গল্প:শিকদার মাহদি (...
 
Notifications
Clear all

গল্প:শিকদার মাহদি (Author:DRM Shohag)


Posts: 16
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 6 months ago

 

 

“তোমার জন্য মেয়ে দেখেছি মাহদি।

দুপুরের দিকে মাহদি বাইরে থেকে মাত্র ফিরেছে। ক্লান্ত দেহ নিয়ে তার ঘরে যাচ্ছিল। দাদিজানের কথা কানে আসতেই তার পা এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সামনের দিকে আরও দু'কদম এগোলে বয়স্ক ভদ্রমহিলা আফসানা বেগম পুনরায় বলেন,

মাহদি আমার ধারে এসে একটু বসো। দুইটা কথা শোনো। তোমার বয়স হইছে। বিয়ে করতে হবে তোমাকে।”

এ পর্যায়ে মাহদি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই এসে দাঁড়ায় তার দাদিজানের সামনে। পুরো নাম ‘শিকদার মাহদি’। আফসানা বেগমের বড় ছেলের ছেলে মাহদি। বয়স ২৯ এর কোঠায় এসে ঠেকেছে মাত্র। হাইট ৬ ফুট। গায়ের রঙ অধিক ফর্সা। চোখের মণি দু'টি অ্যাম্বার অর্থাৎ হালকা সোনালি, যা অত্যধিক আকর্ষণীয়। পরনে কালো টি-শার্ট আর কালো কার্গো প্যান্ট। ঘাড় ছুঁইছুঁই সিলকি চুল। যার কিছু অংশ মাথার উপর ঝুঁটি করে রাখা।
ডান হাতে সোনালি রঙের একটি ঘড়ি আর বাম হাতে একটি কালো ব্যাচ। ডান কানের পাতায় একটি কালো টপ। গালে চাপ দাঁড়ি। মুখাবয়বে গাম্ভীর্য। দৃঢ় চোয়ালের অধিকারী মাহদি তার দাদিজানের উদ্দেশ্যে দু'টো শব্দ আওড়ায়,

“বলো দাদিজান।”

“আমি তো বললামই। তোমার জন্য মেয়ে দেখেছি। তুমি সময় করে একবার মেয়েকে দেখে আসলে বিয়ের কথা পাকা করব।”

মাহদির চোখেমুখে বিরক্তি। এসব বিয়ে টিয়ে তার সাথে ঠিক যায় না। সেখানে মেয়ে দেখে কি করবে সে? সে বিয়ে করার পর এই বাড়িতে একটা বউ আসলে, ‘বয়স হয়েছে, বিয়ে কবে করবে’ এই প্রশ্ন দু'টো থেকে সে বাঁচতে পারবে অন্তত। অতঃপর মাহদি তার দাদিজানের প্রশ্ন এড়িয়ে না গিয়ে বলল,

“মেয়ে দেখতে হবে না। সময় করে একবার তোমরা গিয়ে বউ নিয়ে চলে এসো।”

মাহদির দাদিমা আফসানা বেগম তব্দা খেয়ে বললেন,
“আমরা গিয়ে নিয়ে আসব মানে? তুমি গিয়ে বিয়ে করলে তারপর না ওই মেয়েকে আমাদের বাড়িতে আনতে পারবো!”

বিরক্তিতে মাহদি দু'আঙুলের সাহায্যে কপাল ঘঁষল দু'বার। অতঃপর বলে,
“আচ্ছা চলো বিয়ে করছি। দশ মিনিটের বেশি টাইম দিতে পারবো না।”

কথাটা বলে মাহদি বাইরের দিকে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই আফসানা বেগম খানিক বিস্মিত হয়ে বলেন,
“আশ্চর্য তো! তুমি কি এখনই বিয়ে করতে যাচ্ছ?”

মাহদি অসহ্য কণ্ঠে বলে,
“হ্যাঁ যাচ্ছি। প্রবলেম কি তোমার? এক্ষুনি তো বললে আমি গিয়ে বিয়ে করলে তারপর তোমরা মেয়েকে এই বাড়ি আনতে পারবে।

একটু থেমে আবারো বলে,
মেয়ের বাসার ঠিকানাটা দাও। বিয়ে করে আসছি।”

আফসানা বেগম কি বলবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। পাশে মাহদির ছোট চাচি মুখ চেপে হাসছে। ছেলেটার কর্মকান্ডে না হেসে পারছেন না। যেন মাহদি পুতুলের বিয়ে দিতে যাচ্ছে। ইচ্ছে হলো আর দশ মিনিটে বিয়ে পরিয়ে দিয়ে এলো!
আফসানা বেগম নিজেকে সামলে বললেন,

“এভাবে বিয়ে হয় না মাহাদ। তুমি সন্ধ্যার পর একটু সময় বের কর। তখন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে যাবো। এখন ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও।”

মাহদি তার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে,
“দশ মিনিটের বেশি টাইম লাগলে বিয়ে ক্যান্সেল, মাথায় রাখবে দাদিজান।”

আফসানা বেগম হতাশ চোখে চেয়ে রইলেন নাতির পানে। মাহদির চাচি বলল,
“মা আপনি মাহাদকে আজকেই বিয়ে দিবেন? মেয়ের পরিবার যদি রাজি না হয়?”

আফসানা বেগম মৃদুস্বরে বললেন,
“হবে। এত বড় বাড়ি থেকে সম্মোন্ধ গিয়েছে বলে অনেক খুশি ছিল তারা। আজকে বিয়ের কথা বললেও রাজি হবে। তাছাড়া মাহদির মতিগতির ঠিক নেই। রাত পার হলেই আবার মত বদলাতে পারে। মেয়ের বাড়ি কাছেই আছে। সমস্যা হবে না। তুমি বাড়ির সবাইকে কেনাকাটা শেষ করতে বলো সন্ধ্যার আগেই।”

ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। কিছু একটা ভেবে বললেন,
“আমার মনে হচ্ছে, আপনার বাউন্ডুলে নাতি বিয়েটাকে ছেলেখেলা ভাবছে। ভাবাটা অস্বাভাবিক না। ও তো এমনই।”

আফসানা বেগম সোফায় হেলান দিয়ে আস্তে করে চোখ বুজে বললেন,
“বিয়ের বন্ধনের ভিত খুব মজবুত হয় বউমা। মরার আগে মাহদির একটা গতি করে দিয়ে যেতে চাই। ওকে একটু সংসারি দেখে যেতে চাই। খুব চিন্তা হয় আমার ছন্নছাড়া নাতিটার জন্য।”

রান্নাঘর থেকে মাহদির বড় চাচি এসে দাঁড়ায় সেখানে। শ্বাশুড়ির কথায় মুখ ঝামটায়। তাচ্ছিল্যের সুরে বিড়বিড় করে,
‘ওই মাহদি করবে সংসার! যেখানে সেখানে গু’ন্ডামি করে বেড়ায়। সারাদিন বাইরের মানুষদের পি’টিয়ে এসে রাতে পি’টা’বে বউ। দু'দিন যেতে না যেতেই দেখব বউ পালাইছে।’

.
রাত ৮ টায় বাড়ির মুরুব্বিরা রেডি হয়ে মাহদির জন্য অপেক্ষা করছে। মুরুব্বি বলতে মাহদির বড় চাচা আর তার কিছু বড় ভাইয়েরা আছে। মাহদির বাবা-মা আর দাদা বেঁচে নেই। ছোট চাচা আপাতত ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে আছেন।
এদিকে মাহদি বাড়িতে নেই। এটা নতুন নয়। দিনের ১ ঘণ্টাও বাড়িতে থাকেনা সে। শুধু রাতটুকু পার করতে বাড়ি আসে। মাঝে মাঝে তো রাতেও আসেনা। মাহদির বড় চাচা শিকদার জুনায়েদ মাহদির ফোনে পুরো ২০ বার কল দিয়েছে। কিন্তু কল রিসিভ হয়নি। বরং শেষ দু’বার কল কেটে দিয়েছে মাহদি। ভীষণ চটে গিয়েছেন ভদ্রলোক। মাহদিকে কয়েকটা গালিও দিয়ে দিয়েছে এরকম স্বাভাবের জন্য। 
অতঃপর সকলের বিরক্তি কমাতে মাহদি ৪৫ মিনিট পর বাড়ির সামনে এসে পৌঁছায়। বাড়ির গাড়ির পাশে মাহদি তার বাইক থামিয়ে মাথার হেলমেট খোলে। শিকদার জুনায়েদ রাগান্বিত স্বরে বলেন,

“তোমার কমনসেন্স নেই? কতবার কল দিয়েছি তোমাকে? আমার কল রিসিভ না করে কেটে দিয়েছ কোন সাহসে?”

