Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

চারুলতা (লেখক:কামসম্রাট)
#41

পর্ব - ৪১

সন্ধ্যায় বাবার পাশে বসে আছি। চারু বাবার সেবা ছাড়া তার কাছে আসে না। সে বাবাকে এই অবস্থায় দেখতে পারে না যে! চোখ দুটো তার কেঁদে কেঁদে ফুলে উঠেছে! বাবার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোনোও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইশারায় কথা বলে। আমায় হাত নেড়ে ডাকছিল কিছুক্ষণ আগে। আমি তার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। 

- ব্যাটা.....!!

গলাটা কেউ জোরে চেপে ধরলে গলার ভেতর থেকে যেমন একটা খসখসে আওয়াজ বেরিয়ে আসে, সেইরকমই শোনালো বাবার গলাটা আজ। 

- বলো বাবা, এই তো তোমার পাশেই বসে আছি। জল খাবে?

- নিশীথ....আমি.....ওদের....!!!

কথা আটকে যাচ্ছে বাবার, তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছে আমাকে কিছু বলার। আমার চোখ দুটো ভিজে এলো বাবাকে এভাবে দেখে। কি ছিল, আর আজ কি হল!

- তুমি ঘুমোও বাবা, কষ্ট হবে কথা বললে...!

- আমি....ওদের.....কথা....শুনে ....ফেলেছি......তোর.....তোর..... বউয়ের....!

বাবার চোখদুটো যন্ত্রনায় ছটফট করছে। আমার হাত দুটো ধরে বাবা চারুর ব্যাপারে কিছু জানিয়ে দিয়ে যেতে চাইছে আমায়! কিন্তু কি! বাবা নিশীথের কথা বললো....কি বলতে চাইছে বাবা?

- চারুর...কি বাবা?

- তোর..... বউয়ের....খুব.....বিপদ....!!!!

চারুর বিপদ! বাবার চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। 

- কি বিপদ বাবা? তুমি বলতে পারবে? ও বাবা!

বাবার পাশের ঘরই লতার। বোধহয় লতা আর নিশীথের কোনো গোপন কথা বাবা শুনে ফেলেছে এইজন্যই। বাবা কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল। ইশারায় জল দিতে বললো। জল খেয়ে বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে অনেক কষ্টে আরও কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো,

- জানিনা.....! আমায়.... কথা ....দে.....তুই....!

দম শেষ হয়ে যাচ্ছে বাবার, গলায় তীব্র ব্যাথায় কথা আটকে গেল।

- হ্যাঁ বাবা, বলো পুরোটা....যা বলবে তাই করবো আমি....!!!

- কথা.....দে......তুই.....রক্ষা........ করবি ......চারুকে......!

আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।

- করবো বাবা..... শেষ নিঃশ্বাস অবধি ওকে রক্ষা করে যাবো বাবা....!!!

বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে একটু হেসে বললো....এটাই বাবার শেষ কথা......!

- তোরা........সুখি..........হ........!!!!!!!!!

বাবা চোখ বন্ধ করলো। তার হাতটা আমার মাথা থেকে বিছানায় পড়ে গেল, দেহটা শিথিল হয়ে পড়লো।

- ও বাবা.....!!!!!!!!!

বাবা আর চোখ মেলে তাকালো না। চারু আমার চিৎকারে ঘরে এসে বাবার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো। আমার বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো.... এতদিনের চাপা কান্নাটা আজ প্রকাশ হয়ে পড়লো!

- বাবা......আমরা তোমাকে নিয়ে যাবো বাবা.....চোখ খোলো.... এখানে তোমায় কেউ দেখবে না গো......তুমি চলে গেলে আমাদের ছেড়ে.....ও বাবা......আমায় এখন থেকে কে বকবে গো....কে শাসন করবে......এই দ্যাখো আমি বসে আছি..... একবার ব্যাটা বলে ডাকো বাবা.....একবার ব্যাটা বলে ডাকো......…....ও....বাবা.......!!!!!!!!!!!!!!

যাওয়ার সময় বাবা আমাদের দুজনকে সুখী হওয়ার আশীর্বাদ করে গেলো আর চোখ বন্ধ করলো হাসিমুখে। মাথার উপরে যে বটবৃক্ষটা এতদিন অসংখ্য দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে আসছিল, আজ তা মাটিতে মিশে গেল! এই নিষ্ঠুর জগতে আমি আর চারু এখন একলা দাঁড়িয়ে আছি। চারুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

বাবার শোকে কিছুদিন অচৈতন্যের মতো কাটলো আমাদের দুজনের। হৃদয় থেকে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন করে দিলে যেমন অবস্থা হয়, তেমনি অনুভব করলাম।

একদিন সকালে বারান্দায় বসে আছি। রিনু আর মিনুর দিকে তাকিয়ে তাদের খড় খাওয়া দেখছি। চারু গেছে নদীতে স্নান করতে। লতা তার ঘরে দুজন খদ্দের ডেকে রতি ক্রিয়ায় মেতে উঠেছে। তাদের শীৎকারে চারপাশ পূর্ণ। বাবার মৃত্যুতে লতা একবারের জন্যও এদিকে আসেনি, এমনকি শেষবারের জন্য বাবার মুখ দর্শনও করেনি। কারণ তখন তার ঘরে খদ্দের এসেছিল। নিশীথ এখন বাড়িতে নেই। 

কত কি ভাবছিলাম বসে বসে। তার মধ্যে প্রধান চিন্তাটা হলো বাবার শেষদিনের কথাটা নিয়ে...'তোর বউয়ের খুব বিপদ!'....কি বিপদ! লতা আর নিশীথ আমার চারুর কি ক্ষতি করতে চায়?

