লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী
পর্বঃ০৪
”হোয়াট?”
-“কি হয়েছে মেঘ?”
মেঘ ফাদিনের পানে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে একটু হাসলো।অর্কসহ ড্রইংরুমের সবাই ওর পানে তাকিয়ে আছে। তবুও মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে মাইশার পানে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বললো -” কি বলেছিস? আবার বল।”
মেঘকে এইরকম ভয়ংকর ভাবে রেগে যেতে দেখে মাইশা আমতা আমতা করে বলল -” কই? আমি কিছু বলি নাই তো। তুই বোধহয় অন্য কিছু শুনে ফেলেছিস।হে হে। “
মেঘ শাসিয়ে তাকাল। মাইশা মিনমিন করেতে শুরু করল। ততক্ষণে জোহান নিচে চলে এসেছে। উৎফুল্ল হয়ে হেলেদুলে এসে মেঘের সামনে দাঁড়ালো।মেঘ খেয়ে ফেলার মতো লুক দিয়ে দৃষ্টিপাত করলো জোহানের দিকে । জোহান নিজ থেকেই মেঘের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো-” হ্যালো ক্লাউড।আই অ্যাম জোহান ক্রিস্টিয়ানো। “
মেঘ হতবাক নয়নে একবার হাতের দিকে একবার জোহানের মুখের দিকে তাকাল। পাশ থেকে ফাদিন নাক ছিটকে বলে উঠলো -” কি বিচ্ছিরি?কি বিচ্ছিরি? তোমার নাম খেয়ে দিলো একদম। তোমার নামকে এভাবে আমি কেন প্রথম বিশ্লেষণ করলাম না বলো তো।আগে কেন মাথায় এলো না।”
মেঘ সেদিকে কান না দিয়ে শক্ত করে জোহানের হাত চেপে ধরল। তাতে জোহানের ভাবভঙ্গি পাল্টালো না উল্টো আর হাসোজ্জল হয়ে গেল। মেঘ চোখে ক্রোধ রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে হ্যান্ডশেক করে বললো-“হায়।মাই নেইম ইজ ইহতেশাম চৌধুরী মেঘালয়। নট ক্লাউড। “
জোহান একটু অবাক হয়ে তানিশার পানে তাকাল। তানিশা কপাল কুঁচকে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। -” প্রিন্সেস
হার নেম ইজ ক্লাউড, রাইট? “
তানিশা বিরক্তি মুখে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলো। মেঘ আরেকটু চাপ দিলো জোহানের হাতে।এই অদ্ভুত কান্ড ড্রইংরুমের বসে থাকা বাকি তিন মানব-মানবী উৎসুক নয়নে চেয়ে দেখছে। জোহান হাতের পানে তাকিয়ে মুখ তুলে মেঘের মুখের দিকে দৃষ্টি রাখলো। মেঘ কটমটিয়ে বলল-” ওটা ক্লাউড হবে না। ডাকলে মেঘ ডাকবে না হলে মি.চৌধুরী ডাকবে, ওকে। “
ফাদিন মধ্যিখানে টিটকারি মেরে বললো-” মি.চৌধুরী আয় হায়!”
একেওপরের হাত ছাড়ছে না।জোহান আবার মৃদুহাস্য মুখে হাত ঝাঁকিয়ে বললো-” ওকে মিস্টার ক্লাউড।তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগলো। তোমাকে যতটা হ্যান্ডসাম আর কুল ভেবেছিলাম তুমি তার থেকেও বেশি হ্যান্ডসাম এন্ড কুল। “
জোহানের কথা শুনে মেঘ বিস্ময়ের চূড়ায় উঠে গেল। বিদেশিটা তাকে হ্যান্ডসাম বলায় একটু কাশলো।কেশে ফাদিনের দিকে তাকিয়ে বললো -” এই বিদেশি পাডা কি বললো শুনলে ফাদিন ভাই? “
ফাদিন মাছি তাড়ানোর মতে করে বলল-” আরে বাদ দাও ব্যাক্কলটা কি থেকে কি বলে না বলে। “
মেঘ চোখ ছোট ছোট করে শুধালো -” তাহলে বলতে চাচ্ছেন আমি হ্যান্ডসাম নই?”
