গল্প: আমি তার সন্ধ্...
 
Notifications
Clear all

গল্প: আমি তার সন্ধ্যামালতী(Author: DRM Shohag)

Page 1 / 2

Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago

গল্প: আমি তার সন্ধ্যামালতী

Authors:DRM Shohag

 

এখন  থেকে এইখানে বাকি পর্ব গুলো পোস্ট করা হবে, 

আর যাদে বাকি পর্ব গুলো পড়া হয়নি তাদের জন্য নিচে আগের সব গুলো পর্বের লিংক দেওয়া হয়েছে। 

গল্পের:Link

Loading spinner

Reply
5 Replies
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago
পর্ব:০৬
 

সন্ধ্যার সাথে আকাশের চোখাচোখি হয়। কেউ-ই কারো থেকে চোখ সরালো না। আকাশ সন্ধ্যার পানে দৃষ্টি রেখে সিগারেট ফুঁকছে। কপালে ভাঁজ। তার মাঝে কি চলছে একমাত্র সেই জানে। সিগারেটে আরও কয়েকবার টান দিয়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ায়। 
একদম তার সামনে আকাশকে দাঁড়াতে দেখে সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ক্লান্তির তোড়ে নুইয়ে পড়া সন্ধ্যার মুখটা দেখে। গম্ভীর গলায় বলে,

“দেখতে তো ইনোসেন্ট মেয়ের মতো লাগে। অথচ ভাইয়ের কথায় নেচে ভেতরে ভেতরে বে'য়া'দ'ব মেয়েতে রূপান্তর হয়েছ।”

সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ এটা কেন বলল সে বুঝল না। আকাশ সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া সন্ধ্যার মুখের উপর ছাড়ে। সন্ধ্যা চোখ বুজে নেয়। দ্রুত ঘাড় বাদিকে ঘুরিয়ে কেশে ওঠে। আকাশ ঠোঁট বাঁকালো। বা হাত প্যান্টের পকেটে রাখে। বলে,
“আগে লিপ্স নাড়িয়ে কথা বোঝনোর অভ্যাস ছিল?”

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। গলা অপারেশনের আগে সে আকাশকে ঠোঁট নাড়িয়ে অনেক কথা বোঝাতো। আকাশ কি সেটার কথা বলছে? সন্ধ্যাকে চুপ দেখে আকাশ বিরক্ত হয়। ধমকে বলে,
“কি প্রবলেম, চুপ কেন?”

সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। আকাশের রাগান্বিত মুখ দেখে ঢোক গিলল। ছোট করে বলে, “জ্বি।”

আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”

সন্ধ্যা অবাক হয়। আকাশ কি সত্যিই জানেনা কেন সে ঠোঁট নাড়াতো কাউকে তার মনের ভাব বোঝাতে? সন্ধ্যা মিনমিন করে বলে, “আমি কথা বলতে পারতাম না।”

আকাশের কপালে ভাঁজ পড়ে। উত্তরটা বোধয় মনমতো হয়নি। চোখেমুখে বিরক্তির আভা দেখা গেল। সন্ধ্যার চোখেমুখে অসহায়ত্ব। আকাশের এরকম অপরিচিতদের মতো আচরণ সে আর নিতে পারছে না। মেয়েটা সাহস করে বলে, 
“আপনি আমায় অস্বীকার করছেন কেন?”

আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। মুহূর্তেই বিরক্তিতে ভরা মুখাবয়বে রা'গের আভা দেখা যায়। ডান হাতের দু’আঙুল দ্বারা সিগারেটে দু'টো টোকা দিয়ে, সিগারেটের আগায় জমা ছাই ঝেড়ে ফেলে। চোখের পলকে সিগারেটের জ্ব'ল'ন্ত মাথা সন্ধ্যার বাম গালে চেপে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আবার মিথ্যে বলছিস?”

সন্ধ্যা মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। দ্রুত দু'পা পিছিয়ে যায়। গালটা জ্ব'ল'ছে। বা হাত তুলে গালে রাখল। বিস্ময় দৃষ্টি রাখে আকাশের পানে। আকাশ রে'গে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যার চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। আকাশের এরূপ আচরণ মেয়েটাকে ভীষণ বিধ্বস্ত করে দেয়। অথচ আকাশ কি নির্বিকারভাবে তার সাথে নি'ষ্ঠুর আচরণ করে!
আসমানী নওয়ান তার ঘরে গিয়েছেন৷ 
ডাইনিং-এ বসা লামিয়া সন্ধ্যার আওয়াজ শুনে দ্রুত এগিয়ে আসে। সন্ধ্যার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

“কি হয়েছে সন্ধ্যা?”

সন্ধ্যার ছলছল দৃষ্টি আকাশের দিকে। লামিয়া সামনে তাকালে আকাশের রা'গী দৃষ্টিজোড়া দেখে হয়ত কিছু বুঝল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটা। আকাশ না ফিরলেই বোধয় ভালো হত। এই আকাশকে পেয়ে তার বান্ধবীর জীবনটা আরও দুঃখে ভরে গিয়েছে। 

আকাশের ফোনে কল আসলে সে কিছুদূরে গিয়ে দাঁড়ায়। কল রিসিভ করে কথা বলায় ব্যস্ত হয়। 
সন্ধ্যা বেশ কিছুক্ষণ মলিনমুখে চেয়ে রইল। এই লোকটা তার আকাশ কি করে হয়? কি করে একটা মানুষের মাঝে এতো অমিল হয়? আকাশের বেশভূষা মেয়েটার কাছে একদম নতুন লাগে। লামিয়া সন্ধ্যার কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলে,
“নিজেকে শ'ক্ত কর সন্ধ্যা। তুই যে বলতি, নরম মাটি মানুষ পারায় বেশি। কথাটা কি ভুলে গেলি?”

সন্ধ্যা ঝাপসা চোখজোড়া দু'হাতে ডলে স্বাভাবিক হয়। মলিন হেসে বলে,
“ভুলিনি লামিয়া৷ কিন্তু আমাদের মন খুব বেহায়া হয় বুঝলি? এজন্যই তো আমি আজ আকাশের খাতায় পা'গ'ল, সৌম্য ভাইয়ার খাতায় আত্মসম্মানহীন মেয়ে হিসেবে পরিচিতি পেয়েছি।”

কথাটা বলতে গিয়ে সন্ধ্যার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ায়। ডান হাতে অশ্রুটুকু মুছে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় সে। একবার আকাশের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই সে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে।

ধরনীর বুকে রাতের আমেজ। শীতের ঋতু চলছে। চারিদিক থেকে ঠান্ডা বায়ু এসে গায়ে ধাক্কা খায়। সন্ধ্যার গায়ে শুধু পাতলা এক সাদা শাড়ি। খালি পা। ঠান্ডায় সন্ধ্যার কাঁপুনি ধরার কথা। অথচ তার মাঝে তেমন কোনো অনুভূতি দেখা গেল না। গায়ের লোম খাড়া হলো না। কয়েক পা হেঁটে খালি পা দু’টো বাগানে রাখে যেখানে অসংখ্য ঘাষ বিছিয়ে আছে। শিশির ভেজা ঘাষের উপর দিয়ে হেঁটে যায় সন্ধ্যা। পদযুগল থামে বকুল গাছতলার নিচে এসে। চারিদিক থেকে মৃদু আলোর ছিটেফোঁটা ঠিকরে এসে পড়েছে সন্ধ্যার উপর। 

লামিয়া সন্ধ্যার পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে। বলে,
“ঘরে যা সন্ধ্যা। বাইরে অনেক ঠান্ডা। তাছাড়া রাত হয়েছে তো। আমাকে বাড়ি যেতে হবে। নয়তো মা অনেক টেনশন করবে।”

সন্ধ্যা ছোট করে বলে,
“তুই বাসায় যা। আমি একটু পর বাসার ভেতর যাবো।”

লামিয়া চুপ থাকলো। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর-ও লামিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা বলে,
“যাচ্ছিস না কেন?”

লামিয়া সন্ধ্যার গালে হাত দিয়ে বলে,
“আল্লাহ তোর কপালে একদিন এতোটা সুখ লিখুক,, যে সুখ দেখে সবাই তোকে হিংসে করবে।”

সন্ধ্যার কি হলো কে জানে। লামিয়ার কথাটা শুনে সে শব্দ করে হেসে ফেলল। লামিয়ার চোখজোড়া ঝাপসা হয়। কি আশ্চর্য! তার বান্ধবী হাসছে অথচ সে বান্ধবীর হাসি দেখে দুঃখ পাচ্ছে! মানুষ দেখলে হয়ত তাকেও পা'গ'ল বলবে। বলতেই পারে। কেউ তো আর বুঝবে না, সন্ধ্যার এই হাসিতে ঠিক কতখানি দুঃখ, য’ন্ত্র’ণা, হাহাকার মিশে আছে। কিন্তু সে বোঝে, সে জানে। বান্ধবীর সব দুঃখ, ক'ষ্ট সে খুব বোঝে।

একসময় সন্ধ্যার বিষাদমাখা হাসি বিলীন হয়। উদাস কণ্ঠে বলে, 
“সুখে থাকার দুঃস্বপ্ন আমি কোনোদিনই দেখিনি লামিয়া। কখনো দেখবো-ও না। তুই-ও দেখিস না। বাড়ি যা। আন্টি চিন্তা করবে।”

কথাটা বলে সন্ধ্যা গাছ বরাবর ঘেঁষে দাঁড়ায়। 
লামিয়া মলিন মুখে চেয়ে রইল সন্ধ্যার দিকে। সত্যিই কি সন্ধ্যার কপালে সুখ লেখেনি আল্লাহ? তার বড্ড দুঃখ হয় প্রিয় বান্ধবীর জন্য। কেন সন্ধ্যার জীবন এমন? কেন একটু সুখী হতে পারেনা মেয়েটা? 
চলে যাওয়ার জন্য সন্ধ্যা লামিয়াকে আবারও তাড়া দিলে লামিয়া সন্ধ্যাকে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর যেতে বলে বেরিয়ে যায়। নয়তো বেশি রাত হয়ে গেলে রাস্তায় প্রবলেম হবে। 

সন্ধ্যা দু'হাতে দু'হাতের বাহু আঁকড়ে ধরে। দৃষ্টি দূর আকাশপানে রাখে। যেখানে ছোট্ট ছোট্ট অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। কোনো একদিন সন্ধ্যা-ও তার ব্যক্তিগত আকাশের বুকে এই সন্ধ্যাতারার ন্যায় জ্বলজ্বল করত। সুবিশাল আকাশ যেভাবে তার বুকে তারাগুলোকে আঁকড়ে রেখেছে। তার আকাশ-ও একইভাবে তাকে আগলে রাখত। 
কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা হাসল। বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না সে হাসি। মনে পড়ল কোনো একরাতের কথা, যে রাতে আকাশ এই গাছের নিচে তাকে কোলে নিয়ে বসে তার হাত দ্বারা গিটার বাজিয়ে গান গাইছিল তাকে মিন করে। কত ভালোবাসা ছিল আকাশের মাঝে তার জন্য! আজ সেই আকাশ তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে৷ সন্ধ্যা যে মানতে পারছে না। চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে মেয়েটার। আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা তারাগুলোর দিকে ঝাপসা চোখে চেয়ে সন্ধ্যা গেয়ে ওঠে,

“আমি তোমায় ভালোবাসি…এই জীবনের চেয়েও বেশি….কোনোদিনও বন্ধু ভুলতে পারবো না।
আমি তোমায় ভালোবাসি…এই জীবনের চেয়েও বেশি….কোনোদিনও বন্ধু ভুলতে পারবো না।

একদিন আইবা, তুমি আইবা রে….
সেইদিন আইসা বন্ধু আমায় পাইবা না…

গানের কণ্ঠ অনুসরণ করে আকাশ বকুল গাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে পড়ে মৃদু আবছা আলোয় গাছের সাথে হেলান দিয়ে সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে গান গাইছে,

একদিন আইবা, তুমি আইবা রে….
সেইদিন আইসা বন্ধু আমায় পাইবা না…

আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে থমথমে কণ্ঠে বলে, “কার জন্য গান গাইছ?”

আকাশের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তাকায় আকাশের দিকে। ইচ্ছে করল বলতে, ‘আপনাকে ভেবে গাইছিলাম। আপনি কি আমাকে স্বীকার করবেন? ফিরবেন আমার কাছে?’
মনের কথা মনেই চাপা পড়ে রইল। এই আকাশ তো সেই আকাশ নয়। যে তার পা'গ'লা'মি দেখে খুশি হবে! বরং এই আকাশ তার পা'গ'লা'মি দেখে তাকে পা'গ'ল উপাধি দেয়। সন্ধ্যা তার গালে গড়িয়ে পড়া নোনাপানি দু'হাতে মুছে নেয়। মৃদুস্বরে বলে,

“আপনি কেন শুনতে চাইছেন?”

আকাশ সাথে সাথে উত্তর খুঁজে পেল না। একটু পর বলে, “কোনো কারণ নেই। অ্যানিওয়ে, পা'গ'লদের এসব হ্যাবিট থাকে। ক্যারি অন।”

সন্ধ্যার বুক ফেটে কান্না এলো। আকাশের বলা পা'গ'ল শব্দটির ভার এতো বেশি লাগে কেন? আকাশের মুখ থেকেই কেন তাকে বারবার এই শব্দটি শুনতে হচ্ছে? সে আকাশকে ভালোবাসে বলে? নিজের আবেগ, ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রকাশ করে ফেলছে বলে? কিন্তু সে কি করবে? তার শুভ্র-পুরুষকে দেখলে যে তার মাথা ঠিক থাকে না৷ এটা কি তার দোষ? 
সে চায়না আকাশের মুখ থেকে পা'গ'ল শব্দটি শুনতে। ভালোবাসার মানুষটার জন্য পা'গ'লা'মি করার কারণে, সেই মানুষটার থেকেই পা'গ'ল উপাধি পাওয়া যে বড্ড বেশি ক'ষ্টের, এটা সন্ধ্যা কাকে বোঝাবে?   
সন্ধ্যা নিজেকে শ'ক্ত করতে চাইল। সে বারবার নিজের ভালোবাসার মানুষটার মানুষের কাছ থেকে পা'গ'ল শব্দটি শুনে এই ক'ষ্টের পরিমাণ আর বাড়াতে চায়না। 

আকাশ জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য এক পা বাড়ালে সন্ধ্যা নিজেকে সামলে শ'ক্ত করে বল,
“আমি পা'গ'ল নই।”

আকাশের পা থেমে যায়। বাদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“রিয়েলি? যার কোনো অস্বস্তি নেই তার জন্য কোনো সুস্থ মানুষ পা’গ’লা’মি করে? আর ইউ কিডিং উইথ মি?”

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশের কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না তার। তার মনে হলো, তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটা তার অপরিচিত। ভীষণ অপরিচিত। আর সে অপরিচিত মানুষদের সাথে কথা বলে না। এক মন আকাশকে অপরিচিত বললেও, আরেক বেহায়া মন যে এই আকাশকেই নিজের স্বামী ভাবে। আশা করে আকাশ তাকে ভালোবেসে একবার বুকে জড়িয়ে নিক। আগের মতো ভালোবাসুক। তাকে বিন্দুমাত্র আ'ঘা'ত না করুক। তার আগের আকাশ হয়ে যাক। 

সন্ধ্যাকে এক ধ্যানে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে আকাশ সন্ধ্যার মুখের সামনে ডান হাতের দু'আঙুলের সাহায্যে চুটকি বাজিয়ে বলে,  “হ্যালো?”

সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দৃষ্টি সরিয়ে নেয় আকাশের থেকে। নাহ সে দুর্বল হতে চায়না। অন্তত আকাশের সামনে তো নয়-ই। নিজেকে শ'ক্ত করে এখান থেকে চলে যাবার জন্য এক পা বাড়ালে আকাশ সন্ধ্যার হাত টেনে তার সম্মুখ বরাবর এনে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “অ্যান্সার চেয়েছি আমি।”

আকাশের কান্ডে সন্ধ্যা অবাক হয়। একদম তার মুখের সামনে আকাশের মুখে দৃষ্টি রাখে। আকাশের মুখে রা'গ স্পষ্ট। এতো কাছ থেকে আকাশকে দেখে সন্ধ্যা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। আকাশ কত সুন্দর! গায়ের রঙ কত উজ্জ্বল! তার গায়ের রঙ চাপা বলে সে নিজেকে ছোট করলে আকাশ রা'গ করত। আকাশের প্রিয় রঙের তালিকায় তার গায়ের রঙ চলে গিয়েছিল। অথচ আজ…..সন্ধ্যা শুকনো গলা ভেজায়। মাথাটা সামান্য নিচু করে তার হাত ধরে রাখা আকাশের হাতের দিকে তাকায়। বা হাত এগিয়ে এনে আকাশের হাত ধরতে চায়। বিষয়টি আকাশ খেয়াল করতেই সন্ধ্যার হাত ছেড়ে সন্ধ্যার কাঁধে হাত রেখে সন্ধ্যাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়। চোখেমুখে প্রচন্ড বিরক্তি। 

সন্ধ্যার অবাক হলো না। হলো ক'ষ্টে জর্জরিত। আকাশের বিরক্তি ভরা চাহনী তার চোখ এড়ায়না। মলিন মুখে চেয়ে দেখল অপরিচিত এক আকাশকে। ক’ষ্টগুলো চেপে নিজেকে সামলায় সন্ধ্যা। অতঃপর বলে,

“আমি অস্তিত্বহীন কারো জন্য পা'গ'লা'মি করিনা। আমি আমার শুভ্র-পুরুষের জন্য পা'গ'লা'মি করি। যার অস্তিত্ব আছে। পুরোপুরি আছে। আপনি অস্বীকার করলেই সব মিথ্যে হয়ে যাবে না।”

আকাশ থমথমে মুখে তাকায়৷ সন্ধ্যার ঝাপসা চোখজোড়ায় তার দৃষ্টি। সন্ধ্যার অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি কাজে সন্ধ্যার রিয়েকশন, সন্ধ্যার কথাগুলো তার কেন যেন মিথ্যে লাগছে না। একটা মেয়ে এভাবে মিথ্যা বলতে পারে বলে তার মনে হয়না। আকাশ জিজ্ঞেস করে, 
“কে সে?”

সন্ধ্যা ধরা গলায় উত্তর করে, 
“যদি বলি আপনি?”

সাথে সাথে আকাশ সন্ধ্যার চোয়াল শ'ক্ত করে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ইউ লায়ার! বারবার একই মিথ্যা বলছিস! একদম জানে মে'রে ফেলব।”

হঠাৎ আকাশের এহেন কাজে সন্ধ্যা অবাক হলো। গালে ব্য’থা পেলেও মেয়েটা টুঁ-শব্দ করল না। আকাশের কথা বলার ধরনে তার বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়। ইচ্ছে করল আকাশকে খুব শ'ক্ত করে কয়েকটা কথা শোনাতে। নিজেকে শ’ক্ত করতে চাইল, অথচ পারলো না। তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটা তার কথা বুঝবে না জেনেও বোকা সন্ধ্যা নিজের বেহায়া মনের কাছে ব্যর্থ হয়ে আকাশের দিকে করুণ চোখে চেয়ে নিজের হয়ে সাফাই গায়, 
 
“বিশ্বাস করুন, আমি মিথ্যে বলছিনা।”

আকাশ শান্ত চোখে তাকায়। হাত সন্ধ্যার গাল ধরে রাখা হাত শিথীল হয়। আবারও মনে হলো, সন্ধ্যা মিথ্যে বলছে না। আকাশ ঢোক গিলল। চোখ বুজে ফোঁস করে দু'বার শ্বাস ফেলে। এরপর চোখ মেলে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“যদিও আমার মনে হয়, তোমার হাসবেন্ড নেই। বাট যদি থেকেও থাকে, সে অন্যকেউ। আমি না। নেভার।”

কথাটা বলে আকাশ উল্টেদিকে ফিরে দাঁড়ায়। পকেট থেকে সিগারেট, লাইটার বের করে, সিগারেটে আ’গুন ধরিয়ে আবারও সিগারেট ফুঁকতে শুরু করে। সন্ধ্যা অবাক হয় আকাশের কথায়। মেয়েটার বড্ড জানতে ইচ্ছে হয়, আকাশ কেন তাকে এভাবে অস্বীকার করছে। কিন্তু সে এ ব্যাপারে আর কিচ্ছু বলল না। সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে,

“লায়ার আমি নই। আপনি। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই এটা বুঝতে পারবেন।”

কথাটা বলে সন্ধ্যা আর এখানে দাঁড়ায় না। বড় বড় পায়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে সন্ধ্যার দিকে রে'গে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে করল মেয়েটাকে ঠাস ঠাস করে লাগাতে। আপাতত নিজেকে সংযত করল। বিড়বিড় করল, “হিসাব শুরু হয়ে গেছে। দেখতে থাক বে'য়া'দ'ব মেয়ে।”
_____________________

ঘড়ির কাটা রাত ১১ টার ঘরে।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে নিয়ে তার ঘরে শুয়েছে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। মেয়েটা আজ এতো পরিমাণ কেঁদেছে, চোখমুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় অনেকক্ষণ যাবৎ। প্রায় একঘণ্টার মাথায় সন্ধ্যা ঘুমিয়ে যায়। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার মাথায় একটা চুমু আঁকে। মলিন মুখে মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। কি করবেন এই মেয়েটাকে নিয়ে? সে সত্যিই বুঝতে পারছে না আকাশ কেন এমন করছে। আকাশের বদলে যাওয়ায় যতটা না অবাক হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে সন্ধ্যার সাথে এরূপ অদ্ভুদ আচরণে। 
আকাশ বাড়িতে নেই। কখন বেরিয়েছে তাও জানেনা। সৌম্য চলে যাবার পর আকাশকেও আর দেখেনি। কোথায় গিয়েছে কে জানে! গত ক'বছর যে আকাশকে পেয়েছিল, সে ছিল তার মনের মতো। আর এই আকাশ…আসমানী নওয়ান ভাবতে পারছে না৷ সামনে কি অপেক্ষা করছে জানেন না। কিচ্ছু ভাবতে পারছেন না তিনি। কলিংবেলের আওয়াজে ভদ্রমহিলার ভাবনায় ছেদ ঘটে৷ তাকে জাড়িয়ে রাখা সন্ধ্যার হাত আস্তে করে সরিয়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। কম্বল দিয়ে সন্ধ্যাকে ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে ঘরের দরজা চাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। 

আসমানী নওয়ান অরুণকে দেখে এগিয়ে আসে। কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। অরুণ বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“আন্টি আপনার সাথে ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।”

আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে সোফায় বসে বলে, “আমারো তোমার সাথে কথা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। বসো।”

অরুণ বসল আসমানী নওয়ানের সম্মুখ বরাবর। অরুণ কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। আকাশের স্মৃতি ন'ষ্ট হওয়ায় তাদের উপর যা প্রভাব পড়বে, তা তারা মেনে নিতে পারলেও সন্ধ্যা মানতে পারবে না৷ কি করে মানবে? আকাশ যে সন্ধ্যাকেই অস্বীকার করছে। অরুণ নিজেকে শান্ত করে আসমানী নওয়ানকে নিয়াজের বলা সব কথা বলে। সন্ধ্যাকে না চেনার কারণ যে আকাশের স্মৃতি চলে যাওয়ার কারণে এটা আসমানী নওয়ান বুঝলেও সৌম্য আর সন্ধ্যার সাথে আকাশের করা বিহেভ এর কারণ বুঝল না। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার নিয়ে তিনি চিন্তিত সেটা ভাবলে তার নিজেরই এলোমেলো লাগছে। অরুণের দিকে চেয়ে বলে,

“অরুণ আমি কোনো ভিডিও পাচ্ছিনা। আকাশ আর জান্নাতের রেজিস্ট্রি পেপার থেকে শুরু করে, এ যাবৎ আমাদের বাড়িতে সিসিটিভিতে যত ফুটেজ ছিল। এছাড়া গত তিন বছরের যত ভিডিও ছিল কিচ্ছু নেই। অনেক খুঁজেছি। কোথাও নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম কাজের মেয়ের বাচ্চা রেজিস্ট্রি পেপার ছিঁড়েছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছা করে এই কাজ করেছে। কিন্তু কে?”

