পর্বসংখ্যা_৪
সরু গলি পেরিয়ে বাজারের দিকে হাঁটতে থাকা দুই মানব-মানবীর মাঝখানের সময়টুকুতে নীরবতা বিরাজমান ছিলো। কাবির এইসময়টুকু কথা বলেনি। তবে সেও বাজারের পথ ধরে বাড়ি যাবে বলে প্রীতিষার সাথেই একসাথে যাচ্ছিল। যেহেতু বাজারের সাথে তার লাগোয়া বাড়ি তাই। এদিকে প্রীতিষার দেরি হয়ে গেছে বেশ। একটা ফালতু ঝামেলায় ফেসে গিয়েছিলো, তাই তো আজ পড়াতে পারলো না। এই কারণে, প্রীতিষা ভেতরে ভেতরে অস্থির হচ্ছিল। তার টিউশনটা শুধু শুধুই মিস গেলো। আজ আর পড়াতে পারবে না বলে স্টুডেন্টকে ফোনে জানিয়ে দিয়েছে পরের শুক্রবার পড়িয়ে দেবে আজকের পড়াটা। কিন্তু কাবির হঠাৎ চিরাচরিত ঢঙে কিছু না বলেই উল্টো দিকে হাঁটা ধরলো। প্রীতিষা অবাক হলো না এ কাজে। বুনো ষাড়টাকে এ-ই দুদিনে হাড়ে হাড়ে চিনে গেছে সে। তাই অপেক্ষা না করে পেছন থেকে ডাকলো,
“কাবির! প্লিজ, যাবেন না। একটু দাঁড়ান।”
কাবির পেছন ফিরে ঘুরে দাঁড়াল অতি বিরক্ত ভঙ্গিতে। এই মেয়ে পিছু ছাড়ছে না কেন তার! অত:পর নিজের হাত দুটো কোমরে রেখে বলল,
“আবার ডাকাডাকি কিহের? তুমি না কই যাবা, যাও। আমারে দিয়া কি এহন? লেনাদেনাও তো শেষ।”
প্রীতিষা খানিক চটে গিয়ে বলল,
“এত বেশি কথা বলেন কেন?”
কাবির খানিকটা রেগে গিয়ে তেড়ে এগিয়ে এলো একটু,
“আমার মুখ, আমার ম’র্জি। লাগে সারাদিন কথা কমু, চিল্লামু! তুমার কি?”
হতাশ হয়ে মাথা দোলালো প্রীতিষা। নাহ, এই বুনো ষাড়টার সাথে কোনোমতেই পারা যাবে নাহ! তারপর শান্ত গলায় নরম হয়ে বলল,
“কখনো আমাকেও বলার সুযোগ দিন! আপনি না থাকলে আমি হয়তো বড় কোনো বিপদে পড়তে পারতাম। কিন্তু আপনি ঠিক সময়ে এসে বাচিঁয়েছেন। তাই আপনাকে ছোট্ট একটা ট্রিট দিতে চাই। বিরিয়ানি খাওয়াবো আপনাকে। ধরুন, এইটাই আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম।”
খাওয়ার কথা শুনে আনন্দে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠে কাবিরের। কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না, শক্ত রাখতে চাইল। বিষয়টা ছ্যাবলা*মি হয়ে যাবে ভেবে। তবে বহুদিন পর বিরিয়ানির কথা শুনে নিজেকে সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। তাই জিভ দিয়ে ঠোঁ’ট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করে বলে,
“আসলেই খাওয়াবা?”
প্রীতিষা মৃদু হাসল,
“জ্বিইই।”
কাবির আবার হঠাৎই চোখ ছোট ছোট করে সন্দেহের ভঙ্গিতে তাকালো,
“আসলেই কি কৃতজ্ঞতার জন্য? নাকি মনে মনে অন্য কিছু? তাইলে কিন্তু যামুনা!”
