গল্প:বসন্তবীণা (লেখ...
 
Notifications
Clear all

গল্প:বসন্তবীণা (লেখিকা:মেহেরিশ হিয়া)

Page 1 / 2

Posts: 83
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 6 months ago
শীতের আড়ষ্টতা কাটিয়ে গ্ৰাম বাংলায় বসন্তের আগমন ঘটেছিল। শেখরের জীবনেও সেই একই সময় বসন্ত এক নতুন নামে ধরা দিয়েছিলো। এক বৃষ্টির রাতে অত্যন্ত দূর্বল ,ভীতু স্বভাবের শেখরের জীবনে আগমন ঘটেছিল এক সাহসী, আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন নারী রুপসেনা রহমান তনুর। গ্ৰামের মানুষের আঘাত, তিরষ্কার থেকে রক্ষা করে গড়ে তুলেছে এক নতুন মানব। উপহার দিয়েছে এক সুন্দর সুস্থ জীবন। এবং থেকে গেছে শেখরের 'রুপ' হয়ে 
 
 
 
গল্প:বসন্তবীণা 
 
লেখিকা:মেহেরিশ হিয়া
 
 
Loading spinner

Reply
8 Replies
Posts: 83
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 6 months ago
শীতের আড়ষ্টতা কাটিয়ে গ্রামবাংলায় বসন্তের আগমন হয়েছে গুটি কয়েক দিন। ভোরের কুয়াশাদের মাঝ হতে এক ফালি মিঠা রোদ যেন ধরনীকে সতেজ করে তুলেছে।বিন্দু বিন্দু শিশির কণা ঘাসের উপর ছড়িয়ে আছে। গ্ৰামের আঁকা বাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে একাকী একটি ভ্যান গাড়ি। গাড়ির চালক অল্প বয়সী শ্যাম বর্ণের সুদর্শন পুরুষ। ছোট ঘন কালো চুল গুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে এসে পড়েছে কপালের উপরটায়। সামান্য কালচে অধর জোড়ায় মৃদু লাজুক হাসি। আপন মনে নিজ গন্তব্যে যাচ্ছে যেন। ভ্যানের উপর একটি টেবিল এবং চারটি চেয়ার শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা। ভ্যান টা এসে থামলো হাওলাদার বাড়ির উঠানে। শেখর নেমে এগিয়ে গেলো গ্ৰাম প্রধান বরকত মিয়ার ইটের দোতলা বাড়ির দিকে। চৌকাঠের কাছে এসে গলা উঁচিয়ে হাক ছাড়লো 
 
— চাচিম্মা আপনে গো টেবিল আইছে 
 
গলায় ঝুলিয়ে রাখা গামছাটা দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে নিলো। বাড়ির বড় চৌকাঠ পেরিয়ে বেরিয়ে এলো এই বাড়ির ছোট মেয়ে রোমানা। অপরূপ সৌন্দর্যে অধিকারিণী অষ্টাদশী কন্যার পড়নে কলা পাতা রঙের কাজ করা সুতি সেলোয়ার কামিজ। ওড়নাটা গলায় ঝুলিয়ে রাখা। হাঁটার তালে তালে দুলছে কোমড় সমান চুল গুলো। মুখে এক চিলতে লাজুক হাসি। শেখরের সামনে এসে দাড়িয়ে সুকোমল কন্ঠে শুধালো 
 
— কেমন আছেন শেখর ভাই?
 
রোমানার কথায় শেখর লাজুক হেঁসে বলল 
 
— ভালোই আছি রুমু। মন্টু মিয়ারে একটু ডাইকা দেও বইন। এগুলা নামাইয়া দিয়া আমার আবার আবুল চাচার চালের বস্তা আনতে যাইতে হইবো।
 
শেখর কে নিজের দিকে তাকাতে দেখেই রোমানা লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো। ওড়নার আড়াল থেকে একটা ছোট স্টীলের বাটি বের করে আনলো। বাটিতে গরুর মাংস ভুনা। শেখরের দিকে এগিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল 
 
— আইজ বাড়িতে গরুর মাংসের ভুনা রান্না হইছে। তাই ভাবলাম আপনারেও কয় টুকরা দেই। আপনের জল্লাদ বইন তো আর দিবো না 
 
