Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury
#1

Part:01
জীবনে কখনো শুনেছেন বাসর রাতে নববধূকে দিয়ে একগাদা কাপড় ধোয়ানো হচ্ছে? নিশ্চয়ই না। আজ আমার ডাফার স্বামী ওরফে শায়ান তালুকদার, আমাকে দিয়ে বাসর রাতে কাপড় ধোয়াচ্ছে। অস্বাভাবিক রকমের বাড়াবাড়ি ব্যাপার এটা। এদিকে
রাত অনেক হয়েছে। বাথরুমের ঠান্ডা মেঝেতে টুল নিয়ে বসে আমি একের পর এক কাপড় সাবান মেখে ধুয়ে যাচ্ছি। ঠান্ডা পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখতে রাখতে আঙুলের চামড়াগুলো কুঁচকে যেতে শুরু করেছে। তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে একটা ব্যাপারে। আমার যত্ন করে লাগানো নেইলপলিশ ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। বাপের বাড়িতে থাকতে এসব কাজ তো কখনো করিনি। বাবার আদরের মেয়ে ছিলাম আমি। অথচ সেই বাবাই না জানি কী ভেবে আমাকে এই পাগল ছেলেটার সঙ্গে বিয়ে দিলেন! তার ওপর আবার শায়ান হুমকি দিচ্ছে, কাজ না করলে বাবাকে ফোন করবে। এদিকে বাবাকে আমি প্রচন্ড ভয় পাই। তার সামনে গিয়ে এসব বলতে পারব না বলেই হয়তো সব চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছি। নইলে এই বদমাশ শায়ান তালুকদারকে আমি ঠিকই দেখে নিতাম! শালা বেয়াদব একটা! অথচ এই ছেলেই কিনা আমার ছোটবেলা থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর আজ এই রুপ পরিবর্তনের জন্য বেস্ট শত্রু হয়ে গেছে।

ভাবনার মাঝে ঠিক তখনই বাথরুমের বাইরে থেকে ভেসে এলো গম্ভীর, পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“অরু! এই অরু! আরও দুটো প্যান্ট ছিলো। ওগুলোও বালতিতে অ্যাড কর।”

অরুনীমা মুখ বাঁকিয়ে তাকালো দরজার দিকে। শায়ান দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। যেন এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য। অথচ অরুনীমার অন্য বান্ধবীরা তাকে এভাবে কাজ করতে দেখলে নিশ্চিত অক্কা পেতো। আর শায়ান হাতে করে আরও দুটো জিন্স এনে অরুনীমার সামনে রাখা বালতিতে ফেললো। অরুনীমা অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার ঠোঁটটা অজান্তেই বেঁকে গেলো অভিমানে। আর সে? দিব্যি ভাবসাব নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শায়ান হেসে বলল,
“না না সোনা, তোর এই ইনোসেন্ট পাপ্পি আইস দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। আমি গলছি না। চুপচাপ এগুলো ধুয়ে রেখে দে। কাল সকালে ছাদে গিয়ে মেলে দিবি। আজকের মতো এতটুকুই কাজ।”

কথা শেষ করে শায়ান চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু হঠাৎই অরুনীমা কাতর হয়ে ডেকে উঠলো,
“শায়ান!”

শায়ানের পা থেমে গেলো। অরুনীমা জিজ্ঞেস করে,
“তুই আমাকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছিস কেন? আমরা না বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম! তার ওপর এখন তো আমি তোর বউ… তাও তুই আমাকে দিয়ে এসব করাচ্ছিস?”

শায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল অরুনীমার দিকে। তার চোখে অদ্ভুত এক শান্ত ভাব। সে বলল,
“এটাই তো সমস্যা, অরু। তুই আমার বউ হয়েছিস।কাগজে কলমে, সমাজের চোখে। কিন্তু আমাদের মধ্যে তো সত্যিকারের স্বামী-স্ত্রীর সেই সম্পর্কটা নেই। সেটা আমরা দুজনেই জানি।”

শায়ানের কথা শুনে অরুনীমার বুকটা কেমন করে উঠলো। আসলেই অরুনীমা আর শায়ান বিয়ের দশ মিনিট আগে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছে এই বিয়ে তাদের বাবার জোরে হলেও তারা একচুয়ালি স্বামী-স্ত্রী হবে না। তারা আগের মতো বেস্ট ফ্রেন্ডই থাকবে। সুযোগ বুঝে সেপারেশন নেবে। যেহেতু তারা কেউই প্রস্তুত ছিলো না। শায়ান আবার বলল,
“যেদিন তুই আমাকে সত্যি সত্যি স্বামী বলে মেনে নিতে পারবি, সেদিন আমি তোকে মাথায় করে রাখব। তার আগে নোপ!”

