“তোমার জন্য মেয়ে দেখেছি মাহদি।
দুপুরের দিকে মাহদি বাইরে থেকে মাত্র ফিরেছে। ক্লান্ত দেহ নিয়ে তার ঘরে যাচ্ছিল। দাদিজানের কথা কানে আসতেই তার পা এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সামনের দিকে আরও দু'কদম এগোলে বয়স্ক ভদ্রমহিলা আফসানা বেগম পুনরায় বলেন,
মাহদি আমার ধারে এসে একটু বসো। দুইটা কথা শোনো। তোমার বয়স হইছে। বিয়ে করতে হবে তোমাকে।”
এ পর্যায়ে মাহদি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই এসে দাঁড়ায় তার দাদিজানের সামনে। পুরো নাম ‘শিকদার মাহদি’। আফসানা বেগমের বড় ছেলের ছেলে মাহদি। বয়স ২৯ এর কোঠায় এসে ঠেকেছে মাত্র। হাইট ৬ ফুট। গায়ের রঙ অধিক ফর্সা। চোখের মণি দু'টি অ্যাম্বার অর্থাৎ হালকা সোনালি, যা অত্যধিক আকর্ষণীয়। পরনে কালো টি-শার্ট আর কালো কার্গো প্যান্ট। ঘাড় ছুঁইছুঁই সিলকি চুল। যার কিছু অংশ মাথার উপর ঝুঁটি করে রাখা।
ডান হাতে সোনালি রঙের একটি ঘড়ি আর বাম হাতে একটি কালো ব্যাচ। ডান কানের পাতায় একটি কালো টপ। গালে চাপ দাঁড়ি। মুখাবয়বে গাম্ভীর্য। দৃঢ় চোয়ালের অধিকারী মাহদি তার দাদিজানের উদ্দেশ্যে দু'টো শব্দ আওড়ায়,
“বলো দাদিজান।”
“আমি তো বললামই। তোমার জন্য মেয়ে দেখেছি। তুমি সময় করে একবার মেয়েকে দেখে আসলে বিয়ের কথা পাকা করব।”
মাহদির চোখেমুখে বিরক্তি। এসব বিয়ে টিয়ে তার সাথে ঠিক যায় না। সেখানে মেয়ে দেখে কি করবে সে? সে বিয়ে করার পর এই বাড়িতে একটা বউ আসলে, ‘বয়স হয়েছে, বিয়ে কবে করবে’ এই প্রশ্ন দু'টো থেকে সে বাঁচতে পারবে অন্তত। অতঃপর মাহদি তার দাদিজানের প্রশ্ন এড়িয়ে না গিয়ে বলল,
“মেয়ে দেখতে হবে না। সময় করে একবার তোমরা গিয়ে বউ নিয়ে চলে এসো।”
মাহদির দাদিমা আফসানা বেগম তব্দা খেয়ে বললেন,
“আমরা গিয়ে নিয়ে আসব মানে? তুমি গিয়ে বিয়ে করলে তারপর না ওই মেয়েকে আমাদের বাড়িতে আনতে পারবো!”
বিরক্তিতে মাহদি দু'আঙুলের সাহায্যে কপাল ঘঁষল দু'বার। অতঃপর বলে,
“আচ্ছা চলো বিয়ে করছি। দশ মিনিটের বেশি টাইম দিতে পারবো না।”
কথাটা বলে মাহদি বাইরের দিকে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই আফসানা বেগম খানিক বিস্মিত হয়ে বলেন,
“আশ্চর্য তো! তুমি কি এখনই বিয়ে করতে যাচ্ছ?”
