গল্প:গুমর ফাঁস(০১)

লেখক:Akbor Hossen

পর্ব:০১

জ্ঞান ফিরতেই আঁশটে একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল। মনে হচ্ছে রক্তের গন্ধ। পিটপিট করে চোখ খুলল সে। কিছুক্ষণ কিছুই বুঝতে পারলো না সে। এখন কয়টা বাজে তাও বুঝতে পারছে না। কোথায় আছে সে তাও জানে না। কপালে হাত দিতেই রক্তে মাখামাখি হয়ে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল, সে একটা পুরনো দালান ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। সে উঠতে পারছে না। তার শরীর দুর্বল। জায়গায় জায়গায় ব্যাথা। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। উঠে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপরই তার পরীর কথা মনে পড়ল। সে চিৎকার করে ডাকতে লাগল।
— পরী! পরী!

পরীর সাড়া নেই। সে হন্যে হয়ে পরীকে খুঁজতে লাগল। ঘরটার পাঁচটা কক্ষ। সবগুলো কক্ষে সে পরীকে খুঁজল। কিন্তু কোথাও পরীকে পাওয়া গেল না। আকাশ, হৃদয়, প্রান্ত — তিনজনের একজনও নেই।

সম্ভবত মধ্যরাত। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চারদিকে জোছনা ছড়িয়েছে। ঘরটার চারপাশে ঝোপঝাড়। ঝিঁঝিঁ পোকার ঝিঁইইই…ঝিঁরিৎ ঝিঁইইই…ঝিঁরিৎ শব্দ। তক্ষক ডাকছে। কোথা হতে জানি শব্দ আসছে, — “হতা!” “হতা!!” হুতোম পেঁচার নিরবচ্ছিন্ন ডাক। সব মিলিয়ে পরিবেশটা অনেক ভয়ংকর। বছর চারেক আগে আবছা অন্ধকারেও সে ভয় পেত। কিন্তু এখন গভীর রাতের অন্ধকারেও ভয় পায় না। আজ পাচ্ছে। যতটা না অন্ধকারের, তার চেয়ে বেশি পরীকে হারানোর। সে প্রচণ্ডভাবে ঘামছে। দিহান পরীকে খুঁজতে খুঁজতে বাইরে এলো। আশেপাশের সব ঝোপে পরীকে খুঁজল। কিন্তু কোথাও পরী নেই। গেল কোথায় মেয়েটা? মনের দুঃখে দিহান কাঁদতে লাগলো। হঠাৎই দিহান একটা নারী কণ্ঠের আর্তনাদ শুনল।
— পানি!
দিহান আর্তনাদের উৎস খুঁজে পেল না। সে ভয় পেল। উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
— কে? কে ওখানে?

মেয়েটি আবার “পানি” বলে আর্তনাদ করল। দিহান তখনই চাঁদের আলোয় ঝোপের মধ্যে কিছু একটা নড়া চড়া করতে দেখল। সাহস করে সেখানে গিয়ে দেখল, একটা মেয়ে। নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। তবে সে পরীর মত ছোট মেয়ে নয়। একটা অচেনা কিশোরী মেয়ে। চাঁদের আলোয় মেয়েটির অস্বাভাবিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে। দিহান আগে কখনো এত সুন্দর মেয়ে দেখে নি। সে প্রশ্ন করল,
— কে আপনি? এই গভীর জঙ্গলে কী করেন?
মেয়েটি আবারও “পানি” বলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। দিহান মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তারপর অন্ধকারে পথ খুঁজে বের করে পাকা রাস্তায় এলো।

পরীকে না পেয়ে দিহান নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে অপরাধী। সে মামা হয়ে ভাগ্নিকে রক্ষা করতে পারলো না। জানোয়ারেরা হয়তো মেয়েটাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। তাই সে কাঁদতে লাগল। সে পারল না তার বোনের আমানত রক্ষা করতে। যে বিলাসী তার সমস্ত ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল, সেই বিলাসীর কলিজার টুকরোকে সে রক্ষা করতে পারলো না। এদিকে কোত্থেকে জানি এই অচেনা মেয়েটি এসে জুটল কে জানে?