ফাদিন উঠে আসতে আসতে বলল-” আরে ভায়া! তুমি সব কথা মনে নিয়ে নেও কেন? “
ফাদিন জোহান আর মেঘের হাতের বন্ধন ছাড়িয়ে বলল-” পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম হ্যান্ড শেক এওয়ার্ড পেয়ে গেছেন আপনারা। এখন হাত ছাড়েন। “
মেঘ ঝাটকা মেরে হাত ছেরে দিয়ে মাইশাকে বলল-” একটা টিস্যু দে তো। আমার সুন্দর হাতে কলঙ্ক লাগলো রে। “
মাইশা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দেখে মেঘ ধমকে উঠলো -” ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাইয়া আছোস ক্যান?যা করতে বলেছি কর।”পাশ থেকে অর্ক টিস্যু দিলো।
এবার অর্ককে ধমকে উঠলো -” শালা কথার কথা বুঝে না। “
অর্ক হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে তাকলো। তা দেখে মেঘের দিগুণ রাগ লাগলো। -” দূর বা*ল। থাকবোই না এখানে। “
বলে মেঘ ঘর থেকে বের হয়ে গেল।পিছনে দেখে গেল বিস্মিত মুখের কিছু মানুষকে। মেঘ ঘর থেকে বের হয়ে গার্ডেনে গেল। আকাশের মিটিমিটি তাঁরা দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস নিলো।মাথা শান্ত হচ্ছে না তার।সে যে উদ্ভট আচরণ করেছে তা সে জানে।কিন্তু তানিশাকে ওই লোকটা কেন প্রিন্সেস ডাকবে? ওর ভাইয়েরা ওকে ডাকলে সমস্যা নেই। কিন্তু ও কেন ডাকবে।আর তানিশা কেন জবাব দিবে? মেঘের ভেতরে স্ফুলিঙ্গ ফুটতে লাগলো।গলার সাথে চিপকে থাকা টাইটা খুলে হাতে পেঁচাল।হঠাৎ আশেপাশে অন্য কারো অবস্থান উপলব্ধি করতে পেরে দু কদম এগিয়ে গিয়ে দেখে ফারহান কার সাথে যেন কথা বলছে। মেঘ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলো ফারহানে কথ শেষ হবার জন্য। ফারহান মেঘকে লক্ষ্য করে বন্ধু কাছে বিদায় নিয়ে কল কেটে দিলো। -” মেঘ ভাই যে! এখানে কার উপর রাগ ঝাড়ছেন? “
-” কই? কারো উপর না তো? “
ফারহান মেঘের হাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকা করে বলল -” ওহ আচ্ছা। বুঝলাম। “
-” না তুমি কিছুই বুঝনি। এই তুমি ভাই হয়ে বোনকে সামলাতে পারো না? কাকে না কাকে বাসায় নিয়ে এসেছে। তোমাদের সামনে প্রিন্সেস প্রিন্সেস বলে চেচাচ্ছে! আজব।”
ফারহান সান্ত্বনা দিয়ে বলল -” বাদ দেন। সবার মতো আপনি আর কিছু বলিয়েন না। শখ করে বন্ধু নিয়ে বোনের বিয়েতে এসেছে। আমরা তো আর মানা করতে পারি না। আর কি হলো বয়সের বড় বন্ধু হলো বলে।এইসব এখন কোনো ম্যাটার হলো?তানিশা তো আবার একটু ব্যাক্কলও আছে। “
এতোক্ষণ মেঘ ভালোও ভালোও কথাগুলো শুনছিল।কিন্তু শেষের কথাটা তার গায়ে লাগলো। গম্ভীর স্বরে বলল -” বোনকে ব্যাক্কল বলতে হয় না ফারহান। “
ফারহান নিজেই মেঘের কথায় ব্যাক্কল হয়ে গেল।সে এতক্ষণ একেই তো বুঝ দিচ্ছিলো। -” মেঘ ভাই তুমি ন্যানো সেকেন্ডের ভেতর মুড পরিবর্তন কিভাবে করো বলো তো?”
