গল্প: আপনি আমার ভীষ...
 
Notifications
Clear all

গল্প: আপনি আমার ভীষণ কাছের কেউ (লেখনিতে:সুমাইয়া তুলি)

Page 2 / 2

Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

Part:05

 

 

 

 

বহমান সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না।

মাঝে কেটে গেছে তিনটে দিন। এই তিনদিনে লিলি সাদিদের মুখোমুখি হয়েছে হাতেগোনা কয়েকবার মাত্র। সেদিনের ঘটনাটিও সে আর আয়েশা বেগমকে জানায়নি।

 

আজকের সন্ধ্যাটা লিলির জন্য যেন একটু বেশিই গুমোট। না, বাইরের আকাশে কোনো মেঘ জমেনি; তবু ঘরের ভেতরের আবহাওয়ায় যেন এক অদৃশ্য গুমোট ভাব জমে উঠেছে। কারণ আজ আয়েশা বেগম ফিরে যাচ্ছেন রাজশাহী। যেহেতু সাদিদ শুধু ঢাকার ব্যবসাগুলোই সামলায়, তাই রাজশাহীসহ পরিবারের অন্যান্য ব্যবসার দায়িত্ব মূলত থাকে আয়েশা বেগমের কাঁধেই। তার ওপর এখন আবার সাদিদ নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে। আশা করা যায়, এই ব্যস্ততার মাঝেও সে অন্তত ব্যবসার দায়িত্ব থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেবে না এতটুকু ভরসা তো করাই যায়।

 

কিন্তু আয়েশা বেগমের এই চলে যাওয়া লিলি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তার কণ্ঠে অবুঝ শিশুর আবদারের সুর ভেসে ওঠে। সে আকুল হয়ে বলে ওঠে,

—“আমি আপনার সাথে যেতে চাই, শাশুড়ি আম্মু।”

 

বারবার একই কথা শুনে বিরক্ত হয়ে আয়েশা বেগম গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,

—“দেখো মেয়ে, আর একবার যদি তুমি এই বাড়ি থেকে যাওয়ার কথা বলো, তাহলে সংসার আর পড়াশোনা দুটোই হারাবে।

আমি জানি, তুমি হয়তো ওকে ভয় পাও। কিন্তু ভয় পেয়ে দূরে সরে গেলে সবই হারাবে। ওর বাহ্যিক রূপের আবরণের আড়ালে যে মানুষটা লুকিয়ে আছে, তাকে জানার চেষ্টা করো।”

 

তারপর বিদায়ের সেই আবেগঘন মুহূর্তে তিনি লিলিকে দিয়ে গেলেন একগুচ্ছ উপদেশ। এই অল্প কয়েকদিনেই আয়েশা বেগম বুঝে গেছেন লিলি চঞ্চল, প্রাণবন্ত এক মেয়ে। আর তার দৃঢ় বিশ্বাস, এই মেয়েটিলাই একদিন পারবে তার গাম্ভীর্যে মোড়া ছেলেটাকে সত্যিকারের সংসারী করে তুলতে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

 

আয়েশা বেগমের চলে যাওয়া লিলির মনে এক অদ্ভুত অপূর্ণ শূন্যতার জন্ম দিল। এই কয়েকদিনেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন তার আপনজনের মতো। আর তার থেকেও বড় কথা—এখন এই বিশাল বাড়িতে তাকে থাকতে হবে ওই খারুস, অসভ্য লোকটার সঙ্গেই।তবুও শাশুড়ির বলা কথাগুলো মনে করে লিলি মনে মনে এক দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল। এই স্বামী নামক আসামিকে সে একদিন জব্দ করেই ছাড়বে।

 

———

 

রান্না জিনিসটা লিলি ভালোই পারে। একপ্রকার শখের বসেই এটা শেখা তার। তবে এই শখ যে আজ এভাবে কাজে লেগে যাবে, তা কি আর বোকা লিলি জানত! শাশুড়ি না থাকায় আজ সাদিদের জন্য সে নিজেই রান্না করেছে। আয়েশা বেগম এই ক’দিনেই তাকে সাদিদের পছন্দসই খাবারগুলো রান্না করা শিখিয়ে দিয়েছেন। যদিও লিলির মতে ওগুলোকে ঠিক রান্না বলা যায় না। ঘাসপাতা সেদ্ধকে আবার রান্না বলে নাকি!

