08-29-2026, 10:59 PM
পর্ব:০২
শায়ান একজন সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। সদ্য কর্মজীবনে পদার্পণ করেছে সে, প্রায় তিনমাসের মতো। বিকেল চারটায় ব্যাংকের কাজ শেষ করে শায়ান বের হয়। প্রতিদিনের ন্যায় ব্যাংক থেকে বেরিয়ে শহরের ব্যস্ত রাস্তায় পা রাখে সে। ব্যাংক বিকেল চারটায় ছুটি হওয়ায় নিয়মমতো আধঘণ্টার পথ পেরিয়ে সাড়ে চারটার দিকে সে পৌঁছায় বাড়িতে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই খেয়াল হলো ঘরটা নিরব। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো অরুনীমা নেই ঘরে।
শায়ান অরুনীমাকে খুঁজতে গিয়ে বারান্দায় পা রাখতেই চোখে পড়লো মেয়েটাকে। মেঝেতে বসে আছে সে, দু’হাত ভরে কিছু শিউলি ফুল নিয়ে। বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই শিউলি ফুলগুলো ধরা যায়। এই নিয়েই অরুনীমা নিজের ছোট্ট জগতে ডুবে আছে অন্তর্চিন্তায়। শায়ানের ডাকে চমকে উঠলে সম্বিৎ ফেরে তার। মাথা তুলে তাকাতেই শায়ান জিজ্ঞেস করে,
“একা বসে কি করছিস এখানে?”
অরুনীমা একটু হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হালকা হাসলো স্বভাবসুলভ ভাবে,
“এমনিই… বসে ছিলাম। তুই কখন এলি?”
“এই তো, একটু আগে। দুপুরে কিছু খেয়েছিস? রান্না তো করে যাইনি আজ।”
অরুনীমা ঘরের ভেতরে এসে সোফায় বসলো। অনায়াস ভঙ্গিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বলল,
“পিজ্জা অর্ডার করেছিলাম। হাফ খেয়েই পেট ভরে গেছে। তোর জন্য বাকিটা রেখে দিয়েছি, টেবিলে।”
শায়ান একমুহূর্ত আশ্চর্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। পরক্ষণেই ভাবনায় এলো অবশ্য মেয়েটার দোষ কি! রান্না শেখার সুযোগই বা কবে পেয়েছে সে? আর যাইহোক, খাবার নষ্ট করা যাবে না। আজকে দুপুরের খাবার হিসাবে পিজ্জা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। তাই আর কিছু না বলে চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখা পিজ্জার বাক্স খুলে খেতে খেতে শায়ান বলল,
“তোর একটু হলেও রান্নাবান্না শেখা উচিত ছিলো, অরু।”
এই কথা শুনে অরুনীমা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বেশ প্রতিবাদী কন্ঠে বলল,
“কেন? আমি মেয়ে বলে?”
শায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু গলায় বলল,
“সবসময় এক লাইন বেশি বুঝিস কেন? মেয়ে বলে শিখতে হবে কখন বললাম? কাজ শেখার কোনো জেন্ডার নেই। আমাকে দেখ, আমি তো ঘরের কাজ সবই পারি মোটামুটি। এতদিন তো নিজেই করেছি সব। কাজ করায় কেউ ছোট হয়ে যায় না।”
কথাটা শুনে অরুনীমা একটু চুপ করলো। শায়ানের কথাগুলো সত্যি, কোনো ভুল নেই। তবু অরুনীমা ঠোঁটে দুষ্টু হাসি এনে বলল,
“তুই আছিস না? যেহেতু তুই আমার বর হয়ে গেছিস, একজন কাজ-ফাজ জানলেই তো হয়! আমি পারবো না বাবা, এসব!"
শায়ান খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে গ্লাসের পানি ঢকঢক করে এক চুমুকে শেষ করলো। তারপর গ্লাসটা রেখে শান্ত গলায় বলল,
“না, তোকে শিখতেই হবে। তোকে রান্নাও আমি শেখাবো। আমার উপর নির্ভরশীল কেন থাকবি? আমি না থাকলে কি করবি? তখন তো তোর না খেয়ে থাকতে হবে!"
শায়ানের কথার ভুল মানে বোঝে অরুনীমা। ওর মস্তিষ্ক ভেবে নেয় শায়ান দূরে চলে যাওয়ার কথা বলেছে, বাকি কথাগুলো কানে পৌছায় না তার। তাই অরুনীমা ভয়ার্ত গলায় শায়ানের হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে,
"মানে, কোথায় যাবি তুই?"
শায়ান হেসে মাথা নাড়লো,
“পাগলি! কোথাও না। তোকে ছেড়ে কোথায় যাবো আমি? আমার গন্তব্যই তো তুই। আমি বোঝাতে চাইছি কয়দিন অর্ডার করে খাবি? বাইরের খাবার প্রতিদিনের জন্য না। হেলথ্ ইস্যুর ব্যাপার আছে তো!"
