পর্ব:০২
পেরিয়েছে দু’দিন। ঘড়ির কাটা তখন সকাল ৮:৩০ এর ঘরে।
লামিয়া সৌম্যকে কল করে বলেছে, সে আজ সন্ধ্যাকে তার স্কুটি চালানো শেখাবে। এরপর সেদিকে দিয়ে একেবারে কলেজে যাবে। মেয়েটাকে ডিপ্রেশন থেকে বের করার উপায়। সৌম্য সম্মতি দিয়েছে। তবে বারবার করে লামিয়াকে বলেছে, তার বোনুকে যেন সাবধানে শেখায়। একা না ছাড়ে।
সন্ধ্যা বিছানার ধারে দু’পা উঁচু সামান্য করে, বসে আছে। পিছনে সৌম্য বসা। যে সন্ধ্যার লম্বা চুলগুলো আঁচড়ে বেনি করে দিচ্ছে। সামনে ইরা। তার হাতে খাবারের প্লেট। মেয়েটা সন্ধ্যাকে খাওয়ানোর জন্য অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে। কিন্তু পারছে না৷ সন্ধ্যা নিশ্চুপ। একধ্যানে কোনদিকে য চেয়ে আছে, সে হয়ত নিজেও জানেনা। খাবার খাবে না। কথাটি একবার বলে একেবারে চুপ হয়ে গেছে। শেষমেশ ইরা হতাশ হয়ে চুপ করে বসে রইল।
সৌম্য সন্ধ্যার হাঁটুসমান চুলগুলোয় খুব সুন্দর একটি বিনুনি গেঁথে এরপর সেই বেনুনি পেঁচিয়ে খোঁপা করে দেয়। কাজশেষে সৌম্য ইরার দিকে তাকায়। ইরা সৌম্য’র দিকে তাকালে দু’জনের চোখাচোখি হয়। সৌম্য চোখ সরায় না। ইরা লক্ষ্য করল, সৌম্য ভীষণ মনোযোগ দিয়ে শুধু তাকেই দেখছে। ইরা মৃদুস্বরে ডাকে,
“সৌম্য?”
সৌম্য’র ধ্যান ভাঙে, “হ্যাঁ”
ইরা মৃদু হাসল। সৌম্যকে তার মাঝে মাঝে অদ্ভুদ প্রাণী মনে হয়। তার প্রতি সৌম্য’র দৃষ্টিতে বরাবরই মুগ্ধতা মিশে ছিল। অথচ এখনকার ব্যাপারটা আলাদা। আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেখানে তার নিজেরই দৃষ্টি বারবার বুজে আসে। বিতৃষ্ণা এসে ভিড় জমায়। সেখানে তার স্বামী শুধু তাকে দেখে,, মুগ্ধ হয়ে দেখে। ইরা সন্ধ্যার দিকে তাকায়। মন খারাপ করে বলে,
“বুঝেছি সন্ধ্যা আমার হাতে কেন খাচ্ছে না! আমার এমন বিচ্ছিরি মুখ দেখলে সন্ধ্যার খেতে ইচ্ছে করেনা। যাচ্ছি আমি। তোমার ভাই তোমাকে খাওয়াবে।”
কথাটা বলে ইরা উঠে দাঁড়ায়। প্লেটটি সন্ধ্যার সামনে রেখে সোজা হতে গেলে সন্ধ্যা দ্রুত ইরার হাত টেনে ধরে। ঝাপসা চোখে তাকায় ইরার পানে। ভাঙা স্বরে বলে,
“তুমি এভাবে বলতে পারলে ভাবি?”
ইরা আবার-ও মন খারাপ করে বলে,
“খাচ্ছো না যে তুমি। কখন থেকে বলছি বল তো!”
