লেখিকা:নুসরাত পুতুল
পর্ব:০৫
তুমি আমায় এমন করে ঘরে নিয়ে আসলে কেন?
আর ছামিরকে কেন সাথে নিয়ে আসনি।?
কিছু টা সংকোচ নিয়ে জবাব দিলেন,
” রুমিকে একেবারে নিয়ে এসেছি আমি। তাই ছামিরকে সাথে নেই নাই,
লিহাব সাহেবের গলার সূর নিচু,
কথাটা শোনে হাসনা বেগমের চোখ জোড়া থেমে গেলো। এক মুহুর্তের জন্য তিনি বুঝতে পারলেন না কি বলছে স্বামী।
ফের প্রশ্ন করলো,
‘” কি বললে? রুমিকে একবারে নিয়ে আসছো মানে?
” হ্যা, তার শরুর বাড়ি থেকে এজন্যই ডেকে পাঠিয়েছেন আমায়,
তারা রুমিকে রাখতে চায় না সংসারে,
” দেখো সংসারে ঝামেলা হয়, তাই বলে এ ভাবে নিয়ে আসা কোনো সমাধান নাকি।
হাসনা খুব করে বুঝানোর চেষ্টা করছে।
বুঝলো ও লিহাব। হাসনা বেগমের হাতটা টেনে নিজের মুঠোয় এনে বললো,
” দেখ হাসু, আমার বাবা ছিল গ্রামের মাতবর,
বাবা মা*রা যাওয়ার পর আমিও এমন দু চারটে নালিশে যাই লোকে ডাকলে,
মানুষের মুখ দেখে বলতে পারি তার মনের খবর,
তুমি যখন ভাত রান্না করো তখন যেমন একটা ভাতে টিপ দিলল বুঝতে পারো সকল ভাত ঠিক মতো ফুটেছে কি না, আমিও বুঝতে পারি কে কি বলতে চায়, কি বলে কি বুঝাতে চায়।
সামান্য খাবারের ওছিলা নিয়ে ঝামেলা করেছে রুমির শাশুড়ী ননদ,
কিন্তু বেপারটা এখানেই থেমে নেই। তারা রুমি কে রাখবে না। তাই কোনো না কোনো কারণ বের করেছে মাত্র।
এখন রুমিকে ঐ বাড়িতে আমি জোড় করে রেখে আসতে পারতাম,
কিন্তু তারা যে কোনো মূল্যে তাকে বের করতো। নয়তো বড় কোনে ক্ষতি করে ফেলত।
আর আমি চাইনা বিচার বৈঠক করে বোনকে সে বাড়িতে রেখে আসতে। তাই নিয়ে আসলাম সাথে করে। এখন দেখা যাক কি হয়
হাসনা চুপ করে রইল।
” যাও এক কাপ চা করে আনো। আর রুমিকে খাবার দাও। মনে হয়না সারাদিন খেয়েছে।
হাসনা চলে গেলো।
রুমির জন্য খাবার নিতে নিতে একটা বুদ্ধি আসলো মাথায়,
মনে মনে মুচকি হাসলো,
” এটাই পথ, যা করার আমাকেই করতে হবে। চেষ্টা করে দেখি, কিন্তু যাই করি সাবধানে করতে হবে।উনি যেন আগে কিছু টের না পায়।
বুঝে গেলে কখনোই আমায় করতে দিবে না এ কাজ।
____________<<<<
বড় ফুফু ছামির ভাইকে দিয়ে গেছেন আমাদের বাড়িতে। ফুফা নাকি বিদেশে কি ঝামেলায় পরেছে। টাকা পয়সা পাঠাতে পারবে না তেমন। দুই ছেলে নিয়ে ফুফু সংসার চালানো দায় হয়ে পরবে। তাই এখানের একটা স্কুলে ভর্তি করেছে তাকে।
ছামির ভাইয়ার বয়স ১০ বছর। আমি যে স্কুলে পড়তাম সেখানেই ক্লাস ফাইভে ভর্তি করেছে তাকে। সে সূত্রে দু জন একই সাথে স্কুলে আসা যাওয়া করা হয় এখন। আগে আমার রিক্সা ভাড়ার টাকা,টিফিন খরচ আমার হাতে দেওয়া হতো।
এখন ছামির ভাইয়া সাথে যায়,সে বড় আমার, তাই দায়িত্ব টা তার উপর দেওয়া হলো,
আমার রোজকার টিফিন খরচ এবং রিক্সা ভাড়ার টাকা এখন তার হাতে দেয়,
বাড়ি থেকে রিক্সা করে স্কুল যেতে আসতে ২০ টাকা করে ৪০ টাকা লাগে,
বাবা প্রতিদিন ছামির ভাইয়ার হাতে ১০০ টাকার একটা কচকচে নোট ধরিয়ে দেয় আমারই চোখের সামনে
,
কিন্তু আমায় টিফিন খাওয়ার জন্য কখনো ১০ টার ঝালমুড়ি ধরিয়ে দেয়, কখনো আবার দেয় না। বাড়ি নিয়ে আসে,
এসব কিছু প্রথম প্রথম না বুঝলেও কয়দিন গেলে বুঝি আমি।
একদিন স্কুল ছুটির পর আমি ভাইয়াকে বললাম,
” আইসক্রিম খাব,
নাদিম ভাইয়া আড় চোখে তাকালেন আমার দিকে,
” কি খাবি?
” কোন আইসক্রিম,
কিছু টা ভয়ে ভয়ে বললাম আমি।
” কোণ আইসক্রিম এর দাম কতো জানিস? ৫০ টাকা দিয়ে তোকে আইসক্রিম খাওয়ালে বাড়ি যাবি কি ঘোড়ার গাড়ি করে?
চুপচাপ বাড়ি চল।
কথাটা একটু জোড়েই বললেন নাদিম ভাই।
আমি মুখের উপর বলে দিলাম,
” বাবা তো রোজ একশো করে টাকা দেয় তোমায়। আর গতো দু দিন তো তুমি আমায় একটা ও মজা কিনে দাওনি। তাহলে এখন আইসক্রিম দিচ্ছ না কেন?
আমার কথায় গরম চোখে তাকালো ভাইয়া। যা দেখার পর আমি আর কথা বলার সাহস পাইনি,
চুপচাপ বাড়ি চলে গেলাম সে দিনের মতো।
রাতে ও আমাকে আর নাদিম ভাইকে এক ঘরে ঘুমাতে হতো।
বেশি নড়াচড়া করলে ধমকে উঠতো সে। বলতো বেশি নড়লে মাটিতে ফেলে দিবে।
দিন দিন তার ব্যবহারে আমার ভিতরে কেমন ভয় বারতে লাগলো।
নাদিম ভাই মানেই আমার কাছে আতংক। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেন আমার বাড়িতে আমি তার গোলাম,
দাদি কে ও দেখলাম মাছের বড় টুকরা টা আমার পাতে না দিয়ে নাদিম ভাইয়ের পাতে দিতে।
সব কিছু তে নাদিম ভাই কি চায়, কি পছন্দ করে সে দিকে গুরুত্ব দেন।
আমার এসব মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া উপায় ছিল না,
পর দিন আমার স্কুল ছুটির পর চুপচাপ হাটছিলাম। হঠাৎ নাদিম ভাই কড়া গলায় বলল,
দাড়া,
আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে কোথায় যেন গেলো, ফুরে আসলো মিনিট দুয়েক পর। তালে দেখে আমি অবাক, সত্যি এমনটা আশা করিনি।