মেঘ মুখ উঁচু করে অন্ধকারে মধ্যেও গাছের মগডালের পানে তাকিয়ে ভাব নিয়ে বলল-” একদিন এসো ক্লাস করাবো। এখন আপাতত তোমার সাথে কথা বলার মুড আমার নাই। যাই গা। “
ফারহান মেঘের গমনের পথের পানে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টালো।এই একটা মানুষের কখন রাগ উঠে কখন আবার নিভে যায় বুঝা যায় না। তবেই এই রূপ সে বহুদিন পরে দেখছে।
***********
মেঘ শিকারী চোখে দুতলা থেকে ড্রইংরুমে দৃষ্টিপাত করে দেখেছে। জোহান তানিশার মেজো চাচা নাজমুল মর্তুজা পাশে বসে আছে। পাশের সোফায় বসে মানজুম আরা কি সব জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন জোহানকে।জোহান হেসে হেসে তার জবাব দিচ্ছেন। নাজমুল মর্তুজা বিরক্ত চোখে বউয়ের বাচ্চামো দেখে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর বিরক্তি প্রকাশ করে এটা সেটা বলছেন মানজুম আরাকে।মানজুম আরা তাতে কান দিচ্ছেন না।জোহানকে এতো সহজে সবাই গ্রহণ করে নিয়েছে দেখে মেঘের ভেতরে স্ফুলিঙ্গ হাওয়া লেগে আগুন ফুটছে দাউ দাউ করে। দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে মেঘ। মাইশা দুতলার রেলিং ধরে মেঘের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছে।অর্ক ফাদিনের রুম থেকে বের হয়ে এসে মাইশার পাশে দাঁড়াল। মেঘের দিকে একপলক তাকিয়ে মাইশাকে ফিসফিসিয়ে বলল-” এর মতিগতি তো সুবিধার না।আজ কি বাসায় যাবে না? সে চাইলেও দু মিনিটে নিজের বাসায় চলে যেতে পারে। তাহলে আমাকে ছাড়ছে না কেন? “
মাইশা অর্কের অস্থিরতা দেখে মুখ কুঁচকে ফিস ফিসিয়ে বলল -” বাড়িতে তো একটা বউও নাই। তাহলে এতো উতলা হছিস কেন? ডিনার করে যাবি। “
অর্ক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -” তাই বলে বাড়ি যাবো না? বললো আজ আমার ছুটি। শা*লা আমার বা*লের ছুটি দিয়েছে।”
-” গেছিস কেন নাচতে নাচতে ওর অফিসে চাকরি নিতে।কত করে বললাম আমার সাথে ইন্টারভিউ দিয়ে দেখ হলে তো দুটোই এক ব্যাংকে কাজ করতে পারি।না তখন তো এলি না।আমি ঠিক চাকরিটা পেয়ে গেছি। এখন বাদ দে ওসব। এর মতিগতি দেখ। একদম সেই মেঘ না? ভার্সিটিতে যেমন রগচটা ছিল। “
-” রগচটা, বদমেজাজি এখনও আছে। বদলায়নি একটু। তুই তো অফিসে যাস না তাহলে দেখতি।বাইরে তো জেন্টালম্যানের মুখোশ পরে আছে। “
মাইশা অর্কের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেঘের পানে তাকাল। মেঘের চোখে মুখে এখন ক্রোধ, ক্ষোভে বদলে মুগ্ধতা জমা হয়েছে।মাইশা মেঘের দৃষ্টি বরাবর নিচে তাকাল।দুতলা থেকে ড্রইংরুম লাগোয়া ড্রাইনিংরুমের একাংশ দেখা যাচ্ছে। যেখানে তানিশা খেতে বসেছে।তার গালের একপাশ দৃশ্যমান। পাশের আরেকটা চেয়ারে তানিশার বাবা নাহিদ মর্তুজা আইয়াজকে কোলে নিয়ে বসেছেন। মেয়েয়ের পাশে বসে মজার কোনো গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন।
-” মেয়েটা এমন গিন্নী সেজে হাঁটছে কেন বলতো? “
মেঘের কোমল কন্ঠ স্বর শোনে মাইশা মেঘের পানে তাকিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল -” আর বলিস না। মেয়েটা যা শুরু করেছে। চুল কেটে কুটে। আর এটা নাকি তার ফ্যাশন। শাড়ী পরে আঁচল উড়িয়ে উড়িয়ে হাঁটছে।আমেরিকাও নাকি শাড়ীই পরতো। কেমনটা লাগে বলতো?”
মেঘ তানিশার দিক থেকে চোখ না সড়িয়েই বললো -” তাও তো কিউট লাগছে।আমি ওকে যখনই দেখি প্রথম দেখার মতোই ফিল হয়। জানিস?”