অরুণ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। এরকম হলে আকাশকে তারা কিভাবে ম্যানেজ করবে? সবচেয়ে বড় কথা এই কাজগুলো কে করেছে? কিছু একটা ভেবে বলে, “জেডি?”

আসমানী নওয়ান তাকায় অরুণের দিকে। থমথমে কণ্ঠে বলে,
“জেডি নিজের স্বা’র্থ ছাড়া কিছু করেনা৷ সন্ধ্যা, সৌম্য’র সাথে জেডির কোনো কানেকশন নেই। এখানে ওর কোনো স্বা’র্থ নেই। ও আকাশকে আবার আগের ন্যায় নিজের মতো বানিয়েছে। কিন্তু এসব জেডি করেনি।”

অরুণ চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“তাহলে কে করল এসব? আকাশের এক্সিডেন্ট টা-ও সে করায়নি তো আন্টি?”

আসমানী নওয়ান ছোট করে বলে,
“জানিনা। কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা।”

আসমানী নওয়ান, অরুণ দু'জনের চোখেমুখেই চিন্তা। কি হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? কে করছে? সবমিলিয়ে দু'জনের মাথা ব্য’থা শুরু হলো।
_____________________

সৌম্য আকাশদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস কাউন্টারে এসেছিল। বাস পাচ্ছিল না। বাস পেলেও সব সিট বুক ছিল। সর্বশেষে মাঝরাতের একটি বাসের একদম শেষে দু'টো সিট পায়। এজন্য ঢাকা থেকে বগুড়া আসতে আসতে সকাল হয়ে যায়। বাস থেকে নেমে সৌম্য ইরাকে নিয়ে সিএনজিতে করে গ্রামে আসে। গ্রামের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল প্রায় ১০ টা বেজে গিয়েছে। বাড়ি থেকে খানিক দূরত্বে সৌম্য আর ইরা ভ্যান থেকে নেমে দাঁড়ায়। পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করে ভ্যানওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে ইরার হাত ধরে বাড়ির দিকে এগোয় সৌম্য৷ গ্রামের পরিচিত অনেকে সৌম্যকে জিজ্ঞেস করে, ‘সে কেমন আছে।’ সৌম্য ছোট করে উত্তর করে। পাল্টা প্রশ্ন করেনা। বাড়তি কোনো কথা-ও বলে না। চুপচাপ এগোয়। ইরা সৌম্য’র দিকে একবার তাকিয়ে দেখে। প্রিয় মানুষের মলিন মুখ দেখে ইরার মুখখানা বিষাদে ভরে যায়। কিছু বলল না। সৌম্য’র হাত ধরে ধীরপায়ে এগিয়ে যায়। কানে মেশিনের শব্দ এসে ধাক্কা খাচ্ছে। বাড়ি করার জন্য যেসব মেশিন ব্যবহার হয়, সেইম সেরকম মেশিনের শব্দ। সামনে যত এগোয়, মেশিনের শব্দ তত গাঢ় হয়। সৌম্য, ইরা দু'জনেই ভ্রু কোঁচকালো। এই গ্রামে আবার কে বাড়ি করছে? কৌতুহলী কণ্ঠে ইরা জিজ্ঞেস করে,

“আমাদের বাড়ির পাশে কেউ কি বাড়ি করছে সৌম্য?” 

সৌম্য উত্তর দেয়, “জানিনা তো।”

দু'মিনিটের মাথায় ইরা, সৌম্য দু'জনেই তাদের বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সামনে তাকিয়ে কেউই আর এগোনোর শক্তি পায়না। দু’জনেই বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তাদের স্বপ্নের বাড়িটির দিকে। এতোক্ষণ ভাবছিল, তাদের বাড়ির আশেপাশে কেউ বাড়ি করছে, অথচ তাদের ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো, বাড়ি ভাঙার মেশিন দ্বারা তাদের বাড়ি ভাঙতে দেখে। 

সৌম্য এক সেকেন্ড সময় ন'ষ্ট করল না। একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে বলে, “আমার বাড়ি কেন ভাঙছিস তোরা? কোন সাহসে আমার বাড়ি ভাঙছিস?”

সৌম্য’র চিৎকারে কিছু শ্রমিক ভ্রু কুঁচকে তাকায়। দু’জন কাজ ফেলে এগিয়ে এসে বলে, “কিছু বলছেন?”

সৌম্য যাথাসম্ভব নিজেকে শান্ত করে। বলে, “আমার বাড়ি কেন ভাঙছেন?”

ভদ্রলোক জানায়, 
“আমরা তো মালিককে চিনিনা ভাই। আমরা শ্রমিক। আমাদের এখানে এনে কাজ করতে দেয়া হয়েছে।”

সৌম্য কি বলবে বুঝল না। কে তার বাড়িতে শ্রমিক পাঠিয়েছে বাড়ি ভাঙার জন্য? তখন-ই চারপাশে গুমগুম শব্দে সকলে উপরদিকে তাকায়। 
সামান্য উঁচুতে একটি হেলিকপ্টার ঘুরছে। ধীরে ধীরে হেলিকপ্টারটি একটি ফাঁকা জায়গায় ল্যান্ড করে। একজন হেলিকপ্টারের দরজা খুলে দিলে ভেতর থেকে আকাশ বেরিয়ে আসে। পরনে সাদা প্যান্ট, শার্ট। তার উপর সাদা ওভারকোর্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। জুতোজোড়া-ও সাদা। আকাশ হেলিকপ্টারের পাশে দাঁড়িয়ে। দু'হাত ওভারকোর্টের পকেটে রাখে। দৃষ্টি সৌম্য’র পানে। আকাশের দু'পাশে দু'জন করে লোক দাঁড়ানো। যাদের পরনে কালো পোষাক। 

সৌম্য, ইরা বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সৌম্য’র সম্মুখ বরাবর দাঁড়ায়। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে, সেটি ভাঁজ করে বুকের কাছে ঝুলিয়ে রাখে। এরপর সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,
“ফিলিংস কেমন?”

সৌম্য ঢোক গিলল। ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে, “আপনি আমার বাড়ি…..

মাঝপথে আকাশ বলে,
“এটা তোর নয়। আমার বাড়ি। আমার জায়গা। বাড়িটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। ভেবেছি, এই দু'টাকার বাড়ি ভেঙে একটি ফ্যাক্টরি বানাবো এখানে। বুঝলি?”

সৌম্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কথা বলার ভাষা হারায় ছেলেটি। ছেলেটার অবুঝে ভরা মুখ দেখে আকাশ বাদিকে হাত বাড়িয়ে দু'আঙুলের সাহায্যে কিছু ইশারা করলে, একজন গার্ড আকাশের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দেয়। আকাশ কাগজটি সৌম্য’র সামনে ধরে হেয়ালি স্বরে বলে,
“হেই অবুঝ বালক, দেখে নে এটা কার জায়গা।”

সৌম্য কাগজটিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। দলিলে আকাশের নাম যেমন জ্বলজ্বল করছে, তেমনি জ্বলজ্বল করছে তার সাক্ষর। সৌম্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। এই সাইন সে কবে করেছে? হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলো না। অবাক চোখে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি লেপ্টে। সৌম্য জমির দলিলটি ধরতে গেলে আকাশ হাত সরিয়ে ফেলে। আফসোসের সুরে বলে,
“লাভ নেই। এখান থেকে চলে যা। আমার জায়গার ত্রিসীমানায় তোকে দেখতে চাইনা। কথা বোঝা গেল?” 

সৌম্য খুব করে হাতড়ালো একটা শব্দ উচ্চারণ করার জন্য। কিন্তু একটা ছোট্ট শব্দ-ও খুঁজে পেল না। শ’ক্ত পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে কেবল আকাশকে দেখল। যে আকাশকে সে চুল পরিমাণ চেনেনা। বহুক'ষ্টে উচ্চরণ করে,
“আমার সাথে কেন এমন করছেন?”

সৌম্য’র কথাটা আকাশের কাছে নিছকই এক কৌতুক মনে হলো। সে অদ্ভুদভাবে হেসে ফেলল। হঠাৎ-ই হাসি থামিয়ে আকাশ সৌম্য’র কলার ধরে, চোখমুখ শ'ক্ত করে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ড্রামাবাজ! হিসেব ক'ষতে মাত্র শুরু করেছি। আরও অনেক বাকি। দেখতে থাক।”

কথাটা বলে আকাশ সৌম্যকে ধাক্কা দেয়ার মতো করে সৌম্য’র কলার ছেড়ে উল্টোদিকে ফিরে গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে পড়ে। একজন হেলিকপ্টারের দরজা বন্ধ করে দিলে হেলিকপ্টারটি জায়গা প্রস্থান করে। 

ইরা দৌড়ে এসে সৌম্য’র হাত শ'ক্ত করে ধরল। চোখ বেয়ে তখন থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আকাশ কেন এমন করছে তাদের সাথে? সে বুঝতে পারেনা। ইরা বাড়িটির দিকে তাকায়। তাদের কত শখের বাড়ি আজ নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গেল। এই বাড়িটি সৌম্য ঠিক তার পছন্দের মতো করে বানিয়েছিল। তার ইচ্ছে ছিল এরকম একটি গ্রামে সে আর সৌম্য খুব সুখে-শান্তিতে সংসার করবে। সৌম্য একটু একটু করে টাকা জমিয়ে এইখানে জায়গা কিনে বাড়ি করেছিল। কত ভালোবেসে সৌম্য এই বাড়ি বানিয়েছিল। সেই বাড়ি আজ এভাবে আকাশ ভেঙে ফেলল! ইরা ফুঁপিয়ে কাঁদে। বড্ড ক'ষ্ট হচ্ছে তার। এবার তারা কোথায় থাকবে? 

সৌম্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতো বড় শক তার জন্য অপেক্ষা করছে, সে কল্পনাও করেনি। বুকটায় অস্বাভাবিক ব্য’থার উৎপত্তি হচ্ছে। কেমন মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। যেন সে সত্যিই প্রাণহীন এক মূর্তি! 
প্রিয় মানুষটার জন্য গড়ে তোলা শখের বাড়ি আজ অস্তিত্বহীনের পথে। আহ! জীবন!
.
.
.
আকাশ আর সৌম্য’র ঘটনার পুরো ভিডিও এক যুবক তার ফোনে রেকর্ড করে। এরপর রেকর্ডটি সন্ধ্যার কাছে পাঠিয়ে দেয়। কাজ শেষে ছেলেটি বুক ভরে শ্বাস নিল। ছেলেটির পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো জুতো। মাথায় কালো ক্যাপ, কালো মাস্ক। পরিহিত কালো হুড়ির পকেটের মাঝে দু'হাত রাখা। মাস্কের আড়ালে সাদা চোখের মণি দু'টো জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। আকাশপানে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়, 
“স্যরি সন্ধ্যা! আমার প্রাণ তুই! আমার সোনাপাখি।”
___________________

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যা নামাজ পড়ে শুয়ে বসে ছিল। মাত্র ফোনটি হাতে নিলে একটি ভিডিও তার হোয়াটসঅ্যাপে আসে। কৌতুহলবশত সন্ধ্যা ভিডিওটি অপেন করে। প্রায় ১০ মিনিটের ভিডিও দেখে সন্ধ্যার মাথায় বাজ পড়ে। হাত থেকে ফোন পড়ে যায়। হাত-পা কাঁপছে তার। আকাশ এসব কি করে করতে পারে? তার ভাইয়ের মাথা রাখার ঠাঁই কি করে কে'ড়ে নিতে পারে? মেয়েটা মানতে পারেনা। সৌম্য ভাইয়া ভীষণ ক'ষ্ট পাচ্ছে। সন্ধ্যার সবকিছু এলোমেলো লাগে। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা দু'হাতের মাঝে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আর পারছে না সে। আর কত সহ্য করবে? তার সৌম্য ভাইয়ার কথা ভেবে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ে মেয়েটা। বিড়বিড় করে,
“আমায় ক্ষমা কর সৌম্য ভাইয়া। আমায় ক্ষমা কর।”

বাড়িতে আসমানী নওয়ান নেই। কোথায় গিয়েছে সন্ধ্যা জানেনা। ভদ্রমহিলা বাড়ি থাকলে এতক্ষণে মেয়েটিকে আগলে নিতে দৌড়ে আসত। সন্ধ্যা কাঁদে। খুব কাঁদে। তার যে বড় ক'ষ্ট! তার স্বামী,, তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন, বাবা-মায়ের মতো আগলে রাখা সৌম্য ভাইকে একের পর এক ক'ষ্ট দিচ্ছে। সন্ধ্যার দমবন্ধ লাগে। দমবন্ধকর অনুভূতি নিয়ে খুব ক'ষ্টে ডাকে, “আল্লাহ?”

এভাবে সন্ধ্যা প্রায় ৩০ মিনিটের মতো কাঁদে। ধীরে ধীরে কান্নার বেগ কমে আসে। আস্তে করে সে উঠে দাঁড়ায়। গাড়ির শব্দ পেয়ে সন্ধ্যা দ্রুত বেলকনিতে যায়। আকাশকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে সন্ধ্যা আর এক সেকেন্ড এখানে দাঁড়ালো না। একপ্রকার দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বড় বড় পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। 

তখনই আকাশ বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। সন্ধ্যা থেমে যায়। তাকায় আকাশের দিকে। এই মানুষটা তার আকাশ? এই নি’কৃ’ষ্ট মানুষটা? নাহ্ এই লোকটা আর যাই হোক, তার আকাশ নয়। তার আকাশ মোটেও এমন ছিল না। সে বড্ড ভালো ছিল। তাদের দু'ভাইবোনকে কত ভালোবাসত আকাশ? আর এই লোক? এই লোকটা এসেছে শুধু তাকে আর সৌম্য ভাইয়াকে ক'ষ্ট দিতে। তার সৌম্য ভাইয়াকে যে ক'ষ্ট দিবে, সে কোনোদিন তাকে ক্ষমা করবেনা। সন্ধ্যা আকাশের মতো দেখতে এই নি'কৃ'ষ্ট লোকটাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেনা। কোনোদিন না। তার আকাশ ম'রে গিয়ে গিয়েছে। যে আকাশের তাকে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে কেবল তাকে ভালোবাসার। আকাশ সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল। তখন-ই সন্ধ্যা এগিয়ে গিয়ে আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। কান্নামাখা মুখটায় রা'গের আভা ছড়িয়ে। 

বাঁধা পেয়ে আকাশ বিরক্ত হয়ে সামনে তাকায়। সন্ধ্যাকে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। সন্ধ্যা শ'ক্ত গলায় বলে,

“সন্ধ্যামালতীকে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আমার শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালার নেই। আপনি ঠিকই বলেছিলেন, আমি আপনার সঙ্গে আমার শুভ্র-পুরুষকে গুলিয়ে ফেলেছি। আপনি আমার শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা নয়। আপনি এভি। যার চেহারা অবিকল আমার শুভ্র-পুরুষের মতো হলেও আপনাদের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাৎ। আমার শুভ্র-পুরুষ ছিল শুভ্র রঙের মতো স্বচ্ছ। আর আপনি অস্বচ্ছ! যাকে বলে মানুষরূপী জা'নো'য়া'র।

আকাশ রা'গে কাঁপছে। সন্ধ্যার বলা জা'নো'য়া'র শব্দটি সে হজম করতে পারলো না। এক সেকেন্ড-ও সময় নিল না। বা হাত তুলে সন্ধ্যার ডানগালে একটা দাবাং মার্কা চড় মে'রে দেয়। সন্ধ্যা বাদিকে সামান্য হেলে যায়। গালটা জ্ব'লে উঠল। আকাশের থা'প্প'ড়ে আজ আর অবাক হলো না৷ তবে বুকের বা পাশটায় ব্য'থার সঞ্চার হয়। চোখদু'টো ভিজে ওঠে। সন্ধ্যা শ'ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিন্দুপরিমাণ জায়গা থেকে সরে যায় না।
আর ইচ্ছে করেনা নিজেকে সস্তা বানাতে। কার কাছে নিজেকে ছোট করবে? যার কাছে তার বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই? যে তাকে দু'পয়সা দাম দেয় না তার কাছে? নাহ, সন্ধ্যা আর নিজের মূল্য কমাবে না। 

আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার চোয়াল শ'ক্ত করে ধরে রেখে সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে ফোঁসফোঁস করতে করতে হিসহিসিয়ে বলে,
"এতো সাহস কোথায় পেয়েছিস? আমাকে জা'নো'য়া'র বলিস? আমাকে? এই এভিকে?"

সন্ধ্যার মুখে ব্য'থার ছাপ। সে আকাশের রা'গে লালিত হওয়া চোখজোড়ায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আগের চেয়েও শ'ক্ত কণ্ঠে বলে,
"যে যেমন, তাকে তেমন নামে সম্মোধন করতে আমি বরাবরই সাহসী। আমার সৌম্য ভাইয়ার সাথে করা অন্যায়ের সকল হিসাব আমি গুনে গুনে নিব মিস্টার এভি ওরফে জা'নো'য়া...

আকাশ রে'গে সন্ধ্যাকে আরেকটা থাপ্পড় মা'রা'র জন্য হাত উঠালে সন্ধ্যার কথা থেমে যায়। ভ'য় পেয়ে দ্রুত চোখ বুজে নেয় মেয়েটা। জায়গা থেকে সরলো না, তবে মাথাটা সামান্য বাদিকে সরিয়ে নেয়। বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নোনাজল গড়ায়। যেই আকাশ তাকে একটা থা'প্প'ড় মে'রে কত দুঃখ করত। আজ সেই আকাশের হাতে একটার পর একটা থা'প্প'ড় খেতে হচ্ছে। এই থা'প্প'ড় সন্ধ্যার গালের আগে বুকে গিয়ে লাগে। মেয়েটার দুঃখের অশ্রু থামলো না। কিন্তু সে শ'ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে আর নরম হবে না। এই লোকটার জন্য সে বুক ফেটে ম'রে গেলেও আর ফিরে তাকাবে না। বরং সে তার ভাইয়ের সাথে করা অন্যায়ের হিসাব নিবে।

এদিকে আকাশের হাত মাঝপথেই থেমে গিয়েছে। সন্ধ্যার বন্ধ চোখ বেয়ে অনবরত নোনাজল গড়াতে দেখে আকাশ ঢোক গিলল। থা'প্প'ড়ের কারণে উজ্জ্বল শ্যা'মলা গাল হালকা লাল হয়ে উঠেছে। আকাশ ভেতরে ভেতরে ছটফটালো। থা'প্প'ড় মা'রা'র জন্য যে হাত তুলেছিল, সে হাত ফিরিয়ে এনে তার গলায় ঝুলানো চেইন শ'ক্ত করে ধরে। দৃষ্টি সন্ধ্যার দৃঢ় অথচ ব্য'থার ছাপ যুক্ত মুখাবয়বে। আকাশ হাসফাস করে। তার অস্থির লাগছে। 
এক পর্যায়ে নিজের অজান্তেই আকাশের মুখ থেকে থমথমে কণ্ঠে বেরিয়ে আসে তিনটে শব্দ,

"কান্না অফ কর।”

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা : প্রায় ৪০০০
অনেকগুলো শব্দ। অবশ্যই মন্তব্য করে জানাবেন, কেমন হয়েছে।]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago
পর্ব:০৭
 

অপ্রত্যাশিত আকাশের থমথমে কণ্ঠে সন্ধ্যা অবাক হয়। আকাশ তাকে থা’প্প’ড় মা’রার জন্য হাত তুলেও থেমে গেল কেন? সবচেয়ে বড় কথা, আকাশ তাকে এভাবে কান্না অফ করতে বলল? ভীষণ অবাক হয় সন্ধ্যা। চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশকে শান্ত দৃষ্টিতে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ এই কথা বলল? তার তো বিশ্বাস হয়না। আগে যখন সে কাঁদত, তখন-ও আকাশ এভাবেই তাকে কাঁদতে বারণ করত। আজ আবার-ও একইভাবে আকাশ তাকে কাঁদতে বারণ করল। সন্ধ্যার চোখজোড়া ভিজে ওঠে। এইতো তার আকাশ। মনে হচ্ছে একদম তার আকাশ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে কি আকাশ তাকে আবারও ভালোবাসবে? আর খারাপ ব্যবহার করবে না? এটুকু ভাবতে গিয়ে সন্ধ্যার ভেজা চোখজোড়ায় পানি টইটুম্বুর হয়ে আবারও ক'ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। আকাশ খেয়াল করে, সন্ধ্যা আবার-ও কাঁদছে। এবার সে রা'গ'ল। ধমকে বলে,

“কাঁদতে নিষেধ করলাম না?”

সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আগের চেয়ে আরেকটু অবাক হয়। আকাশ তাকে সেই আগের মতো কাঁদতে নিষেধ করছে? কেন করছে? সে কাঁদলে আকাশের কি? এই আকাশ তো তাকে শুধু আ'ঘা'ত করে৷ 
সন্ধ্যাকে সেই একইভাবে চোখের জল ফেলতে দেখে আকাশের আর সহ্য হলো না। রে'গে সে খপ করে সন্ধ্যার হাত ধরে সন্ধ্যাকে টেনে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে সন্ধ্যাকে বাড়ির বাইরে বের করে দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“রাস্তায় গিয়ে যত খুশি কাঁদ। আর একবার আমার সামনে এসে কাঁদলে থা'প'ড়া'তে থা'প'ড়া'তে একদম জান নিয়ে নিব।”

সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আবার আকাশ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে। তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। এবার সন্ধ্যার এতো পরিমাণ রা'গ হলো। সবসময় সে মুখ বুজে সহ্য করবে কেন? 
এদিকে আকাশ সন্ধ্যার মুখের উপর দরজা আটকাতে নেয়ার আগেই সন্ধ্যা তেড়ে যায় আকাশের দিকে। পা উঁচু করে দু'হাতে আকাশের ওভারকোটের কলার চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“এ্যাই এভির বাচ্চা, এটা আমার স্বামীর বাড়ি। আমাকে আমার স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার তুই কে?”

আকাশ হতভম্ব হয়ে যায়৷ এই ছিঁছকাদুনে মেয়ের মুখ থেকে এমন ধারার কথা সে মোটেও আশা করেনি৷ প্রথমে তাকে নাম ধরে ডাকছিল, এরপর তাকে অ’মানুষ বলল। আর এখন একেবারে তুই করে বলে ফেলল। কত্ত বড় সাহস মেয়েটার! সে ভাবতেই পারছে না। রা'গে শরীর কাঁপছে। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ভস্ম করে দেয়া দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। এইটুকু মেয়ের থেকে একের পর এক কটু ব্যবহার তার বিন্দুমাত্র হজম হচ্ছেনা। 

এদিকে সন্ধ্যা একটু-আধটু ভ'য় পাচ্ছে৷ এই প্রথম সে আকাশকে তুই করে বলল৷ নিজেরই কেমন যেন লাগছে। কিন্তু সেই বা কি করবে? আকাশের প্রতিটা কাজে যেমন খারাপ লাগে, তেমনি রা'গ লাগে৷ তাছাড়া আকাশ তার সৌম্য ভাইয়ার সাথে যা করেছে, এরপর আকাশের সাথে খারাপ ব্যবহার করে তার নিজের গিল্টিফিল হওয়ার ব্যাপারটাই বরং হাস্যকর। আকাশ এর চেয়েও কঠিন ব্যবহার ডিজার্ভ করে৷ সন্ধ্যা আর নিজেকে দুর্বল করল না। বরং শ'ক্ত করল। 
আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“বে'য়া'দ'ব মেয়ে, আমার কলার ছাড় বলছি।”

সন্ধ্যা-ও সাথে সাথে উত্তর করে,
“ছাড়বো না। কি করবেন আপনি?”

