Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#31

৩১



আশিক ভাই!

আশিক ভাই আমাদের 'ঢাকা পেপারস'-এর ক্রাইম বিটের চিফ রিপোর্টার। উনার বয়স পঁয়ত্রিশের মতো হবে। উনার চেহারাটা সবসময় একটা রুক্ষ, রাফ-অ্যান্ড-টাফ লুক দেয়। উনাকে কখনো ফর্মাল শার্ট বা ইন-করা প্যান্ট পরতে দেখিনি। উনার সিগনেচার ড্রেস হলো একটা উসকোখুস্কো, ফেডেড জিন্স আর একটা চেক শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম সবসময় খোলা থাকে। উনার গলায় পত্রিকার প্রেস কার্ডটা একটা মাদুলি বা তাবিজের মতো ঝোলে।

আশিক ভাইয়ের চোখ দুটো সব সময় লাল থাকে। কেউ বলে উনি রাত জেগে সোর্স মেইনটেইন করেন বলে এই অবস্থা, আবার অফিসে এমন গুজবও আছে যে উনি নাকি গাঁজা বা অন্য কোনো নেশা করেন। তবে কারণ যাই হোক, উনার চোখের ওই লালচে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় উনি আপনার পেটের ভেতরের কথাটাও স্ক্যান করে ফেলছেন।

বাংলাদেশের সংবাদ পাড়ায় আশিক ভাই বেশ নামি দামি একটা চরিত্র। ঢাকা শহরের বড় বড় থানার ওসি থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক গডফাদারের সাথে উনার ডিরেক্ট কানেকশন। ডিবি পুলিশ, র‍্যাব, সিআইডি— সব জায়গায় উনার সোর্স আছে। কোথায় কোন মার্ডার হলো, কোন পলিটিশিয়ান কার সাথে ঘুষের ডিল করল, কোন মডেলকে কোন ব্যবসায়ী ফ্ল্যাট কিনে দিল— এই সমস্ত খবর আশিক ভাইয়ের নখদর্পণে। ক্রাইম রিপোর্টিংয়ে উনি একাই একশো।

উনার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব একটা গভীর না। একই অফিসে কাজ করার সুবাদে জাস্ট 'হাই-হ্যালো' টাইপ সম্পর্ক। আমি থাকি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে, বিশ্বের পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, হোয়াইট কলার খবর নিয়ে। আর উনি থাকেন দেশের ড্রেন, নর্দমা আর রক্তের খবরের মধ্যে। আমাদের দুজনের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ আলাদা। মাঝে মাঝে অফিসের নিচে টং দোকানে চা খাওয়ার সময় বা স্মোকিং লাউঞ্জে সিগারেট টানার সময় দেখা হলে একটু কুশল বিনিময় হয়।

"কী অবস্থা রাশেদ? বাইডেনের খবর কী?" উনি হয়তো সিগারেট ধরাতে ধরাতে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করেন।

"এই তো ভাই, চলছে। আপনার এলাকার খবর কী? আজ কয়টা খুন হলো?" আমি পাল্টা মজা করি।

উনি আমাকে খুব একটা পাত্তা দেন না, কারণ উনার চোখে আমি তো নিরামিষ অনুবাদক। আমার জীবনে তো কোনো থ্রিল নেই, কোনো রহস্য নেই। কিন্তু আজ... আজ আমার এই নিরামিষ জীবনে যে পরিমাণ আমিষ মসলা, যে পরিমাণ রক্ত আর অপরাধের ছায়া ঢুকেছে, তাতে আশিক ভাই ছাড়া আমাকে আর কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।

আশিক ভাই হয়তো আমাকে একটা গালি দেবেন। হয়তো বলবেন, "শালা, তুই দেখতে তো খুব ভদ্র, আর ভেতরে ভেতরে এত বড় প্লেয়ার! অন্যের বউয়ের সাথে বিছানায় যাস!" কিন্তু গালি দেওয়ার পরও উনি আমাকে পুলিশের সাইকোলজিটা অন্তত বুঝিয়ে বলতে পারবেন। উনি বলতে পারবেন আনিকা নাওহারের এই জিডি ফাইল করার পেছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী হতে পারে। উনি আমাকে একটা পথ দেখাতে পারবেন, যাতে আমি এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারি।

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরালাম। পুতিন তখনো স্পিচ দিয়ে যাচ্ছেন। পুতিন সাহেব, আপনার যুদ্ধ আপনি করুন। আমাকে এখন আমার নিজের বিশ্বযুদ্ধে নামতে হবে। আমি ল্যাপটপটা লক করলাম। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে আমি আমার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম।

আশিক ভাইয়ের ডেস্কটা নিউজ রুমের একদম শেষ মাথায়। সেখানে সবসময় একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকে। চায়ের খালি কাপ, প্রিন্ট করা কাগজ, আর ছাইদানিতে সিগারেটের স্তূপ। আমি বুক দুরুদুরু অবস্থায় উনার ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আশিক ভাই তখন কানে ইয়ারফোন দিয়ে একটা ভয়েস রেকর্ড শুনছেন, আর খুব দ্রুত কিছু টাইপ করছেন। উনার মুখের এক পাশে একটা আধা-খাওয়া সিগারেট জ্বলছে।

"আশিক ভাই? একটু ডিস্টার্ব করি?" আমি খুব মিনমিন করে বললাম।

আশিক ভাই ইয়ারফোনটা এক কান থেকে খুলে আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকালেন। উনার লালচে চোখে একটা বিরক্তি আর কৌতূহলের মিশ্রণ। "আরে রাশেদ সাহেব! কী খবর? পুতিন আর ট্রাম্প কি সন্ধি কইরা ফেলল নাকি? তুমি ক্রাইম ডেস্কে কী মনে করে?"

"ভাই, সন্ধি তো দূরের কথা, আমার নিজের জীবনেই থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হয়ে গেছে। আপনার সাথে একটু জরুরি কথা ছিল। একান্ত ব্যক্তিগত। পাঁচটা মিনিট সময় দেওয়া যাবে?" আমি খুব অসহায় একটা মুখ করে বললাম।

আমার গলার স্বর আর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে আশিক ভাইয়ের রিপোর্টার ইনস্টিংক্ট হয়তো কিছু একটা আঁচ করতে পারল। উনি টাইপিং থামিয়ে উনার চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরলেন। "বসো," উনি সামনের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে বললেন। "বলো, কী এমন ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হইলো তোমার লাইফে?"

আমি চেয়ারটায় বসলাম। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। আমাকে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। এমনভাবে গল্পটা সাজাতে হবে যাতে আমার ইনভলভমেন্টটা থাকে, কিন্তু আমার আর আনিকার শারীরিক বা যৌন সম্পর্কের বিষয়টা পুরোপুরি আড়ালে থাকে। ক্রাইম রিপোর্টাররা খুব শার্প হয়, একটু এদিক-সেদিক হলেই তারা আসল ঘটনা ধরে ফেলবে।

"ভাই, ব্যাপারটা হচ্ছে..." আমি গলা পরিষ্কার করে শুরু করলাম। "আমার এক পরিচিত বড় আপু আছেন। উনি একজন লেখিকা। লন্ডন থাকেন। আমি উনার বইয়ের প্রুফরিডিংয়ের কাজ করি। তো, উনি গত এক মাস ধরে দেশে আছেন। উনার একটা ফ্ল্যাট আছে ধানমন্ডিতে। উনি আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন কয়েকদিনের জন্য উনার ফ্ল্যাটে থেকে উনার নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটা এডিট করে দিতে। আমি গত কয়েকদিন ওই ফ্ল্যাটেই ছিলাম।"

আশিক ভাই পকেট থেকে একটা নতুন সিগারেট বের করে ধরিয়ে বললেন, "হুম। তারপর? প্রুফরিডিং করতে গিয়া কি কোনো ঝামেলা পাকাইছ?"

"না না ভাই, সে রকম কিছু না!" আমি দ্রুত বললাম। "ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। ওই আপুর হাসব্যান্ড সপ্তাহখানেক আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু গত পরশু রাত থেকেই উনার হাসব্যান্ডকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উনি নিখোঁজ।"

আশিক ভাই সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছাড়লেন। উনার চোখে এখন একটা পেশাদার কৌতূহল। "লন্ডনপ্রবাসী হাসব্যান্ড নিখোঁজ? হুম। তারপর?"

"তারপর ভাই, ওই আপু আজ সকালে থানায় গিয়ে মিসিং রিপোর্ট মানে জিডি করেছেন। আর জিডিতে উনি আমার নামটাও দিয়েছেন। উনি বলেছেন যে উনার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার আগে আমি ওই বাসায় গেস্ট হিসেবে ছিলাম।"

আমি কথাগুলো বলে একটু থামলাম। আমার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। আমি আশিক ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ভাই, আমি তো এসব থানা-পুলিশের কিচ্ছু বুঝি না। পুলিশ যদি এখন আমাকে ডাকে? আমাকে যদি সাসপেক্ট করে বসে? আমি তো ভাই একজন নিরীহ অনুবাদক। আমার তো ভয়ে হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।"

আশিক ভাই কোনো কথা বললেন না। উনি উনার লালচে, তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। উনার ঠোঁটে একটা বাকা হাসি। "রাশেদ," আশিক ভাই খুব ধীর, চিবিয়ে চিবিয়ে বলা গলায় শুরু করলেন, "আমি ক্রাইম রিপোর্টিং করতে করতে মানুষের চোখ পড়া শিখে গেছি। তুমি আমার কাছে কিছু একটা লুকাচ্ছ।"

আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। "কই না তো ভাই! যা সত্যি তা-ই বললাম।" আশিক ভাই একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। উনার গলার স্বরটা আরও নিচু হলো। "স্টোরিটা পুরোপুরি মিলছে না রাশেদ। আমাকে সত্যি কথাটা বলো তো ভাই, ওই আপুর সাথে তোমার কি 'ভাবি-দেবর' টাইপ কোনো রোমান্স চলছিল নাকি? চক্কর আছে কোনো?"

আমি ঢোঁক গিললাম। আমার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললাম, "আস্তাগফিরুল্লাহ ভাই! কী যে বলেন! উনি আমার বড় বোনের মতো। প্রুফরিডিংয়ের বাইরে উনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"

"শিওর?" আশিক ভাই চোখ সরু করলেন। "লন্ডনপ্রবাসী মহিলা। ধানমন্ডির ফ্ল্যাট। টাকার তো অভাব নাই। সম্পত্তির লোভে কি মহিলা নিজের জামাইরে দুনিয়া থেকে সরাইয়া দিছে বলে তোমার মনে হয়? এই নিখোঁজের পেছনে ওই মহিলার কোনো হাত আছে?"

"আমি কীভাবে বলব ভাই? আমি তো কিছুই জানি না," আমি বোকা সাজার ভান করলাম।

আশিক ভাই এবার উনার সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে ফেলে খুব তীক্ষ্ণ একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। "আর তুমি? তুমি এই গুমের পেছনে জড়িত নাই তো? মানে, সত্যি করে বলো, তুমি তো আর ওই লোকটাকে ড্রয়িংরুমে একা পেয়ে অ্যাশট্রে দিয়ে মাথায় বাড়ি মারো নাই?"

"ভাই!" আমি আক্ষরিক অর্থেই চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। "আমি একটা মশাও মারতে পারি না, আর আপনি বলছেন মানুষ খুন! আমি ওই লোকটাকে জীবনে ওইদিন সকালেই ফার্স্ট টাইম দেখেছি। আমি জাস্ট আমার কাজ শেষ করে চলে এসেছি। ট্রাস্ট মি ভাই, আমি কিচ্ছু জানি না।"

আশিক ভাই আমার মুখের আতঙ্কের ছাপটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। তারপর হঠাৎ করে উনার সেই গম্ভীর, ইন্টারোগেটিভ চেহারাটা পাল্টে গেল। উনি একটা খুব তাচ্ছিল্য মেশানো, ডন্ট-কেয়ার মার্কা হাসি হাসলেন। "আরে ধুর মিয়া! রিল্যাক্স! আমি তো জাস্ট চেক করতেছিলাম তুমি কদ্দুর কী জানো," আশিক ভাই হাসতে হাসতে বললেন। "এইটুক বিষয় নিয়া তুমি এমন শুকাইয়া যাইতেছ? আমি তো ভাবলাম তুমি সত্যি সত্যিই কারো মাথা ফাটায়া আসছ। মিসিং জিডিতে নাম দিছে, এতে এত প্যারা খাওয়ার কী আছে? তুমি যখন গুম করো নাই, তখন চিল।"

"ভাই, পুলিশ তো পুলিশই। তারা যদি আমাকে থানায় বসিয়ে রাখে? যদি আজেবাজে জেরা করে?" আমি তবুও আমার ভয়টা প্রকাশ করলাম।
আশিক ভাই একটু হাসলেন। "আচ্ছা, জিডিটা কোন থানায় করছে, জানো কিছু?" আমি দ্রুত বললাম, "কলাবাগান থানায়। আপুর ফ্ল্যাটটা ধানমন্ডি আর কলাবাগানের বর্ডারের দিকে তো, তাই কলাবাগান থানায় করেছে।"

কলাবাগান থানার নামটা শোনার সাথে সাথেই আশিক ভাইয়ের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উনি এমন একটা ভাব করলেন যেন আমি উনার নিজের বাড়ির কোনো ড্রয়িংরুমের নাম বলেছি। "কলাবাগান থানা! আরে ধুর মিয়া! তুমি তো আগেই বলবা!" আশিক ভাই উনার টেবিল চাপড়ে বললেন। "কলাবাগান থানার ওসি হইলো শাহাদাত ভাই। শাহাদাত ভাই আমার নিজের এলাকার বড় ভাই, আমার খুব ক্লোজ পরিচিত। আমরা সপ্তাহে দুই দিন একসাথে বইসা আড্ডা দিই। তোমার কোনো প্যারা নাই রাশেদ।"

আমার কানকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ঢাকা শহরে বিপদের সময় একজন ওসি যদি পরিচিত বের হয়, তার চেয়ে বড় জ্যাকপট আর কিছু হতে পারে না। আশিক ভাই একটা কাগজ টেনে নিয়ে তাতে একটা নাম্বার লিখলেন। "শোনো রাশেদ," আশিক ভাই খুব প্রটেক্টিভ গলায় বললেন, "তোমাকে যদি থানা থেকে ডাকে, তুমি একদম বুক ফুলায়া যাবা। কোনো ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তুমি গিয়া ডিরেক্ট ওসি শাহাদাত ভাইয়ের রুমে ঢুকবা। বলবা, 'আমি ঢাকা পেপারসের আশিকের কলিগ।' শাহাদাত ভাই আমার নাম শুনলে তোমারে চা-বিস্কুট খাওয়াইয়া, স্যালুট দিয়া বিদায় করব। কেউ তোমার দিকে চোখ তুইল্যাও তাকানোর সাহস পাইব না। শুধু যা সত্যি তা-ই বলবা। বলবা তুমি প্রুফরিডার, কাজ শেষ করে চলে আসছ।"

আমার মনে হলো, আশিক ভাই এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো সাধারণ রিপোর্টার নন, উনি যেন সাক্ষাৎ কোনো ত্রাণকর্তা ফেরেশতা হয়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। "ভাই... আপনাকে যে কীভাবে ধন্যবাদ দেব!" আমি প্রায় আবেগে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা করে বললাম। "আমি আসলেই খুব ভয়ে ছিলাম।"

আশিক ভাই হাসলেন। "আরে বোকা! আমরা একই অফিসে চাকরি করি, আমরা তো ফ্যামিলির মতো। তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তোমার কোনো সমস্যা হইলে আমি দেখব না তো কে দেখবে? আর শোনো, তারপরও যদি তোমার একা থানায় যাইতে অস্বস্তি লাগে, তুমি জাস্ট আমাকে একটা কল দিবা। আমি তোমার সাথে থানায় যামু। শাহাদাত ভাইয়ের রুমে বইসা একসাথে চা খাইয়া আসমু। যাও, গিয়া টেনশন ফ্রি হইয়া কাম করো।"

আমি আশিক ভাইয়ের হাতটা ধরে একটা আন্তরিক ঝাঁকুনি দিলাম। "থ্যাংক ইউ ভাই! থ্যাংক ইউ সো মাচ।" আমি উনার ডেস্ক থেকে যখন ফিরে আসছিলাম, তখন আমার পায়ের নিচের মাটিটা আবার শক্ত মনে হচ্ছিল। 

হ্যাঁ, আমার ভেতরে একটা বিশাল নোংরা গোপন সত্য লুকিয়ে আছে। আমি আনিকার সাথে শুয়েছি, আমি বেলালের বিছানায় দাগ ফেলেছি। পুলিশ যদি কখনো সেই সত্যটা খুঁড়ে বের করে, তাহলে হয়তো আশিক ভাই বা ওসি শাহাদাত কেউই আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু আপাতত... আপাতত অন্তত আমার মাথার ওপর থেকে সেই রিমান্ডের, সেই সিলিং ফ্যানে ঝোলানোর ভয়টা কেটে গেছে। আশিক ভাইয়ের ওই একটা 'প্যারা নাই' শব্দ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লাইফ জ্যাকেট হয়ে আমাকে ভাসিয়ে রেখেছে।

আমি আমার ডেস্কে এসে বসলাম। পুতিনের স্পিচের ভিডিওটা আবার অন করলাম। আমার হাত এখন আর কাঁপছে না। আনিকা নাওহারের সেই মায়াবী, ঘাতক ফাঁদে আমি জড়িয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু আমি রাশেদ আহমেদ এত সহজে হার মানার পাত্র নই। আমি পরিস্থিতি দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই এই গল্পের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

আমি কি-বোর্ডে আবার টাইপ করতে শুরু করলাম।
আনিকার সাথে গ্লোরিয়া জিন্স কফিশপে সেই নার্ভ-কাঁপানো সাক্ষাৎ, উনার স্বামী বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার খবর, এবং ক্রাইম রিপোর্টার আশিক ভাইয়ের কাছে গিয়ে আমার সেই করুণ আত্মসমর্পণ— এই সবকিছুর পর চোখের পলকে কেটে গেছে তিনটে দিন।

আজ এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ। সোমবার।

সাধারণত আমার জীবনে সোমবার মানেই ছুটির দিন। সোমবার মানেই কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে গিয়ে চা খাওয়া, উদীয়মান কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডা দেওয়া, আর ফরাসি সাহিত্য বা জাদুবাস্তবতা নিয়ে বড় বড় তাত্ত্বিক আলোচনা করা। কিন্তু আজ আমার চন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার কোনো মানসিক বা শারীরিক শক্তি নেই। মিরপুরের মেসে নিজের দশ ফুট বাই দশ ফুট রুমের ভেতর আমি একটা ইঁদুরের মতো লুকিয়ে আছি।

গত তিন দিন আমার কেটেছে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে। আমি না পেরেছি ঠিকমতো ঘুমাতে, না পেরেছি খেতে, না পেরেছি অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে। আমার মাথার ভেতর একটা অদৃশ্য টাইমবোমা টিকটিক করছে, যেটা যেকোনো সময় ফাটতে পারে।

এই তিন দিনের মধ্যে আনিকার সাথে আমার কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। প্রথমবার যখন আনিকার কলটা আমার ফোনে আসে, তখন স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠেছিল। আমি ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আনিকার সেই চিরচেনা, রেশমি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "কী গো অনুবাদক সাহেব, কেমন আছো?"

আমি আনিকার গলা শুনে যতটা না স্বস্তি পেয়েছিলাম, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আতঙ্কিত হয়েছিলাম। আমি প্রায় ফিসফিস করে, চরম প্যানিক করা গলায় বলেছিলাম, "আনিকা! তুমি আমাকে কল করছ কেন? তোমার স্বামী নিখোঁজ, তুমি থানায় জিডি করেছ! তুমি কি জানো না মিসিং কেসে পুলিশ সবার আগে স্বামী-স্ত্রীর কল লিস্ট চেক করে? তারা তোমার ফোন ট্যাপ করে বসে আছে! তুমি আমাকে এই অবস্থায় ফোন করছ, আমরা তো দুজনেই ফেঁসে যাব!"

আমার এই রুদ্ধশ্বাস আতঙ্কের কথা শুনে আনিকা ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আরে বোকা!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন, "তুমি কি আমাকে এতই কাঁচা খেলোয়াড় ভেবেছ? আমি কি আমার রেগুলার নাম্বার থেকে তোমাকে ফোন দিচ্ছি নাকি? ট্রু-কলারে চেক করে দেখো, এটা কার নাম্বার।"

আমি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনে দেখলাম। ট্রু-কলারে নাম ভাসছে— 'মজিদ মিয়া, কাওরান বাজার'। "মজিদ মিয়া কে?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। "কে জানে কে মজিদ মিয়া!" আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "লন্ডন থেকে আসার পর এয়ারপোর্টের বাইরে এক ভাসমান সিম বিক্রেতার কাছ থেকে এই সিমটা কিনেছিলাম। কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, কার এনআইডি দিয়ে এই সিম তোলা, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। এটা একটা ঘোস্ট সিম বা বেনামি নাম্বার। এই নাম্বার আমি শুধু ইন্টারনেট ডেটা আর তোমাকে কল করার জন্যই ইউজ করি। পুলিশের বাপের সাধ্য নেই এই নাম্বার ট্রেস করে আমার আসল পরিচয় বের করার।"

আমি তবুও আশ্বস্ত হতে পারলাম না। "কিন্তু আনিকা, পুলিশ যদি কোনোভাবে ট্র্যাক করে ফেলে? যদি তারা আমাদের কথাবার্তা শুনে ফেলে?" আনিকা খুব তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "আর জানলেই বা কী? আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি নাকি? আমরা কি বেলালকে খুন করেছি? আমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, ফোনে কথা বলছি, এতে পুলিশের কী করার আছে?"

উনার এই অদ্ভুত কনফিডেন্স আমাকে কিছুটা শান্ত করলেও, পুরোপুরি চিন্তামুক্ত করতে পারল না। আমি এই তিন দিনে উনার সাথে যতবার কথা বলেছি, ততবারই আমি চেষ্টা করেছি আসল সত্যটা খুঁড়ে বের করার। আমার মাথার ভেতর ওই ২রা এপ্রিল সকালের ঘটনাটা একটা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছিল।

"আনিকা, আমাকে সত্যি করে বলো তো," আমি একদিন রাতে উনাকে ফোনে ধরলাম, "আসলে বেলাল সাহেবের কী হতে পারে? তোমার কী সন্দেহ? উনার কি কোনো ব্যবসায়িক শত্রু ছিল? নাকি লন্ডনে কারো সাথে কোনো ঝামেলা ছিল?"

আনিকা প্রতিবারই এই প্রশ্নগুলো খুব নিপুণভাবে এড়িয়ে গেছেন। "আমি জানি না রাশেদ। আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না। বেলালের তো এমন কোনো শত্রু থাকার কথা না। হয়তো রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছে, অথবা অন্য কিছু। পুলিশ খুঁজছে, দেখা যাক কী হয়।"

উনার গলার স্বরে কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো টেনশন নেই। নিজের স্বামী নিখোঁজ, অথচ উনি কথা বলছেন এমনভাবে যেন উনার হাতের একটা সস্তা ছাতা হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ছিল অন্য জায়গায়।

"আনিকা, একটা কথা আমি কিছুতেই মেলাতে পারছি না," আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাইলাম। "সেদিন সকালে... যেদিন বেলাল সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে লাগেজ নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আমি দরজা খুলে দিলাম। একটা অচেনা লোক, সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিচ্ছে, আর বেলাল সাহেব সেটা দেখে কোনো রিঅ্যাক্ট করলেন না? উনি আমাকে হাসিমুখে বললেন— 'কী ব্যাপার, নাশতা আনতে গিয়েছিলেন?' এটা কীভাবে সম্ভব আনিকা? উনি কীভাবে আমাকে এত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলেন? উনি কি কিছুই সন্দেহ করেননি?"

এই প্রশ্নটা করার পর আনিকা ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো উনি সত্যটা বলবেন। হয়তো বলবেন বেলাল সাহেবের কোনো মানসিক সমস্যা আছে, অথবা অন্য কোনো গোপন চুক্তির কথা।

কিন্তু আনিকা সেই প্রশ্নটাও বরাবরের মতোই এড়িয়ে গেলেন। "রাশেদ, তুমি তো জানোই বেলাল একটু অন্যরকম মানুষ। ও হয়তো ভেবেছে তুমি আমার আইটি ফার্মের কোনো এমপ্লয়ি, রাত জেগে কাজ করেছো। ওর মাথা তখন লম্বা জার্নির কারণে টায়ার্ড ছিল। বাদ দাও তো বেলালের কথা। ও কোথায় গেছে, কী হয়েছে, সব পুলিশ দেখবে। তুমি শুধু আমার কথা ভাবো।"

এই 'বাদ দাও তো' বলার পরেই আনিকা উনার আসল রূপে ফিরে আসতেন। উনার ভেতরের সেই কর্পোরেট, প্র্যাকটিক্যাল নারীটা মুহূর্তের মধ্যে যেন উধাও হয়ে যেত, আর তার জায়গা নিত এক কামুক, বন্য এবং তৃষ্ণার্ত নারী। এই তিন দিনে উনার সাথে আমার ৩-৪ বার কথা হয়েছে। এবং প্রত্যেকটা ফোন কলের শেষের দিকে আনিকা আমাকে উনার কথার জাদুতে, উনার কামুক ফিসফিসানিতে এমনভাবে উত্তেজিত করেছেন, যা কোনো সুস্থ পুরুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

"রাশেদ..." আনিকা হঠাৎ গলা নামিয়ে, একদম ফিসফিস করে, একটা ভেজা এবং স্যাঁতস্যাঁতে গলায় কথা বলা শুরু করতেন। "আমার না এখন খুব ইচ্ছা করছে..." "কীসের ইচ্ছা করছে আনিকা?" আমি সতর্ক গলায় বলতাম, কিন্তু আমার শরীরের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি ততক্ষণে বেড়ে যেত।

"তোমার ওই শক্ত, গরম শরীরটার জন্য আমার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে রাশেদ। উমমম... জানো, আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি। আমার গায়ে কোনো কাপড় নেই। আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছি তুমি আমার ওপর ঝুঁকে আছো..."

"আনিকা, প্লিজ... পরিস্থিতি তো এখন এসব ভাবার মতো না। তোমার স্বামী নিখোঁজ!"

"চুলোয় যাক স্বামী! চুলোয় যাক দুনিয়া!" আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কামনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলতেন, "আহহ... রাশেদ... তোমার আদর পেতে আমার শরীরটা নিশপিশ করছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি কি বুঝতে পারছ না আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে? ওইদিন বাথরুমের কমোডের ওপর তুমি আমাকে যেভাবে... ইসসস... আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে ওই ধাক্কাগুলো ফিল করতে পারি। আমার মনে হচ্ছে তুমি এখনো আমার ভেতরে আছো।"

উনার গলা দিয়ে তখন 'উহু... আহা... উমমম...' ধরনের এমন সব আদিম, বন্য শব্দ বের হতো, যা শুনে আমি আমার মেসের অন্ধকার রুমে শুয়ে শুয়ে ঘামতে শুরু করতাম।

"রাশেদ... তুমি কি আমাকে মিস করছ না?" আনিকা ফোনে উনার নিজের শরীরের কোনো একটা অংশে হাত বুলানোর শব্দ করতেন। "আমি কিন্তু এখন আমার আঙুল দিয়ে তোমাকে ফিল করার চেষ্টা করছি। আহহ... রাশেদ... তুমি কবে আসবে আমার কাছে? কবে আমাকে আবার ওইভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে? আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে তোমার জন্য..."

এই ধরনের নোংরা, চরম সেক্সুয়াল এবং উত্তেজক কথাগুলো উনি এমন একটা সময় বলতেন, যখন উনার স্বামী নিখোঁজ, পুলিশ তদন্ত করছে, আর আমি রিমান্ডের ভয়ে কাঁপছি! কিন্তু মানুষের শরীর বড়ই বেইমান। আমার মস্তিষ্ক আমাকে বলত— "রাশেদ, ফোনটা কেটে দে। এই মহিলা একটা সাইকোপ্যাথ।" কিন্তু আমার অবদমিত পুরুষাঙ্গটি আনিকার ওই 'উহু-আহা' শুনে চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে যেত। আমি মেসের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতাম।

আমি বুঝতে পারছিলাম, আনিকা নাওহার শুধু আমার শরীরটাকেই নয়, আমার মনস্তত্ত্বটাকেও উনার হাতের পুতুলে পরিণত করেছেন।
Reply
#32

৩২



আজ সোমবার। সকাল থেকে আমি মেসের রুমেই আছি। রাজু আর তুহিন দুজনেই বাইরে গেছে। মেস একদম ফাঁকা। আমি সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের হিসেব মেলাচ্ছিলাম। দুপুর ঠিক বারোটা বেজে বিশ মিনিট। আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। অলস ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার। আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। আননোন নাম্বার মানেই এখন আমার কাছে একটা সাইরেনের মতো মনে হয়। আমি একটু দ্বিধা করে কলটা রিসিভ করলাম।


"হ্যালো?" আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলার স্বর রাখার চেষ্টা করে বললাম।

ওপাশ থেকে অত্যন্ত ভরাট, গম্ভীর এবং একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।"রাশেদ আহমেদ বলছেন?"

"হ্যাঁ, আমি রাশেদ আহমেদ বলছি। আপনি কে?"

"আমি কলাবাগান থানা থেকে সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ বলছি।"

কথাটা আমার কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমার মনে হলো, আমার মাথার ওপর কেউ একটা দশ টন ওজনের হাতুড়ি দিয়ে সজোরে বাড়ি মারল। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল, বরফগলা বাতাস যেন নিচের দিকে নেমে গেল। আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। আমার চারপাশের পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য যেন স্থির হয়ে গেল।
"হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন?" ওপাশ থেকে এসআই তৌহিদের গলা আবার ভেসে এল।

আমি ঢোঁক গিললাম। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনোমতে আমার ভোকাল কর্ড থেকে শব্দ বের করলাম, "জি... জি, শুনতে পাচ্ছি। বলুন।"

"আপনাকে একটু আমাদের থানায় আসতে হবে।" এসআই তৌহিদ খুব ফ্ল্যাট, ইমোশনহীন গলায় বললেন।

আমার বুকের ভেতর তখন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, এই মুহূর্তে প্যানিক করা যাবে না। আমাকে এমন একটা ভান করতে হবে যেন আমি কিছুই জানি না। "থানায় আসতে হবে?" আমি অত্যন্ত অবাক হওয়ার এবং কিছুই না বোঝার ভান করে বললাম। "কিন্তু কেন? কী কারণে আমাকে থানায় যেতে হবে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।"

ওপাশ থেকে এসআই তৌহিদ একটু বিরক্তির সুরে বললেন, "থানায় আসুন, বিস্তারিত জানবেন। ফোনে তো আর সব কথা বলা যায় না। আপনার নামে একটা ইনকোয়ারি আছে।"

"কিন্তু স্যার, আমি তো একজন সাধারণ চাকরিজীবী। আমার তো কোনো মামলা বা..."

"আরে ভাই, আপনাকে তো কেউ অ্যারেস্ট করছে না। জাস্ট একটা ইনফরমেশনের ব্যাপারে কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছে। দেরি করবেন না। আজ বিকেলের আগেই থানায় চলে আসবেন।"

"আচ্ছা স্যার... আমি আসছি। কিন্তু কলাবাগান থানায় গিয়ে আমি কাকে খুঁজব?"

"থানায় এসে ডিউটি অফিসারকে বলবেন সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ ডাকছে। আমি দোতলায় ইনভেস্টিগেশন রুমে থাকি। ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের মোড় পার হয়ে একটু সামনে গেলেই কলাবাগান থানা। চিনে আসতে পারবেন তো?"

"জি স্যার, চিনে আসতে পারব।"

"ঠিক আছে। বিকেলের মধ্যে চলে আসুন।"

খট। ফোনটা কেটে গেল।

আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছানার ওপর বসে রইলাম। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমার চারপাশে কোনো বাতাস নেই। থানা থেকে কল চলে এসেছে! তার মানে পুলিশ তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। তারা আনিকার জিডির সূত্র ধরে আমার নাম্বার জোগাড় করেছে। এখন আমাকে যেতে হবে থানায়। একটা জ্যান্ত পুলিশ স্টেশনে!

বাঙালি মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে পুলিশের থানা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। ভূত, প্রেত, ডাকাত— এদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হলো থানা। সেখানে একবার ঢুকলে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষও দাগি আসামির মতো অনুভব করতে শুরু করে। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। আমার এখন একজনকে খুব দরকার।

আমি দ্রুত আমার কন্টাক্ট লিস্ট বের করে আশিক ভাইয়ের নাম্বারে ডায়াল করলাম। একবার, দুইবার... তিনবারের মাথায় আশিক ভাই কল রিসিভ করলেন। "হ্যালো, রাশেদ? কী খবর ব্রাদার?" আশিক ভাইয়ের গলায় সেই চিরচেনা, ডন্ট-কেয়ার মার্কা রিল্যাক্সড ভাব। ব্যাকগ্রাউন্ডে রাস্তায় গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হয়তো উনি কোনো অ্যাসাইনমেন্টে বাইরে আছেন।

"আশিক ভাই... সর্বনাশ হয়ে গেছে!" আমি প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো গলায় বললাম।

"আরে, কী হইলো আবার? এত প্যানিক করতেছ ক্যান?"

"ভাই, কলাবাগান থানা থেকে ফোন করেছিল। সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ। আমাকে আজ বিকেলের মধ্যে থানায় দেখা করতে বলেছে। ভাই, আমার তো ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। পুলিশ আমাকে ডাকছে মানে তো আমাকে সাসপেক্ট করছে! এখন আমি কী করব ভাই?"

আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগলাম। আশিক ভাই ওপাশ থেকে খুব জোরে একটা হাসি দিলেন। উনার হাসির শব্দ শুনে আমার মনে হলো, আমি কি কোনো জোকস বললাম নাকি! "আরে মিয়া, তুমি তো দেখি এক্কেবারে বাচ্চা পোলাপান! পুলিশ ডাকছে তো কী হইছে? পুলিশ তো আর বাঘ-ভাল্লুক না যে তোমারে ধইরা খাইয়া ফেলব!" আশিক ভাই খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন।

"ভাই, আপনি তো ক্রাইম রিপোর্টার। আপনার কাছে থানা-পুলিশ ডালভাত। কিন্তু আমি তো জীবনে থানার বারান্দাও মাড়াইনি! আমাকে যদি ওরা রিমান্ডে নেয়? যদি মারে?"