প্রীতিষা এবার রেগে আগুন,
“বারবার কী বলতে চাচ্ছেন? আমাকে দেখে কি ক্যারেক্টারলে*স মনে হয়? আপনি বু’নো ষাঁ’ড় তবে হ্যাঁ, সুদর্শন দেখতে। তাই বলে আমি কিছু বলেছি বা করেছি? তাহলে এমনভাবে কি বলতে চাচ্ছেন, আমি ওরকম মেয়ে নই!”
কাবির থমকে গেল। ঘাড় বাঁকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
“তা না হয় বুজলাম তুমি ভালো মাইয়া! কিন্তু এইডা কি কইলা! সুদর্শন? তাও আমি?”
প্রীতিষার টনক নড়ে এবার। উত্তেজিত হয়ে অনেক কিছুই বলে ফেলেছে। তাই কাবিরকে ভোলাতে সাথে সাথেই মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“না খেলে নাই। এত সাধতে পারবো না। চললাম..”
সে ঘুরে চলে যেতে নিলে কাবির দৌড়ে সামনে এসে পথ আটকাল,
“আইচ্ছা, চলো। তুমিই না কইলা খাওয়াবা? তাইলে এখন পাল্টি খাও ক্যান?”
প্রীতিষা হেসে উঠে বলে,
“আচ্ছা, চলুন।”
এবার দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল, প্রথমবারের মতো সামান্য স্বস্তির অনুভুতি নিয়ে।
————
বিরিয়ানি খেতে কাবিরকে বেশ আগ্রহী দেখে প্রীতিষা নিঃশব্দে হাসলো। লোকটা যতই বাইরে রুক্ষ হোক, ভেতরে একটা শিশুর মতো মন লুকিয়ে আছে। পুরান বাসটেন্ডের সুগন্ধা হোটেলে ঢুকলো কাবির আর প্রীতিষা। এখানে দারুন স্বাদের বিরিয়ানি পাওয়া যায়। প্রীতিষা মুচকি হেসে ইশারা করে বলল,
“ ওই টেবিলটায় গিয়ে বসুন, আমি আসছি। “
কাবির গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়ে গিয়ে প্রীতিষার দেখানো টেবিলেটাতেই বসে। এরপর প্রীতিষাাও চলে আসে আর কাবিরের সামনা-সামনি চেয়ারটায় বসে। একটুপর ওয়েটার প্লেট এনে রাখতেই বিরিয়ানির গন্ধে কাবির নিচু হয়ে দীর্ঘশ্বাস টেনে নেয়। কিন্তু মুখে বলল,
“হুঁ… সেই সেই! এক্কেরে আগের মতোন স্বাদ! তবে পুরান ঢাকার শাহী বিরানি বেশি ভাল লাগে। যদিও আমাগো টাংগাইলের বিরানিও কম না। এই দোকানে আগেও একবার বিরানি খাইছিলাম। ”
প্রীতিষা মাথা নেড়ে বলল,
“ওহ, আচ্ছা। তবে আমি এখানে আগে আসিনি। প্রথমবার এলাম। নিন, এবার শুরু করুন। ঠান্ডা হয়ে যাবে। “
কাবির প্রথম লোকমা মুখে দিতেই মুহূর্তে চোখ আধবোজা হয়ে গেল। পুরো মুখে তৃপ্তির ছায়া, কিন্তু সে প্রকাশ করতে নারাজ হলো। যদিও খেতে চলে এসেছে মেয়েটার এক কথাতেই! ব্যাপারটা ছ্যাচরা*মি হলো কি? পরক্ষণেই নিজে নিজে ভাবলো, না না, ছ্যাচরামি হবে কেন? সে তো খেতে চায় নি, এই মেয়েটাই খাওয়াতে চাইছিলো। সে তো অনুরোধ রেখেছে মাত্র। এই ভেবে প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে খাওয়ায় মনোযোগী। তাই কাবির বলল,
“ আমাগো টাংগাইলের বিরানি কেমুন….কও? ”
প্রীতিষা হেসে বলল,
“ এক কথায় দারুণ! কালকে ভাইয়াও বিরিয়ানি এনেছিলো আমার জন্য। ট্রাস্ট মি, সেটার থেকেও দারুন। ”
