Yesterday, 09:03 AM
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ১
সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বাইরের বয়ে চলা নদীটার দিকে চোখ পড়লো। বর্ষার জলে ফুলে ফেঁপে উঠেছে তার বুক, কুল কুল করে তার উপর দিয়ে জলরাশি ছুটে চলেছে সাগরের সন্ধানে। কত কি মনে পড়ে এই জানালায় বসে! একদিন আমার স্ত্রী এইখানেই, এই বিছানায় আমার সঙ্গে বসে এই নদীর দিকে তাকিয়েই কত কথা শোনাতো আমায়, কত কত বার তার রূপে মোহিত হয়ে আমি বিছানায় তার পাশে শুয়ে তার ঠোঁটজোড়া নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে তার তরল আমার শরীরে শুষে নিয়েছি তার বড় বড় ডাগর দুখানি চোখের দিকে চেয়ে! আজ সেসব দিন কত দূরে! যেন কত শতক আমি বৃদ্ধাবস্থায় এখানটায় বসে আছি... একলা!
আমার নাতিটা এইসময় হঠাৎ পড়া ছেড়ে আমার কাছে এসে কোলের ওপর উঠে বায়না ধরলো,
- দাদু দাদু, আমায় ঠাম্মার গল্প বলো না... কতদিন শুনিনি!
আমি বললাম, শুরু করলাম আমার স্ত্রীর কথা...নাতির ছোটো ছোটো কৌতুহল ভরা উৎসুক দুই চোখে তাকিয়ে তার ঠাম্মার কাহিনী তাকে বলে যেতে লাগলাম।
কিন্তু সেই কাহিনী যে অসম্পূর্ণ! আমার আর আমার স্ত্রীর সম্পূর্ণ কাহিনী যে বলা যায় না কারোকে! আমার ছেলে, বউমা, বন্ধু, সবাই আমাদের কাহিনীর এক ভাগ জানে, অন্য ভাগ বলার সাহস আমার আর নেই! এইকথা আমার হৃদয়েই গোপনে জমা ছিল এতকাল। তাই ভাবলাম, আজ তোমাদের বলে যাই আমাদের কাহিনীর অন্য ভাগ-টা। কাহিনী সম্পূর্ণতা পেলে নাকি মন হালকা হয়! তাই যে ভাগ আমার হৃদয়ে এতোকাল চাপা পড়ে ছিল, যে ভাগ এই জগৎ সংসারের কাছে অজানা, যে ভাগ এই সমাজে নিষিদ্ধ, যে ভাগ আমায় প্রেমের অর্থ শিখিয়েছিল একদিন, আজ সেই ভাগ তোমাদের বলে আমার হৃদয়কে আমি খালি করবো!
এই কাহিনী আমার আর আমার স্ত্রীর, আমার স্ত্রী....চারুলতার এবং চারুলতা....আমার....মা!
আমাদের ছোট্ট গ্রাম, নাম গোবাদা। এখানকার সবাই চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত। চারপাশে যেদিকেই চোখ যায় শুধু সবুজ মাঠ আর ফসলের চাষ। একটা নদী বয়ে গেছে গ্রামের পাশ দিয়েই। সেখানে এই গ্রামের সকলেই যায় স্নান, বাসন ধোয়া, কাপড় কাঁচার জন্য। পানীয় জল পুকুর থেকে নেওয়া হয়। এখানকার মানুষজন বেশ সাদাসিধে, সরল প্রকৃতির। শহর থেকে অনেক দূরে এই ছোট্ট গ্রামে চাষবাস করে নিজেদের জীবন সুখে দুঃখে অতিবাহিত করে যায় সবাই।
আমাদেরও চাষবাস করেই সংসার চলে। বাড়িতে বাবা নয়ন, মা চারুলতা, আমি চয়ন আর আমার বোন লতা। আমাদের চারজনের ছোট্ট সংসার।
বাবার বয়স ৫৮। রোগা, লম্বা, জীর্ণ চেহারা। কম বয়স থেকেই অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য শরীরে একটা বুড়োটে ভাব চলে এসেছে এই বয়সেই। তার মুখে একটা বদমেজাজি রাগী খিটখিটে ভাব সর্বদাই। যৌবন থেকেই বাবা চাষবাস করেই জীবন জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে এবং একা আমাদের সকলকে মানুষ করেছে। কথা খুব কম বলে, যেটা বলে, তাও মায়ের সঙ্গে, আমাদের সঙ্গে খুব কম, প্রয়োজন পড়লে তবেই। আমরা এখনও রীতিমতো ভয় পায় বাবার সামনে পর্যন্ত যেতে। বাবা মা-কে সাধারণ কথাও ধমকে বলে, মা একটু ভীতু ও লাজুক স্বভাবের, তাই প্রায়ই বাবার কথায় নির্জনে বসে কাঁদতে থাকে। বাবা এমনই, কারোকে ঠিক সহ্য করতে পারে না!
মায়ের বয়স ৩৫, ঘোর শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ, মুখের চেহারায় এমন এক মিষ্টি শ্রী রয়েছে, তা না দেখলে অক্ষরে প্রকাশ করা মুশকিল, এককথায় অনন্য সুন্দরী আমার মা চারুলতা। মা স্বাস্থ্যবতী ও আদর্শ গৃহিণী। সন্তানদের প্রকৃতভাবে বড়ো করা এবং সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া, এই সংকল্প নিয়েছিল আজ থেকে একুশ বছর আগে যখন এই বাড়িতে প্রথম বউ হয়ে এসেছিল। মায়ের মুখে সর্বদাই একটা মন ভোলানো হাসি, যেন সেই হাসির মাঝেই লুকিয়ে আছে এই জগতের সব সৌন্দর্য্য! যখন কোনো কারণে কষ্ট পায়, মায়ের কাছে গিয়ে বসি, মা আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, গল্প করে, আমার মন দুঃখ ভুলে মায়ের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠে। কখন কি খাবো, কি করলে এই সংসারে মঙ্গল হবে, কি করা উচিত নয়, কোন সময়ে কি চাষ করলে ফলন ভালো হতে পারে, কোন সময় বাবার কাছে আমাদের যাওয়া উচিৎ নয়, মা সব জানে। কিন্তু একটাই তার ভুল, সে অতি সরল প্রকৃতির, যে যা বলে সহ্য করে নেয়। তাই এই সংসারে মায়ের কোনো গুরুত্ব নেই, না বাবা তাকে ভালোবাসা দেয়, না বোন সম্মান। সত্যি বলতে একমাত্র আমিই মায়ের খোঁজ রাখি, মায়ের কাছে বসে তার দুটো মনের কথা শুনি, মায়ের চোখের জলের গুরুত্ব দিই! কিন্তু তবুও এই একুশ বছরের দীর্ঘ অভাবের সংসার মাকে যেন এক সবজান্তা মঙ্গলময়ী করুণাময়ী এক নারীতে পরিণত করেছে, আর সেই নারীর-ই সন্তান আমি!
