গল্প:অন্তঃদহন (Auth...
 
Notifications
Clear all

গল্প:অন্তঃদহন (Author: DRM Shohag)

Page 1 / 2

Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago

গল্প:অন্তঃদহন

Author:DRM Shohag

 

এখন থেকে এইখানে বাকি পর্ব গুলো পোস্ট করা হবে, 

আর যাদের বাকি পর্ব গুলো পড়া বাকি আছে তাদের জন্য নিচে লিংক দেওয়া হয়েছে। 

 

গল্পের :link

 

 

Loading spinner

Reply
5 Replies
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago

পর্ব:০৬

আকাশ তার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। রা'গ কমেনি এখনো। অরুণ আকাশের পিছু পিছু আকাশে ঘরে এসে দাঁড়ায়। মৃদুস্বরে বলে,

- সামান্য জুস পড়ায় মেয়েটার সাথে এভাবে কথা বললি কেন?

আকাশ রাগান্বিত স্বরে বলে,
- তো কিভাবে কথা বলব? ও আমাকে জুস দিতে আসবে কেন? বউয়ের দায়িত্ব পালন করতে আসবে কেন? বলেছি আমি?

অরুণ চুপ থাকলো। সে বুঝল, আকাশ মূলত জুস পড়ে যাওয়ায় এতো রে'গে যায়নি। একে তো অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে, সাথে বউ হিসেবে ট্রিট করতে আসায় আকাশের এতো রা'গ। মৃদুস্বরে বলে,
- মেয়েটির কি দোষ বল? 

আকাশ রে'গে অরুণের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে,

- একদম কোনো মেয়ের হয়ে সাফাই গাইবি না। তোর এতোগুলো গার্লফ্রেন্ড তো ভালোবাসি ভালোবাসি বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। কিন্তু আসল ঘটনা সব টাকা। টাকা উড়াতে পারিস তাই মেয়েদের লাইন। 

অরুণ বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। আকাশের এমন ধারণার পিছনে অরুণের কোথাও যেন নিজেকে দায়ী লাগলো। সে ভার্সিটি লাইফ থেকে এমন মেয়েদের সাথে মিশেছে। আসলে সে লাইফটাকে এভাবে চিল করতে চেয়েছে। কিন্তু আকাশের মনে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আকাশের উদ্দেশ্যে মৃদুস্বরে বলে,

- সব মেয়েরা একরকম হয় না আকাশ। এই মেয়েটা এমন না-ও হতে পারে।

আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
- এরা সব মেয়েরা-ই এক। এই মেয়েটা আমাকে বিয়ে করেছে এরকম-ই একটা কারণে। বা'লের ভালোবাসা। বা'লের বিয়ে, বা'লের বউ।

- মেয়েটি কথা বলতে পারে না। তুই কথাটা অনেক রূঢ়ভাবে বলেছিস। এভাবে বলা উচিৎ হয়নি তোর।

আকাশ রে'গে বলে,
- যা বলেছি ঠিক বলেছি। আমি ক্লিয়ার করে বলে দিয়েছি, সময়মতো ডিভোর্স দিয়ে দিব। এর অর্থ সে আমার বউ নয়। নয় মানে নয়। তাহলে কেন বউদের মতো রোল প্লে করবে? এসব আমি মানব? নেভার!

অরুণ কিছুক্ষণ পর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
- তুই শিওর, মেয়েটির কথা না বলতে পারা নিয়ে এভাবে বলা ঠিক হয়েছে তোর?

আকাশ অরুণের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। ঢোক গিলে মৃদুস্বরে বলে,
- রে'গে গিয়েছিলাম।
একটু থেমে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- ও এক্সিডেন্টলি আমার বউ, এটা ভুলে থাকলে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। মনে পড়লে মে'জা'জ খারাপ লাগে। 

এরপর আকাশ ওয়াশরুমে যেতে যেতে আবারও শক্ত গলায় বলে,
- মেয়েটি আর একবার আমার বউ এর রোল প্লে করতে আসলে ওর দু'গাল থা'প'ড়ে লাল করে দিব আমি, দেখিস।

অরুণ হেসে বলে,
- মেয়েটার চেয়ে তোর গাল লাল হজয়ার জন্য বেশি পার্ফেক্ট মনে হচ্ছে আমার।

আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে রে'গে বলে,
- আর তোর পা'ছা লাল হওয়ার জন্য আরও বেশি পার্ফেক্ট। 

অরুণ মুখটা একটুখানি করে বলে,
- তুই আমার ফর্সা পা'ছা দেখে নিলি? এসব আমার বউয়ের হক।

আকাশ বিরক্ত হলো। রে'গে বলে,
- আর একটা ফা'ল'তু কথা বলবি তো থা'প'ড়ে সোজা করব তোকে।

কথাটা বলে আকাশ ওয়াশরুমে চলে যায়। অরুণ অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,
- আজ আমার পা'ছা ফর্সা বলে!

প্রায় মিনিট দশ পর আকাশ শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। কাভার্ড থেকে অ্যাশ কালার এর একটি ব্লেজার বের করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। হাতঘড়ি হাতে পরতে পরতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মাথায় পানি ঢেলে মাথাটা মনে হয় ঠাণ্ডা হয়েছে। 
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নেমে আসমানী নওয়ান এর ঘরে যায়। ভদ্রমহিলা বিছানায় শুয়ে ছিল। আকাশ এগিয়ে গিয়ে মৃদুস্বরে ডাকে,
- মা?

আসমানী নওয়ান চোখ বুজে রেখে উত্তর দেয়,
- বলো।

আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
- কাজে যাচ্ছি। নিজের খেয়াল রেখো।

আসমানী নওয়ান চোখ মেলে বলে,
- আমার মনে হয়, তোমার ভদ্রতা, সভ্যতা সব হারায় গেছে। আমার খোঁজ নিয়া সেসবের কিছু প্রমাণ করার দরকার নাই।

আকাশ চুপ থাকলো। এরপর গম্ভীর গলায় বলে,
- মা হয়ে ছেলের মতমতের ইম্পর্ট্যান্ট না দিলে ছেলের ভদ্রতা, সভ্যতা হারানো দোষের কিছু না। আসছি। বাই।

কথাটা বলে আকাশ তার মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। 
সামনে তাকিয়ে দেখল টেবিলের এক কোণায় সন্ধ্যা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির সামনে অরুণ দাঁড়িয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে বলে,

- শোনো সুইটি! আমি বাইরে ঘুরতে যাচ্ছি, বুঝলে? তোমার জন্য অনেক কিছু আনবো বুঝেছ? তোমার কি পছন্দ বলে ফেলো তো আমাকে।

কিছু একটা ভেবে পকেট থেকে ফোন বের করে এগিয়ে দিয়ে বলে,
- এই যে টাইপ করে লেখ। তাহলে আমি বুঝব। 

সন্ধ্যা বিব্রতবোধ করে। মাথা নেড়ে জানায়, তার কিছু লাগবে না। অরুণ মন খারাপ করে বলে,
- ওকে ওকে। আমার পছন্দ-ই তোমার পছন্দ হবে। এবার হাসো তো সুইটি! 
ডান হাতের দু'আঙুল ইশারায় দেখিয়ে বলে,
- স্মাইল!

সন্ধ্যা না চাইতেও একটু হাসলো। অরুণকে দেখে সৌম্য ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। তার সৌম্য ভাইয়া অনেকটা এভাবেই কথা বলতো। তার সাথে খুনশুটি করতো। 
আকাশ সন্ধ্যার দিকে গম্ভীর চোখে চেয়েছিল। সন্ধ্যাকে হাসতে দেখে দৃষ্টিতে শীতলতা ভর করল। 

অরুণ আবারও বলে,
- হাসো সুইটি! আরেকটু হাসো!

আকাশ চরম বিরক্ত হয়। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এসে অরুণের হাত ধরে জোরে টান দেয়। অরুণ বেচারা বুঝতে না পারায় কয়েকপা পিছিয়ে যায় সাথে ঠাস করে পড়ে যায়। সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। 
আকাশ বা হাতে দাঁড়িতে হাত চালায়, সাথে শক্ত গলায় বলে,
- এই বাসায় কোনো তামাশা চলে না। দ্রুত রেডি হয়ে আয়। আমার লেট হচ্ছে।

অরুণ বহু ক'ষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
- আমি কোথায় যাব? তুই কক্সবাজার কাজে যাচ্ছিস যা। আমি যাব না। ইশ! কোমর টা গেল!

আকাশ শক্ত গলায় বলে,
- তোকে যেতে হবে।

অরুণ অসহায় কণ্ঠে বলে,
- কি জ্বালা! আমার পিছে পড়লি ক্যান? 

আকাশ বিরক্তি হয়ে বলে,
- রেডি হয়ে আয়। সময় দুই মিনিট।

অরুণ হতাশ। একটু পর ডান হাত আকাশের বুকে রেখে হেসে বলে,
- বাতাস বাবুটা আমাকে আজকাল একটু বেশিই ভালোবাসছে! আমাকে চোখে হারাচ্ছে। এক মিনিট....

আকাশ ঝাড়া মেরে অরুণের হাত সরিয়ে দিয়ে রে'গে বলে,
- দ্রুত যা।

অরুণ মন খারাপ করে আবার হাসে। কক্সবাজার বোরিং হবে না। ওখানে নিশ্চয়ই কিউট কিউট মেয়ে থাকবে৷ একটু ইনজয়-ও করা যাবে! 

আকাশ গম্ভীর চোখে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ দু'পা এগিয়ে আসলে সন্ধ্যা ঢোক গিলে। আকাশ মৃদুস্বরে বলে,
- এতো চোখের পানি আসে কোথা থেকে? 

সন্ধ্যা দু'হাতে দু'হাত কোচলায়। আকাশ গম্ভীর গলায় বলে,
- আমার থেকে দূরে থাকবে। তাহলে কাঁদতে হবে না। আমার আশেপাশে আসলে থা'প'ড়ে গাল লাল করব তোমার। 

লাস্ট কথাটা ধমকের সুরে বলে। সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আকাশ গটগট পায়ে গেইটের দিকে যায়। সন্ধ্যা ঝাপসা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। অরুণ আকাশের পিছু যেতে যেতে সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে বলে,
- বাই সুইটি!

আকাশ রে'গে তাকায় অরুণের দিকে। অরুণ সামনে ফিরে আকাশের দৃষ্টি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে,
- যাচ্ছি-ই তো। রা'গ'ছিস কেন?

আকাশ কিছু বলল না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল। অরুণ চোখ ছোট ছোট করে আকাশের দিকে তাকিয়ে সেও বেরিয়ে যায়। 

সন্ধ্যা মলিন মুখে আকাশের অদৃশ্য হওয়া দেখল। লোকটা তো তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। তারপর সে কোথায় যাবে? সৌম্য ভাইয়া তো আসেনা। যদি তার ডিভোর্সের পর-ও সৌম্য ভাইয়া না আসে, তবে সে কোথায় যাবে? কোথায় থাকবে? 
________________

আকাশ আর অরুণ কক্সবাজার পৌঁছেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। এখানে অরুণদের নিজস্ব একটা রিসোর্ট আছে। সেখানে আকাশ উঠেছে। অরুণ তার রুমে এসেই ঘুমে কাঁদা। আকাশ ফ্রেশ হয়ে কিছু কাজ কমপ্লিট করে মিটিং এর ব্যবস্থা করে। সময় মতো জায়গাটিতে পৌঁছাতে যথাসময়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 

আকাশ বিভিন্ন কোম্পানির মালিকদের সাথে সমুদ্রের পাড় থেকে কিছুটা দূরে একটি জায়গায় গোল হয়ে বসেছে। আকাশের বয়সের একজন আছে। বাকিরা সবাই বাবার বয়সী লোকজন। আর আছে তাদের দু'জন মেয়ে। একজন মেয়ে আকাশের পাশে বসেছে। যার নাম মিতু।
আকাশ কখনো গম্ভীর স্বরে কথা বলছে, সবাইকে বোঝাচ্ছে, আবার কখনো সকলের কথা শুনছে। মিতু মেয়েটি বার বার আকাশের হাতের উপর হাত রাখে। মেয়েটি আকাশকে চেনে। এর আগেও বহুবার দেখা হয়েছিল। তার বাবাদের সাথে মিটিং এর আয়োজন করলে সে সবসময় আসে আকাশের জন্য। আকাশের সাথে বেশ অনেক কথা বলে। যদিও আকাশ শুধু হু হা করে। তবুও তার ভালো লাগে। 

আকাশ কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যায়। কথা বলার মাঝে এ পর্যন্ত কম করে হলেও ৫০ বার এই মেয়ের হাত সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এটা ভালোভাবে কথা শোনার মেয়ে নয় বুঝল আকাশ৷ ডানদিকে ফিরে কিছুটা আওয়াজ করে শক্ত গলায় বলে,

- কোলে উঠবে? কোলে ওঠার ইচ্ছে হলে জানাও, আমি লোক ভাড়া করে দিচ্ছি। 

মিতু সহ সকলে থতমত খেয়ে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশ আবারও তার হাতের উপরে রাখা মেয়েটির হাত কিছুটা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। ঠাণ্ডা মে'জা'জ কেউ না কেউ গরম করবে। সবসময় আকাশের সাথে এমন করবে কেউ না কেউ। আকাশ চোখ বুজে নিজেকে সামলে আবার-ও কথা বলতে শুরু করে।
মিতু সকলের সামনে যেমন ল'জ্জা পায়, তেমনি ভীষণ মন খারাপ হয় আকাশের এরকম ব্যবহারে। 

অরুণ ঘুম থেকে উঠে আকাশকে খুঁজতে খুঁজতে সমুদ্রের এদিকে এসেছে। আকাশের বলা কথাটা শুনতে পেয়েছে সে। এগিয়ে এসে আকাশের পাশে দাঁড়ায়। ততক্ষণে আকাশদের আলোচনার পর্ব শেষ হয়। সবাই একে একে উঠে যায়। মিতুর বাবা তার মেয়েকে ডাকলে সে বলে, - একটু পর যাবে।

আকাশ চেয়ারে হেলান দিয়ে দু'হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে চোখ বুজে রেখেছে। অরুণ মিতুর পাশে চেয়ার টেনে বেস বলে,
- হাই সুইটি!

মিতু ভ্রু কুঁচকে তাকায় অরুণের দিকে। অরুণ হেসে বলে,
- তুমি কোলে উঠতে চাও? জানো আমার বডিতে অনেক শক্তি! এসো তোমাকে কোলে নিই। 

মিতু অবাক হয়, এমন বিদেশি ছেলের মুখ একদম শুদ্ধ বাংলা ভাষা শুনে। অরুণ আকাশের দিলে তাকিয়ে বলে,
- কিরে বাতাস বাবু, তোর গার্লফ্রেন্ড কে কোলে নিলে তোর কোথাও জ্বলবে না তো?

আকাশ চোখ খুলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- ও আমার কেউ না। তবে তুই চাইলে ওকে কোলে নিতে পারিস। মিস মিতুর ইচ্ছে পূরণ হবে।

কথাটা বলে সমুদ্রের পাড়ের দিকে যায় আকাশ। অরুণ হেসে বলে,
- এসো সুইটি! বসো। এতো সুন্দর সুইটিকে কোলে নিলে আমি ধন্য হয়ে যাবো!

মিতু দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। রে'গে বলে,
- বে'য়া'দ'ব!

অরুণ হেসে বলে,
- সে ঠু ইউ সুইটি!

মিতু ধুপধাপ পা ফেলে তার বাবার দিকে যায়। অরুণ গা টানা দিল। ভালোই লাগে মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করতে।
____________________

দেখতে দেখতে প্রায় পাঁচদিন পেরিয়েছে। সৌম্য কার্জন হলের সামনে মাঠে বসে আছে। দৃষ্টি আকাশপানে। গত পাঁচদিন আগে তার কাছে সন্ধ্যার একটি ভিডিও এসেছিল, এরপর প্রতিনিয়ত সন্ধ্যার ছোট্ট কোনো ভিডিও অথবা কোনো পিক প্রতিদিন আসে। সৌম্যকল করলে ফোন বন্ধ পায়। কে এমন করছে তার সাথে? কখনো সন্ধ্যার কান্নামাখা মুখ দেখেছে, নয়তো কখনো সন্ধ্যার মলিন মুখ দেখেছে। সৌম্য'র অস্থির লাগে। কোথায় আছে তার বোন? কেন তাকে খোঁজ দিচ্ছে না? 

গত সাতদিন আগে যে ইরাকে রেখে আসলো। এরপর আর ইরার হদিস পেল না সৌম্য। কোথায় হারিয়ে গেল ইরা? হারিয়ে গেল প্রশ্নটা আসলো কারণ সৌম্য ইরাকে খুঁজেছে। ইরার ফোনে অসংখ্যবার কল করেছে, কিন্তু একবারের জন্য-ও ইরার ফোন অন পায়নি। পরিচিত সবার কাছে খোঁজ নিয়েছে। কেউ বলতে পারেনা ইরার কথা। ইরা-ও হারিয়ে গেল? 

সৌম্য লম্বা শ্বাস টানে। তার জীবনটা অদ্ভুদ! যেন কেউ কোথাও নেই। এতো ছন্নছাড়া জীবন কারো হয়? কার্জন হলের সামনের এই জায়গাটা একসময় ইরা আর সৌম্য'র খুব পছন্দের জায়গা ছিল। এখন কি পছন্দের জায়গা নেই? আছে তো! আগে হাসিখুশির জন্য জায়গাটা পছন্দের ছিল, আর এখন দুঃখবিলাস করতে জায়গাটি পছন্দের তালিকায়। 

সৌম্য'র মনে পড়ে সেই পুরনো দিনগুলোর কথা। যখন তারা এইখানে দু'জন বসে কত হাসাহাসি করেছে, ইরা হাসতে হাসতে সৌম্য'র গায়ের উপর ঢলে পড়ড। সৌম্য ধমক দিতো এভাবে গায়ে ঢলে পড়ায়। ইরা সৌম্য'র ধমক খেয়ে আরও বিতরামি করত। আরও সৌম্য'র গা ঘেঁষে বসত। মেকি রা'গ দেখিয়ে বল, - আমি তোর কোলে উঠে বসে থাকব, কি করবি রে তুই?