মাহদি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কোনো কমনসেন্স ওয়ালা মানুষ কল রিসিভ না হওয়ার পরও বারবার কাউকে কল দেয় না চাচা।”

শিকদার জুনায়েদ রাগে কাঁপতে লাগলেন। এই বেয়ারা ছেলের কোনো কাজে ইনভলভ হতে তার বিন্দুমাত্র ভালো লাগে না। শুধুমাত্র মায়ের মুখের উপর কথা বলতে পারে না বলে মুখ বুজে অনেককিছু সহ্য করতে হয়। রাগান্বিত স্বরে বলেন,

“আমরা তোমার জন্য কখন থেকে অপেক্ষা করছি, কোনো আইডিয়া আছে তোমার?”

মাহদি ভাবলেশহীনভাবে বলে,
“মাহাদের বউ চাই আপনাদের। অপেক্ষা আপনারা করবেন না তো কে করবে? আমি? আজব!”

শিকদার জুনায়েদ পাল্টা আরও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মাহদির ছোট চাচার ছেলে সাদ তার বড় আব্বাকে কোনোরকমে সামলে বাকি ভাইরা সহ ঠেলেঠুলে গাড়িতে বসিয়ে দিল। নয়তো এই রাস্তায় চাচা ভাতিজির মাঝে এক ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাবে। শিকদার জুনায়েদ গাড়ির মাঝে বসেই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেন। সহ্যের একটা সীমা থাকে। যেটা মাহদি বরাবরের মতোই ক্রস করল। বড় ভাই একটা জঙ্গল রেখে গেছে তাদের সংসারে। 

সাদ মাহদির পাশে এসে দাঁড়ায়। বাড়তি কথা বলে না। নয়তো মাহদির বিয়ে থেকে মত ঘুরে গেলে তাদের দাদিজান আরেক কান্ড বাঁধাবেন। এসব ঝামেলা এড়িয়ে বলল,
“এই টি-শার্ট, প্যান্ট পরেই যাবি?”

মাহদি কপাল কুঁচকে বলে,
“তো কি পরব?”

সাদ খেয়াল করল, মাহদির কালো হাফ হাতা টি-শার্ট হালকা কুঁচকে আছে। কালো কার্গো প্যান্টে ধুলো লেগে আছে। আবার কোথায় কি ঘটিয়ে এসেছে কে জানে! তবে মাহদির ড্রেসআপ এটাই। কিন্তু বিয়ে বাড়িতে এভাবে গেলে ব্যাপারটা ভালো দেখাবে না। অতঃপর বলে,

“তোর জন্য শেরওয়ানি…..”

সাদকে শেষ করতে না দিয়ে আবারো মাথায় হেলমেট পরতে পরতে মাহদি শক্ত গলায় তাড়া দেয়,

“ভাই, যদি চাও এই বাড়ি নতুন বউ আসুক, তাহলে টাইম লস কর না। যেকোনোমুহূর্তে চলে যাবো। এরপর বিয়ের জন্য ইহজীবনে আর আমাকে পাবেনা।”

সাদ তড়িঘড়ি করে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে। মাহদি টার বিশ্বাস নেই। কি আর করার! এভাবেই বিয়ে হোক। যা তা করে বিয়ে তো হচ্ছে, এরপর কি হবে কে জানে! সাদ মাহদির চেয়ে এক বছরের বড়। মাহদির সাথে তার ভালোই ভাব বলা যায়। একমাত্র তার সাথেই দু'দন্ড বসে কথা বলে মাহদি। 
কিছু একটা ভেবে সাদ জানালা দিয়ে মাথা বের করে বলে,

“মাহদি তুই তো বিয়ে করতে যাচ্ছিস। আজ অন্তত বাইক রেখে আমাদের গাড়িতে আয়।”

মাহদি বাইক স্টার্ট দিয়ে সাদের বরাবর গাড়ির কাছে এসে বাইক থামায়৷ ঘাড় ঘুরিয়ে সাদের দিকে চেয়ে হেলমেটের আড়াল থেকে গম্ভীর গলায় বলে,

“তুমি তোমার ছোট ভাইয়ের বিয়েতে ফুল ড্রেসের সঙ্গ ছাড়তে পারলে আমি আমার বাইকের সঙ্গ ছাড়ছি।”

সাদ চোখমুখ কুঁচকে তাকালো। কি শ'য়তান ছেলে। সে ভালোর জন্য বলল, আর এ কোন কথা কোথায় নিয়ে গেল। 
গাড়ির ভেতরে বসা শিকদার জুনায়েদ মাহদির কথাটা শুনতে পেয়েছে। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল,
‘বে’হায়া ছেলে!’

.
ঘড়ির কাটা তখন রাত ১২ টার ঘরে। পরিপাটি একটি ঘরের বিছানার মাঝে বসে আছে মেধা। গায়ে লাল রঙের বেনারসি। ছেলের বাড়ি থেকে গত দু'দিন আগে তাকে দেখতে গিয়েছিল। মেধার বিয়েতে দ্বিমত ছিল না। বাবা নেই তার। মা, বড় আপা আর সে এই তিনজনকে নিয়েই তাদের সংসার। ছেলের বাড়ি থেকে তাকেই পছন্দ করেছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ দুপুরে জানায়, বিয়ে আজকেই হবে। এত ভালো ঘর থেকে সম্মোন্ধ গিয়েছে, এজন্য মা কোনো হম্বিতম্বি ছাড়াই রাজি হয়ে গিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর অনেক দামি দামি জিনিস তাদের বাড়ি পাঠানো হয়, যা দিয়ে মেধা তার আপার সাহায্য নিয়ে যেটুকু পেরেছে সেজেছে। মেধা ভেবেছিল বড় বাড়ির বউ হবে, তার মানে নিশ্চয়ই খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে তার। সে তার বিয়েতে খুব সাজবে, খুব মজা করবে। কিন্তু সেসব কিছুই হলো না। কেমন মরা বাড়ির মতো করে বিয়ে পড়িয়ে আনলো তাকে। স্বামীকে পিছন থেকে এক নজর দেখেছিল মেধা, আর নামটা জানে। এখন তার জন্য ঘরে বসে বসে অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাড়িতে পা রাখার পর মেধার কানে কিছু অদ্ভুত কথা আসে। একজন আধ বয়সী ভদ্রমহিলা অন্যজনকে বলছিল,

‘মাহদি সারাদিন গু'ন্ডামি করেই দিন পার করে। বউকে মে'রে কালকেই না বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়!’

যে এই কথা বলেছে, সেই ভদ্রমহিলা এই বাড়িরই সদস্য। কিন্তু মেধা প্রথমদিনই চিনতে পারেনি, উনি সম্পর্কে তার কি হয়! তবে ওই কথা শোনার পর থেকে মেয়েটার একটু ভয় লাগছে। সত্যি সত্যি তার স্বামী এসেই যদি তাকে ধুপধাপ মেরে দেয়! মেধা ঘামতে শুরু করল। না না সে মার খাবে না। অতঃপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। ঘরে অল্প পাওয়ারের একটি লাইট জ্বলছে। অরার সর্বপ্রথম চোখে পড়ল, দরজার কাছটায় টেবিলের উপর ঝুড়িভর্তি ফলের মাঝখানে একটি চা’কু রাখা। মেয়েটা ব্যস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে চা’কু হাতে তুলে নেয়। এরপর আবারো বিছানার দিকে যেতে নেয়, তখনই দরজা খোলার শব্দ কানে আসে। কেউ একজন ঘরে এসেছে, বেশ বুঝল সে। মেধা এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে উল্টো ঘুরে একদম তার সামনে দাঁড়ানো লোকটার গলার দিকে হাতের চা'কু ধরে তেজ নিয়ে বলে,

“একদম আমাকে মা’রতে আসবে না। আমাকে ছোট মানুষ ভেবে ভুল করবে না। আমি কখনোই বসে বসে তোমার মা'র খাবো না। তাই সাবধান করছি। সাবধান হলে তোমাকে ছেড়ে দিব নয়তো না।”