"আরে ধুর! তুমি জিডির ইনকোয়ারিতে গেছ, মার্ডার কেসের আসামি হিসেবে যাও নাই যে তোমারে রিমান্ডে নিব। শোনো রাশেদ, একদম ভয়ের কিছু নাই। তুমি একাই যাও। নরমাল মানুষের মতো গিয়া কথা বইলা আসো। এসআই তৌহিদরে আমি চিনি, লোকটা একটু ঘাড়ত্যাড়া, কিন্তু সুবিধার লোক। তুমি জাস্ট গিয়ে যা সত্যি তাই বলবা। বলবা যে তুমি প্রুফরিডার, কাজ শেষ করে চলে আসছ। এর বাইরে তুমি আর কিচ্ছু জানো না।"

"কিন্তু ভাই, আমি একা যাব? আপনি কি আমার সাথে একটু..." আমি খুব মিনমিন করে বললাম।

"আমার তো এখন একটা জরুরি কাজে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যাইতে হইতেছে ব্রাদার," আশিক ভাই বললেন। "তুমি একাই যাও। কনফিডেন্টলি কথা বলবা। আর শোনো, যদি দেখো যে পরিস্থিতি বেগতিক, বা তৌহিদ তোমার সাথে বেশি তেড়িবেড়ি করতেছে, তাইলে জাস্ট বলবা— 'আমি ঢাকা পেপারসের আশিক ভাইয়ের কলিগ। আপনি চাইলে ওসির সাথে কথা বলতে পারেন।' আর যদি গিয়ে তোমার বেশি ভয় লাগে বা কোনো ঝামেলা মনে হয়, আমারে ডিরেক্ট ফোন দিও। আমি সাথে সাথে কোর্ট থাইকা চইলা যামু। কোনো প্যারা নাই। রিল্যাক্স!"

আশিক ভাইয়ের এই 'প্যারা নাই' শব্দটা আমার কাছে সাময়িকভাবে একটা লাইফ জ্যাকেটের মতো মনে হলো। উনি যেভাবে কথা বলেন, তাতে মনে হয় দুনিয়ার কোনো কিছুই উনার কাছে সিরিয়াস না। "আচ্ছা ভাই। আমি যাচ্ছি বিকেলে। আমার জন্য দোয়া করবেন," আমি করুণ গলায় বললাম।

"দোয়া করার কী আছে! যাও, বীরদর্পে গিয়া ঘুরে আসো। আর ঝামেলা হইলে তো আমি আছিই।"

ফোনটা রেখে আমি বিছানা থেকে উঠলাম। আমাকে থানায় যেতে হবে। আমি আলমারি থেকে একটা খুব সাধারণ, ক্যাজুয়াল ফুলহাতা শার্ট আর একটা জিন্সের প্যান্ট বের করলাম। আমি চাই না পুলিশ আমাকে দেখে খুব স্মার্ট বা খুব আনস্মার্ট ভাবুক। আমাকে এমন একটা লুক তৈরি করতে হবে, যাতে আমাকে দেখলে নিতান্তই একটা গোবেচারা, ছাপোষা মানুষ মনে হয়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আমি মেস থেকে বেরিয়ে মিরপুর ১০ নাম্বার গোলচত্বরে এসে একটা সিএনজি নিলাম।
"মামা, কলাবাগান যাব। ধানমন্ডি ৩২ এর মোড়ে," আমি সিএনজিওয়ালাকে বললাম। সিএনজি চলতে শুরু করল।

এপ্রিল মাসের তপ্ত বিকেল। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন রোদের তেজ কিছুটা কমলেও, একটা ভ্যাপসা, গুমোট গরম চারপাশ ঘিরে আছে। সিএনজির ভেতরে বসে আমি ঘামছি। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।

সিএনজিটা আগারগাঁও, ফার্মগেট, পান্থপথ হয়ে কলাবাগানের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার এই চেনা দৃশ্যগুলো আজ আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা মনে হচ্ছে। চারপাশের মানুষগুলো কত স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছে, হাসছে, কথা বলছে। তারা জানে না, এই সিএনজিতে বসে থাকা একটা মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলতে একটা পুলিশের থানায় যাচ্ছে।

আমার মাথার ভেতর তখন শুধু আনিকার কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। উনি বলেছিলেন, "আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। আমার একটা প্ল্যান আছে।" কী সেই প্ল্যান? এই পুলিশের ইনকোয়ারি কি সেই প্ল্যানের কোনো অংশ? নাকি আনিকা নিজেই কোনো বড় ফাঁদে পড়ে গেছেন?

আমার বুকটা ধকধক করছে। আমি মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলাম। আমি জীবনে খুব একটা ধর্মকর্ম করিনি, কিন্তু বিপদে পড়লে মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হলো ওই ওপরওয়ালা। "হে আল্লাহ, আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো। আমি আর কোনোদিন অন্যের বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাব না। আমাকে জাস্ট আজকের মতো বাঁচিয়ে দাও।"

সিএনজি এসে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের মোড় পার হয়ে একটা হলুদ রঙের, দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে থামল।

বিল্ডিংয়ের সামনে বড় করে সাইনবোর্ড লাগানো— "কলাবাগান মডেল থানা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।"

সামনে কয়েকটা পুলিশের পিকআপ ভ্যান, একটা ভাঙাচোরা লেগুনা আর কয়েকটা সিজ করা মোটরসাইকেল রাখা আছে। কিছু পুলিশ সদস্য অস্ত্র হাতে ডিউটি করছে। ভেতরে একটা অদ্ভুত কোলাহল আর গুমোট পরিবেশ।
আমি সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে থানার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।

আমার পা দুটো কাঁপছে। আমার গলার ভেতরটা একদম শুকিয়ে গেছে। আমি একটা বড় করে শ্বাস নিলাম। "প্যারা নাই রাশেদ। প্যারা নাই," আমি আশিক ভাইয়ের কথাটা মনে মনে আওড়ালাম। কিন্তু আমার ভেতরের আত্মাটা তখনো চিৎকার করে বলছে— "পালাও রাশেদ! এখনো সময় আছে, পালাও!"

আমি পালানোর চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে, বুকের সমস্ত সাহস একত্র করে কলাবাগান থানার মেইন গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখলাম।
 
পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে ঢুকলে মানুষের মনে হয় সে তার সমস্ত আত্মসম্মান, কনফিডেন্স আর অহংকার বাইরে পাপোশে মুছে রেখে ভেতরে ঢুকেছে। বাংলাদেশের যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের থানা হলো ঠিক সেরকমই একটা জায়গা। আপনি যতই সৎ, নিরীহ আর করদাতা নাগরিক হোন না কেন, থানার চৌকাঠে পা রাখার সাথে সাথেই আপনার সাবকনশাস মাইন্ড আপনাকে সিগন্যাল দিতে শুরু করবে— "তুই একটা অপরাধী! তুই নির্ঘাত কোনো না কোনো পাপ করেছিস!"

কলাবাগান মডেল থানার মেইন গেট দিয়ে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, তখন আমার অবস্থা একটা খাঁচায় আটকে পড়া ইঁদুরের মতো। চারপাশের পরিবেশটাই এমন একটা গুমোট আর অস্বস্তিকর যে দম বন্ধ হয়ে আসে। একপাশে ডিউটি অফিসারের বিশাল টেবিল, সেখানে দুজন পুলিশ বসে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে একটা মোটা খাতায় কী যেন লিখছেন। থানার ভেতরে একটা অদ্ভুত গন্ধ— ফিনাইল, পুরোনো কাগজ, মানুষের ঘাম আর একটা চাপা আতঙ্কের গন্ধ মিলেমিশে একাকার।

আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গিয়ে কনস্টেবল গোছের একটা লোককে বললাম, "ভাই, আমাকে সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ সাহেব আসতে বলেছিলেন। উনার সাথে একটু দেখা করা দরকার।"

লোকটার পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম, কিন্তু পেটের বোতামগুলো এমনভাবে টানটান হয়ে আছে যে যেকোনো সময় ছিটকে আমার চোখে এসে লাগতে পারে। সে আমার দিকে এমন একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাল, যেন আমি মশা বা মাছির মতো তুচ্ছ কোনো প্রাণী।

"তৌহিদ স্যার তো এখন নাই। বাইরে গ্যাছে একটা ডিউটিতে। আপনে ওই কোণার রুমটায় গিয়া বসেন। স্যার আইলে কথা কইবেন," কনস্টেবল লোকটা একটা আধখোলা দরজার দিকে ইশারা করে বলল।

আমি বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নেড়ে ওই রুমটার দিকে এগিয়ে গেলাম। রুমটা সম্ভবত ওয়েটিং রুম বা ছোটখাটো ইন্টারোগেশন রুম। মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল, তার চারপাশে তিনটে প্লাস্টিকের চেয়ার। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, আর এক কোণায় মাকড়সার জাল। সিলিংয়ে একটা ফ্যান ঘুরছে, তবে সেটা বাতাস দেওয়ার চেয়ে 'ক্যাঁচ... ক্যাঁচ...' শব্দ করে মানুষের স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করার কাজটাই বেশি নিষ্ঠার সাথে পালন করছে।

আমি একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসলাম। এবং শুরু হলো আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে ভয়াবহ এবং স্নায়ুক্ষয়ী আধা ঘণ্টার অপেক্ষা। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, আর আমার মাথার ভেতর শত শত ভয়ংকর চিন্তার ডালপালা গজাচ্ছে। এই আধা ঘণ্টা সময় আমার কাছে মনে হলো আস্ত একটা শতাব্দী। মানুষ যখন চরম উৎকণ্ঠায় থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে নেতিবাচক আর ভয়াবহ দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে শুরু করে।

আমি ভাবতে লাগলাম, এসআই তৌহিদ বাইরে গেছেন মানে কোথায় গেছেন? উনি কি আনিকার ফ্ল্যাটে গেছেন আমাকে ফাঁসানোর জন্য কোনো এভিডেন্স কালেক্ট করতে? উনি কি আমার মেস থেকে আমার ল্যাপটপ সিজ করে নিয়ে আসছেন?

একটু পরেই হয়তো দরজা খুলে চার-পাঁচজন ষণ্ডামার্কা পুলিশ ঢুকবে। তারা কোনো কথা না বলে সোজা আমার কলার চেপে ধরে আমাকে ফ্লোরে ফেলে দেবে। তারপর শুরু হবে রিমান্ডের সেই বিখ্যাত 'ডিম থেরাপি' বা 'ওয়াটার বোর্ডিং'। আমি কি পুলিশের মার সহ্য করতে পারব? আমার তো একটা মশারি টানাতে গেলেই হাত ব্যথা হয়ে যায়, আমি পুলিশের ওই তেল মাখানো লাঠির বাড়ি খাব কীভাবে? প্রথম বাড়িতেই তো আমি হাউমাউ করে সব বলে দেব!

আমি কি বলব যে, আমি আনিকার সাথে শুয়েছি? যদি বলি, তাহলে তো আমাকে জেনেশুনে অন্যের বউকে ফুঁসলিয়ে গুম করার দায়ে ফাঁসিয়ে দেবে। আর আনিকা? সে তো পরিষ্কার বলে দেবে— "আমি এই ছেলেকে চিনিই না। ও আমার বাসায় প্রুফরিডিংয়ের নাম করে ঢুকে আমার স্বামীকে কিডন্যাপ করেছে!"

ভয়ে আমার পেটের ভেতরটা রীতিমতো মোচড় দিয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে মরুভূমি। টেবিলের ওপর রাখা একটা কাঁচের গ্লাসে পানি ছিল, কিন্তু সেটা খাওয়ার সাহস হলো না। কে জানে, হয়তো পুলিশের পানিতে কোনো ট্রুথ সিরাম বা সত্য বলানোর ওষুধ মেশানো থাকে! (ভয়ের চোটে আমার মাথার ভেতর হলিউডের সায়েন্স ফিকশন মুভির প্লটও ঢুকে যাচ্ছিল)।

আমি আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনের কথা ভাবলাম। এই তো কদিন আগেও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বিকল্প বাসে সিট পাওয়া আর এহসান ভাইয়ের বকা খাওয়া। আমি কেন ওই আনিকা নাওহারের ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির মোহে পড়ে নিজের জীবনটা এভাবে ধ্বংস করতে গেলাম? ওই নারীর শরীরের একটুখানি সুখের জন্য কি নিজের জীবনটা এভাবে রিমান্ডের লাঠির নিচে সঁপে দেওয়াটা খুব জরুরি ছিল?

হায় রে পুরুষ মানুষ! একটা ফুটো পাত্রের মতো আমাদের চরিত্র। একটু রূপ আর একটু সম্মোহনী হাসির কাছে আমাদের সমস্ত ফিলোসফি, সমস্ত নৈতিকতা ধুলোয় মিশে যায়।

প্রায় বত্রিশ মিনিট পর।

দরজার হাতলটা সশব্দে ঘুরে গেল। আমার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে একটা বিশাল লাফ দিল। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, যেন লাঠির প্রথম বাড়িটা খাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি। "আপনি রাশেদ সাহেব?"

খুব নরম, মার্জিত এবং বিনীত একটা কণ্ঠস্বর। আমি চমকে চোখ খুললাম।  আমার কল্পনায় ছিল গোঁফওয়ালা, লাল চোখ, আর বিশাল ভুঁড়িওয়ালা কোনো পুলিশ অফিসার। কিন্তু আমার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তার পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম থাকলেও, উনাকে দেখে কোনোভাবেই পুলিশ বলে মনে হচ্ছে না।

এসআই তৌহিদের বয়স হয়তো ৩৪-৩৬-এর কাছাকাছি। খুব ছিপছিপে, স্মার্ট একটা ফিগার। মুখে ক্লিন শেভ করা, আর চুলগুলো খুব পরিপাটি করে আঁচড়ানো। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে উনি কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটির নিউলি জয়েন করা লেকচারার বা কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আর বুদ্ধিবৃত্তিক আভা আছে।

আমি ধড়ফড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। "জি... " এসআই তৌহিদ হাসিমুখে ভেতরে ঢুকে আমার সামনের চেয়ারটায় বসলেন। উনার হাতে একটা পাতলা ফাইল। "বসুন। দাঁড়িয়ে থাকছেন কেন?" উনি হাতের ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। তারপর খুব আন্তরিক গলায় বললেন, "আপনাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো,  সরি ভাই। একটা অন্য কেইসের জরুরি কাজে একটু বাইরে যেতে হয়েছিল। জ্যামের কারণে ফিরতে লেট হয়ে গেল। "

আমি হাঁ করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। পুলিশ! বাংলাদেশের পুলিশ আমাকে 'সরি' বলছে! আমাকে 'ভাই' বলে সম্বোধন করছে! আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, পুলিশ মানেই ঘুষের লোভে জিহ্বা বের করে রাখা কোনো ক্ষুধার্ত নেকড়ে। যাদের কাছে সাধারণ মানুষের কোনো সম্মান নেই। কিন্তু এই লোকটাকে দেখে তো আমার ধারণা পুরোপুরি উল্টে যাচ্ছে। এই লোক তো দেখি আমার চেয়েও বেশি ভদ্র!

আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু নার্ভাস গলায় বললাম, "না না, ঠিক আছে স্যার। কোনো অসুবিধা হয়নি।"

"স্যার বলার দরকার নেই, ভাই বললেই হবে। আমরা তো কাছাকাছি বয়সেরই হব," এসআই তৌহিদ খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন। " জাস্ট একটা ইনফরমেশন গ্যাপ ক্লিয়ার করার জন্য আপনাকে ডাকা। তা, আপনি কী করেন?"

উনি খুব স্বাভাবিক, আড্ডার ছলে প্রশ্নটা করলেন। আমি আমার পকেট থেকে খুব সাবধানে আমার মানিব্যাগটা বের করলাম। আনিকার কিনে দেওয়া সেই দামি চামড়ার মানিব্যাগ। সেখান থেকে আমার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। এসআই তৌহিদ কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন।

"রাশেদ আহমেদ। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ঢাকা পেপারস।" উনি কার্ড থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে একটা খুব সুন্দর, বাঁকা হাসি দিলেন।

"ওরে বাবা! এই সেরেছে! আপনি তো দেখি সাংঘাতিক মানে সাংবাদিক!" উনি হাসতে হাসতে বললেন। "ভাই, আমাদের পুলিশের এমনিতেই দুর্নামের শেষ নাই। আপনি আবার আমার নামে পত্রিকায় কোনো উল্টাপাল্টা রিপোর্ট করে দিয়েন না! আমরা কিন্তু ভাই খুব গরিব মানুষ।"

উনার এই জোকসটা শোনার পর আমার বুকের ওপর চেপে থাকা কয়েক টন ওজনের পাথরটা যেন এক নিমিষেই নেমে গেল। পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে হালকা হয়ে গেল। আমিও একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, "আরে ভাই, কী যে বলেন! আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে থাকি। আমি তো বিদেশের খবর অনুবাদ করি। দেশি খবর নিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। আর আপনাদের নামে রিপোর্ট করার সাহস আমার কই!"

"গুড গুড," এসআই তৌহিদ কার্ডটা উনার ফাইলের ভেতর যত্ন করে রাখলেন। উনার মুখের হাসিটা তখনও লেগে আছে, কিন্তু গলার স্বরটা এবার একটু সিরিয়াস হলো। "এবার তাহলে আসল কথায় আসি। রাশেদ ভাই, আনিকা নাওহার নামের একজন লেখিকাকে তো আপনি চেনেন, তাই না?"

আমি মনে মনে আমার প্রস্তুত করা স্ক্রিপ্টটা রিহার্সাল করে নিলাম। "জি, চিনি।" আমি খুব স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত গলায় বললাম।

"হুম। উনার হাসব্যান্ড বেলাল সাহেবকে কি আপনি চেনেন? উনার সাথে কি আপনার কখনো কথা হয়েছে?"

আমি এক মুহূর্তের জন্য থমকালাম। আমার চোখের সামনে ২রা এপ্রিল সকালের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল। হাতে লাগেজ নিয়ে হতভম্ব বেলাল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন, আর আমি উনাকে বলছি, 'আনিকা তো ঘুমাচ্ছে, আপনি আসুন, বসুন!' এই জীবনে ওই একবারই তো কথা হয়েছে উনার সাথে!

আমি আমার কণ্ঠস্বর একদম নিখুঁত রেখে বললাম, "চিনি। অল্প পরিচয়। একবারই কথা হয়েছে।" এসআই তৌহিদ উনার ফাইল থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার দৃষ্টিতে একটা সূক্ষ্ম জিজ্ঞাসু ভাব। "উনার স্ত্রীর সঙ্গেও কি আপনার এরকম হালকা পরিচয়?"

"না," আমি খুব প্রফেশনাল একটা টোন এনে বললাম। "আনিকা আপুর সঙ্গে আমার কাজের সূত্রে পরিচয়। উনার একটা বইয়ের প্রুফ রিড আমি করেছি, যেটা এবার মেলায় বেরিয়েছে। আরেকটা উপন্যাসের কাজ করছিলাম। এটা উনি এবার লন্ডনে ফেরার আগেই প্রকাশনীকে দিয়ে যেতে চাইছিলেন। তাই কাজটায় একটু তাড়াহুড়া ছিল।"

এসআই তৌহিদ উনার চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটু ঠেলে ঠিক করলেন। উনার চোখের দৃষ্টি এখন আগের চেয়ে একটু বেশি ফোকাসড। জোকস করা সেই ভদ্রলোক থেকে উনি এখন পুরোপুরি একজন ইনভেস্টিগেটিং পুলিশ অফিসারে পরিণত হয়েছেন।

"আনিকা ম্যাডাম গতকাল থানায় এসে একটা মিসিং জিডি করেছেন," এসআই তৌহিদ শান্ত গলায় বললেন। "উনার স্বামী বেলাল সাহেব সপ্তাহখানেক আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু তিন দিন আগের রাত থেকে উনাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উনার ফোন বন্ধ। তো, আনিকা ম্যাডাম বলেছেন, বেলাল সাহেব দেশে ফেরার আগের কয়েকটা দিন আপনি উনাদের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গেস্ট হিসেবে ছিলেন। আপনার পাণ্ডুলিপির কাজ ছিল বলে উনি আপনাকে থাকতে দিয়েছিলেন।"

"জি, কথা সত্য," আমি খুব কনফিডেন্টলি বললাম। "আপু আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন। উনার কাজটা একটু তাড়া ছিল, আর আমি মিরপুরের মেস থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে কাজটা করতে পারছিলাম না বলে উনি কয়েকদিনের জন্য উনার গেস্ট রুমে আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন।"

এসআই তৌহিদ আমাকে থামিয়ে দিয়ে খুব দ্রুত একটা প্রশ্ন করলেন, "আপনি কবে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছেন?"

"সপ্তাহখানেক আগেই," আমি একদম সত্য কথাটা বললাম। আমি আসলেই সপ্তাহখানেক আগে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছি, যদিও আমার বের হওয়ার কনটেক্সট আর পুলিশের ভাবা কনটেক্সট সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।

এসআই তৌহিদ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। পুলিশ কাকতালীয় বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করে না, তারা সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র খোঁজে।

"সপ্তাহখানেক আগে বেলাল সাহেব দেশে এলেন, আর আপনি সপ্তাহখানেক আগেই বাসা ছাড়লেন। কী কারণ?" উনার গলার স্বরে একটা প্রচ্ছন্ন জেরা করার সুর।

আমি মনে মনে হাসলাম। মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেদের একটা বড় গুণ হলো, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে একটা চমৎকার, বিশ্বাসযোগ্য পারিবারিক বা সামাজিক লজিক দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে। আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে একটু হেসে বললাম, "তেমন স্পেসিফিক কোনো কারণ নাই ভাই। একে তো পাণ্ডুলিপির কাজটা শেষ হয়ে আসছিল। আর আনিকা আপু জানিয়েছিলেন যে উনার হাজব্যান্ড আসবেন। আমি তখন নিজে থেকেই উনাকে বললাম, কাজ যে অল্প বাকি আছে তা আমি আমার মেসেই করতে পারব। উনারা স্বামী-স্ত্রী, অনেক দিন পর বিদেশ থেকে দেখা হবে, আমি খামোখা উনাদের মাঝখানে 'কাবাব মে হাড্ডি' হতে চাই না। তাই আমি নিজের জিনিসপত্র নিয়ে মেসে চলে আসি।"

আমার এই 'কাবাব মে হাড্ডি' লজিকটা একটা মাস্টারস্ট্রোকের মতো কাজ করল। এসআই তৌহিদের চোখের সেই তীক্ষ্ণ, সন্দেহজনক দৃষ্টিটা নিমেষেই নরম হয়ে গেল। যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেই এই যুক্তিটা শতভাগ পারফেক্ট মনে হবে।

"হুম," এসআই তৌহিদ একটা কলম দিয়ে ফাইলের ওপর হালকা টোকা দিতে লাগলেন। আমার যুক্তিটা উনি পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন। "আপনি তো ওই ফ্ল্যাটে প্রায় সপ্তাহ তিনেক ছিলেন। একটা মানুষ যখন এত কাছ থেকে কাউকে দেখে, তখন অনেক কিছুই তার চোখে পড়ে। রাশেদ ভাই, আপনি কি আনিকা ম্যাডাম আর উনার স্বামীর মধ্যে ফোনে কোনো ঝগড়াঝাঁটি বা অশান্তি হতে দেখেছেন? মানে, উনাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল বলে আপনার মনে হয়েছে?"

প্রশ্নটা খুব ট্রিকি। আমি যদি বলি সম্পর্ক খারাপ ছিল, তাহলে পুলিশের সন্দেহ আনিকার দিকে যাবে। আর যদি বলি খুব ভালো ছিল, তাহলে পুলিশ নিখোঁজ হওয়ার অন্য মোটিভ খুঁজবে।
Reply
#33

৩৩



আমি খুব সাবধানে, মেপে মেপে বললাম, "ভাই, আমি তো থাকতাম আমার গেস্ট রুমে। সারাদিন ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। আপু উনার রুমে থাকতেন। উনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানোর তো আমার কোনো রাইট ছিল না। তবে যতদূর দেখেছি, আপুকে তো বেশ হাসিখুশিই মনে হতো। ফোনে কথা বলার সময় কখনো চিল্লাচিল্লি বা ঝগড়া করতে শুনিনি। আমার তো মনে হয়েছে উনাদের সম্পর্ক খুব ভালো।"

"আনিকা ম্যাডামের কোনো আচরণে কি আপনার কখনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়েছে? ধরুন, উনি হয়তো খুব গোপনে কারো সাথে কথা বলতেন, বা হঠাৎ করে রাতে বাইরে যেতেন?"

"না ভাই, একদমই না," আমি মাথা নেড়ে বললাম। "আপু তো সারাদিন উনার লেখালেখি আর উনার আইটি ফার্মের রিমোট কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। উনি খুব প্রফেশনাল একজন মানুষ। আমার অন্তত কোনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়নি।"

আমি এত সুন্দর করে, এত নিখুঁতভাবে মিথ্যাগুলো বলে যাচ্ছিলাম যে আমার নিজেরই মাঝে মাঝে অবাক লাগছিল। মানুষের বাঁচার তাগিদ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বানিয়ে দিতে পারে। আমার কথাগুলো এসআই তৌহিদ উনার একটা ছোট নোটবুকে টুক করে লিখে নিলেন।

এর মধ্যেই একজন কনস্টেবল দুটো লাল রঙের প্লাস্টিকের কাপে করে চা দিয়ে গেল। "চা খান রাশেদ ভাই। থানার চা, খুব একটা ভালো হবে না, তবে গলা ভেজানো যায়," এসআই তৌহিদ হাসিমুখে নিজের কাপটা হাতে নিলেন। আমি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলাম। চায়ে আদার কড়া একটা ফ্লেভার। আমার স্নায়ুগুলো এখন অনেকটাই রিল্যাক্সড।

চা খেতে খেতে এসআই তৌহিদ হঠাৎ একটু ব্যক্তিগত সুরে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা রাশেদ ভাই, আপনি তো একজন বুদ্ধিমান মানুষ, সাংবাদিক। আপনার সিক্সথ সেন্স কী বলে? আপনার কী মনে হয়, এই বেলাল সাহেব লোকটা কই নিখোঁজ হলো? কীভাবে নিখোঁজ হলো?"

আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটু ভাবার ভান করলাম। "ভাই, আমি তো আসলে উনাকে চিনিই না। তবে ঢাকা শহরের যা অবস্থা! হয়তো এয়ারপোর্ট থেকে আসার পথে, বা ওইদিন রাতে বাইরে বের হওয়ার পর কোনো ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির পাল্লায় পড়েছেন। উনারা তো এলিট ক্লাসের মানুষ, হাতে দামি ফোন, পকেটে পাউন্ড-ডলার থাকে। সন্দেহ করার মতো কোনো নির্দিষ্ট কাউকে তো আমি দেখছি না।"

এসআই তৌহিদ শুধু মাথা নাড়লেন। কিছু বললেন না। আমি বুঝলাম, এই লোকটা আমাকে জাস্ট একটা রুটিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই ডেকেছে। আমার ওপর উনার বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই। আমি এখন পুরোপুরি সেফ জোনে আছি। আর এই সেফ জোনে থাকার কনফিডেন্স থেকেই আমি আমার ট্রাম্প কার্ডটা খেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশিক ভাই আমাকে যে কার্ডটা দিয়েছিলেন।

"আচ্ছা তৌহিদ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম।
"জি, বলুন।"
"আপনাদের থানার ওসি শাহাদাত সাহেবের সাথে কি একটু দেখা করা যাবে? উনি কি আছেন থানায়?"

ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম শোনার সাথে সাথেই এসআই তৌহিদের চোখের দৃষ্টিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এল। উনি কাপ থেকে মুখ তুলে একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। "স্যার তো উনার রুমে আছেন। কিন্তু কেন? উনাকে চিনেন কীভাবে?"

আমি খুব শান্তভাবে, একটু হালকা হাসি দিয়ে বললাম, "না, তেমন কোনো দরকার নেই। আসলে ওসি শাহাদাত সাহেব আমার এক বড় ভাইয়ের খুব ক্লোজ বন্ধু। আমাদের ঢাকা পেপারসের ক্রাইম রিপোর্টার আশিক ভাই। আশিক ভাই বললেন, কলাবাগান থানায় যখন যাচ্ছি, তখন শাহাদাত ভাইকে যেন একটা সালাম দিয়ে আসি।"

আশিক ভাইয়ের নাম আর ওসি সাহেবের বন্ধুত্বের রেফারেন্সটা একটা ম্যাজিকের মতো কাজ করল। এমনিতেই এসআই তৌহিদ আমার সাথে খুব ভদ্র আচরণ করছিলেন, কিন্তু এই কথাটা শোনার পর উনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক নিমেষে আরও বেশি নম্র, আরও বেশি বন্ধুসুলভ হয়ে গেল। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে উপর মহলের রেফারেন্স বা ক্রাইম রিপোর্টারদের কানেকশন খুব বিশাল একটা ব্যাপার।

"ওহ! আপনি আশিক ভাইয়ের কলিগ! উনি তো আমাদের থানার রেগুলার গেস্ট।"

আমার ভেতরের সাংবাদিক এবং কৌতূহলী সত্তাটা এবার একটু নড়েচড়ে বসল। পরিস্থিতি যখন এতটা আমার অনুকূলে, তখন এই সুযোগে কেসটার আসল আপডেট জেনে নেওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না?

"তৌহিদ ভাই, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" আমি একটু গলা নামিয়ে বললাম।
"জি, সিওর।"
"এই বেলাল সাহেবের মিসিং কেসটা আসলে কতদূর আগাল? মানে, পুলিশ কি কোনো ক্লু পেয়েছে?"

এসআই তৌহিদ একটু ইতস্তত করলেন। উনার পেশাদারি আচরণ উনাকে বাধা দিচ্ছিল। "দেখুন রাশেদ ভাই, কেস রিলেটেড কারও সঙ্গে তথ্য শেয়ার করাটা ঠিক হবে না।  রুলসের বাইরে।"

আমি একটু হাসলাম। "ভাই, আমি তো সাংবাদিক। আপনি না বললেও আমিও জেনে যাব। আমার আসলে জাস্ট কৌতূহল থেকে জানতে চাওয়া। তাছাড়া, বলা তো যায় না, হয়তো আপনাদের ইনভেস্টিগেশনে আমার কোনো কথা বা কোনো ধারণা হেল্পও হতে পারে।"

এসআই তৌহিদ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। "মিডিয়াতে যতটুকু ব্রিফ করা যায়, আমি আপনাকে ততটুকুই বলছি। বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার প্যাটার্নটা খুব অদ্ভুত। আমরা উনার ফোন কল হিস্ট্রি আর লোকেশন ট্র্যাকিং করে দেখেছি। ওইদিন রাতে, মানে যে রাতে উনি নিখোঁজ হন, উনার নাম্বারে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছিল। কথা হয়েছিল মাত্র চল্লিশ সেকেন্ড।"

আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম।

"সমস্যাটা হলো," এসআই তৌহিদ কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, "যেই নাম্বার থেকে কল এসেছিল, সেই নাম্বারটা ওইদিন রাতেই প্রথম অন হয়েছে। একটা বার্নার বা ফেক সিম। আমরা সিমের বায়োমেট্রিক আর এনআইডি চেক করে দেখেছি। ওই সিমটা যার নামে কেনা হয়েছে, সেই লোক আজ থেকে তিন বছর আগে মারা গেছে! মানে, সম্পূর্ণ ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে সিমটা তোলা।"

আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। ভুয়া ডকুমেন্টে তোলা সিম! মৃত মানুষের এনআইডি! এগুলো তো কোনো সাধারণ ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির কাজ নয়! এগুলো তো হাই-লেভেলের, প্রি-প্ল্যানড প্রফেশনাল ক্রিমিনালদের কাজ।

"তারপর?" আমি শুকনা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।

"তারপর আর কী! ওই চল্লিশ সেকেন্ড কথা বলার পর বেলাল সাহেব সম্ভবত ফ্ল্যাট থেকে নিচে নামেন। আর ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় উনার ফোনটা সুইচড অফ হয়ে যায়। চিরতরের জন্য। ওই লাস্ট লোকেশনটা দেখাচ্ছে ধানমন্ডি লেকের কাছাকাছি। তারপর আর কোনো ট্র্যাকিং করা যায়নি। সিমটা কেউ হয়তো খুলে ফেলে দিয়েছে।"

এসআই তৌহিদ একটা হতাশার নিশ্বাস ফেললেন। "আমরা আত্মীয়স্বজন, ওই বিল্ডিংয়ের দারোয়ান, উনার স্ত্রী আনিকা ম্যাডাম, এবং এই যে আপনি— সবার সাথেই কথা বললাম। কিন্তু কেইসটা এক ইঞ্চিও আগায়নি ভাই। কোনো মোটিভ পাচ্ছি না। কোনো মুক্তিপণের দাবিও আসেনি। এদিকে বেলাল সাহেব হলেন একদম এলিট ক্লাসের লোক, ইংল্যান্ডের সিটিজেন। ওপর মহল থেকে প্রচণ্ড প্রেসার আসছে কেইসটা সলভ করার জন্য। আমরা রীতিমতো ঘামছি।"

আমি এসআই তৌহিদের দিকে তাকিয়ে একটা সমবেদনা জানানোর ভান করলাম। "ভালোই তো গ্যাঞ্জামে পড়েছেন আপনারা ভাই। কেইসটা তো দেখছি বেশ জটিল।"

"আর বইলেন না! দেখি কতদূর কী হয়। আমাদের টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে," এসআই তৌহিদ উঠে দাঁড়ালেন।

আমাদের কথাবার্তা শেষ। উনি আমাকে দরজার দিকে এগিয়ে দিতে এলেন। "রাশেদ ভাই, আপনি তাহলে এখন আসতে পারেন। আপনার যদি ওই ফ্ল্যাটের কোনো ঘটনা বা কোনো কথা হঠাৎ মনে পড়ে, যেটা আমাদের হেল্প করতে পারে, তাহলে আমাকে কাইন্ডলি জানাবেন," উনি পকেট থেকে উনার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমাকে দিলেন। "এটা আমার পার্সোনাল নাম্বার। যেকোনো সময় কল করতে পারেন।"

আমি কার্ডটা সযত্নে আমার মানিব্যাগে রেখে দিলাম। "অবশ্যই ভাই। আর সাংবাদিক হিসেবে আমি যদি কোনো হেল্প করতে পারি, আমাকে জানাবেন। শুধু এই কেইসই হতে হবে এমন না, যেকোনো ব্যাপারেই। আশিক ভাইয়ের ছোট ভাই হিসেবে আমাকে সবসময় পাশে পাবেন।"

"থ্যাংক ইউ ভাই। ভালো থাকবেন।"

আমি থানা থেকে বেরিয়ে এলাম।

বিকেলের রোদের তেজ কমে এসেছে। কলাবাগানের রাস্তায় তখন জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। আমি থানার গেট থেকে বেরিয়ে একটা বুকভরে শ্বাস নিলাম। মনে হলো, আমি যেন একটা জ্বলন্ত চুল্লি থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছি। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। পকেট থেকে ফোন বের করে সরাসরি আশিক ভাইকে কল দিলাম।

"হ্যালো, রাশেদ? কী অবস্থা? বাইর হইছস থানা থাইকা?" আশিক ভাইয়ের গলা শুনে মনে হলো উনি জেনেই বসে আছেন আমি সেফলি বের হয়েছি।

"জি ভাই, এইমাত্র বের হলাম। আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে কাজে লেগেছে ভাই। ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম বলতেই এসআই তৌহিদ একদম গলে পানি হয়ে গেছে। আমাকে রীতিমতো সম্মান করে বিদায় দিয়েছে।" আমি সব খুলে বললাম।

আশিক ভাই ওপাশ থেকে একটা সন্তুষ্ট হাসি দিলেন। "আমি তো তোমারে আগেই কইছিলাম প্যারা নাই! তুমি স্মার্ট ছেলে, ভালো সামাল দিয়া আসছ। পুলিশরে কখনো বুঝতে দিবা না যে তুমি ভয় পাইতেছ। এখন যাও, আরামে গিয়া মেসে ঘুমাও।"

"থ্যাংক ইউ ভাই। আপনার এই ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।"

ফোন রেখে আমি মিরপুরের বাসে উঠলাম।

বাসের জানালার পাশে বসে আমি বাইরের ছুটে চলা ঢাকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার ওপর থেকে পুলিশের রিমান্ডের ভয়টা হয়তো কেটে গেছে, কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা ভয়াবহ, কালো মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। এসআই তৌহিদের বলা কথাগুলো আমার মগজে একটা হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছিল। মৃত মানুষের আইডি দিয়ে তোলা ভুয়া সিম! চল্লিশ সেকেন্ডের একটা ফেক কল! ফোন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া! এগুলো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটা একটা নিখুঁত, প্রি-প্ল্যানড গুমের ছক।

আর আনিকা?