 

যাহোক, লিলি সেই “ঘাসপাতা” অর্থাৎ তেল-মশলা ছাড়া মিক্সড ভেজিটেবল কারি আর চিকেন স্যুপ । তবে ঠিক কেমন হয়েছে, তা সে বুঝতে পারছে না। নিজে চেখে দেখারও কোনো ইচ্ছে নেই তার। যদিও মনে মনে একটু ভয়ও কাজ করছে কিছু কম-বেশি হলে গোমড়া মুখোটা খাবে কি না সন্দেহ! বাহারি কাকাও আজ এখানে উপস্থিত নেই। থাকলে তাকে একটু টেস্ট করতে দেওয়া যেত।

 

বাহারি বাড়ির পেছনের তিন রুম বিশিষ্ট সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে থাকে। আগে এই বাড়িতে তার অগাধ আসা-যাওয়া থাকলেও লিলি আসার পর থেকে শুধুমাত্র প্রয়োজনেই সে এই তল্লাটে আসে। তা ছাড়া তাকে খুব একটা দেখা যায় না।

 

টেবিলে সাদিদের খাবার সাজিয়ে রেখে নিজে বসে পড়ল গরম গরম ভাত আর গলদা চিংড়ি ভুনা নিয়ে। এটা শাশুড়ি দুপুরে রান্না করে রেখে গিয়েছিলেন। আর চিংড়ি মাছ তো লিলির ভীষণ পছন্দের। নিজের খাওয়ার পাট চুকিয়ে লিলি বসে রইল তার অপ্রিয় খারুস মশাইয়ের জন্য।

 

তবে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও টের পায়নি। দরজা খোলার শব্দে যখন তার ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর ছুঁয়েছে। ঘুমঘুম চোখে লিলি তাকিয়ে দেখল—সাদিদ এসেছে। কিন্তু সে লিলিকে দেখেও না দেখার ভান করে সোজা ভেতরের দিকে চলে গেল। সাদিদের এই নির্লিপ্ত ভাব দেখে লিলি যেমন অবাক হলো, তেমনি রেগেও গেল। তাই তো আচমকাই চেঁচিয়ে উঠল সে। না হলে এমনিতে সে অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত-শিষ্ট মেয়ে।

—“খাবার খেয়ে যান।”

 

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকা সাদিদ থেমে গেল তার কথায়। কপালটা অজান্তেই কুঁচকে গেল। পেছন ফিরে তাকাল লিলির দিকে। তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে কিছুটা ভড়কে গেল লিলি, তবে বাইরে তা প্রকাশ করল না। পিটপিট করে তাকিয়ে রইল সাদিদের পানে। সাদিদ তাকে উপেক্ষা করে আবার এগিয়ে যেতে চাইলে লিলি আগের চেয়ে দ্বিগুণ জোরে বলে উঠল,

—“খাবাবাবার খেয়েয়েয়ে…”

 

—“শাট আপ, স্টুপিড!”

 

সাদিদের ধমক যেন গোটা ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। কেঁপে উঠল লিলি।

—“কি শুরু করেছ তুমি?”

 

পুনরায় তার গম্ভীর কণ্ঠে লিলি আবার কেঁপে উঠল। তার এই কাঁপাকাঁপি দেখে চরম বিরক্ত হলো সাদিদ।

—“মৃগী হয়েছে তোমার?”

 

লিলি অবাক হয়ে বলল,

—“তা কেন হবে?”

 

—“তাহলে এত কাঁপাকাঁপি করছ কেন, স্টুপিড?”

 

সাদিদের কথাকে অপমান হিসেবে নিয়ে সহসা মিলিটারিদের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল লিলি। বুকভরা শ্বাস নিয়ে আবার বলল,

—“খাবার খেয়ে যান।”

 

বিরক্ত সাদিদ গমগমে গলায় বলল,

—“তোমাকে ওয়ার্ন করিনি এমন বউগিরি দেখাবে না।”

 

মনে মনে সাদিদকে ভেংচি কাটল লিলি। এই খারুসকে বউগিরি দেখাতে তার বয়েই গেছে!

—“আমার কোনো ইচ্ছে নেই আপনাকে বউগিরি দেখানোর। আপনি খাবার খেয়ে যান।”

 

একই কথা বারবার শুনে ক্লান্ত সাদিদ আর ঝামেলা করতে চাইল না। তাই বলল,

—“খেয়ে এসেছি।”

 

—“এই এই, মিথ্যে কথা! আপনি আমার রান্না খাবেন না বলে এই কথা বলছেন, তাই না?”

 

—“বুঝেছ যখন, তাহলে এত বকবক করছ কেন?”

 

—“আমার কোনো শখ নেই আপনার সাথে কথা বলার। নেহাৎই শাশুড়ি আম্মু বলেছে তাই।”

 

সাদিদ তাকে ইগনোর করে চলে যেতে চাইল। সারাদিন এমনিতেই প্রচুর ধকল গেছে তার ওপর দিয়ে। এখন তার দরকার একটু বিশ্রাম। আর সেখানে এই মেয়ে বকবক করে তার মাথা খাচ্ছে। সাদিদকে চলে যেতে দেখে লিলি আবার বলে উঠল,

—“আপনি যদি না খান, তাহলে আমি মাইক লাগিয়ে বলে বেড়াব। আপনি আমাকে মেরেছেন! শাশুড়ি আম্মুকেও বলে দেব। সবাইকে বলে দেব!”