মেধার কণ্ঠে মেকি তেজ থাকলেও, কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, চোখেমুখেও ভীতি মেয়েটার। এদিকে ঘটনাটি মাহদির জন্য অপ্রত্যাশিত হলেও, সে একদম নির্বিকার। না চমকালো, না ভড়কালো, না অবাক হলো! বরং চোখেমুখে চরম বিরক্তি আর রাগের ছায়া। 
বিয়ে পড়ানো শেষে মাহদি সাদকে বলেছিল, 
‘ভাই এবার তোমাদের বাড়ির বউকে তোমরা নিয়ে যেও। আমার কাজ শেষ।’
এরপর মাহদি মেধাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার এহেন কান্ডে অবশ্য শিকদার জুনায়েদ আরও কয়েক দফা মাহদিকে কথা শুনিয়েছিল, কিন্তু মাহদির সেসব পাত্তা দেওয়ার সময় থাকলে তো! 
মাহদি মেধাকে একবার বিয়ে বাড়িতেই দেখেছিল। তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি এখন।  

মেধা দু'পা উঁচু করে মাহাদের গলার কাছটায় চা'কু ধরতে চাইলেও সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। গলা থেকে সামান্য নিচের দিকে চা'কু ধরে রাখা। মেয়েটা সেদিকে খেয়াল করল না। সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মাহদির পানে। লোকটার গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। কিন্তু চোখে লাগছে, মাহদির চোখের সোনালি মণি দু'টো। 

মেধার কান্ডে মাহদির ইচ্ছে করল মেয়েটাকে ঠাটিয়ে দু'টো থাপ্পড় লাগাতে। কিন্তু ঝামেলা এড়াতে নিজেকে সংযত করল। এর উপর আবার মেধাকে নিজের দিকে এমন হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে মাহদির রাগের সাথে সাথে বিরক্তির মাত্রা বাড়লো বই কমলো না। সারাদিন ছোটাছুটি করে ফালতু ঝামেলা সামনে এলে মাথা গরম হয়ে যায়। কিন্তু সে আপাতত এই মেয়েটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। 
মেধা সাথে সাথে উল্টো ঘুরে মাহদির দিকে তাকায়। চোখে পড়ল, মাহদির ঘাড় সমান সিলকি সোজা চুলের দিকে। সামনে থেকে অল্প কিছু চুল নিয়ে ছোটোখাটো একটি ঝুঁটি বাঁধা। যেটা পিছনদিকে হেলে আছে। মেধা অবশ্য এতে অবাক হলো না। কারণ সে যখন তার বাড়িতে পিছন থেকে তার স্বামীকে দেখেছিল, তখনও চুলের এই ছিরিই ছিল। তবে চেহারা তো দেখেনি। অতঃপর চটপট প্রশ্ন করে,

“তোমার নাম কি মাহদি?”

মাহদি তার ডান হাত থেকে সোনালি রঙের হাতঘড়িটা খুলে মাত্র টেবিলের উপর রেখেছে তখনই মেধার প্রশ্নে কপালে ভাঁজ পড়ে তার। মেয়েটা তাকে তুমি বলে সম্মোধন করল না? এত ভাবলো না সে। গম্ভীর গলায় ছোট একটি উত্তর করে,

“হুম।”

“তার মানে তুমিই আমার স্বামী?

মাহদির কপালের ভাঁজ গাঢ় হতে শুরু করছে। অত্যধিক বিরক্তির কারণ এটা। 
মাহদি চুপ থাকলো। মেধা আবারো বলল, 

বুঝেছি, তুমি হয়ত বলতে লজ্জা পাচ্ছ। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি তুমিই আমার স্বামী। এসব থাক। আমার তোমাকে পছন্দ হয়নি।”

মেধার প্রথম কথায় মাহদির রাগ হলেও শেষ লাইনটা শুনে যেন সে বেশ মজা পেল। ছোট করে বলল,

“আচ্ছা।”

মেধা ফটাফট বলে,
“আচ্ছা মানে? তোমাকে আমার সত্যিই পছন্দ হয়নি। অপছন্দের মানুষের সাথে সংসার করা যায় না-কি?”

মাহদির ভাবলেশহীন স্বর,
“কর না।”

মেধা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তুমি সংসার করবে না?”

মাহদির একই কণ্ঠ, 
“না।”

মেধা অবাক হয়ে বলে,
“না? তাহলে বিয়ে করলে কেন?”

মাহদির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। এই মেয়ে এত কথা বলছে কেন! অসহ্য কণ্ঠে বলে,

“কখন থেকে আমাকে তুমি তুমি করে সম্মোধন করছ। তুমি জানো আমার বয়স কত?”

কথাটা বলতে বলতে মাহদি মেধার একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। মেধা সরল মনে বলে,

“কত তোমার বয়স? যদিও দেখে বোঝা যাচ্ছে, তুমি আমার চেয়ে অনেক বড় হবে। কিন্তু সঠিক বয়স জানলে বোঝা যাবে তুমি আমার চেয়ে ঠিক কত বছরের বড়!

মাহদি বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে। এটা মেয়ে না ভাঙা রেডিও? মেধা আবারো বলে,

আসলে আমি সবাইকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার বয়স কত। কিন্তু কেউ বলেনি৷ আর আমার বয়স ১৯ বছর। এবার তুমি বলো, তোমার বয়স কত! 

মাহদি চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল,
“২৯।”

মাহদির বয়স শুনতেই মেধা চট করে আঙুলে গুণতে শুরু করল। ছোট থেকেই এটা তার অভ্যাস। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“তুমি আমার চেয়ে দশ বছরের বড়।”

মেধাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে কোনো যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে। মাহদির কণ্ঠে তীব্র রাগ ঝরছে,
“নিজের চেয়ে এত বছর বয়সী বড় একজনকে কিভাবে তুমি সম্মোধন করছ, সেন্স নেই তোমার?”

মেধা কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
“কেন, তুমি বললে কি হবে? আমি তো সবাইকে তুমি করেই বলি।”

মাহদি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“যা ইচ্ছা বলো। কিন্তু তুমি আমার সামনে আর একটা কথাও বলবে না। আমি এখন ঘুমাবো।”

কথাটা বলে মাহদি হনহন করে এগিয়ে গিয়ে ঘরের সব আলো অফ করে দেয়। এরপর গায়ের টি-শার্ট খুলে বিছানার এক কোণায় ছুড়ে ফেলে বিছানার উপর ধপ করে উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ে। 
ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আসার পথে সাদ নিজের ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মাহদিকে। বিয়ের ব্যাপারে কিসব আলতু ফালতু জ্ঞান দিচ্ছিল। মাহদি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। ওসব কথা মানা তো দূর, শুনলেই মেজাজ গরম হয়। তবুও বড় ভাই সাদের কবল থেকে ছুটতে না পেরে গাট্টি মেরে কতক্ষণ বসে ছিল! সাদ তার বয়সে বড় হলেও, দু'ভাই দু'ভাইকে বন্ধুর মতোই ট্রিট করে। শুধু সম্মোধনের সময় মাহদি সাদকে ভাই আর তুমি বলে এটুকুই। 
এরপর সাদের বেকার কথাবার্তা শেষ হলে মাহদি সাদের ঘর থেকেই শাওয়ার নিয়ে ওখান থেকেই একটি টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে একেবারে আসে নিজ ঘরে।

মেধা ঘরের চারিদিকে চোখ বুলায়। কৃত্রিম আলোর অভাবে ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার কথা থাকলেও জোৎস্নার আলোর ছিটেফোঁটা ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। মেধা চেঁচামেচি না করে দ্রুত এগিয়ে এসে বিছানার কাছটায় মাহদির পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

“এ কি তুমি ঘুমাচ্ছো কেন? নতুন বউকে ফেলে কেউ ঘুমায় না-কি?

মাহদির সাড়া নেই। মেধা হাতের চা’কুটি বেড সাইডের টেবিলের কোণায় রেখে দু'হাত কোমরে রেখে বলল,
ঠিক আছে ঘুমাও। এমনিতেও আমি তোমার সাথে সংসার করব না।”

কথাটা বলে কিছু একটা ভেবে তাকালো মাহদির দিকে। ভাবছে এই বাড়ির লোক যে বলল, মাহদি তাকে মারবে। কই মাহদি তো মারলো না! অতঃপর অরা বিড়বিড় করল,

‘আরেকটু দেখি তোমার সাথে সংসার করা যায় কি-না!’

কথাটা বলে মেধা মাহদির দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি ঘুমিয়েছো?

মাহদির সাড়া নেই। মেধা অপেক্ষা করল। ফিরতি উত্তর না পেয়ে হঠাৎ ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
আচ্ছা তুমি না-কি যেখানে সেখানে গু’ন্ডামি করে বেড়াও!”