কাবির কিছু বলতেই যাবে তার আগেই ছোট বাটন ফোন বেজে উঠে শব্দ করে। কাবির কিছুক্ষণ কথা বলল ফোনে। কথার মাঝেই হাসি ফুটলো কাবিরের মুখে। প্রীতিষাও লক্ষ্য করলো সবকিছু আর কাবিরের হাসিটাও প্রথমবার দেখে ভালো লাগলো তার। এমনিতে সবসময় শয়তানি হাসি দিলেও এই হাসিটা একদম অন্যরকম, প্রফুল্ল, প্রানবন্ত। কাবির ফোন রেখেই প্রীতিষাকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ আজকা দেকতাছি দিনডাই ভালো আমার! মেলাদিন পর বিরানি খাইলাম আবার একটা চারতালা বিল্ডিং এর কন্টাক্টও পাইলাম। আল্লাহকে, বহুত শুকরিয়া। ”
প্রীতিষা জিজ্ঞেস করে বলল,
“আপনি এমনিতে কি কাজ করেন?”
কাবির নিজের সুখকর খানাপিনার মাঝেই জবাব দেয়,
“রাজমিস্ত্রী আমি। তা, তুমি তো পড়াশুনা করো? কিসে পড়ো? “
প্রীতিষা বলল,
“অনার্স ফাস্ট ইয়ার। ভাসানীতে পড়ি। “
কাবির চোখে খুশির ঝিলিক ফুটে বলল,
“আরিব্বাস! পাবলিকে পড়ো! গুচ্ছেও চান্স পাওয়াডা আজকাল বহুত কঠিন! এই ভার্সিটিরে হেলাফেলা কইরো না আবার। তয়, বুজলাম তুমি নিশ্চয়ই ভালো ছাত্রী…. গুড।”
প্রীতিষা অবাক হয়ে ভাবলো, পাবলিক, গুচ্ছ এসব কাবির জানে, বোঝে! মনের প্রশ্ন মুখে আনার আগেই কাবির হেসে বলল,
“কি হইলো? আমারে অশিক্ষিত ভাবছিলা? ব্যাপার না, সবারই একি ধারণা। তয়, আমি কিন্তু ইন্টার পাশ! শুধু পাশই না, সাইন্সে থেকে এ-প্লাস পাইছিলাম। হাহাহা, যদিও এখন এইডা কইয়া কোনো লাভ নাই।”
প্রীতিষা এবার খানিকটা থমকে গেল। খাওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে দ্বিধান্বিত কণ্ঠেই এক দমে বলল,
“এত ভালো ছাত্র ছিলেন যখন পড়াশোনা না করে এই কাজে কেন?”
কাবির চোখে এক ভিন্ন উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল। সে প্রীতিষার দিকে তাকাল। প্রীতিষা ভাবলো হয়তো বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলেছে, যা উচিত নয়। কিন্তু মুখে বলার আগেই কাবির বলল,
“পড়াশোনা ভাল লাগতো না, তাই ছাইড়া দিছিলাম। পড়াশোনা কইরা লাভ কি, কও? হেই তো অন্যের গোলামি। আমার আবার গোলামি সহ্য হয় না। আমি রাজা-বাদশার নাগাল থাকি। যদিও গায়ে-গতরে খাইটা কাম করি, আবার মন চাইলে আরামে ঘুম পারি। যা টেকা পাই আরামে চইলা যায় আমার।”
এই বলে হু-হা করে স-শব্দে হেসে উঠল কাবির। প্রীতিষা একই সাথে অবাক, মুগ্ধ। তবে এত মুগ্ধ হচ্ছে কেন বুঝলো না! লোকটা এতটা ভিন্ন কি করে! সবার থেকে আলাদা একজন হওয়াতেই কি এত আকর্ষন পাচ্ছে। আর ভাবলো না সে। ইতিমধ্যে খাওয়া শেষ দুজনেরই। হোটেল থেকে খাওয়া দাওয়া শেষে দুজন বেরিয়ে এলে কাবির বলল,
“ওহহো! মনেই নাই কইতে? তোমার নামডাই তো জানা হইলো না! কি নাম? “
প্রীতিষা মৃদু হেসে বলল,
“প্রীতিষা শেখ দ্যুতি।”
কাবিরের নামটা পছন্দ হলেও সে স্বীকার করবে না। কারণ সে ভন্ড, ভালো কথা তার সাথে যায় না। তাই স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মুখ বিকৃত করে বলল,
“ছ্যাঁ! নাম রাখছে কি, পিতিষা! অর্থহীন!”