আকাশের রা'গ তড়তড় করে বাড়ছে। এই মেয়েকে যে সে কি করবে সে নিজেও জানেনা৷ মনে হচ্ছে একে ঠাস করে মে'রে দিলেও তার শান্তি হবেনা৷ কল্পনার বাহিরে শা'স্তি দিয়ে এরপর একে মা'র'বে। 
সন্ধ্যা আবারও বলে,
“আপনার কথায় আর কিচ্ছু হবে না, বুঝেছেন আপনি? আমাকে ভালো না লাগলে আপনি নিজ দায়িত্বে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবেন৷ খবরদার! আমাকে আরেকবার এই বাড়ি থেকে বের হতে বলেছেন তো ভালো না বলে দিলাম।”

কথাটা বলে সন্ধ্যার আকাশের কলার ছেড়ে আকাশকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। আকাশ বাকহারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ এই এতোটুকু মেয়েটা তাকে কি কি বলছে, আকাশ আর টোটালি নিতে পারছে না৷ সে দ্রুত উল্টোফিরে চেঁচিয়ে বলে,
“বে'য়া'দ'ব মেয়ে। এই বাড়িতে তোর কোনো জায়গা নেই। এক্ষুনি বেরোবি তুই।”

কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যার দিকে এগোয় আকাশ। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আবারো খারাপ লাগলো আকাশের এহেন ব্যবহারে। সন্ধ্যা শ্বাস নিয়ে নিজেকে কঠোর করে। সে আকাশকে ফেলে যেতে চায় না৷ কখনোই না৷ যদি আকাশ সারাজীবন তাকে না চেয়ে এমনই থাকে, তবে সে নাহয় একদিন চলে যাবে৷ তার আগে আকাশের এমন পরিবর্তন, তার আর তার ভাইয়ার প্রতি আকাশের এরূপ আচরণের জবাব নিয়ে তবেই এই বাড়ি ছাড়বে। সে কেন মুখ লুকিয়ে থাকবে? কেন একা একা গুমড়ে পড়ে কাঁদবে? এমন করলে তার সৌম্য ভাইয়া সবচেয়ে বেশি ক'ষ্ট পাবে। সৌম্য ভাইয়া তো তার বোনুকে এতো দুর্বল দেখতে চায়না। সবচেয়ে বড় কথা, তার সৌম্য ভাইয়ার সাথে হওয়া অন্যায়ের জবাব না নিয়ে সে কোথাও যাবেনা। আর না তো যাবে প্রতিনিয়ত আকাশের তাকে অস্বীকার করার জবাব নিয়ে।
সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়েই কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে শ'ক্ত করে বলে,

“আমি বলেছি আমি আমার স্বামীর বাড়ি থেকে কোথাও যাবো না। শুনতে পাননা আপনি?”

আকাশের পা থেমে যায়। সন্ধ্যার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে। সন্ধ্যার আবারো সেই এক কথা শুনে আরও রা'গল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। আমার লাইফে বউ তো দূর, গার্লফ্রেন্ড অব্দি ছিল না।”

যতবার তাকে অস্বীকার করার জন্য আকাশের মুখ থেকে কটু বাক্য উচ্চারিত হয়, ততবার সন্ধ্যার দলা পাকিয়ে কান্না আসে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়না। সন্ধ্যা নিজেকে সামলালো। আকাশের এমন আচরণের কারণ তো সে ঠিক বের করবে। অতঃপর বলে,
“আপনি মিথ্যে বলছেন। আপনার বউ ছিল। আর আপনি তাকে ভালোও…..

আকাশ মাঝখান থেকে চিৎকার করে বলে, “আর একটা মিথ্যে বললে তোকে জুতো পেটা করব বে'য়া'দ'ব মেয়ে।”

সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আকাশের কথার উত্তর হিসেবে বলে,
“আপনি মিথ্যা বললে আপনাকে আমি চটি পেটা করব।”

সন্ধ্যার বলা চটি পেটার অর্থ বুঝল না আকাশ। অদ্ভুদকণ্ঠে আওড়ায়, 
“হোয়াট ইজ চটি?”

আকাশ ডান পাশে দাঁড়ানো একজন গার্ড বলে, “বস মেয়েরা পায়ে যেটা পড়ে, ওটাকে চটি বলে।”

কথাটা শুনে আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। কিহ! এই মেয়ে ওর পায়ের চটি দিয়ে তাকে পেটাতে চাইছে? কত বড় সাহস ভাবা যায়! শ'ক্ত চোখে সন্ধ্যার দিকে তাকায়। ডান হাতে গলায় ঝুলানো চেইন ধরে টানে, যেন সন্ধ্যাকে ঠিক এভাবেই ছিঁড়বে। 
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। এই আকাশকে দেখে তার হুট করেই ভীষণ ভ'য় লাগে। যেটা এখন লাগছে। সে অলরেডি অনেক কিছু বলে ফেলেছে। আসমানী নওয়ান-ও বাড়িতে নেই। এই আকাশ তো আর আগের আকাশ নয়, যে তার কথায় রা'গলেও ভালোবাসতে আসবে, বরং এই লোকটা রে'গে তাকে মা'র'তে আসে। সন্ধ্যা আর এখানে দাঁড়ালো না। আকাশকে আবারো তার দিকে এগোতে দেখে সে একপ্রকার দৌড়ে একটি ঘরে গিয়ে ঘরের দরজা ঠাস করে বন্ধ করে দেয়। 

আকাশ সন্ধ্যাকে ধরার আগেই সন্ধ্যা দরজা বন্ধ করে দেয়ায় আকাশ রে'গে আরও বোম হয়ে যায়। রাগান্বিত স্বরে বলে, “বে'য়া'দ'ব মেয়ে। তোকে ছাড়বো না আমি।”

পিছন থেকে একজন বলে,
“কিন্তু বস, আপনি তো মেয়েটিকে ধরতেই পারলেন না। ছাড়বেন না কিভাবে?”

আকাশ লোকটির দিকে তেড়ে আসে। কলার ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“ধরতে পারলাম না মানে? ওকে আমি ধরেই ছাড়বো৷ নয়ত আমার নাম-ও এভি নয়।”

কথাটা বলে একটি চেয়ারে লাথি দিয়ে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় আকাশ।
.
.
সৌম্য ইরাকে নিয়ে তাদের গ্রামের এক পুকুর পাড়ে বসে আছে। উপরে গাছ। শীতের রোদের ছিঁটেফোঁটা তাদের গায়ে এসে পড়ছে। সৌম্য’র গায়ে একটি জ্যাকেট, ইরার পরনে শাড়ির উপর একটা পাতলা সোয়েটার। তার উপর একটি চাদর জড়ানো। সৌম্য এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে পুকুরের টলটলে পানির দিকে। যেখানে রোদ্র অনেকটা জায়গাজুড়ে বিছিয়ে আছে। ইরা সৌম্য’র কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে রেখেছে৷ মেয়েটির অশ্রু থামছে না আজ। কেন এমন হচ্ছে তাদের সাথে? কেন তার সৌম্য’র সাথে এমন হচ্ছে? বেশ কিছুক্ষণ পর ইরা নিজেকে সামলায়। সোজা হয়ে বসে দু'হাতে চোখমুখ মুছে নেয়। সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় বলে,

“আমরা এখন কোথায় যাবো সৌম্য?”

সৌম্য তাকায় তার বউয়ের দিকে৷ মেয়েটার মুখের ডানপাশ বেশ কালচে রঙের। সৌম্য তাকিয়ে রইল। তার বউয়ের মুখের এই দাগ, এই ত্যাগ শুধু তার জন্য। সে কেন দুঃখ পাচ্ছে? ভালোবাসার চেয়ে বড় কিছু হয়? হয়না। তার বাড়ি ধ্বসে পড়েছে তাতে কি? তার ইরাবতী, তার ভালোবাসা তো আছে। তার কাঁধে মাথা রাখছে। এটাই প্রকৃত সুখ। সৌম্যকে চুপ দেখে ইরার চোখজোড়া আবারও ভেজে। ভাঙা স্বরে ডাকে, “সৌম্য?”

সৌম্য ইরাকে তার বুকে শ'ক্ত করে জড়িয়ে নেয়। ইরা-ও জড়িয়ে ধরল সৌম্যকে। ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা। ভাবে তার সৌম্য’র ক'ষ্ট হচ্ছে। তার সৌম্য ক'ষ্ট পেলে সে কি করে ঠিক থাকবে? সে পারেনা। সে চায়, সৌম্য ভালো থাকুক। খুব ভালো থাকুক। কিন্তু কেন আল্লাহ তার সৌম্যকে একটুখানি ভালো থাকতে দেয়না? 
সৌম্য অনেকটা সময় চুপ থাকলো। একটা টুঁ-শব্দটিও করল না। নিরব থেকে ইরাকে অনুভব করল। তার ভালোবাসা এটা। ভাগ্যের জোরে এই মেয়েটাকে সে পেয়েছিল। বহু ক'ষ্ট সহ্য করে সে তার ইরাবতীকে পেয়েছিল। কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইরাকে ছেড়ে দু'হাতের আঁজলায় ইরার মুখ নেয়। ইরা কান্নামাখা চোখজোড়া খুলে তাকায় সৌম্য’র পানে। সৌম্য দু'হাতের বুড়ো আঙুল দ্বারা ইরার ভেজা গাল মুছে দেয়। ইরার চোখে চোখ রেখে বলে,

“রিজিকের মালিক আল্লাহ। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু……

এটুকু বলে থেমে যায় সৌম্য। ইরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে বলে, 
“ওসব বাড়ি-গাড়ি ধ্বংস হয়ে যাক। হাজারটা বাঁধা পেরিয়ে, দিনশেষে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা চিরদিন অটুট থাকুক। আমি দুনিয়াবি বাড়ি-গাড়ি, টাকার মোহে আটকাই না। আমি আটকে গেছি তোমার মোহে ইরাপাখি। শুধু তুমি বদলে যেও না। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমায় ভালোবেসো। আমি আমার ইরাপাখির সুখের জন্য জান কু'র'বা'ন করব। এতেই প্রকৃত সুখ।”

কথাগুলো বলে সৌম্য থামে। ইরার কপালে তার ঠেকানো কপাল সরায়। তাকায় ইরার পানে। ইরা অবাক হয়ে সৌম্যকে দেখে। অতি আনন্দে আবেগী অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সৌম্য’র গালে হাত দিয়ে বলে,
“ভালোবাসি সৌম্য।”

সৌম্য হাসল। কোথায় যেন শুনেছিল, গাছতলায় বসেও সুখী হওয়া যায়, যদি পাশে ভালোবাসার মানুষটা থাকে। কথাটা আজ তাদের সাথে ভীষণরকমভাবে মিলে গেল। সৌম্য ইরার হাতের তালুতে একটা চুমু এঁকে বলে,
“বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা হারানোর শোক আমাকে দুঃখ দিতে পারেনা ইরাবতী। তাই এসব ভেবে আর কাঁদবে না। আমি বাড়ি হারিয়েছি তোমাকে না। তাই আমি সুখী।”

ইরা উত্তর করে,
“আমিও। কিন্তু আকাশ ভাইয়া….

মাঝপথে সৌম্য মলিন হেসে বলে,
“মানুষ কাউকে ক'ষ্ট দিয়ে যতটা অশান্তিতে ভোগে, ততটা অশান্তিতে সে ভোগেনা, যে তার স্বীকার হয়। আকাশ ভাইয়ার মাঝে যদি একটি মন থেকে থাকে, তবে সে তার ছোট ভাইকে দেয়া ক'ষ্টের কারণে দিনশেষে ঠিকই ছটফট করবে। সে কেন এমন করছে জানিনা। তবে আমি এটুকু জানি, সময় যেমন সবকিছু এলোমেলো করে দেয়, সেই সময়-ই আবার সবকিছু গুছিয়ে দেয়। ততদিন ধৈর্য রাখতে হয় ইরাবতী।”

ইরা খুব মন দিয়ে শুনলো সৌম্য’র কথা। সৌম্য কি সুন্দর করে কথা বলে। ইরার এখন অনেকটা হালকা লাগছে। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“ল্যাপটপ তো নেই৷ আবারো চাকরির পরীক্ষা দিব ইরাবতী। কয়েকমাস আমার অভাবী সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেনা ইরাপাখি?”

এবার ইরার কান্না পায়। সৌম্য এভাবে কেন বলে? সে সৌম্য’র দুঃখের দিনে সৌম্য’র পাশে থাকবে না তো কার পাশে থাকবে? ইরা হাঁটুতে ভর দিয়ে সামান্য উঁচু হয়। সৌম্য কিছু বোঝার আগেই ইরা শ'ক্ত করে সৌম্য’র গলা জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বলে,
“তুমি জানোনা, আমি আমার সৌম্য’র জন্য সবকিছু করতে পারি?”

সৌম্য মৃদু হাসল। কিছু বলল না।
_____________________

ধরনীর বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। সৌম্য ইরাকে নিয়ে বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিছুক্ষণ আগেই বাস থেকে নামলো। কোথায় যাবে সেটাই ভাবছে। 
গত তিন মাস আগে ইরার মা মা'রা গিয়েছে। ইরার বাবার যে সম্পত্তি ছিল, সব সম্পত্তি ইরা আর ইরার মায়ের থেকে ইরার মায়ের বাড়ির মানুষেরা কবে লিখে নিয়েছে, ওরা নিজেরাও জানেনা। ঠিক যেমন আকাশ তার সাইন কিভাবে নিয়েছে সে জানেনা। কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করার পর হাত অনেক খালি ছিল। এর মধ্যে সন্ধ্যার গলা অপারেশনে মোটা অংকের একটা টাকা গিয়ে বলতে গেলে এক টাকাও ছিল না৷ এরপর ক'মাস ফ্রিল্যান্সিং করে কিছু টাকা জমিয়েছিল৷ আর সেই কিছুর পরিমাণ মাত্র ১৮ হাজার টাকা। যে টাকা দিয়ে তারা এই ঢাকা শহরে কোন বাড়ি উঠবে? কি খাবে, সেসব নিয়েই ভাবছে সৌম্য। 
প্রায় অনেকক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ইরার পা ব্য’থা হয়ে গিয়েছে৷ ঢাকা টু বগুড়া টানা দু'বার জার্নি করে এমনিতেও শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। ইরা তার ক্লান্তিকর মাথা সৌম্য’র বাহুতে ঠেকালে সৌম্য ইরার দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে,

“খারাপ লাগছে ইরাবতী?”

ইরা ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া মুখখানা সৌম্য’র দিকে করে বলে, “একটু।”

সৌম্য বা হাতে ইরাকে তার সাথে আগলে নিল। আশেপাশে তাকিয়ে রিক্সা খোঁজে। ঠিক করল, রিহানের বাড়ি যাবে। আকাশের বাড়ি তো কখনোই যাবেনা। আপাতত আজকের রাতটা থাকার জন্য রিহানের বাড়ি ছাড়া আর কিছু মাথায় আসলো না। ঠিক করল, আজ রাতে রিহানের বাড়ি থেকে আগামীকাল বাড়ি খুঁজতে বেরোবে। 

একটি রিক্সা তাদের সামনে এসে দাঁড়ালে সৌম্য ইরাকে নিয়ে রিক্সায় উঠে পড়ে। রিক্সা চলতে শুরু করলে সৌম্য নিজ থেকে ইরার মাথা তার কাঁধে রেখে ইরাকে বা হাতে জড়িয়ে ধরে। ইরা চোখ বুজল। হাজারটা দুঃখের মাঝে, প্রিয় মানুষের কাঁধে মাথা রাখার সুখ তার কাছে এখনো আছে। সৌম্য’র ভাষায় এটাই প্রকৃত সুখ। এইতো তারা বাড়ি হারিয়েও সুখী। দিব্যি সুখী। কারণ তাদের ভালোবাসা হারায়নি। আর না কখনো হারাবে।
.
.
.
মাগরিবের নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে সন্ধ্যা কতক্ষণ যে কাঁদল তার ইয়ত্তা নেই। খুব করে চাইল, আল্লাহ সব ঠিক করে দিক। সুখ না দিল, কিন্তু এতো দুঃখ থেকে অন্তত মুক্তি দিক। কেঁদেকেটে জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখে। আসমানী নওয়ানের ডাকে সন্ধ্যা তাকায় দরজার দিকে। মায়ের মতো একজনকে দেখে সন্ধ্যা দৌড়ে এসে ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। 
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার পিঠে হাত রাখে। আজ সারাদিন সে বাড়ি ছিল না। অনকের সাথে কথা বলেছে, অনেক খুঁজেছে গত তিনবছরের একফোঁটা প্রমাণের আশায়, যা দিয়ে আকাশকে সামান্য হলেও কনভিন্স করতে পাবে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। আর বাড়ি ফিরে সৌম্য’র সাথে করা আকাশের ঘটনায় ভদ্রমহিলা রীতিমতো বড়সড় শক্ পেয়েছে। তিনি একটুও বুঝতে পারছেন না আকাশ এসব কেন করছে। কি এমন শ'ত্রু'তা বাঁধল যে আকাশ সৌম্য’র পিছনে এভাবে উঠেপড়ে লাগলো? 

সন্ধ্যা বহুক’ষ্টে নিজেকে সামলে বলে,
“তোমার ছেলে এসব কিভাবে করতে পারলো আম্মা? সৌম্য ভাইয়া অনেক ক'ষ্ট পেয়েছে। আমার খুব ক'ষ্ট হচ্ছে। তোমার ছেলেকে কিন্তু ছাড়বো না বলে দিলাম।”

আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার চোখের পানি মুছে দেয়। মৃদুস্বরে বলে, “সৌম্য এখন কোথায়?”

সন্ধ্যা উত্তর দেয়, “জানিনা। অনেকবার কল করেছি, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ দেখায়। আমার চিন্তা হচ্ছে।”

আসমানী নওয়ান কিছু একটা ভেবে বলে, “তোর ভাইয়ের একটা বন্ধু ছিল যে। কি যেন নাম?”

“রিহান ভাইয়া?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। ওই রিহানকে একটা কল করে দেখ। সৌম্য কোথায় ও জানতে পারে। ও তো সৌম্য’র বন্ধু।”

সন্ধ্যা মাথা নাড়লো। এটা তো তার মাথায় আসেনি৷ দু'হাতে ভেজা মুখ মুছে সন্ধ্যা তার ফোন থেকে রিহানের নাম্বারে কল করে। ১ম বারেই রিসিভ হয়। সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“রিহান ভাইয়া আমার সৌম্য ভাইয়া কোথায়, আপনি কি জানেন?”

ওপাশে রিহান চুপ থাকলো। অনেকগুলো মাস পর আজ সন্ধ্যার কণ্ঠ শুনলো ছেলেটা। কণ্ঠ শুনেই বুঝেছে সন্ধ্যা কেঁদেছে হয়ত। সৌম্য, ইরা তার বাসায় আসার পর সে ইরার থেকে সব শুনেছে। সৌম্য চাপা স্বভাবের৷ ওকে জিজ্ঞেস করলে ও এড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু ইরা নিজ থেকেই বলেছে। রিহান আকাশের ফিরে আসা থেকে শুরু করে আকাশের প্রতিটি কর্মকান্ড শুনে অবাক হয়েছে। সন্ধ্যা ভালো নেই ভেবে ছেলেটার মুখে ব্য’থার ছাপ। সে সন্ধ্যাকে পায়নি, কিন্তু সে সবসময় চেয়েছে সন্ধ্যা ভালো থাকুক। কিন্তু সন্ধ্যা ভালো নেই। এটা ভাবলেই রিহানের ক'ষ্টের রেশ বেড়ে যায়। 

সন্ধ্যা কোনো রেসপন্স না পেয়ে আবার ডাকে, “রিহান ভাইয়া?”

রিহানের ধ্যান ভাঙে। উত্তর দেয়,
“সৌম্য আমার বাড়িতে আছে। 
কথাটা বলে রিহান বেশ দোনামোনা করে বলে, তুমি কি কেঁদেছ সন্ধ্যা?”

সৌম্য রিহানের বাড়ি শুনে সন্ধ্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তবে রিহানের প্রশ্নে সে ভীষণ বিব্রতবোধ করে। ছোট করে বলে,
“স্বর্দি লেগেছে ভাইয়া। রাখছি।”

বলেই কল কেটে দেয় সন্ধ্যা। রিহান চোখ বুজে চাপা শ্বাস ফেলে। রিহানের ইচ্ছে ছিল সন্ধ্যার বাচ্চা হওয়ার পর, বাচ্চাটার বয়স কয়েক মাস হলে, সে সন্ধ্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে। সন্ধ্যার পুরো জীবন এখনো পড়ে আছে। সারাজীবন তো কেউ একা থাকেনা। সন্ধ্যা-ও দিনে দিনে আকাশকে ভুলে মুভ অন করবে। আর সন্ধ্যার সঙ্গী হবে সে। তার ভাবনার শুরু হতে না হতেই ইতি ঘটে গেল। রিহানের ভীষণ আফসোস হলো, আকাশ ফিরে আসায়। কেন যেন রা'গ-ও হলো আকাশের উপর। আকাশ না ফিরলে সন্ধ্যারাণী তার হতো। সন্ধ্যার বাচ্চাকে সে ফেলত না। সে সন্ধ্যার বাচ্চার বাবা হত। তার কোনো প্রবলেম ছিল না। কিন্তু সব এক নিমিষেই ভেস্তে গেল আকাশ ফিরে আসায়। 
.
.
সৌম্য রিহানদের বাড়ি আছে, এটা সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে জানালে ভদ্রমহিলা সন্ধ্যাকে নিয়ে রিহানদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। আর দেরি করেনি। আকাশ সৌম্যকে বের করে দেয়ার পর সৌম্য যে আর এই বাড়ি আসবেনা, এটা তারা সবাই খুব ভালো করেই জানে। না জানার কথাও না। সৌম্য ভীষণ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ছেলে, তা সবার জানা। আর এজন্য আসমানী নওয়ান নিজেই সৌম্য’র কাছে আসছেন। সন্ধ্যা রিহানদের বাড়ি চেনে তাই অসুবিধা হয়নি। আসমানী নওয়ান মূলত আকাশের ব্যাপারে অনেক অজানা কথা সন্ধ্যা আর সৌম্যকে জানাতে চায়। এই পরিস্থিতিতে আকাশের ব্যাপারটি খোলাশা করার ভীষণ প্রয়োজনবোধন করল। সাথে এটাও জানাবে, আকাশ স্মৃতি হারানোর কারণে সৌম্যকে চিনলেও উদ্ভট আচরণ করছে, আর সন্ধ্যাকে চিনছে না। 

সন্ধ্যা আর আসমানী নওয়ান রিহানদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা দু'বার কলিংবেল চাপলে রিহানের মা এসে দরজা খুলে দেয়। সন্ধ্যা রিহানের মাকে সালাম দিলে ভদ্রমহিলা গোমরামুখে সন্ধ্যার সালামের উত্তর নেয়। সৌম্য, সন্ধ্যা তার বাড়ি আসায় সে মোটেও খুশি নয়। কারণ তার ছেলের ছন্নছাড়া জীবনের জন্য সে সন্ধ্যাকেই দায়ী করে। রিহানকে হাজারবার বিয়ে করার কথা বলেও রাজি করাতে পারেনি। রিহানের উত্তর, ‘সে এক্ষুনি বিয়ে করবেনা৷ সময় লাগবে তার।’
তিনি খুব ভালোই বোঝে রিহান তাকে থামিয়ে রাখার জন্য এই কথা বলে। ছেলের এমন অবস্থা দেখলে কোন মা মেনে নেয়? এজন্যই সন্ধ্যার দোষ না থাকলে সে সন্ধ্যাকেই দোষী মনে করে। 

আসমানী নওয়ান, সন্ধ্যা বাড়ির ভেতর যায়। ডাকে ‘সৌম্য ভাইয়া’ বলে। বোনুর গলা পেয়ে সৌম্য রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সৌম্য’র পরনে হাতকাটা একটা কালো টি-শার্ট, কালো প্যান্ট। 
বেশিক্ষণ হয়নি রিহানের বাড়ি এসে পৌঁছেছে। জ্যাকেট খুলে রেখে হাতমুখ ধুয়ে মাত্র বেরিয়েছে, তখন-ই বোনুর গলা পেয়ে বেরিয়ে এসেছে। 

ভাইয়ের শুকনো মুখ দেখে সন্ধ্যার চোখের কোণে পানি জমে। দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে ভাইয়ের বুকে মাথা রাখে। জড়িয়ে ধরে শ'ক্ত করে। তার ভাই তার প্রথম আশ্রয়স্থল। একসময় তার পাশে একটা পোকাও ছিল না, শুধু তার ভাইয়া ছিল। কত ক'ষ্ট করে তাকে বড় করেছে তার ভাইয়া! বাবা-মা সবার ভালোবাসা তার ভাইয়া একাই তাকে দিয়েছিল। সেই মানুষটা আজ যখন এতো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায়, তখন সন্ধ্যা কি করে মানবে? সন্ধ্যা খুব করে চাইল, তার সৌম্য ভাইয়ার সব দুঃখ তার হোক। কিন্তু তার ভাইয়া ভালো থাকুক। 

সৌম্য সন্ধ্যার মাথায় হাত রেখে ডাকে, “বোনু?”