অরুনীমা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। হাতে এখনো সাবানের ফেনা লেগে। চোখ সরাসরি শায়ানের দিকে রেখে প্রশ্ন করলো,
“তুই আমাকে মেনেছিস?”

শায়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে খুব আলতো করে হেসে বলল,
“কবুল বলার সাথে সাথেই।”

অরুনীমা স্তব্ধ হয়ে গেলো। কি বলল সে? কিন্তু এমন তো কথা ছিলো না! এই বিয়েটা হয়েছে অরুনীমার বাবার জোরে, হুট করে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্কটা এক মুহূর্তে বদলে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পরিণত হওয়া এতটাই কি সহজ? এত তারাতাড়ি শায়ান কিভাবে মেনে নিলো অরুনীমাকে! কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হলো, মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে আবার টুলে বসে পড়লো অরুনীমা। ভাবনা ছেড়ে বালতির ভেতর ভেজা কাপড়গুলো আবার ধুতে শুরু করলো। 

-------------------------------------

কাপড় ধোয়ার দীর্ঘ যুদ্ধ শেষ করে অরুনীমা যখন ফ্রেশ হয়ে ঘরে ঢুকলো তখন রাত অনেকটাই গাঢ় হয়ে এসেছে। অরুনীমা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে দেখে বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে শায়ান। তার হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে নিবদ্ধ। অরুনীমাকে আসতে দেখে সে ধীর ভঙ্গিতে ফোনটা পাশে রেখে দিল। অরুনীমা বিছানায় বসলো। কিছুক্ষণ শায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“একটা কথা বলতো, বাবা তোর সাথে আমার বিয়ে দিল কেন? ব্যাপারটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।”

শায়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল,
“আমি কি জানি? তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর।”

অরুনীমা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকালো। সেই চেনা অভিমানী ভঙ্গি। শায়ান সেটা দেখে মৃদু হেসে বলল,
“ ঘুমাবি না? নাকি রাতটা বসেই কাটানোর প্ল্যান?”

অরুনীমা একটু থেমে আবার প্রশ্ন করলো,
“আমরা… ডিভোর্স নেব না?”

শায়ান এবার চোখ তুলে অরুনীমার দিকে তাকালো। শান্ত স্বরে বলল,
“তোর যদি অন্য কাউকে পছন্দ থাকে যাকে তুই বিয়ে করতে পারবি, তাহলে আমি তোকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। কোনো সমস্যা নেই। ডিভোর্সের জন্য অস্থির হচ্ছিস কেন? এমন কেউ আছে?”

অরুনীমা বিরক্ত হয়ে বলল,
“ওহ ইয়ার! আমার কাউকে পছন্দ থাকলে তুই জানতি না? আমার তো ছেলে মানুষে ফোবিয়া আছে। তুই আর আমার বাপ ছাড়া আমার লাইফে কোনো ছেলের অস্তিত্বই রাখি নি। আমি তো জীবনে বিয়েই করতাম না, ভাই! কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝলামি না! ”

শায়ান এবার চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। ছাদের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“তাহলে চুপ থাক। ডিভোর্সের প্ল্যান চেঞ্জড।”

অরুনীমা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই শায়ান গম্ভীর গলায়  বলল,
“বি ম্যাচিউর, অরু। সারাজীবন একা থাকা যায় না। প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটা সঙ্গী দরকার। তাছাড়া আমরা সমাজে বাস করি। তোর এই ফোবিয়া কেউ বুঝবে না। উল্টো দিনশেষে হাজারটা কথা উঠবে।”

একটু থেমে শায়ান হালকা হেসে বলল,
“আর আমরা তো হাসব্যান্ড–ওয়াইফ থোরাই না হলাম। বন্ধু হিসেবেই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারব। আমাদের ভেতরের গল্প তো আর কেউ জানবে না। তাছাড়া সামাজিক একটা সম্পর্কেও আছি। তাই তুইও চেপে যা।”

অরুনীমা মাথা নেড়ে বলল,
“সব বুঝলাম। কিন্তু আজকে আমি ঘুমাব কোথায়? ওই সোফাটা ছোট, আর মেঝেতে ঘুমানো ইম্পসিবল!”