সৌম্য নিরবে চঞ্চল ইরাকে দেখত৷ আর কিছু বলতো না। যেদিন থেকে ইরার মন পড়তে শুরু করল, সেদিন থেকে সৌম্য হাসতে ভুলে গেল। কারণ ইরা যে আর হাসতো না। সৌম্য'র অবহেলায় ইরার হাসি বিলীন হতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ইরা হাসতে ভুলে গেল। এরপর কথায় কথায় চোখের কোণ ভিজত। ইরা কত যত্নে তা লুকিয়ে-ও নিত। কিন্তু সৌম্য'র চোখ ফাঁকি দেয়া বুঝি এতো সহজ? সৌম্য'র চোখ যে ইরার থেকে সরতো না। ইরা সে খবর রাখেনি। সৌম্য নিরব হয়ে গেল। ইরাকে শুধু দেখত, প্রয়োজন পড়লে ইগনোর করত। ইরার মনে অভিমানের পাহাড় জমতো, আর সৌম্য বুক ব্য'থা নিয়ে কি নির্মল চোখে অভিমানী ইরাকে দেখে যেত। অভিমান গলে ইরার চোখ বেয়ে পানি গড়ালে, তখন-ও সৌম্য ইরাকে শুধু দেখে যেত। এই সমাজে সৌম্য'দের কখনো প্রিয় মানুষের চোখের জল মুছে দেয়ার অধিকার নেই।

কথাগুলো ভেবে সৌম্য মলিন হাসলো। ইরা তো কখনো তার সাথে এভাবে যোগাযোগ অফ করে রাখেনি। মেয়েটি তো এমনটা পারেনা। সে চেনে ইরাকে। তবে কি হলো ইরার? 
সৌম্য'র কোথাও গিয়ে মন টিকে না। সবকিছু এতো অশান্তি লাগে। 

ভাবনার ইতি ঘটালো সৌম্য। সকালে একটা পাউরুটি কিনে খেয়েছিল। এখন বিকাল পেরিয়ে যাচ্ছে। পেটে ক্ষুধা। দোকান থেকে রুটি-কলা কিনে খেতে চাইলো। খেতে ইচ্ছে করল না। দুঃখ দিয়েই পেট ভরা লাগে। পিছিয়ে এসে উল্টো পথে টিউশনের দিকে এগলো। রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটে। আশেপাশে অনেক মানুষ। কিন্তু তার মনে হয়, সে একা। ভীষণ একা। 
.
.
.
রাত তখন ৮ টার কাছাকাছি। আকাশ সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু'পায়ের প্যান্ট হাঁটুর নিচ পর্যন্ত গুটিয়ে গিরার উপর পর্যন্ত পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নীল শার্ট, দু'হাতের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। হাত দু'টো প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। দৃষ্টি দূর অজানায়। মুখাবয়ব গম্ভীর। চোখেমুখে বিরক্তি। তবে কারণ জানা নেই। 

অরুণ আকাশের থেকে আরও খানিক সামনে গিয়েছে। তার হাতে ক্যামেরা। যদিও অন্ধকার, তবে চাঁদের মিটিমিটি আলোয় যা পিক উঠছে সেটাই তুলছে। 

আকাশের থেকে কিছুটা ডানদিকে, একটু সামনে সকাল আর তার এক বান্ধবী দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল দুই বান্ধবী মিলে কক্সবাজার ঘুরতে এসেছে। 
সকালের নজর আকাশের দিকে। সকালের বান্ধবী নীরা সকালকে একদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে,
- ওদিকে কি দেখিস?

সকাল আকাশের দিকে চেয়ে-ই বলে,
- ছেলেটা অনেক সুন্দর না?

নীরা চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। আকাশ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আকাশকে মোটামুটি ভালোই দেখা যাচ্ছে। সকাল নীরাকে রেখে এগিয়ে যায় আকাশের দিকে। নীরা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
- ওদিকে কই যাস?

সকাল পাত্তা দিল না। নীরা আর কিছু না বলে সামনের দিকে এগোতে থাকে।
সকাল মৃদু হাসছে। গায়ে ওড়না নেই মেয়েটার। পরনে একটা টপস্ আর জিন্স। এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ-ই একদম আকাশের সামনে ঠাস করে পড়ে যায়। 
আকাশের দৃষ্টি সামনের দিকে ছিল। হঠাৎ কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়ে তার সামনে পড়ে যাওয়া সকালের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। 

সকাল মৃদু আর্তনাদ করে। ব্য'থাতুর আওয়াজে বলতে থাকে,
- ইশ! ওমাগো! কোমর টা গেল গো!

আকাশ যেভাবে ছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। মুখাবয়ব গম্ভীর, দৃষ্টি সকালের দিকে, তবে চোখেমুখে বিরক্তি। 
সকাল আকাশের দিকে চেয়ে আছে। সে মূলত ইচ্ছে করে পড়েছে, যাতে আকাশ এগিয়ে এসে তাকে হেল্প করে। কিন্তু লোকটি একদম রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে। 

নীরা হঠাৎ-ই খেয়াল করে সকাল পড়ে গিয়েছে। দেখতে পেয়েই মেয়েটি দ্রুত সকালের দিকে এগিয়ে এসে বলে,
- কিভাবে পড়লি?

সকালে দৃষ্টি সামনের দিকে দেখে নীরা-ও মাথা তুলে তাকায়। সামনে তাকিয়ে দৃষ্টিতে বিস্ময় ভর করে।  আকাশ দু'টো মেয়ের এমন উদ্ভট দৃষ্টি দেখে বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ায়, - রা'বি'শ!

কথাটা বলে উল্টো ঘুরে চলে যায়। সকাল মন খারাপ করে বলে,
- লোকটার কি অ্যাটিটিউট! সেই লাগছে। আমি এই লোকটাকে পটিয়েই ছাড়বো।

নীরা বিস্ময় চোখে চেয়ে বিড়বিড় করে,
- সন্ধ্যার বর, আকাশ নওয়ান!
_____________________

আরও একদিন পেরিয়েছে। সৌম্য টিউশনে যাওয়ার জন্য মেস থেকে বেরিয়েছে। রাস্তার ধার দিয়ে ধীরপায়ে হাঁটছে। পায়ে একজোড়া চামড়ার জুতো। ইরা কিনে দিয়েছিল বছরখানেক আগে। বেশ কয়েকজায়গায় ফুটো হয়ে গিয়েছে। সৌম্য মলিন হাসলো। ইরা টা হারিয়ে গেল। সৌম্য'র কাছে ইরার মায়ের নাম্বার ছিল। ছেলেটা নিজের ছটফটানি কমাতে গতকাল ইরার মায়ের নাম্বারে কল দিয়েছিল। ভদ্রমহিলা সৌম্য'র সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলতো। যদিও সৌম্য অনেকমাস হলো কথা বলেনি। তবে গতকাল কল দেয়ায় ভদ্রমহিলার কণ্ঠ এতো রূঢ় ছিল, সৌম্য'র নিজেকে ভীষণ ছোট লেগেছে। কিন্তু তবুও কল কাটেনি। অনেকবার ইরার কথা জিজ্ঞেস করেছে। এরপর তিনি জানিয়েছেন, ইরা তার জীবন নিয়ে সুখী আছে। সৌম্য যেন আর ইরার খোঁজ না করে।

কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মন প্রশ্ন করে,
- ইরাবতী তুই সত্যিই ভালো আছিস তো? 
উত্তর আসে না। সৌম্য হাঁটতে হাঁটতে মেইন শহরে চলে এসেছে। হঠাৎ-ই মাথা তুলে সামনে তাকালে সৌম্য'র পা থেমে যায়। একটি কালো গাড়ি থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়েছে ইরা। সৌম্য ইরাকে দেখেই দ্রুত পায়ে দু'পা এগোয়, সাথে শব্দ করে ডাকতে নেয়, ই....রা প্রথম অক্ষরটি জোরে বললেও পরের অক্ষরটি একদম আস্তে উচ্চারণ করে। সৌম্য'র পা থেমে যায়। 

ইরার পাশে এসে একজন ছেলে দাঁড়িয়েছে, বয়স ২৯-৩০ বছর হবে হয়তো। ইরা লোকটির সাথে হাঁটতে হাঁটতে সামনের শপিং মলের ভেতর গেল। সৌম্য'র বুক চিনচিন করে উঠল। যেভাবে দাঁড়িয়েছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। পাঁচ মিনিট যেতেই ইরা আর লোকটি ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। লোকটি গাড়ির দরজা খুলে দিলে ইরা ভেতরে উঠে বসে। এরপর লোকটি অপরপাশে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। সৌম্য চুপচাপ তাকিয়ে রইল। গাড়ি ছেড়ে দেয়, গাড়ি সামনের দিকে এগোয়, সাথে সৌম্য'র বুক ব্য'থা বাড়ে। মলিন হেসে বিড়বিড় করে,

- এতো তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলি ইরাবতী? আরেকটু সময় নিয়ে ভুলতি নাহয়, বারণ করতাম না।

কথাটা বলে ঢোক গিলল। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দ্বারা ডান চোখ থেকে একফোঁটা নোনা পানি ছিটকে ফেলে। লম্বা শ্বাস টানে। পায়ের গতি বাড়ায়। টিউশন যেতে হবে। দুনিয়ার আনন্দ তো তার জন্য নয়, তার জন্য যত্ন করে দুঃখ-টুকুই জমা রেখেছে আল্লাহ। মেয়েদের মতো কাঁদলে হবে? বরং প্রতিনিয়ত দুঃখ কে বরণ করতে হবে।
__________________

তখন বিকাল,
সন্ধ্যা বেলকনিতে বসে অনেকক্ষণ একা একা বসে কেঁদেছে। ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। কতদিন হয়ে গেল তার ভাইকে দেখেনা। কেঁদেকেটে ঘরে এসে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানি দিয়ে আসে, যদিও চোখমুখ লাল হয়ে আছে। তবে মুখে পানি দিয়ে আগের চেয়ে ভালো লাগছে। 

আকাশ রিসোর্টের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে।  কিছু একটা ভেবে তাদের বাড়ির একটি রুমের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে। স্ক্রিনে সন্ধ্যা ভেসে উঠল। আকাশ নিরব চোখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। 

সন্ধ্যা বিছানায় বসে একটি খাতায় কিছু লিখছে। এই ঘরের টেবিলের উপর খাতা কলম রাখা ছিল। সন্ধ্যা সোখান থেকে একটি খাতা কলম নিয়েছে। খাতার দু'টো পৃষ্ঠায় কিছু লিখে পৃষ্ঠা দু'টো খাতা থেকে ছিঁড়ে তার হাতে নেয়। এরপর বিছানা থেকে নেমে 
আঠা দিয়ে কাগজ দু'টো দেয়ালে বসায়। 

আকাশ অবাক হয়। মেয়েটি কি করছে এসব? দেয়ালে লাগনো কাগজ দু'টিতে চোখ বুলালে আকাশের চোখে পড়ে দু'টো বাক্য। যার একটি কাগজে লেখা আছে,
- তোমাকে খুব মনে পড়ে ভাইয়া।

অপর কাগজে লেখা - 
- তোমাকে অনেক ভালোবাসি ভাইয়া।

আকাশ বাক্য দু'টো পড়ে ভীষণ অবাক হয়। আরেকটি ব্যাপারে অবাক হয়, সন্ধ্যার হাতের লেখা চোখে পড়ার মতো সুন্দর। একদম টাইপ করে লেখার মতো।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখল, সন্ধ্যা লাগজ দু'টির উপর ডান হাতের আঙুলগুলো বুলায় আর মৃদু হাসে।

এরপর কিছু একটা ভেবে সন্ধ্যা দেয়াল থেকে পিছিয়ে এসে ঘরের মাঝখানে দাঁড়ায়। 
সন্ধ্যা এখানে আসার পর থেকে সবসময় শাড়ি পরতো। তবে আজ আসমানী নওয়ান তাকে একটি থ্রি-পিস পরতে দিয়েছে। শাড়ি পরার অভ্যাস নেই সন্ধ্যার। খুব অসুবিধা হতো। তবুও আসমানী নওয়ান এর কথায় অসম্মতি করেনি। ক'ষ্ট করে শাড়ি-ই সামলেছে। আজ থ্রি-পিস পরে সন্ধ্যার আরাম লাগছে। 
সন্ধ্যা তার শরীর থেকে ওড়না খুলে রেখে দিল। আকাশ দৃষ্টি সরিয়ে নেয় সাথে সাথে। ল্যাপটপ বন্ধ করার জন্য ডান হাত ল্যাপটপে রেখেও আর বন্ধ করল না। ভেতর থেকে কেউ বলে ওঠে,

- মেয়েটি তোর বউ। এতো ফর্মালিটির কি আছে?
আবার কেউ বলে,
- কিন্তু তুই তো তোর বউকে ডিভোর্স দিয়ে দিবি। ডিভোর্স পেপার রেডি হচ্ছে।

আকাশ তার মনের ভেতরের এসব চিন্তায় বিরক্ত হয়। সে নিজেকে বোঝায়, আপাতত যেহেতু মেয়েটি তার বউ, সে দেখতেই পারে মেয়েটিকে। ভাবনা রেখে ল্যাপটপে দৃষ্টি দিলে আকাশের চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে। 

সন্ধ্যা নাচছে। নাহ কোনো গান নেই। তবে এমনি-ই মেয়েটি খুব সুন্দর করে নাচছে। হঠাৎ-ই নাচতে নাচতেই ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে। হাসতেই থাকে। 

আকাশ বিস্ময় চোখে সন্ধ্যাকে দেখছে। সন্ধ্যার মুখপানে একধ্যানে চেয়ে আছে। গালে সৃষ্ট নিখুঁত টোলে আকাশের দৃষ্টি থেমে যায়। 

সন্ধ্যা শব্দবিহীন মন খুলে হাসে। তার মনে আছে, সে সৌম্য'র সামনে এভাবে নাচতো। এই অভ্যাস সন্ধ্যার ছোট্টবেলা থেকে ছিল। তাই কখনো ল'জ্জা পায়নি ভাইয়ের সামনে। সৌম্য সন্ধ্যাকে বাহবা দিত। বলতো-

- বোনু তুই তো সেরা! 

এরপর দুষ্টুমি করে বলত,
- কিন্তু এরকম বগের ঠ্যাং এর মতো নাচ দেখে আমার একটু একটু বমি পায় আর কি! এটাই!

সন্ধ্যা ভাইয়ের দুষ্টুমি ধরতে পেরে তার নাচ থামিয়ে ভাইয়ের বাহুতে কিল দিত। মেকি রা'গ দেখাতো। কিন্তু আজ সন্ধ্যা হাসছে। দু'চোখের পাতা বেয়ে নোনাজল গড়িয়েছে, সে খবর সন্ধ্যার কাছে নেই। 

আকাশের চোখেমুখে আগের চেয়ে-ও বিস্ময়। মেয়েটি নাচছে, হাসছে, একই সাথে কাঁদছে। আকাশ চুপচাপ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে রইল। একটু পর বিড়বিড়িয়ে বলে,

- আই লাই ইওর অ্যাকটিভিটিস। বাট, আই হেইট অল গার্লস্। 
একটু থেমে আবারও বলে,
- তুমি খুব তাড়াতাড়ি আমার থেকে ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে।

ডিভোর্সের কথাটা বলতেই আকাশের প্রচন্ড পরিমাণে রা'গ হয়। সে বুঝলো না সে কেন রা'গ'লো। তবে রে'গে'মে'গে কোলের উপর রাখা ল্যাপটপ গায়ের জোরে ছুঁড়ে মারে। ল্যাপটপ দু'টো পুরো দু'ভাগ হয়ে যায়। আকাশ চেয়ারে হেলান দিয়ে ডান হাতে মাথার চুল টেনে ধরে। 

ওপাশে সন্ধ্যার পায়ের গতি কমে যায়। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার পা থেমে যায়। বিছানার কোণায় বসে পড়ে সন্ধ্যা। দু'হাতের উপর চিবুক রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে। দু'টো শব্দে মন কেঁদে উঠল,
- সৌম্য ভাইয়া?