 

কিন্তু তার কথায় কোনো পাত্তা না দিয়ে হনহন করে নিজের কক্ষে চলে গেল সাদিদ। লিলির এবার সত্যিই তার ওপর অভিমান হলো। সে কত কষ্ট করে রান্না করল একটু খেলে কি এমন ক্ষতি হতো!

 

———

 

রাত কেটে নতুন দিনের আলো ফুটে উঠেছে। লিলি ফজরের নামাজ আদায় করার পর আর ঘুমোতে পারেনি। উত্তেজনায় তার চোখে ঘুমই আসেনি। আজ যে তার ভার্সিটিতে প্রথম দিন! তাই সকাল সকাল তৈরি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে সে। নিজের হাতেই বানিয়েছে রুটি আর সবজি। সকালে আর সাদিদের জন্য আলাদা করে রান্না করেনি সে। সবকিছু ঠিকঠাকই আছে তবে একটা সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আজ তাকে ভার্সিটিতে নিয়ে যাবে কে? শাশুড়ি আম্মুও তো নেই। আর রইল সাদিদ,সে কি আর লিলিকে নিয়ে যাবে!

 

ঠিক সেই সময় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল সাদিদ। পরনে ফর্মাল ড্রেস, হাতে রোলেক্সের ঘড়ি। চুলগুলো জেল দিয়ে সুন্দর করে সেট করা। সব মিলিয়ে একদম পারফেক্ট জেন্টলম্যান। না চাইতেও আড়চোখে কয়েকবার তার দিকে তাকাল লিলি। সাদিদ বরাবরের মতো লিলিকে এড়িয়ে গিয়ে চুপচাপ ডাইনিং টেবিলে বসে গম্ভীর গলায় ডাক দিল,

—“বাহারি কাকা!”

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাহারি কাকা ছুটে এলেন।

—“কি হইয়েছে সাদিদ বাবা?”

 

—“আমার ব্রেকফাস্ট কোথায়?”

 

—“হামি এক্ষুনি লিয়ে আসছি।”

 

এরই মধ্যে বাহারি কাকা এনে দিল অ্যাভোকাডো, সালাদ আর সবুজ রঙের জুস। কিসের জুস কে জানে। লিলি একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নাক সিঁটকালো, “এগুলো আবার কেউ খায় নাকি! একেবারে অখাদ্য! ছি!”

 

খাওয়া শেষ করে সাদিদ যখন উঠে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ লিলি বলে উঠল,

—“আজ আমার ভার্সিটির প্রথম দিন।”

 

সাদিদ ফিরে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

—“তো?”

 

ভীষণ রাগ হলো লিলির। তবুও নিজেকে শান্ত রেখে বলল,

—“আমাকে একটু পৌঁছে দেবেন?”

 

সাদিদ নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

—“ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি, সে তোমাকে পৌঁছে দেবে।”

 

লিলি ঝট করে বলে উঠল,

—“শাশুড়ি আম্মু কাল ফোন করে বলেছে আপনি যদি আমাকে না দিয়ে আসেন, তাহলে যেন তাকে বলে দিই। যাই, আগে শাশুড়ি আম্মুকে বলে আসি।”

 

এই বলে লিলি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করল। সাদিদ তার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বাই এনি চান্স, এই মেয়ে কি কাল রাত থেকেই তাকে ব্ল্যাকমেইল করছে? এদিকে লিলি আপন মনে তখনও বকবক করে যাচ্ছে,

—“ইসস! যদি ড্রাইভার গাড়ি চালানোর সময় এক্সিডেন্ট করে ফেলে! তাহলে আমার কি হবে? এত কম বয়সে আমি মরে গেলে পৃথিবীর কত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে—বুঝতে পারছেন বাহারি কাকা? থাক, আগে শাশুড়ি আম্মুকেই বলি।”

 

লিলির যুক্তিহীন কথায় বিরক্ত হলো সাদিদ। তর্ক করার মতো সময় বা ইচ্ছা—কোনোটাই আজ তার নেই। অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, তারপর আবার পার্টি অফিসেও যেতে হবে। তাই বিরক্ত হয়ে সামনে এগোতে এগোতে বিড়বিড় করে বলল,

—“ড্রামাকুইন! স্টুপিড একটা।”

 

এদিকে লিলি সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল,

—“কি বললেন? আমাকে সঙ্গে যেতে? আহা তার কি দরকার! আমি তো ড্রাইভারের সাথেই যেতে পারতাম। যাহোক, আপনি এতো করে যেহেতু বলছেন তাহলে নাহয় আপনার সাথেই যাই।”

 

চড়া গলায় কথাগুলো বলে সাদিদের পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করল লিলি। সাদিদ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তেই লিলি গিয়ে বসে পড়ল তার পাশের সিটে। কোনো কথা না বলে গাড়ি চালাতে শুরু করল সাদিদ। লিলি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে জানালার বাইরে চোখ ফেরাল। বাইরের যানজটভরা দৃশ্যটা আজ তার কাছে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