সন্ধ্যার মলিন মুখখানা আরও মলিন হয়। দৃষ্টি নিচু করে। ঘাড় ফিরিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে তাকায়। সৌম্য’র দৃষ্টি তার বোনুর দিকে। সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে,
“সৌম্য ভাইয়া বিশ্বাস কর‚ আমি ভাবিকে নিয়ে এসব ভাবিনা।”
সৌম্য কি বলবে বুঝল না। ইরা হতাশ চোখে চায়। ভাবল‚ এটা বললে সন্ধ্যা খেয়ে নিবে। কিন্তু মেয়েটা সত্যি ভেবে নিয়ে আবেগী বাণী ছুড়ছে তার ভাইয়ের দিকে। ইরা বসল সন্ধ্যার পাশে। কিছু বলতে চাইলে সৌম্য মাঝ থেকে বলে,
“বোনু, আমরা সবাই জানি তুই কেমন! কিন্তু তুই খেতে চাস না কেন বল তো? পুরো অর্ধেক হয়ে গিয়েছিস, আয়নায় দেখেছিস নিজেকে একবারো?”
সন্ধ্যার চোখদুটো ভিজে ওঠে। বলে,
“আমার কিচ্ছু করতে ভালো লাগে না সৌম্য ভাইয়া৷ তোমরা কেউ আমাকে বোঝো না। সবাই শুধু আমার সাথে জোর কর।”
সৌম্য অসহায় চোখে চায় তার ছোট বোনটার দিকে। সন্ধ্যার মাথা তার বুকে রেখে ডান হাত মাথায় আলতো করে বুলিয়ে বলে,
“আমার ভাগ্নি নয়তো ভাগ্নের জন্য কিছু খেয়ে নে বোনু৷ খাবি না?”
সন্ধ্যা ভাইয়ের বুকে পড়ে নিঃশব্দে অশ্রু ঝরায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, ‘আকাশ’ শব্দটি। যে সন্ধ্যার মনের মানুষ। যাকে ঘিরে তার পৃথিবী। অথচ সেই মানুষটি-ই আজ নেই। কোথাও নেই। ক’মাস পূর্বের স্মৃতি চোখের সামনে আজো জ্বলজ্বল করে সুস্পষ্টভাবে। আকাশকে ঘিরে সেই একেকটি রাতগুলো ছিল সোনালি সকালের মতো। যেখানে আকাশ হাসত, তাকে জড়িয়ে ধরত। ভালোবাসার সাগরে ডুবিয়ে রেখেছিল। সেই ভালোবাসার সাগর উপহার দিয়ে হঠাৎ আকাশ হারিয়ে গিয়েছে।
এইতো সেইদিন, আকাশ তার উপর অভিমান করে বিদেশে পাড়ি জমালো। কতশত অভিমান চেপে অপরিচিত হয়ে উঠল। সন্ধ্যার মন বলত, তার শুভ্র পুরুষ বদলে গিয়েছে। কিন্তু নাহ, সে বদলায়নি। সময় গড়ালো, আকাশের অভিমান ভাঙলো। ডেকে উঠল সেই পরিচিত ডাক, “সোনা বউ”।
সন্ধ্যা কেঁপে উঠল। মনে হলো, তার কানের কাছে এসে আকাশ মাত্র তাকে ‘সোনা বউ’ বলে ডেকেছে। সন্ধ্যা চোখ মেলে ভাইয়ের বুক দেখে হুহু করে কেঁদে ওঠে। বেহিসাব এমন হয়েছে তার সাথে। আজো তার কানে আকাশের বলা সেই ‘সোনা বউ’ ডাক বেজে ওঠে থেকে থেকে। সন্ধ্যার ফোঁপানি বাড়ে।
সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সন্ধ্যার মাথায় পিঠে হাত রেখে বুলায় সান্ত্বনাস্বরূপ। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেতিয়ে আসে। কান্নার তোড় থামে। থেকে থেকে কেঁপে ওঠে। সৌম্য বোনুর মাথায় একটা চুমু আঁকে। এরপর সন্ধ্যাকে সোজা করে বসিয়ে সন্ধ্যার পিঠ তার বুকে ঠেকায়। ডান হাতে সন্ধ্যার ভেজা মুখ মুছে দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“খেয়ে নে বোনু। লামিয়া চলে আসবে।”