আমি চয়ন, বয়স ২০, সবে কলেজ শেষ করে বসে আছি বাড়িতে। চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি আর বাবাকে চাষবাসে সাহায্য করছি। আমি বেশ লম্বা বাবার মতো, প্রায় ৬'১ ফুট, গায়ের রঙ মায়ের মতোই শ্যামবর্ণ। মুখে একটা পুরুষালি সৌন্দর্য্য ও ব্যাক্তিত্ব রয়েছে আমার, সবাই বলে, বিশেষ করে মা বলে। চাষবাসের কাজ, ব্যায়াম করে আমার শরীর তাগড়া হয়ে উঠেছে এই বয়সেই। এককথায় পেশীবহুল পেটানো শরীর আমার। প্রেম কোনোদিন করিনি, একটা মেয়ে আমায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল কলেজের ফাইনাল ইয়ারে, এই বছরেই, কিন্তু আমি না বলে দিয়েছিলাম। বাইরের কোনো মেয়ের প্রতি আকর্ষণ আমি অনুভব করি না, কেন করিনা তা আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি। মেয়েটার স্বাস্থ্য ভালো, দেখতেও বেশ মিষ্টি, নাম রুমা। কলেজে না গেলে সে আমায় সেদিনকার নোটস দিতো, আমাদের অভাবের কারণে অনেক বই প্রয়োজন থাকলেও কিনতে পারিনি, সেসব বই সে আমায় পড়তে দিতো ভালোবেসে। কিন্তু আমি স্রেফ বন্ধু ভেবেই তার সব সাহায্য নিয়ে এসেছিলাম। তাই বলে এই নয় যে যৌন মিলন কি তা জানি না। আমি সব জানি, এতোটাই যে যারা এসব করে বেড়াই, তাদের চেয়েও গভীর আমার মন। কিন্তু ওই একটাই সমস্যা, মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ আসেনি আমার এখনও। হয়তো আসবে পরে। সবার তো সব জিনিস এক হয়না। তবে আমার ব্যাপারে একটা কথা বলতে হয় যে, আমি আজ পর্যন্ত কোনোদিন বীর্যপাত করিনি, মানে হাতে ধরে খেঁচিনি, স্বপ্নদোষ হয় মাঝে মাঝে, কিন্তু নিজে করিনি। জানি না, বোধহয় তারও উপযুক্ত সময় আসেনি আমার জীবনে!
আমার বোন লতা, আমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোটো, এবছর ১৯ -এ পড়লো, দেখতে অসম্ভব সুন্দরী। বাবার গৌরবর্ণ আর উচ্চতা পেয়ে বেশ দেখতে হয়েছে সে। পড়াশোনায় ভালো। কলেজে এই সেকেন্ড ইয়ার তার, ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পড়ছে। খোঁজ নিয়ে দেখেছি সে একজনকে পছন্দ করে, কিন্তু তার নাম জানতে পারিনি। আমাকে ও সব মনের কথা বলে না। একটু চাপা ও রাগী স্বভাবের। ওর এই ব্যাপারটা যদি জানতে পারে বাবা, মেরে পিঠের ছাল উঠিয়ে দেবে ওর। তাই ওকে আমি সুরক্ষা দিয়ে আসছি... গোপনে।
গ্রীষ্মের দুপুরবেলা। তখন আমাদের জমিতে আউশ ধান চাষ চলছে। বাবা মাঠে, আমি বাড়িতে চাকরির জন্য পড়াশোনা করছি, লতা কলেজে আর মা বারান্দায় বসে আমার একটা পুরনো জামা সেলাই করছে আর গুন গুন করে গাইছে একটা মধুর অথচ বেদনাভরা গান। তা শুনে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়! বই ফেলে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি দূরের মাঠের শেষে আকাশ প্রান্তে...মনটা কেমন হয়ে ওঠে!
আমাদের বাড়িটা মাটির, খড়ের ছাউনি, তিনটি ঘর, একটায় বাবা মা, একটায় আমি, আরেকটায় লতা থাকে। বাড়ির সামনে লম্বা বারান্দা, সেখানেই একপাশে রান্না করে মা। পাঁচিল দেওয়া উঠোন। উঠোনটা অনেকটা বড়ো। উঠোনের একদিকে ফুলগাছ অনেকগুলো, অন্যদিকে আম, পেয়ারা, পেঁপে, আর কাঁঠাল গাছের জঙ্গল। এদের ছায়া আমাদের বাড়ির খড়ের ছাউনিতে পড়ে এই গ্রীস্মকালে বেশ আরাম দেয়।
মা জামা সেলাই করতে করতেই আমায় ডাক দেয়,
- চয়ন, এদিকে আয় বাবা।
আমি বই ফেলে বাইরের বারান্দায় গিয়ে দেখি মা হাসিমুখে হাতের জামা তুলে আমায় দেখাচ্ছে। মায়ের হাতের গুণে আমার পুরনো ছেঁড়া জামা যেন নতুনভাবে সেজে উঠেছে। এই জামা পরেই আমি কাল যাবো একটা ইন্টারভিউ দিতে। আমরা গরীব, আমরা এতেই অনেক খুশি থাকি!
- ছেঁড়া টা কোথায় গেল মা? এটা তো নতুনের মতো লাগছে গো একেবারে!