মাইশা কপাল চাপরে বলল -” হায়রে প্রেমের মরা রে।”
মেঘ নির্মল হাসলো।মাইশা তা দেখে মুখ ভেঙচি দিলো।তানিশা দিকে আবার তাকাল। নাহিদ মর্তুজার পাশের চেয়ারে এখন আইরাও এসে বসেছে। ছোট শশুরের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। তানিশা নিজের প্লেট থেকে খাবার আইয়াজের মুখে দিলো। আইয়াজ তা থু মে*রে ফেলে দিলো। তা দেখে আইরা নাহিদ হেসে উঠলেন। মাইশা একটি বিরক্তি একটু আফসোস করে বললো -“কাল আসার পর থেকে লতাপাতা ছাড়া কিছুই মুখে নিচ্ছে না মেয়েটা। সে না কি এখন সাস্থ্য সচেতন মানুষ।ওই বিদেশী উল্লুকটা নিশ্চয়ই এটা ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।নিজে আবার ভালো ভালো খাবার খাচ্ছে। “
মেঘে নির্বিকার চিত্তে বলল-” চিন্তা করিস না। আমাদের দেশে এসেছে না। এমন ডোজ দিবো। তানিশার পিছনে পরবে না আর। কার পানে চোখ দিয়েছে তা তো জানে না। “
-” কি করবি তুই? তানিশা তো আবার চলেই যাবে। ওর পড়াশোনা তো শেষ হয়নি। সেখানে গিয়ে সেই যেই সেই।”
-” তাহলে আরও ডোজ বাড়বে।যাতে সেটার ইফেক্ট আমেরিকা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।”
-” তোর কি মনে হয় শুধু জোহানকে কিছু করলে হবে। আরে আমাদের মেয়েকে আটকাবি কেমন করে? সে এটা হতে দিলে না। “
-” সেটা তোকে ভাবতে হবে না। “
-” আমি ভাবতে যাচ্ছিও না।তুই বুঝতে পারছিস না।তানিশা আর সেই তানিশা নেই রে। কেমন যেন হয়ে গেছে। গোমড়া মুখি সাথে ভীষণ স্ট্রিক।”
-” লুক লাই এডভোকেট সুলতানা হায়দার। তাই তো নাকি? “
-” তা বলতে পারিস।”
-” তানিশা তখন ছোট ছিল। তাই ওর আসল ব্যাক্তিত্ব ফুটে ওঠে নি। এখন বুঝা যাচ্ছে। আর আমার মনে হয়ে আমার এমনটাই চাই। “
অর্ক এতোক্ষণ ওরে কথোপকথন শুনছিল। এই মূহুর্তে হাসি আটকে রাখতে পারলো না। হেসে মাইশার কাধে হাত রেখে বলল -” বাদ দে বোইন বাদ দে। জীবনেও সে তানিশাকে ভুল বুঝবে না। মেয়েটা যদি তার বুকে চা*কু মা*রে সে বলবে এই মেয়ে বুঝে করেনি। “
মাইশা কটমট করে চেয়ে বলল -” আমি আমার বোনের প্রতি ভুল ধারণা সৃষ্টি করছি? “
অর্ক তড়িঘড়ি করে বলল -” আরে না না! আমি এমন বুঝাই নাই রে মা। রাগিস কেন? তোর বোনকে কিন্তু খুব সুন্দর লাগছে নতুন লুকে। হয়েছে?”