এইসব ভাবছিলাম, এমনসময় চারু ছুটে এলো বাইরে থেকে। আমি তাকে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।

- কি হয়েছে চারু?

মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আমার বুকে।

- ওরা....ওরা সবাই জেনে গেছে গো....জেনে গেছে!!!

- কে জেনে গেছে? কি জেনে গেছে?

- আমাদের সম্পর্কের কথা গো.....সারা গাঁয়ের লোক জেনে গেছে....ওরা আসছে....!!!!!!

আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলো এই খবরটা শুনে। তাহলে শেষ পর্যন্ত লতা আর নিশীথ সবাইকে জানিয়েই ফেললো? ওরা আমাদের কারোকেই বাঁচতে দিতে চায় না আর? একটার পর একটা আঘাত? বাবা কি তবে চারুর এই বিপদের কথাই বলছিলো?

- আর কতো.....আর কতো বলতে পারো....?

নিজের অদৃষ্টকে মনে মনে প্রশ্ন করলাম। এমনসময় লতার ঘর থেকে তার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠার আওয়াজ ভেসে এলো,

- কি রে দাদা....মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বানাবি, তো বুক ফুলিয়ে সবার কাছেই বানা না....ওভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে কেন? সেইজন্যেই আমি সবাইকে জানাবার বন্দোবস্ত করেছিলাম। আমি তোদের ভালো চাই রে! ভেবেছিলাম তোরা সমাজে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পা....!

খদ্দেরের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত থেকেই এই কথাগুলো সে বললো। তার কথার আর তেমন মূল্য নেই আমার কাছে। আমরা এমনিতেই চলে যাবো এখান থেকে। আমি আর চারু প্রস্তুতি নেওয়াও শুরু করে দিয়েছি। ভেবেছিলাম গাঁয়ের লোকের কাছে এটা অজানাই থাক্। সম্পর্ক যত পবিত্রই হোক না কেন, সমাজের ধারার প্রতিকূলে গেলেই তার বিরূদ্ধে সবাই এগিয়ে আসবে। আজ লতার জন্য সত্যিই তারা এগিয়ে এলো... পাঁচিলের দরজায় টোকা মারলো অনেকগুলো হাত.... একসঙ্গে!

- চারু, ঘরে ঢোকো.... আমি ছাড়া অন্য কেউ ডাকলে দরজা খুলবে না। মনে থাকে যেন। যাও....যাও যাও যাও যাও...!

পাঁচিলের দরজাটা খুললাম আর খুলতেই কমপক্ষে ৫০ জন আমাদের উঠোনে এসে জড়ো হয়ে আমাকে ঘিরে ধরলো। এই গাঁয়ের মোড়ল সহ বাড়ির পুরুষেরা এসেছে, তাদের স্ত্রীরা আসেনি‌। সবার চোখ লাল হয়ে আছে রাগে। যে মোড়ল, তার গলা....আগে ফাটলো....!

- চয়ন!!!!!!

আমি ভদ্রতা রেখেই গলা নামিয়ে কথা বলতে লাগলাম।

- বলুন।

- এই গাঁয়ে এসব চলবে না। এই গাঁয়ে আরও পাঁচটা পরিবার থাকে। তোমাদের নোংরামি দেখে বাকিরা এই শিক্ষাই পাবে। 

আমি যথেষ্ট সংযত থাকতে শিখে গেছি। এটাও জানি এদের সঙ্গে তর্ক শুরু করলে আমার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরাতে এদের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে। তাই কথাবার্তার মাধ্যমে ওদের বোঝালাম ওরাই ঠিক, আমরা ভুল। যখন কেউ আক্রমণ করে, ভুল করেও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা মূর্খামি। আমাদের অহংকার এই মূর্খামিই আমাদের দিয়ে করিয়ে থাকে অনেকবার। কিন্তু যদি ওদেরকে এটা বোঝানো যায় যে ওরা ঠিক, তবে পরিস্থিতি এক ধাক্কায় স্বাভাবিক হয়ে যায় আর এক্ষেত্রেও আমার বুদ্ধির জোরে এই পরিস্থিতি আমি স্বাভাবিক করে তুললাম।

- আপনারাই ঠিক। আর সত্যি বলতে আমার মায়েরও দোষ নেই। দোষটা আমারই। কিছু বদ ছেলের সঙ্গে পড়ে আমার এই চরিত্র হয়েছে। আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর আপনাদের এই আশ্বাস দিচ্ছি আমি পরশু এই গাঁ ছেড়ে চলে যাবো মাকে নিয়ে। আপনারা সকলে নিশ্চিন্তে থাকবেন এবার।

এই ৫০ জনের হুড়মুড়িয়ে আক্রমণ ও আগমন এক নিমেষেই অর্থহীন করে ফেললাম। তারা এসেছিল কথার আঘাত বা তার বেশি প্রয়োজন হলে লাঠির আঘাত প্রয়োগ করবে আমাদের দুজনের ওপর, কিন্তু কথার প্যাঁচে তাদের কোনোকিছুই আর প্রয়োগ করতে দিলাম না। বাধ্য করলাম লাঠি ফেলে বাড়ি ফিরে যেতে। এমনকি আমার কথায় মোড়লের মন কিছুটা গললো। যাওয়ার সময় মোড়ল বলে গেল,

- চয়ন, তুমি স্কু/লের শিক্ষক। কতো গর্ব হতো তোমাকে নিয়ে বলো তো। তুমিই এই কাজ...? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ। শুধরে যাওয়ার চেষ্টা কোরো...! আর কি বলবো। আর পরশু কিন্তু তোমাদের চলে যেতে হবে। এটা মাথায় রেখো।

এতজন এসেছিলো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে, আর গেল শান্ত মুখে। সত্যি, ভেবেচিন্তে কথা বললে বুঝি জীবনের অনেক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যায়। আমি যে কথাগুলো ওদের বললাম তা ওরা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নিল। আমি ওদের কিভাবে বোঝাতাম যে,

 - আমি বদ সঙ্গে পড়িনি, আমি আমার মায়ের প্রেমে পড়েছি! 