প্রীতিষা রাগী চোখে তাকাতেই কাবির দু-হাত তুলে পল্টি খেয়ে হেসে বলল,
“আরে বেডি! পুরাডা কইতে তো দিবা! দ্যুতি নামডা ভাল লাগছে! দ্যুতি মানে জানোতো?”
প্রীতিষা মাথা নাড়ল, যার মানে সে জানে না। কাবিরের গলা নরম হলো,,
“দ্যুতি মানে হইলো আলো। আমার মায়ের নামও আছিলো আলো।”
প্রীতিষা থমকে দাঁড়াল।
“ছিলো বলতে?”
কাবির একটু হাসল। বড্ড মলিন সে হাসি।
“সে আর নাই। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় আমারে একা ফালাইয়া চইলা গেছে।”
প্রীতিষাকে কিছু বলতে না দিয়ে আবার স্বাভাবিক কঠিন গলায় বলল,
“যাইগা, কাম আছে। তুমি সাবধানে বাড়িত যাইও।”
এইটুকু বলে আর কোনো ফুসরত না দিয়েই হাঁটা ধরলো কাবির। তার সেই চেনা, দ্রুত, অগোছালো এবং দৃঢ় পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যেতে থাকল দূরে। প্রীতিষা স্থির দাঁড়িয়ে দেখলো লোকটাকে একই জায়গায় থেকে, যতক্ষণ দেখা যায়। তার মনে হঠাৎই একটা ভারী ঢেউ এসে লাগলো। যাদের মা নেই, তারা দুনিয়াকে একটু বেশি কঠিনভাবে দেখে। একটু বেশি শক্ত হয়ে বাঁচতে চায়। তবে কাবির সবার থেকে আলাদা, পুরোটাই আলাদা।
আর প্রীতিষাও কাবিরের সেই শূন্যতা চেনে। কারণ সেও তো একি অভাগী। তার ভাই সবটা দিয়ে তাকে আগলে রাখলেও মায়ের জায়গাটা কী কোনোদিন পূরণ হয়? হয় না। প্রীতিষা ফিরল উল্টোদিকে। দু’জন দুই দিকের পথ ধরে হাঁটলেও, মাঝখানে অজানা একটা বড়সড় অনুভূতির রেখা টেনে রেখে গেল। যার সূচনা হলো আজ। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে, তাদের নিজেদের অজান্তে।
**************
রাত নটা। ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলছে, আর মাঝের ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে খাবারের টেবিল। কায়রা রাতের খাবার খাচ্ছে, আর কায়রাভ কায়ানকে কোলে তুলে ভাত চটকে খাইয়ে দিচ্ছে। কায়ান বাবার কাছে খেতে গাইগুই করে না। কারণ বাবাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। কারণ সে তার সব আবদার মেটায়।
কায়রাভ ভাতের লোকমা এক এক করে কায়ানের মুখে ঢেলে দিয়ে বলল,
“আব্বা, চিতল মাছ খাও? এইটার স্বাদ কিন্তু অন্যরকম। কিন্তু তুমি তো মাছ খেতেই চাও না!”