মাইশা কিছু বলার আগেই মেঘ হুমকি স্বরূপ বলল-” আর একবার তোর নজর ওর দিকে গেছে তো তোর চোখ তোলে আমি লুডু খেলবো। “
অর্ক হাত জোর করে দিয়ে অসহায়ত্ব নিয়ে বললো-” মাফ ভাই মাফ।তোরা দুইটার মাঝে কথা বলা সবসময়ের মতো আমারই ভুল। ” তারপর মিনমিন করে বলল-” যার চোখ নিয়ে খেলবি তার না নিয়ে আমার পিছনে পরতে চায়। “
-” ওটাও হবে। “
মেঘের কথা শুনে অর্কের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। শুনে ফেললো ধ্যাত। এখন না আবার তাকে ধরে আছাড় না মা*রে। অর্ক পিছেন ফিরে লম্বা লম্বা কদম ফেলে আবার ফাদিনের রুমের দিকে হাটা দিলো। মাইশা অর্কের গমন পথ থেকে চোখ সরিয়ে আবার নিচে থাকাল।নাহিদ মর্তুজার হাসি মুখ দেখে বলল-” আগে ছোট বাবাকে কতই না ভয় পেতাম।বাড়িতে যখন ছুটিতে আসতেন বাড়ির সব বাচ্চারা শান্ত হয়ে যেতো এমনি এমনিই।চালচলনেই আলাদা একটা শক্তিশালী ভাব ছিলো। তানিশা যাওয়ার পর থেকে নিমেষেই যেন বদলে গেলেন। এখন ছুটিতে এলে বাড়ির মেয়েদের নিয়ে আড্ডা দিতে পছন্দ করেন।রাইশা আপু তানিশার আমিরিকায় যাওয়া পর প্রথম যখন বাড়ি বেড়াতে এলো। ছোট বাবার এমন রূপ দেখে ভরকে গিয়েছিল।ছোট বাবার কথার জবাব দিতেই ওর দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিলো।হা হা। “
-” মেয়ে দূরে যাওয়ায় হয়তো শূন্যতা বোধ করছিলেন। “
-” হয়তো!”
*************
সুলতানা হায়দার চেয়ারে বসে একটা আইনি বই পড়ছিলেন। হঠাৎ রুমের দরজায় কেউ ঠুকা দিতে চোখে চশমা ঠেলে মুখ তুলে তাকালেন।তানিশা মায়ের পানে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল -” আসতে পারি। “
সুলতানা হায়দার মনে মনে খুশি হলেও মুখে প্রকাশ করলেন না। শান্ত কন্ঠে বললেন -” এতো ঢং না করে ভেতরে আসো। “
তানিশা এসে সুলতানা হায়দারের মুখোমুখি আরেকটা চেয়ার টেনে বসলো। রুমের চারপাশে তাকিয়ে বললো -” আম্মু আব্বু কোথায়? “
-“আব্বুর কাছেই এসে ছিলে?”
-“নাহ।তোমার কাছেই এসেছি।”
সুলতানা হায়দার বইটা রেখে দিলেন একপাশে। চশমাটা খুলে তানিশার পানে একবার তাকিয়ে উঠে গেলেন। তানিশা একমনে সুলতানা হায়দারকে দেখে গেল।মাথার একটা দুইটা চুল পেকেছে উনার, এই পরিবর্তন। না হলে সেই ইয়াং ওমেনই। মেয়েকে এভাবে তাকাতে দেখে সুলতানা হায়দার জিজ্ঞেস করলেন -” আমার দিকে তাকিয়ে কি এমন দেখছিস?”
-” তোমাকে। আচ্ছা, তুমি এখন আর হাতে কোনো কেস নিচ্ছো না কেন ? “
-” এখন আর মন মানছে না এসবে। “
-” তুমি এসব বলছো? “
সুলতানা হায়দার টেবিলের উপর এনে একটা পলিথিনের ব্যাগ রাখলেন। -” এখানে অবাক হওয়ার কি?আমার মনে হয় আমার জাগতিক সবকিছু থেকে মন উঠে গেছে। বাড়িতে থাকতে পছন্দ করি। বাদ দাও। এসব তোমার বাবাকে দিয়ে আনিয়েছি। মাইশা আইরাকে নিয়ে খাবে।”
তানিশা চোখ ছোট ছোট করে মায়ের পানে তাকিয়ে আছে। সুলতানা হায়দার তানিশার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন। চেয়ারে বসে অস্থির ভঙ্গিতে টেবিলের কোণ খুঁটলেন।সন্তানদের প্রতি কখনও তিনি নমনীয় ছিলেন না। তেমন আড্ডা দেওয়ার মানুষও না। আজ কত কথা জমে আছে। তবুও দ্বিধা ঠেলে বলতে পারছেন না। তানিশা নিরবতা ভঙ্গ করে বলল -” আম্মু, জানো? খালামনি বলছে শাড়ীতে নাকি আমাকে একদম তোমার মতো লাগে। দুজনেকে একসাথে বসালে মানুষ বলবে আমরা দুইবোন। আমাকে সত্যি এতো সুন্দর লাগে?”
সুলতানা হায়দার চোখ বুঁজে সায় দিয়ে বললেন -” ভীষণ!”