মেধা কথাটা বলতে না বলতেই মাহদি বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে একটি কাঁচের জগ নিয়ে জোরেসোরে টেবিলের কোণায় আ’ঘাত করে জগটি ভেঙে মেধার দিকে গেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে রক্তচক্ষু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হুঁশিয়ারি দেয়,

গু’ন্ডাই তো আমি। এখন সেটার প্রমাণও দিয়ে দিব তোমাকে। ৩৬৫ দিনে পুরো বাড়ির লোক আমার মাথার যা খেতে পারেনি, তুমি মাত্র কয়েক মিনিটে আমার সেই মাথা খেয়ে ফেলেছ। এবার দেখো আমার গু’ন্ডামি।

মেধা ভয়ের চোটে মেঝেতে ঠাস করে পড়ে গিয়েছে। চোখেমুখে বিস্ময় মেয়েটার। মনে হচ্ছে তার দিকে বড়সড় কোনো দৈত্য তেড়ে আসছে। মনে হবে না-ই বা কেন! এমন বিশালদেহী লোকের এত রাগান্বিত লুক দেখলে ছোট বাচ্চারা বোধহয় এতক্ষণে কেঁদে দিত। মেধা তার ভয়ের কান্না বহুক'ষ্টে চেপে রাখলেও, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে মেয়েটার। ভীত কণ্ঠে আওড়ায়,

“না না এমন কর না। আমি আর তোমার মাথা খাবো না।”
 
 

 

🟥গল্পটা একদমই অল্প কয়েকটি পর্বের মধ্যে শেষ হবে। আর হারাচ্ছি না। যাই করি না কেন, পেইজে গল্প সবসময়ই চলবে ইনশাআল্লাহ। এটা শেষ হলে হৃদয় রজনী আসবে অথবা এটার মাঝেই চলে আসবে ইনশাআল্লাহ। রানিং-এ পুরোপুরি ফিরলাম। সাথে থাইকেন। গল্পটা কেমল লাগল, অবশ্যই জানাবেন।

Loading spinner

Reply
1 Reply
Posts: 16
Topic starter
(@drm-shohag)
Joined: 6 months ago
 
পর্ব:০২ 

গল্পের নায়ক- মাহদি, নায়িকা-মেধা
সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। 

 

১০ মিনিট আগে মাহদি ভাঙা জগ ছুড়ে ফেলে হনহন করে ওয়াশরুমে চলে গেছে। মেধা ঘরের এক কোণায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে। বুক ধুকধুক করছে। এখনো ভয় কাটেনি তার। একটু আগে মনে হচ্ছিল, আজ তার শেষ দিন। কিন্তু আল্লাহ সহায় থাকায় লোকটার মাথায় একটু সুবুদ্ধি হয়েছে, আর তাই সে বাঘের থাবা থেকে বাঁচতে পেরেছে। মেয়েটা ধীরে ধীরে উঠে তার ছোটোখাটো একটি ব্যাগের ভেতর থেকে ফোন বের করে। ফোনটা বাটন। একদম নতুন ফোন। গতকাল আপা তাকে কিনে দিয়েছে। ফোনে আপা আর মায়ের নাম্বার সেভ আছে শুধু। মেধা ব্যস্ত হাতে তার আপা দৃপ্তার ফোনে কল দেয়। প্রথমবার কল রিসিভ হয়না। কিন্তু দ্বিতীয়বার কল রিসিভ হয়। মেধা ব্যস্ত কণ্ঠে ডাকে,

"আপা?"

দৃপ্তা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে,
"কি হয়েছে সোনা? এত রাতে কল করলি কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?"

মেধা মন খারাপ করে বলে 
"আপা আমার স্বামী তো গু'ন্ডা। তোমরা আমাকে গু'ন্ডার সাথে বিয়ে দিয়েছ কেন?"

দৃপ্তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
"চিন্তা করিস না সোনা। আপা কাল তোর কাছে আসছি, হু?"

মেধা কিছু বলার আগেই পিছন থেকে মাহদি মেধার কান থেকে ফোন কেড়ে নিশে ফোন বন্ধ করে দেয়। মেধা দ্রুত পিছু ফিরে তাকায়। মাহদিকে নিজের দিকে রেগে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঢোক গিলল মেয়েটা। মাহদি রাগান্বিত স্বরে বলে,

"আমার ঘরে থেকে বারবার আমাকেই গু'ন্ডা বলছ কোন সাহসে?"

মেধা দু'বার চোখের পলক ফেললো আর মেললো। এরপর বলে,
"তুমিই তো একটু আগে বললে তুমি গু'ন্ডা। আমার কি দোষ?

মাহদি হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে। মেয়েটার একেকটা কথা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। মাহদিকে চুপ দেখে মেধা কিছু একটা ভেবে বলে,
জানো নাগিন সিরিয়াল আমার খুব প্রিয়। সবগুলো সিজন দেখেছি আমি। আর তোমার চোখদু'টো দেখতে একদম নাগদের মতো। তোমার ভাগ্য কত ভালো, তুমি মানুষ হয়েও নাগদের মতো হতে পেরেছ।"

মাহদি বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। কিহ্! তাকে ওইসব ফা'লতু সিরিয়ালের ন'ষ্ট ক্যারেক্টারদের সাথে মেলাচ্ছে এই মেয়ে! মাহদি বাম হাত উঠিয়ে আঙুল নাচিয়ে শাসায়,
"আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না মেধা। সাবধান করছি তোমাকে।"

মেধা হঠাৎ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“তুমি আমাকে মেধা বললে? তুমি তো দেখছি খুব ভালো, একদম নামের বিকৃত কর না। কিন্তু আমার কলেজের কেউ আমাকে আমার নাম ধরে বলে না, জানো! আমি একটু চিকন বলে সবাই আমাকে মগা বলে ডাকে।”

মেধার বলা শেষ লাইনটায় ভীষণ দুঃখ প্রকাশ পেল। মেধার কথা শুনে না চাইতেও মাহদির নজর মেধার দিকে একবার গেল, সত্যিই মেয়েটা স্বাভাবিক এর চেয়েও অনেক বেশি চিকন। কিন্তু তাতে মাহদির কি? কিছুই না। বিরক্ত হলো মাহদি। ছেলেটার নিজের উপরই রাগ লাগলো। এই মেয়েকে কিছু বলতে আসাই ভুল। একটা শব্দ বললে, বিনিময়ে প্যারাগ্রাফ শুনতে হয়। 
চরম বিরক্ত হয়ে হনহন করে গিয়ে আবারো ঠাস করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। 
মেধা উৎফুল্ল মনেই এসে মাহদির পাশে শুয়ে পড়ল৷ মেয়েটার মাঝে কোনো সংকোচ নেই। যেন মাহদির পাশে থাকার অভ্যাস তার বহুদিনের। 
মেধার একটা বিশেষ গুণ আছে। তার আপা তাকে কোনো কথা বুঝিয়ে করতে বললে, মেধা সেই কাজ খুব সাচ্ছন্দ্যে করে ফেলে। তার মনে হয়, তার আপা যেটা বলে, সেটা একদম ১০০% ঠিক আর সুন্দর। মেধার এই ভাবনার কারণে তাকে অস্বস্তি সহজে ঘিরে ধরতে পারে না। 

মেধা মাহদির দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়েছে। আর মাহদি উল্টো হয়ে মেধার বিপরীত দিকে মুখ করে রেখেছে। 
মেধার মন এখনো উৎফুল্ল। এর কারণ দু'টো। একটা হলো, তার স্বামীর চোখ তার পছন্দের নাগদের মতো, আর তার স্বামী তাকে মগা না ডেকে মেধা ডেকেছে। এই দু'টো কারণে মাহদিকে তার এখন একটু একটু ভালো লাগছে। কিন্তু সংসার করবে কি-না সেটা এখনো ভাবেনি। সহজ সরল মেয়েটা সবকিছু অতি সহজেই নেয়। সে ভাবছে, বিয়ে হলেও কি! সে চাইলেই এই সংসার করবে, আবার না চাইলেই সংসার করবে না। 

.
শিকদার বাড়িতে সকাল সকাল খাবার টেবিলে সবাই গোল হয়ে বসেছে। বড়সড় ডায়নিং এ খুব বড় একটি টেবিল। দেখতে অনেকটা আদিকালের মতো। 
মাহদি খুব মনোযোগ দিয়ে ডিম পোচ দিয়ে রুটি খাচ্ছে। পাশের চেয়ারে মেধা বসেছে। মেয়েটা নিজেও একটু একটু করে রুটি মুখে দিচ্ছে আর সবাইকে দেখছে। অনেক মানুষ এখানে। তবে দু'জন ছেলে আর একজন মেয়ে যারা তার চেয়ে একটু বড় হবে, ওরা মেধার সাথে একদমই কথা বলেনি। এরা সবাই মাহদির কাজিন। কিন্তু তাকে দেখে খুশি নয়। তার সাথে শুধু এই বাড়ির একজন মহিলা খুব সুন্দর করে কথা বলেছে, তিনিই তাকে মাহদির পাশে বসিয়ে দিয়েছে। সবাইকে চিনিয়ে দিয়েছে। এখানে একটা বুড়ি আছে, সে মাহদির দাদি। সেও তার সাথে কথা বলেনি। কেমন যেন বাঁকা চোখে তাকালো তার দিকে। মেধার একটু অস্বস্তি হলো। কারণ এত ধরনের মানুষের ব্যাপারে তার আপা তাকে কিছুই বলেনি। 

আফসানা বেগম হঠাৎ নিরবতা ভেঙে সাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“মাহদি দাদুভাই তোমার ছোট হয়ে বিয়ে করল। তুমি কবে বিয়ে করবা সাদ দাদুভাই?”