সন্ধ্যা লম্বা শ্বাস নেয়। নিজেকে সামলায়। সৌম্য ইরাকে ইশারায় বোঝায় খাওয়ানোর জন্য। ইরা পরোটা ছিঁড়ে সন্ধ্যার মুখের সামনে নিলে সন্ধ্যা হা করে খাবারটুকু নেয়। ধীরে ধীরে একটা পরোটা শেষ করে আর খেতে চায়না। ইরা জোর করেনা। সন্ধ্যাকে পানি খাওয়ায়। সৌম্য, ইরা দু’জনেই স্বস্তি পায়।
সন্ধ্যা বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। কলেজ ড্রেস অর্থাৎ কলেজ ড্রেসের বোরকা পরে। ইরা বোরকার উপর সন্ধ্যাকে হিজাব বেঁধে দেয়। সন্ধ্যা চুপ করে ইরাকে দেখে। ইরা তার খুব যত্ন করে। সবাই করে। তার সৌম্য ভাইয়া, খালাম্মা। কিন্তু সন্ধ্যা যাকে একটাবার দেখতে চায়, তাকে আর পায়না। বাঁচতে ইচ্ছে করেনা মেয়েটার। কিন্তু সে ম’রে গেলে তার বাচ্চার কি হবে? এই একটি কথাতেই সন্ধ্যার কদম থেমে যায়। স্থির হয়ে যায়। মনের কোণে কিছু শব্দ উঁকি দেয়। যেগুলোর অর্থ – ‘তাকে বাঁচতে হবে।’
লামিয়া আসলে সৌম্য সন্ধ্যাকে নিয়ে আসে। বারবার সাবধানে চালাতে বলে লামিয়াকে। সন্ধ্যাকে জানায়, কেজ শেষে সে গিয়ে নিয়ে আসবে। লামিয়া সৌম্য আর সন্ধ্যাকে দেখে মন ভরে৷ তার ভাই-বোন কিছুই নেই। সৌম্যকে দেখে দুঃখবোধ হয়, ইশ! একটা বড়ভাই নামক ছায়া যদি তার-ও থাকতো। অবশ্য সে সন্ধ্যার ফ্রেন্ড হওয়ার চক্করে সৌম্য তাকেও বড়ভাইয়ের মতো ট্রিট করে। লামিয়ার ভীষণ ভালো লাগে।
.
.
গতকাল বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে এভি। পিছু পিছু জেডি-ও এসেছে। কিন্তু বেচারা গ’রম এভির সঙ্গে কথা বলা তো দূর, কাছেও ঘেঁষতে পারছে না।
এভি কক্সবাজারের একটি রিসোর্টে আছে। এটা তার নিজের। প্রায় পাঁচ বছর আগে রিসোর্টটি গড়ানো। ভাড়া থাকে সবসময়। সে এসেছে জেনে রিসোর্টের স্টাফরা এভির জন্য সব ঠিকঠাক করে রেখেছে। গতরাত এভি এখানেই ছিল। ঘরের এক কোণায় বসে সে। পরনে সাদা প্যান্ট, উদাম শরীর। ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু করছে। প্রায় ৩০ মিনিটের মাথায় শব্দ করে বলে ওঠে,
“ওহ ইয়েস!”
ল্যাপটপটি ঠাস করে বন্ধ করে এভি উঠে দাঁড়ায়। একটি সাদা শার্ট জড়িয়ে, উপরে সাদা ওভারকোর্ট জড়ায়। হাতে চেইন ঘড়ি পরে, পকেটে ফোন ভরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোষাক পরিহিত বেশ কয়েকজন। যারা এভির পিছু পিছু আসতে নিলে এভি বিরক্তি-সূচক শব্দ করে। ডান হাত উঠিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“স্টপ। নো নিড।”
সকলে দাঁড়িয়ে যায়। এভি বা হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে যায়। রিসোর্টের বাইরে জেডি দাঁড়ানো। এভিকে দেখে দ্রুত এগিয়ে আসে। এভি জেডিকে দেখেও না ভান করে চলে যায়। জেডি এভির পিছু পিছু যায়,
“এভি? এভি আমার কথাটা শোন। আমাকে এক্সপ্লেইন করার সুযোগটা দে অন্তত। এভি?”