হঠাৎ সিগন্যাল এসে গাড়ি থেমে গেল। সাদিদের মুখে ফুটে উঠল বিরক্তির ছাপ। ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে পড়ল ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতির দিকে।

 

মেয়েটা ফুল চাইতেই ছেলেটা পাশের দোকান থেকে একগুচ্ছ ফুল কিনে এনে মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিল। চোখের সামনে এই দৃশ্যটা হঠাৎ করেই সাদিদ কে মনে করিয়ে দিল তার অতীতের এক স্মৃতিকে।

 

স্মৃতির পাতায়…

 

—“গোলাপি গোলাপ সৌন্দর্য, প্রশংসা ও বন্ধুত্বের প্রতীক। সাদা গোলাপ শুদ্ধতা, শান্তির প্রতীক। হলুদ গোলাপ বন্ধুত্বের প্রতীক।”

 

—“আর লাল?”

 

সাদিদের প্রশ্নে মেয়েটা হেসে বলল,

—“ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু আমার লাল গোলাপ পছন্দ নয়।”

 

সাদিদ মেয়েটার কথায় সামান্য হেসে ফুলের তোড়া থেকে লাল গোলাপগুলো সরিয়ে বলল,

—“এই জন্যই তুমি সবার থেকে ব্যাতিক্রম।”

 

থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে মেয়েটা বলল,

—“ব্যাতিক্রম জিনিস কিন্তু খুব সহজেই হারিয়ে যায়, কাইরান সাহেব।”

 

—“হারাতে চাইছো নাকি?”

 

মেয়েটা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তারপর বলল,

—“হারাব তো বটেই। তবে তার আগে আপনার মনের সব ভালোবাসা নিংড়ে নিয়ে যাব, যাতে এই হৃদয় আর কখনো অন্য কাউকে ভালোবাসতে না পারে।”

 

তীব্র হর্নের শব্দে ভেঙে গেল সাদিদের স্মৃতির ঘোর। সিগন্যাল ছাড়ার অনেকক্ষণ পরেও গাড়ি না চলায় পেছনের গাড়িগুলো হর্ন দিতে শুরু করেছে। সাদিদের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই দেখে লিলি পাশ থেকে বলল,

—“আপনি ঠিক আছেন?”

 

সাদিদ শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার গাড়ি চালু করল। লিলি চুপচাপ বসে রইল। সাদিদের চোখে লুকিয়ে থাকা স্মৃতির ধারা সে দেখতে পেল না। এক অজানা অথবা জানা যাত্রা পথে, দুই ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ পাশাপাশি বসা সত্ত্বেও কত দূরত্বই না তাদের মাঝে বিদ্যমান!

 

 

Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago

Part:06

 

 

 

 

 

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে থামতেই লিলি ধীরে দরজাটা খুলে নেমে পড়ল। সকালের মিষ্টি আলোয় তার মুখে ফুটে উঠল একটুখানি কোমল হাসি। কৃতজ্ঞতার স্বরে সাদিদকে বলল,

— “ধন্যবাদ।”

 

কিন্তু গোমড়া মুখে বসে থাকা সাদিদ কোনো উত্তর দিল না। যেন কথাগুলো তার কানে পৌঁছাই নি। মুহূর্তের মধ্যেই সে গাড়িটা ঘুরিয়ে দ্রুত চলে গেল। ধুলো উড়িয়ে দূরে মিলিয়ে যাওয়া সেই গাড়ির দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল লিলি। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল — এই মানুষটার মুখ থেকে কথা আশা করাটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় বোকামি।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা রাখতেই লিলির চোখে ভেসে উঠল এক রঙিন, প্রাণবন্ত পৃথিবী। চারদিকে তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে আছে। কোথাও ছাত্রছাত্রীরা গাছের ছায়ায় বসে গল্প করছে, কোথাও হাসির রোল উঠছে আড্ডার ফাঁকে। কেউ তাড়াহুড়ো করে ক্লাসে ছুটছে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে হাঁটছে। এই প্রাণবন্ত পরিবেশ মুহূর্তেই লিলির মনকে অদ্ভুতভাবে উজ্জীবিত করে তুলল। এসব দেখতে দেখতে সে যখন ক্লাসরুমের দিকে এগোচ্ছিল,তখন হঠাৎই সামনে থেকে আসা একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে গেল।দুজনেই খানিকটা টলে উঠল। লিলি তড়িঘড়ি করে মেয়েটিকে বলল

— “সরি সরি।”

 

মেয়েটি হালকা হাসি দিয়ে বলল 

— “আরে ইটস ওকে।”

 

লিলি একটু অপ্রস্তুত হয়ে আবার বলল,

— “এগেইন সরি। আপনার লাগেনি তো?”