মাহদি অসহ্য কণ্ঠে বলে,
“হ্যাঁ যাচ্ছি। প্রবলেম কি তোমার? এক্ষুনি তো বললে আমি গিয়ে বিয়ে করলে তারপর তোমরা মেয়েকে এই বাড়ি আনতে পারবে।
একটু থেমে আবারো বলে,
মেয়ের বাসার ঠিকানাটা দাও। বিয়ে করে আসছি।”
আফসানা বেগম কি বলবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। পাশে মাহদির ছোট চাচি মুখ চেপে হাসছে। ছেলেটার কর্মকান্ডে না হেসে পারছেন না। যেন মাহদি পুতুলের বিয়ে দিতে যাচ্ছে। ইচ্ছে হলো আর দশ মিনিটে বিয়ে পরিয়ে দিয়ে এলো!
আফসানা বেগম নিজেকে সামলে বললেন,
“এভাবে বিয়ে হয় না মাহাদ। তুমি সন্ধ্যার পর একটু সময় বের কর। তখন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে যাবো। এখন ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও।”
মাহদি তার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে,
“দশ মিনিটের বেশি টাইম লাগলে বিয়ে ক্যান্সেল, মাথায় রাখবে দাদিজান।”
আফসানা বেগম হতাশ চোখে চেয়ে রইলেন নাতির পানে। মাহদির চাচি বলল,
“মা আপনি মাহাদকে আজকেই বিয়ে দিবেন? মেয়ের পরিবার যদি রাজি না হয়?”
আফসানা বেগম মৃদুস্বরে বললেন,
“হবে। এত বড় বাড়ি থেকে সম্মোন্ধ গিয়েছে বলে অনেক খুশি ছিল তারা। আজকে বিয়ের কথা বললেও রাজি হবে। তাছাড়া মাহদির মতিগতির ঠিক নেই। রাত পার হলেই আবার মত বদলাতে পারে। মেয়ের বাড়ি কাছেই আছে। সমস্যা হবে না। তুমি বাড়ির সবাইকে কেনাকাটা শেষ করতে বলো সন্ধ্যার আগেই।”
ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। কিছু একটা ভেবে বললেন,
“আমার মনে হচ্ছে, আপনার বাউন্ডুলে নাতি বিয়েটাকে ছেলেখেলা ভাবছে। ভাবাটা অস্বাভাবিক না। ও তো এমনই।”
আফসানা বেগম সোফায় হেলান দিয়ে আস্তে করে চোখ বুজে বললেন,
“বিয়ের বন্ধনের ভিত খুব মজবুত হয় বউমা। মরার আগে মাহদির একটা গতি করে দিয়ে যেতে চাই। ওকে একটু সংসারি দেখে যেতে চাই। খুব চিন্তা হয় আমার ছন্নছাড়া নাতিটার জন্য।”
রান্নাঘর থেকে মাহদির বড় চাচি এসে দাঁড়ায় সেখানে। শ্বাশুড়ির কথায় মুখ ঝামটায়। তাচ্ছিল্যের সুরে বিড়বিড় করে,
‘ওই মাহদি করবে সংসার! যেখানে সেখানে গু’ন্ডামি করে বেড়ায়। সারাদিন বাইরের মানুষদের পি’টিয়ে এসে রাতে পি’টা’বে বউ। দু'দিন যেতে না যেতেই দেখব বউ পালাইছে।’
.
রাত ৮ টায় বাড়ির মুরুব্বিরা রেডি হয়ে মাহদির জন্য অপেক্ষা করছে। মুরুব্বি বলতে মাহদির বড় চাচা আর তার কিছু বড় ভাইয়েরা আছে। মাহদির বাবা-মা আর দাদা বেঁচে নেই। ছোট চাচা আপাতত ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে আছেন।
এদিকে মাহদি বাড়িতে নেই। এটা নতুন নয়। দিনের ১ ঘণ্টাও বাড়িতে থাকেনা সে। শুধু রাতটুকু পার করতে বাড়ি আসে। মাঝে মাঝে তো রাতেও আসেনা। মাহদির বড় চাচা শিকদার জুনায়েদ মাহদির ফোনে পুরো ২০ বার কল দিয়েছে। কিন্তু কল রিসিভ হয়নি। বরং শেষ দু’বার কল কেটে দিয়েছে মাহদি। ভীষণ চটে গিয়েছেন ভদ্রলোক। মাহদিকে কয়েকটা গালিও দিয়ে দিয়েছে এরকম স্বাভাবের জন্য।
অতঃপর সকলের বিরক্তি কমাতে মাহদি ৪৫ মিনিট পর বাড়ির সামনে এসে পৌঁছায়। বাড়ির গাড়ির পাশে মাহদি তার বাইক থামিয়ে মাথার হেলমেট খোলে। শিকদার জুনায়েদ রাগান্বিত স্বরে বলেন,
“তোমার কমনসেন্স নেই? কতবার কল দিয়েছি তোমাকে? আমার কল রিসিভ না করে কেটে দিয়েছ কোন সাহসে?”