বাড়িতে ফিরে সে ডাকল,
— আম্মা। আম্মা।
ঘরের দরজাটা ফট করে খুলে গেল। দরজায় পরীকে দেখতে পেয়ে সে অবাক হয়ে গেল।
— পরী! তুই! তুই কিভাবে ফিরে এলি?
— আমি তো তোমারই ভাগ্নি, মামা। আমার সাথে কেউ পাঙ্গা নিলে আমি কি ছেড়ে দেব? যাই হোক, মেয়েটি কে?
— জানি না। আম্মা কোথায়?
— ঘরে। তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
এমন সময় জরিনার হাঁক শোনা গেল।
— পরী। কার সাথে কথা বলছিস? তোর মামা কি এসেছে?
— হ্যাঁ, এসেছে। সাথে একটা মেয়ে।
— ঘরে আসতে বল।
দিহান ঘরে গিয়ে মেয়েটিকে খাটে শুইয়ে দিতে দিতে বলল,
— ক্ষমা করো, আম্মা। তোমার কথা রাখতে পারি নি। তুমি বলেছিলে রাত দশটার পরে বাইরে না থাকতে। কাফফারা আদায় করে নেব।
— কাফফারা আদায় করতে হবে না। শুধু বল মেয়েটি কে?
— জানি না। ঝোপের পাশটায় পড়েছিল। আর “পানি” “পানি” বলে আর্তনাদ করছিল। তাই নিয়ে এলাম। তুমি একটু মেয়েটার পাশে বসো। আব্বা কোথায়? কুলসুম! কুলসুম!
— কুলসুমকে ডাকিস না। ও ঘুমাচ্ছে। তোর আব্বা গরুর ঘরে। তুই এতো হতাশ হোস না। একটু আমার পাশে বোস। তোর কপালে রক্ত কেন? কী হয়েছে আমাকে বল?
— সে কিছু না, মা। রক্ত শুকিয়ে গেছে।
— একটু পাশে বস। আমাকে সব খুলে বল।
— তোমাকে সব খুলে বলব। যদিও আমি পুরো ঘটনা জানি না। তবুও তুমি আমার মা। তোমাকে সব বলব। এখন একটু মেয়েটিকে দেখো। ও সেই কবে পানি চেয়েছিল। আর এখন বোধ হয় অজ্ঞান!
— ঠিক আছে। তুই কলপাড়ে যা। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। পরী তুই টর্চটা নিয়ে তোর মামার সাথে যা।

————

রাত দুইটা বাজে। কাছের বাঁশবন থেকে সাঁই সাঁই করে বাতাসের শব্দ আসছে। আকাশে দ্বাদশী চাঁদ। একটা অচেনা পাখি কুক কুক শব্দে ডাকছে। এ পাখির শব্দ নাকি অশুভ। অন্য সময় জরিনা এ পাখির শব্দ শুনলেই জানালা বন্ধ করে দেয়। আজ আর দিল না। তার ঘর থেকে পানি ঢালার ঝরাৎ ঝরাৎ শব্দ আসছে। সে অচেনা মেয়েটির মাথায় পানি ঢালছে। পানি ঢালতে ঢালতে সে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। চাঁদটার দিকে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভাবে বড় ছেলের পাগল হওয়ার কথা, ছোট মেয়েটার সাংসারিক অশান্তির কথা, বিলাসীর নরক তুল্য জীবনের কথা। পরীর কথা। দিহানের কথা। সোনালীর নির্মম মৃত্যুর কথা।

দিহানের মাথায় ব্যান্ডেজ করা। সে আর পরী বারান্দার টুলটাতে বসে আছে। পরী হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে দিহানের কাঁধে ঢলে পড়ল। দিহান বলল,
— তুই আমাকে ক্ষমা করে দে, মা। আমি তোকে এত কাছে থেকেও রক্ষা করতে পারলাম না।
পরী কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলল,
— তুমি নিজেকে অপরাধী ভেবো না, মামা। তুমি ছিলে বলেই তো আমি নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছি।
— আচ্ছা। তুই আমাকে সব খুলে বল তো। আকাশরা তোকে কিভাবে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল?
— আমি তোমাকে সব খুলে বলব। তুমি তো আমার মামা। আমার এক মাত্র সুখ-দুঃখের সাথী। তোমাকে না বললে কাকে বলব?

পরী বলতে শুরু করল। তিন মাস আগে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মাধ্যমে আকাশদের সাথে পরিচয়। আকাশ, হৃদয় আর প্রান্ত। অল্প বয়সে বখে যাওয়া ছেলে। স্কুলের পেছনের মোড়টায় প্রতিদিন স্কুল ছুটির সময় দাঁড়িয়ে থাকে। আর মেয়েদের ইভটিজিং করে। পরী ক্লাস সিক্সে পড়ে। তার একটা বান্ধবী আছে। নাম জেরিন। সে পড়ে ক্লাস সেভেনে। ভিন্ন শ্রেণির হওয়া স্বত্ত্বেও দুজনের মধ্যে বেশ ভাব। এতে বেশি অবদান পরীরই। তার একটা বিশেষ গুণ ছিল। সে সবার সাথে মিশতে পারতো। এ গুণটা সে পেয়েছিল তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা বন্ধু-শত্রু যে কোনো মানুষের সাথে মুহূর্তেই সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

একদিন পরী টিফিনের সময় জেরিনকে ডাকতে তার ক্লাসে গেল। গিয়ে দেখল, জেরিন অন্যমনস্ক হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সে বলল,
— জেরিন আপা। আজ বৌ-ছি খেলবে না?
— না।
— কেন?
— এমনি।
— চল না, খেলি।
জেরিন হঠাৎ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
— বলেছি তো, খেলব না। শুধু শুধু বিরক্ত করছিস কেন?