এভি একবার-ও তাকালো না। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। এভি ভেতরে বসতে নিলে জেডি এভির হাত টেনে ধরে। অসহায় কণ্ঠে বলে,
“এভি প্লিজ! একবার আমার কথাটা শোন। এভি???”
এভি রে’গে দু’হাতে জেডিকে ধাক্কা দেয়। এগিয়ে এসে দু’হাতে জেডির কলার ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“একদম আমার কাছে ঘেঁষবি না। না মানে না। সামনে আসলে যাস্ট খু’ন করে ফেলব তোকে।”
কথাটি বলে জেডিকে ধাক্কা দেয়। এরপর আর এক সেকেন্ড-ও দাঁড়ায় না। গাড়িতে উঠে বসলে ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। জেডি সময় নষ্ট করল না। একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে তার গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। এভির গাড়ির পিছু পিছু যায়। চোখেমুখে অসহায়ত্ব।
এভি তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আয়নায় দেখে, জেডি তার গাড়ির পিছু পিছু আসছে। মাথাটা এপাশ-ওপাশ নাড়ায়। হঠাৎ ডান হাত বাড়িয়ে ড্রাইভারকে টেনে সরিয়ে দেয় পিছনদিকে। ড্রাইভিংসিটে সে বসে। গাড়ির গতপথ স্বল্প সময়ের জন্য একদি-ওদিক হয়, তবে এভি দক্ষহাতে সামলে নেয়। ড্রাইভার পাশের সিটে ভীত চোখে চেয়ে আছে এভির পানে। তাকে একটা কথা পর্যন্ত বলল না। এক্ষুনি এক্সিডেন্ট হলে কি হত? যদিও সে নিজেও তো নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এভির সাথে আছে। কথাটা ভেবে ছেলেটি ঢোক গিলল।
এভির চোয়াল দৃঢ়। শ’ক্ত দু’হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরায়৷ গাড়ি আঁকাবাঁকাভাবে চলছে। গতি সর্বোচ্চ। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে। পাশের ছেলেটি জান হাতে নিয়ে বসে আছে।
এভি স্টিয়ারিং দ্রুততার সহিত একবার এদিক তো একবার ওদিক ঘুরিয়ে গাড়ি চালায়, ফলস্বরূপ জেডির নাগালের বাইরে চলে আসে। আয়নায় তাকিয়ে জেডির গাড়ির অস্তিত্ব টের না পেয়ে এভি বাঁকা হাসল।
.
জেডি এভির গাড়ি হারিয়ে ফেলে আরও কিছুক্ষণ গাড়ি চালালো। কোথাও এভির গাড়ির টিকিটিও না পেয়ে জেডি হতাশার শ্বাস ফেলে। অবাক হয়না। কার রাইডিং-এ এভির সাথে সে কখনো পারেনি। আজ না পারাটা-ই স্বাভাবিক। সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। মুখাবয়বে ভীষণ অসহায়ত্ব। স্মৃতির পর্দায় ভাসল কিছু। জেডির ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে ওঠে। বিড়বিড় করে,
“এভিজান! পারবি না এভাবে।”
কিছু সময় পর, জেডি গাড়ি থেকে বের হয়। আশেপাশে তাকিয়ে একটি ক্যাফে চোখে পড়ল। সেদিকে এগিয়ে যায়। কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে এভি বিরক্তি চোখে তাকায়। সামনের ছেলেটি কয়েকবার বলে, “স্যরি ভাই! স্য….”
অরুণের কথা থেমে যায়। দৃষ্টিতে বিস্ময়। আওড়ায়, “জেডি?”
জেডি ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে আছে। অরুণ নিজেকে সামলে বলে,
“তুই হঠাৎ কোথা থেকে….”
জেডি ভ্রু নাচিয়ে বলে, “মেবি আমার রূপ বেড়ে গিয়েছে৷ তোর দৃষ্টিতে এতো মুগ্ধতা কেন মাই ডেয়ার অরুণ-মরুণ?”