কায়ান মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল,
“কাবো, ডাও। আল তুমিও কাও।”
কায়রাভ হেসে হেসে ভাত খাইয়ে দিতে থাকল। কায়রা খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ বলল,
“ভাইজান, তোমার ছেলে তো দেখছি একেবারেই পল্টিবাজ!”
কায়রাভ কৌতূহল ভরা চোখে জিজ্ঞেস করল,
“কেন কেন?”
কায়রা ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি খেলিয়ে বলল,
“ভাবী খাওয়াতে গেলে এক নালাও মুখে নিতে চায় না, জ্বালিয়ে মারে ভাবীকে। আর তোমার কাছে কত শান্তভাবে খায়!”
কায়রাভ কায়ানের দিকে তাকাল ভ্রু কুচকে। ছোট্ট কায়ান ফোকলা দাঁতের হাসি দিলো আর ছোট্ট দু-হাতে মুখ চেপে ধরলো,
“হিহিহি।”
কায়রাভ মাছ বেছে বেছে কায়ানের মুখে ভাতের সাথে খাইয়ে দিয়ে বলল,
“আব্বা, তুমি কি জানো, মাকে জ্বালাতে হয় না। মায়ের সব কথা শুনে চলতে হয়। এখন থেকে কি কায়ান মায়ের সব কথা শুনবে?”
কায়ানের চোখে ছোট্ট ঝিলিক, আর সে হেসেই আধো আধো বুলিতে বলল,
“সু’ন’বে।”
এই সব কায়েশী পাশ থেকে নীরবে দেখছিল, তবে মুখে নির্লিপ্ততা। খাওয়া শেষে কায়রা উঠে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিলে কায়রাভ ভারী নিরেট স্বরে বলল,
“কায়রা, আজকে আব্বাকে নিয়ে যা। আজকে তোর সঙ্গে ঘুমাবে।”
কায়রা সব বুঝে মুচকি হেসে কায়ানকে কোলে তুলতেই কায়ান তার ছোট্ট হাত দিয়ে মাথার দিকটা চুলকে দিয়ে বলে,
“না, আমি মার সাতেই ঘুমু দিবো। যাব না। ”
কায়রাভ এগিয়ে এসে কায়ানের গালে চুমু খেতে খেতে অসহায় হয়ে বলল,
“আব্বা, আপনি তো বিরোধীদলের চেয়ে বেশি যন্ত্র’ণা দেন আমাকে! একটু রহম করুন! “
কায়রা জোরে হেসে ফেলে ভাইয়ের অবস্থা বুঝে। কায়ানকে আরও কয়েকবার নিতে গেলেও ছেলেটা গাই ধরে বসে থাকে। যাবে না মানে যাবেই না। তাই কায়রা আর না পেরে ঘরের দরজার দিকে যেতে যেতে মৃদু মুচকি হেসে বলে,
“ভাবী, তুমি বরং কায়ানকে ঘুম পারিয়ে আমার কাছে দিয়ে যেও। দরজা খোলাই রেখেছি।”
কায়েশী কিছু বলে না। নিঃশব্দে কায়ানকে কোলে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। পেছনে সূক্ষ্ম আলো, আর বাইরে রাতের আঁধার। কায়েশী ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, পিঠে মৃদু চাপড় দিচ্ছে। মায়ের এমন স্পর্শে তার নিদ্রার ঘুম আরও গভীর হয়।নিমেষেই ছোট্ট কায়ান ঘুমের জগতে হারিয়ে যায়।
এরপর কায়েশী আস্তে আস্তে কায়ানকে কায়রার ঘরে রেখে আসে। এরপর চুপচাপ দরজা বন্ধ করে নিজের শোবার ঘরে ফিরে আসে। ঘরের রকিং চেয়ারটায় বসে দুলতে দুলতে সিগারেটের ধোঁয়া মুখে ভরে কায়রাভ একটু চোখ বন্ধ করেছিল। কায়েশীর নুপুরের ঝংকার শুনে তার উপস্থিতি টের পেল, ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির রেখা ফুটল। অতঃপর পেছনে না ঘুরেই বলল,