বলেই মুখ ভেংচে নিলো। মুখে লেপ্টে থাকা মৃদু হাঁসি টুকু মিলিয়ে গেলো শেখরের। বোনের কথা কেউ বললে মনটা বিষিয়ে যায়। শেখর গম্ভীর গলায় রোমানার উদ্দেশ্যে বলল
 
— খাওন দিছো তার লাইগা ধন্যবাদ। আফারে নিয়ে কিছু কইয়ো না। ওয় যা করছে সংসার ডা টিকাই রাখার লাইগা করছে।
 
রুমু কিছুটা তেজ দেখলো। তার এমন ভাব যেন শেখর তার বড়ই আপনজন। রাগি স্বরে শুধালো 
 
— হ্যাঁ আপনের আফা তো আপনের কাছে সোনা। খালি আমাগো বেলায় তামা। 
 
রুমুর অভিমানী কথায় শেখর না হেঁসে পারলো না। মেয়েটা ভীষণ মিষ্টি, আদুরে। এই দুনিয়ায় তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে একমাত্র রুমু। যেন শেখরের আপন ছোট বোন সে। শেখর ভীষণ স্নেহ করে। আলতো হেঁসে বলল
 
— রুমু বইন আমার। তুই তো আরেক টা বইন আমার। তুই আমার কাছে খাঁটি সোনাই বুঝলি!! এখন যা মন্টু মিয়ারে ডাক দে। চাচি তোরে আমার লগে দেখলে আবার রাইগা যাইবো। 
 
— এটা নেও আর কাইল আমি যামু বাটি ডা আনতে 
 
বলেই রুমু বাড়ির ভিতরে চলে গেলো। মিনিট খানেক পর বাড়ির কাজের লোক মন্টু মিয়া এগিয়ে এলেন। দুজনে ধারা ধরি করে টেবিল টা নিয়ে রাখবো বসারঘরে। বসার ঘরের এক কোণে ছোট জলচৌকিতে বসে পান চিবুচ্ছেন বাড়ির কর্ত্রী সোহাগ বানু। শেখরকে নিজ ঘরে পা দিতে দেখেই নাক উঁচু করে নিলেন। বুঝা গেলো তিনি মোটেও পছন্দ করেন না শেখর কে। হেঁসেলের দিকে তাকিয়ে হাক ছাড়লেন 
 
— ওই আমেনা মা তাতাড়ি পানি লইয়া আহো। ঘর ডা আবার মুছতে হইবো 
 
ওনার কথায় হেঁসেল থেকে এ বাড়ির বড় বউ রুমুর মা জামিলা বেরিয়ে এলেন। বসার ঘরে শেখরকে দেখে মুখ জুড়ে কালো মেঘ এসে ভর করলো। আমেনার মা কে বলল
 
— বাড়িতে গরিবের পা পড়েছে গো আমেনার মা। তাড়াতাড়ি ঘর মুছতে হবে নাহয় আমাগো অমঙ্গল হইবে। 
 
শেখর ততক্ষণাৎ মাথা নিচু করে সালাম দিলো। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। শেখর বেরিয়ে যেতেই জামিলা ছুটলেন রোমানার কক্ষে। দরজা ভেজিয়ে রাখা। তিনি দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। রুমু জানলার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার বাইরে অদূরে ভ্যানের দিকে নিবদ্ধ। ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে লাজুক হাসি। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে পুরো ঘটনাটা আন্দাজ করতে তার সময় লাগবো না। জানালার কাছ থেকে রুমু কে টেনে নিজের দিকে ঘুরালো। অকস্মাৎ মায়ের আগমনে রুমু ভরকে যায়। তবে কি মা সবটা দেখে নিয়েছে। জামিলা বানু কঠর কন্ঠে শুধালো 
 
— আমার স্টিলের বাটি ডা কই গেলো রোমা? 
 
— আইজ এতো ভালা খাওন রানছেন। এক বাটি বিন্দুর মারে দিয়া আইছি। কাইল যাইয়া বাটি ডা লইয়া আমু 
 
————————
 
— মম তুমি কি পাগল হয়ে গেছো। আমি বিয়ে করবো ওই সাদা বিড়াল টাকে। লাইক সিরিয়াসলি!! 
 