অরুণ নিজেকে সামলালো। জেডির পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলায়। নিজেকে কালো পোষাকে আবৃত করেছে জেডি। অরুণ গলা ঝেড়ে বলে,
“এতোদিন কোথায় ছিলি? আজ হঠাৎ কোথা থেকে বের হলি?”
জেডি অরুণকে পাশ কাটিয়ে ক্যাফের দিকে যেতে যেতে বলে, “ছিলাম একখানে।”
অরুণের পিছু যায় আর বলে, “তুই আকাশের ব্যাপারে জানিস?”
জেডি হাসল। বলে, “আমার জানার কথা না-কি!”
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জেডি ক্যাফের ভেতর এককোণায় এসে চেয়ার টেনে বসে। অরুণের উদ্দেশ্যে বলে, “কিছু জানাতে চাইছিস, অ্যাম আই রাইট? সিট, সিট।”
অরুণ জেডির হাস্যজ্জ্বল মুখের দিকে মলিন মুখে চেয়ে রয়। অপরপাশে বসে ভারাক্রান্ত গলায় বলে, “আমার কথা শুনলে তোর হাসি মিলিয়ে যাবে।”
জেডি ডান হাতে টেবিলের উপর একটা থা’প্প’ড় দিয়ে প্রফুল্ল মনে বলে,
“ওয়াও! ইন্টারেস্টিং তো! আমার হাসি কে’ড়ে নেয়ার ক্ষমতা তোর কাছে আছে দেখছি। ফার্স্ট স্টার্ট কর। প্লিজ!”
অরুণ ঢোক গিলে বলে, “আকাশ মা’রা গিয়েছে।”
জেডি ভাবলেশহীনভাবে বলে, “তারপর?”
অরুণ অবাক হয় জেডির রিয়েকশনে৷ বলে, “আমি ফান করছি না।”
ওয়েটার কফি দিয়ে যায়। জেডি কফির মগে একবার চুমুক দিয়ে বলে,
“আই নো।”
অরুণের অবাকের মাত্রা বাড়ে। যে ছেলে আকাশের কিছু হলে দুনিয়া উল্টে ফেলে। সে কতবছর আকাশের থেকে দূরে ছিল, আর এখন তার শোকের খবর শুনে জেডির মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই? অরুণের চোখজোড়া ভরে ওঠে কেন যেন। দু’হাতে ঝাপসা হয়ে আসা চোখদু’টো ডলে স্বাভাবিক করে। জেডির দৃষ্টি অরুণের পানে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। অরুণের খেয়ালে আসে বিষয়টি। রে’গে যায় সে। নিজেকে যথাসম্ভব সংবরণ করে উপহাসের সুরে বলে,
“সব ডায়লগ ছিল তবে। আকাশের মৃ’ত্যুর খবর শুনে-ও তোর মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। তুই আকাশকে……
জেডি কফির মগ টেবিলের উপর রেখে দাঁড়িয়ে যায়। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে অরুণের দিকে এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। একটু ঝুঁকে বাঁকা হেসে বলে,
“জেডি বেঁচে থাকতে এভি কখনো ম’রবে না।”
অরুণ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। জেডি ডানদিকে ঠোঁট বাঁকায়। ডান চোখ টিপ দেয়। অরুণের অবাকতায় তার হাসি দীর্ঘ হয়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ঘাড় এদিক-ওদিক নাড়ায়। যেন গানের তালে একটু-আধটু দুলছে।
অরুণ একপ্রকার দৌড়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যায়। জেডি এগিয়ে যাচ্ছে। অরুণ দ্রুতপায়ে জেডির সামনে এসে দাঁড়ায়৷ দু’হাতে জেডির কলার ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে, “আকাশ কোথায়?”
জেডি শব্দ তুলে হাসে। অরুণের মুখে ফু দেয় একবার। বলে, “খুব জ্ব’ল’ছে?”