সন্ধ্যা মাথা তুলে তাকায়। ভেজা কণ্ঠে বলে, “ভাইয়া তোমার বাড়ি….

সন্ধ্যার গলা বেঁধে আসে। সৌম্য মৃদু হাসল। বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, “এসব কেন ভাবছিস? আমি ঠিক আছি বোনু। আমার কাছে ইরাবতী আর তুই আছিস তো। তোরাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।”

সন্ধ্যা মলিন মুখে তাকায়। আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে বলেন,
“সৌম্য আব্বা আমার কিছু কথা আছে তোমাদের সাথে। বসবা একটু?”

সৌম্য আসমানী নওয়ানের দিকে তাকায়। ছেলের কাজে ভদ্রমহিলা যে ভীষণ আপসেট তা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সৌম্য সম্মতি দেয়। রিহান ড্রইংরুমে নিয়ে যায় সবাইকে নিয়ে। সৌম্য’র দু'পাশে ইরা আর সন্ধ্যা বসে। আসমানী নওয়ান সামনে বসে। আরেকপাশে রিহান বসে। যার দৃষ্টি সন্ধ্যার শুকনো মুখের দিকে। সন্ধ্যা বাইরে বের হলে মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে দূর থেকে দেখত। মাঝে অনেকগুলো দিন আর দেখা হয়নি৷ আসমানী নওয়ানের কথায় তার ধ্যান ভাঙে।

“জ্যাক ডাল্টন। যাকে আমরা সবাই জেডি বলে ডাকি। জেডি আকাশের স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড। আকাশ যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, তখন তাদের বন্ধুত্ব হয়েছিল। ওদের বন্ধুত্ব স্কুল, কলেজ, এমনকি ভার্সিটি পর্যন্ত সবার চোখে পড়ার মতো ছিল। এমন-ও হয়েছে আকাশ জেডির মেসে গিয়ে এক সপ্তাহ টানা থেকেছে। আকাশের বাবা আকাশকে নিতে গেলে আকাশ আসতো না। এই আলিশান বাড়ি রেখে ও জেডির কাছে গিয়ে পড়ে থাকতো ছোটোখাটো মেসে। একজনের জায়গায় দু'জন গাদাগাদি করে থাকতো। আমি, আকাশের বাবা রা'গ করলেও আকাশ সেসব গায়ে মাখতো না। এভি / জেডি এদের সম্পর্কটাই ছিল এমন যে ওদের নিয়ে পুরো দুনিয়ার মানুষ হাজারটা কথা বললেও ওরা দু'জন দু'জনের গলা ধরে থাকতো। কারো কথা কানে নিত না। কলেজ লাইফ পর্যন্ত আমি আকাশ, জেডি দু'জনকেই খুব ভালোভাবে দেখলাম। কিন্তু ভার্সিটি ওঠার পর জেডি হঠাৎ ইংল্যান্ড পাড়ি জমায়। আকাশ তখন দিশেহারা ছিল। জেডি তার ২৪ ঘণ্টা একসাথে থাকার মতো বন্ধু ছিল। হঠাৎ এতো কাছের বন্ধু কিছু না বলে না কয়ে চলে গেলে যেমন হয়, আকাশের অবস্থা তেমনি হয়েছিল। ভার্সিটির ১ম সেমিস্টারের এক্সাম পর্যন্ত আকাশ দেয়নি জেডির শোকে। আমার আর ওর বাবার কাছে এসে বাচ্চাদের মতো বায়নাও করেছে জেডিকে বাংলাদেশে ফিরতে বলতে। কিন্তু জেডির সাথে আমাদের আকাশের মাধ্যমেই পরিচয়। আমরা জানতাম না জেডি কোথায়। যেগাযোগ-ও করতে পারিনি। দেখতে দেখতে সেকেন্ড সেমিস্টার চলে আসে। আকাশের পড়ায় মন নেই। সে বন্ধুর শোকে তখনো কাতর। আমি আর আকাশের বাবা আকাশকে বোঝালাম সে আবারও এক্সাম না দিলে ইয়ার লস যাবে। আর সে অনার্স শেষ করলে তাকে আমরা বিদেশ পাঠাবো। যে দেশে জেডি গিয়েছে সেই দেশেই পাঠাবো। আকাশের কথা ছিল, জেডি ভার্সিটি ভর্তি হওয়ার পর চলে গিয়েছে। ও ফিরলে তারা একসাথেই এক্সাম দিবে৷ নয়তো সে একা একা উপর ক্লাসে উঠে যাবে, যা আকাশের ভীষণ অপছন্দের ছিল। যেখানে সে আর জেডি স্কুল লাইফ থেকে আলাদা ক্লাস তো দূর, আলাদা বেঞ্চেও কখনো বসেনি সেখানে তাদের ক্লাস আলাদা হয়ে যাবে? আকাশ মানেনি। 
ভাগ্য সহায় থাকায় চার মাসের মাথায় জেডি বাংলাদেশে ফিরে আসে। এয়ারপোর্ট থেকে সর্বপ্রথম আমাদের বাড়িতেই আসে। কোনোদিকে না তাকিয়ে আকাশকে জাপ্টে ধরে সে সেদিন কেমন অদ্ভুদভাবে কেঁদেছিল। আমি, আকাশের বাবা অবাক হয়েছিলাম। আকাশ ভীষণ বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে, জেডির কি হয়েছে। আমরাও জিজ্ঞেস করি। কিন্তু জেডি কিছুই বলেনি। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছিল। পরবর্তীতে জেডি আকাশকে এ ব্যাপারে কিছু বলেছিল কি-না জানিনা। আমি জিজ্ঞেস করলে আকাশ প্রতিবার-ই এড়িয়ে গিয়েছে। এরপর আবারো তাদের সেই বন্ধুত্ব। তারা একসাথে এক্সাম দিল। ১ম সেমিস্টারের রিটেক দিল একসাথে। কিন্তু বছরখানেক পর খেয়াল করলাম আকাশের মাঝে অনেক পরিবর্তন। ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়তে থাকলো। আকাশের উগ্রতা, চালচলন কেমন যেন হয়ে গেল। আকাশকে চিনতেই পারতাম না আমরা। আমার নিজেকে দিশেহারা লাগে। আমি কি করব, কোথায় যাবো কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না৷ আকাশের আচরণে এতো পরিবর্তন হয়েছিল যে ও রাতে ক্লাবে পর্যন্ত যেত। সারারাত ক্লাবে কা'টিয়ে সকালে বাড়ি ফিরত।”

একটানা কথাগুলো বলে আসমানী নওয়ান থেমে যায়। সন্ধ্যার দৃষ্টিতে বিস্ময়। আসমানী নওয়ান খেয়াল করলেন তা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো বলতে শুরু করেন, 

“আকাশের জীবনে কোনো মেয়ের অস্তিত্ব ছিল না। কারণ আমি পুরোপুরি জানিনা। তবে ওর মেয়েদের প্রতি ভীষণ বিতৃষ্ণা ছিল কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। এটা বুঝেছিলাম, যখন আমি ওকে ভালো পথে আনার জন্য বিয়ে দিতে চাইছিলাম। ও ভার্সিটি পড়াকালীন ওকে বিয়ে দিলে, ভালো মেয়ের সংস্পর্শে এসে ও ভালো হয়ে যাবে ভেবেছিলাম। কিন্তু আকাশকে রাজি করাতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি৷ বারবার ব্যর্থ হয়েছি। 
এরপর জানতে পারলাম আকাশ আসলে জেডি’র জন্যই এমন হয়েছে। ওই যে কথায় আছে, ‘সঙ্গদোষে লোহা ভাসে।’ আকাশের ক্ষেত্রে তেমনি হয়েছিল। জেডির সব চালচলন যেন আকাশ নিজের মাঝে নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছিল। আমার তখন জেডিকে অসহ্য লাগতো। ওর জন্যই আমার ছেলে সেদিন বেপথে গিয়েছিল। আমি জেডির সঙ্গ ছাড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি এখানেও ব্যর্থ হয়েছি। জেডি আর আকাশের বন্ধুত্বের বন্ধন এতোটা দৃঢ় ছিল, এগুলো ঠুনকো কিছুতে ভাঙতো না। আমি অনেক চেষ্টা চালানোর পর একদিন সফল হই, যখন আকাশ আর জেডি থার্ড ইয়ারে, তখন। অরুণ আমাকে অনেক সাহায্য 
করেছিল এ ব্যাপারে। 
এরপর আকাশ ভার্সিটির সবার সামনে জেডিকে অপমান করেছিল খুব বাজেভাবে। জেডি-ও প্রিয় বন্ধুর থেকে এতো অপমানিত হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যায়। তারপর আকাশ কেমন যেন নির্জীব হয়ে যায়।”

আসমানী নওয়ান কথায় দাঁড়ি টানে। সময় নেয়। 
সৌম্য, ইরা, রিহান ভার্সিটি গিয়েছিল, যখন আকাশেরা লাস্ট ইয়ারে ছিল। তারা মাঝে-মাঝে জেডি আর এভিকে দেখত। আবার কখনো দেখত না৷ তারা এতোকিছু জানতোও না। লোকমুখে শুধু শুনেছিল এভি/জেডি দুই বন্ধু। এটুকুই।
সকলের মুখে অজানা কৌতুহল। বোধয় জানতে চাইছে, আসমানী নওয়ান আর অরুণ কি এমন করেছিল যে, এভি/জেডি এদের এতো ভালো বন্ধুত্ব মুহূর্তেই ভেঙে গেল? 

আসমানী নওয়ান এ বিষয়ে কিছু বললেন না। এটুকু স্কিপ করে আবার-ও বলতে শুরু করেন,
“আকাশ ভীষণ একরোখা টাইপ। ওকে যদি কোনো কিছু একবার বিশ্বাস করানো যায়, তাহলে সেখান থেকে বের করা খুব কঠিন। ক'দিন পর জেডি দেশে ফিরে আসে। আকাশের পিছু পিছু ঘোরে। কিন্তু আকাশ তার জায়গায় স্ট্রিক। কিছুদিনের মাথায় আকাশ ওর সোনালি চোখের মণিজোড়া ঢেকে ফেলে কালো লেন্সে। কারণ জেডি ওর সোনালি চোখ পছন্দ করত। ও জেডিকে ক'ষ্ট দেয়ার জন্য, জেডির পছন্দ এভোয়েড করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমি নিষেধ করিনি। বরং বলেছিলাম, ও অন্ধ হয়ে গেলেও লেন্স পড়ে থাকুক। তবুও জেডিকে ভুলে যাক। জেডির ছায়াও আকাশের উপর না পড়ুক। ভালো মানুষ হয়ে থাক। এটাই চেয়েছিলাম। 
দেখত দেখতে আকাশের অনার্স শেষ হয়। সে আমাদের জানায়, সে ইংল্যান্ড পিএইচডি করতে যেতে চায়। আমরা নিষেধ করিনি। বরং ভেবেছিলাম ওখানে গিয়ে নতুন বন্ধু হবে। নতুন বন্ধু পেয়ে জেডিকে ভুলে যাবে। কিন্তু আমাদের ভাবনা সঠিক হয়নি। আকাশ ইংল্যান্ডে গিয়ে পড়াশোনা করেছে ঠিকই, সাথে নিজেকে গড়েছিল এক মাফিয়া হিসেবে। যে বিভিন্ন খারাপ কাজে জড়িত হয়ে গিয়েছিল। খু’ন খারাপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল। 
পিএইচডি শেষ করে আকাশ যখন বাড়ি ফিরল তখন আমরা কেউ আকাশকে চিনতে পারিনি। সে কারো কথা শুনতো না। 
বাসায় অনেক বড় বড় উচ্চপদস্থ মানুষদের যাওয়া-আসা থাকতো। যাদের সাথে আকাশের মেলামেশা ছিল। রাত-বিরাতে বাড়ি ফেরা। কেউ একটু উঁচু গলায় কথা বললে হাত-পা ভেঙে দেয়া,, আবার কাউকে কাউকে চোখের পলকে লা'শ বানিয়ে দেয়া। নিত্যদিন মদ্যপান করত পানির মতো। মানুষ দিনে যে পরিমাণ পানি-ও খায়না, তেমন মদ পান করত আকাশ। এসবই ছিল আকাশের নিত্যদিনের সঙ্গী। 

আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আকাশের বেশভূষায়। আকাশকে যতবার বোঝাতে গিয়েছি, আকাশ ততবার গা ছাড়া ভাবে থেকেছে। আমার সাথে হেয়ালি করেছে। অবাক করার ব্যাপার ছিল জেডি ইংল্যান্ড থাকলেও জেডির সাথে আকাশ তার সম্পর্ক সেদিনও জোড়া লাগায়নি। একরোখা, জেদি আকাশ জেডিকে বরাবরেই মতোই দূরে সরিয়ে রেখেছিল। 
আমি অধৈর্য হয়ে গেলাম। মনে হলো, আকাশকে বিদেশে পড়তে পাঠানোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি আর না পেরে আকাশকে শাসন করতে গেলাম। চিৎকার, চেঁচামেচি করলাম। থা’প্প’ড় মা'রলাম। আকাশ সেদিন অনেক রে'গে গিয়েছিল। পুরো বাড়ির জিনিস সব তছনছ করে রা’গ নিয়ে আবারো পাড়ি জমিয়েছিল ইংল্যান্ড। যা আজ থেকে তিন বছর আগের কথা। আজ আকাশের স্মৃতি সেখানেই আটকে আছে।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে আসমানী নওয়ানের গলা বেঁধে আসে। চোখের কোণে জলকণা। সবাই কেবল অবাক হয়ে শুনছে আকাশের সেই কালো অতীত৷ কৌতুহল জেগেছে, তাহলে মাঝের আকাশ এতো ভালো কিভাবে ছিল?
আসমানী নওয়ান নিজেকে সামলে আবারও বলে,
“আমি অনেক কেঁদেকেটে, অসুস্থতার দোহাই দিয়ে, অনেক ক’ষ্টে আকাশকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলাম। খুব কৌশলে আকাশের সাথে কাজ করেছিলাম। আকাশের গড়া সবকিছুতে আমি পিছন থেকে তালা লাগিয়েছিলাম। এরপর শেষমেশ আকাশকে রিহাবে পর্যন্ত পাঠিয়েছিলাম। দীর্ঘ এক বছর আকাশ রিহাবে ছিল। আমি বা আকাশের বাবা কেউই একদিনের জন্য-ও আকাশকে দেখতে যায়নি। একবছরের মাথায় খবর আসলো, আকাশ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর টিকতে না পেরে ছুটে গিয়েছিলাম আমার ছেলের কাছে৷ আকাশের চুল-দাঁড়ি সব বড় হয়ে গিয়েছিল। কেমন পা'গ'লের মতো দেখাচ্ছিল। উষ্ক-খুষ্ক রোগা আকাশকে দেখে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছিল। একটা বছর বুকে পাথর চেপে দূরে ছিলাম। ছেলের ভালোর জন্য যতটা কঠোর হতে হয়, হয়েছিলাম। তার ফল সেদিন পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম বাচ্চাদের মতো আকাশকে। সে আমাকে দেখে সেদিন বাচ্চাদের মতো নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দু'হাতে আমার পা সাপ্টে ধরে বলেছিল,

‘মা, তোমার পায়ে পড়ি। আমায় বাড়ি নিয়ে যাও মা। এখানটায় খুব অন্ধকার, জানো? আমার দমবন্ধ লাগে। আমার এখানে থাকতে খুব ক'ষ্ট হয়। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি আর খারাপ কাজের সাথে নিজেকে জড়াবো না। আমি ভালো হয়ে যাবো মা। আমাকে তোমার সাথে বাড়ি নিয়ে যাও। আমায় মন ভরে প্রকৃতি অনুভব করতে দাও। আমার আর কিচ্ছু চাইনা মা। এই অন্ধকার ঘরে আমাকে আর রেখে যেও না। দয়া কর মা।”

আকাশের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে আমার দু'পা ভিজেছিল সেদিন। দীর্ঘ রাত পেরিয়ে সকালে যেমন সূর্যের আলো দেখতে পাই। তেমনি সেদিন আমি আমার আকাশের অন্ধকার জীবন থেকে আলোকিত জীবনে আসারা এক নতুন সকাল দেখেছিলাম। আকাশকে বাড়ি নিয়ে আসলাম। সে তার বাবার ব্যবসায় জয়েন করল। আমার ছেলেটা ভালো হয়ে গেল। জন্ম থেকে যেটুকু রা'গ ছিল, সেটাই মাঝেমাঝে এপ্লাই করত। তাছাড়া আমার ভীষণ বাধ্য ছিল। এরপর আকাশের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে সন্ধ্যার সাথে বিয়ে দিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি যে আকাশকে গড়েছিলাম, সে সন্ধ্যাকে ঠিক একদিন ভালোবাসবে৷ আমার বিশ্বাস সত্য প্রমাণিত হলো। কিন্তু তার পরিণতি এমন হবে ঘুনাক্ষরে-ও টের পাইনি।”

সকলে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। সন্ধ্যার চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। কেন কাঁদছে সে জানেনা। রিহাবে বলা আকাশের অসহায়ত্বে ঘেরা কথাগুলো বলার সময় আকাশের অবস্থা যেন সন্ধ্যার চোখে ভাসল। আকাশ এতো ক'ষ্ট করে সেই লাইফ থেকে ফিরে আবারো সেই পথে চলে গিয়েছে। এর চেয়ে ক'ষ্টের আর কি আছে?

আসমানী নওয়ানের চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়ায়। সে নিজেকে সামলে বলে,
“আকাশকে জেডি বাঁচিয়েছে জানি। এরপর ও ইংল্যান্ড থেকে আবারো সেই জীবনের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছে৷ আর সেই এক্সিডেন্টে ছেলেটার কিছু স্মৃতি মুছে গিয়েছে। যে স্মৃতির পাতায় তার কামব্যাক থেকে শুরু করে সন্ধ্যাকে বিয়ে করা, সন্ধ্যাকে ভালোবাসা,, এসব ছিল। সব মুছে গিয়েছে।”

লাস্ট কথাটায় সন্ধ্যার জন্য বোধয় সবচেয়ে বড় ঝটকা ছিল। এজন্য আকাশ তাকে চিনতে পারেনা? মেয়েদের প্রতি সেই বিতৃষ্ণা আকাশের মনে পুষে আছে? সন্ধ্যার চোখ বেয়ে ক'ফোঁটা জল গড়ায়। এইবার আকাশের করা প্রতিটি কাজের পিছনে কারণ বুঝল। আকাশ কি আর কখনো তাকে মনে করবে না? কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যার আরও কান্না পায়। তার আকাশ যে এই আকাশের মাঝেই হারিয়ে গেছে। সে কিভাবে খুঁজে পাবে তার আকাশকে?

সৌম্য, ইরা, রিহান সকলে স্তম্ভিত হয়ে বসে আছে। তারা কেউ জানতো না আকাশের এসব কাহিনী। আজ জেনে মনে হলো, সকলেই বড়সড় শক খেয়েছে। 

আসমানী নওয়ান সৌম্য’র দিকে চেয়ে বলেন, 
“সৌম্য আব্বা, আকাশ তোমার সাথে এমন কেন করছে তা আমি জানিনা। কিন্তু কেউ এর পিছনে আছে। যে আকাশকে নিশ্চয়ই ভুল কিছু বুঝিয়েছে। যে কারণে আকাশ তোমাকে শ'ত্রু ভেবে বারবার আ'ঘা'ত করছে। তুমি আকাশকে ভুল বুঝো না আব্বা।”

সৌম্য ঢোক গিলল। কেন যেন একটু হলেও শান্তি লাগলো। কারণ আকাশ নিজের অনিচ্ছায় সব কাজ করছে৷ কাছের মানুষরা কারণবশত বদলে যাওয়ার মতো আচরণ করলে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ইচ্ছে করে বদলে গেলে মেনে নেয়া যায় না। আকাশ যা করছে সব অনিচ্ছায়, কারো প্ররোচনায়। কথাগুলো ভেবে সৌম্য ঢোক গিলল। ছোট করে বলে, “জ্বি।”

আসমানী নওয়ান আর বসলেন না। অনেক রাত হয়েছে। সন্ধ্যাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে সন্ধ্যা সৌম্য’র থেকে বিদায় নেয়৷ সৌম্য সন্ধ্যাকে সাহস দেয়। সন্ধ্যা বুঝেছে বোধয় অনেক কিছু। 
.
.
.
বাড়ি এসে সন্ধ্যা ফ্রেশ হয়ে এসে আয়নায় নিজেকে দেখে। ডান গালে সকালে আকাশের মা'রা থা’প্প’ড় খেয়ে গালের অবস্থা খুব খারাপ। সৌম্যর কাছে যাওয়ার আগে সে এখানে পাউডার দিয়েছিল, যেন সৌম্য বুঝতে না পারে। এমনিই তার ভাইয়ের কত দুঃখ। তার দুঃখে সৌম্য ভাইয়াকে আর ব্য’থিত করতে চায়নি। 
সন্ধ্যার মন ছটফট করে আকাশকে দেখার জন্য। সেই আকাশ, যে আকাশের মাঝেই কোথাও না কোথাও তার আকাশের অস্তিত্ব মিশে আছে। কিন্তু বাড়ি এসে আকাশকে দেখেনি। আকাশ বোধয় সেই সকালে বেরিয়েছে আর বাড়ি ফেরেনি।

আসমানী নওয়ান বাড়ি এসে  ফ্রেশ হয়ে নেয়। এরপর সে সন্ধ্যার জন্য ঘরে ভাত আনলে সন্ধ্যা আয়নার সামনে থেকে সরে এসে বিছানায় বসে। ভদ্রমহিলা সন্ধ্যার পাশে বসে সন্ধ্যাকে নিজহাতে খাবার খাইয়ে দেয়। সন্ধ্যা জেদ করেনা। চুপচাপ খেয়ে নেয়। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে খাওয়ানো শেষে প্লেট রেখে আসে। এরপর সে সন্ধ্যার পাশে বসে সন্ধ্যার গালে হাত রেখে মলিন গলায় বলে,

“আমি মা হয়ে আকাশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে অনেক ক'ষ্ট সয়েছি মা। আমার হয়ত আর সেই ধৈর্য নেই। এবার আকাশকে সঠিক পথে আনার ভার তুই নিবি তো মা?”