 

তার ‘আপনি’ সম্বোধন শুনে মেয়েটি হঠাৎ হেসে উঠল। চোখে দুষ্টুমি ঝিলিক দিয়ে বলল,

— “আমরা সম্ভবত সেম ব্যাচ। তাহলে তুমি আমায় আপনি করে বলছো কেন?”

 

লিলি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— “আসলে…”

 

মেয়েটি হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে হেসে বলল,

— “আরে থাক থাক, সমস্যা নেই। বাই দা চৌরাস্তা, আমি রিমা। তুমি?”

 

রিমার প্রাণখোলা কণ্ঠে লিলির মনটা হঠাৎই হালকা হয়ে গেল। সেও মৃদু হেসে বলল 

— “লিলি।”

 

ক্লাস চলাকালীনই তাদের আলাপ ধীরে ধীরে আরও গভীর হতে লাগল। কথা বলতে বলতে বোঝা গেল, দুজনের মন-মানসিকতার মধ্যেও বেশ মিল রয়েছে। খুব অল্প সময়েই একটা সহজ বন্ধুত্ব গড়ে উঠল তাদের মধ্যে। ক্লাস শেষ হওয়ার পর রিমা লিলিকে ক্যান্টিনে নিয়ে গেল। ক্যান্টিনের কোণার একটা টেবিলে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গল্পে মেতে উঠল তারা।

 

রিমা হঠাৎ বলল,

— “দেখ, আমার কিন্তু তুমি-টুমি পোষাবে না। আমি তোকে ‘তুই’ করেই বলব।”

 

লিলি হেসে মাথা নাড়ল। তার আপত্তি নেই।

রিমা আবার জিজ্ঞেস করল,

— “তোর বাড়ি কোথায়, লিলি?”

 

প্রশ্নটা শুনে লিলি চুপ হয়ে গেল। তারপর ধীরে বলল,

— “আমি এখন আমার... শ্বশুরবাড়িতে থাকি।”

 

রিমা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল,

— “কি! তোর বিয়ে হয়ে গেছে? কবে? কীভাবে? বল বল, সব বল!”

 

— “হ্যাঁ, বিয়ে করেছি। একটু জটিল গল্প। পরে নাহ বলব।”

 

রিমা চোখ টিপে মুচকি হেসে বলল,

— “ঠিক আছে, কিন্তু পুরো গল্প শুনতে চাই, কেমন? তা, তোর হাজব্যান্ড কেমন?”

 

লিলির ঠোঁটে তখনও হাসি লেগে আছে, কিন্তু মনে মনে সাদিদের পিন্ডি চটকিয়ে বলল,

'কেমন আবার গোমড়া মুখো, খারুস, অসভ্য, হনুমান একটা।'

 

তবে এসব কথা কি আর নতুন বন্ধুকে বলা যায়? তাই নিজের মনের কথাগুলো গোপন রেখে সে শান্ত স্বরে বলল,

— “অনেক ভালো। আমি হলফ করে বলতে পারি, তার মতো মানুষ এই পৃথিবীতে আর এক পিসও নেই।”

 

রিমা আর বেশি ঘাঁটাল না বিষয়টা। সেও হাসতে হাসতে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। 

 

———

 

নিজের অফিসকক্ষে বসে মনোযোগ দিয়ে কিছু ফাইলপত্র উল্টেপাল্টে দেখছে সাদিদ। বড় টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা নথিগুলোতে চোখ রাখলেও তার মন পুরোপুরি সেখানে নেই। আজ আবার অকারণে কিছু তিক্ত স্মৃতি মাথার ভেতর ভেসে উঠায় তার মেজাজটা ভালো নেই।

 

এমন সময় দরজায় হালকা নক শোনা গেল।সাদিদ সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল

—“কাম ইন,” 

 

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সেক্রেটারি বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল, 

—“স্যার, মোরশেদ দেওয়ান এসেছে। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।”

 

নামটা শুনতেই সাদিদের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। মোরশেদ দেওয়ান, লোকটার সঙ্গে তার একটা সাক্ষাৎ সত্যিই জরুরি ছিল—কিন্তু সেটা অফিসে নয়। আসন্ন নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সাদিদের ব্যবসায়িক প্রভাব আর মানুষের মধ্যে তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা মোরশেদের জন্য স্পষ্ট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও লোকটা নিজে থেকেই এখানে চলে এসেছে।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সাদিদ ঠান্ডা গলায় বলল,

—“পাঠিয়ে দাও।”

 

অল্পক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল একজন মাঝবয়সী পুরুষ। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। কৃষ্ণবর্ণ মুখ, কিন্তু চোখদুটো অদ্ভুতভাবে তীক্ষ্ণ, সবসময় হিসেব কষে চলা এক ধূর্ত দৃষ্টি। কক্ষে ঢুকেই লোকটা মুচকি হেসে বলল,

—“কেমন আছো, সাদিদ?”

 

সাদিদ চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত স্বরে উত্তর দিল 

— “ভালো। বলুন, কী ব্যাপার?”