আমি আর চারু যে একে অপরের প্রেমে পড়েছি, এই কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বুঝতে পারলাম ঠিক কাজই করেছি।

এমনসময় লতা বেরিয়ে এলো উঠোনে, পেছনে পেছনে খদ্দেরটাও এলো। খদ্দেরটা বেরিয়ে যেতেই লতা অবাক হয়ে আমার দিকে চাইলো। সে ভেবেছিলো এই গাঁয়ের কাছে আমার আর চারুর সম্মানকে মাটিতে মিশিয়ে দেবে। কিন্তু কিছুই মেশাতে পারলো না দেখে গা জ্বালানো কথা দিয়ে আমাকে আঘাত করার বৃথা চেষ্টা করে গেল।

- বাব্বা...মায়ের স্বামী যে বেশ বড়ো হয়ে গেছে! কি সুন্দর করে কথা বলে....!

- হ্যাঁ, নয়তো চারুকে ভালোবাসলাম কি জন্য যদি রক্ষাই না করতে পারি!

- চারু....? মা থেকে চারু...? প্রেম উপচে পড়ছে....! আহা গো! আমি এই সুখ রাখি কোথায়!

- হ্যাঁ। মা নয় সে, সে আমার চারু....!

- কবে যাচ্ছিস তোরা?

- পরশু...!

- ওহ্। তোরা বিদায় হলে আমার ব্যবসাটা বাড়াবো।

- বেশ।

বলে হেসে ঘরে ঢুকে গেলাম। পেছনে তাকিয়ে একবার দেখলাম লতা আমার দিকে চেয়ে হাসছে।
Reply
#42

পর্ব - ৪২

রাত তখন অনেক। চাঁদ উঠেছে পশ্চিমে। তার আলোয় চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠেছে। একটা পেঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে আমার ঘরের খোলা জানালা দিয়ে দূরের ওই বকুল গাছটায়। চারু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে আমি বুকের মাঝে জাপটে ধরে বিছানায় শুয়ে আছি। 

- আমরা পরশুই এই গোবাদা ছেড়ে চলে যাবো গো?

- হ্যাঁ চারু! পরশুই আমরা বনছায়াপুরে চলে যাবো।

- তোমার চাকরিটা?

- ওটা চলে গেছে। আমি এটা আগে থেকেই জানতাম। আমাদের সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে সেটা আর থাকবে না। আজ দুপুরেই জানাজানি হয়েছে, বনদুলিতে খবর পৌঁছেছে আর তারা আমায় বের করে দেওয়ার চিঠি বিকেলের মধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছেন।

- এক বেলার মধ্যেই কাজটা চলে গেলো?

- বুঝলে না, গাঁয়ের মোড়লের আদেশ!

- তবে? কি করবে এবার?

- টাকা আছে কিছু। বনছায়াপুরে আগে যাই, বাড়িতে উঠি। তারপর কোনো একটা কাজ জুটিয়ে নেবোখন। যা টাকা আছে, তাতে আমাদের অসুবিধা হবে না কাজ জোগাড়ের আগে পর্যন্ত।

- আমার জন্য তোমাকে কত কষ্ট পেতে হচ্ছে বলোতো?

- আর তুমি ছাড়া যে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় চারু!

- লতা?

- লতা কি?

- লতার কি হবে? ওরা যা শুরু করেছে, ওদের ছেলের ভবিষ্যৎ কি হবে?

- ওরা মা বাপ, ওরাই বুঝুক। আর লতার কি হবে, সেটা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। যে মেয়ে এমন হয়ে গেছে স্বেচ্ছায়, সে আমাদের কাছে মৃত!

- ও গো....এমনি বোলো না! ও যে আমার মেয়ে!

- চারু!

- কি?

- আজ থেকে লতা বলে আমাদের জীবনে আর কেউ নেই....ঠিক আছে?

- কিন্তু...!

- ঠিক আছে?

- আচ্ছা।

চারু কেঁদে উঠলো। বাবা চলে গেছে, লতার এই অবস্থা, এই গাঁ আমাদের দুজনকে চোখেও দেখতে চায় না....এই সবকিছু মিলিয়ে চারুর মন দুঃখের ভারে বড্ড কষ্ট পেয়ে উঠলো।

- চারু।

- হুমম।

- আজ আমাদের দুঃখের দিন নয়।

মা কান্না থামিয়ে আমার চোখে তাকালো। 

- বাবা কি বলে গিয়েছিল জানো?

- কি?

- তোরা সুখী হ! বাবা আমাদের নতুন করে জীবন শুরু করার আশীর্বাদ দিয়ে গিয়েছিল!

- সে আমাদের ভালোবাসতো খুব।

- হ্যাঁ।

- আচ্ছা বনছায়াপুর কেমন জায়গা?

- নদীর তীরে একটা ছোট্ট গাঁ। আমাদের এই গোবাদার থেকেও ছোটো। বিশ কি তিরিশটা পরিবার নিয়ে এই গাঁ। সবাই চাষবাস নিয়েই জীবন কাটাই।

- তাহলে তুমিও সেখানে চাষবাস নিয়েই থাকতে পারো!

- তুমি খুশি হবে তাতে?

- তুমি যা করবে, তাতেই আমি খুশি!