মাহদি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কোনো কমনসেন্স ওয়ালা মানুষ কল রিসিভ না হওয়ার পরও বারবার কাউকে কল দেয় না চাচা।”
শিকদার জুনায়েদ রাগে কাঁপতে লাগলেন। এই বেয়ারা ছেলের কোনো কাজে ইনভলভ হতে তার বিন্দুমাত্র ভালো লাগে না। শুধুমাত্র মায়ের মুখের উপর কথা বলতে পারে না বলে মুখ বুজে অনেককিছু সহ্য করতে হয়। রাগান্বিত স্বরে বলেন,
“আমরা তোমার জন্য কখন থেকে অপেক্ষা করছি, কোনো আইডিয়া আছে তোমার?”
মাহদি ভাবলেশহীনভাবে বলে,
“মাহাদের বউ চাই আপনাদের। অপেক্ষা আপনারা করবেন না তো কে করবে? আমি? আজব!”
শিকদার জুনায়েদ পাল্টা আরও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মাহদির ছোট চাচার ছেলে সাদ তার বড় আব্বাকে কোনোরকমে সামলে বাকি ভাইরা সহ ঠেলেঠুলে গাড়িতে বসিয়ে দিল। নয়তো এই রাস্তায় চাচা ভাতিজির মাঝে এক ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাবে। শিকদার জুনায়েদ গাড়ির মাঝে বসেই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেন। সহ্যের একটা সীমা থাকে। যেটা মাহদি বরাবরের মতোই ক্রস করল। বড় ভাই একটা জঙ্গল রেখে গেছে তাদের সংসারে।
সাদ মাহদির পাশে এসে দাঁড়ায়। বাড়তি কথা বলে না। নয়তো মাহদির বিয়ে থেকে মত ঘুরে গেলে তাদের দাদিজান আরেক কান্ড বাঁধাবেন। এসব ঝামেলা এড়িয়ে বলল,
“এই টি-শার্ট, প্যান্ট পরেই যাবি?”
মাহদি কপাল কুঁচকে বলে,
“তো কি পরব?”
সাদ খেয়াল করল, মাহদির কালো হাফ হাতা টি-শার্ট হালকা কুঁচকে আছে। কালো কার্গো প্যান্টে ধুলো লেগে আছে। আবার কোথায় কি ঘটিয়ে এসেছে কে জানে! তবে মাহদির ড্রেসআপ এটাই। কিন্তু বিয়ে বাড়িতে এভাবে গেলে ব্যাপারটা ভালো দেখাবে না। অতঃপর বলে,
“তোর জন্য শেরওয়ানি…..”