মেয়ের কথায় বেজায় চটে গেলেন তানিয়া রহমান। পাত্রপক্ষ ড্রয়িংরুমে বসে আছে আর এখন মেয়ের এসব কথা। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন 
 
— তনু তোমার নানু খুব শখ করে এই বিয়েটা ঠিক করেছেন। আর আলবার্ট ভালো ছেলে। তোমাকে সুখে রাখবে ডিয়ার।
 
— আমার কথা শুনলে না তো দেখো তোমার আদরের আলবার্টের কি হাল করি। 
 
বলেই মুখ ঘুরিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল তনু। শব্দ করেই দরজাটা বন্ধ করলো। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে তানিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ছোট থেকেই মেয়েটা ভীষণ জেদি আর ঝগড়ুটে। জাহিদ রহমানের আদরে মেয়েটা আরো বেশি জেদি হয়েছে। তানিয়া গোলাপি জামদানি টা বিছানায় রেখে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন। 
 
——
 
রহমান ম্যানশনের বড় ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে আছে জাহিদ রহমান ও তার দুই ছেলে জিসান ও জারিশ। অন্য পাশে বসে আছে মিস্টার অ্যান্ডো উইন তার গার্লফ্রেন্ড ফ্লোরা উইন এবং ছেলে আলবার্ট উইন। মাঝে ছোট হুইলচেয়ারে বসে আছে জাহিদ রহমানের শাশুড়ি সৈয়দা বেগম। পেশায় তিনি একটা বিজনেস উইম্যান। উইন্স নেস্ট এর সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি রয়েছে। নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক আরো মজবুত করতেই তিনি এই বিয়ের প্রস্তাব দেন। যদিও এতে জাহিদ রহমানের মতামত ছিল না। তবে শাশুড়িকে তিনি ভীষণ সম্মান করেন। তাই না করতে পারেননি। উইন রা এসেছে অনেক্ষণ হলো তবে তার জেদি মেয়ের দেখা নেই। তিনি জানেন মেয়েটা এই বিয়েতে মোটেও রাজি নয়। কিছু না কিছু ঝামেলা সৃষ্টি করবেই। এই সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে তার। তানিয়া এগিয়ে এলো তাদের কাছ। মেয়েকে দেখেই সৈয়দা বেগম বললেন,
 
— তানি আমার নানুমনি কোথায়!? ওকে নিয়ে এসো। 
 
— হায় গাইজ!!! 
 
অকস্মাৎ এমন কথায় সকলের দৃষ্টি গেলো সিঁড়িতে। সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে সবার চক্ষু চড়কগাছ। নীল শার্ট, গোলাপি শাড়িটা লুঙ্গির মতো করে পড়া। শার্টের উপর লাল জ্যাকেট জড়ানো। চুল গুলো উশখ খুশক হয়ে আছে। প্রথম দেখায় যেকোনো পাগ'ল বলে আখ্যায়িত করবে। তবে জাহিদ রহমান তাকে পাগ'ল বলতে পারলেন না। তার আদরের মেয়ে তনু কে কি করে পাগ'ল বলবেন তিনি। তবে তনুর এই অবস্থা দেখে জিসান জারিশ গড়াগড়ি করে হাসছে। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বাড়ির দুই বধু ইমরা,সায়নাও হাসছে। তানিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন মেয়ের পানে। মেয়েটা মান সম্মান শেষ করে দিলো। মাকে কি করে সামলাবে এখন। সৈয়দা বেগম হতভম্ব, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। নাতনি তাকে সম্মান করে না কিন্তু তাই বলে গেস্ট দের সামনে এমন একটা কান্ড ঘটাবে তা কল্পনাও করেননি তিনি। অন্যদিকে আলবার্ট বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে দেখছে সিঁড়িতে অবস্থান করা মেয়েটিকে। চরম বিষ্ময়ে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো 
 
— হোয়াট ইজ দিস!!!!!! 
 