- আচ্ছা, ভেবে দেখছি!

চারুলতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু মনের মধ্যে চলতে লাগলো বাবার সেই কথাটা,

- তোর বউয়ের খুব বিপদ! 

কিন্তু সেই বিপদ তো কেটে গেছে। গাঁয়ের সবাই জেনে গেছে। আমরা চলে যাচ্ছি। আর কোনো বিপদ নেই! চারুলতাকে জাপটে ধরে তাকিয়ে রইলাম বাইরের উজ্জ্বল আলোকিত প্রান্তরের দিকে।

পরদিন সকাল থেকে ব্যাগপত্র গোছানো শুরু করলাম। কাল খুব সকালে বেরোতে হবে আমাদের। তাকিয়ে দেখলাম চারু সব কাজ সারছে। বাসনগুলো ধুয়ে এনে সবজি কাটায় মন দিয়েছে। কিন্তু তার মন বড়ো দুঃখী আজ। এই বাড়িতে কত স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের। সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে কাল!

দেখি লতা রতনকে নিয়ে খেলছে। কিন্তু সে আমাদের সঙ্গে কোনো বাজে ব্যবহার আর করেনি আজ সকাল থেকে। সাধারণ কথাবার্তা তো বন্ধ হয়েই ছিল, যে কটা কথা পেঁচিয়ে বলতো, তাও দেখি আজ সে আর বলছে না। কি ব্যাপার! এমন তো ওকে দেখি নি কখনও! আজ একটা খদ্দেরও নিশীথ নিয়ে আসেনি এখনও পর্যন্ত। এই সকালের মধ্যে একজন খদ্দের চলেই আসে অন্যদিন। আজ কেমন যেন একটা অভাব আমি ওর স্বভাবে লক্ষ্য করলাম। নিশীথকেও দেখতে পাইনি ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই। আমি আরও অবাক হলাম এর পরের ঘটনায়, আর সেই ঘটনা আমার উষ্ণ মনকে জুড়িয়ে দিয়ে গেল যেন এক ঠান্ডা বাতাসের মতো এসে। যেন কিছু ফেলে দিয়ে চলে  যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মনে পড়তেই তা কুড়িয়ে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। লতা হঠাৎ আমার সঙ্গে কথা বলে উঠলো। আর সেই কথা বেশ্যা লতার মতো নয়, বিয়ের ঠিক পরেই যে লতাকে আমি দেখেছিলাম, এ যেন সেই লতা! আমার বোন....লতা!

- দাদা, আমাকে ক্ষমা করে দিস রে...আমি যে বড় নিষ্ঠুর...!!!

আমি আর চারু একসঙ্গে তার দিকে চাইলাম এই কথায়। কি! কি বললো লতা? এ তো আমার বোনের কন্ঠস্বর! আমার বোন কি তবে ফিরে এসেছে?

- লতা...!!!!

চারু এগিয়ে গিয়ে নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।

- আমি....আমি যে কত কষ্ট পাচ্ছিলাম তোকে ওভাবে দেখে...তুই কি বুঝতিস না লতা...???

চারু কাঁদতে কাঁদতেই মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো। লতাও অঝোরে কেঁদে ফেললো।

- মা!!! আমি ভুল করেছি মা। তোমাদের যাওয়ার কথা শুনে আমি কাল রাতে ঘুমাতে পারিনি গো..!!! তোমরা আমাদের ছেড়ে যেওনা মা...!!!

- ওগো কি বলছে মেয়ে শোনো....আরে আমি যে তোর মা রে ক্ষেপি...তোকে ছেড়ে কোথায় যাবো বল দেখি...!!!

আমি এগিয়ে গিয়ে লতার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম।

- লতা, এই নিশীথই তোর অমন অবস্থার জন্য দায়ী...ওকে আমি ছাড়বো না। জেলে পাঠাবো! আর তোকেও আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবো বনছায়াপুরে।

- না দাদা...! ওই তো আমার চোখ খুলেছে কাল রাতে। ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমার মনকেও শুদ্ধ করে দিল রে দাদা....আমার অপবিত্র মনকে শুদ্ধ করে দিল!

লতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

কি! নিশীথ বদলে গেছে? নিশীথ...ওই জানোয়ারটা বদলে গেছে? আমি নিজের কানকে আজ বিশ্বাস করতে পারছি না যে! 

- নিশীথ কোথায় লতা?

- ও গেছে মাংস আনতে। আজ রাতে ও চায় আমরা যেন একসাথেই খাই রে...!

- বেশ। তুই যা বলবি। কিন্তু আমাদের চলে যেতে হবে এখান থেকে। আমি গাঁয়ের লোককে কথা দিয়ে ফেলেছি কাল!

- না দাদা, যাস না। নয়তো আমি যে আমার মা আর দাদাকে হারিয়ে ফেলবো চিরদিনের জন্য....দাদা তোরা যাস না দাদা....তোরা যাস না!

- ধুর পাগলী! বনছায়াপুর তো কয়েক ঘণ্টার পথ রে.... মাঝে মাঝে গিয়ে থেকে আসিস আমাদের বাড়ি। আমাদের তো আর আসা হবে না।

- সব আমার জন্য হলো রে....দাদা!

- তুই কান্না থামা। কাল চলে যাবো আমরা, তাই আজ ভালোমন্দ রান্না করে একসাথে খাওয়াদাওয়া আর মজা করবো!

আমি তার ছেলে রতনকে কোলে নিয়ে সারা উঠোনে ঘোরাতে লাগলাম, কখনো রিনু মিনুর পিঠে চাপিয়ে মজা করতে লাগলাম। চারু দেখলাম হাসতে হাসতে রান্না চাপানোর জোগাড় শুরু করলো। কতদিন পর তার মুখে আমি এই হাসি দেখতে পেলাম! এমনসময় নিশীথ হাতে মাংসের ব্যাগ নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়েই আমার হাতে তার ছেলে আর চারুর সঙ্গে লতাকে গল্প করতে দেখে সে বুঝে গেল যে লতা সব আমাদের খুলে বলে দিয়েছে। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে রইল। দেখলাম চারু বারান্দা থেকে তার কাছে এসে দাঁড়ালো।

- দাও বাবা.... ব্যাগটা দাও। তুমি জল খাবে?

- না মা! আমি...আমি সত্যিই...!

- থাক্, অনেক করেছো, আর দুঃখিত টা না বললেও হবে। চলো দেখি.... শ্বশুর জামাই মিলে আজ স্নান করে আসি নদীতে একসাথে....চলো চলো গামছাটা নাও। আর চারু তোমরা রান্না সেরে নাও। আজ ভুরিভোজ হবে!

চারু এই শ্বশুর জামাই কথাটা শুনে লজ্জা পেল আর তার লজ্জা দেখে লতা হেসে উঠলো। নিশীথ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো। 

আহা! কি অপরূপ দৃশ্য দেখছি আজ! গ্রীষ্মের দাবদাহে চারপাশে যেন আগুন ধরেছে। আর এই উত্তপ্ত ধরিত্রীর বুকেই আমাদের নদীটির এই কুল কুল বয়ে চলা শীতল ধারা যেন আমাদের দেহের উষ্ণতা ভাসিয়ে নিয়ে যেতেই বয়ে চলেছে অবিরাম। কয়েকটা ডিঙি নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে। 

আমি আর নিশীথ স্নান সারলাম একসাথে। ছেলেটা খারাপ নয়। একটু চরিত্রের দোষ ছিল, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেই দোষ কেটে গেছে আজ আর‌ একইসঙ্গে লতার মাথা থেকেও এই ভুত চলে গেছে। এবার আমরা এখান থেকে চলে গিয়েও শান্তিতে থাকতে পারবো।

- দাদা, আমি আপনাদের কত খারাপ কথা বলেছি...আমার নিজের কেমন লাগছে দাদা!

মনে পড়ে গেল আমার জীবনের সেই সময়কার কথা যখন আমি আমার চারুকেও অন্যের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম, নিজে অন্য মেয়েদের সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সত্যিই কাম কি ভয়ানক নেশা! এই নেশায় মানুষ করতে পারে না এমন কোনো কাজ নেই। সেই কাজ আমিও একসময় করে এসেছিলাম, তবে তা অল্প সময়ের জন্যেই। এবং তা করা বন্ধও করে দিয়েছিলাম। নিশীথও করে এসেছে, এখন বন্ধ করলো। 

এই তো জীবন! ভুল তো মানুষ মাত্রই হবে, সেই ভুল বুঝে তা দ্বিতীয়বার না করাটাই বুঝি জীবনের আসল উদ্দেশ্য!

- খারাপ লাগার কিছু নেই, ভুল সবারই হয়, আর সেই ভুল দ্বিতীয়বার না করাটাই আসল কথা! আচ্ছা মালতী কোথায়? মানে ও নিখোঁজ হলো কিভাবে?

- জানি না দাদা, বললো একবার বনদুলি যাবে, গেল, কিন্তু আর ফিরে এলো না। কি জানি, বোধহয় অন্য কারোর সঙ্গে আবার...!

- তাই হবে। প্রার্থনা করি সেও যেন একদিন আলো দেখতে পায়!

- সত্যি দাদা, আপনার সঙ্গে আমরা এত খারাপ করেছি, তারপরেও আপনি আমাদের এত সহজে ক্ষমা করে দিলেন....আমার নিজেরই লজ্জা করে জানেন! আমাদের জন্যেই আপনাদের গাঁ ছাড়তে হচ্ছে, আমাদের জন্যেই আপনার চাকরিটা গেল!

- প্রথমত এই বারবার ক্ষমা চাওয়া বন্ধ করো, নয়তো ফলস্বরূপ আমরা কিন্তু রতনকে সঙ্গে নিয়ে বনছায়াপুরে চলে যাবো। আর দ্বিতীয়ত আমি তোমার শ্বশুরমশাই, এরকম বার বার দাদা বলে ডাকবে না, বাবা বলবে।

দুজনেই হেসে উঠলাম।

রাতে সবাই একসাথে খেতে বসলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ এই খুশি যদি বাবা দেখে যেতে পারতো তাহলে শান্তি পেতো। দেখলাম চারু আর লতা মিলে আমাদের খাবারের বন্দোবস্ত করছে। আহ্! কি গন্ধ উঠেছে খাসির মাংসের! খিদে বেড়ে গেল গন্ধে! 

- আরে নিয়ে এসো...নিয়ে এসো....আমরা শ্বশুর জামাই যে বসে আছি খাসির মাংসের অপেক্ষায়! পেটে যে ইঁদুর দৌড়ে বেড়াচ্ছে!

- দাঁড়াও আনছি। 

বলে চারু দুহাতে দুটো থালা নিয়ে আমার আর নিশীথের সামনে নামিয়ে রাখলো। 

- কি হলো, তোমারা বসবে না?

- না গো, তোমাদের হোক, তারপরে আমরা বসবো।

- একদম না। আমার আদেশ ভাঙা যাবে না। মেয়েরাও ছেলেদের সঙ্গেই খেতে বসবে একসঙ্গে!

- ঠিক আছে দাদা...আমরাও নিচ্ছি দাঁড়া।

- এই যে লতা....আমি তোর বাবা হই, মনে রাখিস, আজ থেকে বাবা বলে ডাকবি!

- ঠিক আছে....বাবা...তুই খা, আমরা তোদের সঙ্গেই বসছি।

- বাবা, আবার তুই?

সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম।

- আচ্ছা আমার ভুল হয়ে গেছে। আমার প্রিয় বাবা, তুমি খাও, হ্যাঁ, তুমি আর ও খাও, আমরাও বসছি.... হয়েছে বাবা?

- হ্যাঁ হয়েছে, এবার বোস দেখি....ও চারু তুমিও নাও...আর লজ্জা পেলে হবে? তোমার মুখে ভাত যতক্ষণ না উঠছে, আমিও খাবো না।

- বাব্বা, তোমাদের কি প্রেম! তা মা, বলি তুমি প্রথম কখন দাদার...ও না বাবার প্রেমে পড়েছিলে?

চারু লজ্জায় চুপ করে লতার খাবার বাড়তে লাগলো। জামাইয়ের সামনে তার লজ্জা তো হবেই....সে যে আমার লজ্জাবতী চারুলতা!

- মা, আমি কিন্তু বলে রাখছি, আজ তুমি আমার সঙ্গে শোবে। কাল চলে যাচ্ছো, আজ আমি মায়ের সঙ্গে ঘুমোতে চাই। কতদিন তোমার সঙ্গে ঘুমোইনি বলোতো?

চারু আমার দিকে চাইলো, বোধহয় অনুমতি নিল। আমি ইশারায় সায় দিলাম। 

- হ্যাঁ মা, তোর সাথেই আজ ঘুমোবো!

- হ্যাঁ, আর ও বাবার সাথে ঘুমিয়ে পড়বে।

- হ্যাঁ, সে তো ভালোই, জামাইয়ের সঙ্গে শুয়ে আজ গল্প করেই রাত কাটিয়ে দেবো। কাল আবার অনেক ভোর ওঠা আছে। ও গো শুনছো!

- বলো!

- লতার সঙ্গে ঘুমোচ্ছো ঘুমোও, কিন্তু রাতে গল্প বেশি নয়, ঘুমোতে হবে, কাল যাওয়া আছে, পরিশ্রম হবে, অনেকটা পথ। মাথায় রেখো।

- আচ্ছা।

পেটভরে তৃপ্তি করে আজ কতদিন পরে ভাত খেলাম মনে সন্তুষ্টি নিয়ে... হাসিমুখে!

গল্প সেরে শুতে আজ অনেক রাত হয়ে গেল। নিশীথ আমার সঙ্গে শুয়েছে। শ্বশুর জামাই মিলে মধ্যরাত অবধি গল্প করলাম। জীবনের গল্প! আর জীবনের ছোটো ছোটো ভুল থেকে শিক্ষার গল্প! আর করলাম প্রেমের গল্প! যে গল্পে দুই মানব-মানবী একে অপরের হাত ধরে চলেছে দূরে... অনেক দূরে... যেখানে তাদের আর কেউ খুঁজে পাবে না!

গল্প শেষে যখন নিশীথ ঘুমিয়ে পড়লো, আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম দূরের ওই নক্ষত্রখচিত আকাশটাকে! কত কোটি উজ্জ্বল তারা সেখানে রয়েছে....কোন দূর মহাকাশে...! কাল চারুলতাকে নিয়ে বনছায়াপুর চলে যাচ্ছি এই গোবাদা ছেড়ে! বনছায়াপুরে আমাদের নতুর ঘর বাঁধবো আমার চারুলতাকে নিয়ে। তার গর্ভে এখন আমার সন্তান রয়েছে! একদিন আমিও ওখান থেকেই এসেছিলাম! আজ আমার সন্তান আসছে ওখান থেকেই! জীবন কত বিচিত্র! আজ এক ভাবি তো কাল এক হয়! একদিন মাকে মা ভাবতাম, আর আজ ভাবছি আমার স্ত্রী চারুলতা!!!

এসব ভাবতে ভাবতেই কখন পরম শান্তিতে দুই চোখে গভীর ঘুম নেমে এলো...‌কে জানে!
Reply
#43

পর্ব - ৪৩

ভোরে ঘুমটা ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। বৃষ্টি শুরু হবে নাকি! বাতাস বেশ জোরে বইছে! বৃষ্টি নামার আগেই আমাদের বেরোতে হবে।

আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। নিশীথ ঘুমোচ্ছে ওপাশে ফিরে। দরজা খুলে বাইরে এলাম। লতার ঘরের দরজা বন্ধ, তার মানে এখনও চারু ওঠেনি। একেই মেঘের এই অবস্থা, তার ওপর আবার চারু ঘুমোচ্ছে! বোধহয় কাল সারারাত মেয়ের সঙ্গে গল্প করে কাটিয়েছে। ওকে আর কি দোষ দেবো। এতদিন পরে মেয়েকে আবার ফিরে পেল! ভাবলাম ও একটু ঘুমোক, আমি সব বাগিয়ে নিই, তারপর ওকে ডাকবো। বেচারির সারাদিন তো পরিশ্রম কম যায় না!

আমি মুখ ধুয়ে চা বসালাম উনুনে। ব্যাগ হয়েছে মোট দুটো। বেশিরভাগই ফেলে যাচ্ছি। শুধু আমাদের দুজনের পোশাক, চারুর অলংকার, হাঁড়ি, কড়াই, ব্যস্ এই কটাই। রিনু আর মিনুকে রেখে যাচ্ছি, লতাই ওদের দেখভাল করবে। ওরা আজ গোয়ালেই থাক্। মেঘের যা অবস্থা, বের করা উচিৎ নয়।

এবার চারুকে ডাকা দরকার নয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। 

- চারু..... চারু....ওঠো দেরি হয়ে যাচ্ছে!

না, কোনো সাড়া পেলাম না। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। দরজায় হাত ছোঁয়ালাম। দরজা ভেজানোই ছিল। আমি ভেতরে ঢুকে দেখি লতা রতনকে নিয়ে ঘুমোচ্ছে, চারু নেই! 

- লতা, এই লতা....এই.....লতা.....তোর মা কোথায়?

লতা ঘুম জড়ানো গলায় চোখ না খুলেই বলে উঠলো,

- শেষ রাতে জ্যোৎস্না মাসির বাড়ি থেকে লোক এসেছিল, বললো মাসির শরীর খুব খারাপ, মাকে নিয়ে গেল সঙ্গে!

- মানে? তোর মা আমাকে না বলেই চলে গেল এভাবে?

- আমি জানিনা, তুই আমায় ঘুমোতে দিবি?

আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। জ্যোৎস্না মাসির শরীর খারাপ! হয়তো চারু আমি ঘুমোচ্ছি দেখে আর জাগায়নি আমাকে। আমাকে না বলেই নিজের দিদির শরীর খারাপের কথা শুনে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন আমি কি করবো? আজ যে যেতে হবে! সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে! কি করা যায় এখন?

- মাসি....দরজা খোলো!!!

জ্যোৎস্না মাসি হাসিমুখে দরজা খুলে দাঁড়ালেন। আর আমি বিস্মিত হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলাম। মাসিকে দেখে কোনো দিক থেকে মনে হচ্ছে না যে মাসির শরীর অসুস্থ। তবে! কি ঘটছে এসব!

- চারু....মানে মা এসেছে তোমার বাড়ি?

মাসি আকাশ থেকে পড়ল।

- না চয়ন। কেন বল দেখি? 

- তোমার শরীর খারাপ নয়?

- আমার কেন শরীর খারাপ হতে যাবে?

- তুমি লোক পাঠাওনি আমাদের বাড়িতে?

- আমি লোক পাঠাবো....কেন?

আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে লাগলো! তবে? চারু কোথায় গেল? আমার চারু....আমার চারু.... কোথায় তুমি? লতা বললো মাসির বাড়ি থেকে লোক এসে চারুকে নিয়ে গেছে....তবে ওই লোকগুলো কারা? ওরা চারুকে কোথায় নিয়ে গেছে? কি ঘটেছিল আজ শেষ রাতে? কি ঘটেছিল চারুর সঙ্গে? আমি কোথায় খুঁজবো তাকে এখন?

- চারু....!!!!!

যখন মাসি বাড়ি থেকে গোবাদায় ফিরলাম তখন দুপুর হয়ে গেছে। চারু এখন কোথায় কেমন অবস্থায় রয়েছে...আমি কিচ্ছু জানি না! গাঁয়ের মোড়লের সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায়।

- কি চয়ন, আজ যে চলে যাবে বলেছিলে?

- আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছিনা জেঠু....সে নিখোঁজ....আমায় সাহায্য করুন দয়া করে....আমার যে.... আমার যে আর কেউ নেই!!!!

আমি কেঁদে ফেললাম তার কাছে। তিনি কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

- কখন হলো?

- আজ শেষ রাতে...! লতা বললো কিছু লোক এসে মাসির শরীর খারাপের কথা বলে তাকে নিয়ে গেছে! আমি এখন কি করবো? 

- দাঁড়াও দাঁড়াও....উতলা হইয়ো না। দেখি আমি কি করতে পারি। তুমি বাড়ি যাও। আমি বিকেলের মধ্যে তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি।

- আমার মা...!!!

- কান্না থামাও চয়ন। যদি কোনো বিপদে সে পড়ে থাকে, তোমায় শক্ত থাকতে হবে। তুমি যাও। কিছু খেয়ে নাও। মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছে সকাল থেকে পেটে কিছু দাওনি।

বাড়ি ফিরে এলাম। বেঁচে থাকতে হলে যে খেতে হয়, সেকথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার প্রাণ যে আজ আমার কাছে নেই, এই স্থূল শরীরকে বাঁচাবার আর কি প্রয়োজন? 

- লতা!!!!

লতা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে বারান্দায়।

- মাসির শরীর এখন কেমন রে? 

- মাসি....মাসি কোনো লোক পাঠায়নি লতা....ওরা অন্য কোনো দলের লোক, চারুকে তুলে নিয়ে গেছে ওরা....চারু নিখোঁজ!!

- কি বলছিস তুই? মাসি কেমন আছে?

- মাসি সম্পূর্ণ সুস্থ!

- সুস্থ? তবে মা যায়নি ওখানে?

- ওটাই তো বলছি....চারু নিখোঁজ....তোর কি এই কথা কানে ঢুকছে না?

- এ বাবা....! মা গো....তুমি কোথায় গেলে? 

- কান্না থামা তুই...! নিশীথ কোথায়?

- ও একবার বনদুলি গেছে চাষের কাজে। কিন্তু মা... মা কোথায়?

- এখন আমি কি করবো লতা? কোথায় খুঁজবো চারুকে বলতে পারিস? কেন কাল তোর কাছে ওকে ছেড়েছিলাম....! আমার কাছে থাকলে ও আজ আমাদের মধ্যেই থাকতো রে....লতা...!!

আমি ভেঙে পড়লাম, লতাও কেঁদে চললো। কিন্তু এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। চারুর সঙ্গে এখন কি ঘটছে, কে জানে! না না না না.... আমি এভাবে বসে থাকতে পারবো না! এই দুনিয়ায় যেখানেই সে থাকুক.... খুঁজে আমি বের করবোই!