সাদকে শেষ করতে না দিয়ে আবারো মাথায় হেলমেট পরতে পরতে মাহদি শক্ত গলায় তাড়া দেয়,
“ভাই, যদি চাও এই বাড়ি নতুন বউ আসুক, তাহলে টাইম লস কর না। যেকোনোমুহূর্তে চলে যাবো। এরপর বিয়ের জন্য ইহজীবনে আর আমাকে পাবেনা।”
সাদ তড়িঘড়ি করে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে। মাহদি টার বিশ্বাস নেই। কি আর করার! এভাবেই বিয়ে হোক। যা তা করে বিয়ে তো হচ্ছে, এরপর কি হবে কে জানে! সাদ মাহদির চেয়ে এক বছরের বড়। মাহদির সাথে তার ভালোই ভাব বলা যায়। একমাত্র তার সাথেই দু'দন্ড বসে কথা বলে মাহদি।
কিছু একটা ভেবে সাদ জানালা দিয়ে মাথা বের করে বলে,
“মাহদি তুই তো বিয়ে করতে যাচ্ছিস। আজ অন্তত বাইক রেখে আমাদের গাড়িতে আয়।”
মাহদি বাইক স্টার্ট দিয়ে সাদের বরাবর গাড়ির কাছে এসে বাইক থামায়৷ ঘাড় ঘুরিয়ে সাদের দিকে চেয়ে হেলমেটের আড়াল থেকে গম্ভীর গলায় বলে,
“তুমি তোমার ছোট ভাইয়ের বিয়েতে ফুল ড্রেসের সঙ্গ ছাড়তে পারলে আমি আমার বাইকের সঙ্গ ছাড়ছি।”
সাদ চোখমুখ কুঁচকে তাকালো। কি শ'য়তান ছেলে। সে ভালোর জন্য বলল, আর এ কোন কথা কোথায় নিয়ে গেল।
গাড়ির ভেতরে বসা শিকদার জুনায়েদ মাহদির কথাটা শুনতে পেয়েছে। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল,
‘বে’হায়া ছেলে!’
.
ঘড়ির কাটা তখন রাত ১২ টার ঘরে। পরিপাটি একটি ঘরের বিছানার মাঝে বসে আছে মেধা। গায়ে লাল রঙের বেনারসি। ছেলের বাড়ি থেকে গত দু'দিন আগে তাকে দেখতে গিয়েছিল। মেধার বিয়েতে দ্বিমত ছিল না। বাবা নেই তার। মা, বড় আপা আর সে এই তিনজনকে নিয়েই তাদের সংসার। ছেলের বাড়ি থেকে তাকেই পছন্দ করেছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ দুপুরে জানায়, বিয়ে আজকেই হবে। এত ভালো ঘর থেকে সম্মোন্ধ গিয়েছে, এজন্য মা কোনো হম্বিতম্বি ছাড়াই রাজি হয়ে গিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর অনেক দামি দামি জিনিস তাদের বাড়ি পাঠানো হয়, যা দিয়ে মেধা তার আপার সাহায্য নিয়ে যেটুকু পেরেছে সেজেছে। মেধা ভেবেছিল বড় বাড়ির বউ হবে, তার মানে নিশ্চয়ই খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে তার। সে তার বিয়েতে খুব সাজবে, খুব মজা করবে। কিন্তু সেসব কিছুই হলো না। কেমন মরা বাড়ির মতো করে বিয়ে পড়িয়ে আনলো তাকে। স্বামীকে পিছন থেকে এক নজর দেখেছিল মেধা, আর নামটা জানে। এখন তার জন্য ঘরে বসে বসে অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাড়িতে পা রাখার পর মেধার কানে কিছু অদ্ভুত কথা আসে। একজন আধ বয়সী ভদ্রমহিলা অন্যজনকে বলছিল,
‘মাহদি সারাদিন গু'ন্ডামি করেই দিন পার করে। বউকে মে'রে কালকেই না বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়!’