পরী আগে কখনো জেরিনের এমন রুপ দেখে নি। আজ জেরিনের কী এমন হলো যে এমন আচরণ করছে?
— জেরিন আপা। তোমার হয়েছেটা কী, বলো তো?
— কিছু হয় নি।
— তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ?
— না।
— তুমি আমাকে সব খুলে বলো, আপা। আমি তো তোমার বান্ধবী।
— তোকে বলে কী হবে?
— বলো, আপা। আমি শুনতে চাই।
— আকাশ, হৃদয় আর প্রান্তকে চিনিস?
— না।
— ঐ যে মোড়টার মধ্যে তিনটা ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে, দেখেছিস?
— হ, দেখেছি।
জেরিন কেঁদে ভেঙে পড়তে পড়তে বলে,
— ওরা প্রত্যেকদিন আমাকে কী সব আজে বাজে কথা বলে। আর অশ্লীল সব অঙ্গ ভঙ্গি করে। ওরা প্রত্যেক দিন আমাকে ডিস্টার্ব করে। ওদের জন্য স্কুলে আসা-যাওয়া করতে পারি না।
— কী বলো, আপা? কাউকে কিছু বলো নি?
— বলেছি বাড়িতে। লাভ হয় নি। উল্টো আমাকে স্কুলে আসতে নিষেধ করেছে।
— আজ বিকেলে তোমার সাথে যাব। প্রতিবাদ করব।
— কিছু করতে পারবি না, বোন। আমরা ছোট মানুষ।
— এতো ভেবো না। আমি দিহান মামার একমাত্র ভাগ্নি। মামা আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে এইসব জানোয়ারদের শায়েস্তা করতে হয়।

ছুটির পর পরী জেরিনের সাথে গেল। পরীরা যখন আকাশদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন আকাশ একটা শিস দিলো। পরী হঠাৎ রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বলল,
— কে? কে শিস দিয়েছে?
প্রান্ত বলল,
— এই যে ম্যাডাম, আমরা।
— তোদের এতো বড় সাহস! মেয়েদেরকে ডিস্টার্ব করিস। লজ্জা লাগে না!
হৃদয় বলল,
— না। লাগে না।
— তোদের ঘরে কি মা-বোন নেই?
জেরিন বলল,
— ওদের সাথে লাগিস না। পরে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে।
— তুমি চুপ করো, আপা। আমরা প্রতিবাদ করি না বলেই ওদের সাহস দিন দিন বাড়ছে।
আকাশ বলল,
— ম্যাডাম দেখি বারি মরিচের মতো। ছোট হলেও ঝাল বেশি।
প্রান্ত বলল,
— নানির বাড়িতে থাকে। এরপরেও কতো পাওয়ার!

পরী তৎক্ষণাৎ পায়ের জুতা খুলল। এবং দ্রুত লাফিয়ে একটা করে তিনজনের গালেই বাড়ি দিল। পরীর তুলনায় ওরা তিনজনই বেশ লম্বা। পরীর পক্ষে এদেরকে এভাবে মারা সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও দক্ষতার সাথেই মারতে পেরেছে। এসব সে শিখেছে দিহানের কাছ থেকে। দিহান নিজে আগে ক্যারাটিতে ভর্তি হয়েছে। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। তারপরে ঘরোয়া পদ্ধতিতে পরীকে শিখিয়েছে। পরীর হাত দক্ষ হতে বেশি সময় নেয় নি। যতই দক্ষ হোক পরী ছোট মানুষ। আকাশ তার হাত ধরে ফেলল। বলল,
— আজকে আমার হাত থেকে তোর নিস্তার নেই।

এমন সময় আমেনার চিৎকার শোনা গেল। পরী বলল,
— মামা, তুমি ঘরে যাও। তোমার মেয়ে কাঁদছে।
— কিন্তু বাকিটা?
— বাকিটা পরে শোনাব। তুমি ঘরে যাও।

দিহান তার ঘরে গেল। গিয়ে আমেনাকে ফিড করালো। মেয়েটি তিন মাস ধরে মায়ের বুকের দুধ পান করতে পারছে না। তার মা তাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। ফিডার খেতে খেতে আমেনা ঘুমিয়ে পড়ে।

দিহান চলে যাওয়ার পরেও পরী বসে থাকে কিছুক্ষণ। চাঁদটা পশ্চিম দিকে ঢলে পড়েছে। রাতের বোধ হয় খুব বেশি বাকি নেই। এমন সময় পরী হাসনাহেনার ঝোপটার কাছে কোনো মানুষের অস্তিত্ব টের পেল। কে যেন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। পরী ভয় পেল। কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
— কে? কে ওখানে?

চলবে…

®️ M. A. Hossen.Xgossip

(লেখকের নাম পরিবর্তন করে কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যদি এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কেউ আমার লেখা কপি করেছে, তাহলে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাঠকের কাছে এই লেখা আমানত রাখলাম।)

Leave a Comment