অরুনীমা এবার বুঝলো শায়ানের কথার মানে। ও তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। পরক্ষণেই অযাচিত ভাবনা ঝেড়ে শায়ানের আরেকটু কাছে গিয়ে বসে। শায়ানের ঝাঁকড়া ঘন চুলে শিউলি ফুলগুলো গুজতে থাকে এক এক করে। তারপর একটু ভেবে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,
“তাহলে… আমরা একটা মেইড রাখি? এতে দুজনেরই কষ্ট কমবে।”
শায়ান হেসে ফেললো মেয়েটার বোকা বোকা কথায়। এদিকে মেয়েটার এমন পাগলামিও উপভোগ করছে সে। অরুনীমা স্কুল লাইফ থেকে মাঝে মাঝেই এমন ফুল গুজে দিতো শায়ানের চুলে। এতে সে কি আনন্দ পায় কে জানে? কিন্তু শায়ান কোনোকিছুতেই আটকায় না তাকে। অরুনীমার কথার প্রতিউত্তরে ওর কপালে আলতো করে টোকা দিয়ে বলল,
“গাধা! এই টাকায় কুলোবে? আর সংসারটাও তো গোছাতে হবে আমাদের, ভুলে যাচ্ছিস?”
অরুনীমা এবার হাঁটু ভাজ করে সোফায় বসে বেশ আগ্রহ নিয়ে বাচ্চাদের মতো ভাবুক স্বরে বলল,
“কি কি করতে হবে? মানে কোথা থেকে শুরু করবো আমরা?”
শায়ান চারপাশে তাকালো। ঘরটা অবলোকন করলো তীক্ষ দৃষ্টিতে। কি আছে কি নেই তা মনে মনে লিস্ট করে ফেললো। শায়ান নিজের মাথা থেকে একটা ফুল নিয়ে চারপাশে ইশারা করে ঘর দেখতে বলে। এরপর অরুনীমার কানে দুটো ফুল গুজে দিতে দিতে বলল,
“আমার ফার্নিচার প্রায় নেই বললেই চলে। আমি তো ব্যাচেলর ছিলাম এতদিন, প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই কেনা হয়নি। এই যেমন বড় আলমারি, বড় সোফা, ডাইনিং টেবিল, একটা টিভি আরও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। প্রতি মাসে একটা একটা করে কিনবো। ফ্রিজ এটাতেই চলে যাবে।
আর এই বাসাটাও পাল্টাতে হবে। একটা ফ্ল্যাট দেখেছি আমি অলরেডি। কথাও হয়েছে।”
অরুনীমা শায়ানের কথায় সায় জানিয়ে বলল,
“ভালোই করেছিস। এই বাসাটা একদমই ছোট। একটা রুম, তাও যেন বাক্স সাইজ! আমার বাসার বাথরুম এর থেকে বড় ছিলো!”
শায়ান মুচকি হেসে বলল,
“তোমার হাসব্যান্ডের স্যালারিটাও দেখতে হবে, ম্যাডাম। ধুমধাড়াক্কা কিনলেই তো হবে না, তাহলে টান পড়বে। তবে যে ফ্ল্যাটটা দেখেছি খারাপ না, আমার এন্ট্রি লেভেলের স্যালারির সাথে অ্যাডজাস্টেড। ওই বাড়িতে দুটো বড় রুম আছে, কিচেন প্লাস বাথরুম। আর তোর পছন্দ মতো একটা বড়সড় বারান্দা!”
বড় বারান্দার কথায় অরুনীমার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। বারান্দা তার কাছে শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং তার স্বপ্নের এক ছোট্ট প্রাঙ্গণ। বারান্দা জিনিসটা তার প্রচন্ড শখের। সে বিভিন্ন ফুল গাছ লাগিয়ে, পাখি রেখে, দোলনা দিয়ে সাজিয়েছিলো নিজের ঘরের বারান্দা। সৌখিনতা, স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর সব বিপরীত। কিন্তু অরুনীমা কখনোই শায়ানকে সরাসরি বলেনি এই বাড়ির ছোট্ট বারান্দাটি তার ভালো লাগে না, কিংবা এই বাড়ির সংকীর্ণতায় তার দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু শায়ান ঠিক বুঝে নিয়েছে। তবে শায়ানের মুখে স্যালারির কথা শুনে অরুনীমা বুদ্ধিমতীর ন্যায় সুবিধা অসুবিধা ভাবলো। ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলো ,
“ভাড়া কত?”
“পাঁচ হাজার। বেশ কমেই পেয়েছি।”
অরুনীমা ধীরে মাথা নাড়লো। তারপর বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে কিছুটা গম্ভীর হয়ে শায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কোনোমতে গ্রাজুয়েশন শেষ করে বসে আছি, সব তো জানিস। ইচ্ছে নেই তবুও মনে হচ্ছে একটা চাকরি পেলে তোকে হেল্প করতে পারতাম। বাপের টাকায় খেয়েছি এতদিন, লাইফ ইজি ছিলো। বাট নাও আ'ই ফিল লাইক, আই শ্যু'ড ডু সামথিং ঠু! তোর একা চাপ হয়ে যাচ্ছে সব!"