 

মোরশেদ তার ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু প্রসারিত করল।

— “আরে, কী আর ব্যাপার হতে পারে বলো! তোমার সঙ্গে একটু দেখা করতে এলাম। হাজার হোক, আমরা তো এখন একই খেলায় নেমেছি। কেউ হাড়বো কেউ বা জিতব।”

 

সাদিদ ধীরে ঠোঁটে একটুখানি বাকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

—“আমি কোনো খেলা খেলতে আসিনি, মোরশেদ সাহেব। আর না হাড়তে শিখেছি।”

 

এই কথায় মোরশেদের মুখের হাসি এক ঝটকায় মিলিয়ে গেল। চোখে কড়া দৃষ্টি নিয়ে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— “দেখো, ছেলে। আমি ভদ্রভাবে বলছি নির্বাচন থেকে সরে যাও। তুমি ব্যবসায়ী মানুষ, ব্যবসা করো। এই রাজনীতি করে কী লাভ!”

 

কথাগুলো শেষ হতেই সাদিদ ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন স্পষ্ট রাগের ঝলক। তবু ঠোঁটে একটা স্থির হাসি রেখে সে বলল,

—“ হুমকি দিচ্ছেন, মোরশেদ সাহেব? তবে দুঃখজনকভাবে আমি ভয় পেলাম না। তাছাড়া… ব্যবসায়ী মানুষ কিন্তু ভালো রাজনীতি করতে পারে। কিছুদিন পরেই আপনি তার প্রমাণ পাবেন।”

 

এই স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান শুনে মোরশেদের মুখ লাল হয়ে উঠল রাগে। তিনি মূলত চেয়েছিলেন ভয় দেখিয়ে তথবা কথা বলে যেভাবেই হোক সাদিদ কে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে। তবে তা আর হলো কই। ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে থেমে বলল

—“কাজটা ভালো করলে না, সাদিদ।”

 

সাদিদ কোনো উত্তর দিল না। সে স্থির চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না মোরশেদ বেরিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হতেই ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। কিন্তু সাদিদের মাথার ভেতর তখন দ্রুত হিসেব কষা শুরু হয়েছে। সে খুব ভালো করেই জানে মোরশেদ দেওয়ান বসে থাকার মানুষ নয়। লোকটা নিশ্চয়ই আবার কোনো না কোনো গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করবে। কিছুক্ষণ ভেবে ফোনটা তুলে নিয়ে হাসিবকে কল করল। কল রিসিভ হতেই সাদিদ সংক্ষিপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল

—“কাজ হয়েছে?”

 

অপর পাশ থেকে হাসিবের গলা ভেসে এল,

—“হ্যাঁ ভাই, সবকয়টা কে ধরে নিয়ে এসেছি। গোডাউনে আছে।”

 

এই কথাটা শুনে সাদিদের ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটুখানি ক্রুর হাসি ফুটে উঠল।

—“ওদের খাতির-যত্ন কর। রাতে আসছি।”

 

—“ঠিক আছে ভাই।”

 

ফোন কেটে দিয়ে সাদিদ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কোটটা ঠিক করে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আজ গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিংয় আছে। আর ডিলটা অফিসের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। 

 

———

 

লিলির দিনটা মোটামুটি ভালোই কাটল। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ সবকিছুই তাকে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে রেখেছিল সারাদিন। কিন্তু ছুটি হওয়ার পর যখন সে গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, তখনই সেই ভালো লাগার আবেশে হঠাৎ ফাটল ধরল। চারদিকে তাকিয়ে বুঝল সাদিদ এখনো আসেনি। কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করল লিলি। নম্বরটা ডায়াল করবে ভেবেই হঠাৎ মনে পড়ল—সে তো সাদিদের ফোন নম্বরই জানে না! মুহূর্তেই তার মুখের ভাব বদলে গেল। যেই সামান্য টাকাটা নিয়ে বেরিয়েছিল, সেটাও তো ক্যান্টিনে আড্ডা দিতে দিতেই শেষ করে ফেলেছে।

 

তাহলে এখন সে বাড়ি যাবে কীভাবে? চারপাশে তাকিয়ে লিলি বুঝতে পারল, জায়গাটা দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে মুখর ছিল, এখন সেখানে কেবল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকজন মানুষ। চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না ভেবে লিলি ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল।

 

কিছুদূর এগোনোর পর হঠাৎ তার মনে হলো কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব দিল না। হয়তো কাকতালীয়ভাবেই কেউ একই পথে যাচ্ছে।

কিন্তু একটু পরে পিছনে তাকাতেই দেখল, দুটো ছেলে সত্যিই তার পিছু নিয়েছে। মনের ভেতর একটা ভয় নেমে এলো। তবু নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল লিলি। হাঁটার গতি একটু বাড়াল।

 

তবে ছেলেদুটোও দ্রুত পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল সে। হৃদপিণ্ড যেন বুকের ভেতর জোরে ধকধক করতে লাগল। একসময় আর নিজেকে সামলাতে না পেরে দৌড়ে উঠল লিলি। পেছনে তাকিয়ে দেখল—ছেলেদুটো তখনো তার পিছু নিয়েই ছুটছে।

 

দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ সামনে থাকা একজনের সঙ্গে জোরে ধাক্কা খেল সে। ভারসাম্য হারিয়ে সোজা মাটিতে পড়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে যাওয়া লিলিকে দেখে লোকটা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো।

— “ঠিক আছেন আপনি?”