চলবে ইনশাআল্লাহ ~~

🟥[শব্দসংখ্যা- ৩০০০।
গল্পে বেশ কিছু টুইস্ট আছে। ধৈর্য ধরে পড়ুন।
সকলে রেসপন্স করবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন।]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago
পর্ব:০৭

আকাশ তখন মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। তার বাবার এক ব্যবসায়ী কলিগ এর মেয়ে আকাশকে পছন্দ করতো। মেয়েটি আকাশকে প্রপোজ করেছিল। একটু ইউনিক ওয়েতে। একটি ছোট্ট চিরকুট লিখে তার অনুভূতি প্রকাশ করেছিল। আকাশ এর ভাবমূর্তি ছিল স্বাভাবিক। মেয়েটি আকাশকে চুপ থাকতে দেখে সামনাসামনি জিজ্ঞেস করে উত্তর চায়। আকাশ খুব স্বাভাবিক ভাবে জানিয়েছিল, আমার তোমাকে ভালো লাগে না। 
আকাশ ভেবেছিল, মেয়েটি ভুলে গিয়েছে তাকে। কিন্তু না। মেয়েটি সবসময় আকাশের আশেপাশে থাকতো। বিভিন্ন ভাবে তার ভালোবাসা প্রকাশ করত। আকাশ মাঝে মাঝে প্রচন্ড বিরক্ত হতো। কিন্তু মেয়েটির কাজকর্মে সে অবাক না হয়ে পারতো না। আকাশের মনে হতো, মেয়েটি হয়তো তাকে সত্যি-ই ভালোবাসে। কিন্তু তার মেয়েটির প্রতি তেমন কোনো ফিলিংস-ই আসেনি। মেয়েটি আকাশের থেকে এতো নিরবতা পেয়ে-ও কখনো পিছপা হয়নি। এভাবে প্রায় একবছর পেরিয়ে যায়। আকাশের মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যায়। সে বিদেশ যাওয়ার জন্য সবকিছু রেডি করে। তার ফ্লাইটের দু'দিন আগে ব্যবসার কাজে একজায়গায় সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গিয়ে তার পিছে ঘুরঘুর করা মেয়েটির সাথে একটি ছেলের কথপোকথন শুনতে পায়, সাথে ছেলেটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত। 
মেয়েটি মূলত আকাশে বাবার, আকাশের এতো টাকা দেখে এই নাটক গুলো করতো। 

আকাশ সেদিন এতো রে'গে গিয়েছিল! মেয়েটির প্রতি তার অনুভূতি নেই ঠিক আছে, কিন্তু মেয়েটি এতো পা'গ'লা'মি করে তাকে বিরক্ত করতো এর মাসুল দিবে না? আকাশ কারণ ছাড়া কাওকে কিছু বলতো না। যেমন সে কখনো মেয়েটির অনুভূতির জন্য তাকে ছোট করেনি, তার অনুভূতির ঘর শূণ্য হলেও। কিন্তু সেদিন আকাশ মেয়েটির সামনে গিয়ে কোনো কথা ছাড়াই ক'ষি'য়ে দু'টো থা'প্প'ড় মা'রে। 

এখানেই শেষ নয়। আকাশের একটি মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল, যে আকাশকে ভালোবাসি বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিল৷ আর তার তো টাকার জন্য পরবর্তীতে পুরো লিংক ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া বন্ধু হিসেবে অরুণ আছেই। প্রতিটি মেয়ে এতো লোভী টাইপ! মেয়েদের উপর থেকে আকাশের মন একদম উঠে গিয়েছে। 

পুরনো কথা ভেবে আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেঝেতে দ্বিখণ্ডিত হওয়া ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে নিজের উপর বিরক্ত হলো। এখন তাকে সব গুছানো কাজ আবার করতে হবে। হঠাৎ হঠাৎ রা'গের কারণে নিজেকেই দু'টো থা'প্প'ড় দিতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু রা'গ'লো কেন? মেয়েটিকে ডিভোর্স দিবে ভাবতেই রা'গ হলো। কারণ জানে না। নিজের উপর চরম বিরক্ত সে। 
.
.
.
দু'দিন পেরিয়েছে। 
সন্ধ্যার পর পর, সন্ধ্যা আসমানী নওয়ান এর পাশে বসে আছে। আসমানী নওয়ান কাঁথা সেলাই করছে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে ঝাঁকিয়ে হাত নেড়ে বোঝায়, - সে সেলাই করতে চায়।

আসমানী নওয়ান অবাক হয়ে বলে,
- তুই পারিস?
সন্ধ্যা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দেয়। ভদ্রমহিলা সন্ধ্যার হাতে কাঁথা, সুই দিলে সন্ধ্যা খুশি হয়ে আসমানী নওয়ানকে জড়িয়ে ধরে। মৃদু হেসে হাত দিয়ে ইশারায় বোঝায়,
- তুমি অনেক ভালো। 

আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার থুতনিতে হাত রেখে বলে,
- আমার জান্নাত এর চেয়ে ভালো কেউ নাই, বুঝলি?

সন্ধ্যা ইশারা করে,
- তুমি আমাকে জান্নাত ডাকো কেন?

ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বলে,
- কারণ তোর মুখ দেখলে আমি মেলা শান্তি পাই মা। জান্নাতে যেমন অনেক সুখ-শান্তি। তেমন তোর দিকে তাকাইলে আমি এমন শান্তি পাই। কারণ শুনবি?

সন্ধ্যা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। সে শুনতে চায়। আসমানী নওয়ান কিছু বলতে গিয়েও চুপ হয়ে যায়। সন্ধ্যার মুখে চুমু খেয়ে বলে,
- কোনো একদিন শুনবি। এখন তোর কাজ কর মা।

আসমানী নওয়ান এর চোখের কোণে পানি। সন্ধ্যার চোখে যা ধরা দেয়। মেয়েটি আসমানী নওয়ান কে ঝাঁকিয়ে বোঝায়, - তোমার চোখে পানি কেন?

আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। সন্ধ্যা মলিন মুখে চেয়ে থাকে। আসমানী নওয়ান কাঁদলে তার ভালো লাগে না। আপাতত এই একটা মানুষ-ই তার একমাত্র আপন। আসামনী নওয়ান নিজেকে সামলে সন্ধ্যাকে ছেড়ে মৃদুস্বরে বলেন,
- নে এই কাজ শুরু কর। দেখি তো কেমন পারিস।

সন্ধ্যা ইশারায় বোঝায়, - আর কাঁদবে না তো?

আসমানী নওয়ান হেসে ফেলল। দেখ কেমন মেয়ের মতো কথা বলে। অবশ্য এটা তো তোর মেয়ে-ই। মাথা নেড়ে বলে,
- আমার জান্নাতের কথা অমান্য করি কি কইরা!

সন্ধ্যা হাসলো। 
বেল বেজে উঠলে আসমানী নওয়ান ঘর থোকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যা সেলাইয়ে মনোযোগ দেয়।

আসমানী নওয়ান এর ছোট বোন, আর তার মেয়ে শিমু তাদের বাড়িতে এসেছে। আসমানী নওয়ান এতোদিন পর বোনকে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়। জড়িয়ে ধরে বোনকে। এরপর কথা বলায় ব্যস্ত হয়। শিমু তার খালাকে জিজ্ঞেস করে,
- খালামণি সন্ধ্যা ভাবি কোথায়?

আসমানী নওয়ান তার ঘর দেখিয়ে দিলে চঞ্চল শিমু দৌড় দেয় তার খালার ঘরের দিকে। বিছানার উপর একটি মেয়েকে খুব মনোযোগ দিয়ে সুতার কাজ করতে দেখে শিমু এগিয়ে এসে বলে,
- তুমি-ই আকাশ ভাইয়ার বউ সন্ধ্যা ভাবি?

মেয়ে কণ্ঠে সন্ধ্যা মাথা উঁচু করে অপরিচিত এক মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। শিমু এগিয়ে এসে বলে,
- তুমি-ই আমার ভাবি তাই না?

সন্ধ্যা বোকাচোখে চেয়ে ইশারায় বোঝায়,
- হুম।

শিমু এগিয়ে এসে সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে হাসে। এরপর সন্ধ্যার সামনে সোজা হয়ে বলে,
- আমি আকাশ ভাইয়ার খালাতো বোন বুঝেছ? 

সন্ধ্যা ইশারায় বলে,
- কেমন আছো?

শিমুর বুঝতে একটু প্রবলেম৷ হয়। তবে বুঝতে পেরে উত্তর দেয়, সাথে সন্ধ্যাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলে সন্ধ্যা মাথা নেড়ে জানায় সে-ও ভালো আছে। শিমু গালে হাত দিয়ে বলে,
- ভাবি তুমি খুব সুন্দর করে হাসো। আমি তো ক্রাশ খাচ্ছি। ওয়াহ! 

শিমুর কথা শুনে সন্ধ্যা হেসে ফেলে। ইশারায় বোঝায়,  - তুমি দেখতেও সুন্দর, তোমার হাসি-ও সুন্দর। 

শিমু হেসে তার কোলে রাখা ব্যাগের ভিতর থেকে সন্ধ্যার জন্য আনা সবকিছু বের করল। প্রথমে সন্ধ্যার দিকে পুরো পাঁচটি শাড়ি এগিয়ে দিল। যার মধ্যে দু'টো জামদানি, একটি সুতি আর দু'টি কাতান।  এগুলো তার মা এনেছে। শিমু তার ভাবির জন্য আলাদা করে এনেছে,, হাতের চুড়ি, মেচিং করে কিছু জুয়েলারি, মেকাপের একটি সেট, সবশেষে বের করে দু'টি আলতা। 
সন্ধ্যা চুপচাপ শিমুর কাজ দেখছিল। আলতা দেখেই মেয়েটির মন ভীষণ পুলকিত হয়। একটি আলতা সন্ধ্যা হাতে নিয়ে শিমুকে ইশারায় বোঝায়,

- আপু একটি আলতা আমাকে দিবে?

সন্ধ্যার কথা বুঝতে পেরে শিমু শব্দ করে হেসে ফেলে। অতঃপর বলে,
- বোকা ভাবি, এসবকিছু তোমার জন্য-ই এনেছি। আলতা আমার ভালো লাগে, তাই তোমার জন্য ভ'য়ে  ভ'য়ে এনেছি। সবাই এসব পছন্দ করেনা। ভেবেছি তোমার ভালো লাগবে কি-না।

সন্ধ্যা হাত নেড়ে বোঝায়,
- আলতা তার ভীষণ মানে ভীষণ পছন্দ। 

শিমু হেসে সন্ধ্যার জন্য আনা সবকিছু সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
- এগুলো তোমার খালা শ্বাশুড়ি আর তোমার ননদিনীর থেকে গিফট বুঝেছ? ফর্মালিটির জন্য ফিরিয়ে দিতে বলার আগেই বলে দিচ্ছি, গিফট ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলা ঘোর অন্যায়।

সন্ধ্যা সত্যি-ই ভেবেছিল কিছু বলবে, তার আগেই শিমুর এহেন কথায় সন্ধ্যা হেসে ফেলে। 
শিমুর মা ঘরে আসে। সন্ধ্যা শিমুর মা বুঝতে পেরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। ভদ্রমহিলা ঝাপসা চোখে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার গালে হাত দিয়ে বলে,
- কেমন আছিস মা?

সন্ধ্যা অবাক হয়ে তাকায়। যেন ইনি তার কত আপন। কিন্তু সন্ধ্যা তো এনাকে চেনে না। আজকেই প্রথম দেখল। অবাকের রেশ কাটিয়ে সন্ধ্যা মাথা নেড়ে জানায়, - সে ভালো আছে। উনি কেমন আছেন? 
শিমুর মা মৃদু হেসে বলে,
- তোকে দেখে অর্ধেক ভালো হয়ে গেলাম। অসুস্থতার জন্য আসতে পারছিমা না সুস্থ হয়েই ছুটে এসেছি।

সন্ধ্যা কি বলবে বুঝতে পারে না। মেয়েটি চিন্তিত বদনে চেয়ে আছে। এরকম ব্যবহার কাছের মানুষেরা ছাড়া আর কেউ করে? শিমুর মা সন্ধ্যার মুখে তিনটে চুমু এঁকে দেয়। শিমু নিজেও অবাক হয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যাকে দেখে তার মায়ের এমন রিয়েকশন তাকে কনফিউজড করে দিচ্ছে। আবার ভাবলো সন্ধ্যা কথা বলতে পারেনা, এইজন্য হয়তো তার মা বেশি আবেগি হয়ে গিয়েছে। 
শিমুর মা নিজেকে সামলে বলে,

- তোকে নিজ হাতে অনেক কিছু রেঁধে খাওয়াবো। একসাথে খাবো। অনেকদিন থাকবো এইখানে। বুঝেছিস তো?

সন্ধ্যা বিস্ময় মুখে মাথা নাড়ে। আসমানী নওয়ানের ব্যবহার তার প্রথম প্রথম এমন অবাক লাগতো। এখন তার বোনের সেইম বিহেব সন্ধ্যাকে ভাবনায় ফেলে দেয়। 
শিমু এগিয়ে এসে বলে,

- আচ্ছা আম্মু এবার আমার ভাবিকে ছেড়ে আমাকে দাও। আমার ভাবির সাথে অনেক গল্প করার আছে।

শিমুর কথায় আসমানী নওয়ান সহ তার মা হেসে ফেলল। সন্ধ্যা-ও মৃদু হাসলো। তার বয়সী এক মেয়ে পেয়ে সন্ধ্যা ভীষণ আনন্দিত হয়েছে।  
শিমুর মা আসমানী নওয়ান এর হাত থেকে একটি ব্যাগ বের করে একটি গহনার বাক্স বের করে। তার কাছে যা গহনা ছিল তার অর্ধেকটা শিমুর জন্য রেখে বাকি অর্ধেক টা সন্ধ্যার জন্য এনেছে। 
বাক্সের ভেতর থেকে একটি সোনার চেইন বের করে সন্ধ্যাকে পরিয়ে দেয়। এরপর কানের দুল পরিয়ে দিতে চাইলে দেখল সন্ধ্যার কানে সোনার রিং। তাই দুল দু'টো রেখে দিল। এরপর একটি ছোট্ট স্টোনের নাকফুল বের করে সন্ধ্যার নাকে দৃষ্টি দিলে দেখল নাকফুটো নেই। ভদ্রমহিলা মৃদুস্বরে বলে,

- তুই নাক ফুটো করিস নি?

সন্ধ্যা বোঝায়, - করেছিল। কিন্তু নাকে কিছু না দেয়ায় ফুটো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শিমুর মা মৃদু হেসে বলে,
- আচ্ছা কালকে তোকে পার্লারে নিয়ে গিয়ে নাক ফুরিয়ে আনবো।

সন্ধ্যার চোখেমুখে ভীতি। এতো বড় হয়ে নাকফুটো করলে তো অনেক ব্য'থা পাবে। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার মনের কথা ধরতে পেরে হেসে বলে,

- আরে ভ'য় পাইতাছস ক্যান? এইডা এহন খুব সোজা।

শিমুর মা সন্ধ্যার গালে হাত দিয়ে মৃদু হেসে বলে,
- মেশিন দিয়ে চোখের পলকে করে দিবে বুঝলি? একটুও লাগবে না।

শিমু কোমড়ে হাত দিয়ে বলে,
- খালা তুমি গ্রাম্য ভাষায় কথা বলো, তাহলে আমার আম্মু এতো শুদ্ধ করে কথা বলে কেন? 

আসমানী নওয়ান মুখ বাঁকিয়ে বলে,
- সে তোর মায় শহরে আইসা শুদ্ধ শিইখা গেছে। আমিও শিখছি। কিন্তু আমার এই ভাষা কইতেই ভাল্লাগে।

সন্ধ্যা মৃদু হাসলো। আসমানী নওয়ানের এই ব্যাপারটা তার ভালো লাগে। শিমুর মা হেসে বলে,
- আপা আমি তোমার লাহান করে কথা কইবার পারি। খালি কই না দেইখা।

শিমুর মায়ের কথা শুনে সবাই সব্দ করে হেসে ফেলে। 
____________________________

ধরণীতে দুপুরের কড়া তেজ নেমে শীতল আবহাওয়া বিরাজ করছে। 
সৌম্য ইরার বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী কয়েকদিন শিমু পড়বেনা বলে ছুটি চেয়েছে। তাই সৌম্য এই সময়টাতে ফাঁকা পেয়ে চলে এসেছে। মুখটা মলিন। ভালো লাগছে না কিছু। সে একবার ইরাকে দেখতে চায়। কতদিন হয়ে গেল তার ইরাবতীর মুখটা ভালো করে দেখে না। দু'দিন আগে সাইড থেকে একটুখানি দেখল, সাথে ছিল তার জন্য উপহার। এখন-ও মনে পড়লে বুকটা চিনচিন করে ওঠে।
সৌম্য বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে দৃষ্টি ইরাদের পাঁচতলা আলিশান বাড়ির দিকে রাখে। এই আলিশান বাড়ির মেয়ে ইরা। তার সাথে ইরাকে একটুও মানায় না। 
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন পকেট থেকে বের করে ইরার নাম্বারে কল করলে নাম্বার বন্ধ পায়। হতাশার শ্বাস ফেলে ইরার মায়ের ফোনে কল করলে ওপাশ থেকে সাথে সাথে রিসিভ হয়। ভদ্রমহিলা ভীত কণ্ঠে বলে,

- সৌম্য বাবা তুমি এখানে কেন এসেছ?

সৌম্য ইরার মাকে সালাম দিয়ে বলে,
- আন্টি ইরাকে একবার নিচে আসতে বলবেন প্লিজ! একবার দেখা করেই চলে যাবো। প্লিজ আন্টি!

দোতলায় বেলকনিতে দাঁড়ানো ইরার মা সৌম্য'র দিকে তাকিয়ে শক্ত করে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু পারলো না। ছেলেটা কত অসহায় মুখে আবদার করছে, ভদ্রমহিলা তবুও কিছুটা শক্ত কণ্ঠে বলে,

- এইখান থেকে তুমি যাও। বলছি তো ইরা ভালো আছে। তুনি ওর আশেপাশে আর আসবে না। 

সৌম্য কিছু বলতে চায়, তার আগেই কল কেটে যায়। সৌম্য'র বোধয় এতো অসহায় লাগেনি কখনো নিজেকে। এতোটা পর হয়ে গেল সে? একটাবার দেখা করা যায় না তার সাথে?
.
.
ইরা তার ঘরের জানালার পাশে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। 
তার বাবা তার থেকে ফোন কেড়ে নিয়েছে। বলতে গেলে এই ঘরে বন্দী করে রেখেছে। এক সেকেন্ড এর জন্য-ও এই ঘর থেকে তাকে বের হতে দেয় না। মাঝে মাঝে তার সাথে বিয়ে ঠিক করে রাখা রিয়াদ আসলে তাকে বাইরে পাঠায় লোকটার সাথে। ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃষ্টি নিচে নামিয়ে উল্টো ঘুরতে গিয়েও দাঁড়িয়ে যায় রাস্তার পাশে সৌম্য কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সাথে সাথে চোখজোড়া ভিজে যায়। চেঁচিয়ে ডাকে, 
- সৌম্য?

কিন্তু তার গলার আওয়াজ বাইরে যায় না। ইরা দৌড়ে ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজায় থা'প্প'ড় দিতে দিতে কান্নামাখা গলায় বলে,
- আম্মু দরজা খোলো। আম্মু? 

দরজার ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পায় না। ইরা থেমে যায় না। গলার আওয়াজ বাড়িয়ে সমানে ডাকে,
- আম্মু দয়া করে দরজাটা খোলো। তোমাদের পায়ে পড়ি। আম্মু?

হঠাৎ-ই দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ইরা দু'পা পিছিয়ে যায়। দরজা খুলে কেউ ভেতরে প্রবেশ করলে ইরা চোখ তুলে রিয়াদকে দেখে বিরক্ত হলো। রিয়াদের পাশ কাটিয়ে বাইরে যেতে নিলে রিয়াদ ইরার হাত টেনে ধরে। ইরা প্রচণ্ড রে'গে হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে চিৎকার করে বলে,
- লম্পট আমাকে ছুঁবি না তুই।

রিয়াদ বাঁকা হেসে বলে,
- ইরাবতী ডাকার মালিককে দেখে সব ভুলে গেলে সুন্দরী? 

ইরা ঢোক গিলল। রিয়াদ শ'য়'তা'নি হাসি দিয়ে বলে,
- রেডি হয়ে নাও সুন্দরী। আমরা শপিং-এ যাবো।

ইরা রে'গে বলে,
- আমি তোর সাথে কোথাও যাবো না। একদিন গিয়েছি বলে ভেবেছিস আকাশের চাঁদ পেয়ে গিয়েছিস?

রিয়াদ গা দুলিয়ে হেসে বলে,
- হবু বউয়ের মুখে তুই শুনতে ভালোই লাগে। তা সুন্দরী, তোমার সৌম্য কে কি এখনি উপরে পাঠাবো? আাহারে, বেচারা জীবন দিতে নিজেই পায়ে হেঁটে চলে এসেছে। 
কথাটা বলতে বলতে পকেট থেকে ফোন বের করে। ইরা ঢোক গিলল। অতঃপর চোখ বুজে শক্ত গলায় বলে,
- চলুন।

রিয়াদ শব্দ করে হেসে বলে,
- বাহ! এক লাইনে পুরো তুই থেকে আপনি! ভালো ভালো!

রিয়াদ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ইরা দৌড়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। সৌম্যকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইরার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। নিজেকে সামলে তার ড্রয়ার থেকে একটি ছোট্ট চাকু বের করে। যেটি এক হাতের মুঠোয় এঁটে যায়। যে জামা পরেছিল ওভাবেই ইরা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 
রিয়াদ ইরাকে দেখে সামনের দিকে এগোলে ইরা পিছু পিছু যায়। রিয়াদ হাসতে হাসতে বলে,

- তোমার সৌম্য'র সাথে ভুলেও কথা বলতে যেও না সুন্দরী। তোমার বাবার নজর কিন্তু খুব নিখুঁত। 

ইরা চুপ থাকলো। বাইরে বেরিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ালে সৌম্য ইরাকে দেখে দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসে ইরার দিকে। ইরার মাথা নিচু। রিয়াদ হেসে বলে,

- আমার বউয়ের কাছে কি বাবু?

সৌম্য অবাক হয়ে তাকায় ইরার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটির দিকে। গত দু'দিন আগের সেই ছেলেটি। সৌম্য ঢোক গিলল। মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,
- আপনাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে?

ইরা কিছু বলার আগেই রিয়াদ হেসে বলে,
- হানিমুনের টিকিট কাটা-ও শেষ। 

ইরার চোখ থেকে টুপ করে দু'ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। সৌম্য'র গলা শুকিয়ে আসলো। সে ইরার সাথে দু'মিনিট কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু এখন কেন যেন আর ইচ্ছে করছে না। সৌম্য রিয়াদের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটির গায়ের রঙ ইরার মতোই ফর্সা। মনে মনে নিজের উপর বিদ্রুপ হাসলো। মাথা নিচু করে তার হাতের দিকে একবার তাকালো। গায়ের রঙটা তার বেশ ভালোই চাপা। ইরার পাশে সে সবদিক থেকেই বেমানান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বহুকষ্টে উচ্চারণ করল,

- আপনাদের খুব সুন্দর মানিয়েছে।

রিয়াদ হেসে বলে,
- থ্যাঙ্কিউ সো মাচ।

সৌম্য আর দাঁড়ালো না। দু'পা পিছিয়ে গেল। মাথা নিচু করে রাখা ইরার দিকে একবার তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিল। এরপর মৃদুস্বরে বলে,
- ভালো থাকিস ইরাবতী।

কথাটা বলে সাথে সাথে উল্টো ঘুরে বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে শুরু করে সৌম্য। চোখদু'টো ভীষণ ঝাপসা ঠেকে। 
ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে,

- হৃদয়ের সুপ্ত অনুভূতি বুঝলাম। যে অনুভূতি শুধুই তোকে ঘিরে। অপ্রকাশিত এই অনুভূতির বুক ফেটে প্রকাশ হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা হলো,
কিন্তু?
নাহ, বের হতে পারলনা
পুনরায় সেগুলো বুকের ভিতরেই দাফন হলো। 

কথাগুলো বলে শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছল সৌম্য। সারাজীবনে একটুখানি সুখ ভুল করে-ও তার দুয়ারে আসল না। আহ! কি জীবন তার! 
.
.
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে ইরা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। রিয়াদ একটা গান চালিয়ে দেয়, যেন তার খুব আনন্দের দিন। ইরা নিজেকে সামনে নিল। হাতের মুঠোয় ধরে রাখা ছোট্ট চাকু মেলে ধরল। বা হাতে চোখজোড়া মুছে আড়চোখে রিয়াদের দিকে তাকালো। রিয়াদ রাস্তার পাশে গাড়ি সাইড করে। ইরার দিকে ফিরতে নেয়, তার আগেই ইরা তার হাতের চাকু এগিয়ে নিয়ে রিয়াদের ঘাড়ে বসিয়ে দেয়। জায়গা মতোই দিয়েছে। রিয়াদ চোখ বড় বড় করে তাকায়। ইরাকে সরিয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। ইরা ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,

- ইশতিয়াক আহমেদ এর র'ক্ত আমি। আমার বাবা যে ডালে চলে, আমি সবসময় তার উপরের ডালে চলি। ইশতিয়াক আহমেদ এর সাথে হাত মিলিয়েছিস, তো তার র'ক্তের ঝাঁঝ কেমন দেখবি না? 

রিয়াদ নিভু নিভু চোখে তাকায় ইরার দিকে। ইরা রিয়াদকে ছেড়ে তার জায়গায় বসে আঙুল উঁচিয়ে বলে,
- খুব শখ না আমার স্বামী হওয়ার? সৌম্য শেখ ছাড়া আর কারো ইরাবতীর স্বামী হওয়ার অধিকার নেই, বুঝলি? আমার সৌম্য কে মা'র'বি বলেছিলি না? ইরাবতী থাকতে সৌম্য'র গায়ে আঁচ-ও লাগবে না। প্রুভ দিয়ে দিলাম।

রিয়াদ চোখ বন্ধ করে নেয়। ইরা কথাগুলো বলে তার গলায় পেঁচানো ওড়না দিয়ে নাকমুখ ঢেকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আশেপাশে তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ায়। সৌম্য'র কথা মনে আসতেই চোখজোড়া ভিজে ওঠে। সৌম্য'র অসহায়ত্বে ঘেরা কণ্ঠ কানে বাজে। ইরা দু'হাতের মাঝে মুখ লুকিয়ে ফোঁপানো কণ্ঠে বিড়বিড় করে,

- তুই কিভাবে ভাবলি সৌম্য আমি অন্যকাউকে বিয়ে করব? তুই আমাকে কখনোই বুঝলি না! ভীষণ ভালোবাসি সৌম্য।
______________________________
.
ঘড়ির কাটা জানান দেয়, রাত ৮ টা।
শিমু ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে সবকাজ শেষে সন্ধ্যাকে নিয়ে ডায়নিং রুমের সোফায় এসে বসেছে। সন্ধ্যার সাথে গল্প করছে। সন্ধ্যা ইশারায় বোঝায়, শিমুর বুঝতে একটু সময় লাগে তবে শিমুর এতেই বেশ ভালো লাগছে। শিমুর কাছে সন্ধ্যাকে তার মতোই লাগছে। চঞ্চল টাইপ। এজন্য বেশি ভালো লাগছে। 
শিমু সন্ধ্যাকে তার কোচিং এর একটি কাহিনি শোনাতে চায়। শিমু তখন ক্লাস সেভেনে পড়তো। সন্ধ্যা আগ্রহী চোখে চেয়ে। শিমু বলতেই পারছে না। বলার আগেই হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে। সন্ধ্যা বোকাচোখে চেয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পেরোলেও শিমুর অবস্থা একইরকম দেখে সন্ধ্যা হতাশ হয়। বিরক্ত হয়ে শিমুর হাত ধরে টেনে তোলে শিমুকে। বাইরের দিকে টেনে নিয়ে য়েতে নিলে শিমু কোনো রকমে হাসি আটকে থেমে থেমে বলে,

- আরে ভাবি কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

সন্ধ্যা পিছু ফিরে ডান হাতের আঙুল দ্বারা মাথা দেখায়, এরপর হাতের ইশারায় বোঝায়, - তোমাকে মেন্টাল হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। এসো।

সন্ধ্যার কথা শুনে শিমুর মুখ ভোতা হয়ে যায়। মেকি রা'গ দেখিয়ে বলে,
- ধ্যাত! তুমি তো আচ্ছা মজা নাও ভাবি। কাহিনী টা প্রচুর হাস্যকর। তোমাকে বললে তুমি হাসতে হাসতে পড়ে যাবে।

সন্ধ্যা হেসে বোঝায়,
- তাহলে বলো। 
ডান দিকে হেলে পড়ার ভঙ্গি করে বলে,
- আমি-ও একটু পড়ে যাই!

শিমু হেসে ফেলল সন্ধ্যার কান্ডে। আসমানী নওয়ান অবাক হয়ে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে। মেয়েটি এই কয়দিন কত শান্ত হয়ে থাকতো। অথচ তার বয়সী একটি মেয়েকে পেয়ে যেন ভেতরের সব চঞ্চলতা উগলে দিচ্ছে সন্ধ্যা। শিমুর মা বলে ওঠে,

- আপা সন্ধ্যাকে আমার সাথে নিয়ে যাই? ও শিমুর সাথে থাকলে সবসময় হাসবে।

আসমানী নওয়ান মৃদুস্বরে বলে,
- নিয়া যাস। ওয় ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকি। 
শিমুর মা হেসে বলে,
- আমাদের জান্নাতের মুখে কত মায়া তাই না আপা?
দু'বোনের চোখের কোণে-ই পানি।  

শিমু সন্ধ্যার হাত ধরে সোফায় বসায়। এরপর বলতে শুরু করে,

- ক্লাস সেভেনে যে কোচিং করতাম, সেই কোচিং-এ কয়েকজন পড়তাম। এই ধরো দশজনের মতো। স্যার এর নাম রাজিব ছিল। তো রাজিব স্যার তখন বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাথ করাচ্ছিল। আমরা খাতায় উঠিয়ে নিচ্ছিলাম। স্যারের ম্যাথ করা শেষ হলে সে চেয়ারে এসে বসে। আমরা সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখছিলাম। হঠাৎ-ই কেমন যেন প্যা,পু আওয়াজ শুনতে পাই সবাই। আমি লেখা থামিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে বললাম,

- স্যার আপনার মনে হয় ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে।

স্যার কিছু বলল না। দ্রুত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে যেতে নিলে ভোটাস করে একটা শব্দ হয়। 

কথাটা বলে শিমু শব্দ করে হেসে দেয়। সাথে সন্ধ্যা। শিমু কোনোরকমে হাসি আটকে বলে,
- তারপর বুঝলাম আসলে আমি যা ফোনের ভাইব্রেট ভাবছিলাম, সেটা আসলে৷ রাজিব স্যারের বায়ু দূষণ।

সন্ধ্যা হাসতে হাসতে সোফায় আধশোয়া হয়ে পড়েছে। কোনোদিন এতো হেসেছে কি-না মনে পড়ে না। শিমু দাঁত কেলিয়ে হাসে। সন্ধ্যার হাসতে হাসতে নাজেহাল অবস্থা। 
আকাশ মাত্র বাড়ি ফিরেছে। ডায়নিং রুম দিয়ে পাস করে যাওয়ার সময় হাসির শব্দে বামদিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। সন্ধ্যাকে এমন পা'গ'লের মতো হাসতে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় তার। পাশে শিমুকে হাসতে দেখে বুঝল, এই কোনো কাজ করেছে। আকাশ এগিয়ে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার চোখ বন্ধ। আকাশ শীতল দৃষ্টিতে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে। 
দু'হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে শিমুর উদ্দেশ্য আকাশ বলে,
- এখনে কি হচ্ছে?

আকাশের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা দ্রুত সোজা হয়ে বসে। ডান হাতে মুখ চেপে ধরে হাসি আটকায়। 
শিমু আকাশকে দেখে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে,
- আকাশ ভাইয়া তোমার বউ হা'গ'তে হা'গ'তে পা'গ'ল হয়ে গেছে।

আকাশ বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
- মানে?

সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। হায় আল্লাহ! এমনিতেই আকাশের সামনে এমন সিচুয়েশনে পড়ে তার অবস্থা খারাপ। সেখানে এই শিমু তার মানসম্মান খেয়ে দিল। সন্ধ্যা শিমুর পিছে দাঁড়িয়ে শিমুর পিঠে চিমটি কাটে। শিমু পিছনে হাত বুলিয়ে আহ আওয়াজ করে বলে ওঠে,

- মিস্টেক আকাশ ভাইয়া। ওটা হাসতে হাসতে হবে।

আকাশ কিছু বলল না। সন্ধ্যা শিমুর পিছনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- সামনে থেকে সর।

শিমু ভ্রু কুঁচকে বলে,
- কেন?

আকাশ রে'গে তাকায়। শিমু দ্রুত বলে,
- সরছি সরছি।
বলেই আকাশের সামনে থেকে সরে যায়। 

আকাশ সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে বলে,
- হাসছিলে কেন?

পাশ থেকে শিমু বলে,
- অনেক হাস্যকর কাহিনি। আমি তোমাকে বলছি আকাশ ভা....

আকাশের শক্ত চাহনী দেখে শিমুর কথা থেমে যায়। মেকি হেসে বলে,
- ভাবির হয়ে হেল্প করে দিচ্ছিলাম আর কি!

আকাশ রে'গে বলে,
- বলেছি আমি হেল্প করতে?

শিমু মাথা নেড়ে বলে,
- না মানে। আমি একটু...

আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- এখান থেকে যা। বিরক্ত করিস না।

শিমু মুখ ফুলিয়ে বলে,
- আমি তোমাদের বাড়ির মেহমান।

আকাশ সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বলে,
- যা শরবত বানিয়ে আন। ক্লান্ত লাগছে।

শিমু কোমরে হাত দিয়ে বলে,
- আমি?

আকাশ বিরক্ত হয়ে বলে,
- না, তোর বে'য়া'দ'ব ভার্সন শিমু।

আকাশের কথা শুনে সন্ধ্যা হেসে ফেলে। শিমু মুখ গোমড়া করে তার খালার ঘরের দিকে যায়। তার ছেলের নামে বিচার দিবে। তাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে। পৃথিবীতে সব ভাইয়েরাই মনে হয় এমন। বোনকে দিয়ে শুধু কাজ করানোর ধান্দায় থাকে। সন্ধ্যা আকাশের পাশ কাটিয়ে শিমুর পিছু যেতে নিলে আকাশ সন্ধ্যার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

- তোমাকে যেতে বলিনি।

সন্ধ্যা আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ সন্ধ্যার পানে চেয়ে একটু এগিয়ে এলে সন্ধ্যা পিছু সরে যায়। মেয়েটি ঢোক গিলে। আকাশ ডান হাতের বুড়ো আঙুল সন্ধ্যার গালের টোল সৃষ্ট হওয়া জায়গাটিতে রেখে মৃদুস্বরে বলে,
- আবার হাসো।

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের এমন একটি আঙুলের স্পর্শ পেয়ে-ই সন্ধ্যার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে। আকাশ সন্ধ্যার দিকে আরও এক পা এগিয়ে এসে বলে,
- হাসো।

সন্ধ্যা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। আকাশ আবারও সন্ধ্যার দিকে এক পা এগিয়ে আসলে সন্ধ্যা দু'পা পিছিয়ে যায়, ফলে সোফার সাথে বেঁধে ঠাস করে সোফার উপর পড়ে যায় সন্ধ্যা। 
আকাশ বিরক্ত চোখে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। ডান পা ভাঁজ করে সোফার উপর রেখে বা পা মেঝেতে রেখে সন্ধ্যার দিকে ফিরে বসে আকাশ। সন্ধ্যা বুঝতে পেরে দ্রুত সোফা থেকে উঠতে নিলে আকাশ বা হাতে সন্ধ্যার ডান হাত ধরে সন্ধ্যাকে টেনে তার দিকে ফিরিয়ে রে'গে বলে,

- পালাচ্ছ কেন? এসব আমি পছন্দ করি না।

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। এই লোকটার কি হয়েছে? তার সাথে এমন অদ্ভুদ বিহেভ করছে কেন? আকাশ আবারও বলে,
- হাসো।

সন্ধ্যা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। আকাশকে তার কাছে আপাতত এক অদ্ভুদ প্রাণী লাগছে। হুট করেই আকাশের এরকম বিহেবে সন্ধ্যার মাথা ঘুরছে। 
আকাশ সন্ধ্যাকে চুপ দেখে ডান হাতে সন্ধ্যার গাল চেপে তার দিকে ফিরিয়ে, শক্ত গলায় বলে,
- হাসো, ইডিয়ট।

সন্ধ্যার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এই লোকটা কি পা'গ'ল? তাকে ধমকিয়ে বলছে, হাসতে। এমন পরিস্থিতিতে তার কান্না পাচ্ছে। সে হাসবে কি করে?

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা - ৩৪৩০
কেমন হয়েছে জানাবেন। পড়তে থাকুন। গল্পে টুইস্ট আছে। ধীরে ধীরে সব ক্লিয়ার হবেন ইনশাআল্লাহ। অবশ্যই সকলে মতামত দিবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন।]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago
পর্ব:০৮
 
 

সন্ধ্যাকে চুপ দেখে আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- বাংলা বোঝো না? হাসতে বলেছি হাসো।

সন্ধ্যা শক্তি খাটিয়ে সোফা থেকে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু তার ডান পা আকাশের বা পায়ের উপর পরে, আকাশ ভ্রু কুঁচকে মাথা নিচু করে সন্ধ্যার পায়ের দিকে তাকায়। এরপর সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে দ্রুত আকাশের পায়ের উপর থেকে তার পা সরিয়ে নেয়। বেচারির মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে গিয়েছে। আকাশ আবার মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে সন্ধ্যার পায়ের দিকে তাকায়। মেয়েটির পরনে জামা আর প্লাজু। পায়ের গিরা থেকে প্লাজু উপরের দিকে উঠে যাওয়ায় আকাশের নজরে পড়ে সন্ধ্যার পায়ের নুপুর। সন্ধ্যার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে,

- এই নুপুর কোথায় পেয়েছ?

আকাশের হাত এখনো সন্ধ্যার গালে। সন্ধ্যা বোকাচোখে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। আকাশ সন্ধ্যার গাল ছেড়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,
- মা দিয়েছে?

সন্ধ্যা দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে,
- তাহলে কে দিয়েছে? তোমার পরিচিত কেউ?

সন্ধ্যা এবার চোখের ইশারায় হ্যা বোঝায়। আকাশ সাথে সাথে প্রশ্ন করে,
- ছেলে না-কি মেয়ে?

সন্ধ্যা হাতের এক আঙুল দিয়ে প্রথমটা বোঝায়। আকাশ বুঝতে পারে ছেলে। সাথে সাথে রে'গে বলে,
- বে'য়া'দ'ব মেয়ে! পরপুরুষের জিনিস পায়ে পরে থাকতে তোমার ল'জ্জা করে না?

সন্ধ্যা হতভম্ব হয়ে যায়। আকাশ নিচু হয়ে সন্ধ্যার ডান পায়ের নুপুর ধরে জোরে টান দিলে ছিঁড়ে যায়। সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। দ্রুত বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। আকাশের নজর সন্ধ্যার আরেক পায়ে। আকাশ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ানোর আগেই সন্ধ্যা এগিয়ে এসে আকাশের হাত থেকে খন্ডিত নুপুর নিতে চায়। সামান্য ঝুঁকে দু'হাতে আকাশের হাতের মুষ্টি খুলতে চায়। 

আকাশ শক্ত করে হাতের মুঠোয় সন্ধ্যার খন্ডিত পায়েল ধরে রাখলো। সন্ধ্যা দু'হাতে আকাশের হাতের মুঠো খুলতে চায়, কতগুলো খামচি-ও দিয়ে দিয়েছে। আকাশ শক্ত চোখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা ব্যর্থ হয়ে আকাশের দিকে ভেজা চোখে তাকায়। সন্ধ্যার ভেজা চোখে চোখ পড়লে আকাশের দৃষ্টি শিথীল হয়। সন্ধ্যা দু'হাত জমা করে রিকুয়েস্ট করে, তার নুপুর দিয়ে দেয়ার জন্য। আকাশ তার মুঠো করা হাত শিথীল করে। সন্ধ্যা আকাশের হাত থেকে তার দ্বিখণ্ডিত নুপুর একপ্রকার ছিনিয়ে নেয়। এরপর উল্টো ঘুরে যেতে নিলে আকাশ দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে। রাগান্বিত স্বরে বলে,

- কার জন্য কাঁদছ তুমি?

সন্ধ্যা হাত মোচড়ায়। আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- কে দিয়েছে এটা?

সন্ধ্যা অসহায় চোখে তাকালে আকাশ সন্ধ্যার হাত ছেড়ে দেয়। সন্ধ্যা সোফার উপর আকাশের ফোন দেখতে পেয়ে এগিয়ে গিয়ে ফোনটি হাতে নেয়। এরপর ফোনটি আকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বোঝায়, লক খুলে দিতে। আকাশ বুঝতে পেরে তার ফোনের লক খুলে দিল। সন্ধ্যা আকাশের ফোনে কিছু টাইপ করতে শুরু করে। প্রায় মিনিট তিনেক সময় নেয় সন্ধ্যা। এরপর ফোনটি আকাশের সামনে ধরলে আকাশ পড়তে শুরু করে। 

- আমার ভাইয়া আমাকে রুপার পায়েল বানিয়ে দিয়েছেল, বুঝেছেন? আপনার প্রবলেম কি হ্যাঁ? আমার ভাইয়ের জিনিস ছিঁড়ে ফেললেন কেন? আপনার জিনিস তো নিই-নি আমি। 
ভাইয়া কত ভালোবেসে বানিয়ে দিয়েছে জানেন? জানবেন কি করে, পারেন তো শুধু কারণ ছাড়া মানুষকে লোভী বলতে। যারা যেমন তারা অন্যকে তেমন-ই বলে। নিজে লোভী বলে-ই আমাকে লোভী বলেছিলেন। আপনি হলেন মেয়ে লোভী। মেয়ে দেখলেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন। লোভী কোথাকার!

লেখাগুলো পড়ে আকাশ বিস্ময় চোখে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা ঢোক গিলে আকাশের ফোন সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলে দৌড় দিতে নিলে আকাশ সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

- কি বললে? 

সন্ধ্যা ডান হাত মুখে দিয়ে ইশারায় বোঝায়, আপনি বাংলা পড়তে পারেন না? মূর্খ না-কি!

আকাশ চোখ বড় বড় করে তাকায়। কি পরিমাণ বে'য়া'দ'ব মেয়ে ভাবা যায়? এতোদিন সে একে কত অবলা মেয়ে ভাবতো! সন্ধ্যার হাত আরও শক্ত করে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

- ই'ডিয়ট, আমি কোনো মেয়ের দিকে তাকাই না, বুঝতে পেরেছ?

সন্ধ্যা বিরক্ত হলো। তাকে দেখলেই তাকিয়ে থাকে আবার বলছে কারো দিকে তাকায় না। আকাশের হাত শিথীল হলে সন্ধ্যা তার ঘরের দিকে দ্রুত পায়ে চলে যায়। আকাশ বিরক্ত চোখে চেয়ে দেখল। সোফার উপর তার ফোন নিয়ে কাউকে কল করে। রিসিভ হওয়ার সাথে সাথে চিৎকার করে বলে,

- আমার ডিভোর্স পেপার আসে না কেন? এদিকে এক বে'য়া'দ'ব মেয়ে আমার পাশে ঘুরঘুর করছে। একে নেয়া যাচ্ছে না। কোনো মাস টাস অপেক্ষা করতে পারবো না। এক সপ্তাহের মধ্যে যদি আমার বাড়ি ডিভোর্স পেপার না আসে, তাহলে তোকে পিস পিস করে কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসব বলে রাখলাম। 

ওপাশ থেকে অরুণ ভ্রু কুঁচকে বলে,
- আমাকে তোর কোন দিক থেকে উকিল মনে হচ্ছে? আমি হলাম কি সুন্দর হ্যান্ডসাম একটা ছেলে।

আকাশ বিরক্ত হয়ে বলে,
- তুই কোত্থেকে এলি?

অরুণ হতাশ কণ্ঠে বলে,
- মাটির তল থেকে। সমস্যা কি তোর? বউটাকে মানছিস না কেন? 

- কারণ ও বে'য়া'দ'ব।

অরুণ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
- আদবওয়ালী হলে মানতি?

আকাশ বিরক্ত হয়। সামনে তাকালে দেখল সন্ধ্যা তার দিকে চেয়ে আছে। চোখ দু'টো ভেজা মনে হলো। আকাশ পাত্তা দিল না। এরকম বে'য়া'দ'ব মেয়েকে তার সহ্য হয় না। তার পিছে কত মেয়ে ঘুরঘুর করত, সে এভোয়েড করত। আর এই মেয়ে সরাসরি তাকে মেয়ে লোভী বানিয়ে দিল! সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে অরুণের উদ্দেশ্যে রে'গে বলে,

- ডিভোর্স পেপার ছাড়া আমার বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ। 

অরুণ অসহায় কণ্ঠে বলে,
- আরে আমি তোর ডিভোর্স পেপার কই পাবো? 

আকাশ শক্ত কণ্ঠে বলে,
- সেটা তুই জানিস।
বলেই খট করে কল কেটে দেয় আকাশ। এরপর বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। আকাশের চিৎকারে আসমানী নওয়ান এর ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে আসে। আকাশের বলা কথাগুলো শুনেছে। আসমানী নওয়ান চুপচাপ দেখল আকাশকে। শিমুর মা এগিয়ে এসে বলে,

- আকাশ তুমি সন্ধ্যাকে ডিভোর্স দিতে পারবে না।

আকাশ পিছু ফিরে রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে বলে,
- কেন?

আকাশের খালা রে'গে বলে,
- আমি বলেছি তাই।

আকাশ গম্ভীর গলায় বলে,
- তুমি বলতে থাকো। আমি সময়মতো ডিভোর্স দিয়ে দিব। 
কথাটা বলে উপরে উঠতে থাকে। দু'বোন হতাশ চোখে আকাশকে দেখল। শিমু মাথা চুলকায়। আকাশ ভাইয়া সন্ধ্যা ভাবিকে ডিভোর্স দিবে? ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে এসব কিছু জানতো না। 

সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দেয়। ডান হাতে দ্বিওখন্ডিত নুপুর দু'হাতের মাঝে মেলে ধরে। আকাশের কথাগুলো মনে পড়লে সন্ধ্যা নিজের উপর বিদ্রুপ হাসে। চোখজোড়া ভিজে ওঠে। ডিভোর্স তার ভাগ্যে লেখা আছে। এটা তো বিয়ের দিন রাতেই বুঝেছিল। তবুও কেন যেন খারাপ লাগে। একজনের সাথে বেঁধে গিয়ে-ও আবার আলাদা হয়ে যাওয়া! সন্ধ্যার বুক ভার হয়। 

সৌম্য'র আদরমাখা ডাক কানে বাজে, বোনু? এই যে নুপুর টি। সৌম্য তাকে এনে দিয়েছিল। 
সন্ধ্যা তখন ক্লাস এইটে পড়তো। গ্রামে তার এক বান্ধবী ছিল। পায়ে নুপুর ছিল দু'টি। সন্ধ্যার ভীষণ ভালো লাগে নুপুর। সে তার বান্ধবীর কাছে নুপুর জোড়া চাইলে সে সন্ধ্যাকে পরতে দিয়েছিল। সন্ধ্যা পায়ে নুপুর পরে সে-কি উচ্ছলতা। বেশ অনেকক্ষণ দৌড়ায়। এরপর তার বান্ধবীকে নুপুর জোড়া ফেরত দিতে আসলে দেখে একটি পায়ের নুপুর নেই। সন্ধ্যা ঢোক গিলে। তার বান্ধবী ব্যাপারটি বুঝতে পেরে সন্ধ্যাকে যা নয় তাই বলেছিল। তার মা নেই, বাবা থেকেও নেই, বাবা কেন তাকে দেখতে পারে না, আরও কত কথা! সন্ধ্যা অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে ছিল। তখন-ই সেখানে তার ভাই সৌম্য এসে যখন কাহিনী জানলো তখন সৌম্য অনেকটা সময় নিয়ে খুঁজে খুঁজে সেই মেয়ের নুপুর এনে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এরপর সন্ধ্যার চোখের পানি মুছে দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিল,

- বোনু, একদিন তোকে ওর চেয়েও অনেক দামি নুপুর এনে দিব, দেখিস। 

সৌম্য সত্য-ই এক বছরের মাথায় তার জন্য রূপার নুপুর এনেছিল। তার পায়ে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যা গল্পে শুনেছে, প্রেমিকেরা প্রেমিকাদের নুপুর পরিয়ে দেয়। কিন্তু তার ভাই বাইরে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার জন্য যত্ন করে, ভালোবেসে এই নুপুর বানিয়ে এনেছিল। 
সন্ধ্যাকে ডেকে বলেছিল,
- বোনু, তোর খুব পছন্দের একটি জিনিস এনেছি আজ।

সন্ধ্যা তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। সৌম্য ঘেমেনেয়ে একাকার হয়েছিল। সন্ধ্যা সৌম্য'কে ঠেলছিল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। তারপর সব নিবে। সৌম্য শোনেনি। সে শার্টের হাতা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে হাঁটু মুড়ে বসে সন্ধ্যার দু'পায়ে নুপুর পরিয়ে দিয়ে মাথা উঁচু করে বলেছিল,

- এবার হেঁটে দেখা তো বোনু।

সন্ধ্যা পায়জামা উঁচু করে নুপুর দু'টো দেখে বিস্ময় চোখে তাকিয়ে ছিল সৌম্য'র দিকে। হাঁটু মুড়ে বসে মাথা নিচু ফুঁপিয়ে উঠেছিল। সৌম্য ব্য'থিত স্বরে বলেছিল,
- কাঁদছিস কেন বোনু? 

সন্ধ্যা চোখ মুছে ইশারায় বুঝিয়েছিল,
- কারণ তুমি বেস্ট ভাইয়া। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যার চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। দু'হাতের মুঠোয় থাকা পায়েল ভিজে একাকার হয়। খুব মনে পড়ছে সৌম্য ভাইয়াকে। এই তো তার ভাইয়ের একটুখানি স্মৃতি। লোকটি কিভাবে ছিঁড়ে ফেলল। পা ছিলে গিয়েছে। সন্ধ্যা ওসব গায়ে মাখলো না। তার তো এই নুপুরটার জন্য দম আটকে কান্না আসছে। 
লোকটি তার ভাইয়ের জিনিস ছিঁড়ে ফেলল, অথচ একটুও অনুতাপ নেই। উল্টে তাকে ডিভোর্স দিতে পারছে না বলে কত রা'গ! 
ডিভোর্সের কথা ভেবে সন্ধ্যার নিঃশ্বাস ভারী হলো। 
_________________________

সৌম্য রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটছিল। মুখে মলিনতার ছোঁয়া। ইরার নিরবতা সৌম্য'র বুকে ছুরির ন্যায় আ'ঘা'ত করেছে। তার ইরাবতী অন্যকারো? কি করে মানবে সৌম্য? হঠাৎ-ই তার সামনে কারো স্থির দু'টো পা দেখে সৌম্য দাঁড়িয়ে যায়। মাথা উঁচু করলে ইরার বাবাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় তার। লোকটি সৌম্য'র কাঁধে হাত দিয়ে বলে,

- তোমার সাথে ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। পাঁচমিনিট সময় দাও।

সৌম্য কি বলবে বুঝল না। সম্মতি না দিলেও না করতে পারলো না। ইশতিয়াক আহমেদ সৌম্যকে নিয়ে একটি ক্যাফেতে বসে। হালকা কিছু অর্ডার করে ভদ্রলোক। সৌম্য'র বদনে চিন্তার ভিড়। ইশতিয়াক আহমেদ সৌম্য'র দিকে চেয়ে ভাবনায় ব্যস্ত। কয়েকদিন আগে সৌম্য'র ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে পারে সন্ধ্যার কথা। প্রথমে আকাশ ইরাকে বিয়ে করতে রাজি ছিল। এরপর রাজি নয়। কারণ হিসেবে বুঝল সৌম্য'র বোন সন্ধ্যা। তখন থেকে তার মে'জা'জ পুরো বিগড়ে আছে। এক ভাই তার মেয়েকে দখল করে বসে আছে, আরেক বোন আকাশের জীবনে চলে এসেছে। দু'ভাইবোন তার প্ল্যান পুরো মাটি করে দিয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে আকাশ তার ডিভোর্সের সব ব্যবস্থা করছে। সময় লাগছে একটু। এজন্য কিছুটা শান্ত আছে সে। ভাবনা রেখে মৃদু হেসে বলেন,

- তো, কেমন আছো?

সৌম্য মৃদুস্বরে জানায়, ভালো। ইরার বাবাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলে ভদ্রলোক শব্দ করে হেসে ফেলে। সৌম্য ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সে হাসির কিছু বলেছে বলে তো মনে হয় না। ইরার বাবা হাসি থামিয়ে বলে,
- একটু বেশি ভালো আছি, তাই হাসি থামছে না বুঝলে?

সৌম্য বিরক্ত হলো, তবে কিছু বলল না। ইরার বাবা পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে সৌম্য'র দিকে তাক করলে সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। স্ক্রিনে সন্ধ্যার সেসব পিক যেসব তাকে প্রতিদিন নিয়ম করে পাঠানো হতো। সৌম্য'র গলা শুকিয়ে আসে। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
- আমার বোনু কোথায়?

ইশতিয়াক আহমেদ টেবিলের উপর ফোন রেখে হাসে। সৌম্য হঠাৎ-ই রে'গে বলে,
- আপনি আমার বোনকে কোথায় রেখেছেন বলুন?

ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে বলে,
- আমি তোমার বোনকে বিয়ে দিয়েছি না-কি! তোমার পরিবার বিয়ে দিয়েছে। আমার চেয়ে তো তাদের ভালো জানার কথা। 

সৌম্য শান্ত হলো। ইরার বাবা ভুল কিছু তো বলেনি। অতঃপর বলে,
- আপনি আমাকে আমার বোনুর পিক ভিডিও পাঠাতেন তাই না?

ইশতিয়াক আহমেদ হেসে বলে,
- বুদ্ধিমান ছেলে।

সৌম্য বিচলিত কণ্ঠে বলে,
- আমার বোনু কোথায় আঙ্কেল? প্লিজ বলুন!

ইশতিয়াক আহমেদ হঠাৎ-ই মুখ গম্ভীর করে ফেলে। শক্ত গলায় বলে,
- আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে।

সৌম্য কি বলবে বুঝল না। সে একটু আগেই ইরার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু ইরার তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ঢোক গিলে বলে,
- আমি বিবাহিত মেয়েদের পিছু নিই না আঙ্কেল। 

ইশতিয়াক আহমেদের কপালে ভাঁজ পড়ে। সৌম্য আবার-ও অনুরোধের সুরে বলে,
- আঙ্কেল প্লিজ বলুন, আমার বোন টা কোথায়?

ভদ্রলোক হেসে বলে,
- বলবো বলবো। তার আগে আমার মেয়ের থেকে দূরে থেকে প্রুফ দাও। নিজে থেকে এভোয়েড করে প্রুফ দাও। এর বিপরীত টা করলে তোমার বোনের খোঁজ পাওয়া তো দূর, সে এই দুনিয়ায় আর বেঁচে থাকবে না। বুঝলে?

সৌম্য'র চোখেমুখে ভীতি। সে ইরার বাবাকে কয়েকবার দেখেছিল। উপর থেকে ভদ্রলোককে দেখে ভীষণ সাদাসিধে লাগে, অথচ ভেতরটা কত নোংরা হলে এই কথা বলতে পারে! তার বোনটা না বাঁচলে সে কি করে বাঁচবে? এই দুনিয়ায় ওই একটা বোন ছাড়া আর কেউ নেই যে তার। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

- আমি আপনার সব কথা শুনবো আঙ্কেল। প্লিজ বলুন আমার বোনু কোথায়?

ইশতিয়াক আহমেদ হেসে বলে,
- এই শহর ছাড়তে হবে। বাংলাদেশের শেষ প্রান্তে যেতে হবে। নয়তো তোমার বোনের লা'শ তোমাকে উপহার দিব। আমার আবার এরকম উপহার দিতে বেশ ভালো লাগে। 

সৌম্য দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করল। ইচ্ছে করল এই লোকটার গলা কেটে একে লা'শ বানিয়ে দিতে৷ তার কলিজার টুকরো বোনের দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু সৌম্য তার সব রা'গ গিলে নিল। রা'গ দিয়ে সব হয় না। ক্ষমতা লাগে। যা সৌম্য'র নেই, কিন্তু তার সামনে বসা এই লোকটার ক্ষমতা অনেক সৌম্য জানে। ব্য'থিত স্বরে বলে,

- এই শহর ছেড়ে দিব আঙ্কেল, আপনাকে কথা দিচ্ছি। আপনি আমার বোনটা খোঁজ দিন শুধু।

ইশতিয়াক আহমেদ একটি চেক সৌম্য'র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
- ১৫ লাখ টাকার চেক। এটা রাখো।

সৌম্য অবাক হয়ে বলে,
- আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে, তার পারিশ্রমিক।

কথাটা শুনে সৌম্য রে'গে যায়। শক্ত কণ্ঠে বলে,
- আমি আপনার মেয়ের থেকে দূরে থাকব। এর বিনিময়ে এক পয়সা-ও লাগবে না।

ইরার বাবা হেসে বলে,
- শুুধু এইজন্য দিচ্ছি না। তোমার বোনকে পেতে চাইলে এই টাকা লাগবে। তোমাকে হেল্প করছি।

সৌম্য অবাক হয়ে বলে,
- কেন?

- গেলেই বুঝতে পারবে।

সৌম্যরে'গে বলে,
- কোনো টাকা লাগবে না। আমার বোনকে কিভাবে আনতে হবে, আমি সৌম্য শেখ তা জানি। আপনি শুধু ঠিকানা বলুন।

ইরার বাবা হেসে বলে,
- বেশ তেজ আছে তোমার। এমন ছেলেকে আমার ভালো লাগে। কিন্তু পকেট ফাঁকা হলে তখন তাদের গোণার সময় হয়না।

সৌম্য বিদ্রুপ হেসে বলে,
- আপনাদের মতো নিচু মনমানসিকতার মানুষ সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য এই সৌম্য শেখকে গুনুন, তা আমি চাই না। বরং গর্ব করি আপনাদের থেকে দূরে থাকতে পেরে। 

ইরার বাবা রে'গে তাকায় সৌম্য'র দিকে। শক্ত করে বলে,
- তোমার বোনকে পাওয়ার শখ নেই না-কি? 

সৌম্য নিজেকে শান্ত করে বলে,
- আমার বোনের খোঁজ দিন। আমি তো বললাম আপনার মেয়ের আশেপাশে যাবো না।

ইশতিয়াক আহমেদ দাঁড়িয়ে বলে,
- এক সপ্তাহ পর এই ক্যাফেতে একবার আসবে। সেদিন তোমার বোনের খোঁজ পাবে। এই কয়দিন প্রুফ দাও, আমার মেয়ের থেকে দূরত্ব রাখার। দেখি কতটা সফল হও। আমার মনমতো হলে তোমার বোনের খোঁজ পাবে, নয়তো লা'শ।

কথাটা বলে ১৫ লাখ টাকার চেক সৌম্য'র বুক পকেটে রেখে উল্টো ঘুরে যেতে নিলে সৌম্য ইশতিয়াক আহমেদ এর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পকেট থেকে চেকটি বের করে ইশতিয়াক আহমেদ এর পকেটে ঢুকিয়ে হেসে বলে,

- আমি মধ্যবিত্ত হতে পারি, কিন্তু উচ্চবিত্ত, যেমন- আপনার মতো লোভী নই। 

ইশতিয়াক আহমেদ রে'গে তাকায়। সৌম্য মৃদু হেসে বলে,
- বোনের জন্য এতোদিন অপেক্ষা করতে পেরেছি, আরও পারবো। আপনার মেয়ে আমার কাছে আসলে এভোয়েড এর উপর পিএইচডি করে ছেড়ে দিব। বিনিময়ে এক সপ্তাহ পর আমি আমার বোনের খোঁজ নিতে এখানে আসবো। আসছি। ভালো থাকবেন। আসসালামু-আলাইকুম।

কথাগুলো বলে সৌম্য জায়গাটি প্রস্থান করে। ইশতিয়াক আহমেদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। 
.
.
.
গত দুই ঘণ্টা যাবৎ ইরা সৌম্য'র বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সৌম্য'র ঘরে তালা দেয়া। কাউকে জিজ্ঞেস করলেও কেউ বলতে পারে না। ইরা রাস্তার পাশে এপাশ-ওপাশ পায়চারি করল, হাঁটাহাঁটি করল। আবার বসে বসে অপেক্ষা করল। নাহ সৌম্য'র কোনো খবর নেই। 
ইরা সৌম্য'র জন্য রাত ১০ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। ফোনে কল দিয়েছে, বারবার ফোন বন্ধ পাচ্ছে। জায়গা টি ফাঁকা হতে শুরু করেছে। একা একটি মেয়ে আর কতক্ষণ এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে। কতজন বাঁকা চোখে তাকালো। ইরা তবুও দাঁড়িয়ে রইল। আরও ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করল। কিন্তু সৌম্য'র খোঁজ নেই। ইরা ঝাপসা চোখে রাস্তার অপর পাশের পুরনো বাড়িটার দিকে তাকায়। জায়গাটি একদম নির্জন হয়ে গিয়েছে। ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখানে আর থাকা যাবে না। জায়গাটি একদম-ই সেভ নয়। জায়গায় জায়গায় ছেলেদের আড্ডা বসেছে এটুকু সময়ের মধ্যে-ই। ইরা শেষবার সৌম্য'র বাড়িটার দিকে দৃষ্টি রাখে। এরপর উল্টো পথ ধরে। এই শুনশান রাস্তাটি থেকে বের হতে হবে তার। পিছন থেকে পায়ের শব্দ পেয়ে ইরা একবার পিছু ফিরল। ঢুলতে ঢুলতে কয়েকজন তার দিকে আসছে। ইরা ভ'য় পেয়ে দৌড় দেয়। দৌড়াতে দৌড়াতে মেইন রাস্তায় এসে ওঠে। পিছনে তাকিয়ে কাউকে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। 

এগিয়ে গিয়ে একটি বিকাশের দোকানে গিয়ে একাউন্ট থেকে প্রায় ১০ হাজারের মতো টাকা উঠায়। এরপর আশেপাশে খুঁজে একটি হোটেল পেলে, একরাতের জন্য একটি রুম ভাড়া নেয়। উদ্দেশ্য কালকে সকাল সকাল আবার-ও সৌম্য'র খোঁঝে আসবে। হয়তো আজ কোনো পরিচিত বাড়িতে গিয়েছে। 
তবুও চিন্তা হয়। তার বিয়ে হয়েছে ভেবে সৌম্য খুব ক'ষ্ট পাচ্ছে ইরা জানে। ইরা চাতক পাখির ন্যায় মেইন রাস্তার ধারে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল,, কিন্তু সৌম্য যে নেই। ঝাপসা চোখজোড়া মুছে ভেতরে চলে যায়।
.
.
ইশতিয়াক আহমেদ বাড়ি ফিরলে ইরার মন হতদন্ত হয়ে এসে বলে,
- আমার মেয়ে কোথায় বলুন? কি করেছেন ওকে? আপনার পছন্দের ছেলের সাথে বেরিয়ে গেল, আর ফিরল না কেন? রাত তো অনেক হলো।

ইশতিয়াক আহমেদ বিরক্ত হয়ে বলে,
- মেয়ের জন্য চিন্তা বাদ দিয়ে রিয়াদের জন্য চিন্তা কর। ঘাড়ে চাকু বসিয়ে দিয়েছে তোমার মেয়ে। বাঁচবে কি-না সন্দেহ। তোমার মেয়ে এতো তেজ কোথায় পেয়েছে?

ইরার মা সাধারণত তার স্বামীর মুখের উপর কথা বলেন না। ভীষণ শান্তশিষ্ট স্বভাবের সে। কিন্তু মেয়েটা তার উল্টো। আজ তিনি একেবারে চুপ না থেকে বলেন,
- আপনার তেজ আপনার মেয়ে পেয়েছে। এটা তো সবাই জানে।

বউ এর মুখে সঠিক জবাব পেয়ে ইশতিয়াক আহমেদ দাঁত কিড়মিড় করল। 
ইরার মা মৃদুস্বরে বলে,
- ইরা কোথায়? ও বাড়ি আসবে না?

ইশতিয়াক আহমেদ গম্ভীর গলায় বলেন,
- আসবে। সপ্তাখানেক সময় গেলে এমনি আসবে।

- কিন্তু এখন ও কোথায়? এতোরাতে একা একটা মেয়ে কোথায় আছে?

- আছে হয়তো কোনো হোটেলে। একাউন্টে অলরেডি টাকা নেই। আমার মেয়ে তোমার মতো গাধা না-কি! 

ইরার মা চুপ হয়ে গেল। মায়ের মন কি মানে? চিন্তা তো লেগে-ই থাকে।
_____________________

রাত তখন ১২ টার কাছাকাছি। সন্ধ্যা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তার ঘরের ভেতর ছটফট লাগছে। আজ অনেকদিন পর সে অনেক বেশি কেঁদেছে। যদিও বাইরে একটু ভ'য় ভ'য় লাগছে। তবুও বেরিয়েছে। আকাশদের বাড়ির থেকে বেরোলে বাড়ির বর্ডারের মাঝে বেশ বড়সড় একটি সুইমিংপুল আছে। সন্ধ্যা এগিয়ে গিয়ে সুইমিংপুলের পাশে বসে। মিটিমিটি আলো আসছে এদিকে। সন্ধ্যা মলিন মুখে টলটলে পানির দিকে চেয়ে আছে। 

আকাশ বাগানে এসে ব্যবসার জন্য কলে কথা বলছিল খুব সিরিয়াস মুডে। উদাম শরীর। পরনে কালো রঙের ট্রাউজার। ডান হাত পকেটে ঢুকিয়ে বা হাতে ফোন কানে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিল। হঠাৎ-ই পায়ের সাথে কিছুর ধাক্কা লাগে। আকাশ দ্রুত বাম দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে দেখল সুইমিংপুলের মাঝের দিকে যেন কিছু ছটফট করছে। আকাশ দ্রুত কল কেটে ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে সেদিকে তাক করলে সন্ধ্যাকে সুইমিংপুলের মাঝে হাবুডুবু খেতে দেখে বিস্ময় চোখে তাকায়। 

সন্ধ্যা দু'হাত তুলে বাঁচতে চায়। নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে বাঁচতে চায়। সৌম্য ভাইয়ার কথা মনে পড়লো, আকাশের কথা-ও মনে পড়লো। একজন খুব আপন, যে তার কাছে আসে না। আরেকজন নামে আপন, তবুও কেউ একজন বাঁচাতে আসেনা কেন তাকে? 

আকাশ ফ্লাশ লাইট অফ করে সুইমিংপুলে নামতে যেতে চেয়ে-ও থেমে যায়। এই মেয়ে তাকে মেয়ে লোভী বলেছিল, ভাবা যায়! এর জন্য সে ঠিক করে কাজ-ই করতে পারেনি এতোক্ষণ। মানুষের হাসি ভালো লাগতেই পারে, তাই বলে তাকে পুরো নারী লোভী বানিয়ে দিবে? বিড়বিড় করল, 
- বে'য়া'দ'ব মেয়ে।

এখন সে বাঁচাতে গেলে আবার বলবে, নারী দেহ লোভী। তার এসব শোনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। যা ইচ্ছা হোক এর। একা একাই বাঁচুক। 
হঠাৎ-ই দৌড়ের শব্দ পেয়ে আকাশ ডানদিকে তাকালে দেখল অরুণ দৌড়ে আসছে আর বলছে,

- সুইটি ভ'য় পেও না। আমি এসে গেছি। এইতো এসে গেছি।

আকাশ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকালে দেখল মেয়েটি এখন-ও ছটফট করছে। আকাশ আবারও অরুণের দিকে তাকলো। যখন বুঝল অরুণ সন্ধ্যাকে বাঁচাতে যাচ্ছে, এরপর সে সন্ধ্যাকে ধরবে, ব্যাপারটা ঠিক হজম হলো না তার। মে'জা'জ টা চরম লেভেলের খারাপ হলো।
আবার সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। হায় হায় মেয়েটি তো ম'রে যাবে। নিজেকেই দু'টো থা'প্প'ড় দিতে ইচ্ছে করল। 
হাতের ফোন ছুঁড়ে ফেলে অরুণের দিকে একবার তাকালো। আশেপাশে কিছু খুঁজল। লাঠি জাতীয় কিছু পেয়ে অরুণের হাঁটু বরাবর ছুঁড়ে মারলে অরুণ থেমে যায়। আকাশ রে'গে বলে,

- যদি আর এক পা এসেছিস, তোর পা দু'টো কেটে মমি বানিয়ে রাখবো।

কথাটা বলেই সুইমিংপুলে ঝাপ দিয়ে দ্রুত সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে যায়। দু'হাতে সন্ধ্যাকে আগলে নিয়ে উঁচু করে ধরে। সন্ধ্যা আকাশকে ঢাল হিসেবে পেয়ে দু'হাতে আকাশকে আঁকড়ে ধরে। সমানে কাশতে থাকে। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে। একটু পর কাশি থামলে-ও সন্ধ্যা জোরে জোরে হাঁপায়। আকাশ সন্ধ্যার ডান গালে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলে,

- ঠিক আছো?

চলবে ইনশাআল্লাহ ~~

🟥[শব্দসংখ্যা - ৩০০০
রেসপন্স করবেন🙂]

 
 

Loading spinner

Reply
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago

পর্ব:০৯

 

সন্ধ্যা অবাক হয়ে আকাশের চিন্তিত মুখপানে দৃষ্টি রাখে। আকাশ সন্ধ্যার পুরো মুখে দৃষ্টি বুলায়। ওড়না মাথা থেকে কাঁধে স্থান পেয়েছে। এলোমেলো ভেজা চুল, মুখজুড়ে ছোট ছোট পানির কণা। ভেজা ঠোঁটজোড়ায় নজর পড়তেই আকাশ দ্রুত চোখ বুজে বিড়বিড় করে,
- বে'য়া'দ'ব মেয়ে। আমাকে বশ করতে চাইছে। একে বাঁচানো উচিৎ হয়নি। 

সন্ধ্যা বে'য়া'দ'ব মেয়ে টুকু শুনতে পেয়েছে, বাকিটুকু শুনতে পায়নি। আকাশের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। আকাশ নিজেকে সামলে চোখ মেললে সন্ধ্যা স্বাভাবিক হয়। আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলে,

- তুমি সাঁতার পারো না?

সন্ধ্যা মাথা নিচু করে দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। আকাশ এবার কণ্ঠে ঝাঁঝ নিয়ে বলে,

- আমাকে তোমার পা'গ'ল মনে হয়? গ্রামের মেয়ে হয়ে সাঁতার পারো না? এসব ফা'ল'তু কথা আমি বিশ্বাস করব? ছেলেদের কোলে ওঠার জন্য এই ফন্দী এঁটেছিলে তাই না? ছেলে লোভী বে'য়া'দ'ব মেয়ে একটা!

আকাশের কথা শুনে সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। ভীষণ রা'গ হয় তার। আকাশ কিছু বোঝার আগেই সন্ধ্যা দু'হাতে গায়ের জোরে আকাশকে ধাক্কা দেয়। আকাশ ছিটকে দূরে সরে ঠাস করে পানিতে পড়ে যায়। সন্ধ্যার কোমর থেকে হাত আলগা হয়ে যায়। সন্ধ্যার আবারও অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার উপক্রম হয়।
আকাশ দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাতে মুখ মুছে ছটফট করা সন্ধ্যার দিকে তাকায়। আকাশের ইচ্ছে করল একে পানির মাঝে ঠেসে ধরতে। কি পরিমাণ বে'য়া'দ'ব হলে তাকে ধাক্কা দেয়, ভাবা যায়? আকাশ সুইমিংপুলের পাড়ে উঠে পা ঝুলিয়ে বসল। সে এখন সন্ধ্যার তামাশা দেখবে। তাকে ধাক্কা দেওয়া? সাহস কি মেয়ের! কয়েক সেকেন্ড পেরোতেই আকাশের মন মানলো না। দ্রুত নেমে গিয়ে সন্ধ্যাকে তার সাথে আগলে ধরে। সন্ধ্যা দ্রুত দু'হাতে আকাশের গলা জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে।

লোকটার উপর রা'গ হয়েছিল তাকে ওভাবে বলায়, কিন্তু না বুঝে হঠাৎ ধাক্কা দেয়ার পর বুঝেছে কতবড় ভুল করেছে, সে ভেবেছিল, লোকটি আর আসবে না। এবার সে পানিতে ডুবে মা'রা যাবে, তার ভাইয়াকে আর দেখা হবে না। কিন্তু আকাশ আবার-ও এসেছে দেখে মেয়েটির জানে পানি আসে। না চাইতেও চোখের কোণ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ে।

আকাশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো মেয়ে এমন চিপকে থাকলে কেমন লাগে! আকাশ সন্ধ্যাকে সরিয়ে দিতে চাইলো, কিন্তু সন্ধ্যা সাপের ন্যায় পেঁচিয়ে ধরেছে আকাশকে। আকাশ বুঝল মেয়েটি ভ'য় পাচ্ছে। নিজেই তাকে ধাক্কা দিল, কি তেজ মেয়ের! 
আকাশ রে'গে বলে,
- প্রবলেম কি তোমার? ধাক্কা দিলে কেন আমাকে? 

সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। আকাশ বিরক্ত হয়। ভেজা গায়ে এমনভাবে ধরেছে এ মেয়ে। মে'জা'জ খারাপ হচ্ছে। সন্ধ্যার দু'হাত টেনে তার গলা থেকে ছাড়িয়ে নেয়। কিন্তু বা হাত সন্ধ্যার কোমরে রাখা। সন্ধ্যা ভ'য় পেয়ে আবারও আকাশকে ধরতে গেলে আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার গলা থেকে একটু নিচে হাত রেখে সন্ধ্যাকে থামিয়ে দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,

- আর একবার আমার সাথে চিপকালে এই পানিতে চুবিয়ে মা'র'ব।

সন্ধ্যা মাথা নিচু করে নেয়। অপমানে মুখখানি থমথমে হয়ে যায়। মেয়েটির শরীর কাঁপছে হালকা। আকাশ টের পেলেও নরম হলো না। উল্টে রে'গে বলে,
- আর একদিন যদি কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করতে দেখেছি, তোমার খবর আছে। কোথায় পেয়েছ এতো সাহস? আকাশ নওয়ানকে মেয়ে লোভী বলো? আকাশ নওয়ানকে ধাক্কা দাও? আমার বয়স কত জানো?

সন্ধ্যাকে চুপ দেখে আকাশ আরও জোরে ধমক দেয় সন্ধ্যাকে। 
- কি হলো কিছু বলছো না কেন?

সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দু'দিকে মাথা নাড়ায়, অর্থাৎ সে জানেনা। আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
- ২৯ পেরিয়ে কয়েকদিন পর ৩০ হবে। আর তুমি দুই ইঞ্চি লিলিপুট হয়ে আমাকে রা'গ দেখাও, বে'য়া'দ'ব মেয়ে।

২ ইঞ্চি কথাটা সন্ধ্যার পছন্দ হলো না। সে তো ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। কিন্তু শান্ত থাকলো, সে বেকায়দায় পড়েছে। আকাশ গলা ঝেড়ে বলে,
- তোমার থেকে ১১ বছরের বড় আমি, বুঝেছ?এরপর থেকে আমার সাথে যতবার দেখা হবে, আমাকে সালাম দিবে। 

সন্ধ্যা বোকাচোখে তাকায়। আকাশ সন্ধ্যার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে হাত দিয়ে দেখায় আর বলে, 
- এভাবে ইশারা করে দিবে। নয়তো থা'প্প'ড় একটাও মাটিতে পড়বে না। 

সন্ধ্যাকে এখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে দেখে আবারও ধমক দেয়,
- কি হলো, কিছু বলছো না কেন?

সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। দ্রুত ডানদিকে মাথা নেড়ে হ্যাঁসূচক উত্তর বোঝায়। আকাশ গম্ভীর গলায় বলে,
- গুড। আর অবাধ্য হলে সুইমিংপুল তো আছেই। মাথাটা খুব সুন্দর করে পানিতে ডুবিয়ে রাখবো মিনিট দশেক।

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশের কথা বলার ধরণে মেয়েটা আরও বেশি ভ'য় পাচ্ছে। 

আকাশ মনে মনে হাসলো। আচ্ছা জব্দ করেছে মেয়েটাকে। এবার শান্তি লাগছে। মেয়েটি তাকে উল্টাপাল্টা বলার পর থেকে মে'জা'জ খিটখিটে ছিল। 
এরপর দু'হাতে সন্ধ্যার কোমর পেঁচিয়ে ধরে পাড়ে বসিয়ে দিল সন্ধ্যাকে। বাগান জুড়ে ছিটেফোঁটা আলো, যা সন্ধ্যার উপর এসে পড়ে। 
আকাশ সন্ধ্যার দিকে তাকালে অটোমেটিক মুখ হা হয়ে যায়। এই মেয়ে এটা কি পরেছে? 
সন্ধ্যা দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। দৌড় দিতে নিলে আকাশ সন্ধ্যার পা ধরে টান দেয়। সন্ধ্যা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আকাশের উপর। চোখ বড় বড় হয়ে যায় মেয়েটির। আবার তাকে পানিতে ফেলল কেন?

আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
- সাদা, কালো সব-ই তো দেখিয়ে দিলে। আর কাকে দেখানোর জন্য যাচ্ছো?

আকাশের কথা শুনে সন্ধ্যার চোখ আরও বড় হয়। কথার অর্থ বুঝতে পেরে ল'জ্জায় সন্ধ্যা চোখ খিঁচে নিল। সে সাদা জামা পরেছে। জামাটি ভীষণ পাতলা ছিল। সে তো আর জানতো না, সে পানিতে পরে যাবে। তাহলে জীবনে এই জামা পরতো না। 
আকাশের ইচ্ছে করল একে সত্যি-ই পানিতে চুবিয়ে মা'র'তে। 

রে'গে বলে,
- আচ্ছা বে'য়া'দ'ব তো তুমি! মানুষকে শরীর দেখিয়ে বেড়াও!

সন্ধ্যার কান্না পাচ্ছে। ভীষণ অপমানিতবোধ করছে সে। সুইমিংপুলের পাড়ে থাকায় সন্ধ্যা আকাশকে ঠেলে উপরে উঠতে চাইলো। কিন্তু আকাশ সন্ধ্যার কোমর শক্ত করে ধরে রাখলো। সন্ধ্যা ব্য'থা পায়, সাথে ভীষণ ল'জ্জা। 
আকাশ বিরক্তির শ্বাস ফেলে আশেপাশে তাকালে বামদিকে অরুণকে ফোনে কথা বলতে দেখে রে'গে যায়। এই বে'য়া'দ'ব এখনো যায়নি এখান থেকে? পাড়ের কাছে তখনকার মতো লাঠি জাতীয় একটি ডাল পেয়ে অরুণের দিকে ছুঁড়ে মা'রে। অরুণ পায়ে ব্য'থা পেয়ে উল্টো ঘুরলে আকাশ সন্ধ্যাকে তার পিছে দাঁড় করিয়ে রে'গে বলে,

- এই বে'য়া'দ'ব তুই যাসনি কেন এখান থেকে? 

অরুণ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
- কেন যাবো?

আকাশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
- যা এখান থেকে। নয়তো তোকে লাত্থি মে'রে বাংলাদেশের বাইরে বের করব।

অরুণ কল কেটে এগিয়ে আসে আর বলে,
- তুই তোর বউকে বাঁচাতে নেমে মে'রে ফেললি না-কি? কোথায় মেয়েটা?

সন্ধ্যা আকাশের পিছনের পিঠের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- মে'রে দিয়েছি। যা এবার।

অরুণ চোখ বড় বড় করে বলে,
- সত্যি মে'রে দিলি? মেয়েটার টিকিটি-ও দেখছি না যে।

আকাশ রেগেমেগে পাড়ে উঠে অরুণের দিকে তেড়ে গেলে অরুণ উল্টো ঘুরে দৌড়াতে দৌড়াতে অসহায় কণ্ঠে বলে,
- আরে আমি কি করলাম?

আকাশ ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
- তোর ক্যারেক্টার আজ ধুঁয়ে মুছে সাফ করব দাঁড়া। 

অরুণ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়, দারোয়ান গেইটে দাঁড়িয়ে ছিল। অরুণকে দেখে অবাক হয়, বেশি অবাক হয় আকাশকে উদাম হয়ে ভেজা গায়ে এভাবে দেখে। অরুণ বাইরে বেরিয়ে গেলে আকাশ থেমে যায়। দারোয়ানের সামনে গিয়ে বলে,
- চাচা এক্ষুনি গেইট লাগান। খুলবেন না আজকে। 

অরুণ ওপাশ থেকে বলে,
- কিহ! আমি কই থাকবো? তুই আমার সাথে ভিলেনগিরি করতে পারিস না!

আকাশ রে'গে বলে,
- সব পারি আমি। এমনিতেই ডিভোর্স পেপার আনিস নি, তবুও ঢুকতে দিয়েছি। এখন আর না।

অরুণ কোমরে হাত রেখে চোখমুখ কুঁচকে তাকালো। সে একদিনের মধ্যে কোন আসমান থেকে ডিভোর্স পেপার আনবে? শা'লা লজিকলেস কথা বলতেই এর দিন যায়।
আকাশ সত্যি সত্যি-ই গেইটে তালা দেয়া হলে চাবি নিয়ে চলে গেল। অরুণ কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে,

- শা'লা তোর জীবনে বিয়ে হবে না। 

আকাশ পাত্তা দিল না। এটা বদদোয়া না আশীর্বাদ? সে তো বিয়ে করতে-ও চায় না। 
অরুণের আকাশের ব্যাপারে মনে পড়তেই বলে,
- আমার সব গার্লফ্রেন্ড তোর নামে দলিল করে দিব, দেখিস!

আকাশ ততক্ষণে জায়গা প্রস্থান করেছে। অরুণ হাহুতাশ করতে লাগলো। দারোয়ান চাচা নিজেও অসহায় মুখ করে চেয়ে রইল। তার হাতে তো কিছু নেই।

সন্ধ্যা পুল থেকে উঠে দ্রুতপায়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনে আকাশ দাঁড়িয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যা দু'পা পিছিয়ে যায়। আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে সন্ধ্যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দৃষ্টি বুলায়। সন্ধ্যা সাদা জামার উপর সাদা ওড়না টেনে নিজেকে ঢাকতে চাইলো, কিন্তু সব তো ভেজা। 
আকাশের দৃষ্টিতে মেয়েটি নুইয়ে পড়ে। এতো বাজে পরিস্থিতিতে এ জীবনে পড়েছে বলে মনে হয় না। আকাশের পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে আকাশ আবারও সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা ধাক্কা খেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। আকাশ নিজেই দু'পা পিছিয়ে যায়। আবার-ও সন্ধ্যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দৃষ্টি বুলায়। বা হাত ট্রাউজারের পকেটে। ডান হাতের আঙুলগুলো চাপ দাঁড়িতে বুলিয়ে খুব সামান্য হাসে। অতঃপর নিজেকে সামলে গম্ভীর গলায় বলে,

- খারাপ লাগছে না! নাইস কম্বিনেশন!

সন্ধ্যার ইচ্ছে করল, মাটি ফাঁক হয়ে যাক, সে ভেতরে ঢুকে যাক। কি বে'হা'য়া লোক! আকাশ সন্ধ্যার দিকে এগোলে সন্ধ্যা এবার আকাশ বুঝে ওঠার আগেই পাশ কাটিয়ে এক দৌড় দেয়। আকাশ সাথে সাথে পিছু ফিরল। সন্ধ্যাকে ধরতে চাইলে ওড়না খুলে হাতে চলে আসে। সন্ধ্যা ভীত হয়। কিন্তু থামলো না। তার বোঝা হয়ে গেছে এই লোক চরম লেভেলের অ'স'ভ্য। আকাশ সন্ধ্যার ভেজা ওড়নার দিকে চেয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,,

- যাহ! কথা শেষ না করতে দিয়েই পালালো!

ভাবনার মাঝেই আকাশের বুকে চারটে ইটের টুকটো এসে লাগে। আকাশ সামনে তাকালে দেখল সন্ধ্যা এদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে দেখেই আবার দৌড় দিয়েছে। আকাশ সন্ধ্যার ভেজা ওড়না ডান হাতে পেঁচায় আর দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

- বে'য়া'দ'ব মেয়ে! তোমার খবর করব আমি, ওয়েট!

সন্ধ্যা জোরে জোরে দৌড়ায়। বে'হা'য়া লোক তাকে নিয়ে কি বাজে বাজে কথা বলছিল, সে চুপচাপ হজম করবে না-কি! তখন পানিতে ছিল বলে সব মেনেছিল। সন্ধ্যা এক দৌড়ে তার ঘরে এসে থামে। দ্রুত ঘরের দরজা আটকে হাঁপায়। এরপর তার একটি কালো জামা, পায়জামা, ওড়না নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। সব কালো পরবে সে। যেন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেও তার কিচ্ছু দেখতে না পায়৷ 
.
.
.
সৌম্য রাতে তার এক ফ্রেন্ড এর বাসায় ছিল। এরপর সকাল সকাল ঢাকার বাসে উঠে সিলেট চলে আসে। বাস থেকে মৌলভীবাজার নামে। পকেট থেকে ফোন বের করে ঘড়ি দেখল, দুপুর ৩ টা। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। পেটে ক্ষুধা। রাস্তার পাশে একটি দোকানে গিয়ে পাঁচ টাকার একটি রুটি সাথে একটি কলা কিনে। এরপর দোকানের সামনে বসার জায়গা পেয়ে একসাইডে বসে সৌম্য। রুটিতে এক কা'ম'ড় দিয়ে পাশে তাকালে দেখল একটি কু'কু'র চেয়ে আছে। সৌম্য কু'কু'র টির দিকে চেয়ে রুটির টুকরোটুকু চিবায়। রুটিতে দ্বিতীয় কা'ম'ড় দিতে গিয়ে কি যেন ভেবে তার মুখের সামনে থেকে সরিয়ে নেয় রুটি। এরপর কু'কু'র টির মুখের সামনে রুটি ধরলে কু'কু'র ছো মে'রে নেয় রুটি। সৌম্য হেসে ফেলল। হাতের কলাটি কু'কু'রের সামনে রেখে আবার-ও দোকান থেকে রুটি, কলা কিনে খেতে আরম্ভ করে। সৌম্য খেয়াল করল কু'কু'র টি তার পা ঘেঁষে বসে আরামসে খাচ্ছে। সৌম্য তার খাবার টুকু শেষ করে একটি হাফ লিটারের পানির বোতল কিনে, দোকানদারকে টাকা পরিশোধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সৌম্য'র ডান পাশে কু'কু'র টি হাঁটে। 

হঠাৎ-ই সৌম্য'র বাম পাশে একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
- আসসালামু-আলাইকুম ভাইয়া!

সৌম্য ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকালো। সালাম এর উত্তর নিয়ে আবারও সামনে তাকায়। মেয়েটি মৃদু হেসে বলে,
- আপনি কোথা থেকে আসছেন?

সৌম্য গম্ভীর গলায় বলে,
- সালাম এর উত্তর দেয়া ওয়াজিব, তাই দিয়েছি। 

মেয়েটি বুঝল, সৌম্য তার সাথে কথা বলতে চায় না, এজন্য এভাবে বলছে। বিশ বছরের ফর্সা, গোলগাল মেয়েটি মৃদু হেসে বলে,
- আচ্ছা শুধু এটা বলুন, আপনি কু'কু'র টিকে আপনার মুখের খাবার দিয়ে দিলেন কেন?

সৌম্য কু'কু'রটির দিয়ে তাকিয়ে বলে,
- ও ক্ষুধার্ত ছিল।

- রাস্তায় তো আরও কত অভুক্ত কু'কু'র আছে। সবাইকে দিলেন না তো?

- সামর্থ্য থাকলে দিতাম।

মেয়েটি অবাক হয়ে একটু হাসলো। আবারও বলতে নেয়,
- আপনি.....

সৌম্য বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
- আমি বিরক্ত হচ্ছি। আপনি আপনার রাস্তা দেখুন।

সৌম্য'র কথায় মেয়েটি দাঁড়িয়ে যায়। তার মনে আহামরি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না। তবে একটুখানি অপমানিতবোধ করেছে, এজন্য-ই দাঁড়িয়ে পড়েছে। 
সৌম্য মেয়েটির দিকে একবার-ও তাকালো না। সে তার মতো এগিয়ে গিয়ে একটি সিএনজিতে উঠে পড়ে 'ভানুগাছ' গ্রামের উদ্দেশ্যে। প্রতিজনের ভাড়া ১০০ টাকা। সৌম্য সিএনজিতে উঠে বসলে দেখল কু'কু'রটি তার দিকে চেয়ে ঘেউঘেউ করছে। সৌম্য মৃদু হাসলো। সিএনজি ছেড়ে দিলে কু'কু'রটি পিছু পিছু দৌড়ায়। সৌম্য আয়নায় তাকিয়ে দেখল। সিএনজির স্পিড বাড়লে একসময় কু'কু'র টি মিলিয়ে গেল। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 
.
প্রায় ২ ঘণ্টা পর সৌম্য ভানুগাছ গ্রামে এসে পৌঁছায়। কিছু চকলেট, দু'টো চিপস্ কিনে তার কাঙ্ক্ষিত জায়গার উদ্দেশ্যে এগোয়। মিনিট দশ হাঁটলে একটি বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায়। বাড়িটি কাঠ ও বাঁশের তৈরী। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, ভেতর থেকে বেরিয়ে উঠানে এসে সৌম্যকে দেখে অবাক হয়। এগিয়ে এসে সৌম্য'কে জড়িয়ে ধরে বলে,

- তুমি হঠাৎ? এভাবে না বলে কয়ে আসলে যে? বলে আসবে না?