সন্ধ্যা ছলছল চোখে তাকায়। সে বোধয় বড় হয়ে গেল। এতোদিন সবাই তার দায়িত্ব পালন করেছে। কখনো তার সৌম্য ভাইয়া, আবার কখনো তার আকাশ। এবার দায়িত্ব এসে পড়েছে তার উপর। সন্ধ্যা নিজেকে শ'ক্ত করে। সে আকাশের পাশে না থাকলে আর কে থাকবে? সে আকাশের প্রতি কখনো কঠোর হবে, কখনো বা নমনীয় হবে। আর এভাবেই ঠিক একদিন আকাশ আবারও আগের মতো হয়ে যাবে। আবারও তাকে মনে করবে। এসবই তো তার দায়িত্ব। সে যে আকাশের সন্ধ্যামালতী। 
___________________

ঘড়ির কাটায় রাত ১ টা। আকাশ বাড়ি ফিরেছে মাত্র। চারপাশটা অন্ধকার দেখে ভীষণ বিরক্ত হলো। ঘরে যাওয়ার জন্য সামনের দিকে পা বাড়ায়। পরনে সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট, তার উপর সাদা জ্যাকেট।
স্বভাবসুলভ আকাশ ডানবামে মাথা নাড়ায়। কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ ডানদিকে কিছু একটা চোখে পড়ে। আকাশ সাথে সাথে আবার-ও ডানদিকে মাথা ঘোরায়। মায়ের ঘরের লাইট জ্বালানো। দরজা বরাবর বিছানা। এদিকে ফিরে কম্বলের নিচে সন্ধ্যা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আকাশের যেটা অবাক লাগলো, সন্ধ্যা ঘুমোতে ঘুমোতে হাসছে। আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এই মেয়ে সত্যি সত্যি কি পা'গ'ল না-কি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবার কেউ হাসে? আকাশ এগিয়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সন্ধ্যার মাথার কাছে। সে এখানে আসতে আসতে সন্ধ্যার হাসি মিলিয়ে গিয়েছে। আকাশ বিরক্ত হলো৷ এতক্ষণ হাসছিল, সে আসতেই থেমে গেল। ইচ্ছে করল, ঠাস করে একটা লাগাতে। তাছাড়া আকাশের সকালের কথা মনে পড়ল। একে একে সন্ধ্যার বলা বে'য়া'দ'বি কথাগুলো কানে বাজতেই আকাশের দৃষ্টি শ'ক্ত হয়ে আসে। এই মেয়ে তো হিসাব ছাড়া তার হাতের থা’প্প’ড় ডিজার্ব করে। কথাটা ভেবে সন্ধ্যার গালে নজর করলে আকাশের শ'ক্ত দৃষ্টি মুহূর্তেই শীতল হয়ে আসে। সেই থা’প্প’ড় মা'রা গালটি এদিক ফেরানো। যেখানে লাইটের আলোয় জ্বলজ্বল করছে কা'টা কা'টা। মনে হচ্ছে কিছু দ্বারা চিঁড়ে গিয়েছে, কে'টে গিয়েছে। জখম হয়ে আছে। আকাশ এক দেখাতেই বুঝল এটা তার সকালের থা’প্প’ড়ের ফল। আকাশের কি হলো কে জানে, সে ধীরে ধীরে ঠান্ডা মেঝেতে বসে পড়ল। ডান হাতে একটি হুইস্কি’র বোতল মেঝেতে শব্দ করে রাখে। যার অর্ধেক আকাশ অলরেডি খেয়েছে। হুইস্কি খাওয়া অভ্যেস থাকায় অনেক খেলেও সে মাতাল হয়না। 

আকাশের দৃষ্টি সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখপানে। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সন্ধ্যাকে আকাশের চোখে ভীষণ সুন্দর লাগলো। সন্ধ্যার পুরো মুখ নিখুঁতভাবে দেখতে গিয়ে দৃষ্টি ঘুরে সন্ধ্যা কা'টা গালে এসে পড়লে আকাশের অস্থির লাগলো। যে কিছুক্ষণ আগেই সন্ধ্যাকে বেহিসাব থা’প্প’ড় মা'রতে চাইল, এখন তার-ই অস্থির লাগছে সন্ধ্যার ক্ষ'ত গাল দেখে। মনে হচ্ছে ওয়াই-ফাইয়ের নেটওয়ার্কের ন্যায় এই মেয়ের গালের ব্য’থাটা তার বুকে ট্রান্সফার হচ্ছে। আকাশ ঢোক গিলল। 
বেশ কিছুক্ষণ পর আকাশ সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখপানে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,

“কে তুমি? তোমায় ব্য'থা দিয়ে আমি কেন ব্য'থা পাই মেয়ে?”

আকাশের কণ্ঠ অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। আকাশ যদি নিজেকে একবার এই রূপে দেখত, তাহলে হয়ত সে নিজেই নিজেকে কয়েকটা গা’লি দিত। কারণ তার ডিকশনারিতে, তার মেয়েদের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই। কিন্তু তার নিজেতে ধ্যান নেই। সে মগ্ন সন্ধ্যাতে। দৃষ্টিতে মুগ্ধতা। 

আসমানী নওয়ান ওয়াশরুমে গিয়েছিল। ভদ্রমহিলা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বেখায়লে সামনে তাকালে বিস্মিত হয়। আকাশকে সন্ধ্যার পাশে এভাবে দেখার ব্যাপারটি তার কাছে টোটালি আনএক্সপেক্টেড ছিল। 

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা - ৫১০০+
কতগুলো শব্দ দেখেছেন? লেট হওয়ান কারণ এটাই। আকাশের ব্যাপারটি ক্লিয়ার করলাম। আপাতত জেডি আর এভিকে টানলাম না। ওদের নিয়ে সামনে লিখব। ধীরে ধীরে আগাই। কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন। 
আর কি বুঝলেন বলুন তো? আমি তার সন্ধ্যামালতীগল্পটাই আসলে মেইন। অন্তঃদহন গল্পটা আসলে আকাশের জীবনের একটা অধ্যায় মাত্র। তার অতীতের দু-আড়াই বছরের একটা জার্নি। 
সকলের গঠনমূলক মন্তব্য আশা করছি।]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago

পর্ব:০৮

 

আকাশের দৃষ্টি এখনো সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখপানে। হালকা কে'টে যাওয়া গালটায় যতবার চোখ পড়ছে ততবার আকাশের হাসফাস লাগে। আকাশ চোখ বুজে ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। এতো অশান্তি লাগছে কেন? আকাশ উত্তর খুঁজে পায়না। সকালে সন্ধ্যার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা একে একে চোখের সামনে ভাসল। সন্ধ্যার করা বে'য়া'দ'বি কাজগুলো তাকে রা'গিয়ে দেয়ার কথা। অথচ সেসব তার উপর বিশেষ প্রভাব ফেলল না৷ প্রভাব ফেলল সন্ধ্যাকে মা’রা তার থা’প্প’ড়। আকাশের রা'গ হয়। কেন এমন হয় তার সাথে? সে কত মে'য়ের জান নিয়ে নিয়েছে, অথচ আজও তার মনে সেসবের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা  তো দূর, কিচ্ছু কাজ করেনা। আর এই মেয়েকে একটা থা’প্প’ড় মে'রে তার অ’শান্তি শেষ হচ্ছে না। আকাশ চোখ মেলে তাকায়। চোখেমুখে রা'গ স্পষ্ট। দৃষ্টিতে সন্ধ্যা। ইচ্ছে করছে এই মেয়েকে এক্ষুনি মে'রে এই দুনিয়া থেকে আউট করে দিতে। তাহলে যদি সে একটু শান্তি পায়৷ আকাশ সত্যি সত্যিই এই কাজ করতে ডান হাতে ধরে রাখা হুইস্কির বোতল থেকে হাত সরিয়ে সন্ধ্যার গলায় রাখে। রে'গে গলা চেপে ধরতে নেয়, তখন-ই সন্ধ্যা নড়েচড়ে ওঠে। গলায় হাত দেয়ায় ঘুমের ঘোরে বিরক্তির রেশ প্রকাশ করে মেয়েটি। হেলে আকাশের দিকে চলে আসে। একদম আকাশের মুখের সামনে তার মুখ এসে ঠেকে। আকাশ থমথমে মুখে তাকায়। ঢোক গিলল ছেলেটা। গালের কা'টা দা'গ আগের চেয়েও বেশি স্পষ্ট লাগছে আকাশের চোখে। আকাশ জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটজোড়া ভেজায়। সে যে সন্ধ্যার গলা চাপতে হাত তুলেছিল, তা ভুলে বসল। হাত সন্ধ্যার গলা থেকে সরিয়ে আনে সন্ধ্যার কা'টা গালে। 
আবারো দৃষ্টি নমনীয় হয়। ঘিরে নেয় অসহায়ত্ব। বুড়ো আঙুল আলতো করে চালায়। অনুতপ্ত স্বরে বলে, 
“স্যরি!”

আকাশের বলা কথাটা বেশ জোরে ছিল। যার ফলে কথাটা যেমন আসমানী নওয়ানের কানে আসে, তেমনি আকাশের নিজের বলা কথাটি নিজের কানে গিয়েই ধাক্কা খায়। আসমানী নওয়ান যেমন ছেলের কান্ডে অবাক হয়, তেমনি আকাশও নিজেও নিজের কথাতে অবাক হয়। সে সাথে সাথে সন্ধ্যার গাল থেকে হাত সরিয়ে নেয়। সে স্যরি বলেছে ভাবতেই নিজের উপর রা’গ হলো। সাথে সন্ধ্যার উপর। দৃষ্টি সন্ধ্যাতে রেখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে,

“নট স্যরি! বে'য়া'দ'ব মেয়ে! উফ! আমার শান্তি কে'ড়ে কিভাবে ঘুমাচ্ছে! তোমাকে মে'রেই ফেলব আমি। এভিকে চেনোনা তুমি!”

কথাটা বলার পর-ই সন্ধ্যা ঘুমের ঘোরে আরও হেলে আসে আকাশের দিকে। বিছানা থেকে পড়ে যেতে নিলে আকাশ দ্রুত সন্ধ্যাকে বা হাতে আগলে নেয় আর চেঁচিয়ে ওঠে,
“আরে আরে পড়ে যাচ্ছো কেন?”

কানের কাছে এতো জোরে চেঁচানোর শব্দ পেয়ে সন্ধ্যার ঘুমের রেশ কেটে যায়। ভীষণ বিরক্ত হয়। চোখমুখ কুঁচকে নেয়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। তীব্র আলোয় ঠিক করে তাকাতে পারছেনা। তবুও ঘুমঘুম চোখে দেখার চেষ্টা করে। সর্বপ্রথম দু'টো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সন্ধ্যার ঘুমের রেশে ভরা ঝাপসা চোখে পড়ে। হঠাৎ ঘুম ভেঙেই এরকম একটি দৃশ্য দেখে সন্ধ্যা ভীষণ ভ'য় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। 

আকাশ সন্ধ্যার ঘুমঘুম মুখ দেখছিল ভীষণ মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু সন্ধ্যার চেঁচানোয় তার কাজে বিঘ্ন ঘটে, সাথে ধ্যান ভাঙে। রা'গ'ল বেশ। কটমট দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। কড়া ধমক দেয়, 
“সাটআপ বে'য়া'দ'ব মেয়ে!”

ধমক খেয়ে সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ভালোভাবে তার মুখের সামনে বিদ্যমান মুখটি খেয়াল করলে দেখল এটা আকাশ। আকাশকে দেখে সন্ধ্যার ভ্রু কুঁচকে যায়। তার মনে হলো, সে স্বপ্ন দেখছে। আকাশ তার কাছাকাছি আসবে, এটা তো বাস্তবে সম্ভব নয়। চোখেমুখে এখনো ঘুমের রেশ মেয়েটার। সে ভালোভাবে চোখ মেলে এবার। বা হাতে চোখ কচলে তাকায়। নাহ্, এটা তো স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। একদম সত্যি মনে হচ্ছে। আকাশ তার দিকে রে'গে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। সে ঠিক বুঝতে পারছে না, সে আকাশের কাছে কিভাবে এলো! সে তো তার আম্মার সাথে তার আম্মার ঘরে বিছানায় ঘুমিয়েছিল। তাহলে? 

এদিকে আসমানী নওয়ান নিরব চোখে চেয়ে আছে। সে আসলে আকাশের ভাবগতি বুঝতে চাইছেন। তার কেমন যেন অদ্ভুদ লাগছে। আকাশ সন্ধ্যার প্রতি থেকে থেকে ভীষণ নমনীয় হয়ে যায়, একদম আগের মতো৷ ব্যাপারটি তিনি কিছুক্ষণ আগে নিজ চোখে না দেখলে তো বুঝতেই পারতেন না।

সন্ধ্যা নড়াচড়া করতে গেলে বুঝল সে আকাশের হাতের উপর। মেয়েটি সত্যিই বুঝল না, সে আকাশের কাছে, তাও আবার একেবারে আকাশের কোলে এসে পড়েছে। সে আবারো আকাশের দিকে তাকায়। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলতে চায়, তখন-ই আকাশ সন্ধ্যাকে ফেলার জন্য হাত আলগা করলে সন্ধ্যা বা হাতে আকাশের শার্টের কলার চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলে,

“একদম ফেলবেন না আমাকে।”

আকাশ ঢিলে হাত শ’ক্ত করে নেয়। চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। সন্ধ্যার কথার ধরনে মনে হচ্ছে, মেয়েটি তাকে আদেশ করছে৷ আকাশের রা'গ বাড়ল। দাঁতে দাঁতে চেপে বলে,
“আমাকে হুকুম করছ তুমি? এভিকে? তোমার সাহস তো কম না!”

সন্ধ্যা শুকনো ঢোক গিলল। সে বুঝে গিয়েছে, এই আকাশের সাথে ভালোবেসে কথা বললে আকাশ তার কথা তো শুনবেই না উল্টে তাকে আরও পা'গ'ল উপাধি দিতে থাকবে। এমনিতেই গত ক'দিনে সে পড়ে যাওয়ার ফলে একটু প্রবলেম হয়েছিল। নিয়াজ ভাইয়া বারবার বলেছে, বাচ্চাকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে আনতে চাইলে সাবধানে থাকতে। যদি বারবার এভাবে পড়ে গেলে তার বাচ্চার কিছু হয়ে যায়? কথাটা মনে আসতেই সন্ধ্যার বুক কাঁপে। তার বাচ্চার কিছু হলে সে কি করে বাঁচবে? সন্ধ্যা নিজেকে সামলায়। বলে,

“যা ইচ্ছা ভাবুন। আমাকে ভালোভাবে নামিয়ে দিন।”

সন্ধ্যার কণ্ঠে নমনীয়তার ছিটেফোঁটা নেই। আবার কথার ধরন দেখ। আকাশ রা'গে ফুসে ওঠে। সন্ধ্যাকে কোলে নিয়েই বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“নামাবো না। ছুড়ে ফেলব তোমাকে। একদম বাড়ির বাইরে গিয়ে পড়বে।”

সন্ধ্যা ভীত চোখে তাকায়। আকাশ সত্যি সত্যি তাকে ছুড়ে ফেললে তার বাচ্চার কি হবে? এ পর্যায়ে আসামানী নওয়ান এগিয়ে এসে বলে,
“আকাশ জান্নাতকে ভালোভাবে নামিয়ে দাও।”

মায়ের কথায় আকাশ আরও চটল। তার মা এই বাইরের ছেলে মেয়ের জন্য এতো দরদ কেন দেখায়, তার বুঝে আসেনা। মায়ের দিকে চেয়ে রে'গে বলে,
“বললাম তো নামাবো না।”

সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। কিছু একটা ভেবে সন্ধ্যা দু'হাতে আকাশের গলা সাপের ন্যায় পেঁচিয়ে ধরে। আকাশের ধ্যান তার মায়ের থেকে ঘুরে আসে সন্ধ্যার দিকে। বিরক্ত হলো সন্ধ্যার এহেন কান্ডে। রে'গে বলে,
“আরে আরে আমার গলা ছাড়ো বলছি।”

সন্ধ্যা ছাড়লো না। যদিও এভাবে ধরেছে, যেন আকাশ হাত ছেড়ে দিলেও সে পড়ে না যায়। কিন্তু এতোগুলো দিন পর আকাশকে এভাবে জড়িয়ে ধরার পর সন্ধ্যার কি ভীষণ শান্তি লাগলো। আগে আকাশ তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরত। আর আজ সে ধরেছে বলে, আকাশের কত রা'গ! সন্ধ্যার বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়।

এদিকে আকাশ শ'ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হৃৎস্পন্দনের গতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। চোখ বুজল আকাশ। আবারও সেই অশান্তি। ছেলেটার মাথা ব্য’থা শুরু হয়। মেয়েটাকে শুধু ফেলে দেয়া নয়, একদম মে'রে ফেলতে ইচ্ছে করছে। অথচ মে'রে ফেলা তো দূর, ফেলে দেয়ার কথা ভাবলেই মনে হচ্ছে, একটা থা’প্প’ড় দিলে গাল কে'টে যায়। তাহলে ফেলে দিলে নিশ্চয়ই কোমর কা'ট'বে নয়তো ফা'ট'বে। এই ভাবনাটুকু আকাশকে বারবার বাঁধা দিচ্ছে। আকাশ ঢোক গিলল। এমনিই এই মেয়ের জন্য সে শান্তি পায়না। তার উপর মেয়েটা অদ্ভুদ সব বিহেভ করে। আকাশ চোখ বুজে রেখেই রূঢ় কণ্ঠে বলে,
 
“গলা ছাড়ো। আমাকে এভাবে ধরেছ কেন?”

সন্ধ্যা চোখ বুজে নিয়েছিল। আকাশের কণ্ঠে চোখ মেলে। খারাপ লাগে আকাশকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবলে। সে আকাশের গলা ধরেছে পড়ে যাওয়ার ভ'য়ে। কিন্তু ছাড়ছে না কেন, তা বললে হয়ত আকাশ আবারও তাকে পা'গ'ল বলবে। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে আকাশের মতো করেই রূঢ় কণ্ঠে উত্তর দেয়, “আমার ইচ্ছা।”

আকাশ সাথে সাথে চোখ মেলে৷ চোয়াল শ'ক্ত হয়। তার গলা ধরে রেখে, তাকে বলছে, তার ইচ্ছা? কি বে'য়া'দ'ব ভাবা যায়! আকাশ এবার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল এই মেয়েকে একদম বাড়ির বাইরে গিয়ে ছুড়ে ফেলে আসবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। আকাশ সন্ধ্যাকে নিয়ে বড় বড় পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বুঝল না আকাশ তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। 
আসমানী নওয়ান আকাশের পিছু পিছু আসে। বলে,

“আকাশ ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”

আকাশ কিছু বলে না৷ সে তার মতো এগোচ্ছে। আর নেয়াই যাচ্ছেনা মেয়েটাকে। তার সাথে একের পর এক বে'য়া'দ'বি করছে। 
আসমানী নওয়ান পায়ের গতি বাড়িয়ে আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। মাকে দেখে আকাশের পদযুগল থেমে যায়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,

“কি প্রবলেম মা?”

আসমানী নওয়ান জবাব দেয়,
“জান্নাতকে নামাও আকাশ। ওদিকে কোথায় যাচ্ছো?”

আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“ওকে বাড়ির বাইরে ছুড়ে ফেলে আসবো। সেকেন্ডে সেকেন্ডে ও আমার সাথে বে'য়া'দ'বি করে। সামনে থেকে সরো তুমি।”

আসমানী নওয়ান কি বলবেন বুঝলেন না৷ সন্ধ্যা আরও শ'ক্ত করে আকাশের গলা চেপে ধরে। বলে,
“আমাকে ফেললে, আপনার আম্মা কিন্তু আপনাকে ভাত দিবে না, আপনি শুকিয়ে শুটকি না হওয়া পর্যন্ত৷”

সন্ধ্যার বলা কথাটা শুনে আসমানী নওয়ান আর আকাশ দু'জন একে-অপরের দিকে অদ্ভুদভাবে তাকায়। যেন এইমাত্র তারা কোনো জোক্স শুনেছে, কিন্তু অদ্ভুদ ব্যাপার তাদের হাসি আসছে না। আসমানী নওয়ান মনে মনে কপাল চাপড়ায়। মেয়েটা যে কখন কি বলে নিজেই বোঝেনা৷ 
এদিকে সন্ধ্যা কথাটা বলে নিজেই বোকা বনে গিয়েছে। আসলে সে ভাবছিল আকাশকে আটকাতে। কিছু খুঁজে না পেয়ে হঠাৎ মনে যা এসেছে, তাই মুখ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছে। 

আকাশ শ'ক্ত গলায় বলে,
“অলরেডি নিজে এক শুটকি হয়ে আছো। আবার আমাকে শুটকি বানাতে চাইছ? বে'য়া'দ'ব মেয়ে কোথাকার! আমার ওয়েট কত, জানো?”

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। ভাবল, আকাশ তাকে শুটকি বলছে কেন! যদিও সবাই বলে সে অনেক শুকিয়েছে। কিন্তু আকাশ কথাটা বলায় বোধয় একটু ভালো লাগলো এই ভেবে, আকাশ তার দিকে একটু হলেও মন দিয়েছে।

আসমানী নওয়ান দুই ছেলেমেয়ের ভিত্তীহীন কথায় হতাশ হলেন। এসব সাইডে রেখে আকাশের উদ্দেশ্যে বলে,
“আকাশ ওকে নামিয়ে দাও।”

আকাশ রে’গে বলে,
“নামাবো না ওকে।”

আসমানী নওয়ান রা’গ’তে গিয়েও রা'গলো না। আকাশের সাথে এখন রা'গ দেখিয়ে লাভ নেই বুঝল। সে আকাশকে বিব্রত করতে কথাটা ঘুরিয়ে বলে,
“তাহলে কি সারারাত জান্নাতকে কোলে নিয়ে রাখতে চাইছ?”

আকাশ থতমত খেয়ে তাকায় মায়ের দিকে। বিরক্ত হয়ে বলে,
“আমি কেন একে সারারাত কোলে নিয়ে থাকতে যাবো? স্ট্রেঞ্জ!