অরুণ রে’গে তাকায়। জেডি তার কলার থেকে অরুণের হাত ঝাড়া মে’রে সরিয়ে দিয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“আমার-ও জ্ব’ল’ছিল। বিশ্বাসঘাতক!”
অরুণ চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করে। চোখ মেলে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “আকাশ কোথায়?
জেডি হেসে বলে, “নিজে খুঁজে নে।”
এরপর জেডি অরুণের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। অরুণ দ্রুত উল্টো ঘুরে চেঁচিয়ে ডাকে, “জ্যাক?”
শব্দটি জেডির কানে পৌঁছাতেই ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে অরুণের নাক বরাবর একটা ঘুষি মে’রে দেয়। ডান হাতে অরুণের কলার ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“Only AV gets this name, nobody else.”
অরুণ অবাক হলো না। রা’গলো-ও না। জেডির রিয়েকশন দেখে নিশ্চিত হয়েছে আকাশ বেঁচে আছে। কিন্তু কিভাবে? তাছাড়া তারা আকাশের লা’শ পায়নি। সবমিলিয়ে অরুণের মাথা ঘুরছে। অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আকাশ কোথায়? প্লিজ বল? ওকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই।”
জেডি হেসে ফেলল। অরুণকে ছেড়ে গা দুলিয়ে হাসতে শুরু করে। এদিক-ওদিক তাকায়। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে বলে,
“তো? ম’রে যা তোরা। আই ডোন্ট কেয়ার মাই ডেয়ার।”
অরুণ রে’গে বলে, “আকাশ কোথায়?”
জেডি হেসে বলে,
“আসমানে নিচে, জমিনের উপর। দু দু’টো ক্লু দিয়েছি। যাহ, এবার খুঁজে নে।”
অরুণ হতাশ হলো। জেডি বলবে না সে জানে। বলার কথা-ও না। আকাশ কি সত্যিই বেঁচে আছে? তাহলে তাদের কাছে আসলো না? পুরো চার মাস পেরিয়েছে। অরুণ জেডির দিকে তাকায়। কি হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। জেডি হাসল। কিছু বলল না। তার গাড়িতে গিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
.
.
.
কলেজ ছুটি হয়েছে পাঁচ মিনিট হলো। লামিয়া সন্ধ্যাকে নিয়ে স্কুটির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সৌম্যকে না দেখে লামিয়া সন্ধ্যাকে নিয়ে স্কুটিসহ একটি ফাঁকা জায়গায় আসে। কলেজে আসার পথে লামিয়া সন্ধ্যাকে স্কুটি চালানো শিখিয়েছে। এরপর সন্ধ্যা দু’মিনিটের মতো চালিয়ে পড়ে যেতে নিলে লামিয়া দৌড়ে এসে আটকায়। জায়গাটি ফাঁকা, এজন্য লামিয়া সন্ধ্যাকে আবার-ও চালাতে বলে। কয়েকদিন চালিয়ে নিতে পারলেই আর সমস্যা হবে না। সন্ধ্যা নাকোচ করে দিল। তার ভালো লাগছে না। লামিয়া হতাশ হলো। সন্ধ্যার মন ভালো করা, তার মুখে একটুখানি হাসি ফুটানো যুদ্ধে জয়ীর সমান।
ছেলেকণ্ঠে ‘লামিয়া’ নাম শুনতে পেয়ে সন্ধ্যা, লামিয়া দু’জনেই সামনে তাকায়। সাদা প্যান্ট, সাদা ওভারকোর্ট, সাদা জুতো, মুখে সাদা মাস্ক পরিহিত এক লোক দাঁড়ানো। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগছে চোখের সোনালি মণি দু’টো। রোদের মাঝে চকচকে জিনিস যেমন ঝিলিক দেয়, এভির চোখদু’টো তেমনি চিকচিক করছে।
এভি এগিয়ে এসে সন্ধ্যা আর লামিয়ার সামনে দাঁড়ায়। একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়। তবে সন্ধ্যাকে নিয়ে তার মাঝে কোনো ভাবারন্তর হলো না। সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে লামিয়ার দিকে তাকায়।
সন্ধ্যা অবাক হয়ে দেখছে এভির চোখ দু’টো। ‘লামিয়া’ বলা কণ্ঠটি তার পরিচিত ঠেকেছে। মেয়েটা ঢোক গিলল দু’বার।
এভি লামিয়ার দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে, “মিস লামিয়া! ইউ নো, অ্যা’ম আ সিঙ্গেল ম্যান?”