মাহদির অপর পাশে সাদ বসেছে। সে সাথে সাথেই উত্তর দিতে পারলো না। সময় নিয়ে কিছু বলতে চাইল, তার আগেই মাহদি গম্ভীর গলায় বলে,

“ভাই বিয়ে করবে না। মেয়েদের ভালো লাগে না ভাইয়ের। সে সন্যাসী হবে।”

সাদ বামদিকে ঘাড় ফিরিয়ে বিস্ময় চোখে তাকায় মাহদির দিকে। গলা নামিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“নিজের স্বভাব আমার উপর চাপাচ্ছিস কেন বে’য়া’দব?”

মাহদি এঁটো প্লট সামনে থেকে সরিয়ে সাদের দিকে চেয়ে বলে,
“গতরাতে অনেক জ্ঞান দিয়েছ, তাই আজ পারিশ্রমিক দিচ্ছি। এবার চুপচাপ শিকদার মাহদির পারিশ্রমিক গেলো।”

সাদ চোখ পাকালো। মাহদি পাত্তা দিল না। সে উঠে দাঁড়াতে নিলে, সাদ মাহদির হাত ধরে আটকে দিয়ে নিচু স্বরে বলে,

“ভুল হয়েছে আমার। তোদের সংসার ভেসে গেলেও আর ফিরে তাকাবো না আমি। কিন্তু আমার বিয়ে নিয়ে তুই কোনো কথা বলবি না খবরদার। তুই হইলি এক ভেজাইল্যা মানুষ।”

কথাটা বলে সাদ মাহদির হাত ছেড়ে দেয়। মাহদি গায়ে মাখলো না সাদের কথা। সে উঠে দাঁড়িয়ে ডান পা দিয়ে চেয়ার পিছনদিকে ঠেলে সরালো। 
নিরবতার মাঝে হঠাৎ ঘষ ঘষ শব্দে মেধা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। হাতের রুটির টুকরো ছিল, যেটা হাত ফসকে পড়ে যায় মাহদির বাম পায়ের উপর। মাহদি বিরক্ত হয়। ধমকে বলে,

“চোখ নেই তোমার?”

মেধা শুকনো ঢেক গিলল৷ দানবের মতো মানুষটা না রাগলেও মনে হয় রেগে আছে। আর রাগলে তো কথাই নেই। গতকাল অল্প আলোয় মাহদিকে ততটা ভালোভাবে দেখা না গেলেও আজ একদম স্পষ্ট লাগছে। মাহদির গেটআপ দেখে মেধার মনে হচ্ছে, ‘তার সামনে একটা নামকরা বখাটে দাঁড়িয়ে আছে।’ 
এই মাহদিকে দেখে যেকেউ বলে দিবে, ‘এই ছেলে একটা গু'ন্ডা’। 

ভাবনার মাঝেই মাহদি তার বাম পা মেধার বসা চেয়ারের একপাশে তোলে। আদেশের সুরে বলে,
“আমাকে টাচ না করে এটা সরাও এখান থেকে।”

মেধা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো। আড়চোখে আশেপাশে তাকালো। সবাই সবার মতো খাচ্ছে দু'একজন ছাড়া। মেধা চটপট উত্তর দিত। কিন্তু স্পষ্ট গু'ন্ডা মাহদি আর এতগুলো অপরিচিত মানুষের সামনে সে নিজেকে মেলে ধরতে পারছে না। 
মাহদির ছোট চাচি মাহদিকে কিছু বলতে নিলে আফসানা বেগম হাত উঠিয়ে তাকে থামিয়ে দেন। শ্বাশুড়ির উপর কথা বলার জোর হয়না তার। 
এদিকে মেধাকে কাজটি করতে না দেখে মাহদি শক্ত গলায় বলে,

“আমার কথা কানে যায়নি তোমার?”

মাহদির কান্ডে সাদ বিরক্ত হয়ে বলতে নেয়,
“আহ্ মাহদি….”

মাঝখান থেকে আফসানা বেগম শক্ত কণ্ঠে বলেন,
“সাদ দাদুভাই নিজের খাবারে মন দাও।”

সাদ ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বুঝল না, দাদিজান নিজেই এই মেয়েকে মাহদির বউ করে এনে মাহদিকে কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে! তবে সে আর কিছু বলল না। 

এদিকে মেধা অসহায় মুখ করে তাকায় মাহদির দিকে। কেমন নি’ষ্ঠুরদের মতো করে চেয়ে আছে! একদম সিংহের মতো নি’ষ্ঠুর মুখ। মনে হচ্ছে মেধা নামের মেয়ের মাহদি নামের সিংহের থাবায় আজ মৃ’ত্যু নিশ্চিত। 
মেধা শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ধীরে হাত এগিয়ে নেয় মাহদির পায়ের দিকে। খুব সাবধানে মাহদির পায়ের উপর থেকে রুটির অংশটি সরিয়ে আনে। 

মেধার কাজ শেষ হতেই মাহদি হাত ধুয়ে বাড়ি থেকে হনহন করে বেরিয়ে যায়। মেধা আটকে রাখা শ্বাস ছাড়ে। টেবিলে বসা সকলের দিকে একবার তাকায়। কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই। আফসানা বেগমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে চোখাচোখি হয় মেয়েটার। সাথে সাথে মেধা মাথা নিচু করে নেয়। তার পক্ষে দু'জন মানুষ কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু উনি থামিয়ে দিয়েছে। নিশ্চয়ই গু'ন্ডা নাতির পক্ষে থাকে সবসময়। মনে মনে মুখে ভেঙিয়ে বিড়বিড় করে, 
‘বুড়ি একটা।’

খাবার শেষে সকলেই একে একে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেল। তাদের বাড়ির আশেপাশে কত বিয়ে দেখেছে সে। সেঝানে নতুন বউদের কত যত্ন করে! সবাই খুব হেসে হেসে কথা বলে। আর এই বাড়ি তো পুরো উল্টো। এরা যেন কেউ তাকে চেনেই না। গু'ন্ডাদের পরিবার কি এমনই হয় না-কি! মেধার মন খারাপ হয়। ধ্যাত! বড় বাড়ির বউ হতে চাওয়াই তার ভুল হয়েছে।

.
বেলা তখন সকাল ১০ টা। সাদ বাড়ির দরজায় দাঁড়াতেই চোখে পড়ে তাদের বাড়ির একদম মেইন গেইট থেকে এক অসম্ভব সৌন্দর্যের এক নারী তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। পরনে গাঢ় নীল রঙের একটি শাড়ি। শাড়িটি ভীষণ গোছালোভাবে পরা। মাথায় একটি জর্জেট নীল রঙের ওড়না দেওয়া। ডান কাঁধে সাইড ব্যাগ। বাম হাতে একটি চিকন চেইনের ঘড়ি। 
সাদের চোখেমুখে সামান্য বিস্ময়। ছেলেটি ব্যস্ত পায়ে পিছিয়ে এসে দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর বড় বড় পায়ে দোতলা পেরিয়ে তিনতলায় উঠে আসে। ডুপ্লেক্স বাড়ির তিনতলাতেই মাহদি আর সাদের ঘর। কিন্তু সে নিজের ঘরে না গিয়ে সরাসরি মাহদির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজায় দু’হবার টোকা দিতেই মেধা সামনে এসে দাঁড়ায়। সাদকে দেখে বলে,

“এখানে কি চাই?”