আনিকা নাওহার কি সত্যিই এসবের কিচ্ছু জানেন না? উনি কি সত্যিই একজন সাধারণ, শোকাহত স্ত্রী? নাকি... নাকি এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানটা উনারই মস্তিষ্কপ্রসূত? বেলাল সাহেবকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই ভুয়া সিম, এই ফেক কল— সব কি উনারই সাজানো নাটক?

আর যদি তাই হয়, তবে আমি, রাশেদ আহমেদ, একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের বোকা অনুবাদক, কি উনার এই ভয়ংকর, রক্তমাখা দাবা খেলার একটা সাধারণ ঘুঁটি মাত্র? আমার পুরো শরীরটা বাসের সিটের ওপর একটা অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল।

বাস থেকে মিরপুর দশ নাম্বারে নেমে আমি সোজা মেসে ঢুকলাম না।

আমাদের মেসের নিচে একটা টং দোকান আছে। মজিদ মামার চায়ের দোকান। আমি সেখানে গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়লাম। "মামা, কড়া করে এক কাপ চা দাও তো। আর একটা বেনসন।" সিগারেটটা ধরিয়ে আমি গভীর একটা টান দিলাম। নিকোটিনের ধোঁয়াটা ফুসফুসে গিয়ে ধাক্কা মারতেই মনে হলো, আমার শরীরের অবশ হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলো আবার একটু একটু করে কাজ করতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের এই ধুলোমাখা বিকেলে, রাস্তার পাশের একটা টং দোকানে বসে চা আর সিগারেট খাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত দার্শনিক প্রশান্তি আছে। মানুষ যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে, কিংবা থানা-পুলিশের মতো কোনো ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে ফেরে, তখন তার চারপাশের এই অতি সাধারণ, রুটিনমাফিক পৃথিবীটাকেও অনেক বেশি সুন্দর এবং মায়াময় বলে মনে হয়।

রাস্তা দিয়ে রিকশাগুলো টুংটাং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে, মানুষ হৈচৈ করছে, বাসের হেলপাররা গলা ফাটিয়ে যাত্রী ডাকছে। আমি এই সাধারণ, কোলাহলময় পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার তো এই সাধারণ পৃথিবীতেই থাকার কথা ছিল! আমি কেন ওই আনিকা নাওহার নামের এক মায়াবিনী, বিলিয়নিয়ার নারীর চক্রব্যূহে নিজেকে জড়াতে গেলাম?

দুটো সিগারেট আর এক কাপ চা শেষ করে আমি মেসের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। মেসের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা গুমোট, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে এসে লাগল। রাজু আর তুহিন রুমে নেই। হয়তো বাইরে কোথাও গেছে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন এই মুহূর্তে কারো জেরার মুখে পড়ার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই।

আমি সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মিরপুরের মেসের এই দশ ফুট বাই চার ফুটের বাথরুম। শ্যাওলা ধরা দেয়াল, কল ছাড়লে পানি পড়ার চেয়ে ঘড়ঘড় শব্দটাই বেশি হয়। আমি জামাকাপড় খুলে বালতি থেকে মগে করে ঠান্ডা পানি মাথায় ঢালতে শুরু করলাম। ঠান্ডা পানি গায়ের ওপর পড়তেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের মাস্টার বাথরুমের দৃশ্য।

কোথায় এই বালতির পানি, আর কোথায় সেই রেইন-শাওয়ার! চোখ বন্ধ করতেই আমার কল্পনার ক্যানভাসে আনিকা নাওহারের সেই ভেজা, অনাবৃত শরীরটা জীবন্ত হয়ে উঠল। আমার মনে পড়ল, কীভাবে শাওয়ারের গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে উনি আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছিলেন। উনার সেই ফর্সা, মসৃণ পিঠের ওপর দিয়ে কীভাবে পানির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে উনার সুডৌল নিতম্বের খাঁজে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমর চেপে ধরেছিলাম। উনার ভেজা ঠোঁটের সেই বন্য, আদিম চুম্বন— যার মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না, ছিল শুধু এক সর্বগ্রাসী ক্ষুধা।

গোসল করতে করতে আমি আনিকার শরীরের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি স্পর্শ নতুন করে স্মরণ করতে লাগলাম। আমার মনে পড়ল, কীভাবে আমি উনার গলার কাছে মুখ গুঁজে উনার পারফিউম আর ঘামের সেই মাতাল করা গন্ধটা টেনে নিয়েছিলাম। উনার স্তনের সেই উদ্ধত চূড়াগুলো যখন আমার বুকের সাথে ঘষা খাচ্ছিল, তখন উনার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই চাপা, তীক্ষ্ণ দীর্ঘশ্বাসগুলো আমার কানে একটা নেশাধরা সিম্ফনির মতো বাজত। আমি উনার ভেজা চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে উনার মুখটা আমার দিকে টেনে নিতাম, আর উনি উনার দুই পা দিয়ে আমার কোমরটা এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরতেন যেন উনি আমার শরীরের ভেতরেই মিশে যেতে চাইছেন।

এই স্মৃতিগুলো এতই জীবন্ত আর এতই তীব্র ছিল যে, মেসের বাথরুমের কনকনে ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়েও আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা উষ্ণ, বৈদ্যুতিক স্রোত বয়ে গেল। আমার নিস্তেজ হয়ে থাকা শরীরটা আবার নতুন করে উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠতে শুরু করল। আনিকা নাওহার শুধু আমার শরীরকেই নয়, আমার মন, আমার কল্পনা, আমার পুরো অস্তিত্বটাকেই উনার হাতের মুঠোয় বন্দি করে ফেলেছেন।

গোসল শেষ করে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে আমি নিজের রুমে এলাম। একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বিছানায় বসলাম। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। থানা থেকে ফিরে আনিকাকে একটা আপডেট দেওয়া দরকার। কিন্তু সরাসরি ফোন করাটা কি ঠিক হবে? পুলিশ যদি সত্যিই বেলাল সাহেবের কল লিস্ট চেক করে আনিকার ফোন ট্যাপ করে বসে থাকে?

আমি বারান্দায় গিয়ে বসলাম। বিকেলের রোদটা এখন বেশ নরম হয়ে এসেছে। আমি খুব সতর্ক হয়ে হোয়াটসঅ্যাপটা ওপেন করলাম।

অফিসিয়াল, দূরত্ব বজায় রাখা একটা মেসেজ ড্রাফট করলাম: "আপু, একটু কথা ছিল। ফ্রি হয়ে কল দিয়েন।"

'আপু' শব্দটা টাইপ করার সময় আমার নিজেরই হাসি পেল। যে নারীর শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি আমার জিভ দিয়ে মুখস্থ করেছি, তাকে আমি 'আপু' বলে মেসেজ দিচ্ছি! কিন্তু এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। পুলিশের নজরদারি এড়াতে গেলে এমন ভণ্ডামি করা ছাড়া গতি নেই।
মেসেজটা সেন্ড করার ঠিক এক মিনিটের মাথায় আমার হোয়াটসঅ্যাপটা বেজে উঠল।

আনিকা কল করেছেন!

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। এত দ্রুত কল দিলেন? আমি একটু ইতস্তত করে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে কলটা রিসিভ করলাম। "হ্যালো?" আমি খুব নিচু, সতর্ক গলায় বললাম।

"কী ব্যাপার? হঠাৎ 'আপু' বলে মেসেজ দিলে যে?" ওপাশ থেকে আনিকার সেই পরিচিত, মোহনীয় এবং একটু কৌতুক মেশানো গলা ভেসে এল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কীভাবে বোঝাব উনাকে যে আমি কতটা আতঙ্কের মধ্যে আছি!

"আনিকা... আমি তো ভেবেছিলাম পুলিশ হয়তো তোমার ফোন ট্যাপ করে রেখেছে," আমি ফিসফিস করে বললাম। "আজকে বিকেলে আমাকে কলাবাগান থানায় ডেকেছিল।"

আমার কথা শুনে আনিকা একটুও চমকালেন না। বরং ওপাশ থেকে একটা দমকা হাসির শব্দ এল। "হা হা হা! ও আচ্ছা! তুমি ফোন ট্যাপের ভয় পাচ্ছ? তুমি তো দেখছি হলিউডের জেমস বন্ডের সিনেমা একটু বেশিই দেখো রাশেদ!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন।

"হাসছ কেন আনিকা? এটা কোনো জোকস না। পুলিশ যদি সত্যিই আমাদের কথা শোনে?"

"আরে বোকা!" আনিকা হাসি থামিয়ে একটু সিরিয়াস, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন। "এটা সাধারণ লোকাল কল না। এটা হোয়াটসঅ্যাপ কল। হোয়াটসঅ্যাপ এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই আমার বা তোমার হোয়াটসঅ্যাপের ডেটা বা কল রেকর্ড নিতে পারবে না। এটার জন্য একমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ কোম্পানি বা মেটার অনুমতি লাগবে। আর মেটা কোনো থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির পুলিশকে এত সহজে এসব ডেটা দেয় না।"

আনিকার এই টেকনিক্যাল জ্ঞান আমাকে একটু অবাক করল। উনি বলে চললেন, "আর তাছাড়া, আমার এই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা তো বাংলাদেশের না। এটা আমার ইংল্যান্ডের নাম্বার দিয়ে খোলা। আমার এই অ্যাকাউন্টের কোনো ডেটা বের করতে গেলে বাংলাদেশ পুলিশকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কোর্টের অর্ডার নিয়ে আসতে হবে। একটা সাধারণ নিখোঁজ ডায়েরির জন্য পুলিশ এত কাঠখড় পোড়াবে বলে তোমার মনে হয়?"

উনার যুক্তিগুলো বেশ অকাট্য। কিন্তু আমি তো বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষ। আমার ভয় তো এত সহজে যাওয়ার নয়। "তোমার ডেটা না হয় ইংল্যান্ডের কোর্টের অর্ডারে আটকে থাকবে," আমি একটু খুকখুক করে কেশে বললাম। "কিন্তু আমারটা তো আর ইংল্যান্ডের কোর্ট দেখবে না। আমি তো এই দেশেই থাকি। পুলিশ তো চাইলে আমার ডিভাইস ট্র্যাক করতেই পারে।"

আমার এই পালটা যুক্তিতে আনিকা একটু বিরক্ত হলেন বলে মনে হলো। "রাশেদ, তুমি না বেশি চিন্তা করো। পুলিশ তোমার ডিভাইস ট্র্যাক করে কী পাবে? তুমি আমার প্রুফরিডার, আমি তোমার ক্লায়েন্ট। আমরা কাজ নিয়ে কথা বলি। এর বাইরে তো কিছু প্রমাণ করার নেই। বাদ দাও এসব পুলিশের কথা। থানায় কী হলো, সেটা তো বললে না।"

আমি সংক্ষেপে এসআই তৌহিদের সাথে আমার কনভারসেশনটা জানালাম। আশিক ভাইয়ের রেফারেন্সের কথাটাও বললাম। "গুড। তুমি খুব স্মার্টলি ডিল করেছ। আমি জানতাম তুমি পারবে," আনিকা খুব শান্ত গলায় বললেন।

"আচ্ছা, এসব বাদ দাও," আনিকা হঠাৎ উনার গলার স্বরটা পাল্টে ফেললেন। উনার গলায় এখন একটা অদ্ভুত, কোমল অথচ দাবিদার সুর। "কাল বিকেলে একটু শাহবাগ মোড়ে আসবে?"

শাহবাগ মোড়ে!

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার বুকের ভেতর একটা আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। আমার মনে হলো, থানার এই সব প্যারা, বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার টেনশন— সব কিছু হয়তো আনিকা আমাকে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন। কাল বিকেলে শাহবাগ মোড়ে দেখা করা মানে হয়তো আমরা কোনো নিরিবিলি জায়গায় যাব। হয়তো উনি আমাকে উনার কোনো গোপন ডেরায় নিয়ে যাবেন, যেখানে আমরা আবার আগের মতো একে অপরকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে পারব।

"শাহবাগ মোড়ে? কটায় আসব?" আমি আমার গলার উচ্ছ্বাসটা লুকানোর চেষ্টা করেও পারলাম না। কিন্তু আমার এই আনন্দকে এক বালতি বরফ-ঠান্ডা পানি দিয়ে নিমেষেই নিভিয়ে দিলেন আনিকা।

"বিকেল চারটার দিকে এসো," আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন। "আসলে কালকে শাহবাগে বেলালের বন্ধু আর পরিচিতরা মিলে একটা মানববন্ধন করবে। তুমিও এসো।"

"কিসের মানববন্ধন?" আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

"আরে, জাস্ট একটা সামাজিকতা। বেলালের ভার্সিটির কিছু বন্ধু আর ওর প্রাক্তন কলিগরা মিলে এই ইভেন্টটা দাঁড় করিয়েছে। ব্যানার নিয়ে দাঁড়াবে— 'ইঞ্জিনিয়ার বেলালের খোঁজ চাই', 'প্রশাসন জবাব দাও'— এই টাইপের কিছু লোকদেখানো ফাঁকা বুলি আরকি। তুমি তো জানোই আমাদের দেশের মানুষ হুজুগে কতটা মাতাল হয়।" আনিকা খুব তাচ্ছিল্যের সুরে কথাগুলো বললেন।

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই নারীটা আসলে কী! নিজের স্বামী নিখোঁজ, তার বন্ধুরা তাকে খোঁজার জন্য মানববন্ধন করছে, আর উনি বলছেন এটা 'লোকদেখানো ফাঁকা বুলি'!

"তাতে আমার যাওয়ার কী দরকার?" আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম। "আমি তো বেলাল সাহেবকে চিনিই না।"

"আরে, এই জন্যই তো যেতে বলছি," আনিকা হেসে উঠলেন। "ওইসব বন্ধুরা ওখানে দাঁড়িয়ে মিডিয়ার সামনে বড় বড় নীতিবাক্য আর লোকদেখানো মায়াকান্না কাঁদবে। এরপর মানববন্ধন শেষ হলে, আমার টাকায় শাহবাগের কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা-শিঙাড়া গিলে যে যার বাসায় কেটে পড়বে। এটাই তো রিয়েলিটি। আমি চাই তুমি সেখানে থাকো। তুমি আমার পরিচিত একজন হয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাপারটা খুব ন্যাচারাল দেখাবে।"

"কিন্তু এতে লাভ কী আনিকা?"

"লাভ আছে। মিডিয়া কভারেজ পেলে পুলিশ প্রশাসন একটু নড়েচড়ে বসবে। তারা বুঝতে পারবে যে বেলালের ফ্যামিলি আর বন্ধুরা চুপ করে বসে নেই। এতে করে পুলিশ কেসটা সিরিয়াসলি নেবে।"

আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার মাথার ভেতর তখন লজিকের একটা ভয়ংকর দ্বন্দ্ব চলছে। "পুলিশ যদি কেসটা সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে তো বিপদটা তোমারই বেশি আনিকা!" আমি একটু চড়া গলায় বলে ফেললাম। "পুলিশ যদি একটু বেশি গভীরে গিয়ে তদন্ত করে, আর যদি দেখে যে বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তোমারই কোনো..."

আমি বাক্যটা শেষ করতে পারলাম না।

ওপাশ থেকে আনিকার নিশ্বাস নেওয়ার শব্দটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা হিমশীতল, পিনপতন নীরবতা। আমি বুঝতে পারলাম, আমি এমন একটা কথা বলে ফেলেছি, যেটা উনার ইগোতে এবং উনার আত্মসম্মানে একটা ভয়ংকর আঘাত করেছে।

"রাশেদ," আনিকার গলাটা এখন আর রেশমি বা মোহনীয় নেই। উনার কণ্ঠস্বরটা এখন একটা ধারালো ব্লেডের মতো হয়ে গেছে। "আমি বেশ কয়েকদিন ধরেই খেয়াল করছি, বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তুমি আমাকেই এক প্রকার দায়ী করে ফেলছ। তুমি কোথায় কোথায়, কথায় কথায় ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করছ, আমি কিছু করেছি কি না। আমি বেলালের সাথে কিছু ঘটিয়েছি কি না!"

"আনিকা, আমি আসলে তা বোঝাতে চাইনি..." আমি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

"শাট আপ রাশেদ!" আনিকা হিসহিস করে উঠলেন। "আমার প্রতি তোমার এইটুকুও বিশ্বাস নেই? আমি যদি বেলালকে কিছু করতামই, তাহলে কি আমি নিজে গিয়ে থানায় জিডি করে পুলিশকে ডাকতাম? তোমার কি মনে হয় আমি এত বড় একটা বোকা? আর সবচেয়ে বড় কথা— যখন তুমি আমার ফ্ল্যাটে, আমার বিছানায় বসে আমার শরীরটা একটা পশুর মতো খুবলে খাচ্ছিলে, তখন তো তোমার চোখে এই অবিশ্বাস দেখিনি! তখন তো তুমি আমার প্রতিটা ইঞ্চি শরীর ভোগ করার জন্য লালা ঝরিয়েছ। আর এখন, একটু বিপদের গন্ধ পেয়েই তুমি আমাকে খুনি বানাতে চাইছ?"

আনিকার কথাগুলো একটা চাবুকের মতো আমার মুখে এসে লাগল। আমি অপমানে আর অপরাধবোধে একদম কুঁকড়ে গেলাম। "সরি আনিকা... আই অ্যাম রিয়েলি সরি। আমি আসলে টেনশনে উল্টাপাল্টা বকে ফেলেছি," আমি একদম মিনমিন করে বললাম।

আনিকা কয়েকটা গভীর শ্বাস নিলেন। উনার রাগটা কিছুটা কমল বলে মনে হলো। "শোনো রাশেদ," আনিকা এবার খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল এবং রূঢ় একটা গলায় বললেন। "আমি বেলালকে গুম বা খুন— কিছুই করিনি। আর বাংলাদেশে বলে, এই সমাজব্যবস্থার কারণে আমি তোমার আর আমার ব্যাপারটা গোপন রাখছি। আমি খামোখা একটা সস্তা স্ক্যান্ডালের অংশ হতে চাই না।"

উনি একটু থামলেন। তারপর এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে আমার শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেল। "এটা যদি ইংল্যান্ড হতো, তাহলে বেলাল নিখোঁজ হলো নাকি খুন হলো, তাতে আমার কিচ্ছু যেত আসত না। আমি বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলতাম— হ্যাঁ, আমি রাশেদকে আমার বিছানায় জায়গা দিয়েছি। আমার শরীরের প্রত্যেক জাগায় ওর স্পর্শের দাগ আছে। আমার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় আমি তোমার সাথে উদ্দাম বন্যতায় মেতে উঠেছি! তাতে কার বাপের কী? কিন্তু এটা বাংলাদেশ রাশেদ। এখানে এমন কিছুর ইশারা পেলে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাকে একদম ন্যাংটো করে রাস্তায় নামাবে। আমি জানি এখানকার পুরুষদের সাইকোলজি। আমার ফ্ল্যাটের ওই দারোয়ান মফিজও তখন আমার দিকে তাকিয়ে জিভের রস ফেলবে। ওর ভাবটা এমন হবে যেন— 'এই মহিলা যখন একটা সাধারণ অনুবাদককে নিজের শরীরে জায়গা দিয়েছে, তাহলে তো সুযোগ পেলে সে আমাকেও ভোগ করতে দেবে!' এই নোংরা সমাজ, এই সস্তা মানসিকতার মানুষদের ঝামেলার কারণেই আমি তোমার ব্যাপারটা কাউকে বলছি না।"

আমি স্তব্ধ হয়ে উনার কথাগুলো শুনছিলাম। এই নারীর মানসিকতা, উনার সাহস আর উনার এই অকাট্য যুক্তি আমাকে পুরোপুরি বোবা করে দিল। "নয়তো তোমাকে নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নেই রাশেদ। তুমি আমার জীবনে আসা অন্যতম সেরা একটা এক্সপেরিয়েন্স," আনিকা উনার গলার স্বরটা আবার একটু নরম করে বললেন।

"আমি বুঝতে পেরেছি আনিকা। আমাকে ক্ষমা করো। আমি আর কখনো তোমাকে সন্দেহ করব না," আমি খুব আন্তরিকভাবেই বললাম।

"ঠিক আছে। কাল শাহবাগে থেকো। বাই," বলে আনিকা কলটা কেটে দিলেন।

আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইলাম। আনিকা নাওহার আমাকে এমন একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা আমার জানা নেই। এই নারীটা একাধারে একটা রহস্যময়ী ধাঁধা, একটা নিষ্ঠুর কর্পোরেট মাইন্ড, আর একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। আমি বারান্দা থেকে উঠে আবার আমার রুমে এলাম। রুমে ঢুকে আমি সোজা বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। বাথরুমের ছিটকিনিটা ভেতর থেকে আটকে দিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন আনিকার বলা কথাগুলো ইকো হচ্ছে।

"আমার শরীর নিয়ে, আমার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় আমি তোমার সাথে উদ্দাম বন্যতায় মেতে উঠেছি..."

"তুমি আমার শরীরটাকে একটা পশুর মতো খুবলে খাচ্ছিলে..."

এই কথাগুলো আমার শরীরের ভেতরের নিভে যাওয়া আগুনটাকে আবার দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার গ্যালারির একটা হিডেন ফোল্ডার ওপেন করলাম। সেখানে আনিকার দেওয়া সেই গোপন ছবিগুলো সেভ করা আছে। আমি সেই মিরর সেলফিটা ওপেন করলাম, যেটা উনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন।

ছবিতে উনার নগ্ন, ফর্সা শরীর। উনার এক হাত উনার সেই ভরাট, সুডৌল স্তনের ওপর রাখা। উনার চোখ দুটো কামনায় আধবোজা। আমি আমার ট্রাউজারটা নিচে নামিয়ে ফেললাম। আমার পুরুষাঙ্গটি তখন চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। আমি আমার ডান হাত দিয়ে সেটাকে মুঠি করে ধরলাম।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার কল্পনায় আমি এখন আর এই স্যাঁতস্যাঁতে মেসের বাথরুমে নেই। আমি এখন আনিকার সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বিশাল বিছানায়। আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আনিকা আমার নিচে শুয়ে আছেন। উনার সেই ফর্সা পা দুটো আমার কোমর জড়িয়ে আছে। আমি উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম, রহস্যময় কেন্দ্রের ভেতর নিজেকে সজোরে সঞ্চালিত করছি। আমার হাতের মুঠির গতি বাড়তে লাগল।

আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বাথরুমের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। আমি আনিকার ছবিটার দিকে তাকাচ্ছি, আর আমার মনে হচ্ছে আমি যেন উনার স্তনদুটো খামচে ধরে আছি। উনার সেই ঘাতক, রেশমি কণ্ঠস্বর আমার কানের কাছে ফিসফিস করছে— "আমি বুক ফুলিয়ে বলতাম, আমি তোমাকে আমার শরীরে জায়গা দিয়েছি..." এই বন্য, আদিম বাক্যগুলো আমাকে চরম উন্মাদনার দিকে ঠেলে দিল।

"আনিকা... আহহহ... আনিকা..." আমি একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।
Reply
#34

৩৪





"আনিকা... আহহহ... আনিকা..." আমি একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।

আমার শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে গেল। আমি খাদের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমি আমার হাতের গতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেলাম। এবং একটা দীর্ঘ, তীব্র দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত না-পাওয়া আর সমস্ত ফ্যান্টাসি একটা উষ্ণ স্রোত হয়ে বাথরুমের মেঝেতে আছড়ে পড়ল।


আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার হাতের মুঠি শিথিল হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মস্তিষ্ক পুরোপুরি ফাঁকা। কোনো চিন্তা নেই, কোনো দর্শন নেই, কোনো নিখোঁজ ডায়েরি নেই। কিন্তু এই চরম প্রশান্তির আয়ু খুব কম। একটু পরেই বাস্তবতার নিস্তেজতা আর এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা আমাকে গ্রাস করতে শুরু করল। আমি বেসিনের কল ছেড়ে নিজেকে পরিষ্কার করলাম। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা চোখের দিকে তাকালাম। 

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিনয়টা মানুষ কোথায় করে? থিয়েটারের মঞ্চে? সিনেমার পর্দায়? নাকি প্রতিদিনের রুটিনমাফিক বাস্তব জীবনে, সমাজের মানুষের চোখের সামনে? উইলিয়াম শেকসপিয়র সাহেব অনেক আগেই বলে গেছেন— ‘All the world's a stage, and all the men and women merely players.’ পুরো পৃথিবীটাই একটা রঙ্গমঞ্চ, আর আমরা সবাই এখানে নিছকই অভিনেতা। কিন্তু শেকসপিয়র যদি আজ বেঁচে থাকতেন এবং ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আনিকা নাওহারের অভিনয় দেখতেন, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবে তার ওই বিখ্যাত ডায়ালগটা এডিট করে লিখতেন— ‘পুরো পৃথিবীটা একটা রঙ্গমঞ্চ হতে পারে, কিন্তু আনিকা নাওহারের মতো এত নিখুঁত, এত ভয়ংকর এবং এত সাইকোপ্যাথিক লেভেলের অস্কারজয়ী অভিনয় এই পৃথিবীর কোনো মঞ্চে কেউ কখনো করতে পারবে না।’

পরদিন বিকেলবেলা। আমি অফিস থেকে ঘণ্টাখানেকের ছুটি নিয়ে শাহবাগের দিকে রওনা হলাম। এহসান ভাইকে বলতে হলো, ‘ভাই, আমার ওই অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে পঙ্গু হাসপাতালে যেতে হবে।’ এহসান ভাই বরাবরের মতোই বিরক্ত হলেন, কিন্তু আটকে রাখলেন না। ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে আমি যখন শাহবাগে এসে পৌঁছালাম, তখন বিকেল চারটা বিশ বাজে।

শাহবাগ মোড়। জাতীয় জাদুঘর আর পাবলিক লাইব্রেরির মাঝখানের এই জায়গাটা হলো ঢাকা শহরের বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, ছাত্র আর হুজুগে মানুষের সবচেয়ে বড় আস্তানা। এখানে কেউ আসে প্রেম করতে, কেউ আসে ফুল কিনতে, আর কেউ আসে ব্যানার হাতে নিয়ে দুনিয়ার সমস্ত অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। আমি দূর থেকেই দেখলাম, জাতীয় জাদুঘরের ঠিক সামনের ফুটপাতে ৬০-৭০ জন মানুষের একটা জটলা। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।

মানুষগুলোর হাতে একটা বিশাল ব্যানার আর কিছু প্লাকার্ড। ব্যানারের সাদা জমিনে কালো আর লাল কালিতে বড় বড় করে লেখা— ‘৪ দিন ধরে নিখোঁজ ইঞ্জিনিয়ার বেলাল, কোথায় তিনি? কে দেবে এই প্রশ্নের জবাব?’

আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের হাতের প্লাকার্ডগুলোতেও এই টাইপের কিছু কথা লেখা— ‘নিরাপদ ঢাকা চাই’, ‘বেলালের সন্ধান চাই’, ‘প্রশাসন জবাব দাও’।

বাঙালি এমনিতেই খুব আবেগপ্রবণ জাতি। রাস্তায় চারজন লোক ব্যানার নিয়ে দাঁড়ালে আরো চল্লিশজন লোক এমনিতেই দাঁড়িয়ে যায় দেখার জন্য যে আসলে কাহিনী কী। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মূল মানববন্ধনকারী ৬০-৭০ জন হলেও, চারপাশে আরো শ খানেক লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে।

আমি ভিড় ঠেলে একটু সামনের দিকে এগোলাম। আমার চোখ খুঁজছে সেই মাস্টারমাইন্ডকে। হ্যাঁ, ওই তো আনিকা নাওহার! ব্যানারের একদম মাঝখানে, ঠিক সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা। উনার ডানে-বামে চার-পাঁচজন করে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, যাদের বেশিরভাগই সম্ভবত বেলাল সাহেবের ভার্সিটি লাইফের বন্ধু বা প্রাক্তন কলিগ।

আনিকা নাওহারের আজকের গেটআপ দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই থমকে গেলাম। উনার পরনে একটা কুচকুচে কালো রঙের সুতির শাড়ি। শাড়িতে কোনো পাড় বা নকশা নেই। ব্লাউজটাও একদম সাদামাটা, গলা-বন্ধ কালো রঙের। উনার খোলা চুলগুলো খুব অগোছালোভাবে পিঠের ওপর ছড়ানো। চোখে মেকআপের কোনো লেশমাত্র নেই। উল্টো চোখের নিচে হালকা কালচে একটা দাগ যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা প্রমাণ করছে এই নারী গত চার দিন ধরে তার স্বামীর শোকে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেননি! উনার ঠোঁট দুটো শুকনো, ফ্যাকাশে। উনার মুখমণ্ডলে এমন একটা চরম অসহায়, বিধ্বস্ত, মুষড়ে পড়া বাঙালি নারীর ছবি আঁকা, যা দেখলে পাষাণ হৃদয়ও গলে পানি হয়ে যাবে।

আমি ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে বোকার মতো উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই নারীই কি সেই আনিকা নাওহার? যে নারী গতকাল রাতে আমাকে মেসেজ দিয়ে বলেছে— ‘তুমি নাই তাই নিজের আঙুল দিয়ে গুদ শান্ত করি’? যে নারী শপিং মলের চার তলার পুরুষদের বাথরুমে আমাকে দিয়ে বন্যভাবে তার শরীরের ক্ষুধা মিটিয়েছে? বিশ্বাস করা যায় না। মানুষের দ্বৈত সত্তা কতটা নিখুঁত হতে পারে, এটা না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

মানববন্ধনে একে একে কয়েকজন জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতে শুরু করল। কেউ প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে বিষোদগার করছে, কেউ আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে হুংকার ছাড়ছে। মাইক্রোফোন যার হাতেই যাচ্ছে, সে-ই মনে করছে সে কোনো বিশাল জনসভার নেতা। এরপর একজন মাঝবয়সী লোক মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে খুব করুণ গলায় বললেন, "উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আমাদের বন্ধু, একজন সৎ ও মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার বেলাল আজ চার দিন ধরে নিখোঁজ। তার পরিবার আজ চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এখন আপনাদের সামনে কিছু কথা বলবেন নিখোঁজ বেলাল ভাইয়ের স্ত্রী, বিশিষ্ট কবি আনিকা নাওহার।"

ভিড়ের মধ্যে একটা পিনপতন নীরবতা নেমে এল। আনিকা খুব ধীর, কাঁপা কাঁপা পায়ে সামনে এলেন। উনার হাত থেকে মাইক্রোফোনটা নিতে গিয়ে উনার আঙুলগুলো এমনভাবে কাঁপল যে মনে হলো উনি হয়তো এখনই সেন্সলেস হয়ে পড়ে যাবেন। উনি মাইক্রোফোনটা মুখের কাছে নিলেন।

"আমি... আমি আসলে কী বলব বুঝতে পারছি না..." আনিকা কথা শুরু করলেন। উনার গলার স্বরটা ভাঙা, কান্নাজড়িত। "আমার স্বামী... বেলাল... ও তো কখনো কারো ক্ষতি করেনি। ও তো দেশের বাইরেই থাকে। কদিনের জন্য দেশে এসেছিল... আর এখন চার দিন ধরে ওর কোনো খোঁজ নেই। আমি সব জায়গায় গিয়েছি... থানায় গিয়েছি... কেউ আমাকে বলতে পারছে না আমার স্বামী কোথায়।" কথা বলতে বলতে আনিকা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

উনার কাঁদার দৃশ্যটা আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখলাম। উনার চোখ থেকে সত্যিই পানি গড়িয়ে পড়ছে! উনি উনার কালো শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে গিয়ে উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা তীব্র ওঠানামা শুরু হলো। এবং ঠিক এই জায়গাটাতেই আনিকার সেই চরম, সাইকোপ্যাথিক এবং সূক্ষ্ম ফেমিনিন পাওয়ার প্লে বা নারীত্বের খেলাটা শুরু হলো।

কাঁদতে গিয়ে, বারবার জোরে শ্বাস নেওয়ার কারণে উনার কালো ব্লাউজে ঢাকা সেই বিশাল, ভরাট স্তনযুগল একটা অদ্ভুত, মোহনীয় ছন্দে ওঠানামা করতে শুরু করল। কালো রঙের কাপড়ে সেই ওঠানামা যেন আরও বেশি স্পষ্ট, আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। আমি চারপাশের লোকজনের দিকে তাকালাম। বাঙালি পুরুষ শোক পালন করতে পছন্দ করে ঠিকই, কিন্তু শোক পালনকারী নারী যদি অপরূপা সুন্দরী হয়, তবে তাদের শোকের চেয়ে চোখের ক্ষুধার পাল্লাটাই ভারী হয়ে যায়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, মানববন্ধনে দাঁড়ানো বেলালের বন্ধু থেকে শুরু করে রাস্তার যে রিকশাওয়ালা তামাশা দেখতে দাঁড়িয়েছে— সবার চোখ আনিকার চোখের পানির চেয়ে উনার ওই বক্ষদেশের ছন্দময় ওঠানামার দিকেই বেশি নিবদ্ধ। সবাই খুব সহানুভূতিশীল মুখ করে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের অবচেতন মন আনিকার ওই শারীরিক লাস্যময়তার কাছে আক্ষরিক অর্থেই সারেন্ডার করে বসে আছে।

"আপনারা আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিন... আমি আর কিছু চাই না... আমি শুধু ওকে ফেরত চাই..." আনিকা ফুঁপাতে ফুঁপাতেই উনার বক্তব্য শেষ করলেন। ভিড়ের ভেতর থেকে একটা সমবেদনার গুঞ্জন উঠল। কয়েকজন মহিলা এসে আনিকাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে শুরু করল।

আমি একপাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বললাম— ‘ব্রাভো! অস্কার কমিটি যদি আজকের এই পারফরম্যান্স দেখত, তবে মেরিল স্ট্রিপ বা কেট উইন্সলেটকে বাদ দিয়ে আনিকা নাওহারের হাতেই সেরা অভিনেত্রীর ট্রফি তুলে দিত।’ মানববন্ধন আরও কিছুক্ষণ চলল। এরপর আস্তে আস্তে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। মানুষজন যে যার মতো জটলা পাকিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল।

আমি ভিড় ঠেলে আনিকার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম। আনিকা আমাকে দেখতে পেয়েছেন। উনার চোখের সেই কান্না, সেই বিধ্বস্ত ভাবটা তখনো উনার মুখে নিখুঁতভাবে আঁকা। উনি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকালেন। উনার ঠিক পাশেই একজন ৫০-৬০ বছর বয়সী, কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। "মাইনুল ভাই," আনিকা ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে খুব নিচু, শোকাহত গলায় বললেন, "ও হচ্ছে রাশেদ। আমার বইয়ের প্রুফরিডার। আমার এই বিপদের দিনে ও-ও এসেছে সাপোর্ট দিতে।"

তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, "রাশেদ, ইনি মাইনুল ভাই। বেলালের খুব কাছের বড় ভাই। ভার্সিটির বড় ভাই।" আমি খুব ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বললাম, "আসসালামু আলাইকুম। জি, আনিকা আপু আমাকে বলেছেন আপনার কথা।" মাইনুল সাহেব একটা মুরুব্বিসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, "ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো করেছ ভাই এসেছ। মেয়েটা একা একা কতক্ষণ এই ধকল সামলাবে! ওর তো এখন মেন্টাল সাপোর্ট দরকার।"

আমরা এভাবে আরো তিন-চারজন মানুষের সাথে টুকটাক কথা বললাম। সবাই আনিকাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি নিয়ে কথা বলছে। আমি খুব বাধ্য ছেলের মতো সবার কথায় সায় দিচ্ছি। এমন সময়, মাইনুল ভাই যখন অন্য একজনের সাথে কথা বলতে একটু অন্যদিকে ঘুরেছেন, আনিকা ঠিক আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন।

উনার মুখের চেহারা তখনো সেই চরম অসহায়, শোকাহত স্ত্রীর মতো। উনার চোখ থেকে তখনো একটা দুইটা অশ্রুবিন্দু গাল বেয়ে নামছে। কিন্তু উনি উনার মাথাটা সামান্য আমার দিকে হেলিয়ে, উনার সেই ঘাতক, রেশমি এবং চরম উত্তেজক গলায় ফিসফিস করে বললেন— "রাশেদ... এই সুযোগে একটু পাছা হালকা চেপে দাও তো।"

আমি আক্ষরিক অর্থেই ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠলাম। আমার চোখ কপালে উঠে গেল। আমি ডানে-বামে তাকালাম। এই শত শত মানুষের ভিড়ে, নিজের নিখোঁজ স্বামীর জন্য আয়োজিত মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে, এই মহিলা আমাকে বলছে উনার পাছা চেপে দিতে! আমার ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে একটা চরম বিরক্তি, রাগ এবং হতভম্ব ভাব কাজ করতে শুরু করল। আমি উনার দিকে এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালাম যেন আমি কোনো পাগলকে দেখছি।

আমার বিরক্তি দেখে আনিকা একটুও দমে গেলেন না। উল্টো, উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, এক সেকেন্ডের মুচকি হাসি ফুটে উঠল। এবং তার ঠিক পরমুহূর্তেই উনি আবার উনার সেই অসহায়, কান্নাজড়িত চেহারাটা অন করে মাইনুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মাইনুল ভাই, পুলিশ তো কিছুই বলছে না। আমি এখন কী করব ভাইয়া?"

আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই মহিলার স্নায়ু কি ইস্পাত দিয়ে তৈরি? নাকি উনার মাথার ভেতরে কোনো সার্কিট নষ্ট হয়ে গেছে? আরও কিছুক্ষণ পর, রাস্তার ভিড় কমতে শুরু করল। মানববন্ধনের মানুষজন যে যার মতো বাড়ির পথ ধরল। আনিকা মাইনুল ভাই আর বাকি দু-একজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আপনারা যান ভাইয়া। অনেক কষ্ট করলেন আমার জন্য। আমাকে রাশেদ রিকশায় তুলে দিয়ে বা নামিয়ে দিয়ে আসবে। আপনারা টেনশন করবেন না।"

"ঠিক আছে আনিকা। শক্ত হও। আমরা কাল আবার থানায় যাব," বলে মাইনুল ভাইরা বিদায় নিলেন।

সবাই চলে যাওয়ার পর আনিকা আমার দিকে ঘুরলেন। "এই ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না রাশেদ। আমাকে একটু আড়ালে নিয়ে যাও। আমার খুব সিগারেট খেতে মন চাচ্ছে," আনিকা উনার নরম, শোকাহত গলা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে খুব ক্যাজুয়াল, বসি (bossy) টোনে বললেন।

আমি কোনো কথা না বলে উনার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। শাহবাগ মোড়ে ছবির হাটের দিকে, ফুলের দোকানগুলোর পেছনের দিকটায় একটা সরু গলি মতো জায়গা আছে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। আমরা সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। চারপাশের তাজা গোলাপ, রজনীগন্ধা আর গাঁদা ফুলের একটা তীব্র গন্ধ বাতাসে ভাসছে।

আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট ধরালাম। তারপর সেটা আনিকার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আনিকা সিগারেটটা নিয়ে একটা গভীর টান দিলেন। উনার চোখ বন্ধ। ধোঁয়াটা ফুসফুসে আটকে রেখে উনি খুব রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে সেটা বাতাসে ছাড়লেন। উনার কপালের ওই শোকের রেখাগুলো এখন সম্পূর্ণ উধাও।

আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। গত তিন দিনের জমানো ভয়, ক্ষোভ, আর আজকের এই চরম পাগলামি আমার ভেতরের বাঁধ ভেঙে দিল।  "কী শুরু করেছেন এসব আনিকা?" আমি প্রায় ফুঁসতে ফুঁসতে, রেগে গিয়ে বললাম। "এগুলো কীসের নাটক? আপনি আমাকে ডেসপারেটলি বাথরুমে নিয়ে গেলেন, আমাকে মেসেজ দিয়ে ছবি পাঠালেন, আর এখন এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাকে আপনার পাছায় হাত দিতে বলছেন! আমি কিছু বললে আপনি বলেন আমি নাকি আপনাকে অবিশ্বাস করছি। কিন্তু আপনি তো আমাকে কিছুই বলেন না! আপনি তো আমাকে পুরোটাই অন্ধকারে রেখেছেন!"

আমি একটু দম নিলাম। আমার গলা কাঁপছে। "দয়া করে আমাকে বলবেন আপনি আসলে কী করছেন? আপনার হাসব্যান্ড কোথায়? কেউ যদি আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারে, আমাদের পরিণতি কী হবে আপনি ভেবেছেন? আমার তো ক্যারিয়ার, জীবন সব শেষ হয়ে যাবে!"

আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগলাম। আনিকা সিগারেট টানতে টানতে আমার দিকে খুব শান্ত, শীতল দৃষ্টিতে তাকালেন। উনার চোখে কোনো রাগ বা বিরক্তি নেই। শুধু একটা ডন্ট-কেয়ার ভাব। "চুপ থাকো রাশেদ," আনিকা খুব নিচু কিন্তু ধারালো গলায় ধমক দিলেন। "খালি ভয়! তোমার এই একটাই প্রবলেম, তুমি একটা ভীতু কাপুরুষ। আরে বাবা, কেউ জানলে কী হবে? বেলাল নিজেই তো সব জানত। তাতেই বা কী হয়েছে?"

কথাটা আমার কানের পর্দায় আঘাত করার পর আমার মনে হলো আমার পায়ের নিচ থেকে শাহবাগের মাটিটা ধসে গেছে। "বেলাল সাহেব জানতেন মানে!" আমি চিৎকার করে ওঠার উপক্রম করলাম, কিন্তু জায়গাটার কথা ভেবে গলা নামিয়ে নিলাম। "কী জানতেন উনি?" আনিকা সিগারেটের ছাই ঝাড়লেন। উনার ঠোঁটে এখন একটা চরম তাচ্ছিল্য আর বেপরোয়া হাসি।

"জানত মানে কী, বোঝো না?" আনিকা উনার গলার স্বরটা একদম খাদে নামিয়ে, অত্যন্ত নোংরা, র-অ্যান্ড-রাফ একটা টোনে বলতে শুরু করলেন। "বেলাল জানত যে তোমার বীর্যে আমার গুদ ভেসে গেছে অসংখ্যবার। বেলাল জানত, তোমার দাঁতের কামড়ে আমার স্তনের বোঁটা সিক্ত হয়ে লাল হয়ে গেছে। বেলাল জানত, তোমার জিভের স্পর্শে আমার নাক থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সব সতেজ হয়ে যেত, আর আমার জিভের স্পর্শে তোমার ওই আইফেল টাওয়ার থেকে পানির ফোয়ারা ছুটত!"

আনিকা কথাগুলো এত অবলীলায়, এত কাঁচা আর অশ্লীলভাবে উচ্চারণ করলেন যে, আমার মনে হলো আমার কান দিয়ে গরম সীসা গলে গলে পড়ছে। একজন নারী, তাও আবার এমন হাই-সোসাইটির একজন নারী, নিজের স্বামীর কথা বলতে গিয়ে এত নোংরাভাবে নিজের শারীরিক সম্পর্কের বর্ণনা দিতে পারে, এটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।

আমি আক্ষরিক অর্থেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। "হোয়াট দ্য ফাক!" আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই একটা গালি বেরিয়ে এল। "কী বলছ এসব আনিকা? উনি জেনেও তোমাকে কিছু বলেনি? উনি এসব মেনে নিতেন?"

"বলবে কেমনে?" আনিকা আরেকটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। উনার চোখে এখন একটা প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। "ও নিজে যা করেছে, আমি তার তুলনায় কমই করেছি। আর এসব শুরু করেছে তো ওই শুয়োরটাই!"

"কী শুরু করেছেন বেলাল সাহেব? উনি কী করেছেন?" আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাইলাম। আমার ভেতরের কৌতূহল এখন আতঙ্কের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে।

আনিকা হঠাৎ করে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এলেন। উনার চোখদুটো রাগে জ্বলছে। "ইচ্ছা করছে এখানে তোমার মুখের ওপর আমার গুদটা চেপে ধরি, যাতে তোমার ওই বালের মুখটা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়!" আনিকা হিসহিস করে উঠলেন। "এত প্রশ্ন! এত কৌতূহল তোমার!"

আমি থমকে গেলাম। এই নারীর মেজাজ কখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা বোঝা অসম্ভব। "প্লিজ আনিকা... আমাকে বলেন। আমাকে অন্তত সত্যিটা জানতে দিন," আমি প্রায় অনুনয়ের সুরে বললাম। আনিকা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু শান্ত করলেন।

"পরে বলব। এখন আমার মুড নেই। আপাতত আমাকে একটা উবার ডেকে দাও," আনিকা উনার হাতের সিগারেটটা ফুটপাতে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে পিষে দিলেন। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে উবার অ্যাপ ওপেন করতে যাব, ঠিক সেই মুহূর্তে... আনিকা উনার ডান হাতটা আচমকা বাড়িয়ে দিলেন।

এবং কোনো রকম প্রস্তুতি বা ওয়ার্নিং ছাড়াই, উনি উনার হাতের পুরো মুঠি দিয়ে আমার প্যান্টের ওপর দিয়ে আমার পুরুষাঙ্গ বা বাঁড়াটাকে এমন সজোরে একটা চাপ দিলেন যে আমি আক্ষরিক অর্থেই লাফিয়ে উঠলাম। "ফাক্কক!" আমি ব্যথায় আর আকস্মিকতায় একটা অস্ফুট চিৎকার দিয়ে উঠলাম।

উনার হাতের ওই চাপটা এতই জোরালো আর এতই পজেসিভ ছিল যে, আমার মনে হলো উনি আমার পৌরুষটাকে উপড়ে ফেলতে চাইছেন।
উনি উনার হাতটা সরিয়ে নিয়ে আমাকে একটা ঘাতক চোখের ইশারা দিলেন। "জলদি উবার ডাকো," আনিকা খুব শান্ত গলায় বললেন।

আমি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলাম। আমার তলপেটে তখনো চিনচিনে একটা ব্যথা আর একই সাথে একটা বন্য উত্তেজনা কাজ করছে। কিন্তু আমার প্রথম টার্গেট হলো এই মহিলাকে যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরানো। এই নারী আমার জন্য একটা টিকিং টাইমবোমা।
আমি উবার ডাকলাম।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়ি চলে এল। আনিকা গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে আমার দিকে ফিরে তাকালেন। "কাল রাতে মেসেজ দেব। রেডি থেকো," উনি খুব নিচু গলায় বললেন। তারপর উনি গাড়িতে উঠে বসলেন। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

গাড়িটা শাহবাগের মোড় ঘুরে সায়েন্স ল্যাবের দিকে চলে যাচ্ছে। আমি ফুলের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে সেই চলে যাওয়া গাড়ির লাল টেইল-লাইটের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন। বেলাল সাহেব কী করেছিলেন? আনিকা কেন প্রতিশোধ নিচ্ছেন? আর বেলাল সাহেব যদি সব জানতেনই, তাহলে উনি ওই ২রা এপ্রিল সকালে আমাকে দেখে ওরকম হাসিমুখে কথা বলেছিলেন কেন? পুরো ব্যাপারটা একটা চরম, বিকৃত এবং সাইকোলজিক্যাল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। আর আমি রাশেদ আহমেদ, সেই গোলকধাঁধার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।
Reply
#35

৩৫




ফোনে যেদিন আনিকা খুব নরম, ভেজা এবং মায়াবী গলায় বললেন, "রাশেদ, বিশ্বাস করো, আমি সত্যিই কিছু জানি না। বেলালের কী হয়েছে, ও কোথায় গেছে, কে ওকে নিয়ে গেছে— আমার কোনো আইডিয়া নেই। আমি শুধু একটা জিনিসই জানি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। সত্যিই ভালোবাসি।"


ব্যাস! এই কয়েকটা জাদুকরী শব্দ, আর গলার ওই অদ্ভুত রেশমি কাঁপুনি। আমার মাথার ভেতর গত কয়েকদিন ধরে যে বিশাল অবিশ্বাসের পাহাড় তৈরি হয়েছিল, যে আতঙ্কের সাইক্লোন বইছিল, তা এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

মানুষ কত বোকা হতে পারে! মিষ্টি কথার ক্ষমতা যে কত ভয়ংকর, সেটা আমি সেদিন বুঝলাম। আমার অনুবাদক মস্তিষ্ক, যার কাজই হলো শব্দের পেছনের আসল অর্থ খুঁজে বের করা, সে আমাকে সমানে সতর্ক করে যাচ্ছিল। আমার লজিক আমাকে বারবার বলছিল, "রাশেদ, তুই একটা গাধা! এই মহিলা তোর সাথে নিখুঁত একটা নাটক করছে। সে একজন জাত অভিনয়শিল্পী। শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের সামনে যে নারী চোখের পানি ফেলার অস্কারজয়ী অভিনয় করতে পারে, তার কাছে ফোনে দুই ফোঁটা মিষ্টি কথা বলা তো কোনো ব্যাপারই না। সে তোকে ফাঁদে ফেলছে, তোকে নিজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।"

কিন্তু আমার মন? সেই মনটা যেন একটা আজ্ঞাবহ দাসের মতো আনিকার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। মন বলল, "না, আনিকা যা বলছে সব সত্য। এত সুন্দর একটা মুখ, এত মায়াবী একটা কণ্ঠস্বর কখনো মিথ্যা বলতে পারে না।"

নারী কী অদ্ভুত এক নেশা!

সৃষ্টিকর্তা যখন নারী তৈরি করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিলেন। তিনি জানতেন, এই একটা সৃষ্টির কাছে পৃথিবীর সমস্ত শক্তিশালী পুরুষ, সমস্ত তুখোড় দার্শনিক, সমস্ত ক্ষমতাধর সম্রাট একদিন না একদিন হাঁটু গেড়ে বসবে। পৃথিবীর তাবৎ মদ, গাঁজা, আফিম বা কোকেনের নেশা হয়তো একটা সময় পর কেটে যায়; রিহ্যাবে গেলে মানুষ হয়তো ড্রাগস ছাড়তে পারে। কিন্তু নারীর শরীরের, নারীর কথার আর মায়ার যে নেশা— তার কোনো রিহ্যাব সেন্টার এই পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, আর কখনো হবেও না।

নারীর আসল ক্ষমতা কোথায় জানেন? তাদের ক্ষমতা তাদের পেশিতে নয়, তাদের ক্ষমতা তাদের চোখের ওই অদ্ভুত মায়ায়। একটা মেয়ে যখন খুব অসহায় চোখে আপনার দিকে তাকায়, যখন তার চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি টলটল করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে পাষাণ পুরুষটারও মনে হয়— "এই মেয়েটার জন্য আমি আমার জীবন দিয়ে দিতে পারি!" পুরুষকে 'হিরো' বা 'ত্রাণকর্তা' সাজিয়ে দেওয়ার যে অদ্ভুত সাইকোলজিক্যাল খেলা, নারীরা এটা জন্মগতভাবেই জানে। তারা জানে কীভাবে একজন পুরুষকে তার পৌরুষের অহংকারে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আসলে নিজেদের কাজটা উদ্ধার করে নিতে হয়।

হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষরা বোকার মতো এই ফাঁদে পা দিয়ে আসছে। হেলেনের জন্য ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়ে গেল। কেন? একটা নারীর জন্য হাজার হাজার পুরুষ নিজেদের রক্তে মাটি ভাসিয়ে দিল। তারা কি জানত না যে এই যুদ্ধের কোনো যৌক্তিক মানে নেই? জানত। কিন্তু ওই যে, নারীর নেশা! একজন পুরুষ যখন একজন নারীর প্রেমে পড়ে, বা তার শরীরের নেশায় মজে যায়, তখন তার হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পায়। তার কাছে তখন ওই নারীর মুখের কথাই বেদবাক্য বলে মনে হয়।
নারীর শরীর এবং মন হচ্ছে একটা গোলকধাঁধা। আপনি একবার সেই গোলকধাঁধায় প্রবেশ করলে, আর বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পাবেন না। তাদের গায়ের একটা নিজস্ব ঘ্রাণ থাকে, তাদের গলার স্বরে একটা অদ্ভুত কম্পন থাকে, হাঁটার সময় কোমরের একটা নির্দিষ্ট ছন্দ থাকে— এগুলো সব মিলিয়ে পুরুষের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি হিপনোটাইজ করে ফেলে। পুরুষ ভাবে সে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে রাজা। কিন্তু আসলে সুতোর নাটাই থাকে নারীর হাতে। সে যখন খুশি সুতো ছাড়ে, যখন খুশি টান মারে। পুরুষ স্রেফ একটা ঘুড়ির মতো আকাশে ওড়ে আর ভাবে, "আহা! আমি কত স্বাধীন!"

এই যে আমরা পুরুষরা এত বড় বড় ফিলোসফি কপচাই, চায়ের দোকানে বসে এত লজিক দেখাই, রাজনীতি আর বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে তর্ক করি— এগুলো সব দিনের বেলার ভান। কিন্তু রাতের অন্ধকারে, একটা নরম, উষ্ণ নারীদেহের সান্নিধ্যে আমাদের সমস্ত লজিক যেন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তখন মনে হয়, এই নারী যদি আমাকে বিষও খাইয়ে দেয়, আমি হাসিমুখে সেই বিষ পান করে নেব। কারণ, ওই ধ্বংসের মধ্যেও একটা অদ্ভুত, আদিম সুখ আছে। নারী হচ্ছে সেই আগুন, আর পুরুষ হচ্ছে সেই বোকা পতঙ্গ, যে খুব ভালো করেই জানে ওই আগুনে ঝাঁপ দিলে সে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তবুও সে সেই আগুনের রূপ দেখে মোহিত হয়ে হাসিমুখে সেখানেই ঝাঁপ দেয়।

আনিকা নাওহারের ক্ষেত্রেও আমার ঠিক এই অবস্থাটাই হয়েছে।

এত কিছু ঘটে গেল! উনার স্বামী নিখোঁজ, পুলিশ তদন্ত করছে, উনি আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে নোংরা কথা বলেছেন, উনার অতীতের কত ভয়ংকর রূপ আমার সামনে এসেছে। যেকোনো সুস্থ, স্বাভাবিক এবং লজিক্যাল পুরুষের উচিত ছিল এই মহিলার ছায়া থেকে একশ মাইল দূরে পালানো। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়ে অন্য কোনো শহরে চলে যাওয়া।

কিন্তু আমার কী হলো?

ফোনে উনার ওই "আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি" কথাটা শোনার পর আমার সব অভিমান, সব সন্দেহ, সব ভয় এক নিমিষেই জল হয়ে গেল। উনার প্রতি আমার আকর্ষণ বিন্দু পরিমাণও কমল না, বরং যেন আরও হাজার গুণ বেড়ে গেল। আমার মনে হতে লাগল, আনিকা যা বলছেন, সেটাই ধ্রুব সত্য। বেলাল সাহেব কীভাবে গায়েব হলেন, সেটা নিয়ে আমার আর কোনো মাথাব্যথা নেই। আনিকা যদি এখন আমাকে বলেন যে বেলাল সাহেব নিজেই নিজের ইচ্ছেয় ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেছেন, আমি হয়তো কোনো তর্ক না করে সেটাই বিশ্বাস করে নেব।

আমার মাথার ভেতরে এখন আর কোনো ক্রাইম থ্রিলার চলছে না, সেখানে এখন শুধুই একটা রোমান্টিক ঘোরের রাজত্ব। উনার ওই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতিক শরীরটা, উনার ঘাড়ের কাছের সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা, আর উনার সেই বন্য, আদিম আদরের স্মৃতিগুলো আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, আমি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলেছি।

আমি জানি, আমি একটা পতঙ্গের মতো আগুনের দিকে ছুটে যাচ্ছি। আমি খুব ভালো করেই জানি, এই ভালোবাসার, এই নেশার পরিণতি হতে পারে চরম ধ্বংস, হয়তো জেলখানা বা ফাঁসির দড়ি। কিন্তু আমার আর ফেরার কোনো উপায় নেই। আনিকা নাওহার নামের ওই মায়াবিনী আমার চোখের সামনে এমন একটা রঙিন চশমা পরিয়ে দিয়েছেন, যে চশমার ভেতর দিয়ে এখন আমি কেবল উনাকেই দেখি। উনার সব কথা আমার কাছে ঐশ্বরিক বাণীর মতো মনে হয়।

আমি একজন সামান্য মানুষ। আজ আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এবং সম্পূর্ণ হাসিমুখে, একজন নারীর পাতা এই মায়াজালে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করলাম। কারণ, আমি জানি, এই ধ্বংসের পথে হাঁটার যে একটা তীব্র, মাদকতাময় আনন্দ আছে— পৃথিবীর অন্য কোনো শান্তিতে তা নেই।


ভয় জিনিসটা আসলে কী? বিজ্ঞানের ভাষায় ভয় হলো মানুষের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (Amygdala) নামক অংশ থেকে নিঃসৃত হওয়া কিছু রাসায়নিক পদার্থের ফলাফল। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত দর্শন বলে ভিন্ন কথা। ভয় হলো আসলে অজ্ঞতার আরেক নাম। আপনি যখন জানেন না আপনার সামনে কী আছে, ঠিক তখনই আপনি ভয় পান। অন্ধকার ঘরে আমরা ভয় পাই কারণ আমরা জানি না সেখানে কোনো ভূত বা সাপ লুকিয়ে আছে কি না। আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার পর যখন দেখি ঘর ফাঁকা, তখন আমাদের ভয়টা কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
 
শাহবাগ মোড়ে আনিকার সাথে দেখা হওয়া, কিংবা কলাবাগান থানায় সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদের সেই অমায়িক এবং আড্ডাসুলভ জেরা— ঠিক কী কারণে আমি জানি না, আমার ভেতর থেকে গত কয়েকদিনের সেই হাড়-কাঁপানো, দম-বন্ধ-করা ভয়টা হঠাৎ করেই ম্যাজিকের মতো উধাও হতে শুরু করল।
 
আমি মিরপুরের মেসে নিজের বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে লজিকগুলো মেলাতে লাগলাম। আমি ভয় পাচ্ছি কেন? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি! আমি কি বেলাল সাহেবকে খুন করেছি? না। আমি কি উনাকে গুম করেছি? না। আমি কি উনার কাছে মুক্তিপণ দাবি করেছি? না।
 
আমি যা করেছি, সেটা হলো উনার স্ত্রীর সাথে শুয়েছি। হ্যাঁ, এটা সত্যি। কিন্তু আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে আনিকাও বেলালকে গুম বা খুন করেনি। আনিকা হয়তো একজন চরম কামুক, রহস্যময়ী এবং জটিল নারী, কিন্তু উনি খুনি নন। আমার মন অন্তত এটাই বলে। তাহলে আমি খামোখা রিমান্ড আর ফাঁসির দড়ির স্বপ্ন দেখে নিজের ব্লাড প্রেশার বাড়াচ্ছি কেন?
 
সমাজ আর আইনের মধ্যে একটা খুব সূক্ষ্ম কিন্তু বিশাল পার্থক্য আছে। সমাজ যেটাকে ‘পাপ’ বলে, আইন সেটাকে সব সময় ‘অপরাধ’ বলে না। আমরা সামাজিক নিয়ম ভেঙেছি। পরকীয়া, অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক— এগুলো সমাজের চোখে চরম নিষিদ্ধ, নোংরা এবং পাপের কাজ। এলাকার মুরব্বিরা জানলে হয়তো আমাকে জুতাপেটা করে মেস থেকে বের করে দেবেন। কিন্তু বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে, পেনাল কোডে কি বলা আছে যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ যদি নিজেদের পূর্ণ সম্মতিতে এক বিছানায় যায়, তবে তাদের ফাঁসি হবে?
 
আমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। আমরা একে অপরের সাথে সেক্স করেছি, নাকি আমরা একে অপরের পেটে, বুকে, ঘাড়ে মুখ ঘষেছি বা একে অপরকে চুষে খেয়েছি— তাতে আইনের বা পুলিশের কী করার আছে? এটা কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। আমি আর আনিকা তো জোর করে কিছু করিনি।

যা হয়েছে, দুজন মানুষের চরম এবং বন্য কামনার সম্মতিতে হয়েছে। এই সোজা, কাটখোট্টা লজিকটা মাথার ভেতর পুরোপুরি সেট হয়ে যাওয়ার পর আমার বুকের ওপর থেকে যেন জগদ্দল পাথর নেমে গেল। আমার মনে হলো, আমি শুধু শুধু নিজের ছায়াকে দেখে ভয় পাচ্ছিলাম।
 
সেই রাতেই, শাহবাগ মোড়ের সেই মানববন্ধনের ঘটনার পর, আমি আনিকাকে ফোন দিলাম। উনার ওই বেনামি বা 'ঘোস্ট' নাম্বারটাতে কল করলাম। কয়েকবার রিং হওয়ার পর উনি ফোনটা ধরলেন।
 
"হ্যালো," আনিকার গলাটা খুব শান্ত এবং ক্লান্ত শোনাল।

"কী করছ?" আমি খুব স্বাভাবিক, নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
 
"এই তো, শুয়ে আছি। তুমি মেসে ফিরেছ?"
 
"হ্যাঁ, ফিরেছি অনেকক্ষণ হলো। তুমি খেয়েছ রাতে?"
 
আমাদের কথোপকথনটা এমনভাবে শুরু হলো, যেন আমরা বহু বছরের পরিচিত কোনো দম্পতি বা খুব গভীর কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা। গত কয়েকদিন ফোনে আমাদের যে চরম নোংরা, উত্তেজক এবং বন্য সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসির কথা হতো— আজ তার ছিটেফোঁটাও নেই। আজ কোনো 'উহু, আহা' নেই, কোনো শরীর নিশপিশ করার গল্প নেই। আজ আমাদের কথার ভেতর দিয়ে কোনো যৌনতা বা অবৈধ সম্পর্কের স্রোত বইছে না। আজ শুধু আছে একটা অদ্ভুত মায়া, একটা বন্ধুত্বের এবং প্রেমের ছোঁয়া।
 
"খেয়েছি। মাইনুল ভাইরা আসার সময় কিছু খাবার পার্সেল করে নিয়ে এসেছিলেন। ওগুলোই একটু মুখে দিলাম। তুমি খেয়েছ?" আনিকা জিজ্ঞেস করলেন।
 
"মেসের ডাল-ভাত গিলেছি আরকি," আমি একটু হেসে বললাম। "আচ্ছা আনিকা, পুলিশের কোনো আপডেট আছে? বেলাল সাহেবের কেসটা নিয়ে পুলিশ কি তোমাকে নতুন কিছু জানিয়েছে?"
 
ওপাশ থেকে আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "পুলিশ তো সন্ধ্যার দিকেও একবার এসেছিল। দুজন অফিসার। ওরা ড্রয়িংরুমে বসে অনেকক্ষণ জেরা করল। বেলালের ব্যবহৃত ল্যাপটপটা তো ও সাথে নিয়ে গিয়েছিল, তাই সেটার খোঁজ করল। ওর ফেলে যাওয়া কিছু ডকুমেন্টস আর ডায়েরি ঘাঁটাঘাঁটি করল। কিন্তু নতুন কোনো আপডেট তারা দিতে পারল না। জাস্ট বলল, 'আমরা দেখছি ম্যাডাম, টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে।' এসব বলতে বলতেই তো দিন পার করে দিচ্ছে।"
 
আমি উনার গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলাম উনি সত্যিই খুব ক্লান্ত।
 
"তুমি খুব টায়ার্ড হয়ে আছো আনিকা। সারাদিন ওই রোদের মধ্যে শাহবাগে দাঁড়িয়ে ছিলে। এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো," আমি খুব দরদ মেশানো গলায় বললাম।
 
"ঘুম কি আসে রাশেদ?" আনিকা ফিসফিস করে বললেন। "এই বিশাল ফ্ল্যাটটায় আমি একা। এই শূন্যতাটা আমাকে মাঝে মাঝে খুব ভয় পাইয়ে দেয়। জানো, আজ শাহবাগে যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন আমার শুধু মনে হচ্ছিল, তুমি যদি আমার হাতটা ধরে রাখতে! যেমন করে বইমেলায় ধরে হাঁটাতে। তোমার হাতটা ধরলে আমি একটা অদ্ভুত সাহস পাই।"
 
কথাগুলো আমার বুকের ভেতর গিয়ে একটা শীতল, মিষ্টি প্রলেপের মতো লাগল। এই নারী, যে কিনা একটু আগে আমাকে উনার শরীরের নেশায় পাগল করে দিচ্ছিল, সে এখন আমার কাছে একটু মানসিক আশ্রয় খুঁজছে।
 
"আমি তো তোমার সাথেই আছি আনিকা। যখনই তোমার একা লাগবে, ভয় লাগবে, আমাকে ফোন করবে। আমি অন্তত তোমার কথাগুলো তো শুনতে পারব," আমি বললাম।
 
"হুম। তুমি সত্যিই খুব ভালো একটা মানুষ রাশেদ। আমার জীবনের এই বিশৃঙ্খলার মাঝে তুমি একটা শান্তির মতো এসেছ। আচ্ছা, তুমি এখন ঘুমাও। কাল তোমার অফিস আছে না?"
 
"হ্যাঁ। তুমিও ঘুমাও। গুড নাইট আনিকা।"
 
"গুড নাইট রাশেদ।"
 
ফোনটা রেখে আমি একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। এই একটা ফোন কল আমাদের সম্পর্কটাকে শুধু শরীর থেকে বের করে একটা মানসিক স্তরে নিয়ে গেল।
 
পরদিন সকাল।
 
আমি বাসে করে কারওয়ান বাজারে এসে নেমেছি। অফিসের বিল্ডিংয়ের দিকে এগোচ্ছি, এমন সময় দেখি অফিসের নিচে টং দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আশিক ভাই সিগারেট টানছেন। উনার এক হাতে চায়ের কাপ, চোখে যথারীতি লালচে ভাব, আর কাঁধে সেই পুরনো রেক্সিনের ব্যাগটা ঝুলছে।
 
"আশিক ভাই! আসসালামু আলাইকুম!" আমি কাছে গিয়ে হাসিমুখে বললাম। আশিক ভাই আমাকে দেখে উনার স্বভাবসুলভ বাঁকা হাসিটা দিলেন। "ওয়ালাইকুম আসসালাম রাশেদ সাহেব। কী খবর? কলাবাগান থানা থাইকা জ্যান্ত ফিরা আসছ দেইখা ভালো লাগতাছে।"
 
"সবই আপনার দোয়ায় ভাই। আপনার ওই ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম বলাটাই তো আমার লাইফ সেভ করে দিল। আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে রিমান্ডে ঝুলিয়ে দেবে," আমি হাসতে হাসতে বললাম।
 
"আরে ভাই, তোমারে তো কইলামই, পুলিশ তো আর খামখা সাধারণ মানুষরে ধরে না। মামা, রাশেদরে এক কাপ কড়া লাল চা দাও তো!" আশিক ভাই চা-ওয়ালাকে অর্ডার দিলেন। আমরা দুজন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ফুটপাতের একপাশে এসে দাঁড়ালাম।
 
আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালাম। আশিক ভাই উনার আধখাওয়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে আমার প্যাকেট থেকে আরেকটা নিলেন। "ভাই, ওই কেসটার কোনো খোঁজখবর কি পেলেন?" আমি খুব সাবধানে, একটু নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলাম। "মানে, বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা?"
 
আশিক ভাই চায়ের কাপে একটা শব্দ করে চুমুক দিলেন। উনার চোখদুটো একটু সরু হয়ে এল। ক্রাইম রিপোর্টারদের একটা নিজস্ব বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থাকে, যখন তারা কোনো ইনসাইড নিউজ শেয়ার করে, তখন তাদের গলার স্বর আর চোখের ভঙ্গি পুরো থ্রিলার সিনেমার মতো হয়ে যায়।  "রাশেদ, আমিকাল রাতেও শাহাদাত ভাইয়ের সাথে কথা বলার সময় একটু জিজ্ঞেস করছিলাম কেসটা নিয়া," আশিক ভাই গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন। "পুলিশ কিন্তু কেসটা অলমোস্ট গুছাইয়া আনছে। মানে, জট খুলতে শুরু করছে।"
 
আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। "গুছিয়ে এনেছে মানে? বেলাল সাহেবকে কি পাওয়া গেছে?"