সন্ধ্যার পুরো শরীর শিরশির করে ওঠে। এই কণ্ঠ সে চেনে৷ এই কণ্ঠ একমাত্র তার আকাশের। তাহলে এই লোক তার আকাশের কণ্ঠ কোথায় পেল? সন্ধ্যার চোখের কোণে পানি জমে। এখন তার নিজেকেই পা’গ’ল বলতে ইচ্ছে করছে। সে সারারাত কল্পনা করে আকাশকে। সারাদিন আকাশের কণ্ঠ তার কানে বাজে। আর এখন অন্যজনের মাঝে আকাশের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে। সন্ধ্যা নিজেকে সামলতে নিতে চায়। পারলে তো! ডান চোখ ফেটে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।
এদিকে লামিয়া অবাক হয়ে চেয়ে আছে এভির পানে। কোথা থেকে কে এসে তাকে বলছে, সে সিঙ্গেল। ভদ্রলোক সিঙ্গেল হতেই পারে। এটা জেনে লামিয়া কি করবে? সে বলে,
“আপনি সিঙ্গেল না মিঙ্গেল এটা জেনে আমি কি করব ভাই?”
চোখের পলকে এভি বা হাতে উঠিয়ে লামিয়ার ডান গালে ক’ষিয়ে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। লামিয়া সন্ধ্যার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সন্ধ্যা দু’হাতে লামিয়াকে আগলে নেয়। দুই বান্ধবী বিস্ময় চোখে তাকায় এভির দিকে। এভির রা’গে ফোঁসফোঁস করতে করতে হিসহিসিয়ে বলে,
“এভি ফান একদম পছন্দ করে না। ওকেই? রা’বিশ!”
এভি নামটি শুনে সন্ধ্যা, লামিয়া দু’জনেই ঢোক গিলল। খুব বুঝল লামিয়া যার সাথে মজা করে পোস্টটি দিয়েছিল এটাই সে। লামিয়া কেঁদে দেয়ার মতো অবস্থা।
এই লোক তো সাংঘা’তিক। একদম তাকেই খুঁজে বের করেছে। একটা থা’প্প’ড় খেয়ে বেচারির মাথা ভনভন করে ঘুরছে।
এভি আবার-ও লামিয়ার দিকে হাত বাড়ালে সন্ধ্যা এভির হাত শ’ক্তহাতে চেপে মাঝপথে আটকে দেয়। এভি রে’গে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা ভ’য় পেল না। তার বান্ধবী অপরাধ করেছে ভালো কথা। কিন্তু একজন ছেলে হয়ে রাস্তার মাঝে মেয়ের গায়ে হাত তুলবে বারবার। এটা সন্ধ্যা বান্ধবী হয়ে মেনে নিবে? কখনো না। সন্ধ্যা মাস্ক পরিহিত এভির সোনালি চোখের মণিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“এই যে মিস্টার, আমরা ভদ্র ঘরের মেয়ে। তবে অ’ভদ্র মানুষের অযথা আঘাত সহ্য করার মতো ভদ্র নয়।”
একটু শ্বাস নিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“আমার ফ্রেন্ড ভুল করেছে। আপনি তাকে একটা থা’প্প’ড় মে’রেছেন। তবুও আমরা স্যরি! এবার আপনি যেতে পারেন।”
এভি শ’ক্ত চোখে তাকায়। কারো জ্ঞান শোনার মতো টাইম তার নেই। থাকলেও সে শুনবে না। রা’গে ফায়ার হয়ে গিয়েছে একদম। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“এভি ক্ষমা করা পছন্দ করে না।”