“তুমি নিজেই ভেবে দেখ, কখন থেকে জান্নাতকে কোলে নিয়ে আছো।”

আকাশ থমথমে মুখে তাকায়। সন্ধ্যা আকাশের গলা জড়ানো দু'হাত ঢিলে করে। মাথাটা সামান্য পিছিয়ে এনে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশের যদি সব মনে পড়ত, তবে আজকের দিনগুলো অন্যরকম হতো। আকাশ তার আর তার ভাইয়ার সাথে এমন অ’মানবিক আচরণ করার কথা ভাবতেও পারতো না। কিন্তু এখন সব এলেমেলো। 

আকাশ দৃষ্টি ফিরিয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বলে,
“বললাম তো ওকে ছুড়ে ফেলব।”

সন্ধ্যা অসহায় চোখে তাকায়। আকাশের দৃষ্টি সন্ধ্যার অসহায়ত্বে ঘেরা দৃষ্টির সাথে মিলিত হয়। ক'সেকেন্ডের মাথায় আবারও সন্ধ্যার কা'টা গালে দৃষ্টি পড়লে আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। মনে হচ্ছে তার কোনো প্রবলেম হয়েছে। মেয়েটাকে আ'ঘা'ত করার জন্য আগে তাকে প্রিপারেশন নিতে হবে। নয়তো তার দ্বারা কিছুতেই এই কাজটা হচ্ছেনা। উল্টে এক আ'ঘা'ত দিয়ে তার শুধু অশান্তি লাগছে। এই অশান্তি থেকে বাঁচতে তার এখান থেকে এক্ষুনি যাওয়া উচিৎ বলে মনে হলো। অতঃপর আকাশ আস্তে করে সন্ধ্যাকে নামিয়ে দেয়। 

আকাশের কান্ডে সন্ধ্যা অবাক হলো। অবাক হলো আসমানী নওয়ান-ও। আকাশ সত্যিই সন্ধ্যাকলে নামিয়ে দিল? তাও আবার এতো ভালোভাবে?

আকাশ আর এখানে দাঁড়ায় না। উল্টো ঘুরে এক পা এগোতে গিয়েও কি যেন ভেবে আবারও এদিকে ফিরে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। শ’ক্ত করে বলে,
“মুড নেই, তাই বেঁচে গেলে। পরেরবার বাঁচবে না। কনফার্ম।”

কথাটা বলে আকাশ জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য দ্রুত পা চালায়। দু'তিন সিঁড়ি গ্যাপ দিয়ে দিয়ে উপরে উঠে যায়। যেন পালিয়ে গেল।
সন্ধ্যা চেয়ে রইল আকাশের দিকে। আকাশের বলা, ‘পরেরবার বাঁচবে না’ কথাটা মাথায় ঘুরছে। এই মানুষটা তার ভালোবাসা। আচ্ছা সে কি এই মানুষটার ভালোবাসা নয়? তাকে কি একটুও মনে নেই? সন্ধ্যার মুখখানা মলিন হয়। 

আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফেরায়। থুতনিতে হাত রেখে মৃদু হাসে। ভদ্রমহিলার হাসিতে সন্ধ্যা অবাক হয়। আসমানী নওয়ান বোঝানোর স্বরে বলেন,
“তুই আমার আকাশের ভালোবাসা জান্নাত। একটা কথা মনে রাখবি, ভালোবাসা কখনো ম'রে না। আমার আকাশের ভালোবাসা-ও ম'রেনি। ও অস্বীকার করলেও ওর মাঝে তোর প্রতি ভালোবাসা সুপ্ত অবস্থায় জীবিত আছে। যার প্রমাণ আমি আজ পেলাম। তুই শুধু ধৈর্য রাখিস মা।”

সন্ধ্যার চোখজোড়া ঝাপসা হয়। সত্যিই আকাশ এখনো তাকে ভালোবাসে? তবে কবে আবারো ডাকবে, সোনা বউ বলে? ডাকবে তো? একদিন আকাশ নিজেই তাকে জড়িয়ে ধরবে তো? তাকে আর তার ভাইয়াকে আবারো ভালোবাসবে? 
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে নিয়ে তার ঘরে যায়। সন্ধ্যা চুপচাপ যায় তার আম্মার সাথে। সিঁড়ির দিকে একবার তাকায়। আকাশকে দেখতে পায় যদি! আকাশ ততক্ষণে তার ঘরে চলে গিয়েছে। তাই আর দেখা মিলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। 
__________________

ঘড়ির কাটা তখন ১:৩০ এর ঘরে। সৌম্য ডান কাত হয়ে শুয়ে আছে। ডান হাত মেলে রাখা, যেখানটায় ইরা মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। বালিশ নেই এমন নয়। ইরার অভ্যাস এটা। সে বিছানায় একটার বেশি বালিশ রাখেনা ইচ্ছে করে। রাখলেও তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে রাখে। প্রথমদিন সৌম্য ইরার এই কান্ডে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে ইরা উত্তরে বলেছিল,
‘আমাকে তোর বুকে মাথা রাখতে দিবি সৌম্য? কখনো কখনো তোর হাতের উপর-ও নাহয় মাথা রাখব। সারারাতে যদি তোর বুক, হাত যদি ব্য’থা হয়ে যায়, আমি পরেরদিন মালিশ করে দিয়ে সব ব্য’থা সারিয়ে দিব।”

সেদিনের বলা কথাটা ভেবে সৌম্য একটু হাসল। তাকায় ঘুমন্ত ইরার পানে। বা হাত ইরার গালে রেখে মৃদুস্বরে বলে, “আমার ইরবাতী।”

এরপর সৌম্য বা হাতে ইরাকে তার দিকে একটু টেনে নিয়ে কম্বল দিয়ে দু'জনকে আরেকটু ঢেকে নয়। ইরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করে। মিনিট দু'য়েক এর মাথায় মনে হলো, পাশের ঘরে কেউ চেঁচামেচি করছে। কিছু সময় পেরোলে সৌম্য’র মনে হলো, চেঁচামেচি একজন নয়, বরং দু'জন করছে। সৌম্য’র কপালে ভাঁজ পড়ে। এতো রাতে কারা এভাবে গলা উঁচু করে কথা বলছে বুঝল না। প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলার শব্দ হয়। সাথে মেয়ে কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলা স্পষ্ট কণ্ঠের কিছু কথা ভেসে আসে সৌম্য’র কানে,

“এখনো এতো দরদ কেন ওই দুই ভাইবোনদের জন্য তোর? ওই মেয়ের পেটে নাকি বাচ্চা? তবুও ওকে চাস? ল'জ্জাশরম সব বিকিয়ে দিয়েছিস তাইনা? আর ওই ছেলের প্রতিই বা এতো দরদ ক্যান? ওকে বাড়ি উঠতে দিলি বলেই তো ওই মেয়ে এই বাড়ি পা রাখলো। যত অশান্তি হয়েছে আমার। বাইরের মানুষ ঘরে এসে ঘাপটি মে'রে থাকবে। আর সেসব শাস্তি পোহানো লাগবে আমার।”

সৌম্য ততক্ষণে চোখ মেলে তাকিয়েছে। রিহানের মায়ের গলা চিনতে এবার একটুও অসুবিধা হয়নি তার। সৌম্য ঢোক গিলল। 
এবার রিহানের কণ্ঠ ভেসে আসে,

“সৌম্য এখানে একবারে থাকতে আসেনি মা। প্লিজ ওকে নিয়ে কিছু বলো না৷ ও আমার বন্ধু। বিপদে পড়ে এখানে এসেছে। আমি এটুকু করতে না পারলে আমি কেমন বন্ধু হলাম বলো তো?”

“লাগবেনা এরকম বন্ধু। ওর জন্য আজ তোর জীবনের কোনো ঠিকঠাকানা নেই।”

“দয়া করে চুপ কর। ওরা ঘুমিয়েছে। তুমি কি চাইছ এই মাঝরাতে ওদের বের করে দিই?”

রিহান মা রে'গে বলে,
“পারলে তাই দে। আমায় একটু শান্তি দে। ওদের দেখলেই আমার গা জ্ব'লে যায়। সেখানে ওদের মেহমানদের মতো আপ্যায়ণ করতে হচ্ছে আমার৷ আর যদি এই ছেলের সাথে সম্পর্ক রেখেছিস তো, আমার সাথে তোর সম্পর্ক থাকবে না, এই বলে দিলাম আমি।”

এরপর আর শোনা গেল না। দু'জনেই নিরব হয়ে গিয়েছে। 
এদিকে রিহান আর তার মায়ের কথোপকথন শুনে সৌম্য’র বুক ভার হয়ে আসে। গায়ে জড়ানো কম্বল সরিয়ে ইরাকে ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে বসে সে। সামান্য নড়াচড়ায় ইরার ঘুম ভেঙে যায়। সৌম্য’কে উঠে বসতে দেখে ইরা-ও ধীরে ধীরে উঠে বসে। সৌম্য’র বাহুতে হাত রেখে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলে,
“কি হয়েছে সৌম্য?”

সৌম্য তাকায় ইরার পানে। জোরপূর্বক একটু হাসল৷ ছোট করে বলে,
“কিছু না। ওদিকে ঘোরো।”

ইরা প্রশ্নাত্মক চোখে তাকালে সৌম্য আবারও তাড়া দিলে ইরা কোনো প্রশ্ন না করে উল্টো ঘুরে বসে। সৌম্য দু’হাত ইরার কোমর সমান এলোমেলো চুলগুলো একসাথে করে একটি খোঁপা বেঁধে দেয়। ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায়৷ জিজ্ঞেস করে,
“সকাল হয়ে গিয়েছে কি?”

সৌম্য উত্তর দেয়, “না। দেড়টা বাজে।”

ইরা অবাক হলো৷ খোঁপা করে দেয়ায় মেয়েটা অবাক হলো না। এই কাজ সৌম্য-ই তাকে সবসময় করে দেয়৷ কিন্তু এই মাঝরাতে তো করে দেয় না। উল্টে শোয়ার আগে সৌম্য নিজেই খোঁপা খুলে দেয়, যেন তার ঘুমাতে সমস্যা না হয়৷ তাহলে? ভাবনার মাঝেই সৌম্য বিছানা থেকে নেমে ঘরের লাইট জ্বালায়। এগিয়ে এসে ইরার হাত ধরলে ইরা চুপচাপ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। সৌম্য ইরাকে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ট্যাপ ছেড়ে ডান হাত বাড়িয়ে দেয় ট্যাপের নিচে। ইরার উদ্দেশ্যে বলে,

“মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ কর।”

ইরা অবাক হলো। এবারেও মেয়েটা কিছুই বলল না। সামান্য ঝুঁকে চোখ বুজলে সৌম্য ইরার মুখে কয়েকবার পানি ছিটিয়ে দেয়৷ একই সাথে নিজের মুখেও কয়েকবার পানি ছিটিয়ে ট্যাপ অফ করে দেয়। এরপর ইরার হাত ধরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ইরার পরনের শাড়ির আঁচল টেনে সৌম্য তার মুখ মুছে নেয়৷ 
এরপর এগিয়ে গিয়ে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা টি-শার্ট পরে তার উপর জ্যাকেট পড়ে নেয়। ইরার চাদর এনে ইরার মাথাসহ গা ভালোভাবে ঢেকে দেয়। ইরা এতক্ষণ অবাক হয়ে শুধু দেখছিল সৌম্য’র কান্ড। হয়ত কিছুটা আন্দাজ করেছে। যদিও সে ঘুমিয়ে ছিল, তবে চেঁচামেচি’র আওয়াজে ঘুম হালকা হয়েছিল। সৌম্য’র আচরণে কথাগুলো না শুনলেও বুঝে ফেলেছে অনেককিছুই। মৃদুস্বরে বলে,

“এতো রাতে আমরা কোথায় যাবো সৌম্য? এখন তো শীতের রাত। কাল সকালে গেলে হয়না?”

সৌম্য তাকায় ইরার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ইরার মুখের দিকে। হঠাৎ-ই ইরাকে শ’ক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে। ইরা দু'হাত তুলে সৌম্য’র পিঠে রাখে। সৌম্য লম্বা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঢোক গিলে বলে,
“আমার আজকের দিনগুলো ভালো নয় ইরাবতী। আমার তোমার সঙ্গ চাই। আমি তোমাকে কতটুকু ভালো রাখতে পারবো জানিনা। তবে আমার সবটা দিয়ে দিব। শুধু আমার আত্মসম্মান কুড়াতে আমাকে কখনো বাঁধা দিওনা।”

ইরা আর কথা খুঁজে পেল না। অনুতপ্ত স্বরে বলে, “স্যরি সৌম্য!”

সৌম্য ইরাকে ছেড়ে ইরার কপালে একটা চুমু আঁকে। টেবিলের উপর থেকে ফোন আর মানি ব্যাগ নিয়ে
ইরার ডান হাত তার বা হাতের মুঠোয় নিয়ে বাইরের দিকে যেতে যেতে বলে, “এসো।”

ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আশেপাশে তাকালে সোফার এক কোণায় রিহানকে বসে থাকতে দেখে সৌম্য সেদিকে এগিয়ে যায়। ডাকে, “রিহান?”

রিহান মাথা তুলে তাকায়। সৌম্য আর ইরাকে এভাবে দেখে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। অবাক হয়ে বলে,
“কোথাও যাচ্ছিস সৌম্য?”

সৌম্য জবাব দেয়,
“হ্যাঁ। একটা কাজ আছে। যাচ্ছি তাহলে।”

রিহানের অবাক স্বর, “এতো রাতে কি কাজ?”

সৌম্য একটু হাসল। কিছু বলল না। ইরার হাত ধরে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। রিহান ঢোক গিলল। খুব বুঝল সৌম্য তার মায়ের বলা কথাগুলো শুনে নিয়েছে। ভীষণ অসহায় লাগলো নিজেকে। সৌম্য যে আর কিছুতেই এখানে থাকবেনা সে জানে। রিহান মলিন গলায় বলে,
“মায়ের কথায় কিছু মনে করিস না সৌম্য।”

সৌম্য দাঁড়ালো। ইরা তাকায় সৌম্য’র দিকে। এবার আরও পরিষ্কার হলো, রিহানের মা কিছু একটা বলাতেই সৌম্য’র এমন আচরণ। 
সৌম্য ইরার হাত ছেড়ে রিহানের সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে,
“তোর ছন্নছাড়া জীবনের জন্য কোথাও না কোথাও আমি-ই দায়ী রিহান। পারলে আমায় ক্ষমা করিস। আমি আর তোর সাথে যেগাযোগ করব না। তুই-ও করিস না। ভালো থাকিস।”

রিহানের অসহায় কণ্ঠ, “সৌম্য?”

সৌম্য বহুক'ষ্টে শ্বাস ফেলে দু'বার৷ মায়ের মুখটা ভীষণ মনে পড়ল। সৌম্য নিজেকে সামলায়। ডান হাত রিহানের কাঁধে রেখে বলে,
“মায়েদের মনে ক'ষ্ট দিতে নেই রিহান। মায়ের মতো করে কেউ ভালোবাসেনা বুঝলি। তুই পারলে বিয়ে করে নে এবার। অন্তত আন্টির জন্য। আর আমার সালাম দিবি আন্টিকে। যাচ্ছি।”

কথাটা বলে সৌম্য আর দাঁড়ালো না। এগিয়ে এসে ইরার হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। চোখদুটো লাল হয়ে আছে। তার জীবনে সুখের সময়টা খুব সীমিত ছিল। আর দুঃখের সময় ছিল অসীম। মানুষ বলে, দুঃখের দিনে পাশে থাকা মানুষগুলোকে কখনো ভোলা যায়না। রিহান তার একমাত্র বন্ধু, যে তার দুঃখের দিনে কোথা থেকে যেন পাশে এসে দাঁড়াতো। সৌম্য কখনো খোঁজ না দিলেও নিজেই খুঁজে নিত। সৌম্য নিষেধ করত না। কিন্তু আজ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করল নিজেই নিজের কাছে। রিহানের হেল্প না নেয়ার নিষেধাজ্ঞা। 
সবাই সবার পাশে চিরদিন থাকার সুযোগ পায়না। এটাই তো জীবন!
কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। 
.
রিহান ঝাপসা চোখে চেয়ে সৌম্য’র প্রস্থন দেখল। কেন যেন তার বাচ্চাদের মতো করে কাঁদতে ইচ্ছে করল। সৌম্য হয়ত আর কখনোই তার দিকে ফিরেও তাকাবেনা। নাহ, রা'গ করেছে বলে নয়। সৌম্য’র আত্মসম্মানে লেগেছে। রিহান খুব ভালো করে চেনে সৌম্যকে। তার মায়ের জন্য সৌম্য আর কখনোই তার দিকে ফিরবেনা। রিহান এগিয়ে এসে সোফায় বসে দু'হাতে মুখ ঢেকে নিল। কেন যেন বড্ড ক্লান্ত লাগছে আজ।
_________________

আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে শুইয়ে দিয়ে বেলকনিতে গেলে চোখে পড়ে, তার বাড়ি সোজা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে জেডি। দীর্ঘ ক'বছর পর দেখলেও চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না। ভদ্রমহিলার চোখেমুখে রা'গ ফুটে ওঠে। তার ছেলের এই হালের জন্য কোথাও না কোথাও তো এই ছেলেও দায়ী। তিনি আর এখানে দাঁড়ালেন না। হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে আসমানী নওয়ান। একদম জেডির পিছনে দাঁড়িয়ে শ'ক্ত গলায় বলে,
“এখানে কেন এসেছ?”

পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে জেডি বাঁকা হাসে। কিন্তু তাকালো না। বা হাত প্যান্টের পকেটে। ডান হাতে সিগারেট ধরে রেখেছে। নিশ্চিন্ত মনে সিগারেট ফুঁকতে ব্যস্ত সে। আসমানী নওয়ান জেডির গা ছাড়া ভাবে রে'গে ডাকে,
“জেডি?”

জেডি এবারেও তাকালো না। ওদিক ফিরেই বলে,
“ওয়েট ওয়েট আন্টি। এতো হাইপার কেন? একটু সবুর তো করুন। এতো ভালোবাসলে তো মুশকিল!”

জেডির হেয়ালি স্বরে আসমানী নওয়ানের রা'গ তড়তড় করে বেড়ে যায়। রাগান্বিত স্বরে বলে,
“খু'ন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে তোমাকে। জা'নো'য়া'র ছেলে কোথাকার।”

সাথে সাথে জেডি এদিক ফিরে তাকায়। ডান হাত উঁচিয়ে বলে,
“এ্যাই এভির মা এ্যাই! আপনাকে কি আমার বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে না-কি! হ্যাঁ?”

আসমানী নওয়ান শ'ক্ত চোখে চেয়ে বলে, “আকাশকে তুমি এসব ভুলভাল বুঝিয়েছ, তাইনা?”

জেডি হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে অবাক হওয়ান ভান করে বলে, “রিয়েলি? ওয়াও! আর কি কি করেছি, লিস্ট গুলো যদি বলতেন!”

আসমানী নওয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তার কেন জেডিকে সন্দেহ হয়না। সে জেডিকে আকাশের মতোই চেনে। একসময় ছেলের মতোই থেকেছে তার সাথে। সৌম্য আর সন্ধ্যার সাথে জেডির ইহজন্মে কোনো কানেকশন থাকার কথা নয়। তাহলে কে এর পিছনে? 

আসমানী নওয়ানকে চুপ দেখে জেডি বাঁকা হেসে বলে,
“আমাকে আর এভিকে আলাদা করার জন্য যে গেইম আপনি খেলেছিলেন, এ কথা যদি এভি একবার জানতে 
পারে, তখন আপনার কি হবে মিসেস আসমানী নওয়ান?”

আসমানী নওয়ানের মুখে ভ'য়ের ছাপ ফুটে ওঠে। জেডি হাসে। শব্দ করে হাসে৷ আসমানী নওয়ানকে ভ'য় পাইয়ে দিয়ে সে যেন ভীষণ আনন্দিত। 
আসমানী নওয়ান নিজেকে সামলায়। শ'ক্ত গলায় বলে,
“আকাশ কিচ্ছু জানবে না। কিচ্ছু না। এতো বছরে যখন প্রুফ দিতে পারোনি। আজ-ও তুমি পারবে না জেডি। নেভার।”

জেডি'র হাসির মাত্রা দীর্ঘ হয়। শব্দরা 
ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ধীরে ধীরে জেডি'র হাসি হালকা হয়। ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“এভি কি জানবে, আর কি জানবে না, সব তো সময় বলবে এভির মা ওরফে মাই সুইটহার্ট আন্টি। দেখতে রহো ক্যা হোতা হ্যায়।”

আসমানী নওয়ান ঢোক গিলল। একটা থেকে বের হতে না হতেই আরেকটা হাজির। জেডি'র কথা শুনে মনে হচ্ছে, ও কিছু জট পাকাচ্ছে। আকাশ যদি কিছু জানে, তাহলে তার কি হবে? জেডি আসমানী নওয়ানের এক্সপ্রেশনে গা দুলিয়ে হাসে। কয়েক পা পিছিয়ে যায়। হাসতে হাসতেই বলে,

“লাভ ইউ লাভ ইউ মাই সুইটহার্ট আন্টি। আপনি ঠিক এভাবেই ভ'য় পাবেন। এমন আপনাকে দেখতে ঝাক্কাস লাগে, অ্যান্ড মেরা দিল বহুত খুশ হো জাতা হ্যায়।”

আসমানী নওয়ান শ'ক্ত চোখে চেয়ে দেখে জেডিকে। জেডির হাসি মনে হচ্ছে তার গায়ে আ'গু'ন ধরিয়ে দিচ্ছে।
________________

সন্ধ্যা অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করছে। তার চোখে ঘুম নেই। আসমানী নওয়ান কোথায় গিয়েছে কে জানে! সন্ধ্যা এ নিয়ে মাথায় ঘামায়না। আকাশ চলে যাবার পর আসমানী নওয়ান নিজেই অফিস সামলান। কখন কোথায় কোন কাজে চলে যায়, সন্ধ্যা জানেনা। তবে অফিসের কাজেই হুটহাট চলে যায়। প্রথম দু'মাস তিনি নিজেও ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। এরপর নিজেকে শ'ক্ত করে কাজে মন দিয়েছে। সন্ধ্যার অবাক লাগে তার আম্মাকে দেখলে। আসমানী নওয়ান নিজেকে যেমন দেখায় তেমন নয়৷ আগে তো একদম গ্রাম্য ভাষায় কথা বলত, আর এখন….সন্ধ্যা মেলাতেই পারেনা। সে বুঝেছে তার আম্মা ক্ষেত্রবিশেষে নিজেকে একেকরূপে উপস্থাপন করে। এর সবগুণ তার মাঝে আছে। সবকিছুর মাঝে তার আম্মা তার খেয়াল রাখতে ভুলে যায় না। ভীষণ ভালোবাসে তাকে। মায়ের মতো। খালা তো তার। খালারা হয়তো মায়ের মতো করেই ভালোবাসে। ভাগ্যিস সে খালার দেখা পেয়েছিল। এজন্য মায়ের ভালোবাসার গন্ধ পেয়েছে সে।

অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে সন্ধ্যা উঠে বসে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করে। মনে পড়ল সেই ভিডিওতে দেখা দৃশ্য। আকাশ সৌম্য’র সামনে দলিল ধরেছিল। সন্ধ্যার মাথা কাজ করেনা, তার ভাইয়া ওখানে সাইন না করলে ওখানে সাইন কিভাবে গেল? আর আকাশ-ই বা কেন এমন করছে? সবচেয়ে বড় কথা, সন্ধ্যার মাথায় আসলো, তাকে ভিডিওটি কে পাঠিয়েছে। সন্ধ্যা নিজের ভাবনায় নিজেই বিস্মিত হলো। এসব তো মাথায় আসেনি তার। সন্ধ্যা দ্রুত তার ফোন নিয়ে নাম্বারটি বের করল, যে নাম্বার থেকে তাকে ভিডিও পাঠানো হয়েছে। সন্ধ্যা কি মনে করে নাম্বারে কল করে। অবাক করা কান্ড কলটি সাথে সাথেই রিসিভ হয়। সন্ধ্যা কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে আকাশের কণ্ঠ ভেসে আসে সন্ধ্যা প্রিয় দু'টি শব্দ, “সোনা বউ?”