"না, লোকটারে এখনো ফিজিক্যালি পাওয়া যায় নাই," আশিক ভাই সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন। "তবে পুলিশ যতটুকু ইনসাইড নিউজ পাইছে, তাতে বুঝা যাইতেছে ঘটনাটা কোনো সাধারণ কিডন্যাপিং বা মুক্তিপণের কেস না। এটা অনেক ডিপ একটা গেম। ওই যে ফেক সিমের কথা তোমারে এসআই তৌহিদ বলছিল না? ওই সিমের কল ট্রেস করে, আর ওই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ এনালাইসিস করে পুলিশ একটা বিশাল ক্লু পাইছে। কারা এর পিছে আছে, বা লোকটারে কোথায় নেওয়া হইতে পারে— এই ব্যাপারে ডিবি পুলিশের একটা টিম অলরেডি কাজ শুরু কইরা দিছে।"
 
"কারা আছে ভাই এর পেছনে?" আমি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম। আশিক ভাই আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "সেটা তো শাহাদাত ভাই আমারে ভাঙে নাই। 

পুলিশের রুলস আছে তো। যখন একদম কনফার্ম হইয়া অ্যারেস্ট করবে, তখন প্রেস ব্রিফিং করবে। তবে এইটুকু বুঝতে পারছি, কেসটার ভেতরে বিশাল কোনো ফিন্যান্সিয়াল বা প্রফেশনাল শত্রুতার ব্যাপার আছে। আর বেশিদিন লাগব না, দুই-চার দিনের মধ্যেই হয়তো নিউজটা ব্রেকিং হিসেবে পেপারে ছাপানো লাগবে।"
 
আমি একটা ঢোঁক গিললাম। "যাক, আলহামদুলিল্লাহ! পুলিশ অন্তত একটা লাইনে তো এগোচ্ছে।

আপুটা তো অনেক টেনশনে আছেন।"

"হুম, টেনশনে থাকারই কথা। ঠিক আছে রাশেদ, চলো উপরে যাই। আজ আবার ওইদিকে ডিবির একটা প্রেস ব্রিফিংয়ে যাইতে হইব," আশিক ভাই চায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে বললেন।
 
অফিসে ঢুকে আমি আমার ডেস্কে বসলাম। ল্যাপটপ অন করে নিউজ পোর্টালে ঢুকলাম। কিন্তু আমার মাথায় তখন আশিক ভাইয়ের কথাগুলো ঘুরছে। পুলিশ কেস গুছিয়ে এনেছে! ফিন্যান্সিয়াল শত্রুতা! তার মানে কি বেলাল সাহেবের সাথে লন্ডনের কোনো বিজনেস পার্টনারের ঝামেলা ছিল? নাকি দেশের ভেতরের কোনো শত্রু? যাই হোক না কেন, আনিকার অন্তত এর পেছনে কোনো হাত নেই, এটা ভেবেই আমার মনটা শান্তিতে ভরে গেল।
Reply
#36

৩৬



অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি হোয়াটসঅ্যাপে আনিকার সাথে চ্যাট করছিলাম।


আমি: "শুভ সকাল। ঘুম ভাঙল?"

আনিকা: "হ্যাঁ, একটু আগে উঠলাম। তুমি অফিসে?"

আমি: "জি ম্যাডাম। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে পড়ে আছি। আচ্ছা আনিকা, গতকাল শাহবাগে তুমি একটা কথা বলেছিলে। মনে আছে?"

আনিকা: "কোন কথাটা? আমি তো কাল অনেক কথাই বলেছি। রাগের মাথায় কত কিছুই তো বকেছি।"

আমি: "তুমি বলেছিলে, বেলাল সাহেব এসব আগে শুরু করেছিলেন। তুমি উনার তুলনায় কমই করেছ। এই কথাটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। কী শুরু করেছিলেন বেলাল সাহেব? উনার দিক থেকে কী এমন হয়েছিল?"
 
মেসেজটা পাঠানোর পর আমি দেখলাম আনিকা টাইপিং করছেন। তারপর আবার থেমে গেলেন। আবার টাইপিং। প্রায় দুই মিনিট পর উনার মেসেজ এল।
 
আনিকা: "রাশেদ, আমি তোমাকে সব বলব। কিছুই লুকাব না। কিন্তু, আমাকে একটু সময় দাও। এই মুহূর্তে আমি মেন্টালি খুব ট্রমাটাইজড আর কনফিউজড একটা অবস্থার মধ্যে আছি। একদিকে বেলালের নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা, আরেকদিকে আমার নিজের ভেতরের কিছু জমা কষ্ট। আমি নিজে আগে একটু ধাতস্থ হই। আমার ব্রেনটাকে একটু শান্ত হতে দাও। আমি প্রমিজ করছি, আমি নিজে বসে তোমাকে বেলালের ওই দিকের সব সত্যি কথা খুলে বলব। জাস্ট গিভ মি সাম টাইম।"
 
আমি মেসেজটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মানুষের জীবনে এমন কিছু অন্ধকার দিক থাকে, যা সহজে কাউকে বলা যায় না। আমি আনিকাকে আর চাপ দিলাম না।
 
আমি লিখলাম: "ঠিক আছে। টেক ইওর টাইম। আমি ওয়েট করব।
 
আনিকা একটা হার্ট ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই দিলেন।
 
বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ করে আমি মিরপুরের মেসে ফিরলাম। মেসে ফিরে আমার মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারছিলাম, ঢাকা শহরের এই বদ্ধ পরিবেশ, এই মেস, আর এই প্রতিদিনের রুটিন আমার স্নায়ুর ওপর একটা মারাত্মক চাপ ফেলছে। গত এক মাসের এই বিশাল মানসিক রোলারকোস্টার, আনিকার সাথে সেই উদ্দাম দিনগুলো, বেলালের নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের থানা— সবকিছু মিলিয়ে আমার ব্রেন এখন ওভারলোডেড হয়ে গেছে।
 
আমার একটু বিশ্রাম দরকার। একটু শান্তি দরকার। আমার মনে হলো, আমি যদি এখন কয়েকটা দিন নওগাঁয় আমার গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকি, তাহলে হয়তো আমি এই মানসিক অবসাদ থেকে একটু মুক্তি পাব। গ্রামের সেই খোলা বাতাস, মায়ের হাতের রান্না, আর বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়— এগুলো ছাড়া আমাকে এখন আর কেউ শান্ত করতে পারবে না। কিন্তু আমি কি এখন ঢাকা ছেড়ে যেতে পারব? পুলিশের কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না, সেটা জানা দরকার। আমি মোবাইলটা বের করে এসআই তৌহিদের সেই পার্সোনাল নাম্বারে কল দিলাম।
 
"হ্যালো? তৌহিদ ভাই বলছেন?"

"জি বলছি। কে বলছেন?" ওপাশ থেকে উনার ভদ্র গলা ভেসে এল।

"ভাই, আমি রাশেদ। ওই যে, ঢাকা পেপারসের সাংবাদিক। গতকাল আপনার সাথে কলাবাগান থানায় কথা হলো।"

"হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। বলুন, কী খবর? আনিকা ম্যাডামের ফ্ল্যাটের কিছু কি মনে পড়ল?"

"না ভাই, সেরকম কিছু না," আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম। "আসলে ভাই, আমি একটু গ্রামের বাড়িতে যেতে চাচ্ছিলাম। আমার বাবা-মা নওগাঁয় থাকে। গত কয়েকদিনের অফিসের প্রেসার আর এই থানার ঝামেলার কারণে মেন্টালি খুব আপসেট হয়ে আছি। তো ভাবলাম, দুই-চার দিনের জন্য একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসি। আপনাদের পুলিশের দিক থেকে কি কোনো বিধিনিষেধ আছে? মানে, আমি তো ওই জিডির একটা রেফারেন্স..."
 
এসআই তৌহিদ ওপাশ থেকে হেসে উঠলেন। "আরে না না ভাই! আপনি তো কোনো সাসপেক্ট না বা কোনো অ্যারেস্টেড পার্সন না যে আপনাকে শহর ছাড়তে বারণ করব। আপনি তো জাস্ট একজন উইটনেস বা গেস্ট ছিলেন। আপনার যেখানে খুশি যেতে পারেন। কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। তবে হ্যাঁ, আপনার ফোন নাম্বারটা তো আমাদের কাছে আছেই। যদি কখনো কোনো ইনফরমেশনের জন্য কল দিই, তাহলে একটু রিসিভ করবেন। এইটুকুই।"
 
আমার বুকের ভেতর থেকে যেন এক মণ ওজনের একটা বোঝা নেমে গেল। "অনেক ধন্যবাদ তৌহিদ ভাই। আমি অবশ্যই ফোন খোলা রাখব।"
 
ফোন রেখে আমি আমার ল্যাপটপটা ওপেন করলাম। এখন সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে হবে। এহসান ভাইয়ের কাছ থেকে ছুটি আদায় করা। কয়েকদিন আগেই আমি আনিকার সাথে সময় কাটানোর জন্য ৭-৮ দিনের একটা লম্বা ছুটি নিয়েছি। কর্পোরেট অফিসে, বিশেষ করে নিউজ ডেস্কে, এক মাসে দুইবার লম্বা ছুটি চাওয়াটা রীতিমতো একটা ক্যাপিটাল ক্রাইম। এহসান ভাই হয়তো আমার মেইল দেখেই আমাকে চাকরি থেকে টার্মিনেট করার হুমকি দেবেন।
 
কিন্তু আমার তো উপায় নেই। আমাকে যেতেই হবে। আমি মেইল অপশন ওপেন করে কম্পোজ করতে বসলাম।
 
আমি জানি, বাঙালি বসদের ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল না করলে ছুটি পাওয়া যায় না। তাই আমি একটা খুব ইমোশনাল, প্রফেশনাল এবং একই সাথে অসহায়ত্বে ভরপুর একটা মেইল ড্রাফট করতে শুরু করলাম।
 
এহসান ভাই,
আমি খুব চরম একটা মানসিক এবং শারীরিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যে কারণে বাধ্য হয়ে আমাকে এই মেইলটা লিখতে হচ্ছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে আমি ব্যক্তিগত জীবনে কিছু অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছি (যেটা আমি আপনাকে মৌখিকভাবে কিছুটা বুঝিয়েছিলাম)। এর পাশাপাশি অফিসের টানা শিফট এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের প্রেসার— সবকিছু মিলিয়ে আমি বর্তমানে সিভিয়ার মেন্টাল ব্রেকডাউন (Severe Mental Breakdown) ফেস করছি। আমার পক্ষে এখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
 
আমি জানি, কিছুদিন আগেই আমি আমার পাওনা ছুটি থেকে ৭-৮ দিনের একটা লিভ কাটিয়েছি। একটা নিউজ ডেস্কে কাজ করে, মাসের মধ্যে এভাবে আবারও ছুটি চাওয়াটা চরম অন্যায় এবং অপেশাদারিত্ব। আমি এটা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করছি। কিন্তু ভাই, আমি আক্ষরিক অর্থেই নিরুপায়।
 
আমার এখন কয়েকটা দিনের জন্য আমার পরিবারের কাছে, আমার গ্রামের বাড়ি নওগাঁয় যাওয়াটা খুব জরুরি। আমি জানি, বাবা-মায়ের কাছে গেলে, একটু মানসিক শান্তি পেলে আমি হয়তো আবার আমার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারব। আমি যদি এই মুহূর্তে এই ব্রেকটা না নিই, তাহলে হয়তো আমি ডিপ্রেশনে চলে যাব, যা আমার কাজের ওপর আরও বেশি খারাপ প্রভাব ফেলবে।
 
আমাকে আগামী এক সপ্তাহের জন্য (আগামীকাল থেকে) ছুটি মঞ্জুর করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। যেহেতু আমার ক্যাজুয়াল লিভ হয়তো শেষ, তাই এইচআর ডিপার্টমেন্ট যদি মনে করে, তবে এই ছুটির দিনগুলোর জন্য আমার বেতন থেকে 'লিভ উইদাউট পে' (LWP) হিসেবে টাকা কেটে নিতে পারে। আমি তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি করব না। আমার কাছে এখন টাকার চেয়ে আমার মানসিক সুস্থতাটা বেশি প্রয়োজন।
 
আমি আশা করি, আমার এই মানবিক এবং অসহায় পরিস্থিতিটা আপনারা একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমাকে এই ছুটিটুকু দিয়ে আমার জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেবেন।
 
সিন্-সিয়ার্লি, রাশেদ আহমদ (সাব-এডিটর)
 
আমি মেইলটা একবার রিডিং পড়লাম।  চালাকি করে এইচআর এবং এডিটরকে সিসি (CC) করে দিয়েছি, যাতে এহসান ভাই একা আমাকে আটকে না রাখতে পারেন। এইচআর দেখবে যে একটা ছেলে বিনা বেতনে (LWP) ছুটি নিতে চাচ্ছে তার মানসিক অবস্থার কারণে, তারা নিশ্চয়ই সেটা আটকাতে যাবে না। আমি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে 'Send' বাটনে ক্লিক করলাম। মেইলটা চলে গেল। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিলাম। ঘরের লাইটটা নিভিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।
 
বাইরে মিরপুরের রাস্তায় তখন রাতের কোলাহল কমতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। আমার মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই চিন্তা— আগামী কয়েকটা দিন আমি আমার মায়ের হাতের রান্না খাব, বাবার সাথে চা খাব, আর আনিকা নাওহারের এই পুরো আখ্যানটা থেকে নিজেকে একটু ডিটক্স করব। আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম। আমার জীবনটা এখন একটা ট্রানজিট পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অজানা সব বিস্ময় আর আতঙ্ক।
মানুষ যখন কোনো চরম মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যায়, তখন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে তার শেকড়। ঢাকা শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গল, কারওয়ান বাজারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস, কিংবা ধানমন্ডির ষোলো তলা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট— এসব কিছুই তখন আর শান্তি দিতে পারে না। তখন মনে পড়ে মায়ের হাতের গন্ধ, বাবার চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, আর গ্রামের বাড়ির উঠোনের ধুলোমাখা বাতাসের কথা।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমি বাড়ি যাব। আমার মস্তিষ্ক এখন একটা হ্যাং হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের মতো আচরণ করছে। একে রিস্টার্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিছানায় বসেই আমি আনিকার সেই 'ঘোস্ট' নাম্বারে ডায়াল করলাম। 

"হ্যালো," ওপাশ থেকে আনিকার ঘুম-জড়ানো, রেশমি গলা ভেসে এল।

"শুভ সকাল। আমি তোমাকে ঘুম থেকে তুলে দিলাম নাকি?" আমি নরম গলায় বললাম।

"না, জেগেই ছিলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিং দেখছিলাম। বলো, কী খবর তোমার?"

"খবর খুব একটা ভালো না আনিকা। আমি কয়েকদিনের জন্য ঢাকা ছাড়ছি। ১০-১৫ দিনের জন্য আমি নওগাঁ যাচ্ছি, আমার গ্রামের বাড়িতে।"

কথাটা শোনার পর ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। আমি বুঝতে পারছিলাম আনিকা কথাটা হজম করার চেষ্টা করছেন। "হঠাৎ গ্রামের বাড়ি?" আনিকার গলায় এবার একটা স্পষ্ট বিস্ময় আর চাপা অভিমান। "আমাকে কিছু না বলেই এমন একটা ডিসিশন নিয়ে নিলে?"

"আমার আর কোনো উপায় ছিল না আনিকা," আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম। "গত এক মাসের এই মানসিক রোলারকোস্টার, তোমার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা, আমার ভেতরের এই অপরাধবোধ আর আতঙ্ক— সবকিছু মিলিয়ে আমার মেন্টাল ব্রেকডাউন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি যদি এখন কয়েকটা দিন ঢাকা থেকে দূরে, আমার বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে একটু শান্তিতে না থাকি, আমি হয়তো সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাব। আমার এই যান্ত্রিক শহরটাকে এখন একটা দমবন্ধ করা গ্যাস চেম্বার বলে মনে হচ্ছে।"

আনিকা আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনলেন। কোনো বাধা দিলেন না। কিছুক্ষণ পর উনার গলা থেকে একটা গভীর, উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। "যাও," আনিকা খুব শান্ত, মায়াবী গলায় বললেন। "কবে যাচ্ছ?"

"আজ রাতেই। বাসের টিকিট কাটব একটু পরে।"

"রাশেদ..." আনিকা হঠাৎ গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন। উনার কণ্ঠে এখন একটা অদ্ভুত, শিশুলভ হাহাকার। "তোমার সাথে যদি আমি যেতে পারতাম! যদি সবকিছু ফেলে তোমার হাত ধরে ওই গ্রামে চলে যেতে পারতাম, হয়তো আমি একটু শান্তি পেতাম। এই আইটি ফার্ম, এই বিশাল ফ্ল্যাট, পুলিশের জেরা, এই নোংরা সমাজ— সবকিছু থেকে পালিয়ে ওই সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতাম। একটা মাটির ঘরে থাকতাম, তুমি বাজার থেকে চাল-ডাল নিয়ে আসতে, আমি হয়তো চুলার ধোঁয়ায় চোখ লাল করে তোমার জন্য রাঁধতাম... খুব সহজ, সাধারণ একটা জীবন! কিছুক্ষণের জন্য হলেও হয়তো একটা স্বর্গীয় সুখ হতো।"

আমি আনিকার কথাগুলো শুনছিলাম আর মনে মনে হাসছিলাম। উচ্চবিত্ত, বিলাসী নারীদের এই এক অদ্ভুত রোমান্টিসিজম! তারা এসি রুমে, শ্যানেল পারফিউম মেখে, কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে মাটির ঘর আর চুলার ধোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। তারা জানে না, চুলার ধোঁয়ায় চোখ লাল হওয়াটা কোনো রোমান্স নয়, ওটা একটা চরম শ্বাসকষ্টকর দারিদ্র্য। গ্রামে এক রাত কারেন্ট না থাকলে, আর মশার কামড় খেলে তাদের এই 'সবুজ আর সহজ জীবনের' রোমান্স জানালা দিয়ে পালাবে। কিন্তু এসব রূঢ় বাস্তবতা বলে আমি উনার ফ্যান্টাসিটা নষ্ট করলাম না।

"কী আর করার আনিকা," আমি খুব দরদ দিয়ে বললাম। "এই অবস্থায় তো তোমার যাওয়া সম্ভব না। পুলিশ তোমাকে ঢাকা ছাড়তে দেবে না। তুমি এখানেই থাকো। আমি দশ-পনেরো দিন একটু ঘুরে, মাথাটা ঠান্ডা করে আসি। তারপর তো আবার এই ঢাকাতেই ফিরতে হবে।"

"হুম। সাবধানে থেকো। আর আমার সাথে যোগাযোগ রেখো কিন্তু। আমাকে ভুলে যেও না," আনিকার গলায় একটা নির্ভরতার সুর।

"ভুলব না। রাখছি এখন। অফিসে যেতে হবে।"

ফোন রেখে আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম।
 
সকাল সাড়ে দশটায় আমি কারওয়ান বাজারের অফিসে ঢুকলাম। আমার বুকের ভেতর একটু ধুকপুকানি। গত রাতে এহসান ভাই, এইচআর আর এডিটরকে সিসি করে যে ইমোশনাল মেইলটা দিয়েছিলাম, তার ফল কী হবে সেটা জানার অপেক্ষায় আছি। ডেস্কে বসে ল্যাপটপটা সবে অন করেছি, এমন সময় আমাদের অফিসের পিয়ন মোতালেব এসে আমার সামনে দাঁড়াল।

"রাশেদ ভাই, আপনেরে এডিটর স্যার উনার রুমে ডাকতাছে।"

এডিটর স্যারের রুম! সাংবাদিকতার লাইনে এডিটর বা সম্পাদকের রুমে ডাক পড়া মানেই হলো দুটো জিনিস— হয় আপনার প্রমোশন হচ্ছে, নয়তো আপনার চাকরি যাচ্ছে। আমার বর্তমান যে অবস্থা, তাতে প্রমোশনের সম্ভাবনা শূন্যের নিচে। আমি ঢোঁক গিলে এডিটর স্যারের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম, এডিটর স্যার উনার বিশাল চামড়ার রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। উনার ঠিক সামনের একটা চেয়ারে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বসে আছেন এহসান ভাই। ঘরের তাপমাত্রা সম্ভবত আঠারো ডিগ্রিতে নামানো, কনকনে ঠান্ডা।

"আসসালামু আলাইকুম স্যার। আসতে পারি?" আমি খুব বিনীত গলায় বললাম।

"এসো রাশেদ, বোসো," এডিটর স্যার উনার চশমাটা একটু ঠিক করে বললেন। উনার সামনে আমার সেই মেইলের একটা প্রিন্টআউট রাখা।

আমি এহসান ভাইয়ের পাশের খালি চেয়ারটায় আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। "রাশেদ," এডিটর স্যার খুব শান্ত, ভারিক্কি গলায় শুরু করলেন, "আমরা তোমার মেইলটা পড়লাম। তুমি লিখেছ তুমি সিভিয়ার মেন্টাল ব্রেকডাউনের মধ্যে আছো। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি আছে। আচ্ছা, তুমি কি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছ? যদি ফ্র্যাঙ্কলি বলো, তাহলে আমরা সেই অনুযায়ী পেপারওয়ার্ক রেডি করি।"

আমি রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। চাকরি ছেড়ে দেওয়া! আমি তো জাস্ট কয়েকটা দিনের ছুটি চেয়েছি! "না না স্যার!" আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে বললাম। "আমি চাকরি ছাড়তে যাব কেন? এই ঢাকা পেপারস তো আমার পরিবারের মতো। আমি জাস্ট দশ-পনেরো দিনের একটা ব্রেক চাচ্ছিলাম। আমার মানসিক অবস্থাটা আসলেই খুব খারাপ স্যার। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাতে পারছি না। একটু গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের সাথে থাকলে আমি আবার পুরো এনার্জি নিয়ে ফিরে আসতে পারব।"

এহসান ভাই এবার মুখ খুললেন। "কিন্তু রাশেদ, তুমি তো কয়েকদিন আগেই আট দিনের একটা লিভ কাটালে। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে এখন কাজের যা প্রেসার, তুমি এভাবে হুটহাট দশ-পনেরো দিনের জন্য উধাও হয়ে গেলে আমরা ডেস্ক চালাব কীভাবে? এটা তো কোনো প্রফেশনালিজম হতে পারে না।"

"আমি জানি এহসান ভাই। আমার এটা চাওয়াটা একদমই অন্যায় হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তো কখনো কখনো পরিস্থিতির কাছে নিরুপায় হয়ে যায়। আপনারা চাইলে আমার এই ছুটির দিনগুলোর বেতন কেটে নিতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই," আমি আমার সবচেয়ে করুণ চেহারাটা সামনে আনলাম।

এডিটর স্যার কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কর্পোরেট বসরা মানুষের সাইকোলজি খুব ভালো বোঝেন। উনি হয়তো বুঝতে পারলেন যে, এই ছেলেকে জোর করে ডেস্কে বসিয়ে রাখলে সে নিউজ করার চেয়ে নিউজে ভুল করবে বেশি। "শোনো রাশেদ," এডিটর স্যার উনার হাত দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করে বললেন, "আমরা আমাদের কর্মীদের মেন্টাল হেলথকে ভ্যালু দিই। তুমি যখন বলছ তুমি কাজ করার মতো অবস্থায় নেই, তখন আমরা তোমাকে জোর করব না। কিন্তু দশ-পনেরো দিন বলে কোনো রুলস নেই। তুমি যেহেতু লিভ উইদাউট পে (LWP) নিতে রাজি আছো, আমি তোমাকে পুরো এক মাসের আনপেইড লিভ গ্রান্ট করছি।"

"এক মাস!" আমি এবং এহসান ভাই দুজনেই একসাথে চমকে উঠলাম।

"হ্যাঁ, এক মাস," এডিটর স্যার এহসান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এহসান, তুমি এই এক মাসের জন্য অন্য ডেস্ক থেকে একজন সাব-এডিটরকে টেম্পোরারি তোমার ডেস্কে নিয়ে নাও। আর রাশেদ, তুমি এক মাস পুরোপুরি অফিশিয়াল কাজ থেকে দূরে থাকো। গ্রামে যাও, রেস্ট নাও, মাথা ঠান্ডা করো। ঠিক এক মাস পর তুমি আবার তোমার ডেস্কে জয়েন করবে। আর যদি এক মাসের মধ্যে তুমি না ফেরো, তবে আমরা ধরে নেব তুমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছ। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?"

আমার মনের ভেতর একই সাথে একটা আনন্দ আর বিষাদের সুর বাজল। এক মাসের ছুটি! এক মাস আমাকে কিম জং উন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ দেখতে হবে না! কিন্তু এক মাসের বেতন কাটা যাবে, মানে পঁচিশ হাজার টাকার একটা বিশাল ধাক্কা। তবে আমার সেভিংসের টাকায় আপাতত চলে যাবে। আমার এখন টাকার চেয়ে মানসিক মুক্তিটা বেশি প্রয়োজন।

"জি স্যার। আমি এক মাস পর অবশ্যই জয়েন করব। অনেক ধন্যবাদ স্যার," আমি মাথা নিচু করে সম্মতি দিলাম।

অফিস থেকে বেরিয়ে আমি পান্থপথে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে গেলাম। রাত সাড়ে দশটার নওগাঁর একটা এসি বাসের টিকিট কাটলাম। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। 

আমি মেসে ফিরে আমার একটা ছোট ট্রাভেল ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আর দরকারি জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম, এমন সময় আনিকার ফোন এল। "রাশেদ, তোমার বাস কয়টায়?"

"রাত সাড়ে দশটায়। পান্থপথ থেকে।"

"এখন তো মাত্র ছ'টা বাজে। তুমি যাওয়ার আগে আমার সাথে একটু দেখা করে যাবে না?" আনিকার গলায় একটা মিষ্টি, আকুল আবেদন।

আমিও চাচ্ছিলাম উনাকে একবার দেখে যেতে। আগামী এক মাস তো উনার এই শরীর, এই সুবাস থেকে আমাকে দূরে থাকতে হবে। 

"অবশ্যই দেখা করব। কিন্তু কোথায়? আমি তো পান্থপথের দিকে আসব, তুমি ধানমন্ডিতে আছো। মাঝামাঝি কোথাও বসা যায়?"

"রবীন্দ্র সরোবরে চলে এসো," আনিকা বললেন। "আমি ওখানে থাকব। ওখান থেকে তুমি ইজিলি পান্থপথে চলে যেতে পারবে।"
Reply
#37

৩৭



সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমি রবীন্দ্র সরোবরের কাছাকাছি পৌঁছালাম। দিনের বেলার ভ্যাপসা গরমটা এখন আর নেই। লেকের দিক থেকে একটা খুব স্নিগ্ধ, ঠান্ডা বাতাস বইছে। চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো লেকের কালো পানিতে পড়ে একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। সরোবরের সিঁড়িগুলোতে কপোত-কপোতীরা বসে আছে, বাদাম আর চটপটির দোকানের হাঁকডাক, গিটার হাতে কয়েকজন ছেলে গান গাইছে। ঢাকা শহরের এই চিরচেনা সন্ধ্যার একটা নিজস্ব রোমান্টিকতা আছে।


আমি লেকের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে আনিকাকে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ একটা গাছের নিচে, একটু আধো-অন্ধকার জায়গায় উনাকে দেখতে পেলাম। আমি আক্ষরিক অর্থেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলাম। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গেলে আসলে ডিকশনারির শব্দভাণ্ডার কম পড়ে যায়। উনাকে আমি শাড়িতে দেখেছি, স্লিপিং গাউনে দেখেছি, সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থাতেও দেখেছি। কিন্তু আজ উনার ক্যাজুয়াল, ওয়েস্টার্ন লুকটা আমাকে যেন নতুন করে আবার প্রেমে ফেলে দিল।

উনার পরনে একটা স্কাই-ব্লু রঙের ডেনিম জিন্স, যেটা উনার নিখুঁত, সুডৌল পা এবং নিতম্বের সাথে একেবারে লেপ্টে আছে। ওপরে একটা ধবধবে সাদা রঙের লিনেন কাপড়ের কুর্তি। কুর্তিটা ঢিলেঢালা হলেও, বাতাস যখন উনার গায়ে এসে লাগছিল, তখন কাপড়টা উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশের সাথে সেঁটে গিয়ে একটা মারাত্মক আবেদন তৈরি করছিল। উনার ঘাড়ের ওপর দিয়ে একটা কালো রঙের পাতলা শাল খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে জড়ানো।

চুলগুলো আজ কোনো পার্লার স্টাইলে সাজানো নেই, বরং একটা খুব সাধারণ 'মেসি বান' বা অগোছালো খোঁপা করে মাথার ওপরে আটকানো। কয়েক গোছা অবাধ্য চুল উনার ফর্সা গলার কাছে এসে পড়ছে। মুখে মেকআপের কোনো লেয়ার নেই, শুধু চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁটে একটা হালকা পিংক কালারের লিপবাম।

এই সাধারণ সাজেও উনাকে এত বেশি সুন্দর, এত বেশি আভিজাত্যপূর্ণ এবং একই সাথে এত বেশি আবেদনময়ী লাগছিল যে, আমার মনে হলো আমি উনার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। আমি উনার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম।

"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম?" আমি একটা মুগ্ধ হাসি দিয়ে বললাম।

আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "না, এই তো জাস্ট এলাম। চলো, ওই দিকটায় বসি। ওখানে ভিড় কম।" আমরা লেকের পাড়ের একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। একটা পিচ্চি ছেলের কাছ থেকে মাটির ভাঁড়ে দু কাপ চা নিলাম। আমি পকেট থেকে বেনসন বের করে একটা ধরালাম।

আমাদের দুজনের মাঝখানে একটা অদ্ভুত, ভারী নীরবতা। আমি বাসে করে গ্রামে চলে যাচ্ছি। আনিকা হয়তো আর কিছুদিন পর লন্ডনে ফিরে যাবেন। আমাদের এই অদ্ভুত, নিষিদ্ধ এবং বন্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী, সেটা আমরা কেউই জানি না। আমি চায়ের ভাঁড়ে একটা চুমুক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়লাম।

"আনিকা," আমি নীরবতা ভেঙে, খুব শান্ত, কিন্তু গভীর গলায় বললাম। "আমি তো চলে যাচ্ছি। এক মাসের জন্য। আমি জানি না ফিরে আসার পর তোমাকে আর পাব কি না। কিন্তু যাওয়ার আগে, আমার মন একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য খুব ছটফট করছে। আমার মস্তিষ্ক শান্তিতে নেই।"

আনিকা চায়ের ভাঁড়টা দুই হাত দিয়ে ধরে লেকের কালো পানির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। উনি আমার দিকে ঘাড় ফেরালেন না, শুধু বললেন, "কী প্রশ্ন?"

আমি উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। "সেদিন শাহবাগে তুমি বলেছিলে... বেলাল সাহেব নাকি সবকিছু জানতেন। তুমি বলেছিলে, এসব নাকি উনিই শুরু করেছিলেন! আমার সাথে তোমার এই সম্পর্ক, এই উন্মাদনা— এগুলোর পেছনে নাকি উনারই কোনো হাত আছে। আনিকা, আমি গত কয়েকদিন ধরে এই কথাটা নিয়ে ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাকে অর্ধেক কথা বলে অন্ধকারে ফেলে রেখেছ।"

আমি একটু দম নিলাম। উনার মুখের দিকে তাকিয়ে উনার রিয়্যাকশন বোঝার চেষ্টা করলাম। উনার মুখটা একদম শান্ত, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত শীতলতা। "আনিকা, প্লিজ। আজ আমাকে সত্যি কথাটা বলো। কী শুরু করেছিলেন বেলাল সাহেব? উনি কী জানতেন? তোমাদের এই পারফেক্ট, হাই-সোসাইটির বিয়ের পেছনের আসল সত্যিটা কী?"

আমার প্রশ্নগুলো রাতের বাতাসে একটা ভারী পাথরের মতো গিয়ে পড়ল। আনিকা নাওহার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। উনি উনার চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর রাখলেন। তারপর উনার কালো শালটা দুই হাত দিয়ে নিজের শরীরের চারপাশে একটু ভালো করে জড়িয়ে নিলেন, যেন উনি ভেতরের কোনো শীত বা কোনো অতীত স্মৃতি থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন।

উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে উনার বুকের সেই ভরাট স্ফীতিটা একবার ওপরে উঠল এবং নিচে নামল। উনি উনার সেই গভীর, বাদামি চোখ দুটো সোজা আমার চোখের ওপর স্থাপন করলেন। উনার দৃষ্টিতে এখন কোনো কামুকতা নেই, কোনো খেলা নেই। সেখানে এখন একটা নগ্ন, রূঢ় এবং ভয়ংকর সত্যের ছায়া।

"তুমি সত্যিটা জানতে চাও রাশেদ?" আনিকা খুব নিচু, ফিসফিস করা, কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন গলায় বললেন। 
"তুমি আমার আর বেলালের এই পারফেক্ট বিয়ের পেছনের নোংরা, কদর্য আর কুৎসিত সত্যিটা শুনতে চাও?"

আমি ঢোঁক গিলে শুধু মাথা নাড়লাম। "হ্যাঁ। আমি শুনতে চাই।"

আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরলেন। উনার চোখ দুটো লেকের পানির দিকে নিবদ্ধ হলো। "তাহলে শোনো..." আনিকা উনার জীবনের সেই বন্ধ দরজার তালাটা খুলতে শুরু করলেন। "সবাই ভাবে বেলাল একজন জিনিয়াস ইঞ্জিনিয়ার, একজন লাভিং হাসব্যান্ড। কিন্তু বেলালের আসল রূপটা তুমি জানো না রাশেদ। ও কোনো সাধারণ পুরুষ নয়। ওর মাথার ভেতর যে বিকৃতি কাজ করে, সেটা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না..."

"আমাদের সংসারটা শুরুতে খুব সুন্দর ছিল, রাশেদ," আনিকা বলতে শুরু করলেন। উনার কণ্ঠস্বরটা রাতের এই মৃদু বাতাসে কেমন যেন একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাল। "বেলাল মানুষ হিসেবে খুব চমৎকার ছিল। অন্তত প্রথম তিন বছর। লন্ডনে আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটটা ছিল আমাদের নিজেদের একটা স্বর্গ। ও সারাদিন ওর ইউনিভার্সিটি আর রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর আমি আমার কাজ নিয়ে। কিন্তু দিন শেষে যখন আমরা ওই বাসায় ফিরতাম, তখন আমাদের মাঝখানে কোনো দূরত্ব থাকত না। আমরা দুজনে একসাথে রান্না করতাম, গান শুনতাম... আর আমাদের প্রাইভেট মুহূর্তগুলো ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু ভীষণ উষ্ণ।"

আমি উনার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। আমি কোনো অস্থিরতা দেখালাম না। আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়াটা আমাদের মাঝখানের শূন্যতায় রিং তৈরি করে বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল।

"কিন্তু তিন বছর পর," আনিকা উনার গলার স্বরটা আরেকটু নামিয়ে নিলেন, "আমি প্রথম খেয়াল করলাম, বেলালের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছে। খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন। ও যখন আমার কাছে আসত, তখন সেই পুরোনো মনোযোগটা থাকত না। ও যেন একটা দায়িত্ব পালন করছে, এমন একটা ভাব। আমাকে স্যাটিসফাই করার জন্য ও খুব তাড়াহুড়ো করত, কিন্তু নিজের কোনো সম্পৃক্ততা থাকত না। ও যেন শারীরিকভাবে আমার সাথে থাকত, কিন্তু মানসিকভাবে ও অন্য কোথাও হারিয়ে যেত।"

আমি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কিছু জিজ্ঞেস করোনি?"