বলে আমি জামাটা হাতে তুলে দেখতে লাগলাম এদিক ওদিক করে। সত্যিই মায়ের হাতে জাদু আছে! আমি মাকে বলিওনি সেলাই করতে, শুধু বলেছিলাম এই জামাটা পরে যাবো। মা জামা দেখে বুঝেছিল জামার সেলাই ছিঁড়ে গেছে অনেক জায়গায়, দুপুরের কাজ সেরে বসে আমার সমস্যা মা মিটিয়ে দিলো! মা মা-ই হয়! আমি জামাটা দেখে খুশি হয়ে মাকে বসা অবস্থায় জড়িয়ে ধরলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
- তোর এই চাকরিটা হয়ে যাবে দেখিস....!
যদি জানতাম অদৃষ্ট কি বস্তু, যদি জানতাম একটা সামান্য কথা কত কি বয়ে আনতে পারে আমাদের জীবনে, যদি জানতাম এই কথায় সবকিছু ওলট পালট হয়ে যাবে, তাহলে হয়তো মায়ের পায়ে সেদিন আমি কান্নায় লুটিয়ে পড়তাম আর প্রার্থনা করতাম এমনটা যেন না হয়! কিন্তু আজ যখন নিজের ঘরের জানালায় বসে বয়ে চলা নদীর জলরাশির দিকে নিঃশব্দে চেয়ে থাকি, ভাবি আমার জীবন কথা, বুঝতে পারি, যা হয়েছিল, ভালোর জন্যই হয়েছিল। মায়ের সেই একটা কথা আমার জীবনে কি ঘটিয়ে দিলো, তা সময়-ই বলে যাবে!
মায়ের কথায় আনন্দে আবেগে মায়ের কোলে শুয়ে পড়লাম। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো মায়ের। মা হয়তো মনে মনে ভাবছে,
- চাষবাস করে চারজনের পেট চলে, কিন্তু সামান্য এক টুকরো শখ-ও মেটাতে পারিনা ছেলে মেয়েটার। আজ এই চাকরিটা যদি হয়ে যায়! আমি জানি হয়ে যাবে...তাহলেই আমার মুক্তি! ছেলেটা নিজের জীবনের শখ পূরণ করতে পারবে, লতার বিয়ে দেবে, আমাদের বুড়ো বুড়িকে দেখতে হবে না। ওরা ভালো থাকুক, যেখানেই থাকুকনা কেন, আমরা খুশিই থাকবো। চয়ন....আমার সোনা মানিক....বাবার সঙ্গে চাষবাস, তারপর চাকরির জন্য কত রাত জেগে পড়াশোনা করা.... তোর এবার চাকরিটা হয়ে যাবে বাবা!
আমার দুই চোখেও জল ভরে এলো। মায়ের কোলে শুয়ে মায়ের কোমর জড়িয়ে কিছুক্ষণ মায়ের আদর খেলাম। তারপর উঠে গিয়ে মাঠে চলে গেলাম। বিকেলে অনেক কাজ থাকে জমিতে। মা আমার জামা আমার ঘরের তারে ঝুলিয়ে রেখে বিকেলের চা বানাতে বসলো।
যখন মাঠ থেকে ফিরলাম, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লতা নিজের ঘরে পড়ছে। মা বারান্দায় চা মুড়ি সাজিয়ে আমাদের বাপ বেটার মাঠ থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে আছে। তখনকার সময়ে গ্রামে বিদ্যুৎ থাকেনি। লন্ঠন, হ্যারিকেন জ্বেলেই আমরা সব কাজ করতাম। ওটাই তো তখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। সবই অভ্যাস!
আমি আর বাবা ঘরের পেছনের পুকুরে গেলাম হাত পা ধুতে, মা পুকুরপাড়ে লন্ঠন ও গামছা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল হাসিমুখে।
কাল আমার ইন্টারভিউ শহরে, ভোরে বেরিয়ে ১৫ কিলোমিটার সাইকেলে করে গেলে স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন ধরে শহরে যেতে তিন ঘন্টা লাগবে। তারপর ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যাবে। তাই মা আজ রাত জেগে পড়াশোনা না করে ঘুমিয়ে পড়তে বললো, ভোর চারটেই ওঠা আছে।
হাত মুখ ধুয়ে পাড়ে উঠতে যাবো, পা পিছলে গিয়ে পুকুরের জলে পড়ে গেলাম। মা লন্ঠন নামিয়ে রেখে ছুটে এসে হাত বাড়িয়ে তুললো আমায়। বাবা রেগে গিয়ে আমার দিকে না তাকিয়েই গজগজ করতে করতে পাঁচিলের দরজা দিয়ে উঠোনে চলে গেল। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাবা রাগী জানি, কিন্তু আমাকে কি বাবা ভালোও বাসেনা! যাইহোক, মায়ের হাত ধরে পাড়ে উঠে বসলাম। লন্ঠনের আলোয় দেখলাম ডান পায়ের হাঁটুর নীচের চামড়া অনেকটা ছিঁড়ে গিয়েছে। মা আমায় ধরে সঙ্গে নিয়ে ঘরের বারান্দায় বসালো। তারপর পা মুছে দিয়ে তার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে ফেলে ডগার দিকটা দু টুকরো করে ছিঁড়ে সেই কাপড় দিয়ে আমার পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো। মায়ের চোখে জল, বললো,
- ব্যাথা হচ্ছে সোনা?
- না মা, কমে এসেছে।
বলার সময় লক্ষ্য করলাম মায়ের চোখের জল আমার ডান পায়ের হাঁটুর ওপর কয়েক ফোঁটা ঝরে পড়লো। মাকে কাঁদতে দেখলে আমার ভালো লাগে না, মনটা কেমন হুঁ হুঁ করে ওঠে। আমাদের কথা শুনে ঘর থেকে লতা ছুটে এসে আমার পা টা দেখে বললো,
- কি করে আর কাল যাবি? এতো বড়ো ছেলে, পুকুরপাড়ে পড়ে গেলি?
মা এই কথায় প্রতিবাদ করে বলে,
- লতা, ছেলেটা পড়ে গেছে, আর তোর একটুও কষ্ট হচ্ছে না? ওই ছেলেটাই তোর বিয়ে দেবে বলে রাত দিন জেগে পড়াশোনা করছে একটা চাকরির জন্য, বাবার সাথে মাঠে যাচ্ছে দুটো টাকার জন্য।
- সে আমি কি করবো মা? আমি তো আর দাদাকে ঠেলে ফেলিনি!