শায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“খাটে কি সমস্যা?”

অরুনীমা চোখ বড় বড় করে তাকালো। যেন বিস্ময়কর কিছু শুনেছে৷ বলল,
“আমি একটা ছেলের সাথে ঘুমাব? তাও এক খাটে?”

শায়ান ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে বলল,
“তো কি করবি? বিয়ে যেহেতু একটা ছেলেকেই করেছিস, ছেলের সাথেই তো ঘুমাতে হবে, তাই না?”

অরুনীমা একটু গুটিসুটি হয়ে শায়ানকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“তাহলে সর ওই সাইডে চেপে ঘুমা। মাঝে বড় একটা কোলবালিশ দে। যতই হোক ছেলেমানুষ তুই, রিস্কি ব্যাপার-স্যাপার!”

শায়ান হালকা হেসে বিছানার মাঝখানে একটা বড় বালিশ রেখে দিয়ে সরে যায় পাশে। অরুনীমা সাবধানে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তবে পরনের শাড়িতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। কারণ জীবনে সে শাড়ি পরেনি। অস্বস্তিটা বোঝা যাচ্ছিল স্পষ্টই। শায়ান সেটা লক্ষ্য করে বলল,
“জেদ করে লাগেজ তো আনলি না বাড়ি থেকে। শাড়িতে নিশ্চয়ই কম্ফোর্ট হবে না। আলমারিতে আমার অনেকগুলো টি-শার্ট আছে। সেখান থেকে আমার যেকোনো একটা টি-শার্ট পরে নিতে পারিস।”

অরুনীমা এক মুহূর্তও দেরি করলো না। উঠে গিয়ে আলমারি খুলে একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট বের করলো। অবশ্য শায়ানের সব টি-শার্টে আরও দু-তিনটে অরুনীমা নিমেষে হয়ে যাবে। ভাবনা ছেড়ে তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় বদলে আবার এসে শুয়ে পড়লো অরুনীমা। বিছানায় কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটলো  নিরবতায়। তারপর অরুনীমা শায়ানের পাশে কাত হয়ে নিজের হাতের ওপর মাথা রেখে শায়ানের দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী হয়ে বলল,
“শোন… তুই আমার না বলার আগেই সব বুঝিস কী করে? ছোটবেলা থেকেই এটা খেয়াল করি।”

শায়ান ধীরে হেসে বলল,
“অনেক বছরের রিসার্চ করার ফল এটা।”

অরুনীমা ছোট ছোট চোখে তাকালো। তারপর শায়ান নিজে চোখ বন্ধ করে বলল,
“এবার ঘুমা। কাল সকালে আমার অফিস আছে।”

অরুনীমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ক্লান্ত থাকায়  কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অরুনীমার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হয়ে এলো, ঘুম তাকে টেনে নিয়ে গেলো অন্য জগতে। শায়ানও চোখ বন্ধ করেছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুললো। নীরবে তাকিয়ে রইলো পাশে ঘুমিয়ে থাকা অগোছালো, অবুঝ মেয়েটার অরুনীমার দিকে। তার কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়া ছোট ছোট বেবি হেয়ারগুলো শায়ান আলতো করে তর্জনী আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিলো। ঘুমের মাঝে অরুনীমাকে দেখতে আলাদা এক শান্তি লাগে শায়ানের।

কত বছর হয়ে গেলো। বন্ধুত্বের নামেই পাশে ছিলো সে। আজ অরুনীমা তার স্ত্রীও হয়ে গেছে। তবু এতদিনেও শায়ান তার মনের অনুভূতি জানাতে পারেনি। কারণ সে জানে, অরুনীমা বুঝবে না। কখনোই বুঝবে না মেয়েটা। উল্টো হেসে উড়িয়ে দেবে। সে বুঝবে না যে, শায়ানের অনুভূতি বন্ধুত্বের সীমানা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এতটাই দূরে চলে গেছে, যেখানে ভালোবাসার অন্ত নেই। তবু দিনশেষে একটাই শান্তি আছে তার মনে। অরুনীমা এখন তার। চিরদিনের জন্য।

চলমান.......



Reply


Messages In This Thread

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)