“দরজা লাগিয়ে এসো।”
কায়েশী এক মৃদু শ্বাস ফেলে বিনা কথায় দরজা লাগিয়ে এল। কায়রাভ এবার বলল,
“সামনে আসা হোক। ”
কায়েশী ধীরে ধীরে পুতুলের ন্যায় এগিয়ে এসে দাঁড়াল রকিং চেয়ারটির পাশে,অযথা চেচামেচি-ঝগড়াঝাটি করতে করতে সেও ক্লান্ত। এইসব ভাবনার মাঝে মুহূর্তের মধ্যেই কায়রাভ উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরল। ত্রস্ত বেগে হেঁটে কায়েশীকে নরম বিছানার গদিতে ছুঁড়ে ফেলল একপ্রকার। এমন দ্রুত ঘটলো ব্যাপারটা যা কায়েশীর বুঝতে সময় লেগেছে। ততক্ষণে অনুভুত হয় কায়রাভ তার ওপর ভর দিয়ে বলিষ্ঠ বুকে আলিঙ্গন করেছে। কায়েশীর দুই হাত অচেতনভাবে তার শক্ত হাতের বাধনে আটকা। কায়েশী আস্তে-ধীরে চোখ বন্ধ করে নিলো পরমুহূর্তে কি হবে তা ভেবে।
সময় পেরোয়, কিন্তু সব স্বাভাবিক থাকে। কিছুক্ষণ পর, কায়েশী চোখ খুলে দেখল কায়রাভ এখনও একইভাবে তার ওপর শুয়ে আছে আর তাকে দেখে চলেছে ওই ধুসর চোখজোড়া। তার চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি, যা বোঝা সম্ভব নয়। কায়েশী চেষ্টা করল তা পড়তে, কিন্তু যতই চেষ্ট করুক না কেন, সেই দৃষ্টির গভীর রহস্য সে বুঝতে পারবে না। এতকালই তো পারলো না।
কায়রাভ হালকা গলায় বলল,
“কি ভেবেছিলে? শরীর চাই?”
কায়েশী ব্যঙ্গের হাসি হেসে জবাব দিল,
“তা নয় নাকি? আর কি–ই বা প্রয়োজন আপনার?”
কায়রাভের কায়েশীর চোয়াল দু আঙ্গুলে মৃদুভাবে চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
“আমাদের সুন্দর সম্পর্কটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করো না, কায়েশী। আমি কখনো তোমাকে জোর করিনি, তুমিও ভালো করেই জানো। আর এত ঘৃণা? এতটাই? এই ঘৃণার পরিমাপ কতটুকু?”
কায়েশী মাথা কাত করে বলল,
“উহু! পরিমাপ করার কথা ভাবিনি। তবে অপরিসীম ঘৃণা, বিশ্বাস করুন।”
কায়রাভ ঘরের মৃদু আলোয় বউয়ের ভেজা চোখের পানে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটাকে তো ভালোই বেসেছে সে, তাহলে তার বদলে এত শাস্তি কেন পাচ্ছে! শুধু মাত্র ভালোবাসার পন্থা ভিন্ন ছিলো বলে? কায়রাভ কায়শীর কপালে চু’মু দিয়ে বলল,
“কিন্তু আফসোস, এমন ঘৃনাতেও তুমি পুরোটাই আমার। এমন ঘৃনাতেই তুমি আমার স্ত্রী, আমার সন্তানের মা। তাহলে চাইব, এই ঘৃণারও শেষ না হোক… কারণ এই ঘৃণাও তোমাকে আমার কাছেই বেঁধে রেখেছে। আমার চাওয়া একটাই, তুমি শুধু এবং শুধু আমার থাকো, ব্যাস!”