"করেছিলাম," আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে বললেন। উনার ফর্সা গলার পেশিগুলো একটু শক্ত হয়ে উঠল। "ও বলত কাজের খুব প্রেসার। ইউনিভার্সিটির প্রমোশনের চাপ, রিসার্চের টেনশন। আমিও ভাবলাম, হ্যাঁ, হয়তো এটাই সত্যি। একটা মানুষ যখন ক্যারিয়ার নিয়ে এত স্ট্রাগল করে, তখন শারীরিক সক্ষমতা বা আগ্রহ একটু কমে যেতেই পারে। আমি স্পেস দিয়েছিলাম। প্রায় এক বছর আমি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমি  কখনো কোনো প্রেশার দিইনি।"

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। এই সুন্দরী, পরিণত নারীটি উনার জীবনের সেই একাকীত্বের দিনগুলোতে কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন, তা উনার চোখের কোণের সেই হালকা পানির বিন্দু দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উনার কাপড়ের নিচ দিয়ে উনার বুকের সেই ভরাট গঠনটা প্রতিটা নিশ্বাসের সাথে ভারী হয়ে উঠছিল।

"কিন্তু এক বছর পর," আনিকা বলতে থাকলেন, উনার কণ্ঠস্বরটা এবার একটু শক্ত হয়ে উঠল, "পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। বেলাল আমাকে স্পর্শ করাই বন্ধ করে দিল। ও দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ আমার পাশে শুয়ে থাকত, কিন্তু  কোনো সাড়াশব্দ থাকত না। আমি যদি গায়ের ওপর হাত রাখতাম, ও খুব ভদ্রভাবে  শরীরটা সরিয়ে নিত। বলত, 'আজ খুব টায়ার্ড লাগছে আনিকা, চলো ঘুমাই।' শেষমেশ পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, আমার নিজের ভেতরের শারীরিক তাড়নায়, নিজের ক্ষুধার কারণে আমাকেই ইনিশিয়েটিভ নিতে হতো।"

আমি উনার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এই অপরূপা নারী, যার একটি ইশারায় যেকোনো পুরুষ উনার পায়ে লুটিয়ে পড়তে পারে, তাকে উনার নিজের স্বামীর কাছে এভাবে হাত পাততে হতো!

"এবং যখন আমি ওর কাছে যেতাম," আনিকা উনার চোখ বন্ধ করে ফেললেন, যেন উনার অতীতের সেই চরম অপমানের স্মৃতিটা উনি আবার দেখতে পাচ্ছেন, "ও বিছানায় একটা পাথরের মূর্তির মতো পড়ে থাকত। কোনো রিয়্যাকশন থাকত না, কোনো রেসপন্স থাকত না। ও শুধু শুয়ে থাকত, আর আমাকেই সবকিছু করতে হতো। মনে হতো আমি কোনো প্রাণহীন, ঠাণ্ডা লাশের সাথে জড়িয়ে আছি। শরীরটা আমার ছোঁয়ায় একটুও সাড়া দিত না। পুরুষাঙ্গ আমার হাতের মুঠোয় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে থাকত। এক বছর... পুরো এক বছর আমি এই নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি রাশেদ। আমার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত এবং সবচেয়ে অপাংক্তেয় নারী বলে মনে হতো।"

আনিকার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। উনার সেই ফর্সা গালে অশ্রুবিন্দুটি ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় একটা মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। আমার উনার হাতটা ধরতে ইচ্ছে করল, কিন্তু আমি উনাকে ডিস্টার্ব করলাম না। আমি উনার গল্প শুনতে লাগলাম।

"একদিন আমি আর পারলাম না," আনিকার গলার স্বরটা এখন রাগে আর অপমানে কাঁপছে। "আমি জাপটে ধরলাম। চেপে ধরে বললাম, 'বেলাল, কী হয়েছে তোমার? সত্যি করে বলো। তুমি কেন আমার সাথে এমন করছ? তোমার কি কোনো রোগ হয়েছে?' ও প্রথমে কিছু বলল না। চুপ করে রইল। আমি যখন অনেক জোরাজুরি করলাম, ডিভোর্সের হুমকি দিলাম, তখন ও খুব শান্ত গলায়  মাথাটা বালিশে হেলিয়ে দিয়ে একটা কথা বলল।"

"কী বলল?" আমি খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।

"ও বলল, 'আনিকা, আমি তোমার শরীরে আর কোনো থ্রিল পাই না। তোমার সাথে শোয়াটা এখন আমার কাছে একটা রুটিন ওয়ার্কের মতো মনে হয়। এই রিলেশনশিপটা আমার জন্য একটা বোঝা।'"

আনিকা একটু থামলেন। উনার শ্বাস এখন খুব দ্রুত ওঠানামা করছে। পরনের কাপড়ের সামনের অংশটা সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় ফুলে উঠছে। আমি উনার এই তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও উনার শারীরিক গঠনের সেই মারাত্মক আকর্ষণটা এড়াতে পারছিলাম না। উনার কোমরটা বেঞ্চের ওপর একটা সুন্দর ধনুকের মতো বাঁক তৈরি করেছিল।

"আমি তো অবাক!" আনিকা বলতে থাকলেন। "আমি বললাম, 'থ্রিল পাও না মানে? আমি তোমার স্ত্রী!' ও বলল, 'তাতে কী? মানুষের রুচি তো বদলাতেই পারে।' আমি যখন আরও প্রেশার দিলাম, জিজ্ঞেস করলাম ওর কি অন্য কোনো চয়েস আছে কি না, তখন ও খুব ঠান্ডা মাথায় একটা স্বীকারোক্তি দিল। ও বলল, ওর ইউনিভার্সিটির এক সাদা চামড়ার কলিগ, নাম ক্যাথরিনের সাথে ও গত কয়েক মাস ধরে রেগুলার সেক্স করছে।"

আমি চমকে উঠলাম। আনিকা একটা বিষাক্ত হাসি হাসলেন। 

"আমি বেলালকে বললাম, 'কিন্তু আমার প্রতি তোমার এই অনিহা তো গত কয়েক মাসের না, এটা তো প্রায় দুই বছর ধরে চলছে! তাহলে তার আগে কী হয়েছিল?' বেলাল তখন ওর ডিকশনারির সবচেয়ে নোংরা পাতাটা খুলল। ও স্বীকার করল, ক্যাথরিনের আগে, ওর খুব ভালো বন্ধু রাসেল— রাসেলও আমাদের সাথে ইউকেতেই থাকে— রাসেলের বউ তানিষার সাথে ও নিয়মিত ফিজিক্যাল রিলেশনে ছিল। রাসেল যখন অফিসে থাকত, বেলাল তখন রাসেলের বাসায় গিয়ে তানিষার সাথে বিছানায় মেতে উঠত।"

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বেলাল সাহেব লোকটা তো আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ! তার নিজের খুব ভালো বন্ধুর স্ত্রীর সাথে সে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক রাখছিল!

"শুধু তানিষা আর ক্যাথরিনই নয়," আনিকার চোখ দুটো এখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। "ও জানাল, গত আড়াই-তিন বছরে ও আরও অন্তত তিন-চারজন ভিন্ন ভিন্ন নারীর সাথে শুয়েছে। ওদেশে ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ড বা ক্যাজুয়াল সেক্স তো খুব সহজ। ও বলল, এই কাজগুলোতে খুব ভালো লাগে।  কোনো গিল্ট ফিলিং হয় না, কোনো অপরাধবোধ বা লজ্জা নেই। ও জীবনটাকে এনজয় করতে চায়।"

আমি নিচু, বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কিছু বললে না? তুমি কি উনাকে ডিভোর্সের কথা বললে না?"

"বলেছিলাম," "অনেক রাগারাগি করেছি, অনেক কেঁদেছি,  পায়ে পর্যন্ত ধরেছি যে আমাদের বিয়েটা যেন ও এভাবে নষ্ট না করে। কিন্তু ও বলল, 'আনিকা, আমাদের বিয়েটা একটা সোশ্যাল স্ট্যাটাস। আমরা সমাজকে দেখাতে পারি যে আমরা খুব সুখে আছি। কিন্তু আমাদের পার্সোনাল লাইফে আমরা স্বাধীন। তোমার যদি শারীরিক চাহিদা থাকে, তুমিও অন্য কোনো পুরুষের সাথে ঘুমাতে পারো। আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। আমরা চাইলে ওপেন ম্যারেজ ট্রাই করতে পারি। আর তোমার যদি এতে আপত্তি থাকে, আমরা সোজা ডিভোর্সের দিকে এগোতে পারি।'"

আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আনিকা নাওহারের মতো একজন ক্লাসি, রূপবতী এবং অহংকারী নারীকে উনার নিজের স্বামী একটা ওপেন ম্যারেজের প্রস্তাব দিচ্ছেন! উনাকে বলছেন— "তুমি চাইলে অন্য পুরুষের বিছানায় যাও, আমার আপত্তি নেই।" এই অপমানের চেয়ে বড় কোনো অপমান একজন নারীর জীবনে হতে পারে না।

"আমি ডিভোর্স চাইনি রাশেদ," আনিকা উনার চোখের পানি মুছে খুব শান্ত গলায় বললেন। "আমি চেয়েছিলাম বেলালকে একটু সময় দিতে। আমি ভেবেছিলাম, আমি যদি এইবার একটু বেশি দিনের জন্য দেশে আসি, ও যদি ওই ফ্যান্টাসির বাইরে একা থাকে, হয়তো একাকিত্বের ভয়ে  আমার কাছে ফিরে আসবে। অনুতাপ হবে। ভুল বুঝতে পারবে। আমি ডিভোর্স দিয়ে আমাদের সুন্দর অতীতটাকে ভেঙে ফেলতে চাইনি। আর বেলালের ওপর রেগে গিয়ে, নিজের সতীত্ব অন্য কোনো সস্তা পুরুষের বিছানায় গিয়ে বিসর্জন দিতেও আমার ইগোতে লেগেছে।"

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। উনার চোখের মণি দুটো এখন লেকের পানির অন্ধকারে আরও বেশি গভীর আর রহস্যময় মনে হচ্ছে। উনার এই সরল, সততা মেশানো স্বীকারোক্তি আমার ভেতরের সমস্ত অবিশ্বাসকে ঝেড়ে ফেলে দিল।

"কিন্তু..." আনিকা হঠাৎ উনার বসার ভঙ্গিটা পাল্টালেন। উনার গলার স্বরটা এখন একটা বরফের মতো শীতল। 

"আমার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এই দেশে এসে।"

"কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার বুকটা আবার ধকধক করছে। "দেশে এসে কী হলো?"

"দেশে এসে আমি বেলালের এমন একটা খবর পেলাম, এমন একটা নোংরা ঘটনা জানতে পারলাম, যা জানার পর আমার ভেতরের ওই সতী নারীটা চিরতরে মরে গেল। আমার মনে হলো, আমি বেলালের জন্য যে আত্মত্যাগ করছি, সেটা একটা চরম বোকামি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বেলালকে আমি ওর ভাষাতেই জবাব দেব।"

আনিকা একটু থামলেন।

"কী খবর পেয়েছিলে তুমি?" আমি উনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা নাওহারের ঠোঁটে একটা খুব শীতল, ম্লান হাসি ফুটে উঠল। "রাশেদ, উত্তরটা দেওয়ার আগে আমাকে একটা সিগারেট ধরাও তো," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরটা খুব শান্ত, কিন্তু তার গভীরে একটা দীর্ঘশ্বাসের কাঁপুনি ছিল।

আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট বের করলাম। একটা ম্যাচ কাঠি জ্বালিয়ে আগুনটা উনার ঠোঁটে ধরা সিগারেটের ডগায় ধরলাম। আগুনের সেই ক্ষণস্থায়ী আলোয় আমি আনিকার চোখের মণি দুটো দেখলাম। সেই বাদামি চোখে আজ কোনো মায়া নেই, সেখানে শুধু জমে আছে এক বিষাক্ত অতীত।

আমি নিজের জন্যও একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়াটা ফুসফুসে টেনে নিয়ে বাতাসের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। আনিকা সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিলেন। ধোঁয়াটা কিছুক্ষণ নিজের ভেতরে আটকে রেখে উনি খুব রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বাতাসে ছাড়লেন। উনার ফর্সা, মসৃণ মুখমণ্ডলের ওপর ধোঁয়ার একটা পাতলা আস্তরণ তৈরি হয়ে আবার মিলিয়ে গেল।

"রাশেদ, দেশে আসার পর তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হলো," আনিকা বলতে শুরু করলেন। উনার গলার স্বর খুব নিচু, যেন উনি নিজের সাথেই কথা বলছেন। "আমি কিন্তু প্রথম দিন থেকেই খেয়াল করেছিলাম যে তোমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছে। তুমি তোমার ওই তীক্ষ্ণ, শিকারি চোখ জোড়া দিয়ে আড়চোখে আমার শাড়ির কুঁচি, আমার কোমর, আমার বক্ষদেশ যেভাবে তারিয়ে তারিয়ে চুষে খাচ্ছিলে— তা দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে তুমি আমার প্রেমে বা আমার শরীরের নেশায় হাবুডুবু খাচ্ছ।"

আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। আমার গাল দুটো একটু গরম হয়ে উঠল।

আনিকা উনার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, "কিন্তু আমি তো তখনো সতী সেজেছিলাম। বেলাল আমাকে এত বড় একটা আঘাত দেওয়ার পরও আমি আমার মনে বেলালের জন্য একটা ছোট জায়গা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, না, আমি বেলালের মতো নোংরা হব না। আমি আমার সতিত্ব আগলে রাখব। তাই প্রথম প্রথম আমি তোমাকে খুব একটা পাত্তা দিইনি। তোমার ওই লোলুপ দৃষ্টি আমি খুব উপভোগ করতাম ঠিকই, কিন্তু আমি তোমাকে একটা সীমারেখার ওপাশে আটকে রেখেছিলাম।"

আমি উনার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে একটু অধৈর্য গলায় বললাম, "আহা! আমি আমার নিজের গল্প শুনতে এখানে আসিনি আনিকা। আমার ওই ক্ষুধার্ত চোখের কথা তো আমি নিজেই জানি। তুমি আমাকে বলো— কী এমন জানতে পারলে তুমি? কার কাছ থেকে জানতে পারলে যে তোমার ওই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল?"

আনিকা সিগারেটের ছাইটা লেকের পানিতে ঝেড়ে ফেলে একটা লম্বা নিশ্বাস নিলেন। উনার সাদা লিনেনের কুর্তিটা সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় ফুলে উঠে আবার নেমে গেল।

"দেশে আসার ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় ঘটনাটা ঘটল," আনিকা বলতে লাগলেন। "আমার এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটটা তো অনেক দিন ধরে তালাবন্ধ থাকে। ফ্ল্যাটটা ক্লিন করার জন্য আর আমাকে টুকটাক হেল্প করার জন্য ঐযে কাজের মেয়েটা আসত। মনে আছে না তোমার?মেয়েটার নাম ময়না। বয়স বড়জোর উনিশ বা বিশ হবে। খুব সাদাসিধে, গ্রাম্য একটা মেয়ে।"

আমি মাথা নাড়লাম। হ্যাঁ, ওই মেয়েটার কথা আমি জানি। আমি যখন ফ্ল্যাটে ছিলাম, মেয়েটা সকালে এসে ক্লিন করে দিয়ে যেত।

"তো, একদিন ময়না ঘর মুছতে মুছতে আমাকে খুব ক্যাজুয়াল একটা প্রশ্ন করল," আনিকা বললেন। "সে বলল— 'ম্যাডাম, এইবার স্যার আইবেন না?' আমি প্রশ্নটাকে খুব সাধারণ একটা কৌতূহল বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কারণ আমরা তো এর আগে যখনই দেশে এসেছি, দুজনে একসাথেই এসেছি। আমি হাসিমুখে বললাম— 'না ময়না, তোমার স্যার তো এবার আসবে না। ও ওখানে খুব ব্যস্ত।' ময়না একটু চুপ করে থেকে বলল— 'স্যার মানুষটা অনেক ভালো ম্যাডাম।' আমি  কথা শুনে একটু হাসলাম। বললাম— 'হ্যাঁ, ও মানুষ হিসেবে ভালোই।' কিন্তু ময়না সেখানেই থামল না। সে  ঘর মোছার বালতিটা একপাশে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল— 'স্যার যখন গতবার আইছিলেন, আপনি তো আসেন নাই। তখন আমার মায়ের খুব কঠিন অসুখ আছিল। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার আছিল। স্যার আমারে অনেক টাকা দিয়া সাহায্য করছেন। স্যার বড় ভালা মানুষ।'

আনিকা একটু থামলেন। উনার চোখের মণি দুটো এখন বরফের মতো ঠাণ্ডা।

আমি উনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর? তুমি অবাক হলে?"

"অবাক মানে?" আনিকা একটা বিষাক্ত হাসি হাসলেন। "আমার মাথার ভেতরের সমস্ত লজিক যেন এক সেকেন্ডে জ্যাম হয়ে গেল। আমি মনে মনে হিসাব করতে লাগলাম— বেলাল গতবার একলা দেশে এসেছিল? কখন এসেছিল? ও তো আমাকে কোনোদিন বলেনি যে ও একলা বাংলাদেশে গিয়ে ঘুরে এসেছে! আমি আমার স্মৃতি হাতড়ে দেখলাম, আমি দেশে আসার ঠিক তিন-চার মাস আগে বেলাল আমাকে বলেছিল যে ও একটা বৈজ্ঞানিক সেমিনারের কাজে ফ্রান্স যাচ্ছে। ১০-১২ দিনের জন্য। আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করল। বেলাল আসলে ফ্রান্স যায়নি। ও উনার ওই বৈজ্ঞানিক সেমিনারের মিথ্যা গল্প সাজিয়ে সোজা ঢাকায় চলে এসেছিল! একলা!"

আমি খুব মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শুনছিলাম। আমার মনের ভেতর একটা অদ্ভুত বিস্ময় কাজ করছে। বেলাল সাহেব উনার স্ত্রীকে লুকিয়ে দেশে এসেছিলেন!

"আমার হঠাৎ করে এক তীব্র সন্দেহ হলো," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বর এখন কাঁপছে। "বেলাল এই ফ্ল্যাটে একলা এসে থেকেছে, অথচ আমার কাছে সেই খবরটা ও লুকিয়ে গেছে। কেন? আর তার চেয়েও বড় কথা— বেলাল মানুষ হিসেবে কখনো মানবদরদী ছিল না। ও লন্ডনে কোনো চ্যারিটিতে এক পাউন্ড টাকা দিতে গেলেও দশবার হিসাব করে। সেই বেলাল হঠাৎ করে আমাদের ফ্ল্যাটের এক সাধারণ কাজের মেয়েকে  মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক  টাকা দিয়ে দিল? এটা কোনোভাবেই বেলালের চরিত্রের সাথে মেলে না। আমি ময়নাকে একপ্রকার রিমান্ডে নিলাম।"

"তুমি ময়নাকে জেরা করলে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"হ্যাঁ। খুব শান্ত গলায় বললাম— 'ময়না, তোমার স্যার তোমাকে কত টাকা দিয়েছিল?' ময়না একটু ঘাবড়ে গেল। বলল— 'ম্যাডাম, অনেক টাকা দিছিল। প্রায় লাখখানেক।' আমি বললাম— 'তোমার স্যার তো কখনো কাউকে এক টাকাও ফ্রি দেয় না ময়না। ও তোমাকে এত টাকা কেন দিল? সত্যি করে বলো তো, ও কি এমনি এমনি টাকাটা দিয়েছিল?' ময়না আমার গলার স্বরের কাঠিন্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে শুরু করল। আমি আর একটু চেপে ধরতেই, উনি সোজা আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল। ও কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করল— 'ম্যাডাম, আমার খুব ভুল হইয়া গেছে। স্যার টাকা দিছিল ঠিকই, কিন্তু উনার লগে শুইতে কইছে।'"

আনিকার কথাগুলো শোনার পর আমার নিজের শরীরের ভেতর দিয়েও একটা অদ্ভুত অস্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল। নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের বিছানায়, নিজের কাজের মেয়ের সাথে স্বামী শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে!
Reply
#38

৩৮





আনিকার মুখে কথাটা শোনার পর থেকে আমার পেটের ভেতর একটা বমি বমি ভাব শুরু হলো। আনিকা উনার সুন্দর, সাদা হাত দিয়ে কপালটা জোরে চেপে ধরলেন। উনার আঙুলগুলো কাঁপছিল। চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল, কিন্তু সেটা কান্নার জল নয়—রাগের, অপমানের আগুনের ফুলকি। "আমার রাগে, অপমানে সারা শরীর রি রি করতে লাগল," উনি বললেন। উনার গলার স্বরটা ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই ভাঙা স্বরের মধ্যেও একটা তীক্ষ্ণ ধার ছিল।

যে স্বামী লন্ডনের ওই বিলাসবহুল বেডরুমে আমার মতো একজন সুন্দরী, শিক্ষিতা, রূপবতী স্ত্রীকে ছুড়ে ফেলে রেখেছিল, যে স্বামী দাবি করেছিল তার নাকি আমার শরীরে আর কোনো থ্রিল বা আগ্রহ নেই—সেই একই স্বামী আমারই কেনা বিছানায়, আমারই ফ্ল্যাটের কাজের মেয়েকে নিয়ে শুয়েছে! কল্পনাটা মাথায় আসতেই আমার শরীরের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে গেল। আনিকা ময়নাকে চুল ধরে টেনে তুলেছিলেন। উনার হাতের আঙুলগুলো ময়নার চুলের গোড়ায় কড়া হয়ে বসেছিল। "সত্যি করে বল শুয়োরের বাচ্চা! ও আর কী কী করেছে? ও কবার এসেছে তোর কাছে?" উনার গলায় তখন আর মানুষের স্বর ছিল না, যেন কোনো আহত বাঘিনীর গর্জন।

ময়না কাঁদতে কাঁদতে, ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সবকিছু উগরে দিল। ও বলল, বেলাল এই ফ্ল্যাটে সাত দিন ছিল। আর এই সাত দিনের প্রায় প্রতিটি রাতেই সে ময়নাকে নিজের বিছানায় ডেকে নিত। ময়না বলল—'স্যার তো আমার লগে অনেক খারাপ কাজ করছে ম্যাডাম। উনি আমারে কাপড় খুইলা বিছানায় ফালাইয়া রাখত। উনি উনার মুখে আমার...'

আনিকা একটু থামলেন। উনার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। উনি সিগারেটের বাটটা সজোরে লেকের পানিতে ছুড়ে ফেললেন। পানির উপর ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হলো, যেন সেই ঢেউগুলোও উনার অপমানের সাক্ষী। উনার মুখমণ্ডলে এক চরম ঘৃণা আর বিতৃষ্ণার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। উনার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে এসেছিল। লেকের পাড়ের হালকা বাতাসে উনার ভেজা চুল উড়ছিল, আর সেই চুল থেকে একটা মিষ্টি, ভেজা ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। আমি উনার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এই অপমান কোনো নারীর পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। কোনো স্ত্রীর পক্ষে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, কল্পনা করাও কষ্টকর।

কিন্তু ধাক্কাটা শুধু এখানেই শেষ হয়নি। আনিকা উনার গলার স্বর আরও নিচে নামিয়ে আনলেন। উনার চোখ দুটো এখন একদম কালো হয়ে গেছে, যেন কোনো গভীর অন্ধকার কুয়ো। "ময়না আমাকে আরেকটা তথ্য দিল, যা শোনার পর আমার ভেতরের শেষ সতী নারীটা চিরকালের জন্য মারা গেল।" উনার কথাগুলো বলতে বলতে উনার শরীরটা যেন শক্ত হয়ে গেল। "ময়না বলল, শুধু সে একাই বেলালের বিছানায় যায়নি। এই বিল্ডিংয়ের চার তলার আরেকটা ফ্ল্যাটের কাজের মেয়ে আছে, তার নাম রহিমা। বেলাল ওই সাত দিনের মধ্যে চার দিন ময়না আর রহিমাকে একসাথে উনার বেডরুমে ডাকত।"

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। 

"একসাথে? মানে থ্রি-সাম?" আমার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না।

"হ্যাঁ!" আনিকা একটা বন্য, পাগলাটে হাসি হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না—শুধু বিষ, ঘৃণা আর ভাঙা আত্মার আর্তনাদ। "ময়না বলল—'ম্যাডাম, আমি যখন একদিন স্যাররে কইলাম রহিমারে ডাকছেন ক্যান? স্যার হাসল। স্যার আমাগো দুইলারে একসাথে কাপড়া খুলতে কইল। উনি আমাগো দুইলারে নিয়া একসাথে ফুর্তি করছে। স্যার আমাগো দুইলারে একসাথে বিছানায় শোয়াইয়া উনার জিনিস আমাগো মুখে...'"

আমি আর শুনতে পারলাম না। আমার নিজেরই গা গুলিয়ে উঠল। বমি আসার মতো অনুভূতি। লেকের পানি, পাখির ডাক, দূরের গাড়ির শব্দ—সবকিছু যেন মিলিয়ে গেল। শুধু আনিকার কথাগুলো আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। বেলাল সাহেব লোকটা তো আস্ত একটা জানোয়ার! সে লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় প্রফেসরের মুখোশ পরে থাকে, সভ্য সমাজের সামনে নিজেকে শিক্ষিত, সংস্কৃতিমান মানুষ হিসেবে প্রচার করে, আর নিজের দেশে এসে নিজের ফ্ল্যাটে দুজন কাজের মেয়েকে একসাথে নিয়ে উনার বিছানায় নোংরা, পশুর মতো খেলায় মেতে ওঠে! কল্পনায় যখন সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল—দুজন অসহায় মেয়ে, একজন শিক্ষিত, ক্ষমতাবান পুরুষের লালসার শিকার—আমার হাতের মুঠো আপনা-আপনি শক্ত হয়ে গেল।

আনিকা আরও বললেন। ময়না নাকি বলেছে, বেলাল তাদের দুজনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে বলত—'তোদের এই কালো, নোংরা শরীরগুলোর যে গন্ধ, এই গন্ধের যে থ্রিল, এটা আমার ওই মেমসাহেব বরের শরীরে নাই।' সে তাদের উনার ইচ্ছেমতো ব্যবহার করত। তাদের মুখে উনার বীর্য স্খলন করত, আর উনারা সেটা নিতে বাধ্য হতো টাকার লোভে, চাকরি হারানোর ভয়ে। আনিকা উনার কথা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার বুকটা উঠানামা করছিল। উনার কুর্তির কাপড়টা সামান্য সরে গিয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ ঘাড় আর কলারবোনের অংশটা দেখাচ্ছিল।

উনার চোখের সামনে এখন আর কোনো কান্নার জল নেই। উনার চোখ দুটো এখন সম্পূর্ণ পাথরের মতো শক্ত, ঠান্ডা। "এই কথাগুলো শোনার পর আমি আমার ড্রয়িংরুমে বসে প্রায় দুই ঘণ্টা চুপচাপ কাঁদলাম," আনিকা বললেন। উনার কণ্ঠস্বরে সেই দুই ঘণ্টার যন্ত্রণা এখনও লেগে ছিল। "আমার মনে হলো, আমি বেলালের জন্য যে নিজেকে এতদিন ধরে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলাম, আমি যে নিজের কামনার আগুনটাকে চেপে ধরে সতী সেজেছিলাম—তা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বোকামি। আমি কার জন্য সতিত্ব আগলে রাখছি? যে লোকটা আমার বিছানায় দাঁড়িয়ে দুজন নোংরা কাজের মেয়েকে নিয়ে ফুর্তি করছে! যে লোকটা আমার শরীরকে 'বোরিং' বলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, সে নিজে কত নোংরা, কত নিচু স্তরের লালসায় ডুবে আছে!"

আমি আনিকার হাতটা আমার হাতের মুঠোয় নিলাম। উনার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে একটা কাঁপুনি ছিল। আমি আলতো করে উনার আঙুলগুলোতে চাপ দিলাম, যেন বলতে চাইলাম—আমি এখানে আছি।

"আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম," আনিকা আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন। উনার চোখে এখন এক বন্য, সর্বগ্রাসী জিঘাংসা জ্বলছিল। "অনেক হয়েছে। আমি আর সতী সেজে থাকব না। বেলালের এই বিশ্বাসঘাতকতার দাম আমি আমার একাকিত্ব দিয়ে দেব না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েই ওকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেব। আমাদের এই বিয়ের কোনো মানে নেই। আর যেদিন আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঠিক সেদিন থেকেই আমি তোমাকে পাত্তা দেওয়া শুরু করলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার শরীরটা আমি সেই পুরুষকে দেব, যে আমার রূপের কদর বোঝে, যে আমার এই সুধার স্বাদ নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকে।"

আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার এই কথাগুলো আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, আদিম উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছিল। আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ জেগে উঠছিল। আমি রাশেদ আহমেদ। একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক। সাধারণ জীবন। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, আনিকা নাওহারের এই বন্য রূপের পেছনে কতটা বড় একটা ক্ষত লুকিয়ে আছে। উনি উনার স্বামীর ওই নোংরা বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নিচ্ছেন উনার নিজের শরীর দিয়ে। আর উনার সেই প্রতিশোধের মাধ্যম হিসেবে উনি বেছে নিয়েছেন আমাকে। এই চিন্তাটা আমার মধ্যে একইসাথে গর্ব আর দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলল।

আমি উনার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের ওপর আমার হাত রাখলাম। উনার ত্বকটা ছিল নরম, উষ্ণ। "আনিকা..." আমি খুব নিচু গলায় বললাম।

"হুম?"

"তুমি ঠিকই করেছ। ওই জানোয়ারটার জন্য তোমার এই শরীরটাকে বন্দি করে রাখার কোনো মানেই হয় না। আই অ্যাম উইথ ইউ।"

আনিকা উনার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর এলিয়ে দিলেন। উনার ভেজা চুলের সেই মিষ্টি সুবাস আবার আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। উনার কুর্তির সামনের অংশটা আমার বুকের সাথে লেপ্টে আছে। আমি উনার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলাম, ধীরে ধীরে। লেকের পানি শান্ত হয়ে গেছে। চারপাশে নীরবতা। শুধু দুটো হৃদয়ের ধুকধুক শব্দ।

আনিকা একটা অভিমানী সুরে বললেন, তাহলে এভাবে আমাকে একা রেখে পালাচ্ছ কেন!

মানুষের মনস্তত্ত্ব এক বিশাল গোলকধাঁধা। এই গোলকধাঁধার ভেতরে কখন যে কোন্ অনুভূতির জন্ম হয়, আর কখন যে কোনটা হারিয়ে যায়, তা পৃথিবীর তাবৎ বাঘা বাঘা দার্শনিকরাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

রবীন্দ্র সরোবরের অন্ধকার লেকের পাড়ে বসে আনিকা নাওহারের মুখ থেকে উনার স্বামী বেলাল সাহেবের নোংরা, কদর্য এবং বিকৃত জীবনের গল্প শোনার পর আমার মাথার ভেতরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। আমি ভাবছিলাম, এই যে আমরা বাইরে থেকে মানুষের দামি গাড়ি, ব্র্যান্ডের শার্ট, আর নিখুঁত হাসিমুখ দেখে তাদের জীবনের বিচার করি, তার ভেতরটা আসলে কতটা পচা আর দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে!

মাটির ভাঁড়ের চা ততক্ষণে জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেছে। আমি আনিকার ফর্সা, নরম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব আলতো করে একটু চাপ দিলাম। উনার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা। "আনিকা," আমি খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বললাম, "আমি পালাচ্ছি না। আর তোমাকে পাশ কাটানোর তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আমি আসলে গত এক মাসের এই বিশাল মানসিক রোলারকোস্টার, তোমার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা— সবকিছু মিলিয়ে মানসিকভাবে চরম এলোমেলো হয়ে আছি। আমার মস্তিষ্ক এখন কোনো লজিক্যাল সিগন্যাল প্রসেস করতে পারছে না।"

আনিকা আমার কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ শুনছিলেন। উনার নিঃশ্বাসের একটা মৃদু গরম ভাপ আমার গলার কাছে এসে লাগছিল।

"আমি গ্রামে গেলে হয়তো একটু শান্তি পাব," আমি বলতে থাকলাম। "খোলা বাতাস, বাবা-মায়ের মুখ, আর আমার ওই পুরোনো ঘরটা আমাকে হয়তো আবার স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে। আমি আশা করছি, এর মধ্যে পুলিশ বেলাল সাহেবকে খুঁজে বের করতে পারবে। উনি কোথায় গেছেন, কী হয়েছেন— সেই সত্যিটা সামনে আসা খুব দরকার। একবার এই মেঘটা কেটে গেলে, তারপর আমরা দুজনে খুব শান্ত মাথায় আমাদের ফিউচার নিয়ে ভাবব।আমাদের সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা তখন ঠিক করা যাবে।"

আমি ভেবেছিলাম, আমার এই অত্যন্ত পরিণত, যৌক্তিক এবং দায়িত্বশীল কথাবার্তা শুনে আনিকা হয়তো খুশি হবেন। হয়তো বলবেন— "হ্যাঁ রাশেদ, তুমি ঠিকই বলেছ।"

কিন্তু নারীদের লজিক আর পুরুষদের লজিক কখনো এক সরলরেখায় হাঁটে না। আনিকা হঠাৎ উনার মাথাটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার চোখদুটো লেকের ওই ঘোলাটে অন্ধকারেও অদ্ভুত এক বন্যতায় চকচক করে উঠল। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার কালো শালটা একটু সরিয়ে দিলেন।

"রাশেদ," আনিকা খুব নিচু, কিন্তু কেমন যেন একটা স্যাঁতস্যাঁতে, ভেজা গলায় ফিসফিস করে উঠলেন। "আমি এই কারণেই এই ভারিক্কি আলাপগুলো করতে চাইনি। এসব অতীত, স্বামী, সমাজ, পুলিশ— এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে আমার মাথা ধরে যায়।"

উনি একটু থামলেন। উনার দৃষ্টি আমার ঠোঁট থেকে নেমে আমার কলারবোনের কাছে স্থির হলো। "জানো," আনিকা উনার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে আমার শার্টের বোতামের ওপর একটা অদৃশ্য বৃত্ত আঁকতে আঁকতে বললেন, "এইসব সিরিয়াস আলাপ করতে গিয়ে আমার শরীরের ভেতরে কেমন যেন করছে। আমার শরীরে রসে টানছে রাশেদ। আমার পুরো শরীরটা তোমার একটুখানি আদরের জন্য নিশপিশ করছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।"

আনিকার কথাগুলো শোনার পর আমার বুকের ভেতর যেন এক হাজার ওয়াটের একটা জেনারেটর স্টার্ট নিল। আমি ঢোঁক গিলে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।

"আনিকা... প্লিজ," আমি একটু নার্ভাস গলায় বললাম। "এটা আসলে আমাদের দুজনের জন্যই একটা পরীক্ষা। আমাদের আপাতত কিছুদিন আলাদা থাকার পরীক্ষা দিতে হবে। এই দূরত্বটা আমাদের সম্পর্কটাকে হয়তো আরও স্ট্রং করবে।"

আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে আমার দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলেন। উনার স্তনযুগলের সেই ভরাট, মোহনীয় স্ফীতিটা আমার বাহুর সাথে হালকা ঘষা খেল। "পরীক্ষা দেব। অবশ্যই পরীক্ষা দেব," আনিকা একটা ঘাতক হাসি দিয়ে বললেন। "কিন্তু আজকের পর থেকে পরীক্ষা দিই না! আজকে, এই মুহূর্তে আমাকে একটু আদর করো রাশেদ। প্লিজ।"

"আরে, কী বলছ এসব!" আমি প্রায় আঁতকে ওঠার ভান করলাম। "আমি একটু পরে গাড়িতে উঠব। আমার সাড়ে আটটায় পান্থপথ থেকে নওগাঁর বাস। টিকিট কাটা হয়ে গেছে। আমি এখন তোমাকে আদর করতে যাব কীভাবে?"