- আমি আসছি চারু....!!!

বাড়ি থেকে বেরোতে যাবো, গাঁয়ের মোড়ল জেঠু দুজন লোক নিয়ে এসে হাজির। আমি আর লতা তাদের দিকে চেয়ে রইলাম ভেজা চোখে।

- চয়ন, একটু বাইরে এসো!

আমি চারুর খবরের আশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। লতাও আসছিল, কিন্তু সে একজন মেয়ে, চারুর খবর শুনে চিন্তা করবে ভেবে তাকে আসতে মানা করলাম। কিন্তু লতা নাছোড়বান্দা, সেও শুনতে চায়। শেষে মোড়ল জেঠুই মানা করলো।

- লতা, থাক্ মা, তোমায় পরে জানাবো....আমরা তোমার দাদার সাথে একটু কথা বলে নিই আগে।

আমি তাদের সঙ্গে বাড়ির বাইরে গেলাম। কিছুদূর গিয়ে একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যিখানে গিয়ে সবাই দাঁড়ালাম। তারপর জেঠু শুরু করলেন তার কথা। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শোনা হয়ে গেলে আমার চারপাশ ওই কালো মেঘে ঢাকা আকাশটার মতোই অন্ধকার হয়ে এলো। তিনি যেটা বললেন, তা যদি সত্যি হয়, তবে আমার চারুর ভয়ঙ্কর বিপদ!

- কি করবো আমি এখন জেঠু?

- তুমি কিচ্ছু করবে না...। যা করার আমরা করবো। তবে শেষে তোমাকে প্রয়োজন হবে, তার আগে অবধি আমরাই যথেষ্ট। যা বললাম, যেভাবে বললাম, সেভাবেই করা চায়...একটু অন্যথা হলেই চারুকে হারিয়ে ফেলতে হবে তোমাকে চিরদিনের জন্য! মনে রেখো কথাটা! যখন আসতে বলা হয়েছে, চলে আসবে। আমরা যাচ্ছি!

তারা চলে‌ গেল। আমাকে তারা অতল কুয়োই ফেলে দিয়ে গেল। আমায় ওকে বাঁচাতেই হবে! এটা চারুর জীবনের প্রশ্ন...আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন....আমার ভালোবাসার প্রশ্ন!!!

বাড়িতে ঢুকতেই লতা এসে আমায় জড়িয়ে ধরলো কাঁদতে কাঁদতে। 

- কি বললো দাদা, মা কোথায়?

আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,

- এখনও তারা খুঁজে পায়নি। তবে চিন্তা নেই, ওরা খুঁজছে। সঠিক সময়ে জানাবে বলেছে।

- কিন্তু ওই লোকগুলো কারা? ওরা কি কিছুই জানতে পারেনি ওই লোকগুলোর ব্যাপারে?

- না, ওরা এই গাঁয়ের নয়। কেউ দেখেনি ওদের এর আগে এখানে!

- আমি কি নিশীথকে ডেকে পাঠাবো কারোকে দিয়ে?

- না থাক, ও যা কাজ করছে করতে দে, আমি আমার কাজ করি!

একটু আনমনেই বলে উঠলাম,

- নিশীথকে ওর কাজে এগিয়ে যেতে দে। আমিও দেখি আমি কতদূর এগোতে পারি!

- ও তো চাষের কাজে গেছে, দেখাশোনা করতে, ও তো আর চাষ করছে না নিজে। ওর চাপ তেমন নেই , ওকে ডেকে নিই বরং।  যদি কিছু সাহায্য করতে পারে আমাদের!

- না বললাম তো তোকে। 

- আচ্ছা!

- আচ্ছা লতা....ঠিক কখন ওই লোকগুলো এসেছিল রে?

- মানে...? মানে ঠিক বুঝলাম না!

- মানে জানতে চাইছি যে, তুই যে তখন বললি ওরা শেষ রাতে এসেছিল, ওটাই বলছি, ঠিক কখন এসেছিলো?

- আমি ঘুমোচ্ছিলাম, অত কি খেয়াল করেছি আমি!

- তাও ঠিক। ঠিক আছে। তুই যা। বরং একটু চা বানা। মাথাটা ধরে আছে‌। বোধহয় চা খেলে ঠিক হয়ে যাবে!

- কেন হঠাৎ এই প্রশ্ন করলি?

- কোনটা বলতো?

- ওই... ওই লোকগুলো কখন এসেছিল, ওটা জানতে চাইলি কেন?

- এমনি।

- ওহ্। তোর কি মনে হয়, মোড়লের লোক খুঁজে পাবে মাকে?

- মনে হয় না। যতটা বুঝলাম, ওরা কিছুই জানেনা। কেন বলতো?

- না, মায়ের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে রে!

- হ্যাঁ, সেটা তো আমি জানিই। তবে একটা কথা মনে হচ্ছে, কি জানিস?

- কি দাদা?

- চারুকে আর খুঁজে পাবো না রে। ওকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি মনে হয় চিরদিনের জন্য!

এই কথায় লতা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। তারপর কি ভেবে চলে গেল চা করতে। 

আমি নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম ভেতর থেকে। বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম এবার কি কি করতে হবে। অনেক কিছু ভেবে নিতে হবে এখন আমায় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। অনেক জাল ছাড়িয়ে নতুন কৌশল অবলম্বন করে তারপর বেরোতে হবে মাঝ রাতে। আজ রাতে অনেক কিছু ঘটতে চলেছে। তাই এখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়া প্রয়োজন! 

বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে মুষলধারায়। সন্ধ্যা নামলো বলে...।
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)