কথা শেষ হতেই তার হাতে বাঁধা কায়েশীর কব্জি আরও দৃঢ় হয়ে আসে। তারপর কায়রাভ ঝুঁকে কায়েশীর নাকফুল সই চু’মু দিল। ছোট্ট চিকন ডাঁটার সেই নাকফুল ফর্সা মুখের চৌকা নাকে পরা- সে যেন একখণ্ড উগ্র সৌন্দর্য। এই নাকের ডগায়ই সারাদিন হাঁটে নিজের রাগ নিয়ে, তেজ নিয়ে, অসম্ভব বিরক্তি নিয়ে। তবুও কায়রাভের ভালো লাগে, এইযে এই বাড়িতে টুকটুক করে লাল শাড়ি পরে বউটা হেঁটে বেড়ায়, তখন প্রতি মুহুর্তে কায়রাভ আপ্লুত হয়, বিমোহিত হয়। কায়েশী এইসব কাজে বিরক্ত তেতে উঠে বলল,
“আপনি কি একটুও অনুতপ্ত হন না? একটুও মনে হয় না আপনি ভুল? চার বছর ধরে সংসার করে মন পর্যন্ত পেলেন না আমার। তাও লজ্জা লাগে না?”
কায়রাভ নরম হেসে দিলো, বোঝাতে চাইল প্রশ্নটা তার হৃদয়ে তির ছুড়ে দিলেও ব্যথা লাগেনি। বলল,
“ভালোবাসা হওয়া উচিত এমনই। ভালোবাসলে এমন নির্লজ্জভাবে ভালোবাসতে হবে। এক্সপেকটেশন রাখা যাবে না, যেমন আমি রাখছি না। আর শোনো, মন একটা বেইমান জিনিস। এই মন দিয়ে আজ ঘৃনা করছো, কাল ভালোওবাসবে। তাই তোমার মন আমার লাগবে না। এই মন ছাড়া চার বছর যখন কাটিয়েছি, আরও চল্লিশ বছরও কাটিয়ে দেব, আল্লাহ চাইলে। ভালো না-হয় আমিই বাসলাম, তোমাকে বাসতে হবে না।”
কায়েশী চোখ বন্ধ করে মৃদু কাতর সুরে বলল,
“আপনি অসুস্থ, কায়রাভ! আপনাকে ঠিক লাগে না আমার!”
কায়রাভ মৃদু হেসে কায়েশীর ঘাড়ের উপর উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা, আমাদের গল্পের ইউনিক অংশটা কি জানো? একতরফা ভালোবাসা। যা নায়করা সাধারণত দূর থেকে বাসে। যেখানে চাওয়া থাকে, পাওয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু আমি যে নায়ক নই। আমার একতরফা ভালোবাসাকে ছিনিয়ে এনেছি, নিজের বউ করেছি। শুধুমাত্র নিজের সুখটাকে কৌশলে কাছে এনেছি, তাই এতে তোমার ঘৃনাও সই। তবে সত্যি বলতে এটা তো নিছক ভালোবাসা নয়, এটা আমার আমরণ আসক্তি বলতে পারও! যা কাটবে না কখনো। না কাটুক! “
কায়রাভ আলতো হেসে কায়েশীর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে আবার বলল,
“একদিন আমার থেকে ভালোবাসা পাওয়ার লোভ তোমার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটাবে, কায়েশী। আমাকে পাওয়ার তৃষ্ণায় তুমি ছটফট করবে। কথাটা মিলিয়ে নিও।”
তার কণ্ঠে ছিল ভালোবাসার এমন গভীর নিশ্চয়তা যা কায়েশীর এরুপ অস্বীকার, রাগ, অভিমান সবকিছু মিলিয়েও তাকে কায়রাভের থেকে আলাদা করতে পারবে না। কায়রাভের ভালোবাসা ছিল জেদী, দাবিদার। কিন্তু তার নিজের ভাষায় একতরফা হলেও সে পরিপূর্ণ। কায়েশীকে পেয়েছে সে, নিজের করেই ছেড়েছে। নিজের অংশকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে। আর কি চাই তার জীবনে! ভালোবাসা নাই বা পেলো, মানুষটা শুধু তার থাক।
চলমান…….
[ কেমন লাগছে পর্ব জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]