আনিকা উনার হাত দিয়ে আমার শার্টের কলারটা খামচে ধরলেন। "চুলোয় যাক তোমার গাড়ি! চুলোয় যাক তোমার পান্থপথ!" আনিকা প্রায় হিসহিস করে উঠলেন। "সকালের গাড়িতে যাবে। কী সমস্যা? একটা টিকিটের টাকাই তো নষ্ট হবে। ওই টিকিটের ডাবল টাকা আমি তোমাকে এখনই গুগল পে-তে ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। প্লিজ রাশেদ... আজ রাতে আমাকে একটু আদর করো। প্লিজ!"

উনার গলার স্বরে এখন আর কোনো জেদ নেই, আছে একটা তীব্র, অসহায় হাহাকার। "এই গত কয়েকদিনের ব্যস্ততা, পুলিশের জেরা, বেলালের নিখোঁজ হওয়া— এই সাসপেন্স আর টেনশন আমি আর নিতে পারছি না রাশেদ। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার মনে হচ্ছে আমার ব্রেনের শিরাগুলো ছিঁড়ে যাবে। তুমি যদি আজ রাতে আমাকে একটু আদর করো, তোমার ওই শক্ত বাহুর বাঁধনে যদি আমাকে একটু পিষে ফেলো, তাহলে আমি হয়তো সব কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকতে পারব। আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে একটু মুক্তি দাও।"

উনার এই কাতর অনুনয় শোনার পর আমার ভেতরের সেই পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের 'ভদ্রলোক' সত্তাটা আর টিকতে পারল না। আমি নিজেও তো ভেতরে ভেতরে এই শরীরটার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিলাম। "আরে, সে না হয় বুঝলাম," আমি একটু নরম হয়ে, প্র্যাকটিক্যাল পয়েন্টে ফিরে এলাম। "কিন্তু এখন জায়গা পাব কোথায়? আমরা যাব কোথায়?"

"কেন? আমার বাসায় চলো!" আনিকা সাথে সাথে বললেন।

"পাগল হয়েছ!" আমি চোখ কপালে তুলে বললাম। "তোমার বাসায় তো এখন পুলিশের পাহারা থাকার কথা। তোমার স্বামী নিখোঁজ। কে জানে, হয়তো সাদা পোশাকে গোয়েন্দারা তোমার ফ্ল্যাটের নিচে নজর রাখছে। তুমি কোথায় যাচ্ছ, কার সাথে মিশছ— সব হয়তো তারা নোট করছে। আমি যদি এখন তোমার সাথে তোমার ফ্ল্যাটে ঢুকি, কাল সকালেই আমাকে ডিবি অফিসে উল্টো করে ঝুলিয়ে জেরা করবে। আমি পুলিশকে ভয় পাই আনিকা।"

আনিকা একটু বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকালেন। "তাতে কী যায় আসে! আমি কি তোমাকে লুকাতে চাই? আমি কি আমার প্রেমিকের আদরের অধিকার রাখি না? পুলিশ জানলে জানবে। আমরা তো কোনো খুন করিনি!"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। "আরে আনিকা, সেটা তো তুমি আর আমি বুঝি। আমাদের প্রেম হয়তো আমাদের কাছে পবিত্র, আমরা হয়তো কোনো আইনি অন্যায় করছি না। কিন্তু সমাজ তো এভাবে দেখে না! পুলিশ তো এটাকে 'পবিত্র প্রেম' বলবে না, তারা এটাকে বলবে 'পরকীয়ার জেরে স্বামীকে গুম'। খামোখা একটা জঘন্য স্ক্যান্ডাল হবে। তোমার আর আমার— দুজনেরই সম্মান রাস্তায় লুটোপুটি খাবে।"

আনিকা বুঝতে পারলেন আমার লজিকটা অকাট্য। উনি একটু দমে গেলেন। "তাহলে চলো কোনো হোটেলে যাই। ফাইভ স্টার কোনো হোটেলে চেক-ইন করি," আনিকা বিকল্প প্রস্তাব দিলেন।

"হোটেল? ঢাকা শহরের হোটেলে কোনো ব্যাগেজ ছাড়া, একজন বিবাহিত নারী আর একজন অবিবাহিত পুরুষ গিয়ে বলবে আমাদের একটা রুম দেন? রিসিপশনিস্ট তো আমাদের আওয়ার-বেসিসে আসা কাস্টমার ভাববে! তাছাড়া এনআইডি কার্ড স্ক্যান করার ঝামেলা আছে।"

"তাহলে তোমার মেসে চলো! তোমার রুমমেটদের দশ হাজার টাকা দিয়ে বলব আজ রাতে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে!" আনিকার পাগলামি যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।

আমি হেসে ফেললাম। "আমার মেস! আনিকা, আমার মেসে রাজু নামের যে ছেলেটা থাকে, সে এখন বাংলাদেশ বিষয়াবলি মুখস্থ করছে। আমি যদি তোমাকে নিয়ে মেসে ঢুকি, সে হয়তো মনে করবে আমি বিসিএস ভাইভার কোনো নারী অধিকার বিষয়ক প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে এসেছি! মেসে সম্ভব না।"

"তাহলে ঢাকার বাইরে চলো। গাজীপুর বা পূর্বাচলের কোনো রিসোর্টে।"

"ওখানে যেতে যেতেই রাত বারোটা বাজবে। কাল সকালে আবার আমাকে গ্রামের বাসে উঠতে হবে। সেটাও প্র্যাকটিক্যাল না।"

আনিকা হতাশ হয়ে বেঞ্চের ওপর হেলান দিয়ে বসলেন। উনার মুখটা কালো হয়ে গেল। আমি চুপচাপ সিগারেটের শেষ অংশটুকু টানছিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন একটা ডিরেক্টরের মতো নানা সিনারিও প্লে হচ্ছে। কোথায় যাওয়া যায়? এমন কোনো জায়গা, যেখানে কোনো পুলিশের নজরদারি নেই, কোনো এনআইডির ঝামেলা নেই, অথচ একটা বিলাসবহুল, চলন্ত, রোমান্টিক বিছানা পাওয়া যাবে?

হঠাৎ করে আমার মাথার ভেতর একটা বিদ্যুতের মতো আইডিয়া খেলে গেল। আমি আনিকার দিকে ঘুরে বসলাম। আমার চোখে একটা বুনো, অ্যাডভেঞ্চারাস ঝিলিক। "আনিকা... একটা আইডিয়া আছে," আমি খুব নিচু, রহস্যময় গলায় বললাম।

"কী আইডিয়া?" আনিকা একটু সোজা হয়ে বসলেন।

"একটু রিস্কি, একটু আনপ্রেডিক্টেবল। কিন্তু দারুণ মজা হবে। এমন একটা অ্যাডভেঞ্চার, যা তুমি হয়তো জীবনেও করোনি।"

"কী সেটা? বলো না!" আনিকা অধৈর্য হয়ে আমার হাত চেপে ধরলেন।

আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম, "চলো, বরিশাল যাই!"

"বরিশাল!" আনিকার চোখ দুটো আক্ষরিক অর্থেই রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেল। "বরিশাল মানে? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?"

"একদম পাগল হইনি। খুব ঠান্ডা মাথায় বলছি," আমি আমার প্ল্যানটা ছকতে শুরু করলাম। "আমরা সদরঘাট যাব। সেখান থেকে বরিশালগামী কোনো একটা বিলাসবহুল লঞ্চের টিকিট কাটব। ধরো 'এমভি মানামি' বা 'সুন্দরবন'-এর মতো কোনো লঞ্চ। লঞ্চের একদম টপ ফ্লোরে একটা ডিলাক্স সুইট বা ভিআইপি কেবিন নেব। রাত আটটা বা নয়টায় লঞ্চ ছাড়বে।"

আমি আনিকার মুখের দিকে তাকালাম। উনার চোখের সেই হতাশা কেটে গিয়ে সেখানে এখন একটা তীব্র, বন্য রোমাঞ্চের ছায়া। "আমরা কেবিনের দরজা ভেতর থেকে লক করে দেব," আমি ফিসফিস করে বলতে লাগলাম। "লঞ্চ চলবে বুড়িগঙ্গা, মেঘনা আর কীর্তনখোলার বুক চিরে। নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস, লঞ্চের ইঞ্জিনের সেই মৃদু ভাইব্রেশন, আর বিশাল একটা বিছানা। আমি সদরঘাট থেকে শুরু করে বরিশাল পৌঁছানো পর্যন্ত সারা রাত ধরে তোমাকে আদর করব। তোমার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি আমার জিভ দিয়ে ছুঁয়ে দেব।"

আনিকার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করেছে। উনার বুকটা ওঠানামা করছে। "তারপর?" উনি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলেন।

"তারপর সকালে বরিশাল নেমে আমরা কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে ঘুরব। ব্রেকফাস্ট করব। তারপর দিনের বেলায় যে লঞ্চটা ঢাকার দিকে ব্যাক করে, আমরা সেটার আরেকটা ভিআইপি কেবিন নেব। বরিশাল থেকে ঢাকা ফেরার পুরোটা পথ, আমি আবারও তোমাকে আমার বাহুডোরে আটকে রাখব। তোমাকে আদর করতে করতে আমি আবার ঢাকায় ফিরব। বিকেলে তোমাকে ঢাকায় নামিয়ে দিয়ে, আমি রাতের বাসে সোজা নওগাঁ চলে যাব।"

আমার এই মাস্টারপ্ল্যান শোনার পর আনিকা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলেন না। উনার মুখটা হাঁ হয়ে আছে। "মাই গড রাশেদ!" আনিকা হঠাৎ একটা চাপা, বন্য আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। "তুমি সত্যি বলছ? এমন করা যাবে? এটা তো একটা আস্ত মুভির প্লট! নদীর বুকে, ভাসমান একটা রুমে সারা রাত... ওহ গড! আমার এখনই শরীর কাঁপছে।"

"অবশ্যই করা যাবে," আমি একটা কনফিডেন্ট হাসি দিলাম। "চল দেখি, কতদূর কী হয়।"

আমাদের প্ল্যান খুব দ্রুত সেট হয়ে গেল।

"আমরা একসাথে সদরঘাট যাব না," আমি গোয়েন্দাদের মতো নির্দেশ দিতে শুরু করলাম। "তুমি এখান থেকে একটা উবার নিয়ে সোজা সদরঘাট চলে যাবে। আমি যাব আরেকটা বাহনে। আমরা লঞ্চ ঘাটে গিয়ে মিট করব। তারপর একসাথে উঠে সোজা আমাদের সুইটে ঢুকে যাব।"

আনিকা একটু চিন্তিত মুখে বললেন, "কিন্তু রাশেদ, লঞ্চের বুকিংয়ের সময় যদি আমাদের পরিচয় জানতে চায়? আমরা কী পরিচয় দেব? স্বামী-স্ত্রী?"

আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। "স্বামী-স্ত্রী! আরে দূর! কী বলছ তুমি? তুমি কি আয়নায় নিজেকে দেখেছ? তোমার মতো এমন একজন আভিজাত্যে মোড়ানো, হাই-ক্লাস, বিলিয়নিয়ার নারীর সাথে আমার মতো একটা পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে ছেলেকে দেখে কেউ জীবনেও স্বামী-স্ত্রী ভাববে না। বাংলাদেশের মানুষ এত বোকা না। তারা ভাববে আমি হয়তো কোনো পালিত প্রেমিক বা গিগলো, যে বড়লোকের বউ ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!"

আনিকা আমার কথায় শব্দ করে হেসে ফেললেন। "খুব ফাজিল হয়েছ তুমি! তাহলে কী বলবে?"

"সেটা আর তোমার জানা লাগবে না," আমি চোখ টিপে বললাম। "তুমি লঞ্চে ওঠার পর ওই আইডিয়া আমি ম্যানেজ করে নেব। তুমি শুধু একটা কাজ করবে।"

"কী?"

"তুমি এখন সোজা তোমার ধানমন্ডির বাসায় যাও। খুব দ্রুত একটা ফ্রেশ শাওয়ার নাও। তারপর একদম সাধারণ, ক্যাজুয়াল একটা বাঙালি পোশাক পরো। একটা সিম্পল সালোয়ার কামিজ। কোনো দামি গয়না বা মেকআপ না। আর হ্যাঁ, সাথে কোনো লাগেজ, ভ্যানিটি ব্যাগ বা ট্রলি কিচ্ছু নেবে না।"

"লাগেজ নেব না? কিন্তু আমার তো কিছু চেঞ্জিং ক্লথস বা দরকারি জিনিস লাগবে!" আনিকা অবাক হয়ে বললেন।

আমি খুব সিরিয়াস গলায় বললাম, "একদম না আনিকা। তোমার বাসার নিচে হয়তো পুলিশের সোর্স দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তারা যদি দেখে যে বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পর তুমি হাতে লাগেজ বা ট্রলি নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছ, তারা সাথে সাথে সন্দেহ করবে যে তুমি পালাচ্ছ। তখন গোপনে তোমার পিছু নিতে পারে।  তুমি জাস্ট খালি হাতে, একটা ছোট পার্স নিয়ে বের হবে। যেন তুমি জাস্ট নিচে কোনো সুপারশপে বা একটু হাঁটতে বের হয়েছ। পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার এটাই একমাত্র পথ।"

আনিকা মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

"কিন্তু আমার কাপড়চোপড়? ব্রাশ? তোয়ালে?"

আমি উনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে উনার কানের খুব কাছে ফিসফিস করে বললাম, "আমার ট্রাভেল ব্যাগে তোয়ালে, ব্রাশ, সব আছে। আর কাপড়ের কথা বলছ? আনিকা, একবার লঞ্চের ওই ভিআইপি সুইটে ঢুকে দরজাটা লক করার পর... তোমার আর কোনো কাপড়ের দরকার হবে না। পুরো বরিশাল ট্রিপে তোমাকে কোনো কাপড় পরতেই হবে না। আমিই তোমার কাপড়।"

কথাটা শোনার পর আনিকার সারা শরীরটা একটা প্রবল শিহরণে কেঁপে উঠল। উনার চোখের মণি দুটো কামনায় কালো হয়ে গেল। "তুমি সত্যিই একটা জাদুকর রাশেদ," আনিকা একটা চাপা, ভেজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।

"আর কোনো কথা না," আমি উঠে দাঁড়ালাম। "প্ল্যান অনুযায়ী কাজ শুরু করো। তুমি বাসায় যাও, ফ্রেশ হয়ে সদরঘাটের জন্য উবার নাও। আর আমি এখান থেকে ডিরেক্ট সদরঘাট চলে যাচ্ছি লঞ্চের টিকিট ম্যানেজ করতে।"

আনিকাও উঠে দাঁড়ালেন। উনার চোখে এখন একটা বন্য, আদিম রোমাঞ্চের নেশা। আমি আমার ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রিকসার খোঁজে মোড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, আর আনিকা উনার ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের দিকে।

আমাদের সামনে এখন বুড়িগঙ্গার কালো জল, একটা ভাসমান বিলাসবহুল কেবিন, আর একটা অনন্ত কামনার রাত অপেক্ষা করছে। আমি জানি না এই অ্যাডভেঞ্চারের শেষ কোথায়, কিন্তু এই মুহূর্তের রোমাঞ্চটা পৃথিবীর যেকোনো থ্রিলার মুভিকে হার মানানোর জন্য যথেষ্ট।
Reply
#39

৩৯



সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ঢাকা শহরের এই একটা জায়গায় এলে আমার সবসময় মনে হয়, আমি যেন টাইম মেশিনে চড়ে কয়েক শতাব্দী পেছনের কোনো এক ব্যস্ত, কোলাহলময় এবং ধুলোমাখা বন্দরে এসে উপস্থিত হয়েছি। বাতাসে ডিজেল পোড়া উৎকট গন্ধ, বুড়িগঙ্গার কালো পানির স্যাঁতস্যাঁতে আঁশটে ঘ্রাণ, কুলিদের হাঁকডাক, আর হাজার হাজার মানুষের গাদাগাদি ভিড়। এখানে সবাই দৌড়াচ্ছে, সবারই যেন চরম তাড়া। এই কোলাহলের ভেতরে দাঁড়ালে মানুষের নিজের অস্তিত্বটাকে খুব তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র মনে হয়।

আমি ভিড় ঠেলে এমভি সুন্দরবন লঞ্চের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘড়িতে তখন রাত দশটা বাজে। কাউন্টারে বসা লোকটার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পানের পিকে দাঁত লাল হয়ে আছে, আর কপালের ওপর দিয়ে একটা বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। সারাদিন হাজার হাজার মানুষের নানা রকম আবদার শুনতে শুনতে এই লোকগুলোর ইমোশন বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

"ভাই, একটা ডিলাক্স সুইট লাগবে। ভিআইপি কেবিন," আমি গলাটা একটু চড়িয়ে বললাম, যাতে মাইকের আওয়াজ আর কোলাহলের ভেতর দিয়ে আমার কথা উনার কান পর্যন্ত পৌঁছায়।

লোকটা এক সেকেন্ডের জন্য আমার দিকে তাকাল। আমার পরনে ক্যাজুয়াল শার্ট আর জিন্স। আমাকে দেখে খুব একটা ভিআইপি মনে হওয়ার কথা না, কিন্তু কাউন্টারের লোকজনের চোখ টাকার গন্ধ ঠিকই চেনে।

"কয়জন যাবেন?" লোকটা একটা টিকিট বই টেনে নিয়ে রসহীন গলায় জিজ্ঞেস করল।

"আমি আর আমার বড় বোন," আমি খুব স্বাভাবিক, অত্যন্ত নির্লিপ্ত একটা মুখ করে মিথ্যা কথাটা বলে দিলাম। বাংলাদেশে যেকোনো জায়গায় একজন নারী আর একজন পুরুষ একসাথে গেলে, তাদের সম্পর্ক যদি স্বামী-স্ত্রী না হয়, তবে ‘ভাই-বোন’ হলো সবচেয়ে নিরাপদ এবং সর্বজনীন একটা রক্ষাকবচ।

লোকটা কলমের মুখ খুলে টিকিটে কিছু একটা লিখতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল।

"ভাই-বোন যাইবেন? তাইলে দুইটা সিঙ্গেল বেডের সুইট দিয়া দিই? আমাগো ডিলাক্স টুইন বেডের কেবিন আছে, খুব ভিআইপি। ভাই-বোন আরামে ঘুমাইতে পারবেন," লোকটা খুব হেল্পফুল একটা চেহারা করে প্রস্তাব দিল।

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। টুইন বেড! দুইটা আলাদা বিছানা! আনিকা নাওহারের মতো একজন অপ্সরী নারীকে নিয়ে আমি মাঝনদীতে ভাসব, আর আমরা দুজন দুই বিছানায় ঘুমাব? এর চেয়ে তো আমার ওই মিরপুরের মেসে গিয়ে তুহিনের সাথে ঘুমানো ভালো ছিল!

"না ভাই, টুইন বেড লাগবে না," আমি খুব দ্রুত, কিন্তু একটু বেশিই সিরিয়াস গলায় বললাম। "আপনি আমাকে একটা ডাবল বেডের সুইটই দেন। একটাই বিশাল বিছানা থাকবে, এমন কেবিন দেন।"

কথাটা শোনার পর কাউন্টারের লোকটার কলম থেমে গেল। সে তার পান-খাওয়া লাল দাঁতগুলো বের করা বন্ধ করে, চোখ জোড়া সরু করে আমার দিকে তাকাল। উনার দৃষ্টিতে এমন একটা অদ্ভুত, সন্দেহজনক এবং ‘সব বুঝি ব্যাটা’ টাইপের একটা লুক ছিল, যা দেখলে যেকোনো সাধারণ মানুষের ঘাম ছুটে যাওয়ার কথা। ভাই-বোন একসাথে যাবে, অথচ ডাবল বেডের একটা বিছানাতেই থাকবে— এই লজিকটা পৃথিবীর কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হজম করবে না, আর সদরঘাটের কাউন্টারের পাকা লোক তো নয়ই!

আমি বুঝতে পারলাম, আমি একটা লজিক্যাল গর্তে পা দিয়ে ফেলেছি। এটাকে এখনই সামাল দিতে হবে। "আরে ভাই, সমস্যা তো বিছানা নিয়ে না!" আমি আমার অনুবাদক মস্তিষ্কের সমস্ত ক্রিয়েটিভিটি কাজে লাগিয়ে খুব ক্যাজুয়াল একটা হাসি দিয়ে বললাম। "আমার বড় বোন একটু অসুস্থ, সে সুইটের ওই ডাবল বেডে আরাম করে সারা রাত ঘুমাবে। আমি তো আর কেবিনের ভেতর থাকব না! আমি সারা রাত লঞ্চের ডেকে ঘুরে বেড়াব। নদীর বাতাস খাব, আকাশের তারা দেখব। আমার তো আর বিছানা লাগবে না। আপনি ডাবল বেডের সুইটটাই দেন, যাতে আমার বোনের ঘুমাতে কোনো কষ্ট না হয়।"

আমার এই অকাট্য, আত্মত্যাগী এবং চরম কাব্যিক যুক্তি শুনে কাউন্টারের লোকটার চোখের সেই অদ্ভুত দৃষ্টিটা গেল না। সে হয়তো মনে মনে ভাবল, ‘শালা, ঢাকা শহরের মানুষগুলোর ভেতরে ভেতরে এত ফিকির! নদীর বাতাস খাবে না ছাই খাবে, সেটা তো কেবিনের দরজা বন্ধ হলেই বোঝা যাবে।’

কিন্তু লঞ্চের কাউন্টারের লোকজনের একটা ভালো গুণ হলো, তারা টাকার বিনিময়ে টিকিট বেচে, নীতিবাক্য বেচে না। আপনি আপনার বোনের সাথে ডাবল বেডে ঘুমান নাকি নদীর বাতাস খান, তাতে তাদের কোম্পানির কোনো লোকসান নেই।

"আইচ্ছা ভাই, যা ভালো বোঝেন। এই নেন, তিন তলার ডাবল বেডের ভিআইপি সুইট," লোকটা টিকিটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।

আমি টাকা মিটিয়ে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক, প্রথম ধাপ পার হওয়া গেল।

লঞ্চ ছাড়বে রাত বারোটায়। এখন বাজে ঠিক দশটা। আরও পাক্কা দুই ঘণ্টার অপেক্ষা।

আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে আনিকার সেই বেনামি নাম্বারে ডায়াল করলাম।

"হ্যালো, আনিকা? আমি কিন্তু লঞ্চের টিকিট কেটে ফেলেছি। তুমি কোথায়?"

"এই তো রাশেদ, আমি বের হয়ে গেছি। উবারে উঠেছি জাস্ট। রাস্তা তো অনেকটা ফাঁকা এখন। আমি আধা ঘণ্টার মধ্যেই সদরঘাট পৌঁছে যাব," আনিকা খুব শান্ত গলায় বললেন।

"ঠিক আছে, তুমি সাবধানে এসো। আমি মেইন টার্মিনালের গেটের কাছেই আছি।"

ফোন রেখে আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেটটা বের করলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে টার্মিনালের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

আধা ঘণ্টা!

নারীদের ডিকশনারিতে 'আধা ঘণ্টা' শব্দটার কোনো নির্দিষ্ট আভিধানিক অর্থ নেই। এটা একটা আপেক্ষিক সময়। এই আধা ঘণ্টা মানে চল্লিশ মিনিট হতে পারে, এক ঘণ্টাও হতে পারে। আনিকার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না।

আমি টার্মিনালে দাঁড়িয়ে একটা, দুটো, তিনটে করে সিগারেট শেষ করলাম। চারপাশের কোলাহল দেখছি। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি, কুলিদের মাথায় বিশাল বিশাল মালের বস্তা। লঞ্চের সাইরেনের শব্দে মাঝেমধ্যেই কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।

ঠিক এগারোটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে আমার ফোন বেজে উঠল। "রাশেদ, আমি টার্মিনালের মেইন গেটের একটু আগে জ্যামে আটকে আছি। তুমি একটু এদিকে এগিয়ে আসবে?"

আমি ভিড় ঠেলে দ্রুত গেটের দিকে এগোলাম। গেটের বাইরে উবারের একটা সাদা গাড়ি থেকে আনিকা নাওহার নামলেন। উনাকে রিসিভ করতে গিয়ে আমি আক্ষরিক অর্থেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য রাস্তার মাঝখানে পাথরের মতো জমে গেলাম।

আমি উনাকে বলেছিলাম, একদম সাধারণ, ক্যাজুয়াল একটা বাঙালি পোশাক পরে আসতে। কোনো মেকআপ বা ভারী গয়না ছাড়া। উনি আমার কথা রেখেছেন। কিন্তু এই 'সাধারণ' পোশাকের ভেতরেও যে একজন নারী এতটা ভয়ংকর, এতটা লাস্যময়ী এবং এতটা ঐশ্বরিক রূপ ধারণ করতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল।

আনিকার পরনে আজ একটা কুচকুচে কালো রঙের সুতির কামিজ। কামিজটা খুব একটা লম্বা নয়, ঠিক হাঁটু অব্দি এসে শেষ হয়েছে। আর তার নিচে একটা ধবধবে সাদা রঙের পালাজ্জো বা সালোয়ার। কামিজের হাতা থ্রি-কোয়ার্টার। উনার ফর্সা, মসৃণ গলার ওপর দিয়ে একটা সাদা রঙের সুতির ওড়না খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে মাথার ওপর দিয়ে পেঁচানো। চোখের ওপর একটা কালো ফ্রেমের চশমা, যেটা উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত, বুদ্ধিবৃত্তিক অথচ চরম দুষ্টু একটা লুক এনে দিয়েছে।

মাথায় ওড়না থাকা সত্ত্বেও উনার সেই ঘন, কালো, অবাধ্য চুলগুলোকে আটকে রাখা যায়নি। চুলগুলো ওড়নার ফাঁক দিয়ে পাহাড়ের চূড়ার মতো উঁকি দিচ্ছে, আর কিছু চুল ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনের দিকে লুটিয়ে পড়েছে।

আমি মুগ্ধ, তৃষ্ণার্ত এবং বন্য এক দৃষ্টি নিয়ে উনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করতে লাগলাম। এই সাধারণ কালো কামিজটা উনার শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির কোনো কিছুই আর গোপন নেই। উনার ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল কালো কাপড়ের বাঁধন ছিঁড়ে যেন বিদ্রোহ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওড়নাটা উনার বুকের ওপর দিয়ে গেলেও, সেই স্ফীতিকে লুকানোর ক্ষমতা ওই পাতলা কাপড়ের ছিল না।

উনার মুখটা আজ একদম ফ্রেশ। কোনো মেকআপ নেই। কিন্তু ওই মেকআপহীন ফর্সা ত্বক, চশমার কাঁচের পেছন থেকে উঁকি দেওয়া ওই মায়াবী বাদামি চোখ, আর ন্যাচারাল লালচে ঠোঁট দুটো আমাকে যেন চুম্বকের মতো টানছিল।

উনার সরু কোমর থেকে শুরু করে নিতম্বের সেই অবিশ্বাস্য ঢালটা কালো কামিজের নিচে একটা নিখুঁত ঢেউয়ের মতো নেমে গেছে। আর সাদা রঙের সালোয়ারটা উনার ভরাট, সুডৌল উরু এবং পা গুলোকে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত উনার প্রতিটি মুভমেন্ট আমার বুকের ভেতর একটা করে হাতুড়ির বাড়ি মারছিল।

সদরঘাটের এই ধুলোমাখা, ঘামে ভেজা, বিশৃঙ্খল পরিবেশের মাঝখানে আনিকা নাওহারকে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক ভিনগ্রহের অপ্সরী ভুল করে এই মর্ত্যে নেমে এসেছে। "কী দেখছ অমন করে?" আনিকা আমার কাছে এসে উনার সেই ঘাতক হাসিটা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন।

আমি একটা বড়সড় ঢোঁক গিলে বললাম, "দেখছি, সাধারণ পোশাকে একটা মানুষ কতটা অসাধারণ হতে পারে। তোমাকে তো এখন আর লন্ডন প্রবাসী সিইও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ঢাকা ভার্সিটির কোনো এক মিষ্টি, দুষ্টু ছাত্রী।"

আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "তাই নাকি? চলো, তোমার ওই মিষ্টি ছাত্রীকে নিয়ে এখন লঞ্চে চলো।"

রাত এগারোটা বেজে গেছে। এই সময়টা লঞ্চগুলোতে যাত্রী ওঠার সবচেয়ে পিক আওয়ার। চারদিকে প্রচণ্ড ভিড়। মানুষজন তাদের মালপত্র, বাক্স-পেটরা নিয়ে ঠেলাঠেলি করে লঞ্চে উঠছে। আমি আনিকার একটা হাত শক্ত করে ধরে ভিড় ঠেলে এমভি সুন্দরবন-এর দিকে এগোতে লাগলাম।

এত মানুষের ভিড়ে কেউ আলাদা করে আমাদের দিকে খেয়াল করছে না। সবারই নিজের মালপত্র আর কেবিন খোঁজার তাড়া। কিন্তু যদি কেউ এক মুহূর্তের জন্য থেমে আমাদের দিকে তাকাত, তাহলে সে হয়তো অবাক বিস্ময়ে দেখত যে, এই নোংরা কোলাহলের ভেতর দিয়ে কী অপূর্ব এক নারী তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

আমরা লঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে সোজা তিন তলায় উঠে গেলাম। তিন তলায় মূলত ভিআইপি এবং ডিলাক্স সুইটগুলো অবস্থিত। আমাদের সুইটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা প্রশান্তির হাওয়া আমাদের গায়ে এসে লাগল। সুইটটা বেশ বড়। মাঝখানে একটা বিশাল ডাবল বেড, সাদা ধবধবে চাদর বিছানো। একপাশে একটা সোফা, একটা ছোট কফি টেবিল। অ্যাটাচড বাথরুম, আর একটা বিশাল কাঁচের জানালা, যেখান থেকে বাইরের নদী আর আকাশ দেখা যায়। এসি আগে থেকেই চলছিল, তাই ভেতরের পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা আর আরামদায়ক।

আনিকা ভেতরে ঢুকেই একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার মাথার ওড়নাটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেললেন। উনার চুলগুলো মুক্ত হয়ে উনার পিঠের ওপর আছড়ে পড়ল। আমি দরজার লকটা ভেতর থেকে আটকে দিলাম।

"তুমি বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নাও আনিকা," আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম। "আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। পুরো লঞ্চের সিচুয়েশনটা একটু দেখে আসি। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসব।"

আনিকা উনার চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন, "ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু। আমাকে বেশিক্ষণ একা ফেলে রেখো না।" উনার কথার ভেতরে সেই চেনা, আদিম ইঙ্গিতটা খুব স্পষ্ট। আমি মুচকি হেসে সুইট থেকে বেরিয়ে এলাম।

লঞ্চের ভেতরে ঘোরাঘুরি করাটা আমার একটা পুরোনো শখ। আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের সাব-এডিটর হলেও, দেশি খবরগুলো আমার চোখের সামনে দিয়েই যায়। বিশেষ করে এই এমভি সুন্দরবন-১৬ লঞ্চটা নিয়ে গত কয়েকদিন পত্রপত্রিকায় বেশ আলোচনা হচ্ছিল।

আমি তিন তলার ডেক থেকে নিচে তাকালাম। লঞ্চের ভেতরে এক অদ্ভুত জৌলুস আর আভিজাত্য। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রী সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। বাসেই এখন খুব সহজে মানুষ বরিশাল চলে যায়। লঞ্চের ব্যবসায় চরম মন্দা যাচ্ছিল। এর ওপর দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পুরো নৌ-ব্যবসা একটা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। বড় বড় লঞ্চ মালিকরা তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, লঞ্চের যুগ হয়তো শেষ।

কিন্তু এত ঝুঁকি, এত অনিশ্চয়তা আর হতাশার মধ্যেও বরিশাল-ঢাকা নৌপথে যুক্ত হয়েছে এই বিশাল দানব— সুন্দরবন-১৬। সাংবাদিক হিসেবে আমি খবর রাখি। গত বুধবার বিকেলেই এই লঞ্চটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ নিজে এই লঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। লঞ্চটির মালিকপক্ষ সেদিন বুক ফুলিয়ে দাবি করেছিল, এই লঞ্চে আধুনিক সাজসজ্জা, নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এমন সব ব্যবহার হয়েছে, যা এর আগে বাংলাদেশের কোনো লঞ্চে দেখা যায়নি।

আমি তিন তলার ব্যালকনি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের বিশালত্বটা অনুভব করার চেষ্টা করলাম। কী নেই এখানে! পুরো লঞ্চটা সম্পূর্ণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লঞ্চে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য রীতিমতো একটা করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) স্থাপন করা হয়েছে! ভাবা যায়? মাঝনদীতে ভাসমান একটা লঞ্চে সিসিইউ! আমি মনে মনে হাসলাম। আমার যদি আজ রাতে আনিকার ওই রূপ আর আদরের চোটে হার্ট অ্যাটাক হয়েও যায়, তাহলেও চিন্তার কিছু নেই। এই লঞ্চেই আমার চিকিৎসা হয়ে যাবে!