যে এই কথা বলেছে, সেই ভদ্রমহিলা এই বাড়িরই সদস্য। কিন্তু মেধা প্রথমদিনই চিনতে পারেনি, উনি সম্পর্কে তার কি হয়! তবে ওই কথা শোনার পর থেকে মেয়েটার একটু ভয় লাগছে। সত্যি সত্যি তার স্বামী এসেই যদি তাকে ধুপধাপ মেরে দেয়! মেধা ঘামতে শুরু করল। না না সে মার খাবে না। অতঃপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। ঘরে অল্প পাওয়ারের একটি লাইট জ্বলছে। অরার সর্বপ্রথম চোখে পড়ল, দরজার কাছটায় টেবিলের উপর ঝুড়িভর্তি ফলের মাঝখানে একটি চা’কু রাখা। মেয়েটা ব্যস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে চা’কু হাতে তুলে নেয়। এরপর আবারো বিছানার দিকে যেতে নেয়, তখনই দরজা খোলার শব্দ কানে আসে। কেউ একজন ঘরে এসেছে, বেশ বুঝল সে। মেধা এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে উল্টো ঘুরে একদম তার সামনে দাঁড়ানো লোকটার গলার দিকে হাতের চা'কু ধরে তেজ নিয়ে বলে,
“একদম আমাকে মা’রতে আসবে না। আমাকে ছোট মানুষ ভেবে ভুল করবে না। আমি কখনোই বসে বসে তোমার মা'র খাবো না। তাই সাবধান করছি। সাবধান হলে তোমাকে ছেড়ে দিব নয়তো না।”
মেধার কণ্ঠে মেকি তেজ থাকলেও, কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, চোখেমুখেও ভীতি মেয়েটার। এদিকে ঘটনাটি মাহদির জন্য অপ্রত্যাশিত হলেও, সে একদম নির্বিকার। না চমকালো, না ভড়কালো, না অবাক হলো! বরং চোখেমুখে চরম বিরক্তি আর রাগের ছায়া।
বিয়ে পড়ানো শেষে মাহদি সাদকে বলেছিল,
‘ভাই এবার তোমাদের বাড়ির বউকে তোমরা নিয়ে যেও। আমার কাজ শেষ।’
এরপর মাহদি মেধাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার এহেন কান্ডে অবশ্য শিকদার জুনায়েদ আরও কয়েক দফা মাহদিকে কথা শুনিয়েছিল, কিন্তু মাহদির সেসব পাত্তা দেওয়ার সময় থাকলে তো!
মাহদি মেধাকে একবার বিয়ে বাড়িতেই দেখেছিল। তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি এখন।
মেধা দু'পা উঁচু করে মাহাদের গলার কাছটায় চা'কু ধরতে চাইলেও সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। গলা থেকে সামান্য নিচের দিকে চা'কু ধরে রাখা। মেয়েটা সেদিকে খেয়াল করল না। সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মাহদির পানে। লোকটার গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। কিন্তু চোখে লাগছে, মাহদির চোখের সোনালি মণি দু'টো।
মেধার কান্ডে মাহদির ইচ্ছে করল মেয়েটাকে ঠাটিয়ে দু'টো থাপ্পড় লাগাতে। কিন্তু ঝামেলা এড়াতে নিজেকে সংযত করল। এর উপর আবার মেধাকে নিজের দিকে এমন হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে মাহদির রাগের সাথে সাথে বিরক্তির মাত্রা বাড়লো বই কমলো না। সারাদিন ছোটাছুটি করে ফালতু ঝামেলা সামনে এলে মাথা গরম হয়ে যায়। কিন্তু সে আপাতত এই মেয়েটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে।
মেধা সাথে সাথে উল্টো ঘুরে মাহদির দিকে তাকায়। চোখে পড়ল, মাহদির ঘাড় সমান সিলকি সোজা চুলের দিকে। সামনে থেকে অল্প কিছু চুল নিয়ে ছোটোখাটো একটি ঝুঁটি বাঁধা। যেটা পিছনদিকে হেলে আছে। মেধা অবশ্য এতে অবাক হলো না। কারণ সে যখন তার বাড়িতে পিছন থেকে তার স্বামীকে দেখেছিল, তখনও চুলের এই ছিরিই ছিল। তবে চেহারা তো দেখেনি। অতঃপর চটপট প্রশ্ন করে,
“তোমার নাম কি মাহদি?”