 

লিলি তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল। জামায় লেগে থাকা ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে পিছনে তাকাল।আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেদুটো ততক্ষণে কোথাও নেই। যেন মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। লিলির দৃষ্টি অনুসরণ করে অচেনা লোকটাও সেই দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

— “ফলো করছিল?”

 

লিলি নীরবে মাথা নাড়ল। তারপর চোখ তুলে প্রথমবারের মতো ভালো করে তাকাল লোকটার দিকে। লোকটার উচ্চতা প্রায় সাদিদের সমান। সুঠাম গড়ন, প্রশস্ত কাঁধ। তবে তার গায়ের রঙটা অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল—একটু বিদেশিদের মতো। আবার পুরোপুরি বিদেশিও মনে হয় না। অদ্ভুতভাবে লোকটাকে খুব পরিচিত লাগল লিলির। কোথায় যেন আগে দেখেছে। কিন্তু যতই মনে করার চেষ্টা করুক, ঠিক কোথায় দেখেছে তা কিছুতেই মনে পড়ল না।

 

এদিকে লিলির কথা শুনে লোকটার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অজানা ক্রোধের ঝলক ফুটে উঠল। কিন্তু সে তা সঙ্গে সঙ্গে চাপা দিয়ে

শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

— “আপনি এই সময় এই রাস্তায় কী করছেন? সাধারণত এই সময় রাস্তাগুলো খুব ফাঁকা থাকে।”

 

লিলি একটু ইতস্তত করে বলল,

— “ওই... বাসায় যাচ্ছিলাম।”

 

— “একা একা? আসুন, আমি আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি। এই সময় রাস্তাটা নিরাপদ নয়।”

 

লিলি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।

— “না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি যেতে পারব।”

 

— “এই সময় কোনো গাড়ি পাবেন না। বাই দ্য ওয়ে… আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন?”

 

লিলি ভ্রু কুঁচকে একটু বুক চিতিয়ে বলল,

— “ভয় কেন পাব? আমি অনেক সাহসী।”

 

তার সেই বাচ্চাসুলভ ভঙ্গি দেখে লোকটার চোখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

— “তাহলে তো হলোই। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।”

 

লিলি কিছুক্ষণ চুপচাপ লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। চেহারা দেখে তাকে ভদ্রলোকই মনে হচ্ছে। তাছাড়া তার কাছে এখন কোনো টাকাও নেই, আর সাদিদও আসেনি তাকে নিতে। অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো। গাড়িতে উঠে বসতেই ঠিকানাটা বলল লিলি। খুব বেশি সময় লাগল না কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি এসে থামল সাদিদের বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নেমে লিলি ভদ্রভাবে বলল,

— “ধন্যবাদ।”

 

তারপর দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।

গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সেই মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লোকটা। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল,

 

—“Blueberry, my blueberry. You are still like before—sweet and soft, just like a blueberry. Finally, I found you, sweetheart. Now all that’s left is to keep you all to myself.”

 

———

 

রাত গভীর হয়ে এসেছে। শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিত্যক্ত গোডাউন। দীর্ঘদিনের অবহেলায় যার ভেতরটা ধুলোবালিতে ঢেকে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঠের বাক্স, মরিচা ধরা লোহার টুকরো। বহুদিন বন্ধ থাকার কারণে ভেতরে একটা ভ্যাপসা, দমবন্ধ করা গন্ধ জমে আছে।গোডাউনের এক কোণে তিনজন যুবক হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। তাদের মুখে ভয় আর ক্রোধ মিশে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।

 

গোডাউনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হাসিব। আগের আঘাত কাটিয়ে এখন সে মোটামুটি সুস্থ। তার পাশে আরও দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে লোহার রড, আরেকজনের হাতে পিস্তল। তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঠিক তখনই গোডাউনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সাদিদ। পরনে এখনো তার অফিসের সেই গেটআপ।

 

হাসিব এগিয়ে এসে বলল,

— “ভাই, এরাই সেদিন সেমিনারে গণ্ডগোল করেছিল। এরা মোরশেদের লোক। তবে বলছে, মোরশেদ নাকি এসবের মধ্যে ছিল না।”

 

সাদিদ ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বাঁধা অবস্থায় থাকা একজন যুবকের সামনে দাঁড়াল। ছেলেটির ঠোঁটের পাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ লেগে আছে।