শায়ান অরুনীমার গাল টিপে দিয়ে নরম গলায় বলল, “এত ভাবিস না। তোকে ক্যারি করার সামর্থ্য এই শায়ান তালুকদারের আছে। তাছাড়া এমবিএ কর, শুধু শুধু বসে থেকে লাভ কি? ততদিনে চাকরি পেলে তো হলোই।"
অরুনীমা সারাজীবন পড়াশোনা থেকে দশ হাত দূরে থাকে। এতটা করেছে নিজের বাবার জোরে। আর আজ শায়ান কিনা পড়াশোনার কথাই বলছে! তাহলে বিয়ে করে লাভ কি হলো? তাই আবার পড়াশোনার কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে উঠে অরুনীমা বলল,
“না না! পড়াশোনা আর না! নো ওয়ে! এই পড়ালেখায় চাকরি পেলে বলিস, করবো। কিন্তু আবার পড়ালেখা, নোপ!"
এমন কথায় শায়ান হো হো করে হেসে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে রসিকতা করে বলল,
“তাহলে আমার হাউজ ওয়াইফ হয়ে যা!”
অরুনীমাও হেসে ফেললো। মাথা নাড়িয়ে আলতো হেসে বলল,
“সেটাও পারবো না। রান্নাটান্না, ঘরের কাজ কিচ্ছু পারি না। কারণ আমি একটা অকর্মা! বাবা ঠিকই বলতো, আমি কোনো কাজের না। ইউজলেস একটা! তাই বিয়ে দিয়ে ঝামেলা নামিয়ে দিয়েছে।”
শায়ান এবার আর হাসলো না। কারণ, অরুনীমা মোটেও মজা করে নি। বরং, মজার ছলে নিজের ভেতরের অভিমান প্রকাশ করেছে। তা বুঝতে অপারগ নয় শায়ান। শায়ান অরুনীমার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিয়ে ধমকে বলল,
“ফালতু কথা বলিস না, অরু। বাবারা একটু বকাঝকা করেই। ওসব মনে রাখতে নেই। বরং এটা ভাব, বাবার বকা শোনার জন্যও কপাল লাগে। যেটা তোর আছে।”
অরুনীমা চুপ করে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। ওর কথাটা গভীর। এই যেমন, বাপের বকা শোনার কপাল শায়ানের নেই। ছেলেটার যে কেউ থেকেও নেই। ওর বাবা-মা দুজনই আলাদা হয়ে গিয়ে নিজেদের মতো আছে বহুবছর। নিজেদের জীবনে ব্যস্ত তারা সন্তান-সন্ততি নিয়ে। আর শায়ান একাকিত্মকে সঙ্গী করে থেকেছে এতকাল। আর হাইস্কুল জীবনে পেয়েছিলো অরুনীমার মতো বন্ধুকে। এরা দুজন আলাদা হয় নি কখনো, ছোট থেকে এখন পর্যন্ত একসাথে আছে। আর স্টি'ল স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাওয়ায় আলাদা হওয়ার প্রশ্নই নেই। দিনশেষে ভালো কিছু বলতে শায়ান এটাই বলে। শায়ান তার অরুকে দিয়েই একজীবন খুশি খুশি কাটিয়ে দিতে পারবে। জীবনের প্রতি আর কোনো অভিযোগ রাখবে না সে।
বিদ্যমান ঘরের নীরবতায় হালকা বাতাস আসছে জানালার পর্দা নাড়িয়ে। বিকেলের লালচে-হলুদ আলো এসে পড়েছে ঘরটায়। বারান্দায় পড়ে থাকা কিছু শিউলি ফুলের গন্ধে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু অপূর্ণতার মাঝেও ছোট্ট এক সংসার গড়ে উঠার মৃদু প্রতিশ্রুতি দুজনের। একটা সুন্দর পূর্নতার খোঁজ দুটো মনই যে চায়। চড়ুই পাখিদের আপাতত সংসার গোছানোর চিন্তা চলছে।
--------------------------------------
রাতটা অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। রান্নাঘরের গরম ভাতের গন্ধ এখনও বাতাসে ভাসছে। শায়ান নিজের হাতে রান্না করেছে আজ সহজ, আন্তরিক আয়োজনে। দুজনে পাশাপাশি বসে রাত আটটার মধ্যেই খাওয়া সেরে নেয়। তারপর গল্প, ছোট ছোট কথা, টুকরো হাসিতে সময় যায়। কিন্তু তখন রাত খুব বেশি হয় নি। সময় যেন এগোতে চাইছিলো না, আটকে ছিলো কোথাও। শায়ান অরুনীমাকে লক্ষ্য করে হালকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“বোর লাগছে?”