তানিশা মৃদু হাসলো যেন সে সন্তোষ হয়েছে মায়ের মুখে এমন কমপ্লিমেন্ট পেয়ে । মানুজুম আরা গলা ফাটিয়ে তানিশাকে ডাকতে ডাকতে রুমে এসে ঢুকলেন।মানজুম আরার হাতে একটা বাটি দেখে তানিশা আঁতকে উঠল। -” দেখো মেজো মা আমার মাথায় এসব একদম দিতে চাইবে না বললাম। “
মানজুম আরা খ্যাক করে উঠলেন -” চুপ। চুপচাপ এসে বস আমার পাশে। আয়। “বলে বিছানায় আসন পেতে বসলেন।তানিশা অসহায় মুখ করে সুলতানা হায়দারের দিকে তাকিয়ে বললো -” আম্মু বলো না এসব আমি আমার চুলে দিবো। “
মানজুম আরা সুলতানাকে শাসিয়ে বললেন -” সুলতানা তুমি আমাদের মা মেয়ের মধ্যে আসবে না একদম। চুলের কি অবস্থা হয়েছে তোর মেয়ের দেখ।ঘাসের মতো লাগে দেখতে। এই তুই আয় বললাম। “
-” না না। কি উটকো গন্ধ। ওয়াক।পুরো রাত নাকি মাথয় রাখতে হবে। আমার বালিশে লেগে গিয়ে যা তা অবস্থা হবে। “
-” ঘামছা বেধে দিবো।দিয়ে দেই আরাম পাবি। চুলও লম্বা হবে। জোহানের কাছ থেকে জেনে করেছি।”
-” তুমি ওই বদমাশের কথা শুনতে গেলে কেন? উফফ! কি যে করো না। “বলে তানিশা উঠে গিয়ে মানজুম আরা সামনে বসলো। মানজুম আরা মালিশ করে দিয়ে দিতে শুরু করলেন।আরামে তানিশার চোখ লেগে আসতে নিয়েছিল যখন ঠিক তখনই ঠাস করে পাশে কেউ বসলো। তানিশা চোখ খুলে দেখলো ফাদিন এসে পাশে বসেছে। মাইশাও দাঁড়িয়ে আছে। ফাদিন মানজুম আরার হাত নিজের মাথায় রেখে বললো -” একটু পুত্র সেবা করো মা জননী। মেয়েদের সেবা করে কি হবে? সেই অন্যের বাড়িতে কামলা খাটবে। তোমার কোনো প্রফিট নাই। “
মানজুম আরা ছেলের মাথায় ধাক্কা দিয়ে আবার তানিশার মাথায় হাত রাখলেন। মানজুম আরা নিজের দুই ছেলে ফাদিন আর ফাহিমকে দেখতে পারেন না। ওনার মেয়ের ভীষণ শখ।আর ওনার দুই দুইটা সন্তানই ছেলে।আর একটা ছেলেও ওনার মন মতো না। একটা বেশি উগ্র তো আরেকটা বেশিই নম্র। তাই ওনার কাছে বাড়ির মেয়েগুলোর কদর বেশি।ছেলেরা গাঙ্গের জলে ভেসে যাক, তাতে কিছুই আসে যায় না উনার।তানিশাকে তা নিয়ে হাসতে দেখে ফাদিন ধমক উঠলো -” মুখ বন্ধ কর। মুখ বন্ধ কর গাধার রাজকুমারী। তোরা আমার হক খাইলি।”
মানজুম আরা উল্টো ছেলেকে ধমকে উঠলেন -” তুই চুপ কর। আর যা এখন থেকে। আমার মেয়েদের কিছু বলবি না। “
ফাদিন বিরক্ত হয়ে উঠে গেল।ধুপধাপ পা ফেলে যেতে যেতে বলল-” আল্লাহ জানেন আমাদের কোন রাজার বাড়ি থেকে কে চুরি করে আনা হয়েছে। রাজার বাড়ি থাকতাম আদর পাইতাম। এখানে আমার কোনো কদর নাই।”
-” আমার ছেলেটার কখনও বুদ্ধি শুদ্ধি হবে না। এই মাইশা আয় তোকেও দিয়ে দেই। “
মাইশা নাক কুঁচকে মানা করে
দিলো। সে সুলতানা হায়দার পাশে গিয়ে বসে ব্যাগ খুলতে ব্যাস্ত হলো। তার চুল সে পার্লরে থেকে টিক করে এনেছে।সে এসব লাগিয়ে বারোটা বাজাতে পারবে না।
চলবে……