 

অতপর শান্ত অথচ বরফশীতল বলল,

— “জানের ভয় নেই নাকি? বাহ… তোরা তো দেখছি ভীষণ সাহসী।”

 

ছেলেটি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

— “ভাই ছিল না এসবে।”

 

সাদিদ ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটিয়ে বলল,

— “ইমপ্রেসিভ। তোদের কে তো ভালোই ট্রেনিং দিয়েছে… মোরশেদ দেওয়ান।”

 

হাসিব পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— “ভাই, এরা বলছে মোরশেদ আপনার পরিবারের ওপর নজর রাখছে।”

 

এই কথাটা শুনে সাদিদের ভ্রু কুঁচকে উঠল। হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল বিচ্ছু মেয়েটার কথা। সকালে তাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে আসার পর আর খোঁজ নেওয়া হয়নি। তবে ড্রাইভারকে তো বলে দিয়েছিল মেয়েটাকে নিয়ে আসতে। তাই বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল সাদিদ। ঠিক তখনই হঠাৎ গোডাউনের ভেতর আরেকটা গলা ভেসে উঠল,

— “আমাকে ছাড়া ওদের মারিস নাআআআ! আমিও মারব রে পাগলা!”

 

কথাটা শুনে সাদিদের মুখে চরম হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। বাড়িতে একটা পাগল, বাইরে আরেকটা। মাঝখানে ফেসে গেছে সাদিদ।

ওই একটা গান আছে না,

 

🎶

বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা

হরেক রকম পাগল এসে মিলাইছে মেলা

বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা

 

এই মুহূর্তে ঠিক এই অবস্থাই সাদিদের জীবনের। বাড়ি হোক বা বাইরে চারপাশে শুধু পাগল আর পাগল। সুস্থ মানুষের দেখা পাওয়া যেন দিন দিন তার জন্য দুষ্কর হয়ে উঠছে। এদিকে হাসিব আরিফের কথা শুনে এগিয়ে এসে বলল,

— “কিন্তু ভাই, ধোলাইয়ের পর্ব তো শেষ।”

 

আরিফ নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চাপড়ে বলল,

— “না না না! এটা হতে পারে নাআআ! আমাকে ছাড়া তোরা এটা কী করে করতে পারলি, পাষণ্ড!”

 

সাদিদ এবার গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল,

— “আরিফ।”

 

আরিফ সঙ্গে সঙ্গে মেকি কান্নার ভান করে বলল,

— “সবসময় তুই এমন করিস। তোর সাথে আর কথা নেই, সাদি মামা।”

 

এদিকে হাসিব তাদের এই নাটকীয় দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে বলল,

—“এদেরকে কি ছেড়ে দেব, নাকি আরেকটু ‘খাতির’ করব ভাই?”

 

আরিফ তো খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলতে যাচ্ছিল—আরেকটু খাতির করি। কিন্তু তার আশায় মাটিচাপা দিয়ে সাদিদ শান্ত গলায় বলল,

— “ছেড়ে দে।”

 

তারপর বাঁধা ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

— “বলে দিস তোদের বসকে… যদি সে আমার পরিবারের দিকে নজর দেয়, তাহলে তার জন্য এই শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”

 

কথাটা বলেই সাদিদ ঘুরে দাঁড়াল। আরিফও তার সঙ্গে গোডাউন থেকে বেরিয়ে এল। গাড়ির কাছে এসে সাদিদ ড্রাইভিং সিটে বসতেই আরিফ তাড়াতাড়ি পাশের সিট দখল করে নিল। গাড়ি ছাড়ার আগ মুহূর্তে সে কিছুক্ষণ সাদিদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই বলল,

— “শুনেছি বিয়ে হলে মানুষের রূপ বাড়ে। এখনই তো দেখছি সেটা সত্যি কথা রে ভাই।”

 

সাদিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— “গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। একটু ঠেলা দে।”

 

আরিফ সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে নেমে পড়ল।

— “আরে এটা আবার কোনো কথা হলো! বিপদে তো বন্ধুই বন্ধুর কাজে আসে। নো টেনশন সাদি মামা। আমার শরীরে অনেক শক্তি জিমে যাওয়া শুরু করেছি না! এক ধাক্কাতেই গাড়ি উগান্ডা চলে যাবে।”

 

কিন্তু আরিফের সেই উগান্ডা পাঠানোর স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই চোখের পলকে সাদিদ দরজা বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল।

আরিফ হতভম্ব হয়ে প্রায় দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চিৎকার করে উঠল,

— “সাদিইইই! তুই বউয়ের জুতার বাড়ি খাবিইইই!”

 

তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

— “আল্লাহ! তোমার কাছে বিচার দিলাম। ওই নাকউঁচু সাদিরে যেন একদিন ওর বউ নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়!”

 

 

Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner