পর্ব – ১৫
লেখা – আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট থেকে তিন দিনের একটা ছোট্ট ট্যুরের আয়োজন করা হয়েছে। ঘোষণাটা এসেছে আজই। ঘোষনাটা আসার সাথে সাথে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছে পুরো ক্লাস রুম। সবাই ব্যস্ত বন্ধু-বান্ধবদের সাথে টুরের প্ল্যান করতে। তার বিপরীতে বিনীতাদের গ্রুপ বসেছে গোলটেবিল বৈঠকে। বিনীতা আর মিথিলার বাসা থেকে এত দূরে যাওয়ার পারমিশন দেবে কিনা সেটা নিয়েই চলছে ডিসকাশন।
মিথিলা ব্যাগের চেইন টানতে টানতে বলল, “সিরিয়াসলি, এভাবে হুট করে ঘোষণা দিলে কীভাবে কী ম্যানেজ করব? বাসায় কী বলব ভাবতেই পারছি না!”
বিনীতা মাথা নেড়ে সায় দিল, “ঠিক বলেছিস। আগে থেকে জানলে হয়তো একটু মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারতাম। এখন যদি বলি, ‘আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে তিন দিনের ট্যুরে যেতে হবে,’ আম্মু সরাসরি না করে দেবে।”
রূপন্তি পাশ থেকে বাঁকা হাসল, “তবে বাসায় না বললেই হয়!”
মিথিলা চোখ বড় বড় করে তাকাল, “মানে?! কী পাগলের মতো কথা বলছিস!”
রূপন্তি কাঁধ ঝাঁকাল, “আরে ধুর! আমার কথা আগে শোন, তারপর ডিসিশন নে। ধর, প্রথমে বললি, ‘ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে, সবাই যাচ্ছে…’ একটু পরে বলবি, ‘দুই-একদিন থাকতে হতে পারে…’ তারপর ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটা বলবি। একবারে বললেই তো বিপদ!”
বিনীতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তোর যুক্তিতে কাজ হবে না রূপু, আম্মু বিশদ জানতে চাইবে। কোথায় যাচ্ছি, কারা যাচ্ছি, কতদূর, নিরাপত্তা কেমন— সব!”
মিথিলা গম্ভীর গলায় বলল, “আর আমার আম্মু বলবে, ‘বাকিরা যাচ্ছে মানে এই না যে তুমিও যেতে পারবে।’ “
তুহিন তখন পাশ থেকে বলল, “আরে, ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল ট্যুর, সব স্যার-ম্যাম থাকবে। ব্যাপারটা এভাবে বুঝিয়ে বললেই তো হয়।”
বিনীতা কপালে হাত দিল, “ভাই, আমাদের বাসায় এসব বুঝবে না। ওরা ভাববে, আমরা তিন দিনের জন্য হারিয়ে যাব!”
রূপন্তি মুচকি হাসল, “আরে ভয় পাস না, দেখি আমি কী করতে পারি। তোর আম্মুর সঙ্গে কথা বললে হয় না?”
বিনীতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল, “একদম না! উল্টো আম্মু ভাববে, আমি নিজে না বলে তোকে দিয়ে বলাচ্ছি, তখন তো পুরোটাই মাঠে মারা যাবে!”
রাহাত কাঁধ ঝাঁকাল, “তাহলে সহজ উপায়— আগে বাসার মুড দেখে তারপর বলা!”
সবাই চুপ হয়ে গেল। ট্যুর নিয়ে উচ্ছ্বাসের বদলে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— বাসায় কীভাবে বলবে, সেটাই!
________________________________
“রূপন্তিদের ডিপার্টমেন্ট থেকে নাকি ট্যুরে যাবে, শুনেছিস?”
অর্ণব ফোন স্ক্রল করতে করতে মাথা তুলল, “না, বিনীতার সাথে কথা হয়নি। কবে যাচ্ছে?”
শাফিন মগে থাকা কফিটা নাড়তে নাড়তে বলল,
“সামনের মঙ্গলবার মনে হয়।”
“ওহ্! কাল থেকে বিনীতার সাথে কথা হয়নি।”
শাফিন কাঁধ ঝাঁকাল, “ও আচ্ছা। আমি ভাবছিলাম—আমরা যদি ওদের না জানিয়ে গিয়ে সরাসরি ট্যুরের ওখানে হাজির হই, কেমন সারপ্রাইজ হবে?”
অর্ণব অবাক হয়ে তাকালো, “মানে? ওরা তো ইউনিভার্সিটির ট্যুরে যাচ্ছে, আমরা সেখানে গিয়ে হাজির হব কিভাবে?”
শাফিন হাসল, “আরে ধুর, জায়গাটা তো আর রেসট্রিকটেড না! আমরা নিজেরা ঘুরতে যেতেই পারি।”
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর ধীরে বলল,
“কিন্তু বিনীতা যদি কিছু মনে করে? যদি মনে করে আমরা ইচ্ছে করেই ওদের ফলো করছি?”
শাফিন ভ্রু নাচিয়ে বলল, “যদি উল্টে খুশি হয়? তুই সব সময় নেগেটিভটা ভেবে বসে থাকিস কেন বল তো!
অর্ণব চিন্তিত মুখে বলল, “হুম… ভাবতে হবে।”
শাফিন হাসল, “ভাব, কিন্তু দেরি করিস না। টিকিট আগেভাগে বুক দিতে হবে!”
________________________________
রাত প্রায় দশটা। ডিনার শেষ করে বিনীতা ঘরে এসে বসেছে, মনটা কেমন অস্থির হয়ে আছে। একবার ভাবলো, এখন বলবে, তারপর আবার মনে হলো, সকালে বলাই ভালো। মা হয়তো এখন ক্লান্ত। কিন্তু দেরি করলে ও নিজেই স্থির থাকতে পারছে না।
অবশেষে দোমোনা করতে করতেই ড্রইংরুমে এলো। আম্মু সোফায় বসে নিউজ দেখছে, আব্বু ঘরে চলে গেছে।
বিনীতা সোফার এক কোণে বসল, “আম্মু, একটা কথা ছিল।”
রাহনুমা বেগম টিভির ভলিউম কমিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন, “হ্যাঁ? কী কথা?”
বিনীতা একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ইতস্তত করে বলল, “আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা ট্যুরের আয়োজন করেছে। তিন দিনের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে হবে…”
রাহানুমা বেগম ভ্রু কুঁচকালেন, “কোথায়?”
“সেন্ট মার্টিন…”
রাহানুমা বেগম এবার পুরোপুরি গম্ভীর হলেন।
“তিন দিন? এত দূরে?”
বিনীতা আগেভাগেই এসব প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল।
“হ্যাঁ, পুরো ব্যাচ যাবে, টিচাররাও থাকবেন। নিরাপত্তার দিক থেকেও কোনো সমস্যা নেই।”
রাহনুমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, “তুমি জানো, আমরা তোমাকে এত দূর কখনোই একা ছাড়ি না।”
বিনীতা মায়ের হাত ধরে বলল, “আম্মু, আমি তো একা যাচ্ছি না, পুরো ডিপার্টমেন্ট থাকবে। রূপন্তি-মিথিলাও যাচ্ছে।আমাদের ভার্সিটির শেষ দিকের দিনগুলোতে সবার একসাথে কিছু স্মৃতি তৈরি হবে। আমি রূপন্তির সাথেই থাকব, তোমাদের সবসময় আপডেট দেব।”
রাহনুমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তোমার আব্বুর সাথে কথা বলতে হবে। আমি নিজেও চিন্তায় থাকব, জানো তো।”
“তুমি আব্বুকে বুঝিয়ে বলবে কিন্তু।”
রাহনুমা বেগম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “দেখি, কথা বলি…”
বিনীতা বুঝল— বিষয়টা এখানেই শেষ না। ধৈর্য ধরে এখন অপেক্ষার প্রহর গোনার পালা। আদৌ যেতে পারবে কি না, সেটা এখন সময়ই বলে দেবে।
______________________________
ট্যুরের আগের রাত। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে চাপা উন্মাদনা। মেয়েদের হলে একরকম প্রস্তুতির ধুম, ছেলেদের হলে অন্যরকম পরিকল্পনার ফিসফাস চলছে।
রূপন্তি আর মিথিলা মেঝেতে বসে ব্যাগ গোছাচ্ছে, আর বিনীতা বিছানায় আধশোয়া হয়ে শেষ মুহূর্তের চেকলিস্ট মিলাচ্ছে। অবশেষে দুজনের অনুমতি মিলেছে ট্যুরে যাবার।
“আমি কি বেশি কিছু নিচ্ছি?” বিনীতা ব্যাগের চেইন খুলে আবার দেখতে লাগল।
“বেশি না, অর্ধেক ওয়ারড্রোব নিয়ে যাচ্ছিস!” মিথিলা বলল।
রূপন্তি ওর ব্যাগের ভেতর এক ঝলক তাকিয়ে বলল, “আরে! এত জামা নিচ্ছিস কেন? আমরা কি তিন দিনের জন্য যাচ্ছি নাকি তিন মাসের জন্য?”
বিনীতা গম্ভীর মুখে বলল, “কী বলিস! ছবি তোলার সময় বারবার একই ড্রেস পরবো?”
মিথিলা হাসতে হাসতে বলল, “তার মানে, তুই সকালে এক রকম ড্রেস, দুপুরে আরেকটা, সন্ধ্যায় অন্য কিছু পরবি?”
বিনীতা চোখ ঘুরিয়ে বলল, “বাহ! খুব ভালো আইডিয়া!”