সাদ গলা ঝেড়ে বলে,
“তুমি কি তোমার বোনকে কিছু বলেছ?”

মেধা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“সেটা আমি তোমাকে কেন বলব?”

সাদ সময় নিয়ে ভেবে বলল,
“আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। এবার বলা যাবে আমাকে?”

মেধার মনে পড়ল, খাবার টেবিলে সাদ তার হয়ে কথা বলতে চেয়েছিল। এজন্য সাদের বন্ধু হতে চাওয়ার কথাটা খুব পছন্দ হলো। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল,

“তুমি খুব ভালো সাদ। আর তাই আমিও তোমার বন্ধু হতে চাই। আমার কোনো সমস্যা নেই।”

মেধার মুখে সরাসরি নিজের নাম শুনে সাদ একবার কেশে উঠল। মেধা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কি হয়েছে? পানি খাবে?”

সাদ নিজেকে সামলে বলে,
“না, হঠাৎ নাম ধরে ডাকলে তাই আর কি!”

মেধা মৃদু হেসে বলে,
“আমি জানি তুমি আমার চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু তুমি বড় হলেও যেহেতু আমার বন্ধু তাই আমি তোমাকে নাম ধরেই ডাকব। তুমি বললে, আমরা একে-অপরকে তুই করেও বলতে পারি।”

সাদ বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“না না, তুমিই ঠিক আছে। আমি এটাতেই কমফোর্ট।

মেধা মাথা নেড়ে আচ্ছা বলে। সাদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। পুনরায় বলে,
তুমি তোমার বোনকে কি বলেছ বললে না তো!”

মেধা সরল মনে বলে,
“আসলে তোমার ভাই যে গু'ন্ডা, সেটাই আমি আমার আপাকে বলেছি। আপা আজ আসবে বলেছে।”

“তোমার আপা আসলে কি করবে তুমি?”

“আমি আমাদের বাড়ি চলে যাবো আপার সাথে। তোমার ভাইকে আমার পছন্দ হয়নি, তাই সংসার করব না, বুঝলে?”

সাদ বিস্ময় চোখে তাকায়। সবজায়গায় শুনেছে স্বামী বউয়ের সাথে সংসার করতে চায় না, এখন দেখছে মেধা তার ভাইয়ের সংসার করতে চাইছে না। স্বামীকে রেখে চলে যাবার সিদ্ধান্তও নিয়ে নিয়েছে! সাংঘাতিক! ছেলেটা নিজেকে সামলে বলে,

“কিন্তু চাইলেই তো সংসার ভাঙা যায় না। আমাদের বিয়ে একবারই হয়।”

কথাটা শুনে মেধার মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে। কিছু একটা মনে পড়েছে। অতঃপর বলে,
“তুমি ঠিক বলেছ। আমার মা-ও এই কথা বলে জানো!”

সাদ প্রশ্ন করে,
“তাহলে সংসার করবে না বলছ কেন?”

মেধা সরল মনে বলে,
“তোমার ভাই যে গু'ন্ডা!”

সাদ ছোট ভাইয়ের হয়ে সাফাই গায়,
“তুমি ভুল ভাবছ। ও আসলে খুবই ভালো একটা ছেলে।” 

কথাটা বলে সাদ একা একা বিড়বিড় করে,
‘ভালো, না ছাই!’

মেধা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার ভাই একটু একটু ভালো আছে। জানো, ও আমাকে সঠিক নামে ডেকেছে। ওর চোখগুলোও আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আর আমি সিনেমায় দেখেছি, গু’ন্ডাদের মনে অনেক দুঃখ থাকে। ওদেরও সংসার করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মুখে বলে না। 

এবার সাদ দু'বার কেশে উঠল। বিড়বিড় করে,
‘যাক, এ যাত্রায় সিনেমা বাঁচিয়ে দিল।’

অতঃপর বলে,
“তাহলে মাহদির সাথে সংসার কর।”

মেধা চটপট উত্তর করে,
“আচ্ছা ঠিকাছে।”

সাদ অদ্ভুতভাবে তাকালো মেধার দিকে। এত সহজে রাজি হয়ে গেল? তার মনে হচ্ছে, সে কোনো পাঁচ বছরের বাচ্চাকে বোঝাতে এসেছে। সে যেভাবে যা বোঝালো, তাই বুঝে গেল। অদ্ভূত! কিছু একটা ভেবে বলে,

“স্বামী-স্ত্রীর মাঝের কথা কাউকে বলতে নেই বুঝেছ? তোমার বোন, মা কাউকেই না। বললে সেই সংসার ভেঙে যায়। তুমি কি সেটা চাও?”

মেধা একদম স্বচ্ছ মনে উত্তর করে,
“না চাই না তো। মা যে বলে, মেয়েদের বিয়ে একবারই হয়। আমার তো বিয়ে হয়েই গেছে। এখন শুধু আমাদের কোনো কথা আর কাউকে বলা যাবে না, তাইনা সাদ?

সাদ মাথা নাড়লো। মেধা হেসে বলে,
“বুঝেছি বুঝেছি। তুমি আসলেই খুব ভালো তো সাদ। একদম আমার আপার মতো৷ আপাও আমাকে এভাবে বোঝায়।”

সাদ জোরপূর্বক একটু হেসে বলে,
“এখন তোমার আপা আসলেও তার সাথে চলে যাবে না তো, তাইনা?”

মেধা মাথা নেড়ে বলে,
“যাবো না৷ আমি তো সংসার করব।”

.
দৃপ্তা নিচে মাহদির ছোট চাচির সাথে কথা বলেছে। বাড়ির আর কাউকে দেখেনি। সাথে মাহদির দাদিজান ছিল। তিনি তাকে শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন,
‘কেমন আছো?’
এরপর মাহদির ছোট চাচি অর্থাৎ সাদের মা-ই তাকে নাস্তা দেয়, হেসে হেসে কথা বলে। যদিও ভারি খাবার দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দৃপ্তা জানায়, সে খেয়েই এসেছে। 
তবে আফসানা বেগমের এহেন আচরণ বিচক্ষণ দৃপ্তার মস্তিষ্ক ধরতে পেরেছে। ২৩ বছর চলছে তার। কিন্তু সে এখনো বিয়ে করেনি। বাবা মারা গেছে বছর ছয় আগে। এরপর থেকে দৃপ্তাই তাদের সংসারের হাল ধরে। একটি কিন্ডার-গার্ডেন স্কুলে চাকরি নেয়, টুকটাক টিউশনি করায়। এভাবেই সে, তার মা আর বোনের সংসার চলত। মেধার চেয়ে তার জন্য বিয়ের ঘর সবচেয়ে বেশি এসেছে। কিন্তু সে যখন বলত, বিয়ের পরও সে চাকরি করে তার পরিবারকে দেখবে, তখনই ছেলের পরিবার নাকচ করে দিত। ২১ এর কোঠায় আসার পর তার জন্য আর বিয়ের ঘর আসেনি। মাহদিদের পরিবারই তো তাকে দেখে ভেবে নিয়েছে, তার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। এইজন্য ২৩ বছর বয়সেও সে অবিবাহিত। একদিকে আশেপাশের মানুষ বলতে থাকে, 
‘বুড়ি হয়ে যাচ্ছে, বিয়ে করছে না।’
আবার তারাই ছেলে পক্ষদের বলে, 
‘মেয়ের মাঝে সমস্যা আছে, নয়তো এতদিন অবিবাহিত থাকতো না।’

দৃপ্তার অবশ্য এসবে কোনো যায় আসে না। সে তার মতো অটল। কারো কথা শোনার সময় তার নেই। সমাজের কথা শুনলে তার মা আর বোন না খেয়ে মরত। তখন কেউ দেখতে আসত না৷ কিন্তু আড়ালে কটু কথা বলার সময় সবাইকে পাওয়া যায়। এটাই নিয়ম। তবে এসব কটু কথা দৃঢ় দৃপ্তাকে কখনো ভাঙতে পারবে না। 

নাস্তা শেষে দৃপ্তাকে সাদের মা রেহানা তিনতলায় রেখে যায় মেধার ঘরে।
মেধা তার আপাকে দেখে একদৌড়ে এসে দৃপ্তাকে জড়িয়ে ধরে। ছোট বোনের কান্ডে দৃপ্তা মৃদু হাসলো। পিঠে হাত রেখে বলে,

“কেমন আছিস সোনা?”

মেধা হেসে বলে,
“ভালোই ছিলাম। তোমাকে দেখে আরও অনেক বেশি ভালো আছি আপা। তুমি কেমন আছো? মা কেমন আছে?” 