এমনসময় পাশ থেকে বাবা ঝাঁঝিয়ে উঠলো,
- এই ছেলের কিচ্ছু হবে না, না চাকরি না চাষবাস... শুধু বসে বসে বাপের অন্ন গিলবে!
এই কথায় আমি যত না কষ্ট পেলাম, মা পেলো শতগুণ বেশি। মা শাড়ির ছেঁড়া আঁচলে মুখ চেপে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে গেল, বলতে বলতে গেল,
- ওগো তোমরা সবাই মিলে ওকে এতো কষ্ট দিও না গো, আমি যে এই কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না!
আমার চোখেও জল ভরে এলো। আর রাতের খাবার মুখে তোলার কথা মাথায় এলো না। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বিছানায় বসে বইগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। সত্যিই কি আমার কিছু হবে না! সত্যিই কি আমি দূর্ভাগা!
কখন যে আমি এসব ভাবতে ভাবতে খালি পেটে বইয়ের ওপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই, ঘুমটা ভাঙলো মায়ের হাতের ছোঁয়ায়। মা আমার পাশে ভাত ও সবজি ভর্তি থালা নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আবেগে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মা এক হাত দিয়ে আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো,
- যখন খারাপ সময় আসে, তখন বুঝবি কেউ তোকে ভালোবাসবে না, সবাই দূরে ঠেলে দেবে....কিন্তু তোর ভালো সময় আসবে চয়ন, দেখবি সেদিন তোর যা স্বপ্ন আছে সব পূরণ হবে...সব!
মা...তুমি সত্যিই করুণাময়ী! মনে মনে মাকে বললাম,
- যখন খারাপ সময় এলো, তুমি তো আমায় দূরে ঠেলে দাওনি মা!
আমার দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ে মায়ের কোমরের শাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে। মা তার কোমর থেকে মুখ তুলে আমার কপালে স্নেহের চুম্বন এঁকে বললো,
- খেয়ে নে সোনা, সেই কখন দুপুরে দুটো ভাত খেয়েছিস!
বলে মা আমায় নিয়ে মেঝেতে বসলো। সবজি দিয়ে ভাত মেখে হাতে করে মা আমায় খাইয়ে দিতে শুরু করলো। মা এমন প্রায়ই করে। যখন খুব আনন্দে থাকে আর যখন খুব দুঃখে থাকে, এই দুই বিপরীত অবস্থায় মা আমায় খাইয়ে এসেছে। এটা চিরাচরিত এক রীতি হয়ে গেছে, আগেও দেখেছি....কিন্তু আজ ঘটলো অন্য কিছু....এলো এক নতুন অনুভূতি! জীবনে এই প্রথম...আমি এক নারীর.... স্বাদ পেলাম....সেই নারী....আর কেউ নয়....আমার নিজের মা.... চারুলতা!!!
আমার ডান পাশে আমার দিকে মুখ করে মা খাইয়ে দেওয়ার সময় মায়ের বাঁ দিকের নরম স্তন আমার ডান কনুইয়ে চাপ দিলো অল্প! এই ঘটনা আগেও ঘটেছে। খাওয়ানোর সময় বা সাধারণ আর পাঁচটা কাজ করার সময় মায়ের স্তন আমার অঙ্গে অঙ্গে স্পর্শ হয়েছে। ঘটনা একই, শুধু অনুভূতিটা ভিন্ন! আজ এই মুহূর্তে জীবনে এই প্রথমবার জেগে থাকা অবস্থায় যৌন অনুভূতি আমার গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো ধীরে ধীরে, কারণ এর আগে যে স্বপ্নদোষ কিছুবার হয়েছিল, তা জেগে থেকে হয়নি! এটা ঠিক তীব্র যৌন উত্তেজনা নয়, আবার তা স্নেহ-মমতাও নয়। যেন সেই অনুভূতিতে আরামের সঙ্গে মিশেছে খুব সূক্ষ্ম এক যৌনতার গন্ধ, যা আমার মাথা থেকে শুরু করে তলপেট বেয়ে আমার লিঙ্গের ডগায় সুড়সুড়ি দিলো অল্প!
মা খাইয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমার মনে উঠেছে আজ প্রবল ঝড়!
আমি শুরুতে এই অনুভূতির আনন্দে কিছুটা ঘোরাচ্ছন্ন থাকলেও, ধীরে ধীরে পাপবোধ আমায় গ্রাস করা শুরু করলো। ছিঃ, এগুলো আমি চিন্তা করছি? মা, সে আমার মা! আমায় জন্ম দিয়েছে! নেহাৎ চরিত্র অন্ধকার না হলে কারোর এমন চিন্তা মাথায় আসতেও পারে না। তাহলে কি আমার চরিত্র অন্ধকারে গ্রাস করা শুরু করলো? কই না তো...! আজ অবধি একজন নারীর দেহ স্পর্শও করিনি আমি, না তাদের নিয়ে কুচিন্তা করেছি। তবে? এটা কি ছিল? যে চিন্তা আমার পবিত্র হৃদয়ে মায়ের মাতৃত্বে অন্য রূপ দিতে এসেছিল, সেই চিন্তা কেন এলো? কেন?
মা কখন খাইয়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল, কখন আমি শুয়ে পড়েছিলাম, কখন শুয়ে শুয়ে চাকরি, ইন্টারভিউ ও ভোরের ট্রেনের কথা ভুলে জানালা দিয়ে বাইরের নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে চেয়ে থেকে মায়ের নিয়ে সেই কুচিন্তাকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, তবে এটুকু আমার অবচেতনে মন সে রাতে ঘুমোবার আগে ফিসফিসিয়ে আমায় বলে গেল....
- মা-ই সব!
(ক্রমশ....)
পর্ব - ২
ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১১ টা বেজে গেল। সাইকেলটা উঠোনের এক কোনে রেখে দেখি মা বারান্দায় লন্ঠন জ্বালিয়ে মুখ নামিয়ে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। আমি উঠোনে অন্ধকারের দিকটায় সাইকেল রাখছিলাম বলে মা দেখতে পায়নি আমায়। বোধহয় বাবা আর লতা শুয়ে পড়েছে নিজেদের ঘরে। আমি কাছে যেতেই মা বারান্দা থেকে উঠে চোখের জল মুছে মুখে হাসি ফুটিয়ে আমার কাছে এসে জিগ্যেস করলো,
- ফিরেছিস সোনা....তোর পায়ের ব্যাথাটা আর নেই তো?