ওঠানামার জন্য লঞ্চের ভেতরে সিঁড়ির পাশাপাশি ক্যাপসুল লিফটের ব্যবস্থা আছে। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটা ফ্লোরে, প্রতিটা কর্নারে বসানো আছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা। আছে শিশুদের জন্য বিনোদনের একটা বড় জোন বা প্লে-গ্রাউন্ড, বিশাল একটা ফুডকোর্ট যেখান থেকে কাবাব আর বিরিয়ানির গন্ধ ভেসে আসছে, একটা ফার্মেসি, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, এবং যাত্রীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের সুবিধা।

সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক আবুল কালাম সাহেবের একটা ইন্টারভিউ আমি পড়েছিলাম। তিনি গর্ব করে বলেছিলেন,  তাঁর এই বাহন ৩৬০ ফুট লম্বা একটা ভাসমান শহর! লঞ্চটিতে লোয়ার ডেক আর আপার ডেকের বিশাল জায়গা তো আছেই, তার পাশাপাশি আড়াই শতাধিক প্রথম শ্রেণির কক্ষ (কেবিন), ৬টি অত্যন্ত বিলাসবহুল ভিআইপি সুইট এবং ১০টি সেমি-ভিআইপি কক্ষ আছে। এর মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৩৫০ জন। ১৩৫০ জন মানুষ নিয়ে এই বিশাল দানবটা বুড়িগঙ্গার কালো পানি চিরে কীর্তনখোলার দিকে ছুটে যাবে। আর এই ১৩৫০ জন মানুষের ভিড়ে, ৩ তলার ওই ভিআইপি সুইটটার ভেতরে আমরা দুজন মানুষ রচনা করব আমাদের নিজস্ব একটা স্বর্গ।

লঞ্চের ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, নিচে কুলিরা এখনো মালপত্র তুলছে। লঞ্চের বিশাল সাইরেনটা বেজে উঠল। তার মানে রাত বারোটা বাজতে চলল। লঞ্চ ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে লঞ্চের নিওন আলোগুলো প্রতিফলিত হয়ে একটা অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য তৈরি করেছে। নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস আমার মুখে এসে লাগছে।

আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। আমার বুকের ভেতরকার সেই অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা আবার নতুন করে ক্ষরিত হতে শুরু করেছে। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই ছবি ভাসছে— কালো কামিজ আর সাদা সালোয়ার পরা আনিকা নাওহার।

ওই বন্ধ দরজার ওপাশে উনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। লঞ্চের ডেক থেকে ঘুরে আমি দ্রুত পায়ে তিন তলার ভিআইপি সুইটের দিকে ফিরে চললাম।

লঞ্চের বিশাল ইঞ্জিনটা একটা গম্ভীর 'ভুমমমম...' শব্দ করে স্টার্ট নিয়েছে। পুরো লঞ্চটায় একটা হালকা, রোমাঞ্চকর কম্পন তৈরি হলো। আমার শরীরের ভেতরেও ঠিক একই রকম একটা কম্পন, একটা আদিম ইঞ্জিন স্টার্ট নিয়ে ফেলেছে।

আমি সুইটের দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। দরজা খুললেই শুরু হবে এই ভাসমান শহরের বুকে আমার জীবনের সবচেয়ে বন্য, সবচেয়ে স্মরণীয় এবং সবচেয়ে দীর্ঘ একটা রাত।
Reply
#40

৪০



লঞ্চের বিশাল ইঞ্জিনটার একটা গভীর, গম্ভীর 'ভুমমমম...' শব্দ তিন তলার এই ভিআইপি সুইটের দরজার ফ্রেমে এসেও আছড়ে পড়ছিল। কাঠের দরজায় কান পাতলে সেই স্পন্দন টের পাওয়া যায়। কিন্তু আমার নিজের বুকের ভেতর যে ইঞ্জিনটা তখন এক হাজার গুণ বেশি গতিতে স্টার্ট নিয়েছিল, তার আওয়াজের সামনে বাইরের ওই মেটালিক দানবের শব্দকে একদম তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। আমার হৃৎপিণ্ডটা বুকের পাঁজর চিরে যেন বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছিল।


আমি সুইটের দরজার পিতলের হাতলটায় হাত রেখেছিলাম। একটা দ্বিধা, একটা বুনো উত্তেজনা আর চরম প্রত্যাশা নিয়ে আমি জাস্ট দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাকে আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো না। ভেতর থেকে দরজাটা খুব নিঃশব্দে, কিন্তু চটজলদি ফাঁক হয়ে গেল। আর তার পরের মুহূর্তে যা ঘটল, তার জন্য আমার কোনো মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আনিকা নাওহারের চোখে তখন কোনো দ্বিধা নেই, কোনো ভদ্রতার সামাজিক মুখরোচক আবরণ নেই। সেখানে জ্বলছে এক বিশুদ্ধ, আদিম এবং সর্বগ্রাসী আগ্নেয়গিরি।

উনি আমাকে কোনো কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিলেন না। আমি মুখ খুলে কিছু একটা বলতে গিয়েছিলাম, হয়তো বলতে চেয়েছিলাম— 'আনিকা, বাইরে লোকজন আছে...' অথবা 'তুমি ফ্রেশ হয়েছ?'। কিন্তু আমার সেই উটকো বাক্যগুলো আমার গলার ভেতরেই আটকে রইল।

উনার ডান হাতটা সাপের মতো দ্রুত গতিতে বেরিয়ে এল। উনার ফর্সা, মসৃণ আঙুলগুলো আমার টি-শার্টের নিচের অংশ পেরিয়ে সোজা গিয়ে চেপে ধরল আমার গ্যাবার্ডিন প্যান্ট পরা কোমরের বেল্টের ওপর। উনার হাতের মুঠিটা একটা লোহার ইকেবানা চিমটার মতো শক্ত হয়ে গেল। এবং এক প্রবল, হ্যাঁচকা টানে উনি আমাকে সুইটের ভেতর টেনে ঢুকিয়ে নিলেন।

আমার শরীরের ভারসাম্য হারাল। আমি ভেতরে আছড়ে পড়ার আগেই উনি উনার অন্য হাত দিয়ে কাঠের ভারী দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিলেন।

ক্লিক!

সেই যান্ত্রিক লক হওয়ার শব্দটা এই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল সুইটের নিস্তব্ধতায় একটা চূড়ান্ত সিলমোহরের মতো বাজল। বাইরে বুড়িগঙ্গার কালো পানি, নদীর ওপর থেকে ভেসে আসা পচা ডিজেলের গন্ধ, টার্মিনালের কুলিদের চিৎকার, হকারের হাঁকডাক আর লঞ্চের বিশাল সাইরেন— সবকিছু ওই একটা 'ক্লিক' শব্দে চিরকালের জন্য এই ঘর থেকে নির্বাসিত হয়ে গেল। এখন এই চার দেয়ালের ভেতর, নরম চাদর বিছানো ডাবল বেডের সামনে শুধু আমরা দুজন মানুষ। দুই ভিন্ন মেরুর, ভিন্ন বয়সের, ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের দুজন মানুষ, যাদেরকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে এক অমোঘ, নিষিদ্ধ কামনার সুতো।

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আনিকা উনার পুরো শরীরের সমস্ত ওজন, উনার সমস্ত তৃষ্ণা নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

"আনিকা..." আমি শুধু এইটুকু উচ্চারণ করতে পেরেছিলাম।

কিন্তু উনার গরম, নরম এবং আক্ষরিক অর্থেই ক্ষুধার্ত ঠোঁট দুটো আমার মুখের ওপর এমনভাবে চেপে বসল যে আমার কণ্ঠস্বর উনার মুখের ভেতরের উষ্ণতায় চিরতরে হারিয়ে গেল। উনার এই আক্রমণে কোনো প্রিলিমিনারি রোমান্স ছিল না, কোনো মেকি ন্যাকামি ছিল না। এটা ছিল একটা বন্য পশুর আরেকটা পশুকে গিলে খাওয়ার চেষ্টা। উনি উনার ভেজা, মিষ্টি এবং গরম জিভটা সরাসরি আমার মুখের ভেতর চালান করে দিলেন।

চুমু জিনিসটা বড়ই অদ্ভুত। সমতলে বা সাধারণ জীবনে মানুষ যখন কাউকে চুমু খায়, তখন সেটার পেছনে থাকে একটা হালকা ভালোলাগা বা সামাজিক মায়া। কিন্তু যখন স্থান-কালের সমস্ত সীমানা পেরিয়ে, সমাজ আর আইনের চোখে অপরাধী হয়ে দুজন মানুষ কোনো এক বন্ধ ঘরে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন চুমু হয়ে যায় একে অপরের আত্মাকে শুষে নেওয়ার, একে অপরের অস্তিত্বকে নিজের ভেতরে হরণ করার এক আদিম প্রক্রিয়া।

আনিকার চুমুটা ছিল ঠিক সেরকমই। গভীর, ভেজা, এবং অসহ্য সুন্দর এক চুমু। উনার মুখের ভেতরের সেই মিষ্টি, নোনতা স্বাদ আর উনার লালার উষ্ণতা আমাকে মুহূর্তের মধ্যে এক অবশ করা ঘোরের মধ্যে ঠেলে দিল। আমি আমার দুই হাত বাড়িয়ে উনার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। আমার আঙুলগুলো উনার সালোয়ার কামিজের সুতির কাপড়ের ওপর দিয়ে উনার ফর্সা, মেদহীন কোমরের খাঁজে গিয়ে দেবে গেল। উনার শরীরটা আমার শরীরের সাথে একেবারে সেঁটে গেল। উনার পরনে সেই কালো রঙের সালোয়ার কামিজ। কামিজের ফেব্রিকটা আমার সুতির সাদা টি-শার্টের ওপর দিয়ে ঘষা খাচ্ছিল, আর সেই ঘর্ষণে আমাদের চামড়ার নিচে এক চরম রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল।

সুইটের ভেতরের পরিবেশটা সেকেন্ডের মধ্যে বদলে যেতে লাগল। এসির বাইশ ডিগ্রিতে থাকা ঠান্ডা বাতাসটাকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে আমাদের দুটি নগ্নপ্রায় শরীরের উত্তাপ রাজত্ব কায়েম করল। আনিকার চুলে ঢাকা মাথার সেই সুবাস, উনার গলার কাছে লেগে থাকা শ্যানেল পারফিউমের আভিজাত্যময় ঘ্রাণ, আর সব কিছুর ওপরে উনার শরীর থেকে ছড়ানো সেই স্বাভাবিক, উত্তপ্ত নারীত্বের গন্ধ— সব মিলিয়ে আমার অনুবাদক মস্তিষ্ক পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ল। আমার মনে হলো, পৃথিবীটা হয়তো এখন উল্টো ঘুরতে শুরু করেছে।

আমরা দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েই চুমু খেয়ে যাচ্ছিলাম। উনার হাত দুটো আমার ঘাড় পেরিয়ে মাথার পেছনে চলে গেল। উনার পরিপাটি করে সাজানো ম্যানিকিউর করা আঙুলগুলো আমার মাথার চুলগুলো শক্ত করে খামচে ধরল। উনি আমাকে আরও কাছে, উনার আরও গভীরে টেনে নিতে চাইছিলেন।

আমি উনার পিঠে, উনার মেরুদণ্ডের খাঁজ ধরে হাত বুলাচ্ছিলাম। উনার কালো কামিজের পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়েই আমি উনার অন্তর্বাসের হুক আর স্ট্র্যাপটা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম। উনার সেই ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল আমার বুকের সাথে এতটাই শক্তভাবে চেপে ছিল যে, আমার মনে হচ্ছিল উনার বুক আর আমার বুক এক হয়ে গেছে। উনার হূৎপিণ্ডের দ্রুত ওঠানামা আমি আমার নিজের পাঁজরের ভেতর টের পাচ্ছিলাম।

আমাদের দুজনেরই শ্বাস-প্রশ্বাস এখন এক অনিয়মিত, বুনো ছন্দে বইছে। প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে সাথে বুক ফুলে উঠছে, আবার নেমে যাচ্ছে। অন্ধকার সুইটের দেওয়ালে তখন শুধুই এক ভেজা, চোষার শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছিল।

আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু সরালেন, কিন্তু পুরোপুরি সরালেন না। উনার ফর্সা গাল দুটো তখন কামনার তাপে ঈষৎ লাল হয়ে উঠেছে। উনি উনার দাঁত দিয়ে আমার নিচের ঠোঁটটা খুব আলতো করে, অথচ একটা তীক্ষ্ণ ব্যথার অনুভূতি দিয়ে কামড়ে ধরলেন।

"উমমম..." আমার মুখ দিয়ে একটা চাপা শব্দ বের হলো।

"চুপ..." আনিকা উনার চোখের মণি দুটো আমার চোখের একদম কাছাকাছি এনে ফিসফিস করে বললেন। উনার নিশ্বাসের গরম হাওয়া আমার ঠোঁটে আছড়ে পড়ছিল। "আজ কোনো কথা বলবে না রাশেদ। আজ শুধুই খেলা।"

কথাটা বলেই উনি আবার উনার জিভটা আমার মুখের ভেতর পুরে দিলেন। আমি উনার জিভটাকে আমার ঠোঁট দিয়ে চুষতে লাগলাম। উনার শরীরটা আমার বাহুডোরে একটা কলার পাতার মতো থরথর করে কাঁপছিল। আমার শরীরও কাঁপছিল এক অজানা, প্রলয়ঙ্করী উত্তেজনায়।

ধীরে ধীরে আনিকার হাত আমার মাথার চুল থেকে নেমে এল আমার টি-শার্টের নিচের বর্ডারের ওপর। উনার আঙুলগুলো খুব অস্থিরভাবে আমার টি-শার্টের কাপড়টা ধরে ওপরের দিকে টানতে লাগল।

"এটা খোলো..." উনি চুমুর ফাঁকেই একটা হাঁপানো, ভেজা গলায় নির্দেশ দিলেন। "আমার তোমার এই কাপড়ের বাধা সহ্য হচ্ছে না।"

আমি উনাকে সাহায্য করলাম। উনি দুই হাতে আমার টি-শার্টটা টেনে এক ঝটকায় আমার মাথার ওপর দিয়ে খুলে ফেললেন। শার্টটা ফ্লোরে একটা অর্থহীন কাপড়ের টুকরোর মতো খসে পড়ল।

আমার খালি বুকটা সুইটের আবছা আলোয় উন্মুক্ত হয়ে গেল। আনিকা এক সেকেন্ডের জন্য থামলেন। উনার ফর্সা হাতটা আমার খালি বুকের ওপর রাখলেন। উনার হাতের তালুটা আগুনের মতো গরম। উনার আঙুলগুলো আমার বুকের লোমগুলোর ভেতর দিয়ে স্লাইড করে নিচে নামতে লাগল। আমার পেটের পেশি ছুঁয়ে উনার হাত সোজা নেমে গেল আমার গ্যাবার্ডিন প্যান্টের বেল্টের কাছে।

আমি আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলাম না। আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধাতুর পুরুষটা এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। আমি আমার দুই হাত বাড়িয়ে উনার কালো কামিজের নিচের ঝুলটা ধরলাম।

"হাত দুটো তোলো আনিকা," আমি উনার চোখে চোখ রেখে, খুব নিচু আর গভীর গলায় বললাম।

আনিকা বাধ্য মেয়ের মতো উনার দুই হাত ওপরের দিকে তুললেন। আমি উনার কালো কামিজটা এক টানে উনার মাথার ওপর দিয়ে টেনে বের করে আনলাম। কামিজ সুইটের ফ্লোরে একপাশে ছুড়ে ফেলে দিলাম। সুইটের ল্যাম্পশেডের মায়াবী, হলুদ আলোয় উনার শরীরের ওপরের অংশটা উন্মোচিত হলো।

নিচে শুধুই একটা কালো লেসের অন্তর্বাস। উনার সেই ছত্রিশ বছর বয়সী, কিন্তু নিখুঁতভাবে সযত্নে রাখা ফর্সা শরীরটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। উনার স্তন দুটো এতই ভারী এবং গোলাকার যে, লেসের কাপ থেকে তা যেন বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য আকুল হয়ে ছিল। উনার সমতল পেট, উনার কলারবোনের ডিপ খাঁজ আর উনার ফর্সা বাহু দুটো দেখে আমার মনে হলো, আমি পৃথিবীর সেরা কোনো ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উনার সেই রাজকীয় রূপের দিকে এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম। "কী দেখছ?" আনিকা উনার ফর্সা কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে, একটা বুনো হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

"দেখছি, একটা মানুষকে ঈশ্বর কতটা নিখুঁত করে বানাতে পারেন," আমি ফিসফিস করে বললাম।

তারপর আমি আর অপেক্ষা করলাম না। আমি উনার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের ওপর আমার ঠোঁট রাখলাম। একটা দীর্ঘ, আর্দ্র চুম্বন। তারপর উনার কলারবোন বরাবর আমার জিভ বুলিয়ে আমি আস্তে আস্তে নিচে নামলাম। লেসের সেই কালো অন্তর্বাসের ওপর দিয়েই আমি উনার স্তনবৃন্তে মুখ রাখলাম। কাপড়ের সেই খসখসে ফেব্রিকের ওপর দিয়েই আমি সেটাকে চুষতে লাগলাম। আমার জিভের উষ্ণ স্পর্শে উনার স্তনবৃন্তগুলো মুহূর্তের মধ্যে একটা ছোট পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল।

"আহহহ... রাশেদ... ইসসস..." আনিকা আমার মাথাটা উনার দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে উনার বুকের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে নিলেন। উনার নখগুলো আমার খালি পিঠের চামড়ায় গিয়ে বসে গেল।

আমি আমার হাত দুটো উনার পিঠের দিকে নিয়ে গেলাম। খুব নিপুণ হাতে আমি অন্তর্বাসের মেটালিক হুকটা খুলে দিলাম। লেসের ওই শেষ আবরণটাও খসে ফ্লোরে পড়ে গেল। উনার স্তন দুটো পুরোপুরি মুক্ত হয়ে আমার মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। ফর্সা, নিটোল, এবং পুরোপুরি প্রস্ফুটিত দুটি ফুল যেন। উনার স্তনবৃন্ত দুটো হালকা গোলাপি আর উত্তেজনায় টানটান।

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আমি একটা বোঁটা আমার মুখের ভেতর পুরে নিয়ে বন্যভাবে চুষতে শুরু করলাম। আমার জিভ দিয়ে সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাটছিলাম, আর অন্য হাত দিয়ে উনার অন্য স্তনটা খুব আদরে, অথচ একটা চরম অধিকারবোধের সাথে দলে দিচ্ছিলাম।

আনিকা উনার মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিলেন। উনার বুকটা এক অসম্ভব ছন্দে ওপর-নিচে উঠানামা করতে লাগল। উনার গলা দিয়ে একটা বুক-চেরা, গভীর আর্তনাদ বেরিয়ে এল— "আহ... রাশেদ... আমাকে শেষ করে দাও তুমি..."

উনার হাত দুটো এবার থেমে রইল না। উনি উনার হাত নিচে নামিয়ে এনে আমার গ্যাবার্ডিন প্যান্টের বেল্টের বাকলে হাত দিলেন। খুব দ্রুত উনি বেল্টটা আনলক করলেন, তারপর জিপারটা টেনে নিচে নামিয়ে দিলেন।

প্যান্টের বোতাম খোলার সাথে সাথেই আমার প্যান্টটা আলগা হয়ে আমার হাঁটু পর্যন্ত নেমে গেল। আমার আন্ডারওয়্যারের ভেতরে আমার পুরুষাঙ্গটি ইতিমধ্যেই চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে, আক্ষরিক অর্থেই এক দণ্ডায়মান কুতুব মিনারের মতো ফুঁসছিল। উনার হাত যখন কাপড়ের ওপর দিয়ে সেটাকে স্পর্শ করল, আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল।

আনিকা উনার নরম, উত্তপ্ত হাতের তালু দিয়ে আমার সেই দণ্ডায়মান অংশটাকে কাপড়ের ওপর দিয়েই চেপে ধরলেন। উনার আঙুলগুলো দিয়ে উনি খুব ধীরে ধীরে, একটা পাগল-করা, নিপুণ ছন্দে ওপর-নিচে নড়াচড়া করতে লাগলেন।

আমি উনার স্তন থেকে মুখ সরিয়ে উনার মুখের দিকে তাকালাম। উনার চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা, তাই উনার খালি চোখ দুটো এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত। উনার চোখ দুটো কামনার আবেশে অর্ধেক বন্ধ। ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁকা হয়ে আছে, উনার গাল দুটো লাল, আর কপালে সুক্ষ্ম ঘামের বিন্দু জমতে শুরু করেছে। উনার এই ঘুম ভাঙা, কামনায় উন্মত্ত রূপটা দেখে আমার ভেতরের পশুটা পুরোপুরি জেগে উঠল।

আমি উনার সাদা সালোয়ারের রাবার-ব্যান্ডটা দুই হাতে ধরলাম। "এটাও খোলো," আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম।

আনিকা কোনো কথা বললেন না। উনি উনার পা দুটো একটু ওপরে তুললেন, আর আমি এক টানে সালোয়ারটা নিচে নামিয়ে দিলাম। সালোয়ারটা ফ্লোরে জমে থাকা টি-শার্ট আর কামিজের স্তূপের ওপর গিয়ে পড়ল। নিচে শুধুই উনার একটা কালো রঙের প্যান্টি।

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমি উনার সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলাম। উনার সমতল, ফর্সা পেটে আমার মুখ রাখলাম। উনার নাভির চারপাশে আমার জিভ দিয়ে একটা বৃত্ত এঁকে দিলাম। নাভির সেই গভীর খাদের ভেতর আমার জিভের উষ্ণ স্পর্শ পেতেই আনিকা এক তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠলেন। উনার পা দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল।

তারপর আমি আরও নিচে নামলাম। প্যান্টির ওই পাতলা সুতির কাপড়ের ওপর দিয়েই আমি উনার সেই অতি গোপন, রহস্যময় এবং ভিজে থাকা নারীত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আমার ঠোঁট আর মুখ চেপে ধরলাম। গরম! এবং ভীষণ ভেজা!

উনার শরীরের কামনার রসে কাপড়টা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ সিক্ত হয়ে উঠেছিল। আমি আমার জিভ দিয়ে সেই কাপড়ের ওপর দিয়েই উনার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশে একটা জোরালো চাপ দিলাম।

"উফফফ... রাশেদ... না..." আনিকা উনার দুই হাত দিয়ে আমার চুলগুলো সজোরে টেনে ধরলেন। উনার শরীরটা যেন নিচ থেকে ওপরের দিকে ছিটকে উঠতে চাইল। "উঠো... বিছানায় চলো... আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না..."

উনার গলার স্বরটা ভাঙা, ভেজা এবং চরম আকুলতায় ভরা। আমি উঠে দাঁড়ালাম।

আনিকা আমার একটা হাত উনার শক্ত মুঠোয় ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ওই বিশাল, ধবধবে সাদা চাদর বিছানো ডাবল বেডটার দিকে। আমি বিছানার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। আনিকা উনার হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে আমার পাশে বসলেন। উনার হাত দুটো আমার আন্ডারওয়্যারের বর্ডারে গেল। উনি খুব ধীর গতিতে সেটাকে আমার শরীর থেকে টেনে বের করে এনে বিছানার নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

আমার পুরুষাঙ্গটি এখন কোনো আড়াল ছাড়া, সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে ওপরের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল। উনার ঘরের ল্যাম্পশেডের আলোয় সেটার রগগুলো উত্তেজনায় ফুলে উঠেছে দেখা যাচ্ছিল। আনিকা উনার দুই হাত বাড়িয়ে আমার সেই দণ্ডায়মান অংশটাকে ধরলেন। উনার হাতের তালুর রেশমি কোমলতা আর উনার গায়ের উত্তাপ আমার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত বিজলীর জন্ম দিল। আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম। 

তারপর... আনিকা উনার মুখটা নিচু করলেন। উনার গরম, ভিজে থাকা ঠোঁট জোড়া আমার লিঙ্গের একদম অগ্রভাগে এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। উনি খুব ধীর গতিতে, অত্যন্ত পরম আদরে সেটাকে উনার মুখের ভেতর নিতে শুরু করলেন।

এক ইঞ্চি... দুই ইঞ্চি... গলার কাছ পর্যন্ত। আমার ভেতরের সমস্ত অস্তিত্ব যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি দুই হাত দিয়ে বিছানার সাদা চাদরটা খামচে ধরলাম।

তারপর উনি আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠলেন। উনার জিভের ডগা দিয়ে নিচের অংশটা খুব মায়াবী একটা ছন্দে চাটলেন। আবার ভেতরে নিলেন। সুইটের ভেতর এখন অন্য কোনো শব্দ নেই। না কোনো পানির আওয়াজ, না কোনো বাইরের কোলাহল। শুধু উনার মুখের সেই ভেজা, চোষার শব্দটা— চপ... চপ...— এই নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর এক আদিম, চরম অশ্লীল এবং পরম ঐশ্বরিক সংগীতের মতো বাজতে লাগল। উনার মুখের লালা আমার লিঙ্গের গায়ে গড়িয়ে পড়ছিল।

আমি মাথা সামান্য তুলে উনার দিকে তাকালাম। উনার চোখ দুটো বন্ধ, কপালে হালকা ভাঁজ। উনি উনার পুরো মনোযোগ, উনার উর্বরা অস্তিত্ব দিয়ে আমাকে সেবা করছেন। উনার এক হাত আমার অণ্ডকোষের ওপর খুব আলতো করে বুলে যাচ্ছিল, আর অন্য হাত দিয়ে উনি আমার গোড়ার দিকটা ধরে ওপরে-নিচে নাড়াচ্ছিলেন।

আমি উনার খোলা চুলে আমার হাত রাখলাম। কোনো চাপ দিলাম না, জাস্ট একটা স্পর্শ। আনিকা যেন আমার সেই ইশারাটা বুঝতে পারলেন। উনি আরও গভীরে নিলেন। উনার গলার কাছে গিয়ে ঠেকতেই উনি একটু খুকখুক করে কাশলেন, কিন্তু উনি থামলেন না। উনি উনার কাজ চালিয়ে গেলেন। উনার জিভের ডগা দিয়ে উনি আমার অগ্ৰভাগের সেই চরম সংবেদনশীল ছিদ্রটায় বারবার খোঁচা দিচ্ছিলেন।

আমার মনে হচ্ছিল, আমার শরীরের সমস্ত রক্ত, সমস্ত শক্তি এক জায়গায় এসে জমা হয়েছে। আমি আমার কোমরটা একটু ওপরের দিকে তুললাম। আনিকা উনার একটা হাত বাড়িয়ে আমার উরু চেপে ধরলেন।

"আস্তে সোনা..." উনি মুখটা এক সেকেন্ডের জন্য সরিয়ে, ঠোঁট দুটো লালায় ভেজা অবস্থাতেই ফিসফিস করে বললেন। উনার চোখে এক বন্য মায়া। তারপর উনি আবার সেটাকে উনার মুখের ভেতরের স্বর্গে পুরে নিলেন।

পাঁচ মিনিট... ছয় মিনিট... এভাবে চলল। আমার পুরো শরীরটা যেন একটা ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম, আমার সহ্যসীমার শেষ প্রান্তে আমি এসে দাঁড়িয়েছি। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড... তারপরই আমার ভেতরের সমস্ত তরল লাভা ছিটকে বেরিয়ে আসবে।

কিন্তু আনিকা তো সাধারণ কোনো নারী নন। উনি একজন পাকা, অভিজ্ঞ এবং চরম দূরদর্শী খেলোয়াড়। উনি খুব ভালো করেই জানেন কখন থামতে হয়। উনি উনার মুখ থেকে আমার লিঙ্গটা বের করে আনলেন। বের করার মুহূর্তে জিভ দিয়ে শেষবারের মতো খুব মায়াবী একটা লেহন করলেন।

তারপর উনি হাঁটু গেড়ে বিছানার ওপর উঠে এলেন। উনি আমার ওপর এসে বসলেন। উনার দুই পা আমার কোমরের দুই পাশে ছড়িয়ে পড়ল। উনার নগ্ন, ভেজা যোনিপথটা আমার শক্ত লিঙ্গের ওপর দিয়ে হালকা ঘষা খেল। কী সাংঘাতিক উত্তপ্ত আর কী ভীষণ পিচ্ছিল!

উনি উনার বাঁ হাত দিয়ে উনার কালো প্যান্টিটা এক টানে শরীর থেকে খসিয়ে একপাশে ছুড়ে মারলেন। এবার কোনো কাপড়ের আড়াল নেই।

আনিকা উনার ডান হাত দিয়ে আমার শক্ত লিঙ্গটা ধরলেন। তারপর উনার নিজের শরীরের সেই উন্মুক্ত, পিচ্ছিল এবং কামনার রসে টইটম্বুর যোনিমুখের ওপর সেটিকে নিখুঁতভাবে স্থাপন করলেন। উনার চোখ দুটো আমার চোখের দিকে স্থির। উনার ঠোঁটে এক রহস্যময়, বিজয়ী হাসি।

উনি খুব ধীরে, অত্যন্ত ধীরে উনার শরীরের পুরো ভর ছেড়ে দিয়ে নিচে বসতে শুরু করলেন। আমার লিঙ্গের চকচকে অগ্রভাগটা উনার শরীরের ভেতরের সেই উষ্ণ, আঁটসাঁট স্বর্গে প্রবেশ করল।

আনিকা উনার মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে, বুকটা ওপরে তুলে একটা দীর্ঘ, কাঁপাকাঁপা শ্বাস ফেললেন—
"আহ্..."

উনি আরও একটু নিচে নামলেন। অর্ধেক ঢুকল। উনার ভেতরটা অসহ্য রকমের টানটান, গরম এবং পিচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো ফুটন্ত তরলের ভেতর প্রবেশ করছি। উনি উনার শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়ে পুরোটা ঢুকিয়ে দিলেন। আমাদের শরীর সম্পূর্ণ জোড়া লেগে গেল। উনি এক মুহূর্তের জন্য একদম স্থির হয়ে রইলেন। শুধু উনার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। আমার লিঙ্গ উনার শরীরের গভীরে স্পন্দিত হচ্ছে। তারপর... উনি নড়তে শুরু করলেন।

শুরু হলো আমাদের সেই মহাজাগতিক, ছন্দময় যাত্রা। এই নদীর বুকে ভাসমান লঞ্চে, বাইরের পৃথিবীর কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এক স্বর্গে।

উনি উনার কোমরটা একটু ওপরে তুললেন। আমার লিঙ্গ প্রায় বেরিয়ে এল। তারপর উনি সজোরে নিচে বসলেন।
শব্দ হলো— চাপ্! উনার শরীরের ভারে বিছানার স্প্রিংটা একটু ডেবে গেল। উনার স্তন দুটো এই ধাক্কায় একটা বুনো ঝাঁকুনি খেল। উনি দাঁত চেপে ধরে একটা অস্ফুট শব্দ করলেন, "উম্ম..."।

এবার আরও একটু জোরে। ওপরে উঠে আবার বসলেন। এইবার আমার লিঙ্গ পুরোটা উনার জরায়ুমুখ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল। উনার যোনির ভেতরের পেশিগুলো আমাকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমরটা ধরলাম। আমার আঙুলগুলো উনার ফর্সা, নরম মাংসে একটু দেবে গেল।

উনি এবার শুধু ওপরে-নিচে নয়, সামনে-পেছনে নড়তে শুরু করলেন। আমার লিঙ্গ উনার ভেতরে একটা অদ্ভুত ঘর্ষণ তৈরি করল। উনার ক্লিটোরিস বা ভগাঙ্কুরটা সরাসরি আমার তলপেটের সাথে মিলল। উনি মাথা পেছনে ফেললেন। উনার চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে পড়ল। "রাশেদ... আরও... উফফ..."

জোরে। এবার আমি নিচ থেকে একটু পুশ করলাম। বিছানার ফ্রেমটা কেঁপে উঠল। উনার যোনি থেকে কামনার রসে সিক্ত হওয়ার কারণে একটা স্পষ্ট, ভেজা শব্দ আসছে। চাপ্-চাপ্। আমার অণ্ডকোষ উনার শরীরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। আমি উনার স্তন দুটো আমার দুই হাতে নিয়ে মলতে লাগলাম। স্তনবৃন্ত দুটো আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরতেই উনি একটা বন্য গোঙানি দিয়ে উঠলেন।

উনি উনার দুই হাত আমার বুকের ওপর ভর রেখে আরও দ্রুত নড়তে লাগলেন। উনার পেটের পেশীগুলো টানটান হয়ে আছে। ঘামের ফোঁটা উনার কপাল দিয়ে, উনার গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আমারও বুক ঘেমে গেছে। উনার ভেতরটা এখন আরও বেশি ভেজা হয়ে উঠেছে। আমার লিঙ্গ খুব সহজেই, কোনো বাধা ছাড়াই ঢুকছে আর বেরোচ্ছে।

উনি একটু সামনের দিকে হেলে পড়লেন। উনার মুখটা আমার মুখের একদম কাছে এল। উনি আমার ঠোঁটে একটা গভীর চুমু দিলেন। উনার লালা মেশানো জিভটা আমার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। এই চুমুর মধ্যেই উনার কোমর সমানে নড়ছে। প্রতিবার বসার সময় উনার যোনি আমার লিঙ্গকে একটা স্পঞ্জের মতো চেপে ধরছে। আমি উনার পেছনের দিকটা, উনার সেই সুডৌল, বিশাল নিতম্বদুটো হাতে নিয়ে জোরে চেপে ধরলাম। উনি আমার বুকে ভর দিয়ে আরও গভীরে বসলেন।

এবার উনি ছন্দ বদলালেন। খুব ধীর গতিতে ওপরে উঠে, তারপর হঠাৎ করে সজোরে বসছেন। প্রতিবারই আমার লিঙ্গের অগ্রভাগ উনার একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে তীব্র আঘাত করছে। উনি প্রতিবারই একটা করে ছোট আর্তনাদ করছেন। "আহ... আহ... রাশেদ... আহ..."

আমি আর শুধু দর্শক হয়ে থাকতে পারলাম না। আমি উনার কোমরটা আরও শক্ত করে ধরে, নিজেও নিচ থেকে প্রবল বেগে ঠোকা দিতে শুরু করলাম। উনি একটু অবাক হয়ে চোখ খুললেন। তারপর হাসলেন— একটা চরম তৃপ্ত, বন্য হাসি। "হ্যাঁ... এভাবে... এভাবেই..." আমরা দুজনেই এখন মিলিত ছন্দে নড়ছি। লঞ্চের ইঞ্জিনের ভাইব্রেশন আর আমাদের শরীরের ভাইব্রেশন যেন এক হয়ে গেছে। ভিআইপি কেবিনের বিছানার কাঠের ফ্রেমটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে আমাদের এই আদিম উল্লাসের জানান দিচ্ছে।

উনার যোনি এখন আরও শক্ত হয়ে উঠেছে। ভেতরের পেশিগুলো ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি উনি উনার চরম মুহূর্তের খুব কাছাকাছি। কিন্তু উনি থামলেন না। উনি আরও জোরে, আরও বন্যভাবে ওঠানামা করতে লাগলেন। উনার নখগুলো আমার বুকে ফুটছে। ব্যথা আর সুখের এমন একটা ককটেল, যা আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল।

উনি সোজা হয়ে বসলেন। দুই হাত উনার পেছনে নিয়ে গিয়ে আমার উরুর ওপর ভর দিলেন। এই পজিশনে উনার শরীরের ওজনটা আরও গভীরে চাপ দিচ্ছিল। প্রতিটি ঠোকায় উনার স্তন দুটো ওপরে-নিচে লাফাচ্ছে। ঘামে চকচক করছে উনার পুরো শরীর। আমি আমার ডান হাতটা নিচে নিয়ে গিয়ে উনার ক্লিটোরিসে আঙুল দিয়ে ঘষতে লাগলাম। উনি একটা গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলেন। "আহ্ গোড... রাশেদ... আমি মরে যাচ্ছি..."

উনার শরীরটা হঠাৎ করে একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে কেঁপে উঠল। যোনিপথটা ছন্দময়ভাবে সংকুচিত হতে শুরু করল। উনার ভেতরের পেশিগুলো আমাকে এমনভাবে চেপে ধরল যেন আমাকে চুষে শেষ করে দেবে। আমি আর কোনোভাবেই নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমি নিচ থেকে আমার জীবনের সবটুকু শক্তি দিয়ে জোরে জোরে ঠোকা দিচ্ছিলাম। উনার ভেতরের সেই গরম, স্পন্দনশীল মাংস আমার লিঙ্গকে যেন দোহন করে নিচ্ছিল।
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)