মাহদি তার ডান হাত থেকে সোনালি রঙের হাতঘড়িটা খুলে মাত্র টেবিলের উপর রেখেছে তখনই মেধার প্রশ্নে কপালে ভাঁজ পড়ে তার। মেয়েটা তাকে তুমি বলে সম্মোধন করল না? এত ভাবলো না সে। গম্ভীর গলায় ছোট একটি উত্তর করে,
“হুম।”
“তার মানে তুমিই আমার স্বামী?
মাহদির কপালের ভাঁজ গাঢ় হতে শুরু করছে। অত্যধিক বিরক্তির কারণ এটা।
মাহদি চুপ থাকলো। মেধা আবারো বলল,
বুঝেছি, তুমি হয়ত বলতে লজ্জা পাচ্ছ। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি তুমিই আমার স্বামী। এসব থাক। আমার তোমাকে পছন্দ হয়নি।”
মেধার প্রথম কথায় মাহদির রাগ হলেও শেষ লাইনটা শুনে যেন সে বেশ মজা পেল। ছোট করে বলল,
“আচ্ছা।”
মেধা ফটাফট বলে,
“আচ্ছা মানে? তোমাকে আমার সত্যিই পছন্দ হয়নি। অপছন্দের মানুষের সাথে সংসার করা যায় না-কি?”
মাহদির ভাবলেশহীন স্বর,
“কর না।”
মেধা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তুমি সংসার করবে না?”
মাহদির একই কণ্ঠ,
“না।”
মেধা অবাক হয়ে বলে,
“না? তাহলে বিয়ে করলে কেন?”
মাহদির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। এই মেয়ে এত কথা বলছে কেন! অসহ্য কণ্ঠে বলে,
“কখন থেকে আমাকে তুমি তুমি করে সম্মোধন করছ। তুমি জানো আমার বয়স কত?”
কথাটা বলতে বলতে মাহদি মেধার একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। মেধা সরল মনে বলে,
“কত তোমার বয়স? যদিও দেখে বোঝা যাচ্ছে, তুমি আমার চেয়ে অনেক বড় হবে। কিন্তু সঠিক বয়স জানলে বোঝা যাবে তুমি আমার চেয়ে ঠিক কত বছরের বড়!
মাহদি বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে। এটা মেয়ে না ভাঙা রেডিও? মেধা আবারো বলে,
আসলে আমি সবাইকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার বয়স কত। কিন্তু কেউ বলেনি৷ আর আমার বয়স ১৯ বছর। এবার তুমি বলো, তোমার বয়স কত!
মাহদি চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল,
“২৯।”
মাহদির বয়স শুনতেই মেধা চট করে আঙুলে গুণতে শুরু করল। ছোট থেকেই এটা তার অভ্যাস। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“তুমি আমার চেয়ে দশ বছরের বড়।”
মেধাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে কোনো যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে। মাহদির কণ্ঠে তীব্র রাগ ঝরছে,
“নিজের চেয়ে এত বছর বয়সী বড় একজনকে কিভাবে তুমি সম্মোধন করছ, সেন্স নেই তোমার?”
মেধা কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
“কেন, তুমি বললে কি হবে? আমি তো সবাইকে তুমি করেই বলি।”
মাহদি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“যা ইচ্ছা বলো। কিন্তু তুমি আমার সামনে আর একটা কথাও বলবে না। আমি এখন ঘুমাবো।”
কথাটা বলে মাহদি হনহন করে এগিয়ে গিয়ে ঘরের সব আলো অফ করে দেয়। এরপর গায়ের টি-শার্ট খুলে বিছানার এক কোণায় ছুড়ে ফেলে বিছানার উপর ধপ করে উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ে।
ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আসার পথে সাদ নিজের ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মাহদিকে। বিয়ের ব্যাপারে কিসব আলতু ফালতু জ্ঞান দিচ্ছিল। মাহদি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। ওসব কথা মানা তো দূর, শুনলেই মেজাজ গরম হয়। তবুও বড় ভাই সাদের কবল থেকে ছুটতে না পেরে গাট্টি মেরে কতক্ষণ বসে ছিল! সাদ তার বয়সে বড় হলেও, দু'ভাই দু'ভাইকে বন্ধুর মতোই ট্রিট করে। শুধু সম্মোধনের সময় মাহদি সাদকে ভাই আর তুমি বলে এটুকুই।
এরপর সাদের বেকার কথাবার্তা শেষ হলে মাহদি সাদের ঘর থেকেই শাওয়ার নিয়ে ওখান থেকেই একটি টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে একেবারে আসে নিজ ঘরে।
মেধা ঘরের চারিদিকে চোখ বুলায়। কৃত্রিম আলোর অভাবে ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার কথা থাকলেও জোৎস্নার আলোর ছিটেফোঁটা ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। মেধা চেঁচামেচি না করে দ্রুত এগিয়ে এসে বিছানার কাছটায় মাহদির পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“এ কি তুমি ঘুমাচ্ছো কেন? নতুন বউকে ফেলে কেউ ঘুমায় না-কি?
মাহদির সাড়া নেই। মেধা হাতের চা’কুটি বেড সাইডের টেবিলের কোণায় রেখে দু'হাত কোমরে রেখে বলল,
ঠিক আছে ঘুমাও। এমনিতেও আমি তোমার সাথে সংসার করব না।”
কথাটা বলে কিছু একটা ভেবে তাকালো মাহদির দিকে। ভাবছে এই বাড়ির লোক যে বলল, মাহদি তাকে মারবে। কই মাহদি তো মারলো না! অতঃপর অরা বিড়বিড় করল,
‘আরেকটু দেখি তোমার সাথে সংসার করা যায় কি-না!’
কথাটা বলে মেধা মাহদির দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি ঘুমিয়েছো?
মাহদির সাড়া নেই। মেধা অপেক্ষা করল। ফিরতি উত্তর না পেয়ে হঠাৎ ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
আচ্ছা তুমি না-কি যেখানে সেখানে গু’ন্ডামি করে বেড়াও!”
মেধা কথাটা বলতে না বলতেই মাহদি বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে একটি কাঁচের জগ নিয়ে জোরেসোরে টেবিলের কোণায় আ’ঘাত করে জগটি ভেঙে মেধার দিকে গেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে রক্তচক্ষু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হুঁশিয়ারি দেয়,
গু’ন্ডাই তো আমি। এখন সেটার প্রমাণও দিয়ে দিব তোমাকে। ৩৬৫ দিনে পুরো বাড়ির লোক আমার মাথার যা খেতে পারেনি, তুমি মাত্র কয়েক মিনিটে আমার সেই মাথা খেয়ে ফেলেছ। এবার দেখো আমার গু’ন্ডামি।
মেধা ভয়ের চোটে মেঝেতে ঠাস করে পড়ে গিয়েছে। চোখেমুখে বিস্ময় মেয়েটার। মনে হচ্ছে তার দিকে বড়সড় কোনো দৈত্য তেড়ে আসছে। মনে হবে না-ই বা কেন! এমন বিশালদেহী লোকের এত রাগান্বিত লুক দেখলে ছোট বাচ্চারা বোধহয় এতক্ষণে কেঁদে দিত। মেধা তার ভয়ের কান্না বহুক'ষ্টে চেপে রাখলেও, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে মেয়েটার। ভীত কণ্ঠে আওড়ায়,
“না না এমন কর না। আমি আর তোমার মাথা খাবো না।”
🟥গল্পটা একদমই অল্প কয়েকটি পর্বের মধ্যে শেষ হবে। আর হারাচ্ছি না। যাই করি না কেন, পেইজে গল্প সবসময়ই চলবে ইনশাআল্লাহ। এটা শেষ হলে হৃদয় রজনী আসবে অথবা এটার মাঝেই চলে আসবে ইনশাআল্লাহ। রানিং-এ পুরোপুরি ফিরলাম। সাথে থাইকেন। গল্পটা কেমল লাগল, অবশ্যই জানাবেন।