মিথিলা আর রূপন্তি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হেসে ফেলল, আর বিনীতা ভ্রু কুঁচকে ওদের দিকে তাকাল, “হাসছিস কেন? সত্যি বলছি!”
রূপন্তি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “হুম হুম, খুব ভালো আইডিয়া। সাথে অর্ণব ভাইকে নিলে একেবারে তোর প্রিয় ওয়েডিং এর ফটোশুট হয়ে যেত!”
মিথিলা মাথা নেড়ে বলল, “আসলেই তো! এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যেত!”
বিনীতা চোখ গরম করে তাকালো ওদের দিকে।
“কি শুরু করলি তোরা!”
বলেই বালিশ ছুঁড়ে মারলো ওদের দিকে। বালিশ গিয়ে লাগলো মিথিলার মাথায়। মিথিলা আর রূপন্তি হো হো করে হাসতে হাসতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
ঘড়িতে প্রায় বারোটা বাজে।
রূপন্তি হাততালি দিয়ে বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা! এখন তো ঘুমানো দরকার! কাল সকাল সাতটার মধ্যে বাস ছাড়বে। ছ’টার মধ্যে ডিপার্টমেন্টের সামনে থাকতে হবে। দেরি হলে কিন্তু বাস রেখে চলে যাবে!”
“সাতটা?” বিনীতা হতাশ হয়ে বলল, “আমার জন্য সকাল সাতটা মানে রাত তিনটা!”
রূপন্তি কাঁধ ঝাঁকালো, “তাহলে রেডি হয়ে ঘুমা! সকালে উঠেই দৌড় লাগাবি!”
তিনজনই আবার হেসে উঠলো।
আজকে ওরা তিনজন একসাথে ঘুমাবে। মিথিলা এক ঝটকায় বিছানায় উঠে বসল, “সবাই মোবাইল সাইলেন্ট রাখো, নয়তো রাতের বেলা কে যেন আবার কল দিয়ে ‘গুড নাইট’ জানাতে গিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেবে!”
রূপন্তি বিনীতার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো, “উমম…..”
বিনীতা কেশে উঠে তাড়াতাড়ি কাঁথার নিচে মুখ গুঁজলো, “আমাকে ঘুমাতে দে!”
মিথিলা আর রূপন্তি মুখ চেপে হাসল। ট্যুরের উত্তেজনা, প্রস্তুতি আর একসাথে থাকার আনন্দে ওরা ধীরে ধীরে পাড়ি দিল ঘুমের রাজ্যে।
_________________________________
অর্ণব ব্যাগ গোছাতে বসেছে, কিন্তু শাফিন একটা জিনিসও গোছাচ্ছে না, বিছানায় গা এলিয়ে ফোন ঘাটছে।
“তোর কিছু লাগবে না?” অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল।
“একটা ব্যাগ আর একটা মনভালো করা পরিবেশ— এই তো!” শাফিন হাসল।
“দেখ, কাল যদি গিয়ে দেখিস তোর ব্রাশ, তোয়ালে, স্যান্ডেল এমনকি প্যান্ট-শার্টও ভুলে গেছিস, তখন আমাকে দোষ দিতে পারবি না বলে দিচ্ছি!”
শাফিন হাসল, “আমি প্ল্যান করেই মিনিমালিস্টিক লাইফস্টাইল বেছে নিয়েছি!”
অর্ণব ব্যাগের চেইন লাগিয়ে বলল, “এই যে মিনিমালিস্ট, টিকিট চেক করেছিস তো?”
“হুমমম…” শাফিন ফোনে টিকিট বুকিং চেক করল, “সব ওকে! কাল সকালেই রওনা দিব!”
অর্ণব তখনো দ্বিধায়, “সত্যিই কি আমরা এভাবে ওদের জানিয়ে না গিয়ে ঠিক করছি?”
শাফিন কাঁধ ঝাঁকালো, “শোন, ওরা ট্যুর নিয়ে এত ব্যস্ত যে আমাদের খেয়ালই করবে না! যখন হুট করে সামনে হাজির হবো, তখন কেমন সারপ্রাইজড হবে ভাবতেই মজা লাগছে!”
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “দেখা যাক! ব্যাগ গোছানো শেষ। এখন একটু ঘুমাতে হবে!”
শাফিন তখনো ফোন ঘাটছে, মুচকি হাসল, “অবশ্যই, ঘুমাও, স্বপ্নে দেখো— সামনে তিন দিনের অ্যাডভেঞ্চার!”
অর্ণব নিঃশ্বাস ফেলল। ঘুমানোর চেষ্টা করল, কিন্তু একটা অদ্ভুত উত্তেজনা মনের মধ্যে খচখচ করতেই থাকল।
To be continued…
যারা যারা ট্যুরে যেতে চান পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে রেডি হোন তাড়াতাড়ি…😁