“আমরা দু'জনেই ভালো আছি।”

মেধা স্বস্তি পেল। মা আর আপার জন্য মন পুড়ছিল। এখন আগের চেয়ে ভালো লাগছে। 
দৃপ্তা ছোট বোনের সাথে আরও টুকটাক কথা বলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
“গতরাতে তোর স্বামীর ব্যাপারে কি বলছিলি মেধা? সব শুনব বলে এসেছি। নিশ্চিন্তে বল আমাকে। আপা সব ঠিক করে দিব।”

মেধা তার অভিযোগ রাখতে চাইল আপার কাছে। কিন্তু সাদের কথা মনে পড়তেই থেমে গেল মেধা। স্বামীর কথা অন্যকে বললে সেই সংসার ভেঙে যায়। আর তার মা বলে, ‘মেয়েদের বিয়ে একবারই হয়।’
তার সংসার ভেঙে গেলে তার তো আর বিয়ে হবে না। তাছাড়া মাহদি তো একটু-আধটু ভালোও আছে। অতঃপর সে হেসে বলে,

“কিছু না আপা। আমার স্বামী ভালোই বুঝলে? জানো আপা, ও আমাকে মেধা নামেই ডেকেছে। আমি চিকন হওয়ার পরও সবার মতো আমাকে মগা বলেনি।

দৃপ্তা চুপচাপ বোনের কথা শুনল। মা আর সে ছাড়া মেধাকে এই নামে ডাকে না। অর্থাৎ মেধার ফ্রেন্ডরা সবাই মেধাকে মগা বলে ডাকে। এটাই মেধার দুঃখ! মেয়েটি নিয়ম করে একবার হলেও এই দুঃখ প্রকাশ করে। 
এখন মা আর আপা ছাড়াও আরেকজন মেধা নামে ডেকেছে মানেই মেধার কাছে অনেককিছু।  
মেধা আবারও বলে,

আর চোখদু'টো একদম নাগদের মতো। এজন্য ওকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ইশ! আমার চোখদু'টো যদি ওর মতো হত!”

দৃপ্তা চুপচাপ ছোট বোনের আদুরে ইচ্ছেগুলো শুনল। মেয়েটা এত সহজ-সরল! ভ'য় হয় তার। আল্লাহ্ তার বোনকে এই সমাজের কালো ছায়া থেকে সবসময় দূরে রাখুক, এটাই তার চাওয়া৷ বলে,

“লোকটা যদি তোকে কখনো কিছু বলে সাথে সাথে আমাকে কল করবি, মনে থাকবে? আপা সবসময় তোর সাথে আছি।”

মেধা হেসে মাথা নাড়ায়। দৃপ্তার গালে হাত দিয়ে বলে, “তুমি খুব সুন্দর আপা।”

দৃপ্তা মেধার গাল টেনে বলে,
“তোর আপার বোন তার থেকেও বেশি সুন্দর সোনা।”

মেধা সেই কথা নাকচ করে দিয়ে তার কথাই সঠিক বলে দাবি করে। নিয়ম করে সে তার আপার প্রশংসা করে। তার কাছে তার আপা এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী। সবদিক থেকে একদম পার্ফেক্ট। 

.
দৃপ্তা দুপুরের আগে আগে মাহদিদের বাড়ি প্রস্থান করতে তিনতলা থেকে দোতলায় নামে। তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় সাদ। দু'জনের চোখাচোখি হয়। দৃপ্তা সাদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সামনে এগোয়। সাদ আবারো দৃপ্তার সামনে এসে দাঁড়ায়। অনুনয় করে,

“তৃপ্তি প্লিজ, আমার দিকটা বোঝার চেষ্টা কর।”

দৃপ্তা শক্ত গলায় বলে,
“বুঝব না তোমাকে, আর কিছু বলবে সাদ?”

সাদ দৃপ্তার আগুনচোখা দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলালো। দৃপ্তার সাথে তার পরিচয় দুই বছর হলো। পরিচয়ের কাহিনীটা আবার আরেক ঘটনা। 
দৃপ্তার মুখে নিজের নাম শুনে সাদের মেধার কথা মনে পড়ল। দৃপ্তাও মেধার মতো তাকে বন্ধু মেনেই নাম ধরে ডাকে। দু'বোনের অনেক স্বভাবই মিলে যায়। ঝামেলা হয়েছে মূলত বিয়ে নিয়ে। তাদের বাড়ি থেকে মাহদির জন্য সম্মোন্ধ গেলে দৃপ্তা সাথে সাথে তাকে কল করে। বলে,
‘মাহদির মতো বখাটে, গু'ন্ডা ছেলের সাথে সে তার বোনকে বিয়ে দিতে চায় না। মাহদির বদলে বিয়েটা যেন সে করে।’

কিন্তু সাদ না করে দেয়। দৃপ্তা জানে সাদের পছন্দের কেউ নেই। কথায় কথায় অনেককবার জিজ্ঞেসও করা হয়েছে। প্রতিবার না উত্তর পেয়েই দৃপ্তা সাদকে জোর করেছিল তার বোনকে বিয়ে করার জন্য। কারণ মাহদি আর সাদ একই বাড়ির ছেলে। তার মা বড় বাড়ির সম্মোন্ধ নাকচ করতনা জানে, এজন্যই সাদকে পাত্র হতে বলেছিল। কিন্তু সাদ কারণ ছাড়াই বন্ধুত্বের মর্যাদা রাখেনি। মায়ের সাথে পেরেও ওঠেনি দৃপ্তা। শেষমেশ তার বোনটার একটা গু'ন্ডার সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। 

সাদ গলা ঝেড়ে বলে,
“তোমার বোনকে মাহদির জন্য আমার দাদিজান পছন্দ করেছে। এখানে আমার কিছু করার ছিল না।”

দৃপ্তা কঠোর স্বরে বলে,
“মিথ্যে বলছ তুমি। আমার বোনটা কিচ্ছু বোঝে না। সেই অবুঝ মেয়েটাকে তোমার গু'ন্ডা ভাইয়ের সাথে তুমি জুড়ে দিয়েছ। আমি তোমাকে এতবার রিকুয়েস্ট করলাম, অথচ তুমি আমার বন্ধুত্বের কোনো মর্যাদাই রাখলে না।”

সাদ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। দৃপ্তাকে বোঝানোর স্বরে বলে,
“তুমি যেমনটা ভাবছ তেমনটা নয় তৃপ্তি।”

দৃপ্তা চোখ পাকিয়ে বলে,
“আমার নাম দৃপ্তা।”

সাদ আশেপাশে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে দৃপ্তার দিকে চেয়ে বলে,
“স্যরি তৃপ্তি!”

“মজা করছ আমার সাথে?”

“আমি কি এসব পারি?”

সাদের কণ্ঠ সিরিয়াস। দৃপ্তা কিছু বলে না। সাদ আবারও বলে,

“মাহদি ভালো ছেলে। আই মিন, ও খুবই হাসবেন্ড মেটেরিয়াল একটা ছেলে।”

দৃপ্তার কণ্ঠে কৌতুক,
“ওহ রিয়েলি?”

সাদ থতমত খেয়ে তাকায়। সত্যিই সে একটা কৌতুক বলে ফেলেছে। কিন্তু ধরা দিল না। বরং খুব সূক্ষ্মভাবে নিজেকে সামলে বলে,
“আমি মিথ্যা বলি না তৃপ্তি।”

দৃপ্তা একই স্বরে বলে,
“বুঝেছি। সারাদিন, যেখানে সেখানে মা'র'পি'ট করা ছেলে, বে'য়া'দ'বি দিয়ে ভর্তি তোমার ভাই পার্ফেক্ট হাসবেন্ড মেটেরিয়াল ছেলে। এর চেয়ে বড় সত্যি আর কিছু হতেই পারে না সাদ। আমি তোমার সত্য কথা বিশ্বাস করেছি।”

দৃপ্তার কথাটা সাদের খুব গায়ে লাগলো। কিছুটা রেগেই বলল,
“মাহদি অবশ্যই ভালো হাসবেন্ড তৃপ্তি। সময়ের সাথে সাথে তুমি এটার প্রমাণও পাবে।”

দৃপ্তা দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“অবশ্যই। প্রমাণ তো আমি নিবই। বোন আমার। তাই খোঁজও আমাকেই রাখতে হবে। তাছাড়া তুমি তো আছোই আমাকে প্রমাণ যোগার করে দেওয়ার জন্য।”

সাদের গলা দিয়ে অটোমেটিক একটি শুকনো ঢোক চলে গেল। সে কি করে প্রমাণ করবে মাহদি ‘হাসবেন্ড মেটেরিয়াল’ ছেলে? সাদ নিশ্চিত, মাহদি যে গতকাল বিয়ে করেছে, এখন ওই বে'য়া'দ'বটা এটাই ভুলে গেছে। সেই ছেলে আবার হাসবেন্ড মেটেরিয়াল হবে কি করে? 