সৌম্য মৃদু হেসে সালাম দিয়ে বলল,
- এমনি-ই চলে এলাম। 

ভদ্রলোক সৌম্যকে টেনে নিয়ে গিয়ে উঠানে পাতা চেয়ারে বসতে দিয়ে ডাকলেন,
- কই গো সিজান এর আম্মা, আসো দেখে যাও কে আসছে!

সৌম্য হেসে বলে,
- মামা ব্যস্ত হবেন না। সিজান কই?

বলতে বলতে পাঁচ বছরের একটি বাচ্চা দৌড়ে এসে সৌম্য'র পা জাপ্টে ধরে বলে,
- বাইয়া তুমি আসচ?

সৌম্য সিজান কে কোলে নিয়ে হাতের চিপস দেয়, পকেট থেকে চকলেট বের করে হাতে দেয়। বাচ্চাটি খুশি হয়ে সৌম্য'র গলা জড়িয়ে ধরে। সৌম্য'র মামা বলেন,
- সন্ধ্যা কেমন আছে? ওকে আনলে না কেন?

সৌম্য'র মুখ মলিন হয়। মৃদুস্বরে বলে,
- ভালো আছে মামা। আনবো সময় করে। আমি কিছু কাজে এসেছি। এক সপ্তাহ'র মতো থাকবো। আপনার সাহায্য লাগবে।

সিজান এর বাবা সৌম্য'র কাঁধে হাত রেখে বলে,
- এক সপ্তাহ থাকলে আমি ধন্য হবো। কখনো তো এসে একদিন-ও থাকোনি। ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর তোমার সব কথা শুনবো।

সৌম্য মৃদু হাসলো। র'ক্তরে সম্পর্ক নেই এদের সাথে, অথচ কত আপন ভাবে তাদের। 
ভেতর থেকে সৌম্য'র মামি এগিয়ে এসে বলে,
- কেমন আছো বাবা?

সৌম্য তার মামির সাথে টুকটাক কথা বললো। সিজানকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। সৌম্য'র মামা ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হতে বললে সৌম্য ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, মামার ডাকে আবার-ও পিছু ফিরে তাকায়। ভদ্রলোক তার মেয়েকে দেখিয়ে বলে,
- সৌম্য? এটা আমার বড় মেয়ে সৃজা। তুমি এর আগে আসলে ও কোনো না কোনো সময় বাড়ি থাকতো না। এবার দেখা হয়ে গেল।

সৌম্য মেয়েটির দিকে তাকায়। ঘণ্টা দুই আগে রাস্তায় যে মেয়েটির উপর বিরক্ত হয়েছিল সৌম্য, এটা সেই মেয়ে। যদিও মনে মনে একটু অবাক হয়েছে সৌম্য, তবে উপর থেকে স্বাভাবিক। কিন্তু মেয়েটি অবাক হয়ে বলে,
- বাবা, এই ছেলে-ই তোমার সেই বান্ধীর ছেলে সৌম্য?

সৃজার বাবা মৃদু হেসে বলে,
- হ্যাঁ মা।

সৃজা ভাবলো সৌম্য রাস্তায় ভালো করে কথা না বললেও এখন চিনতে পেরে ভালো করে কথা বলবে। কিন্তু না, সৌম্য সৌজন্যমূলক সৃজাকে সালাম দিয়ে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে-ই ভেতরে চলে গেল। সৃজা তব্দা খেয়ে চেয়ে রইল। বিড়বিড় করল,
- কি অ্যাটিটিউট মাইরি!
____________________________

ইরা সারাদিন সৌম্য'র খোঁজ করে সন্ধ্যার পর পর বাসায় ফিরেছে। বাসায় ফেরার কারণ আছে। তার বাবা চুপ করে বসে থাকার মানুষ নয়। তাকে ছেড়ে দিয়ে রেখেছে মানেই ঘাবলা আছে। অর্থাৎ ইরাকে বন্দী করার প্রয়োজন নেই। এজন্য-ই ইরা স্বাধীনভাবে আজ ঘুরে সৌম্য'কে খুঁজতে পেরেছে। কিন্তু সৌম্য'র টিকিটি-ও এই শহরে নেই। ইরা বাড়ির কলিংবেল বাজালে তার মা এসে দরজা খুলে দেয়। ইরাকে দেখে অবাক হয়ে বলে,

- কাল থেকে কোথায় ছিলি মা?

ইরা ভেতরে যেতে যেতে বলে,
- হোস্টেলে। 
এরপর ডায়নিং এ দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকে,
- বাবা? বাবা? বাবা?

ইরার মা কিছু বলার আগে দরজা থেকে ইশতিয়াক আহমেদ এগিয়ে এসে বলে,
- এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে যে?

ইর তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
- সৌম্য কোথায়?

ইশতিয়াক আহমেদ মৃদু হেসে বলে,
- সেটা কে? 

ইর চিল্লিয়ে বলে, 
- একদম নাটক করবে না আমার সাথে। বলো সৌম্য কোথায়?

ইশতিয়াক আহমেদ বিরক্ত হয়। এতো শান্তশিষ্ট বউ বিয়ে করে কি হয়েছে। পেট থেকে বের হয়েছে এক ধানিলঙ্কা মেয়ে। উল্টে তিনি-ও রে'গে বলে,

- তুমি রিয়াদকে মে'রে'ছিলে? আজ ও ম'রে গেলে কি হতো?

ইরা ভ্রু কুঁচকে বলে,
- ও এখনো ম'রেনি?

ইরার বাবা ইরার গালে থা'প্প'ড় মেরে দেয়। মেয়ের উদ্ধতস্বভাব নিতে পারেন না তিনি। ইরার মা দৌড়ে এসে ইরাকে আগলে নিয়ে ভেজা গলায় বলে,
- আপনি আমার মেয়েটাকে এভাবে মা'রেন কেন? ও বড় হয়েছে না?

ইরার বাবা রে'গে বলে,
- মা'র খাওয়ার মতো কাজ করলে মা'র খাবে৷ ও কোন সাহসে রিয়াদ এর গায়ে হাত দিয়েছে? মেয়েকে এসব কি শিক্ষা দিয়েছ? 

ইরার চোখের কোণে পানি। মায়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,

- ভাগ্যিস আমি তোমার মা, বাবা অথবা বড় ভাই বা বড় বোন নয়। নয়তো তোমার মতো অ'মানুষদের সিধে করার জন্য এই ইরা একাই যথেষ্ট। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমার মা আমায় বড়দের সম্মান করতে শিখিয়েছে তাই আজ মেয়ে হয়ে বাবাকে সঠিক শিক্ষা টা দিতে পারছি না।

কথাটা বলে তার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে,
- যত রিয়াদকে আমার কাছে পাঠাবে সবগুলোর অবস্থা এরকম-ই হবে। আর আমার সৌম্যকে আমি ঠিক খুঁজে বের করব। 

ইয়তিয়াক আহমেদ বোবা চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে রইল। মেয়েটা এতো তেজ পায় কোথায় সে ভেবে পায় না। 
______________________

আকাশ অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে। সিঁড়ির দিকে যেতে গিয়ে-ও পিছিয়ে আসলো। ডানদিকে ঘাড় বাঁকালে দেখল সন্ধ্যা এদিক ফিরে ঘুমিয়ে আছে। দরজাটা একদম খোলা। আকাশ মোড় ঘুরিয়ে এগিয়ে গেল। এইভাবে দরজা খুলে কে ঘুমায়! বিরক্ত হলো আকাশ। 
ঘরের ভেতর প্রবেশ করে এগিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার মাথার কাছে দাঁড়ায়। 

সন্ধ্যার পরনে কালো জামা, মাথায় ওড়না টানা। ডান কাত হয়ে গুটিশুটি মে'রে ঘুমিয়ে আছে। আকাশ হাতঘড়িতে সময় দেখল। রাত ৮ টা। অসময়ে কেউ ঘুমায়! ঘুমিয়েছে তো ভালোই ভদ্রভাবে! বাইরে বেরোয় অভদ্রভাবে। সন্ধ্যার বাম হাত গালের নিচে রাখা। ডান হাত বিছানা থেকে খানিকটা ঝুলে আছে। হাতের মুঠোয় কিছু ধরে রাখা। আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করল, জিনিসটা কি! গতকালকের নুপুর বুঝতে পেরে আকাশের চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে। 
তার মনে পড়ল, সন্ধ্যা লিখে বলেছিল, এটা তার ভাই তাকে দিয়েছে। আকাশের আরেকটি কথা মনে পড়ে, আকাশ যখন কক্সবাজার ছিল, তখন সন্ধ্যা একটি কাগজে লিখেছিল তার ভাইকে ভালোবসে, এরপর সেই কাগজ দেয়ালে লাগিয়েছিল। আকাশ অবাক হয়, মেয়েটি তার ভাইকে একটু বেশি-ই ভালোবাসে হয়তো। কিন্তু এর ভাই এর কাছে আসে না কেন? প্রশ্নগুলো নিয়ে ঘাটলো না।

আকাশ সামান্য ঝুঁকে সন্ধ্যার হাতের মুঠো থেকে নুপুরটি নিতে চায়, কিন্তু সন্ধ্যার হাতের মুঠো বেশ শক্ত। আকাশ ভ্রু কোঁচকায়। এই মেয়ের প্রবলেম কি? ঘুমের ঘোরে-ও ঝাঁঝ দেখানো লাগবে? ইচ্ছে করছে ঠাস করে কানের গোড়ায় একটা থা'প্প'ড় মে'রে হাতের মুঠো খুলতে। বিরক্ত হয়ে নুপুরের দু'খন্ড ধরে জোরে টান দেয়। সন্ধ্যা ঘুমের ঘোরে চোখমুুখ কোঁচকায়। মুখাবয়বে ব্য'থাতুর চিহ্ন ফুটে ওঠে। আকাশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বিড়বিড়িয়ে বলে,

- বলেছিলাম, দেখা হলে সালাম দিবে। আর এ পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। 

সন্ধ্যা আবার-ও গুটিশুটি মে'রে ঘুমিয়ে গেল। আকাশ দ্বিখন্ডিত নুপুরটি প্যান্টের ডান পকেটে রেখে,  ডান হাত পকেটে-ই ঢুকিয়ে রাখলো। বা হাতে ব্ল্যাক শার্টের দু'টো বোতাম খুলল। এটুকু সময়ে ঘেমে যাওয়ার কারণ বুঝলো না। ঘর থেকে বেরিয়ে, বা হাতে দরজা টেনে শব্দ করে লাগিয়ে দেয়। গায়ের যত শক্তি ছিল সব শক্তি যেন ঢেলে দিয়েছে। দরজা খুলে রাখার সব রা'গ এই দরজার উপর বোধয় ঝেড়ে দিল। অনেক জোরে শব্দ হয়েছে। সন্ধ্যা ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসে। 
এদিকে আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে বলে,

- কিসের শব্দ হলো? 

আকাশকে বাইরের দিকে যেতে দেখে বলে,
- কখন আসলে আবার কোথায় যাচ্ছো?

আকাশ মৃদুস্বরে বলে,
- কাজ আছে।

আসমানী নওয়ান আশেপাশে তাকালো। বুঝলো না কিসের শব্দ হলো। কিছু বুঝতে না পেরে তার ঘরে চলে যায়। 
সন্ধ্যা বিছানা থেকে নেমে আশেপাশে ভীত চোখে তাকায়। মূলত শব্দের উৎস খুঁজতে চাইছে মেয়েটা। গতকাল রাতে অসময়ে ভেজায় আজ সারাদিন মাথাটা ভার লাগছিল, তাই কখন ঘুমিয়েছিল, বুঝতেই পারেনি। 
হঠাৎ মনে পড়ল নুপুরের কথা। বাম পা বাড়িয়ে দেখল নুপুর আছে, কিন্তু ডান পায়ের ছেঁড়া নুপুর তার হাতে ছিল, নেই কেন? সন্ধ্যা দ্রুত বিছানার উপর হাতায় পুরো বিছানা খোঁজে কোথাও পায় না। মেঝেতে নেমে চারপাশে খোঁজে। কোথাও পায় না। সন্ধ্যার চোখের কোণে পানি জমে। ভাইয়ার দেয়া নুপুর ছিঁড়ে গেল, তবুও সে সেটি নিয়ে-ই ছিল। সেটাও হারিয়ে গেল! সন্ধ্যা বিছানার উপর দু'হাত রেখে, তার উপর মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। সৌম্য ভাইয়া-ও হারিয়ে গেছে, তার দেয়া জিনিস-ও হারিয়ে যাচ্ছে! 
.
.
আকাশ নুপুরটি একটি স্বর্ণকারের দোকানে নিয়ে যায়। ৩০ মিনিট এর মধ্যে যেন ঠিক করে দেয়া হয়, যা পেমেন্ট চাইবে, দেয়া হবে। কিন্তু দ্রুত দিতে হবে। দোকানওয়ালা আকাশের কথা মেনে তাদের কাজ করছে। আকাশ এক সাইডে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রোল করছে। হঠাৎ আনিকা এসে আকাশের হাত ধরে বলে,

- দোস্ত! তুই এখানে? 

আকাশ আনিকাকে দেখল। কিন্তু তার হাত ধরায় মে'জা'জ খারাপ হলো। একে হাজারদিন বলা হয়েছে ঘেঁষবি না। কিন্তু এটা এর স্বভাব থেকে বের হয় না। আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

- হাত ছাড়বি না-কি জুতার বারি খাবি? 

আনিকা দ্রুত আকাশের হাত ছেড়ে বলে,
- ওহ, স্যরি স্যরি! মনে থাকে না আমার। এতো ঢং পারিস বাবা তুই! কয়দিন পর তো বউ হাত না ধরলে এর চেয়ে-ও বেশি চেতবি।

আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
- বউ আর তুই এক না-কি? বউ আরও অনেককিছু ধরতে পারে। তুই আজাইরা কথা বাদ দিয়ে বিদায় হো। 

আনিকা চোখ ছোট ছোট করে বলে,
- বুঝলাম না, তুই তো আমাদের বাতাস বাবু নয়। সত্যি করে বল, তুই আমার বন্ধুকে কোথায় লুকিয়ে রেখে এসেছিস? মনে হচ্ছে এটা কোনো প্রেমিক জ্বিন!

দোকানওয়ালা মেরামত করা নুপুরটি আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিলে আকাশের আগে আনিকা ছো মে'রে নিয়ে নেয়। আকাশ রে'গে বলে,
- আনিকা দে।

আনিকা আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
- তুই তো বউ মানিস না। তাহলে এটা কার? মনে হচ্ছে বউ মানছিস। স্বীকার কর, নয়তো পাবি না এটা।

আকাশ বিরক্ত হয়ে বলে,
- কবে বললাম বউ মানি? এসব আমার সাথে যায় না। মে'জা'জ খারাপ করাস না, নুপুর দে। 

আনিকা কিছু বলতে গেলে তার মায়ের ডাকে আসছি বলে আকাশকে নুপুর দিয়ে বলে,
- বোনের বিয়ের শপিং-এ এসেছি। তাই বেঁচে গেলি। কয়েকদিন পর তোদের বাড়ি গিয়ে রহস্য উদ্ঘাটন করব, দাঁড়া। 

আকাশ আনিকার কথা পাত্তা দিল না। নুপুরটি পকেটে রেখে বিল মিটিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। 
.
.
আকাশ বাড়ি ফিরল। হাতঘড়িতে একবার সময় দেখল ৯টা ২০। আকাশ সন্ধ্যার ঘরের দিকে তাকালে দেখল আবার-ও দরজা পুরো খোলা। অরুণ সোফায় বসা। মে'জা'জ খারাপ হলো। এই মেয়ের প্রবলেম কি? দরজা হা করে রাখে কেন? মনে হচ্ছে একে একটা শিক্ষা দিতে হবে। বড় বড় পা ফেলে সন্ধ্যার ঘরে প্রবেশ করলে অবাক হয়, ঘরে তো কেউ নেই। বেলকনির জিরো লাইট জ্বলছে, কি যেন ভেবে আকাশ বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। 

বাদিকে তাকালে দেখল সন্ধ্যা দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসেছে। দু'হাঁটু ভাঁজ করে দু'হাতে দু'পা জড়িয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে। থেকে থেকে শরীর কেঁপে উঠছে। আকাশ বুঝতে পারলো, মেয়েটি কাঁদছে। আকাশ সন্ধ্যার সামনে ডান হাঁটু একটু উঁচু রেখে বাম পা সামান্য নিচু করে রেখে বসে। সন্ধ্যার ফোঁপানোর আওয়াজ পায়। আকাশ তার ডান পকেট থেকে নুপুর বের করে ডান হাতে নুপুরটি সন্ধ্যার সামনে ঝুলিয়ে মৃদুস্বরে বলে,

- এটার জন্য কাঁদছ?

আকাশের গলা পেয়ে সন্ধ্যা সাথে সাথে মাথা উঁচু করে তাকায়। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকালো। সন্ধ্যার চোখমুখ ভ'য়ং'ক'র লাল। কতক্ষণ যে কেঁদেছে আল্লাহ জানে আর সন্ধ্যা জানে। সন্ধ্যা আকাশের হাতে তার নুপুর দেখে অবাক হয়ে তাকায়। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়, তার দ্বিখণ্ডিত নুপুর জোড়া লাগনো দেখতে পেয়ে। সন্ধ্যা অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ গম্ভীর চোখে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ ধমকে বলে,

- কাঁদছিলে কেন ইডিয়ট?

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা - ৩৪৫০
সকলে গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন অবশ্যই।]
 

Loading spinner

Reply
Page 1 / 2
Share:

Loading spinner