এই হলো আমার মা! ইন্টারভিউ কেমন হলো, চাকরি হবে কিনা, এসব নয়, নিজের সন্তান কেমন আছে, এই তার একমাত্র কৌতূহল! আমি আমার ইন্টারভিউয়ের জন্য আগে থেকেই উত্তেজিত হয়ে ছিলাম। তাই দুই হাতে মায়ের কাঁধ দুটো ধরে হেসে বললাম,
- মা আমার ব্যাথা নেই, তবে ইন্টারভিউ খুব খুব খুব ভালো হয়েছে মা.... খুব ভালো হয়েছে!
মায়ের চোখ জলে ভরে আসে। আমি মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম,
- আয় কেঁদো না মা, এই চাকরিটা হয়ে গেলে দেখবে আর আমাদের কোনো দুঃখ থাকবে না... তোমার মুখে আমি হাসি ফোটাবো।
বলে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- সেই সকালের পর আর কিচ্ছু পেটে দিইনি মা, রান্না করেছো?
মা হাসতে হাসতে আমায় নিয়ে গেল বারান্দায়। তারপর বললো,
- আমি তোর জন্য পুকুর থেকে জল এনে রেখেছি বালতিতে ওখানে, হাত মুখ ধুয়ে আয়, আমি খেতে দিচ্ছি।
এই মায়ের কোলে যেন বারে বারে ফিরে আসি! কাল পুকুরে পড়ে গিয়েছিলাম বলে আজ আমি বাড়ি ফেরার আগেই মা আমার জন্য জল এনে রেখেছে যাতে আমায় পুকুরের পিচ্ছিল ঘাটে আর না যেতে হয়। কত কিছু নিয়ে মা তুমি ভাবনায় থাকো.... সংসারের দারিদ্র, স্বামীর অপমান, মেয়ের কুকথা আর ছেলের চিন্তা! এই এক শরীরে আর কত কি বয়ে বেড়াবে মা তুমি!
আমি ব্যাগ রেখে খালি গায়ে একটা গামছা পরে গেলাম উঠোনে। সেখানে মায়ের আনা বালতি ভর্তি জল নিয়ে হাত মুখ ধোয়া নয়, একেবারে স্নান-ই করে নেবো ভাবলাম। এই গরমে সারাদিনের ঘাম বসে আছে শরীরে, তার ওপর স্নান করে গা ঠান্ডা না করলে ঘুম আসবে না আমার। আমি গায়ে সাবান ঘষতে ঘষতে মাকে দেখতে লাগলাম। মা তখন বারান্দায় বসে দুটো থালায় ভাত তরকারি সাজাচ্ছে। বুঝলাম মাও খায়নি এখনও। আজ অবধি কোনোদিন দেখলাম না আমায় খাওয়াবার আগে মা খেয়ে নিয়েছে। মায়ের স্নেহ যে এমনই! আমি মায়ের দিকে তাকিয়েই ছিলাম, মা একবার আমার দিকে চেয়ে হাসলো , তারপর আবার খাবারে মন দিলো।
মা একটা হালকা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে আজ। ঘোর শ্যামাঙ্গিণী মা, তাই এই হলুদ রঙের শাড়িতে মাকে সামান্য লন্ঠনের আলোয় অসম্ভব সুন্দরী দেখাচ্ছে। যেন এক ডানা কাটা পরী আকাশ ছেড়ে গাঁয়ের এক ছোট্ট মাটির ঘরে নেমে এসে এক বাঙালী নারী রূপে এই সংসার সামলাচ্ছে, অবিরাম, কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই। চুল খোলা রেখেছে মা, সেগুলো পিঠ ও বুকের ওপর এদিক ওদিক দুলছে মায়ের নড়াচড়ায়। মায়ের মুখে যে দুঃখী ভাবটা বাড়ি ফিরে দেখছিলাম, তা যেন অদৃশ্য হয়ে এক সারল্য ভরা প্রশান্তি ফুটে উঠেছে মায়ের সারা মুখমন্ডলে। এই মাকেই আমি দেখতে চাই, চোখের জলে নয়, দুঃখের বন্ধনে নয়, সুখ ও হাসির পরশে মায়ের জীবনকে আমি পরিপূর্ণ রূপ দিতে চাই....দেবো, আমি দেবো একদিন!
যখন খাওয়া শেষ হলো, দেখলাম মা নিজের ঘরে না গিয়ে বারান্দার এক কোনে বসে আছে। আমার দিকে চেয়ে বললো,
- সোনা তুই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়, এই ক্লান্ত শরীরে আর দাঁড়িয়ে থাকিস না।
আমি বললাম,
- তুমি ঘুমোবে না? এইখানে যে বসে গেলে?
মা মাথা নীচু করে আনমনে কি ভাবতে ভাবতে বললো,
- নারে, আমার আজ ঘুম পাচ্ছে না। মাথাটা ধরে আছে, একটু বসি, কমে গেলেই চলে যাবো।
আমি বুঝলাম মায়ের এই কথা সত্যি নয়। মাকে এভাবে আমি এর আগেও বহুবার সবার আড়ালে সরে এসে একলা নির্জনে বসে থাকতে দেখেছি, বসে বসে অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজের দোষকে খুঁজতে দেখেছি। তাই কাছে গিয়ে মায়ের পাশে বসে বললাম,
- কি হয়েছে সত্যি করে বলোতো মা....।
মা চুপচাপ। আমি আবার এক কথা জিগ্যেস করাতে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো তার কোলের ওপর। আমি এবার মায়ের হাত ধরে বললাম,
- আমি তো তোমার ছেলে মা, আমিই তো সব, তুমি আমাকেই বলবে না?
তারপর মায়ের ঠোঁটে কথা ফুটলো। যা বললো তা সংক্ষেপে এরকম, আজ বিকেলে লতা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরেনি দেখে বাবা গিয়েছিল খুঁজতে। কিছুদূর গিয়ে বাবা দেখতে পায় সেখানে একটা নির্জন বড়ো দীঘির পাড়ে গাছতলায় লতা একটা ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় বসে। ব্যস্। পাশেই একটা ছোটো খেজুর গাছ ছিল। তার ডাল ভেঙে পাতা ছাড়িয়ে মারতে মারতে তাকে বাড়ি নিয়ে আসে বাবা। তারপর তাকে তার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়। এখানেই শেষ নয়, বাবার রাগ এবার সবে শুরু হয়। লতার ওপর থেকে সব দোষ তুলে বাবা মায়ের ওপর তা চাপিয়ে দিয়ে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে মাকে একটা চড় মারে এই বলে যে, মা নাকি নিজের মেয়েকে মানুষ করতে পারেনি, মা নাকি 'মা' হওয়ার যোগ্যই নয়! তারপর থেকে বাবা তার ঘরে মাকে আর ঢুকতে দেয়নি। মা...সে তো আর রাগ করে থাকতে পারে না স্বামীর ওপরে, না মেয়েকে না খাইয়ে শাস্তি দিতে পারে! সম্পূর্ণ বিনা দোষে বাবার কথার আঘাত ও চড় সহ্য করেও মা রান্না করেছিল, বাবার ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে এসেছিল, লতার ঘরে তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে খাইয়ে দিয়ে এসেছিল। তারপর থেকেই ওভাবে বারান্দায় আমার অপেক্ষায় বসেছিল। সেই বিকেলের পর থেকে বাবা আর একটাও কথা বলেনি মায়ের সঙ্গে।
যা ভেবেছিলাম তাই হলো, লতার সব কান্ড বাবা জেনে গেলো। এই ঘটনা আমায় আঘাত দেয়নি, লতা বড়ো হয়েছে, প্রেম করছে, আর তা একদিন জানাজানি হবেই, এটা স্বাভাবিক, আঘাত পেলাম মায়ের অপমানে! এই সংসারের সব ভুল, সব খারাপ আর সব দূর্ভাগ্যের জন্য মাকেই দোষী হতে হয় বারবার। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না! কতোবার, কতোবার আমি আমার প্রাণপ্রিয় মায়ের চোখের জল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবো! কতোবার তাকে মিথ্যা সান্তনা দেবো যে সব ঠিক হয়ে যাবে, বাবা শুধরে যাবে! কতোবার তার দুঃখে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলবো চোখের জল তোমার এতো অল্প মূল্যের নয় মা! আমার রাগ প্রবল, শুধু প্রকাশটা কম হয় মাত্র, কিন্তু যখন হয়, তখন এর তাপ যে কেউ সহ্য করতে পারে না!
আমি মাকে ওখানে বসিয়ে রেখে বাবার ঘরের দরজা সজোরে ধাক্কা দিয়ে দড়াম করে খুলে ভেতরে ঢুকে 'বাবা' বলে চিৎকার করে উঠলাম। বাবা ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমের মধ্যে এতো চিৎকারে ভয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো। আমার চোখ দিয়ে তখন আগুনের হলকা বেরিয়ে আসছে। আমি ক্রুদ্ধ স্বরে বললাম তাকে,
- তুমি মায়ের গায়ে হাত তুলেছো?
বাবার ঘুমের ঘোর তখন আমার চিৎকারে ভঙ্গ হয়ে রেগে গিয়ে উত্তর দিলো,
- তুলেছি। ভুল করলে আরও মারবো।
এই কথায় আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। মা কি কোনো ভৌত বস্তু নাকি যে রাগ হলেই তাকে ছুঁড়ে ফেলা যায়! এই তার ভালোবাসা নিজের স্ত্রীর জন্য! নাকি নিজের যৌবন শেষ হয়ে গেছে বলে মাকে একজন সংসার চালানো দাসী ভেবে ফেলেছে সে! আমি গর্জে উঠলাম,
- না, আর নয়, আর একটা আঘাতও নয়। এই শেষ!
বলে দরজা টা আবার দড়াম করে ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাবার ঘর থেকে। বাইরে এসে দেখি মা চোখে জল নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবার ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের হাতটা ধরে বললাম,
- চলো, আজ থেকে তুমি আমার কাছে শোবে। বাবার সঙ্গে তোমায় আমি আর থাকতে দেবো না।
মা আমায় আটকায়, কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
- ওরকম বলিসনা বাবা, আমি দোষ করেছি বলেইতো মেরেছে। বারে, ভুল করলে তো তাকে শাস্তি দিতে হবে, নয়তো যদি আমি বারে বারে ভুল করি!
- না মা, ভুল তুমি নিজে করোনি, শুধু তোমার একটাই ভুল....সরল মন নিয়ে সবার কথা মেনে নেওয়া আর সব.... সবকিছু সহ্য করে নেওয়া! তবে আর, আর আমি তোমায় কষ্ট পেতে দেবোনা মা!
- এরকম করিস না বাবা, আমি আজ রাতে তোর বাবার কাছে না গেলে যে তোকে ও মেরে শেষ করে দেবে কাল!
আমি থামলাম। শুধু থামলাম না, আমি অবাক হলাম। মায়ের 'রাতে বাবার কাছে যাওয়া' - এই কথাটা ঠিক স্বাভাবিক ভাবে আমার মনে প্রবেশ করলো না। রাতে যাওয়া মানে? রাতে মা বাবার কাছে গেলে বাবা আর আমায় মারবে না? কেন? মা কোন পথে বাবার রাগ ঠান্ডা করবে? মা কি করতে চলেছে?
মা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে নিঃশব্দে বাবার ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো। আমি নিজের ঘরে চলে এলাম।
আর কি চিন্তা করবো? কিইবা বাকি আছে চিন্তা করার? লন্ঠনের আলো নিভিয়ে দিয়ে জানালার কাছটায় এসে শুয়ে পড়লাম। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আজ পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ। তার রূপোলী আলো আমার ঘরে ঢুকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক মায়াবী আবহ সৃষ্টি করেছে। আমি ওই চাঁদের দিকে চেয়ে কত কি ভাবতে লাগলাম!
ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১১ টা বেজে গেল। সাইকেলটা উঠোনের এক কোনে রেখে দেখি মা বারান্দায় লন্ঠন জ্বালিয়ে মুখ নামিয়ে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। আমি উঠোনে অন্ধকারের দিকটায় সাইকেল রাখছিলাম বলে মা দেখতে পায়নি আমায়। বোধহয় বাবা আর লতা শুয়ে পড়েছে নিজেদের ঘরে। আমি কাছে যেতেই মা বারান্দা থেকে উঠে চোখের জল মুছে মুখে হাসি ফুটিয়ে আমার কাছে এসে জিগ্যেস করলো,
- ফিরেছিস সোনা....তোর পায়ের ব্যাথাটা আর নেই তো?
এই হলো আমার মা! ইন্টারভিউ কেমন হলো, চাকরি হবে কিনা, এসব নয়, নিজের সন্তান কেমন আছে, এই তার একমাত্র কৌতূহল! আমি আমার ইন্টারভিউয়ের জন্য আগে থেকেই উত্তেজিত হয়ে ছিলাম। তাই দুই হাতে মায়ের কাঁধ দুটো ধরে হেসে বললাম,
- মা আমার ব্যাথা নেই, তবে ইন্টারভিউ খুব খুব খুব ভালো হয়েছে মা.... খুব ভালো হয়েছে!
মায়ের চোখ জলে ভরে আসে। আমি মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম,
- আয় কেঁদো না মা, এই চাকরিটা হয়ে গেলে দেখবে আর আমাদের কোনো দুঃখ থাকবে না... তোমার মুখে আমি হাসি ফোটাবো।
বলে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- সেই সকালের পর আর কিচ্ছু পেটে দিইনি মা, রান্না করেছো?
মা হাসতে হাসতে আমায় নিয়ে গেল বারান্দায়। তারপর বললো,
- আমি তোর জন্য পুকুর থেকে জল এনে রেখেছি বালতিতে ওখানে, হাত মুখ ধুয়ে আয়, আমি খেতে দিচ্ছি।
এই মায়ের কোলে যেন বারে বারে ফিরে আসি! কাল পুকুরে পড়ে গিয়েছিলাম বলে আজ আমি বাড়ি ফেরার আগেই মা আমার জন্য জল এনে রেখেছে যাতে আমায় পুকুরের পিচ্ছিল ঘাটে আর না যেতে হয়। কত কিছু নিয়ে মা তুমি ভাবনায় থাকো.... সংসারের দারিদ্র, স্বামীর অপমান, মেয়ের কুকথা আর ছেলের চিন্তা! এই এক শরীরে আর কত কি বয়ে বেড়াবে মা তুমি!
আমি ব্যাগ রেখে খালি গায়ে একটা গামছা পরে গেলাম উঠোনে। সেখানে মায়ের আনা বালতি ভর্তি জল নিয়ে হাত মুখ ধোয়া নয়, একেবারে স্নান-ই করে নেবো ভাবলাম। এই গরমে সারাদিনের ঘাম বসে আছে শরীরে, তার ওপর স্নান করে গা ঠান্ডা না করলে ঘুম আসবে না আমার। আমি গায়ে সাবান ঘষতে ঘষতে মাকে দেখতে লাগলাম। মা তখন বারান্দায় বসে দুটো থালায় ভাত তরকারি সাজাচ্ছে। বুঝলাম মাও খায়নি এখনও। আজ অবধি কোনোদিন দেখলাম না আমায় খাওয়াবার আগে মা খেয়ে নিয়েছে। মায়ের স্নেহ যে এমনই! আমি মায়ের দিকে তাকিয়েই ছিলাম, মা একবার আমার দিকে চেয়ে হাসলো , তারপর আবার খাবারে মন দিলো।
মা একটা হালকা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে আজ। ঘোর শ্যামাঙ্গিণী মা, তাই এই হলুদ রঙের শাড়িতে মাকে সামান্য লন্ঠনের আলোয় অসম্ভব সুন্দরী দেখাচ্ছে। যেন এক ডানা কাটা পরী আকাশ ছেড়ে গাঁয়ের এক ছোট্ট মাটির ঘরে নেমে এসে এক বাঙালী নারী রূপে এই সংসার সামলাচ্ছে, অবিরাম, কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই। চুল খোলা রেখেছে মা, সেগুলো পিঠ ও বুকের ওপর এদিক ওদিক দুলছে মায়ের নড়াচড়ায়। মায়ের মুখে যে দুঃখী ভাবটা বাড়ি ফিরে দেখছিলাম, তা যেন অদৃশ্য হয়ে এক সারল্য ভরা প্রশান্তি ফুটে উঠেছে মায়ের সারা মুখমন্ডলে। এই মাকেই আমি দেখতে চাই, চোখের জলে নয়, দুঃখের বন্ধনে নয়, সুখ ও হাসির পরশে মায়ের জীবনকে আমি পরিপূর্ণ রূপ দিতে চাই....দেবো, আমি দেবো একদিন!
যখন খাওয়া শেষ হলো, দেখলাম মা নিজের ঘরে না গিয়ে বারান্দার এক কোনে বসে আছে। আমার দিকে চেয়ে বললো,
- সোনা তুই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়, এই ক্লান্ত শরীরে আর দাঁড়িয়ে থাকিস না।
আমি বললাম,
- তুমি ঘুমোবে না? এইখানে যে বসে গেলে?
মা মাথা নীচু করে আনমনে কি ভাবতে ভাবতে বললো,
- নারে, আমার আজ ঘুম পাচ্ছে না। মাথাটা ধরে আছে, একটু বসি, কমে গেলেই চলে যাবো।
আমি বুঝলাম মায়ের এই কথা সত্যি নয়। মাকে এভাবে আমি এর আগেও বহুবার সবার আড়ালে সরে এসে একলা নির্জনে বসে থাকতে দেখেছি, বসে বসে অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজের দোষকে খুঁজতে দেখেছি। তাই কাছে গিয়ে মায়ের পাশে বসে বললাম,
- কি হয়েছে সত্যি করে বলোতো মা....।
মা চুপচাপ। আমি আবার এক কথা জিগ্যেস করাতে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো তার কোলের ওপর। আমি এবার মায়ের হাত ধরে বললাম,
- আমি তো তোমার ছেলে মা, আমিই তো সব, তুমি আমাকেই বলবে না?
তারপর মায়ের ঠোঁটে কথা ফুটলো। যা বললো তা সংক্ষেপে এরকম, আজ বিকেলে লতা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরেনি দেখে বাবা গিয়েছিল খুঁজতে। কিছুদূর গিয়ে বাবা দেখতে পায় সেখানে একটা নির্জন বড়ো দীঘির পাড়ে গাছতলায় লতা একটা ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় বসে। ব্যস্। পাশেই একটা ছোটো খেজুর গাছ ছিল। তার ডাল ভেঙে পাতা ছাড়িয়ে মারতে মারতে তাকে বাড়ি নিয়ে আসে বাবা। তারপর তাকে তার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়। এখানেই শেষ নয়, বাবার রাগ এবার সবে শুরু হয়। লতার ওপর থেকে সব দোষ তুলে বাবা মায়ের ওপর তা চাপিয়ে দিয়ে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে মাকে একটা চড় মারে এই বলে যে, মা নাকি নিজের মেয়েকে মানুষ করতে পারেনি, মা নাকি 'মা' হওয়ার যোগ্যই নয়! তারপর থেকে বাবা তার ঘরে মাকে আর ঢুকতে দেয়নি। মা...সে তো আর রাগ করে থাকতে পারে না স্বামীর ওপরে, না মেয়েকে না খাইয়ে শাস্তি দিতে পারে! সম্পূর্ণ বিনা দোষে বাবার কথার আঘাত ও চড় সহ্য করেও মা রান্না করেছিল, বাবার ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে এসেছিল, লতার ঘরে তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে খাইয়ে দিয়ে এসেছিল। তারপর থেকেই ওভাবে বারান্দায় আমার অপেক্ষায় বসেছিল। সেই বিকেলের পর থেকে বাবা আর একটাও কথা বলেনি মায়ের সঙ্গে।
যা ভেবেছিলাম তাই হলো, লতার সব কান্ড বাবা জেনে গেলো। এই ঘটনা আমায় আঘাত দেয়নি, লতা বড়ো হয়েছে, প্রেম করছে, আর তা একদিন জানাজানি হবেই, এটা স্বাভাবিক, আঘাত পেলাম মায়ের অপমানে! এই সংসারের সব ভুল, সব খারাপ আর সব দূর্ভাগ্যের জন্য মাকেই দোষী হতে হয় বারবার। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না! কতোবার, কতোবার আমি আমার প্রাণপ্রিয় মায়ের চোখের জল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবো! কতোবার তাকে মিথ্যা সান্তনা দেবো যে সব ঠিক হয়ে যাবে, বাবা শুধরে যাবে! কতোবার তার দুঃখে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলবো চোখের জল তোমার এতো অল্প মূল্যের নয় মা! আমার রাগ প্রবল, শুধু প্রকাশটা কম হয় মাত্র, কিন্তু যখন হয়, তখন এর তাপ যে কেউ সহ্য করতে পারে না!
আমি মাকে ওখানে বসিয়ে রেখে বাবার ঘরের দরজা সজোরে ধাক্কা দিয়ে দড়াম করে খুলে ভেতরে ঢুকে 'বাবা' বলে চিৎকার করে উঠলাম। বাবা ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমের মধ্যে এতো চিৎকারে ভয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো। আমার চোখ দিয়ে তখন আগুনের হলকা বেরিয়ে আসছে। আমি ক্রুদ্ধ স্বরে বললাম তাকে,
- তুমি মায়ের গায়ে হাত তুলেছো?
বাবার ঘুমের ঘোর তখন আমার চিৎকারে ভঙ্গ হয়ে রেগে গিয়ে উত্তর দিলো,
- তুলেছি। ভুল করলে আরও মারবো।
এই কথায় আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। মা কি কোনো ভৌত বস্তু নাকি যে রাগ হলেই তাকে ছুঁড়ে ফেলা যায়! এই তার ভালোবাসা নিজের স্ত্রীর জন্য! নাকি নিজের যৌবন শেষ হয়ে গেছে বলে মাকে একজন সংসার চালানো দাসী ভেবে ফেলেছে সে! আমি গর্জে উঠলাম,
- না, আর নয়, আর একটা আঘাতও নয়। এই শেষ!
বলে দরজা টা আবার দড়াম করে ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাবার ঘর থেকে। বাইরে এসে দেখি মা চোখে জল নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবার ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের হাতটা ধরে বললাম,
- চলো, আজ থেকে তুমি আমার কাছে শোবে। বাবার সঙ্গে তোমায় আমি আর থাকতে দেবো না।
মা আমায় আটকায়, কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
- ওরকম বলিসনা বাবা, আমি দোষ করেছি বলেইতো মেরেছে। বারে, ভুল করলে তো তাকে শাস্তি দিতে হবে, নয়তো যদি আমি বারে বারে ভুল করি!
- না মা, ভুল তুমি নিজে করোনি, শুধু তোমার একটাই ভুল....সরল মন নিয়ে সবার কথা মেনে নেওয়া আর সব.... সবকিছু সহ্য করে নেওয়া! তবে আর, আর আমি তোমায় কষ্ট পেতে দেবোনা মা!
- এরকম করিস না বাবা, আমি আজ রাতে তোর বাবার কাছে না গেলে যে তোকে ও মেরে শেষ করে দেবে কাল!
আমি থামলাম। শুধু থামলাম না, আমি অবাক হলাম। মায়ের 'রাতে বাবার কাছে যাওয়া' - এই কথাটা ঠিক স্বাভাবিক ভাবে আমার মনে প্রবেশ করলো না। রাতে যাওয়া মানে? রাতে মা বাবার কাছে গেলে বাবা আর আমায় মারবে না? কেন? মা কোন পথে বাবার রাগ ঠান্ডা করবে? মা কি করতে চলেছে?
মা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে নিঃশব্দে বাবার ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো। আমি নিজের ঘরে চলে এলাম।
আর কি চিন্তা করবো? কিইবা বাকি আছে চিন্তা করার? লন্ঠনের আলো নিভিয়ে দিয়ে জানালার কাছটায় এসে শুয়ে পড়লাম। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আজ পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ। তার রূপোলী আলো আমার ঘরে ঢুকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক মায়াবী আবহ সৃষ্টি করেছে। আমি ওই চাঁদের দিকে চেয়ে কত কি ভাবতে লাগলাম!