সন্ধ্যা স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো শরীর শিরশির করে ওঠে। কলের ওপাশ থেকে আবারো একই কণ্ঠে ভেসে আসে,
“অনেক বেশি মনে পড়ছিল সোনা বউ?”

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। হঠাৎ-ই দরজার দিকে চোখ পড়লে দেখল আকাশ দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে গম্ভীর মুখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যার মাথা ঘুরে ওঠে। বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আকাশ এখানে থাকলে ফোনের ওপাশে কে? না-কি ফোনের ওপাশেই আকাশ। আর তার সামনে দাঁড়ানো লোকটা আকাশ নয়। সন্ধ্যার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে। কি হচ্ছে তার সাথে? 

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা : ৩৭৩০
কার কার মাথা ঘুরল সন্ধ্যার মতো জানাবেন কিন্তু🫣]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 14
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 5 months ago
পর্ব:০৯
 
 
 

সন্ধ্যা এখনো বিস্মিত নয়নে চেয়ে আছে দরজায় দাঁড়ানো আকাশের দিকে। যার চোখের সোনালি মণি দু'টো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেই তার আর আসমানী নওয়ানের সাথে কথা বলে আকাশ উপরে চলে গেল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আকাশ শাওয়ার নিয়ে নিচে নেমেছে। পরনে একটি পাতলা টি-শার্ট, প্যান্ট। মাথার চুলগুলো ভেজা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। তার মাথা এখনো ভনভন করে ঘুরছে। এটা যে আকাশ, তার সব হিসাব তো মিলেছে, তবে ফোনের ওপাশে কে? তাকে সোনা বউ বলে ডাকল যে। উত্তেজনায় সন্ধ্যার শরীর কাঁপছে। কানে ফোন ধরে রেখেছে। 

দরজায় দাঁড়ানো আকাশ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। মাকে না দেখে জিজ্ঞেস করে, “মা কোথায়?”

সন্ধ্যার কানে বোধয় গেল না আকাশের বলা কথাটা। তার মস্তিষ্ক অচল অচল লাগছে। সে কাকে বিশ্বাস করবে? ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে নাকি তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে? কে আকাশ? আজ কতগুলো দিন পর সেই ডাক শুনতে পেল। যে ডাক শোনার জন্য সন্ধ্যা কতগুলো দিন অপেক্ষা করেছে। কিন্তু তার অনুভূতি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। 

ততক্ষণে আকাশ ঘরের ভেতর এসে একদম সন্ধ্যার সামনে দাঁড়িয়েছে। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে সন্ধ্যাকে পরোখ করছে। সন্ধ্যার মৃদু কম্পন তার চোখ এড়ায়নি। কপালে ভাঁজ পড়ে। থমথমে কণ্ঠে বলে, “কি প্রবলেম? মৃগী রোগীর মতো কাঁপছো কেন?”

সন্ধ্যার বুক ধুকধুক করছে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“আপনি কে?”

সন্ধ্যার কথায় আকাশ ভ্রু কুঁচকে নেয়। এই আধপা'গ'ল টা আবার কি ভুলভাল বকছে। আকাশ ধমকে বলে,
“এই মাঝরাতে থা’প্প’ড় ছাড়া তোমার পেটের ভাত হজম হচ্ছেনা? আমার বাড়ি থেকে আমাকে চেনো না৷ বে'য়া'দ'ব মেয়ে!”

সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। এখনো কানে ফোন ধরে রেখেছে। সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না৷ ফোনের ওপাশে একই কণ্ঠের মানুষ এইমাত্র কথা বলল। সে কি করবে এখন? তার যে মাথা ঘুরছে। ওপাশ থেকে অনেক আগেই কল কেটে গিয়েছে। সন্ধ্যা কান থেকে ফোন নামায়। আকাশের চোখে চোখ রেখে ঢোক গিলে বলে,
“আপনার কি জমজ ভাই আছে?”

আকাশ বিরক্ত চোখে তাকায়৷ মেয়েটাকে তার মাঝে মাঝে পা'গ'ল মনে হলে একটু পর আবার ভালো-ও মনে হয়। কিন্তু এবার আসলেই পা'গ'ল মনে হচ্ছে৷ এই মাঝরাতে কোথা থেকে তার জমজ ভাইকে টেনে আনছে কে জানে! আকাশ কটমট চোখে চেয়ে বলে, 
“আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে।”

সন্ধ্যা তার হাতের ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “ফোনের ওপাশে অবিকল আপনার মতো করে একজন কথা বলেছে আমার সাথে।”

আকাশ ডান হাত উঠিয়ে সন্ধ্যার গালে থা’প্প’ড় দেয়ার ভঙ্গি করে রে'গে বলে,
“আর একটা উল্টাপাল্টা কথা বললে কানের গোড়ায় লাগাবো।”

সন্ধ্যা ভ'য় পেয়ে মুখ ডানদিকে সামান্য হেলে নেয়৷ আকাশ খেয়াল করে হাত নামিয়ে নেয়৷ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, “মা কোথায়?”

সন্ধ্যা জবাব দেয়, “জানিনা।”

আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“জানোনা মানে?”

সন্ধ্যা বিরক্তি নিয়ে বলে,
“জানিনা মানে জানিনা। এমনিতেও আপনি যে আম্মার ছেলে, এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না৷ সত্যি করে বলুন আপনি কে?”

আকাশ ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করল৷ ইচ্ছে করছে এক ঘুষিতে এই মেয়ের নাক ফাটাতে। সন্ধ্যা আকাশকে রা'গ'তে দেখে ঢোক গিলল। ফোনের ওপাশে লোকটা যদি আকাশ হয়েও থাকে, তাহলে সে তার সামনে না এসে ফোনে বসে তাকে সেই আগের আকাশের মতো করে কেন ডাকবে? সে হিসাব মেলাতে পারলো না৷ কিন্তু তার সামনে দাঁড়ানো আকাশের হিসাব তো মিলেছে৷ আকাশের হেলিকপ্টার এক্সিডেন্ট হওয়া থেকে শুরু করে আসমানী নওয়ানের থেকে শোনা প্রতিটি কথার ভিত্তিতে এটাই তো সেই আকাশ। সন্ধ্যা নিজেকে শান্ত করে বলে, 

“আমি সত্যি বলছি। ফোনের ওপাশে আপনার কণ্ঠের মতো করে কেউ কথা বলেছে৷ বিশ্বাস না হলে আপনি দেখুন।”

আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়েই খপ করে ফোনটা নেয়। যদি এর কথা সত্যি না হয়, তবে এই মেয়েকে আজ সে থা'প'ড়েই পা'গ'ল থেকে সুস্থ বানাবে। ডায়াল কলের প্রথম নাম্বারে কল করে ফোন লাউডে দেয়। ওপাশ থেকে অরুণ বলে ওঠে,  “হ্যালো সন্ধ্যা!”

অরুণের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ কটমট চোখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা আকাশের হাত থেকে ফোন একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে নাম্বার চেক করে। নাহ এটাই তো সেই নাম্বার। অরুণ এই নাম্বার কোথায় পেল? সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“অরুণ ভাইয়া এই নাম্বার থেকে কিছুক্ষণ আগে একজন অবিকল আকাশের কণ্ঠে কথা বলেছে। কে সে অরুণ ভাইয়া?”

অরুণ থমথমে মুখে বলে,
“আমি স্যরি! আমার ফোন থেকে…..

বাকিটুকু বলার আগেই কেউ একজন অরুণের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে আবারও আকাশের কণ্ঠে ডাকে, “হেই, সোনা বউ….

সন্ধ্যা কেঁপে উঠল। আবারো আকাশের কণ্ঠে সেই ডান শুনতে পেয়ে তার মাথা আবারো ভনভন করতে থাকে। তাকায় তার সামনে দাঁড়ানো আকাশের দিকে। আকাশ স্বাভাবিক। তার মুখাবয়বে অবাক হওয়ার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। সন্ধ্যা কিছু বলার আগেই আকাশ সন্ধ্যার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ফোন কানে নিয়ে হুংকার ছেড়ে বলে,

“জ্যাক, তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি।”

ওপাশে জেডি’র মুখ থমথমে হয়ে যায়। কপালে ভাঁজ পড়ে। এতো রাতে আকাশ, সন্ধ্যা একসাথে কেন বুঝল না। তাকায় অরুণের দিকে, যে তার দিকে খেয়ে ফেলা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। জেডি গলা ঝেড়ে নিজ ফর্মে ফিরে বলে,
“এভি তুই কোথায়?”

আকাশ রা'গে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে, “জা’হা’ন্না’মে। 
জেডি বা হাতে কপালের ঘাম মুছল। আকাশ তার কণ্ঠ নকল করে কথা বলার ব্যাপারটা ভীষণ অপছন্দ করে। তাও আবার সেখানে যদি মেয়ে রিলেট থাকে। ভার্সিটিতে এ নিয়ে তুলকালাম বেঁধেছিল একবার। কিন্তু সে কি করে জানবে ওই মেয়ের পাশে আকাশ আছে। জেডি নিজেকে সামলে হেসে বলে,
“আমি বুঝেছি তুই দুনিয়ার কোনো এক অগ্নিকুন্ডের উপর বসে আছিস। তোর নিচে জ্বলছে। সেগুলোই উপর দিয়ে ধোঁয়া স্বরূপ বের হচ্ছে। আর তোর ধোঁয়ায় আমি ঘেমেনেমে একাকার হয়ে যাচ্ছি মাই জান।”

আকাশের রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আর একবার আমার কণ্ঠ নিয়ে ফা'জ'লা'মি করলে তোকে জ'বা'ই করে ফেলব।”

কথাটা বলেই আকাশ রে'গে সন্ধ্যার ফোন সর্বশক্তি দিয়ে আছাড় মা'রে। 

সন্ধ্যা ভাবনায় মশগুল। ফোনের ওপাশে অরুণের পর যে কথা বলল, তাকে আকাশ জ্যাক বলে ডাকল। আর সেই লোকটাই আকাশের কণ্ঠ নকল করে তার সাথে এভাবে কথা বলছিল? আকাশের কথার ধরনে তো তাই মনে হলো। কিন্তু ওই লোকটা একদম হুবহু আকাশের কণ্ঠ কিভাবে নকল করল? আর তাকে সেই ‘সোনা বউ’ ডাক? ভাবনার মাঝেই আকাশকে তার ফোন আছাড় মা'র'তে দেখে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। দ্রুত এগিয়ে যায় তার ফোনের দিকে। একদম গুঁড়ো গুড়ো হয়ে গিয়েছে। এই ফোন আর নেয়া যাবেনা।
সন্ধ্যা আকাশকে কিছু বলার আগেই দেখল আকাশ হনহন করে বেরিয়ে গেল এই রুম থেকে৷ সন্ধ্যা পিছু পিছু গিয়ে রে’গে বলে,

“আপনি আমার ফোন ভাঙলেন কেন?”

এমনিতেই আকাশ রে'গে বোম হয়ে আছে। এর মধ্যে সন্ধ্যার কথাটুকু হজম হলো না। উল্টো ঘুরে বড় বড় পায়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার হাত পিছন থেকে মুচড়ে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“শুধু ফোন নয়, তোকেও ভাঙবো বে’য়া’দ’ব মেয়ে।”

হাতে ব্য’থা পেয়ে সন্ধ্যা মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। তাকায় আকাশের দিকে। সন্ধ্যার ব্য’থাতুর মুখ চোখে পড়লে আকাশ সাথে সাথে সন্ধ্যার হাত আলগা করে দেয়। শীতল দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। আকাশের হাত ঢিলে বুঝতে পেরে সন্ধ্যা দু'হাতে আকাশকে গায়ের জোরে ধাক্কা দেয়। আকাশ দু'পা পিছিয়ে যায়। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়।
সন্ধ্যা আকাশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আর একবার গায়ের জোর দেখাতে আসলে আমার বুদ্ধির জোরে আপনাকে সত্যি সত্যি চটি পেটা করে ছাড়বো বলে রাখলাম। বে’য়া’দ’ব লোক কোথাকার!”

কথাটা বলে সন্ধ্যা দ্রুত ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা আটকে দেয়। আকাশ হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। এতক্ষণ ঠিক কি হলো, এটুকু বুঝতেই তার অনেকটা সময় লেগে গেল। আবার তাকে পায়ের জুতো দিয়ে পেটাতে চাইল, তারপর তাকে আবার বে'য়া'দ'ব-ও বলল! ঠিক কি পরিমাণ সাহস দেখালো মেয়েটা! তাকে বিন্দুমাত্র ভ'য় পায়না। আকাশ দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

“একবার তোমাকে আ'ঘা'ত করা শিখে নিই। এরপর যদি তোমাকে টুকরো টুকরো না করেছি তাহলে আমার নাম…..

পিছন থেকে আসমানী নওয়ান বলে, “এভি নয়।”

মায়ের কণ্ঠে আকাশ পিছু ফিরে তাকায়। আসমানী নওয়ান আবারও বলেন, “জান্নাতকে কিছু করতে পারো আর না পারো, কিন্তু তোমার এভি নামটা কে'টে দিও। তোমার নামের এই ফর্মটা আমার পছন্দ নয়৷”

আকাশ বিরক্ত হলো মায়ের কথায়। রে’গে বলে, “তোমার ওই পাতানো মেয়েকে আমি ছাড়বো না।”

“আচ্ছা ধরে রেখ। আমিও এটাই চাই।”

মায়ের হেয়ালিপনায় আকাশ থতমত খেয়ে তাকায়। মাকেও আজকাল বড্ড বিরক্ত লাগছে। আসমানী নওয়ান বোধয় একটু হাসলেন। বলেন, 
“ও আমার পাতানো মেয়ে নয়।”

আকাশ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“তাহলে কি তোমার নিজের মেয়ে? হয়তো লুকিয়ে রেখেছিলে। এমন হলে তো ও সম্পর্কে আমার বোন হয়ে গেল। বোনকে আমার বউয়ের অপবাদ দাও কিভাবে মা? তোমার কি রুচির দু’র্ভি’ক্ষ চলছে?”

আসমানী নওয়ান রে'গে ধমকে ওঠেন, “আকাশ?”

আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। আসমানী নওয়ান চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এরপর আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
“তোমাকে এসব কে বলেছে আকাশ? ক্লিয়ার করবে প্লিজ?”

আকাশ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“যে-ই বলুক। সে সত্যিটা-ই বলেছে। নিজ চোখে দেখছি সব। অথচ তুমি একের পর এক মিথ্যে বলছ। থেমে যাও মা। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। নয়তো এর ফল ভালো হবেনা।”

কথাগুলো বলে আকাশ আর দাঁড়ালো না। আসমানী নওয়ান চিন্তিত মুখে চেয়ে দেখলেন কেবল আকাশকে। আকাশকে কেউ কিছু বললে, মুখের কথা সে বিশ্বাস করে নেয়ার মতো মানুষ নয়৷ তাহলে আকাশকে কি এমন করে অপর পক্ষের লোক আকাশকে বিশ্বাস করিয়েছে, তারা যা বলছে সব মিথ্যে? 
.
.
.
অরুণ একটি ফাঁকা রাস্তার পাশে বসে আছে। তার সামনে জেডি দাঁড়ানো। যে এপাশ-ওপাশ হাঁটছে। অরুণ এখানে সন্ধ্যার পর থেকে বসে আছে। সে মেন্টালি ভীষণ ডিস্টার্ব ছিল, তাই একা একা ভাবছিল অনেককিছু৷ কিছুক্ষণ আগে এখানে জেডি আসে। জেডির স্বভাব যেমন, যেচে পড়ে কথা বলছিল অরুণের সাথে। অরুণ-ও টুকটাক কথা বলছিল। টপিক আকাশ ছিল। 

অরুণের শ'ক্ত দৃষ্টি জেডির দিকে। একে সন্ধ্যার ব্যাপারে বলাই ভুল হয়েছে। আকাশ তো বিশ্বাস করে না, ভাবল জেডি হয়ত বিশ্বাস করবে। এজন্য আকাশের ব্যাপারে টুকটাক অনেক কথা বলেছে। হাইলাইট করেছে সন্ধ্যার ব্যাপারটা। আকাশ সন্ধ্যাকে সোনা বউ বলে ডাকত। অনেক ভালোবাসতো। এসব শুনে জেডি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। মানুষ জোক্স শুনেও এতো হাসেনা, জেডি আকাশকে নিয়ে বলা কথাগুলো শুনে যত হাসছিল। অরুণ চুপচাপ হজম করছিল জেডির অ'সহ্যরকম হাহা হিহি। এরপর হঠাৎ-ই সন্ধ্যার নাম্বার থেকে কল আসলে, জেডি ফোনের স্ক্রিনে সন্ধ্যা নাম দেখে, তার ফোন কেড়ে নেয়। অরুণের নিষেধ হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে জেডি কল রিসিভ করে সন্ধ্যার সাথে ফা'জ'লা'মো করল। 

একে তো সন্ধ্যা আকাশের জন্য এতোগুলো দিন যাবৎ কত দুঃখ পেয়ে এসেছে। এরপর হঠাৎ আকাশের দেখা পেয়ে তার জীবনে সুখের বদলে আরও দুঃখ এসে হাজির হয়েছে, এক ভিন্নরূপী আকাশকে পেয়ে৷ আর সেই মেয়েটার সাথে এই জা'নো'য়া'র টা ফা'জ'লা'মি করল বসে বসে৷ অরুণের মনে হলো, এই জেডিকে যদি সত্যিই খু'ন করতে পারতো তবে শান্তি পেত। 

জেডি অরুণের সামনে দাঁড়ায়। দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রেখে বলে,
“ওই মেয়েটা এভির বাড়ি থাকে? সিরিয়াসলি?”

অরুণ কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“নাহ, তোর মাথার উপর থাকে। আয়নার সামনে গিয়ে দেখ, সন্ধ্যা তোর মাথার উপর বসে বসে কাঁদছে আর তোর চুলগুলো রুমাল ভেবে ওতে নাক মুছছে।”

জেডি রে’গে তাকায়। কিছু একটা ভেবে হাসল। এরপর ঘুরে গিয়ে পিছন থেকে দু’দিকে পা দিয়ে অরুণের মাথার উপর বসে। যেন কোনো টুলের উপর বসেছে। অরুণ চেঁচিয়ে ওঠে। জেডি সামান্য ঝুঁকে অরুণের জ্যাকেটের কলার দু'হাতে চেপে ধরে অরুণের মুখ সোজা তার মুখ এনে বাঁকা হেসে বলে,

“দু'মিনিট অপেক্ষা কর ডেয়ার। তোকে আমি মারাত্মক সুগন্ধি উপহার দিতে যাচ্ছি। এটা যে সে সুগন্ধি নয়, এই সুগন্ধি আমার পেট থেকে একেবারে পায়ুপথ দিয়ে বের হবে।”

অরুণ নড়াচড়া করলেও সুবিধা করতে পারেনা। রা’গে ফোঁসফোঁস করছে। ডান হাত তুলে জেডির দু'পায়ের মাঝে হাত দিলে জেডি দ্রুত সরে যায় অরুণের মাথার উপর থেকে। অরুণ দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। জেডির দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
“একটুর জন্য মাপতে পারলাম না। তবে কোয়ালিটি ভালোই মনে হলো।”

জেডি কটমট চোখে তাকায়। এগিয়ে এসে বলে, 
“তোর যা আমারও তাই। না-কি তুই হারবাল খেয়ে ভাব নিচ্ছিস?”

শেষ কথাটা জেডি  বাঁকা হেসে ভ্রু নাঁচিয়ে বলে। অরুণ থতমত খেয়ে তাকায়। রে'গে বলে,
“আমাকে তোর অসুস্থ লাগে?”

জেডি ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,
“একদম না। তবে….
কথাটা বলে হুট করে ডান হাত অরুণের দিকে নিলে অরুণ দ্রুত তার দু'হাতে গোপন জায়গা চেপে ধরে। জেডি হাসে। বলে, 
মনে হচ্ছে, তোর চাপাচাপির অভ্যেস ভালোই। ভালো ভালো চালিয়ে যা। তোকে ভাইরাল করার দায়িত্ব আমার।”

কথাটা বলে বা হাত উঠিয়ে তার ফোন অরুণের দিকে ধরে। অরুণ দেখল সে এখন যেখাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেই পিক জেডি তুলেছে। অ'সহ্যকর অনুভূতি নিয়ে সে জেডির দিকে তাকালো। 
জেডি ফোন পকেটে রেখে উল্টোদিকে যেতে যেতে শব্দ করে হাসে। 
অরুণ রে'গে বলে, “ওই পিক যদি কিছু করেছিস, তোর খবর আছে জেডি।”

জেডি ঘাড় বাঁকিয়ে অরুণের দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলে,
“খবর তো তোর হবে ডেয়ার। সূচনা কিন্তু অনামিকা।”

অরুণ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। কিহ! এই পিক ওই ছেমড়ির কাছে গেলে তার গলায় দড়ি দিয়ে ম'রা ছাড়া আর উপায় থাকবেনা। অরুণ দৌড় দেয় জেডির দিকে। জেডিও দৌড়ালো। হাসছে সে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় জেডির মুখ মলিন হয়। স্মৃতির পাতার কিছু দৃশ্য ভেসে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, ক’বছর আগে সেই ভার্সিটি লাইফে ফিরে গিয়েছে। যেখানে সে আর অরুণ সারাদিন একজন আরেকজনের পিছে লাগত, আর আকাশ তাদের দু'জনের বিচার করত। একদম হেডমাস্টারের মতো। সেসব দিন হারিয়ে গেছে সেই কবেই। জেডি অন্ধকার আকাশপানে তাকায়।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে শব্দ করে বলে,
“বেঈমানী কিন্তু বন্ধুরাই করে, তাইনা অরুণ?”

জেডির কণ্ঠে বড্ড আক্ষেপ মেশানো। 
পিছনে দৌড়ে আসা অরুণের কানে আসে জেডির কথা। মুখে ফুটে ওঠে মলিনতার ছাপ। পায়ের গতি কমে আসে। তবে থামে না। তার মনে হলো, জেডিকে কি স্যরি বলা উচিৎ? আবার আরেক মন তীব্র প্রতিবাদ করে বলে উঠল, ‘কখনোই না।’ 
__________________

নিস্তব্ধ রাত। সময় তখন প্রায় ২ টা। শীতের রাত। চারিদিকে কুয়াশায় ভরপুর। কয়েক সে.মি. এর দূরত্বে কি আছে, তা দেখা মুশকিল। সৌম্য ইরাকে নিয়ে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছে। মিটিমিটি ঠান্ডা বাতাস প্রিতিনিয়ত ছুঁয়ে দেয় দু'জনকে। ইরা সৌম্য’র সাথে লেপ্টে হাঁটছে৷ ভীষণ শীত করছে। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে৷ সৌম্য দাঁড়ায়। সাথে ইরা-ও দাঁড়ায়। তাকায় সৌম্য’র দিকে। সৌম্য’র দৃষ্টি ইরাতে। মেয়েটার চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে ঠান্ডায়। সৌম্য’র ভীষণ খারাপ লাগলো। সে একা হলে শীতের কাপড় ছাড়াও বাইরে রাত কাটিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু সাথে তার বউ আছে, এখন সে কি করবে? এতো রাত হওয়ায় ঠিকঠাক কোনো ব্যবস্থাও করতে পারছেনা। একবার ভাবল, ইরাকে নিয়ে ওই বাড়ি থেকে এতো রাতে বেরোনো উচিৎ হয়নি৷ কিন্তু আবার আরেক মন বলে, এ কি করে সম্ভব? যেখানে রিহানের মা বলতে গেলে তাদের ঘাড় ধরে বের করে দেয়নি, সেখানে সে কি করে থাকতো? সৌম্যকে চুপ দেখে ইরা সৌম্য’কে ঝাঁকিয়ে ডাকে, “সৌম্য?”

সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জ্যাকেটের চেইন খুলল। ইরার কিছু বলার আগেই সৌম্য ইরাকে টেনে তার জ্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে নেয় ইরার শুকনো শরীরটা। ইরা মাথা উঁচু করে তাকায়৷ বলে, 
“কি করছ?”

সৌম্য ইরার দিকে চেয়ে জ্যাকেটের চেইন লাগালো। মেয়েটা রোগা পাতলা হওয়ায় সুন্দরমতো এঁটে গিয়েছে সৌম্য’র জ্যাকেটের ভেতর। এটা দেখে সৌম্য একটু হাসল। ডান হাতের দু'আঙুলের সাহায্যে ইরার নাক টেনে বলে, “দেখতে বাচ্চা লাগে।”

ইরা মুখ ফুলিয়ে বলে,
“আমি মেয়ে না? মেয়েরা দেখতে ছোটোখাটো-ই হয়।”

সৌম্য আরেকটু হেসে বলে,
“সেটাই তো বললাম। তোমাকে এভাবেই ভালো লাগে আমার।”

ইরার মুখে হাসি ফুটল। তাদের থেকে কয়েক হাত দূরত্বে ল্যাম্পপোস্ট, যার আবছা আলো এদিকটায় এসেছে। সৌম্য দু'হাতে ইরাকে জড়িয়ে নেয়। সামান্য ঝুঁকে ইরার বাম গালের সাথে তার ডান গাল ঠেকিয়ে দেখল, ইরার গাল বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। সৌম্য মাথা সোজা করে ইরার দিকে তাকায়। ইরাও তাকায়। সৌম্য অসহায় কণ্ঠে বলে, “স্যরি!”

ইরা ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”

সৌম্য কিছু বলল না। ইরার কপালে চুমু আঁকে। এরপর গালে চুমু আঁকে। দু'গালে চুমু আঁকে। ধীরে ধীরে সারামুখে ছোট ছোট চুমু আঁকে। ইরা চোখ বুজে নেয়। একসময় সৌম্য ইরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, 
“শীত কমেছে ইরাবতী?

ইরা জ্যাকেটের ভেতর দিয়েই সৌম্যকে শ'ক্ত করে ধরে রেখেছে। সৌম্য’র কথা দ্বারা কি বুঝল কে জানে, ইরা হেসে ফেলল। চোখ বুজে রেখেই বলে,
“না তো।”

সৌম্য হাসল। জ্যাকেটের উপর দিয়েই দু'হাতে ইরাকে আরেকটু শ'ক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে। সময় ব্যয় না করে চোখের পলকে ইরার ঠোঁটজোড়ায় নিজের আধিপত্য চালায়। ইরা বোধয় অপেক্ষায় ছিল। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল মেয়েটার। 
কনকনে শীত। আন্ধার রাত। মাথার উপর কুয়াশা। রাস্তার এক পাশে দু'যুগল নিশ্চিতে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা বিনিময়ে ব্যস্ত। ছেলেটির কত প্রচেষ্টা তার ভালোবাসাকে শীতের ঠান্ডা থেকে বাঁচিয়ে নেয়ার!

প্রায় মিনিট পাঁচ পর একজন আধবয়স্ক লোক রাস্তার পাশে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হাতে টর্চ। যা সামনের দিকে তাক করে ধরলে মনে হলো কোনো ছেলে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি গলা উঁচিয়ে বলে,
“কে ওখানে?”

কথাটা সৌম্য’র কানে না আসলেও সজাগ ইরার কানে এসেছে। ইরা সরে আসতে চাইলে পারলো না। জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে বা হাত উঠিয়ে সৌম্য’র গালে হাত রেখে সৌম্য’কে ঠেলে সরিয়ে দেয়। সৌম্য’র কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। তাকায় ইরার দিকে। ইরা ঢোক গিলে বলে, “মানুষ।”

সৌম্য আশেপাশে তাকায়। ডানদিকে ফিরলে মুখের সামনে টর্চ এর আলো এসে পড়লে সৌম্য চোখ বুজে নেয়। লোকটি বোধয় বুঝল। সে টর্চের আলো সরিয়ে নেয়। 
ইরা বলে, “জ্যাকেটের চেইন খুলে দাও।”

সৌম্য তাকালো ইরার দিকে। কিছু বলল না। আর না তো জ্যাকেটের চেইন খুলল। উল্টে বা হাতে জ্যাকেটের চেইন আরও উপরদিকে উঠিয়ে নেয়। ইরা সৌম্য’র বুক সমান, তার মাথা পর্যন্ত ঢেকে যাচ্ছে। ইরা দ্রুত বলে,
“কি করছ?”

সৌম্য উত্তর দেয়,
“চুপ থাকো। আমি কথা বলছি।”

ততক্ষণে লোকটি সৌম্য’র কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। সৌম্য ডানদিকে ফিরে নিজে থেকে লোকটিকে সালাম দেয়। লোকটি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কারো সাথে কথা বললে দিক ফেরাতে হয়, ছেলেটা কি জানেনা? লোকটি সালাম এর উত্তর নেয়। সৌম্য’র থেকে কিছুটা পিছিয়ে সে। তার উপর অন্ধকার, শীতের কুয়াশা,, সব মিলিয়ে সে এখনো ভাবছে সৌম্য এখানে একাই। সৌম্য লোকটিকে জিজ্ঞেস করে,

“এখানে আশেপাশে কি এরকম কোনো জায়গা বা হোস্টেল হবে, শুধু আজ রাত থাকার জন্য?”

লোকটি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায় সৌম্য’র দিকে। রাত-বিরেতে এমন এক ছেলে একরাত থাকার জন্য হোটেল খুঁজছে, ব্যাপারটি সে স্বাভাবিক চোখে দেখল না৷ তবে উত্তর করল,
“আছে। সামনে ২০ মিনিট হাঁটলেই পাওয়া যাবে। সারারাত সার্ভিস দেয়৷ কিন্তু তুমি……

সৌম্য মাঝখান থেকে থেকে বলে, 
“আমার ওয়াইফকে নিয়ে থাকব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”

কথাটা বলতে বলতে সৌম্য তার জ্যাকেটের চেইন খুলে ইরাকে বের করে ভেতর থেকে৷ এরপর সে জ্যাকেটের চেইন লাগিয়ে নেয়।
লোকটি চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। এবার তো আরও সন্দেহ হচ্ছে। এরা ভালো মানুষ তো?

সৌম্য ইরার দিকে তাকালে দেখল ইরার চোখে ঘুম উপচে পড়ছে। ক্লান্তিতে মেয়েটা যে নুইয়ে পড়ছে সৌম্য বোধয় খুব করে অনুভব করল। গতকাল থেকে ঘুম নেই ঠিক করে। ইরাকে কোলে তুলে নিল সৌম্য। ইরা থতমত খেয়ে যায় সৌম্য’র কান্ডে। দ্রুত লোকটির দিকে তাকায়, ভদ্রলোকের দৃষ্টি দেখে বোধয় কিছু বুঝল মেয়েটা। সৌম্য লোকটিকে পাস করতে করতে আবারো বলে,

“আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।”

লোকটি চুপচাপ শুধু দেখে গেল। মনে মনে বড্ড বিরক্ত হলো। আজকালকার ছেলেমেয়েদের কত রঙ্গ দেখতে হবে কে জানে! অতঃপর সে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে। 

সৌম্য পাঁচ মিনিটের মতো হাঁটার পর ইরা সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে বলে,
“লোকটা আমাদের অবিশ্বাস করেছে সৌম্য।”

সৌম্য’র ছোট্ট উত্তর, “করতে দাও।”

“তোমার খারাপ লাগছেনা?”

“না তো।”

“কেন?”

“যেখানে আমার ইরাপাখি আমাকে বিশ্বাস করে। সেখানে বাইরের মানুষদের অবিশ্বাসে কি আসে যায়?”

এরপর ইরার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ঘুমাও। তাহলে দ্রুত সকাল হবে।”

ইরা ঘুমঘুম চোখে চেয়ে হেসে বলে,
“সারারাত এভাবে নিয়ে থাকবে? তাহলে এক্ষুনি ঘুমাচ্ছি।”

সৌম্য বোধয় আবারো একটু হাসল। বলে, “ইরাবতীর হাতের মালিশ আমার বডির প্রিয় খাবার।”

এবার ইরা কিছুটা শব্দ করে হাসল। শুনশান রাস্তায় ইরার এটুকু হাসির সে কি আওয়াজ! সৌম্য বুক ভরে শ্বাস নেয়ার মতো করে ইরার হাসির শব্দ শুনলো। 
ইরা চেয়ে থাকে সৌম্য’র দিকে। কত বদলে গিয়েছে সৌম্য। আগে সে সৌম্য’র হাত ধরলেও সৌম্য তার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিত। আর এখন সেই সৌম্য আশেপাশের সব অবহেলে ফেলে রেখে শুধু তার দিকে ফোকাস করে।
___________________

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যা নামাজ পড়ে এপাশ-ওপাশ পায়চারি করছে। গতকাল রাতেও ঠিক করে ঘুমাতে পারেনি সে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে আশেপাশে তাকায়। রান্নাঘর থেকে রান্নার আওয়াজ আসছে মৃদু। বুঝল আসমানী নওয়ান রান্নাঘরে রান্নায় ব্যস্ত। 

সন্ধ্যা অরুণের ঘরের দিকে যায়৷ আকাশ হারিয়ে যাওয়ার পর অরুণ আর অলিভিয়া বাংলাদেশ থেকে যায়নি। দু'জনেই তাদের বাসায় থেকে গিয়েছে। অলিভিয়া তার পরিচিত ফ্রেন্ডদের সাথে কই যেন ঘুরতে গিয়েছে। তবে অরুণ আছে। যদিও গতরাতে ঘুমানোর আগে অরুণকে বাসায় দেখেনি। অরুণ মাঝেমাঝেই এমন রাত করে ফেরে। কাজ থাকে হয়তো। তাই কেউ বাঁকা চোখে তাকায় না। সন্ধ্যা অরুণের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দেয়। ডিম লাইটের আলোয় চোখে পড়ল অরুণ ঘুমে বিভোর। সন্ধ্যা একবার ভাবল ঘুরে যাবে৷ কিন্তু সে শান্তি পাচ্ছে না। গতকালকের ব্যাপারে ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেনা৷ যে নাম্বার থেকে তার ফোনে আকাশের দেয়া ভিডিও আসলো, সেই নাম্বার অরুণের কাছে কি করে এলো? ভিডিওটি কি তবে তাকে অরুণ দিয়েছে? সন্ধ্যা এখানে এসে আটকে যাচ্ছে। অরুণের সাথে কথা বলে তবেই ক্লিয়ার হওয়া যাবে। সন্ধ্যা আর পেছালো না। অরুণের থেকে সব শুনে অরুণকে আবার ঘুমাতে দিবে নাহয়। অতঃপর ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে সন্ধ্যা। এগিয়ে গিয়ে ঘরের লাইট জ্বালায়। লাইটের আলো মুখের উপর পড়ায় অরুণ চোখমুখ কোঁচকায় সামান্য। একটু নড়েচড়ে উঠে আবারো স্বাভাবিক হয়। 

সন্ধ্যা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অরুণের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ডাকে, “অরুণ ভাইয়া? অরুণ ভাইয়া?”

অরুণ ঘুমে বিভোর। সন্ধ্যা অসহায় চোখে তাকায়। আবারও ডাকল বেশ কয়েকবার। অরুণের কোনো সাড়া নেই। সন্ধ্যা কি করবে বুঝতে পারছে না। চলে যাওয়ার কথা ভাবলেও মন সায় দেয় না। অরুণ তো দুপুরের আগে উঠবে বলে মনে হয় না৷ তার প্রশ্নের উত্তর তো এখনই লাগবে। সন্ধ্যা কিছু একটা ভেবে সামান্য ঝুঁকে অরুণের ঘাড়ের কাছে এক আঙুল দিয়ে খুচিয়ে ডাকতে লাগে অরুণকে। যদিও ব্যাপারটা তার কাছে ভীষণ বিব্রত লাগলো, কিন্তু আবার অতোটাও লাগলো না। সৌম্য’র পাশের জায়গায় সে অরুণকে অনেক আগেই বসিয়েছিল। গত ক'মাসে সেই বিশ্বস্তের জায়গাটা আরেকটু দৃঢ় হয়েছে। সন্ধ্যা শব্দ করে বলতে থাকে,

“অরুণ ভাইয়া আপনার সাথে আমার ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। অরুণ ভাইয়া?”

হঠাৎ-ই অরুণ ঘুমের ঘোরে ডান হাতে খপ করে সন্ধ্যা হাত মুঠো করে ধরে। সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। হাত সরাতে চাইলেও পারেনা। অরুণ শ'ক্ত করে ধরেছে। সন্ধ্যা এবার চেঁচিয়ে ডাকে, “অরুণ ভাইয়া????”

অরুণ ঘুমের ঘোরে হাসতে হাসতেই হা করে সন্ধ্যার হাত খেয়ে ফেলার ভঙ্গি করে। সন্ধ্যা এবার গলার জোর আরও বাড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। 

তখনই আকাশ অরুণের রুম পাস করে যাচ্ছিল। সে মূলত জগিং করতে বেরিয়েছিল, বেলা গড়িয়েছে, তাই বাগান থেকে ফিরে ঘরে যাচ্ছিল। পরনে হাতা কাটা সাদা গেঞ্জি, সাদা ট্রাউজার।
অরুণের ঘরে চেঁচানোর শব্দ পেয়ে আকাশের পা থেমে যায়। ডানদিকে ঘাড় ফেরায়। চোখে পড়ে অরুণ সন্ধ্যার হাত টেনে ধরেছে। আর সন্ধ্যা চেঁচাচ্ছে। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। সন্ধ্যার হাত অরুণ টেনে ধরেছে ব্যাপারটি তার মোটেও পছন্দ হলো না। মুহূর্তেই শান্ত মুখটায় রা'গ হানা দেয়। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। পেশিবহুল দু'হাত ফুলে ওঠে, সাথে কপালের রগ। ঘরের ভেতর যেতে গিয়েও থেমে গেল অরুণকে উঠতে দেখে। 

এতো জোরে চেঁচানোয় অরুণের ঘুম ভাঙে পুরোপুরি। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে ঘুমঘুম চোখে সামনে তাকায়। সন্ধ্যাকে চেঁচাতে দেখে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে,
“আরে সন্ধ্যা এই সাতসকালে তুমি এভাবে চেঁচাচ্ছ কেন?”

সন্ধ্যা হাত মোচড়ায় আর বলে,
“আমার হাত ছাড়ুন।”

অরুণ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। চোখ নামিয়ে হাতের দিকে তাকালে দেখল সে সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে আছে। অরুণ কারেন্ট শক খাওয়ার মতো লাফিয়ে ওঠে। সন্ধ্যার হাত ছেড়ে বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“তোমার হাত আমার হাতের মধ্যে কি করে?”
সন্ধ্যা হাত ছাড়া পেয়ে স্বস্তি পায়। জানে পানি এসেছে বোধয়। ঘনঘন শ্বাস ফেলে। যেমন ভ'য় পেয়েছে, তেমনি এতো জোরে চেঁচিয়ে হাঁপিয়ে গিয়েছে। 

অরুণ অনুতপ্ত স্বরে বলে,
“স্যরি সন্ধ্যা! আসলে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার সামনে খুবই সুস্বাদু একটা ললিপপ। বাচ্চাকালে ফ্রেন্ড এর থেকে যেভাবে ছিনিয়ে খেতাম, আজ স্বপ্নেও সেভাবেই একজনের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে খেতে চাইছিলাম। কিন্তু এটা যে তোমার হাত সেটা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি।”

সন্ধ্যা বিস্মিত হয়। একবার অরুণের দিকে তাকায় তো একবার তার হাতের দিকে তাকায়। তার হাত কোনদিক থেকে ললিপপ লাগে সেটাই ভাবছে।

দরজায় দাঁড়ানো আকাশের দৃষ্টি অরুণের দিকে। মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে অরুণকে কাঁচা চিবিয়ে খাচ্ছে। ডান হাতের পাশের দেয়ালের সাথে লাগানো একটি টেবিলের উপর ফুলদানি পেয়ে সেটা হাতে তুলে নেয়। এক সেকেন্ড-ও সময় ব্যয় না করে ফুলদানিটি অরুণের বুক বরাবর ছুড়ে মা'রে। এরপর আকাশ আর এখানে দাঁড়ায় না৷ পথ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে পা চালায়। তার মাথায় কি চলছে কে জানে!
.
এদিকে হঠাৎ কোথা থেকে এক ফুলদানি এসে অরুণের বুকে লাগলো অরুণ, সন্ধ্যা কেউই বুঝল না। অরুণ বিছানার উপর চিৎপটাং হয়ে পড়ে গিয়েছে। বেচারা ডান হাতে বুক ডলছে আর কোকাচ্ছে। সন্ধ্যার মায়া লাগলো৷ সে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই খুঁজে পেল না। বুঝল না এই ফুলদানি কোথায় থেকে অরুণের বুকে এসে পড়ল। মেয়েটা অরুণের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“ভাইয়া আপনি ঠিক আছেন?”

অরুণ ধীরে ধীরে উঠে বসল। বুক মালিশ করতে করতে অসহায় কণ্ঠে বলে, “এমনিতেই এই অনামিকা ছেমড়ির জন্য হৃদয় ভেতর থেকে খান খান হয়ে আছে, এখন আবার কে উপর থেকে হৃদয় ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগলো রে! ইশ!”

সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। অরুণকে শান্ত হতে দেখে সে বলে,
“ভাইয়া?”

অরুণ তাকায় সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা এবার বলে,
“গতকাল আমি একটা নাম্বারে কল দেয়ার পর একজন যে আকাশের কণ্ঠ নকল করে কথা বলল, ওই নাম্বার কার ভাইয়া?”

অরুণ খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয়,
“নাম্বারটা তো আমারি। গতকাল নতুন সিম কিনেছি। আর আকাশের কণ্ঠ নকল করে জেডি তোমার সাথে ফান করেছিল সন্ধ্যা। আমি ওর হয়ে স্যরি!”

সন্ধ্যার ভ্রু কুঁচকে যায়। নাম্বারটা অরুণ ভাইয়ার? তাহলে কি ওই ভিভিও অরুণ ভাইয়া পাঠিয়েছিল? সন্ধ্যা বলে,
“ভাইয়া ওই নাম্বার থেকে আকাশ আর সৌম্য ভাইয়ার বাড়ি ভাঙাসহ তাদের কথার সব ভিডিও আমার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছিল গতকাল। ভিডিওটি কি আপনি পাঠিয়েছিলেন?”

সন্ধ্যার কণ্ঠে বিস্ময়। অরুণ যেন আকাশ থেকে পড়ল। উত্তর দেয়,
“আমি কেন তোমাকে ভিডিও পাঠাবো! তাছাড়া আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার তো এই নাম্বারে নয়। আমার আগের নাম্বারে। তুমি চাইলে চেক করতে পারো।”

কথাটা বলে অরুণ তার ফোন সন্ধ্যার দিকে বাড়িয়ে দিলে সন্ধ্যা সত্যিই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটি চেক করল, আসলেই অরুণের আগের নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ। তাহলে এই ভিডিও তাকে কে পাঠালো? 

অরুণ নিজেও ভীষণ অবাক হলো। সন্ধ্যাকে এই ভিডিও যে পাঠিয়েছে, সে নিশ্চয়ই আকাশকে সন্ধ্যার চোখে খারাপ বানাতে চায়, এজন্যই ভিডিওটি পাঠিয়েছে। এটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কে? অরুণ চিন্তিত কণ্ঠে বলে,

“সিমটা আমি আমার এক পরিচিত ছোট ভাইয়ের থেকে নিয়েছিলাম সন্ধ্যা। ও নাকি মাত্রই কিনেছিল। কিন্তু ওর প্রয়োজন নেই তাই আমাকে দিতে চাইল। আমি না করিনি। আমার একটা জিপি সিম কেনা লাগতো। অনেকদিন হলো কিনব কিনব করে সময় হচ্ছিল না। তাই এই সিমটাই নিয়ে নিলাম। আমি ছেলেটার সাথে কথা বলব। দেখি কোনো ক্লু পাই কি-না!”

অরুণ কথাগুলো বলতে বলতে দরজায় চোখ পড়লে ভ্রু কুঁচকে যায়। আকাশের চোখমুখ থেকে রা'গ উপচে পড়ছে মনে হলো। ডান হাতে মোটা একটি কাঠ। অরুণ ভালো করে খেয়াল করলে দেখল, এটা গাছের ভাঙা ডাল। অরুণ আবারো আকাশের মুখের দিকে তাকায়। আকাশ তার দিকেই তেড়ে আসছে মনে হলো৷ অরুণ কারণ না বুঝলেও ভালোই বুঝল এই আকাশ তার দিকেই আসছে। সে দ্রুত বসা থেকে দাঁড়িয়ে বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে নামতে যায়, তার আগেই আকাশ বা হাতে অরুণের থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট টেনে ধরে। প্যান্ট নিচের দিকে নেমে আসে অনেকটা। অরুণ চোখ বড় বড় করে তাকায়। দ্রুত দু'হাত প্যান্ট টেনে ধরে চেঁচিয়ে বলে,

“ইয়া আল্লাহ! আমার ই'জ্জ'ত গেল! ছাড় ছাড়।”

আকাশ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“মেয়েবা’জী করছিলি এখানে?”

অরুণ অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আরে আমি কেন মেয়েবাজী করব! আমি এসব ছেড়ে দিয়েছি তো! বা'ল সব ভুলে আমার উপর ঝা'ল মেটাতে আসে।”

সন্ধ্যা হতভম্ব হয়ে যায়। কি হলো কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিছুই বুঝল না। কিন্তু অরুণের অবস্থার কথা ভেবে বেচারির চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মনে হচ্ছে অরুণের ই'জ্জ'তের কিছু একটা হবে। তার এখানে থাকা একদমই ঠিক হবে কি-না! সন্ধ্যা দ্রুত জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য এক পা এগোতেই আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার চুল টেনে সন্ধ্যাকে তার সামনে এনে সন্ধ্যার পিঠ তার বুকে ঠেকায়। ডান হাতে রাখা গাছের ডালের অংশটি সন্ধ্যার গলায় চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,

“কি হচ্ছিল এখানে? একটা মিথ্যে বলবি তো, একদম জ'বাই করে ফেলব।”

আকাশের কান্ডে সন্ধ্যা বিস্মিত হয়। মেয়েটা ঢোক গিলছে বারবার। গলায় ব্য’থা পাচ্ছে। তবে সেদিকে পাত্তা দিল না। আকাশ এমন কেন করছে, সেটাই বোঝার চেষ্টায় আছে সে।

ওদিকে অরুণের অবস্থাও নাজেহাল। আকাশ এখনো বা হাতে অরুণের প্যান্ট টেনে ধরে আছে। অরুণ তার প্যান্টে রাখা দু'হাত একবার আলগা করলেই বেচারার প্যান্ট খুলে গিরায় এসে ঠেকবে। 

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা : ৪২৩০
কেমন হয়েছে জানাবেন। পর্বটা লিখতে ভালোই লাগল। হাসলামও খানিক।]

 

Loading spinner

Reply
Page 1 / 2
Share:

Loading spinner