অরুনীমা দ্রুত মাথা নাড়লো। আসলেই লাগছে কিছুটা। তার চোখে একটু অস্থিরতা। শায়ান উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার থেকে মানিব্যাগ পকেটে ভরে বলল,
“চল, বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি তাহলে।”
বাইরে যাওয়ার কথাটা শুনেই অরুনীমার মুখে আলাদাই ঝিলিক ফুটে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে পরনের লেডিস শার্টের উপর গলায় স্কার্ফটা জড়িয়ে নেয়। তার লম্বা খোলা চুলগুলো পনিটেল করে বেঁধে নেয়। তারপর নিঃশব্দে শায়ানের পিছু নিলো অদ্ভুত নিশ্চিন্ত ভরসা নিয়ে।
শায়ান অরুনীমা পাশাপাশি হাঁটছে। দু'একটা রিকশা, সিএনজি যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে। তাছাড়া রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। তবে দূরে কয়েকজন ছেলেপুলে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাৎই শায়ান অরুনীমাকে আলতো টেনে নিজের পাশ বদলে নিলো। আর বেশ সচেতন এক তাড়নায় ওর হাতটা ধরে ফেললো নিজের মুঠোয়। অরুনীমা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। সামনেও খেয়াল করে নি। কিন্তু শায়ানের হাতের উষ্ণ স্পর্শটা টের পেতেই সে ঘুরে তাকালো। চোখে বিস্ময় আর অচেনা প্রশ্নসুচক দৃষ্টি। শায়ান তা লক্ষ্য করে একটু জোর গলায় বলল,
“এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি পরপুরুষ নই। আর… আই হ্যাভ দ্য রাই'ট।”
রাইট শব্দটাতে শায়ানের জোরই ছিলো আলাদা। তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি অরুনীমার। এদিকে শায়ানের কথাগুলোতে ছিলো নিজের স্ত্রীর প্রতি মিশ্র অনুভূতি। দাবি, অধিকার আর লুকানো স্নেহের অনুভূতি।
অরুনীমা নিজেও হাত ছাড়ালো না। শুধু ধীরস্বরে বলল,
“আমি এসবের সঙ্গে খুব একটা কম্ফোর্টেবল নই, তুই জানিস। এসবকিছুই নতুন আমার কাছে… এই অনুভূতিগুলোও।”
শায়ান অরুনীমার অস্বস্তির কথা শুনে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিলো। কিন্তু তার আগেই অরুনীমা নিজেই পুরুষালী হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রাখলো। না নিজে ছাড়লো, আর না শায়ানকে ছাড়াতে দিলো। অরুনীমার কণ্ঠে এবার একরকম দৃঢ়তা,
“ছাড়িস না। তুই আমাকে পরিচয় করাবি সবকিছুর সঙ্গে… কম্ফোর্টও তুই'ই করাবি।”
শায়ান আলতো হেসে অরুনীমার হাত ধরেই সামনে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু গলায় বলল,
"তোর অনুভুতিগুলো নতুন, কিন্তু আমার নয়। অনেক অনেক পুরোনো আমার অনুভুতি। কালও ভেবেছি জানাবো না তোকে। কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না কেন জানি। চল আজ তোকে বলেই দেই, আই ফার্স্ট ফল ইন লা'ভ উইথ ইয়্যু, হোয়েন আই ওয়াজ ইন ক্লাস নাই'ন। দ্যাটস হোয়েন আই রিয়ালাইজড আই হ্যাড ফিলিংস ফ'র ইয়্যু। এন্ড আই স্টিল লা'ভ ইয়্যু।”
এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেলো। অরুনীমা স্তব্ধ হলো সব শুনে। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। কি অকপটে স্বীকারক্তি দিয়ে দিলো শায়ান! অরুনীমা ভাবতেও পারেনি এমন কিছু। শায়ানকে সে বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবে নি কখনো। ভাবতে পারেই নি।
এদিকে সব বলতে পেরে, অরুনীমাকে অবাক করতে পেরে শায়ানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটুকরো গভীর হাসি ফুটে উঠলো। এদিকে শায়ানের ফিলিংস জেনে অস্বস্তি হওয়া শুরু করেছে অরুনীমার। আবার সেই ফোবিয়া এসেছে জাপটে ধরেছে ওকে। অরুনীমা কি ভেবে যেন হাত ছাড়াতে উদ্ধত হয়। মোচরাতে থাকে খানিকটা। তা বুঝে শায়ান এবার ধমকে বলল,
"এসব শুনে হাত ছাড়াতে গেলে মা'র খাবি আমার হাতে! আমি কিছু নিয়ে জোর করছি না তোকে। আর না আমি বিয়ের পর চেঞ্জ হয়েছি যাতে তোর অস্বস্তি হয়। আমরা বন্ধুই আছি, আজ শুধুমাত্র অনুভূতিটুকুর স্বীকারক্তি দিয়েছি। তাছাড়া, আই গেভ ই'য়্যু টাই'ম ফর এভরিথিং। আমার একজীবনের পুরো সময় তোকে দিয়েছি। এনা'ফ না?"
অরুনীমা কিছু বলল না। মাথা নামিয়ে নিলো। ওর যেন কেমন লাগছে সব শুনে। শায়ানের কথায় অস্বস্তি দূর হলেও পুরোপুরি সহজ হতে পারছে না সে। শায়ান এবার আরও শক্ত করে ধরে রাখলো মেয়েলি নরম, উষ্ণ হাতটা। হাঁটার মাঝে অরুনীমার শীর্ন হাতটা উঁচু করে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো তালুতে। অরুনীমার বিমুঢ় হয়ে তাকালো, কিন্তু বাঁধা দেবার সাহস বা অবকাশই কোনোটাই রইলো না। এই স্পর্শ থেকে অজান্তেই শুরু হলো তাদের নতুন কোনো গল্পের প্রথম সুচনা। হয়তোবা নতুন অনুভুতির সুচনা।
শায়ান একজন সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। সদ্য কর্মজীবনে পদার্পণ করেছে সে, প্রায় তিনমাসের মতো। বিকেল চারটায় ব্যাংকের কাজ শেষ করে শায়ান বের হয়। প্রতিদিনের ন্যায় ব্যাংক থেকে বেরিয়ে শহরের ব্যস্ত রাস্তায় পা রাখে সে। ব্যাংক বিকেল চারটায় ছুটি হওয়ায় নিয়মমতো আধঘণ্টার পথ পেরিয়ে সাড়ে চারটার দিকে সে পৌঁছায় বাড়িতে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই খেয়াল হলো ঘরটা নিরব। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো অরুনীমা নেই ঘরে।
শায়ান অরুনীমাকে খুঁজতে গিয়ে বারান্দায় পা রাখতেই চোখে পড়লো মেয়েটাকে। মেঝেতে বসে আছে সে, দু’হাত ভরে কিছু শিউলি ফুল নিয়ে। বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই শিউলি ফুলগুলো ধরা যায়। এই নিয়েই অরুনীমা নিজের ছোট্ট জগতে ডুবে আছে অন্তর্চিন্তায়। শায়ানের ডাকে চমকে উঠলে সম্বিৎ ফেরে তার। মাথা তুলে তাকাতেই শায়ান জিজ্ঞেস করে,
“একা বসে কি করছিস এখানে?”
অরুনীমা একটু হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হালকা হাসলো স্বভাবসুলভ ভাবে,
“এমনিই… বসে ছিলাম। তুই কখন এলি?”
“এই তো, একটু আগে। দুপুরে কিছু খেয়েছিস? রান্না তো করে যাইনি আজ।”
অরুনীমা ঘরের ভেতরে এসে সোফায় বসলো। অনায়াস ভঙ্গিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বলল,
“পিজ্জা অর্ডার করেছিলাম। হাফ খেয়েই পেট ভরে গেছে। তোর জন্য বাকিটা রেখে দিয়েছি, টেবিলে।”
শায়ান একমুহূর্ত আশ্চর্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। পরক্ষণেই ভাবনায় এলো অবশ্য মেয়েটার দোষ কি! রান্না শেখার সুযোগই বা কবে পেয়েছে সে? আর যাইহোক, খাবার নষ্ট করা যাবে না। আজকে দুপুরের খাবার হিসাবে পিজ্জা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। তাই আর কিছু না বলে চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখা পিজ্জার বাক্স খুলে খেতে খেতে শায়ান বলল,
“তোর একটু হলেও রান্নাবান্না শেখা উচিত ছিলো, অরু।”
এই কথা শুনে অরুনীমা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বেশ প্রতিবাদী কন্ঠে বলল,
“কেন? আমি মেয়ে বলে?”
শায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু গলায় বলল,
“সবসময় এক লাইন বেশি বুঝিস কেন? মেয়ে বলে শিখতে হবে কখন বললাম? কাজ শেখার কোনো জেন্ডার নেই। আমাকে দেখ, আমি তো ঘরের কাজ সবই পারি মোটামুটি। এতদিন তো নিজেই করেছি সব। কাজ করায় কেউ ছোট হয়ে যায় না।”
কথাটা শুনে অরুনীমা একটু চুপ করলো। শায়ানের কথাগুলো সত্যি, কোনো ভুল নেই। তবু অরুনীমা ঠোঁটে দুষ্টু হাসি এনে বলল,
“তুই আছিস না? যেহেতু তুই আমার বর হয়ে গেছিস, একজন কাজ-ফাজ জানলেই তো হয়! আমি পারবো না বাবা, এসব!"
শায়ান খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে গ্লাসের পানি ঢকঢক করে এক চুমুকে শেষ করলো। তারপর গ্লাসটা রেখে শান্ত গলায় বলল,
“না, তোকে শিখতেই হবে। তোকে রান্নাও আমি শেখাবো। আমার উপর নির্ভরশীল কেন থাকবি? আমি না থাকলে কি করবি? তখন তো তোর না খেয়ে থাকতে হবে!"
শায়ানের কথার ভুল মানে বোঝে অরুনীমা। ওর মস্তিষ্ক ভেবে নেয় শায়ান দূরে চলে যাওয়ার কথা বলেছে, বাকি কথাগুলো কানে পৌছায় না তার। তাই অরুনীমা ভয়ার্ত গলায় শায়ানের হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে,
"মানে, কোথায় যাবি তুই?"
শায়ান হেসে মাথা নাড়লো,
“পাগলি! কোথাও না। তোকে ছেড়ে কোথায় যাবো আমি? আমার গন্তব্যই তো তুই। আমি বোঝাতে চাইছি কয়দিন অর্ডার করে খাবি? বাইরের খাবার প্রতিদিনের জন্য না। হেলথ্ ইস্যুর ব্যাপার আছে তো!"
অরুনীমা এবার বুঝলো শায়ানের কথার মানে। ও তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। পরক্ষণেই অযাচিত ভাবনা ঝেড়ে শায়ানের আরেকটু কাছে গিয়ে বসে। শায়ানের ঝাঁকড়া ঘন চুলে শিউলি ফুলগুলো গুজতে থাকে এক এক করে। তারপর একটু ভেবে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,
“তাহলে… আমরা একটা মেইড রাখি? এতে দুজনেরই কষ্ট কমবে।”
শায়ান হেসে ফেললো মেয়েটার বোকা বোকা কথায়। এদিকে মেয়েটার এমন পাগলামিও উপভোগ করছে সে। অরুনীমা স্কুল লাইফ থেকে মাঝে মাঝেই এমন ফুল গুজে দিতো শায়ানের চুলে। এতে সে কি আনন্দ পায় কে জানে? কিন্তু শায়ান কোনোকিছুতেই আটকায় না তাকে। অরুনীমার কথার প্রতিউত্তরে ওর কপালে আলতো করে টোকা দিয়ে বলল,
“গাধা! এই টাকায় কুলোবে? আর সংসারটাও তো গোছাতে হবে আমাদের, ভুলে যাচ্ছিস?”
অরুনীমা এবার হাঁটু ভাজ করে সোফায় বসে বেশ আগ্রহ নিয়ে বাচ্চাদের মতো ভাবুক স্বরে বলল,
“কি কি করতে হবে? মানে কোথা থেকে শুরু করবো আমরা?”
শায়ান চারপাশে তাকালো। ঘরটা অবলোকন করলো তীক্ষ দৃষ্টিতে। কি আছে কি নেই তা মনে মনে লিস্ট করে ফেললো। শায়ান নিজের মাথা থেকে একটা ফুল নিয়ে চারপাশে ইশারা করে ঘর দেখতে বলে। এরপর অরুনীমার কানে দুটো ফুল গুজে দিতে দিতে বলল,
“আমার ফার্নিচার প্রায় নেই বললেই চলে। আমি তো ব্যাচেলর ছিলাম এতদিন, প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই কেনা হয়নি। এই যেমন বড় আলমারি, বড় সোফা, ডাইনিং টেবিল, একটা টিভি আরও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। প্রতি মাসে একটা একটা করে কিনবো। ফ্রিজ এটাতেই চলে যাবে।
আর এই বাসাটাও পাল্টাতে হবে। একটা ফ্ল্যাট দেখেছি আমি অলরেডি। কথাও হয়েছে।”
অরুনীমা শায়ানের কথায় সায় জানিয়ে বলল,
“ভালোই করেছিস। এই বাসাটা একদমই ছোট। একটা রুম, তাও যেন বাক্স সাইজ! আমার বাসার বাথরুম এর থেকে বড় ছিলো!”
শায়ান মুচকি হেসে বলল,
“তোমার হাসব্যান্ডের স্যালারিটাও দেখতে হবে, ম্যাডাম। ধুমধাড়াক্কা কিনলেই তো হবে না, তাহলে টান পড়বে। তবে যে ফ্ল্যাটটা দেখেছি খারাপ না, আমার এন্ট্রি লেভেলের স্যালারির সাথে অ্যাডজাস্টেড। ওই বাড়িতে দুটো বড় রুম আছে, কিচেন প্লাস বাথরুম। আর তোর পছন্দ মতো একটা বড়সড় বারান্দা!”
বড় বারান্দার কথায় অরুনীমার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। বারান্দা তার কাছে শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং তার স্বপ্নের এক ছোট্ট প্রাঙ্গণ। বারান্দা জিনিসটা তার প্রচন্ড শখের। সে বিভিন্ন ফুল গাছ লাগিয়ে, পাখি রেখে, দোলনা দিয়ে সাজিয়েছিলো নিজের ঘরের বারান্দা। সৌখিনতা, স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর সব বিপরীত। কিন্তু অরুনীমা কখনোই শায়ানকে সরাসরি বলেনি এই বাড়ির ছোট্ট বারান্দাটি তার ভালো লাগে না, কিংবা এই বাড়ির সংকীর্ণতায় তার দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু শায়ান ঠিক বুঝে নিয়েছে। তবে শায়ানের মুখে স্যালারির কথা শুনে অরুনীমা বুদ্ধিমতীর ন্যায় সুবিধা অসুবিধা ভাবলো। ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলো ,
“ভাড়া কত?”
“পাঁচ হাজার। বেশ কমেই পেয়েছি।”
অরুনীমা ধীরে মাথা নাড়লো। তারপর বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে কিছুটা গম্ভীর হয়ে শায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কোনোমতে গ্রাজুয়েশন শেষ করে বসে আছি, সব তো জানিস। ইচ্ছে নেই তবুও মনে হচ্ছে একটা চাকরি পেলে তোকে হেল্প করতে পারতাম। বাপের টাকায় খেয়েছি এতদিন, লাইফ ইজি ছিলো। বাট নাও আ'ই ফিল লাইক, আই শ্যু'ড ডু সামথিং ঠু! তোর একা চাপ হয়ে যাচ্ছে সব!"
শায়ান অরুনীমার গাল টিপে দিয়ে নরম গলায় বলল, “এত ভাবিস না। তোকে ক্যারি করার সামর্থ্য এই শায়ান তালুকদারের আছে। তাছাড়া এমবিএ কর, শুধু শুধু বসে থেকে লাভ কি? ততদিনে চাকরি পেলে তো হলোই।"
অরুনীমা সারাজীবন পড়াশোনা থেকে দশ হাত দূরে থাকে। এতটা করেছে নিজের বাবার জোরে। আর আজ শায়ান কিনা পড়াশোনার কথাই বলছে! তাহলে বিয়ে করে লাভ কি হলো? তাই আবার পড়াশোনার কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে উঠে অরুনীমা বলল,
“না না! পড়াশোনা আর না! নো ওয়ে! এই পড়ালেখায় চাকরি পেলে বলিস, করবো। কিন্তু আবার পড়ালেখা, নোপ!"
এমন কথায় শায়ান হো হো করে হেসে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে রসিকতা করে বলল,
“তাহলে আমার হাউজ ওয়াইফ হয়ে যা!”
অরুনীমাও হেসে ফেললো। মাথা নাড়িয়ে আলতো হেসে বলল,
“সেটাও পারবো না। রান্নাটান্না, ঘরের কাজ কিচ্ছু পারি না। কারণ আমি একটা অকর্মা! বাবা ঠিকই বলতো, আমি কোনো কাজের না। ইউজলেস একটা! তাই বিয়ে দিয়ে ঝামেলা নামিয়ে দিয়েছে।”
শায়ান এবার আর হাসলো না। কারণ, অরুনীমা মোটেও মজা করে নি। বরং, মজার ছলে নিজের ভেতরের অভিমান প্রকাশ করেছে। তা বুঝতে অপারগ নয় শায়ান। শায়ান অরুনীমার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিয়ে ধমকে বলল,
“ফালতু কথা বলিস না, অরু। বাবারা একটু বকাঝকা করেই। ওসব মনে রাখতে নেই। বরং এটা ভাব, বাবার বকা শোনার জন্যও কপাল লাগে। যেটা তোর আছে।”
অরুনীমা চুপ করে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। ওর কথাটা গভীর। এই যেমন, বাপের বকা শোনার কপাল শায়ানের নেই। ছেলেটার যে কেউ থেকেও নেই। ওর বাবা-মা দুজনই আলাদা হয়ে গিয়ে নিজেদের মতো আছে বহুবছর। নিজেদের জীবনে ব্যস্ত তারা সন্তান-সন্ততি নিয়ে। আর শায়ান একাকিত্মকে সঙ্গী করে থেকেছে এতকাল। আর হাইস্কুল জীবনে পেয়েছিলো অরুনীমার মতো বন্ধুকে। এরা দুজন আলাদা হয় নি কখনো, ছোট থেকে এখন পর্যন্ত একসাথে আছে। আর স্টি'ল স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাওয়ায় আলাদা হওয়ার প্রশ্নই নেই। দিনশেষে ভালো কিছু বলতে শায়ান এটাই বলে। শায়ান তার অরুকে দিয়েই একজীবন খুশি খুশি কাটিয়ে দিতে পারবে। জীবনের প্রতি আর কোনো অভিযোগ রাখবে না সে।
বিদ্যমান ঘরের নীরবতায় হালকা বাতাস আসছে জানালার পর্দা নাড়িয়ে। বিকেলের লালচে-হলুদ আলো এসে পড়েছে ঘরটায়। বারান্দায় পড়ে থাকা কিছু শিউলি ফুলের গন্ধে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু অপূর্ণতার মাঝেও ছোট্ট এক সংসার গড়ে উঠার মৃদু প্রতিশ্রুতি দুজনের। একটা সুন্দর পূর্নতার খোঁজ দুটো মনই যে চায়। চড়ুই পাখিদের আপাতত সংসার গোছানোর চিন্তা চলছে।
--------------------------------------
রাতটা অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। রান্নাঘরের গরম ভাতের গন্ধ এখনও বাতাসে ভাসছে। শায়ান নিজের হাতে রান্না করেছে আজ সহজ, আন্তরিক আয়োজনে। দুজনে পাশাপাশি বসে রাত আটটার মধ্যেই খাওয়া সেরে নেয়। তারপর গল্প, ছোট ছোট কথা, টুকরো হাসিতে সময় যায়। কিন্তু তখন রাত খুব বেশি হয় নি। সময় যেন এগোতে চাইছিলো না, আটকে ছিলো কোথাও। শায়ান অরুনীমাকে লক্ষ্য করে হালকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“বোর লাগছে?”
অরুনীমা দ্রুত মাথা নাড়লো। আসলেই লাগছে কিছুটা। তার চোখে একটু অস্থিরতা। শায়ান উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার থেকে মানিব্যাগ পকেটে ভরে বলল,
“চল, বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি তাহলে।”
বাইরে যাওয়ার কথাটা শুনেই অরুনীমার মুখে আলাদাই ঝিলিক ফুটে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে পরনের লেডিস শার্টের উপর গলায় স্কার্ফটা জড়িয়ে নেয়। তার লম্বা খোলা চুলগুলো পনিটেল করে বেঁধে নেয়। তারপর নিঃশব্দে শায়ানের পিছু নিলো অদ্ভুত নিশ্চিন্ত ভরসা নিয়ে।
শায়ান অরুনীমা পাশাপাশি হাঁটছে। দু'একটা রিকশা, সিএনজি যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে। তাছাড়া রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। তবে দূরে কয়েকজন ছেলেপুলে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাৎই শায়ান অরুনীমাকে আলতো টেনে নিজের পাশ বদলে নিলো। আর বেশ সচেতন এক তাড়নায় ওর হাতটা ধরে ফেললো নিজের মুঠোয়। অরুনীমা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। সামনেও খেয়াল করে নি। কিন্তু শায়ানের হাতের উষ্ণ স্পর্শটা টের পেতেই সে ঘুরে তাকালো। চোখে বিস্ময় আর অচেনা প্রশ্নসুচক দৃষ্টি। শায়ান তা লক্ষ্য করে একটু জোর গলায় বলল,
“এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি পরপুরুষ নই। আর… আই হ্যাভ দ্য রাই'ট।”
রাইট শব্দটাতে শায়ানের জোরই ছিলো আলাদা। তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি অরুনীমার। এদিকে শায়ানের কথাগুলোতে ছিলো নিজের স্ত্রীর প্রতি মিশ্র অনুভূতি। দাবি, অধিকার আর লুকানো স্নেহের অনুভূতি।
অরুনীমা নিজেও হাত ছাড়ালো না। শুধু ধীরস্বরে বলল,
“আমি এসবের সঙ্গে খুব একটা কম্ফোর্টেবল নই, তুই জানিস। এসবকিছুই নতুন আমার কাছে… এই অনুভূতিগুলোও।”
শায়ান অরুনীমার অস্বস্তির কথা শুনে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিলো। কিন্তু তার আগেই অরুনীমা নিজেই পুরুষালী হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রাখলো। না নিজে ছাড়লো, আর না শায়ানকে ছাড়াতে দিলো। অরুনীমার কণ্ঠে এবার একরকম দৃঢ়তা,
“ছাড়িস না। তুই আমাকে পরিচয় করাবি সবকিছুর সঙ্গে… কম্ফোর্টও তুই'ই করাবি।”
শায়ান আলতো হেসে অরুনীমার হাত ধরেই সামনে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু গলায় বলল,
"তোর অনুভুতিগুলো নতুন, কিন্তু আমার নয়। অনেক অনেক পুরোনো আমার অনুভুতি। কালও ভেবেছি জানাবো না তোকে। কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না কেন জানি। চল আজ তোকে বলেই দেই, আই ফার্স্ট ফল ইন লা'ভ উইথ ইয়্যু, হোয়েন আই ওয়াজ ইন ক্লাস নাই'ন। দ্যাটস হোয়েন আই রিয়ালাইজড আই হ্যাড ফিলিংস ফ'র ইয়্যু। এন্ড আই স্টিল লা'ভ ইয়্যু।”
এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেলো। অরুনীমা স্তব্ধ হলো সব শুনে। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। কি অকপটে স্বীকারক্তি দিয়ে দিলো শায়ান! অরুনীমা ভাবতেও পারেনি এমন কিছু। শায়ানকে সে বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবে নি কখনো। ভাবতে পারেই নি।
এদিকে সব বলতে পেরে, অরুনীমাকে অবাক করতে পেরে শায়ানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটুকরো গভীর হাসি ফুটে উঠলো। এদিকে শায়ানের ফিলিংস জেনে অস্বস্তি হওয়া শুরু করেছে অরুনীমার। আবার সেই ফোবিয়া এসেছে জাপটে ধরেছে ওকে। অরুনীমা কি ভেবে যেন হাত ছাড়াতে উদ্ধত হয়। মোচরাতে থাকে খানিকটা। তা বুঝে শায়ান এবার ধমকে বলল,
"এসব শুনে হাত ছাড়াতে গেলে মা'র খাবি আমার হাতে! আমি কিছু নিয়ে জোর করছি না তোকে। আর না আমি বিয়ের পর চেঞ্জ হয়েছি যাতে তোর অস্বস্তি হয়। আমরা বন্ধুই আছি, আজ শুধুমাত্র অনুভূতিটুকুর স্বীকারক্তি দিয়েছি। তাছাড়া, আই গেভ ই'য়্যু টাই'ম ফর এভরিথিং। আমার একজীবনের পুরো সময় তোকে দিয়েছি। এনা'ফ না?"
অরুনীমা কিছু বলল না। মাথা নামিয়ে নিলো। ওর যেন কেমন লাগছে সব শুনে। শায়ানের কথায় অস্বস্তি দূর হলেও পুরোপুরি সহজ হতে পারছে না সে। শায়ান এবার আরও শক্ত করে ধরে রাখলো মেয়েলি নরম, উষ্ণ হাতটা। হাঁটার মাঝে অরুনীমার শীর্ন হাতটা উঁচু করে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো তালুতে। অরুনীমার বিমুঢ় হয়ে তাকালো, কিন্তু বাঁধা দেবার সাহস বা অবকাশই কোনোটাই রইলো না। এই স্পর্শ থেকে অজান্তেই শুরু হলো তাদের নতুন কোনো গল্পের প্রথম সুচনা। হয়তোবা নতুন অনুভুতির সুচনা।
চলমান.......
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]