কথাটা বলে সন্ধ্যাকে একপ্রকার ধাক্কা দেয়। সন্ধ্যা পড়তে নিয়ে বা পাশে দাঁর করানো স্কুটি ধরে নিজেকে সামলে নেয়। সামনে তাকালে দেখল এভি লামিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার ভীষণ রা’গ হলো। যেখানে মেয়েটা আজকাল অকারণে রে’গে যায়, সেখানে এই মুহূর্তে তার সামনে এক চরম লেভেলের অ’ভদ্র ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা নিজেকে দমিয়ে নিতে পারলো না। দ্রুত এগিয়ে আসে এভির দিকে। এভির লামিয়ার দিকে হাত বাড়ানোর আগেই সন্ধ্যা ডান হাতে এভির বাম গালে ক’ষিয়ে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। এভির মুখ ডানদিকে সামান্য হেলে যায়। মুখ থেকে মাস্ক খুলে পিচঢালা রাস্তায় পড়ে যায়। এভি দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। দু’চোখে যেন আ’গু’ন জ্ব’লছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ভস্ম করা দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে।
সন্ধ্যা এতক্ষণ রে’গে তাকিয়ে ছিল এভির দিকে। মাত্র এভির চেহারা দেখে সন্ধ্যার পায়ের তলার মাটি ভূমিকম্পের ন্যায় কেঁপে ওঠে। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। অবিকল আকাশ! মুহূর্তেই সন্ধ্যার চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে। এটা কি সত্যিই আকাশ? সন্ধ্যার শরীর অবশ হয়ে আসছে। সে কি এবারেও চোখে ভুল দেখছে? এটাও কি তার কল্পনা?
লামিয়া নিজেও অবাক হয়ে চেয়ে আছে। এ তো আকাশ! মেয়েটার মাথা থা’প্প’ড় খেয়ে যতটা না ঘুরছে তার চেয়ে বেশি আকাশকে দেখে ভনভন করে ঘুরছে।
সন্ধ্যা ডান হাত বাড়িয়ে এভির গাল ছুঁয়ে দেয়। কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করতে নেয়, “আকা….
তার আগেই সন্ধ্যার ডান গালে জোরেসোরে এক থা’প্প’ড় মে’রে দেয় এভি। সন্ধ্যার দুর্বল শরীরটা পড়তে দেয়না এভি। সে বা হাতে সন্ধ্যার চোয়াল শ’ক্ত করে ধরে, পিছন থেকে পি’স্ত’ল বের করে সন্ধ্যার মাথায় ঠেকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“কেউ তোর লা’শটাও খুঁজে পাবে না।”
সন্ধ্যার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। এতক্ষণের জমানো অশ্রু দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। বিস্মিত দৃষ্টিজোড়া এভির পানে। অবিকল আকাশের মতো লোকটা কে? যে দেখতে একদম আকাশের মতো, কথা বলে আকাশের মতো। সন্ধ্যার ভেতর থেকে কান্নারা উগলে বেরিয়ে আসে। এটা তার আকাশ নয়। তার আকাশ তাকে একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেয় না। আর এই লোকটা তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়েছে!
সামনে অরুণ বিস্ময় কণ্ঠে ডাকে,
“আকাশ?”
পরিচিত কণ্ঠে নিজের নাম শুনতে পেয়ে আকাশ সামনে তাকায়। অরুণকে দেখে গম্ভীর গলায় বলে,
“হুম। পরে কথা বলছি। ইমপর্ট্যান্ট কাজ করছি।”
সন্ধ্যা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। তার পিছন থেকে আকাশকে অরুণ ডেকেছে, সে জানে। অরুণের কণ্ঠ তার পরিচিত। তার মাথায় বন্দুক ঠেকানো লোকটি আকাশ বলেই তো অরুণের কথায় রেসপন্স করল। তবে আকাশ তার সাথে এরকমটা….সন্ধ্যা আর ভাবতে পারেনা। অনুভূতিহীন চোখে কেবল চেয়ে রইল এভির পানে। চোখদু’টো বোধয় জল ফেলতে ভুলে বসল।
চলবে ইনশাআল্লাহ~~