.
দুপুর দু'টোয় মাহদি বাড়ি ফিরেছে। গোসল করে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে পুনরায় চুলের কিছু অংশ ঝুটি করে নেয়। সে যখন ঘরে এসেছিল, তখন মেধা ঘরে ছিল না। এরপর সে বেলকনিতে গেলে মেধা এর ফাঁকে এসে ওয়াশরুমে যায় গোসল করতে। 

ওদিকে সাদ মাহদির ভালো হাসবেন্ড হওয়ার ব্যাপারটা কিভাবে দৃপ্তার সামনে প্রমাণ করবে সেই চক্করে কোনো কাজই করেনি। অফিস পর্যন্ত যায়নি। এরই মাঝে মাহদিকে বাড়ি ফিরতে দেখে তার ভাবনা আরও বেড়ে যায়। অনেকক্ষণ ভাবাভাবির পর মাহদির ঘরের দরজা বাইরে আটকে দেয়। মাহদিকে দিনের বেলা বাড়ি আটকে রাখার ক্ষমতা কারো নেই। কারো ও দিনে কখনো ঘুমায় না। আর জেগে থাকা অবস্থায় মেধার কাছে থাকলে ওর যদি একটু উন্নতি হয়, তবে সে বেঁচে যাবে। সেই ভাবনা থেকেই এই কাজ করল। বিরক্ত লাগছে তার। দাদিজানের কেন যে ওই মেধাকেই পছন্দ করতে হলো মাহদির জন্য কে জানে! 

মাহদি সবসময়ের মতো নিজের গেটআপ নিয়ে ব্যস্ত পায়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। দরজার হাতল ধরে টানলে দেখল খুলছে না। কপালে ভাঁজ পড়ল তার। তখনই পিছন থেকে মেধার কণ্ঠ ভেসে আসে,

“এ কি তুমি ভরদুপুরে দরজা আটকালে কেন? দেখ তুমি যা চাইছ সেটা শুধু রাতেই সম্ভব। কারণ দিনের বেলা আমি ল’জ্জা পাই।”

মেধার কণ্ঠে মাহদির কপালের ভাঁজ গাঢ় হয়। এক মুহূর্তের জন্য সে ভুলেই গিয়েছিল, গতকাল বিয়ে করে সে একটা বউ এই বাড়িতে এনেছে। কিন্তু মেয়েটা কি বলল? অতঃপর সে পিছু ফিরে জিজ্ঞেস করে,

“কি চাইছি আমি?”

গোসল করে বেরিয়েছে মেধা। এলোমেলোভাবে শাড়ি পরিহিতা মেয়েটা সরল মনে বলে,
“সব স্বামীরা যা চায়, তুমিও তো সেটাই চাইছ। যদিও তোমার আমাকে এখনো পুরোপুরি পছন্দ নয়। কিন্তু আমি ঠিক করেছি, তোমার সাথেই সংসার করব।”

মাহদি দাঁতে দাঁত চাপলো। এই হাদারামটা এসব কি বলছে? মেজাজ দেখিয়ে বলে,

“আমার তোমাকে টোটালি পছন্দ নয়। তাই উল্টাপাল্টা চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই।”

মেধা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“পছন্দ না হলেও স্বামীরা তার বউয়ের কাছে রাতে আসে, আমি সব জানি বুঝলে? কিন্তু তুমি ভরদুপুরে আসতে চাইছ বলেই নিষেধ করছি।

রাগে মাহদির কপালের রগ ফুলে উঠল। যার ভূমিকাই সে কল্পনা করেনি, তার উপসংহারে পৌঁছে গেছে এই মেয়েটা। 
ওদিকে মেধা গোসল করতে যেতে দেখল তার পা জ্বলছে। গতকাল কাঁচ লেগে কে'টে গিয়েছিল হয়ত! তাই সে মাহদির উদ্দেশ্যে বলে,

“মাহদি শোনো, গতকাল রাতে আমার পা কেটে গিয়েছিল বুঝলে? আজ একটা মলম কিনে আনবে আমার জন্য, কেমন?”

মাহদির চোখেমুখে অসম্ভব বিস্ময়। মেয়েটা তাকে তুমি করে তো বলছেই, সাথে নাম ধরেও ডাকছে। হজম হচ্ছে না মাহদির। রাগে মাথা ফাটার উপক্রম হয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকছ কোন সাহসে?”

মেধা ভয় পেলেও সহজ থাকলো। সাদ বুঝিয়েছিল, মাহদি ভালো। সেই বুঝ থেকেই মেধার ভয় কমেছে। মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“কেন কি হয়েছে? স্বামীকে তো সবাই নাম ধরেই ডাকে।”

স্বামী স্বামী করে মাথাটা খেয়ে ফেললো এই মেয়ে। মাহদি অসহ্য কণ্ঠে বলে,
“একদম আমাকে স্বামী স্বামী করবে না তুমি।”

মেধা মুখ ফুলিয়ে বলে,
“আমি জানি, তোমাদের মতো গু’ন্ডারা একটু খিটখিটে স্বভাবেরই হয়। তাই তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, আমি তোমার কোনো কথায় একদমই মাইন্ড করব না।”

আবার তাকে গু'ন্ডা বলছে! চো'রকে চো'র বললে যেমন ক্ষিপ্ত হয় চো’র। মাহদির ক্ষেত্রেও তেমনি হয়েছে। সে যা খুশি করুক, কিন্তু কেউ সেই নামে কেন তাকে সম্মোধন করবে? রাগে বাম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, আর ডান হাতে পাশের টেবিল থেকে একটি কাঁচের গ্লাস হাতে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় গ্লাস ভেঙে যায়। র'ক্তকণা ছুটে বেরিয়ে আসে। মাহদির ডান হাতে র'ক্তে মেখে যায়। কিন্তু তার মুখে ব্য’থার ছাপ নেই, উল্টে রা'গের ছায়া। 
রাগ ঝাড়ার জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় মাহদির কাছে আপাতত নেই। 

দৃশ্যটি দেখে মেধা আঁতকে উঠে বলে,
“এ কি, গ্লাস ভেঙে নিজের হাতের এটা কি অবস্থা করছ?”

কথাটা বলতে বলতে মেধা এগিয়ে এসে মাহদির হাত ধরলে মাহদি বাম হাতে মেধার হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। বিরক্ত হয়ে বলে,

“কি প্রবলেম তোমার? আমাকে টাচ করছ কেন?”

মেধা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কেন কি হবে তোমাকে টাচ করলে? তুমি আমার স্বামী না? তাই আমি তোমাকে টাচ করতেই পারি। তুমি আমার সাথে একটু সহজ হও বুঝলে?

কথাটা বলে আবার মাহদির হাত ধরতে নিলে মাহদি দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“আরেকবার আমাকে টাচ করলে একটা আছাড় খাবে তুমি।”

মেধা আছাড়কে আচার শুনলে পেল। বুঝল না, এত রেগে মাহদি তাকে আচাড় খাওয়াতে চাইছে কেন। তবে সে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,

“তুমি আমাকে আচার খাওয়াবে মাহদি? আচার আমার খুব প্রিয়, জানো? ১০ টা আচারের কম একদম দিবে না আমাকে।

মাহদি রাগের আভায় ভর্তি চোখ দু'টো বন্ধ করল। গতরাত থেকে সে ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। কখন যেন রাগ দমানোর সব উপায় অতিক্রম করে এই হাদারামকে তুলে একটা আছাড় মারবে কে জানে! এরপর এর নাড়িভুড়িও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মাহদিকে চুপ দেখে মেধা আবারো বলে,
আচ্ছা আমি তোমার হাত ধরছি না। ছেলেদের সহ্যক্ষমতা বেশি হয় আমি জানি। এটুকু কা’টলে তোমার কিছুই হবে না। সিনেমায় দেখেছি, এসব একদম নরমাল।
এর চেয়ে তুমি আমার ব্লাউজের হুকটা একটু লাগিয়ে দাও তো মাহদি।”

চলবে ইনশাআল্লাহ~~

🟥[শব্দসংখ্যা : ৩৭০০
কেমন হয়েছে, জানাবেন অবশ্যই।]

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner