গল্প:জ্বীনের সাথে সংসার (০১-০২)


লেখক:রাকিবুর রহমান আতিক

পর্ব:০১


নীল আকাশের নিচে সবুজে ঢাকা বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। মাঠের দক্ষিণ পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় তিন তলা বিশিষ্ট ভবন। মূলত এটি একটি মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসায় কিতাবি তালিম নিতে দূর দূরান্ত থেকে আসে অনেক ছাত্র। মাদ্রাসায় ছাত্রদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। বিকেল হলেই মাদ্রাসার মাঠে খেলতে বের হয় ছাত্ররা। সবাই হইহুল্লোরে ব্যস্ত থাকলেও সিফাত সব সময় আলাদা থাকে। মাঠের দক্ষিণ পাশের এক কোণে বিরাট আকৃতির এক আম গাছ। সেই গাছের নিচে বসে একা একা কি যেন কথা বলে সে। কেউ তার পাশে গেলেই রাগ করে অন্যান্য সময় সবার সাথে মিশলেও বিকেলের ওই সময়টা সে অন্যরকম থাকে।

প্রথমদিকে অন্যরা তাকে খেলার জন্য টানলেও এখন কেউ আর তাকে খেলার কথা বলে না। বিকেলের এই সময়টা সবাই সিফাতের কাছ থেকে দূরে থাকে। সিফাতের উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুটের মত প্রকাণ্ড দেহ ফর্সা গায়ের রং, অদ্ভুত নীল রঙের চোখ দুটো তার সৌন্দর্য কে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। পড়ালেখা তীক্ষ্ণ মেধাবী হওয়ায় শিক্ষকেরা তাকে স্নেহ করেন।

শহরের মেয়ে নাবিলা। দুইদিন হলো গ্রামে এসেছে। শহরে বড় হয়েছে সে, তাই পর্দা করাতো দূরে থাক শার্ট-প্যান্ট পরে গ্রামে চলাফেরা করে। এ নিয়ে গ্রামের লোকদের মধ্যে চলতে থাকে কানাকানি। অবশেষে নাবিলার চাচা সমসিদ আলীকে পঞ্চায়েতে ডেকে বলা হয় যে যদি তার ভাতিজি এমনভাবে চলাফেরা করে তবে তাঁদের একঘরে করে দেওয়া হবে৷ সমসিদ আলী অনেক কষ্টে ভাতিজিকে বুঝালেন৷

এখন সে তার চাচাতো বোন মৌমিতার সেলোয়ার কামিজ পরে গ্রাম ঘুরে দেখতে বের হয়। সাথে তার চাচাতো বোন মৌমিতাও থাকে। গ্রামের সবুজ শ্যামল পরিবেশ খুব ভালো লাগে তার৷ মাঝে মাঝে নাবিলার গ্রামে থেকে যেতে ইচ্ছে করে। তবে গ্রামে তো আর ভার্সিটি নেই। তাই এখানে থাকার ইচ্ছেটা তার পূরণ হয় না। তবে সে মনে মনে ঠিক করেছে পড়ালেখা শেষ করে গ্রামে চলে আসবে একেবারে৷

শহরের ঐ যান্ত্রিক জীবনের অতিষ্ট সে। ধূলোবালি আর গাড়ির পেপু শব্দ বিরক্তিকর। অথচ গ্রাম কত সুন্দর৷ কোনো দূষণ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর কী যে ভালো লাগে। চারদিকে পাখিদের পাখপাখালি, মানুষের ছুটে চলা, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দু, কী যে ভালো লাগে তার তা বলে বুঝানো যাবে না।


জ্বীনের সাথে সংসার

পর্ব:০২

লেখক:রাকিবুর রহমান আতিক


গোধূলীর মূহুর্তে নাবিলা আর মৌমিতা গ্রামের পথ ধরে হাঁটছিলো। হাঁটতে হাঁটতে তারা একসময় ঐ মাদরাসার মাঠে গিয়ে পৌঁছালো। মাদরাসার মাঠে খেলাধূলা করছে ছাত্ররা৷ মাদরাসা ভবনের চারদিকে সারিবদ্ধভাবে ফুল গাছ লাগানো। ফুল মানেই নাবিলার ক্রাশ। ফুল দেখলেই সে ফুলের সাথে ছবি উঠবেই। মাদরাসা মাঠের ফুলবাগান দেখে মৌমিতাকে বলল_ এই মৌমিতা আয় না রে ফুলের কাছে গিয়ে ছবি তুলি। তুই কী পাগল হইছিস, এইটা মাদরাসা, এখানে ঢুকা যাবে না।


_ কেনো ঢুকা যাবে না, নিষেধ না কী? না ঠিক নিষেধ নয়, তবে কোনো প্রয়োজন ছাড়া এই মাদরাসায় কোনো মহিলা প্রবেশ করে না।


আমি ওই ফুলের কাছে যাবোই, তুই এলে আয়, না এলে নাই। এই বলে নাবিলা মাদরাসায় গেইটে প্রবেশ করে মাঠের মাঝ বরাবর হাঁটতে শুরু করলো। মাদরাসার ছাত্ররা মাঠে ফুটবল খেলছিলো, নাবিলার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই সে হাঁটছে তো হাঁটছেই।

মাদরাসার এক ছাত্র ফুটবলে লাত্থি দিতেই বল সজোড়ে গিয়ে পড়লো নাবিলার মাথায়, ওমনি নাবিলা মাটিতে পড়ে গেলো। মৌমিতা দৌড়ে গেলো নাবিলার কাছে। বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে নাবিলা। নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। অনেক জোরেই আঘাত পেয়েছে মাথায়৷ মাদরাসায় বড় কয়েকজন ছাত্র পানি এনে নাবিলার মাথায় দিতে শুরু করলো।

অন্যেরা ভয়ে আঁটসাঁট হয়ে মাদরাসা মাঠের একপ্রান্তে জড়ো হয়ে আছে৷। নাবিলার মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে নাবিলার জ্ঞান ফিরছে না। মাদরাসায় শিক্ষকরা তখন অফিস কক্ষে কাজ করছিলেন৷ সোহান দৌড়ে গিয়ে শিক্ষককে খবর দিলো৷ ছাত্রদের জটলা আর দৌড়াদৌড়ি দেখে সিফাত গাছের নিচে থেকে উঠে মাঠে এসে দেখলো নাবিলা মাটিতে পড়ে আছে। নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে।।সিফাত নাবিলার পাশে গিয়ে বসলো।

নাবিলার নাকে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছু একটা পড়লো সাথে সাথে নাক দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেলো আর নাবিলার জ্ঞান ও ফিরে এলো। উপস্থিত সবাই এটা দেখে অবাক। মাদরাসার ছাত্ররা একজন আরেকজনের মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। নাবিলার জ্ঞান ফেরার পর সে পানি খেতে চাইলো। পানি খাওয়ার পর তার চোখ গেলো সিফাতের দিকে। এমন সুন্দর মানুষ সে এর আগে কোনোদিন দেখেনি। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো সিফাতের দিকে। চোখের মণি দুটো হালকা নীল, ফর্সা গায়ের রং, ঘন কালো চুল। এক পলকেই নাবিলা ছেলেটির প্রেমে পড়ে গেলো।

মাদরাসার শিক্ষকরা তিনতলা থেকে নিচে নেমে মৌমিতা আর নাবিলাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন তারা এখানে কেনো মৌমিতা শিক্ষককে সব খুলে বলল৷ সব শুনে মাদরাসার শিক্ষক বললেন যেহেতু উনি শহরের মেহমান তাই মাদরাসা ঘুরে দেখতেই পারেন, তবে মাদরাসায় পর্দার সহিত আসতে হবে৷


শিক্ষকের কথায় মৌমিতা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক একটি জবাব দিয়ে বিদায় নিলো।
ফেরার পথে নাবিলা মৌমিতাকে বললএই শোন আমার সাথে যে এমন ঘটনা ঘটেছে তা কিন্তু বাসায় বলিস না। আমার বলতে হবে না, তুই যা জোরে আঘাত পেয়েছিস, রাতে না তর ব্যথা শুরু হয় আমি ভাবছি।
আরে না কিছুই হবে না, আমি এখনো কোনো ব্যথা অনুভব করছি না।


_ কিছু না হলেই ভালো৷ কথা বলতে বলতে দুজন পৌঁছে গেলো বাড়িতে। এরপর হাতমুখ ধুয়ে ঘরে গিয়ে প্রবেশ করলো। চারদিক থেকে এলো ভেসে এলো মাগরিবের আজানের ধ্বনি৷ মৌমিতা ওযু করে নামাযে দাঁড়ালো। নাবিলা অবশ্য নামায পড়ে না। শহরের মেয়ে, আধুনিকতায় বড় হয়েছে, তাই সে নামে মাত্রই মুসলমান, নামায, কোরআন এগুলো তার জানা নাই।

চলবে…..

Leave a Comment