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 83
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 6 months ago
পর্ব:০২
 
 
 
 
ধরনীতে অন্ধকার নেমেছে। তবুও শহরের ব্যস্ততম রাস্তার দৃশ্য যেন ভিন্ন কথা বলছে। বিভিন্ন আলোকসজ্জায় সজ্জিত গোটা শহরের আনাচে কানাচে। বিভিন্ন রঙ বেরঙের ছোট বড় লাইট; ল্যাম্পপোস্টের আলোতে যেন এই ভিন্ন গল্প লেখে রেখেছে। রহমান ম্যানশনের ড্রয়িংরুমে এলাহী কান্ড। রুমের একপাশে সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো। মাঝে একটা সোফা রাখা। মেঝেতে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেওয়া, ফুলের মাঝে অতি নিখুঁত ভাবে ইংরেজি গুটি কয়েক অক্ষরে লেখা “Albert & Tonu's Ring Ceremony ”। অন্যপাশে খাবার টেবিল যেন রাজকীয় সাজে সজ্জিত আজ। বাড়ির দুই বউ ভীষণ সুন্দর করে সাজিয়েছে সবকিছু। আজই তনুর আংটি বদল হবে। সৈয়দা বেগমের আদেশ। যা নিয়ে চলছে নানী নাতনি র মাঝে এক নিরব যুদ্ধ। তনু কিছুতেই বিয়ে করবে না। তখন ওইরকম বেশভূষায় যাওয়ায় সৈয়দা বেগম ভীষণ চটে গিয়েছিলেন। তিনি কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ টুকু ও দেননি। সঙ্গে সঙ্গে আংটি বদল করে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। যাতে উইন্স রা সম্পূর্ণ মতামত দিয়ে আংটি আনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে ঘন্টা খানেক আগেই। 
 
নিজ রুমে বসে আছে তনু। সামনে বিছানার উপর রাখা সাদা গাউন আর দোপাট্টা। সঙ্গে কিছু জুয়েলারি ও আছে। আপাতত রুমে কেউ নেই। তানিয়া একটু আগেই মেয়েকে বুঝিয়ে রেখে গেছেন মায়ের ঘরে। তনু জানে নানী নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিন সবথেকে বেশি। বিরক্তিতে নাক কুঁচকে নিলো তনু। ফোন টা হাতে নিয়ে ফ্রেন্ডস গ্ৰুপচ্যাটে ঢুকলো। সেখানে ঢুকে মেজাজ টা আরো খারাপ হলো। এই মূহুর্তে যেন নিজের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলবে। ফোনটা ছুঁড়ে ফেললো অদূরে। সঙ্গে সঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল যান্ত্রিক বস্তু টি। দরজায় সামান্য টোকা পড়লো। তানিয়া ওপাশ থেকে বললেন 
 
— তনু তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। আলবার্ট রা চলে এসেছে। দশ মিনিট পর আমি এসে তোকে নিয়ে যাবো। 
 
মায়ের কথায় তনুর সর্বাঙ্গ রাগ থরথর করে কাঁপতে লাগল। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। না পালানো ছাড়া কোনো উপায় নেই অবশিষ্ট। দ্রুত পায়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল। পোশাক পাল্টে সাদা লং শার্ট আর ব্লু লেডিস প্যান্ট পড়ে নিলো। নিজের আইডি কার্ড আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। গোলাপি শাড়িটা বারান্দার গ্ৰিলে বেঁধে নিচে ছেড়ে দিলো। শাড়ি তে ঝুলে নিচে বাগানে এসে নামলো। এই জায়গাটা অন্ধকারে ঢেকে আছে। তনু আস্তে আস্তে প্রাচীর টপকে বাইরে এলো। একটু হাঁটতেই একটা সিএনজির দেখা মিললো।
 
— এই মামা যাবেন!?
 
— কোথায় যাইবা মামা?
 
সিএনজি চালকের কথায় তনু একটু ভাবনায় পড়ে গেলো আসলেই তো যাবে কোথায়। বন্ধুদের বাসায় যাওয়া যাবে না। 
 
— মামা আমি একটা বিপদে পড়েছি এখন পালাতে হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কোনো একটা গ্ৰামে নিয়ে চলুন। একটু তাড়াতাড়ি যাবেন প্লিজ 
 
— আইচ্ছা আসো।
 
—————
 
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আপন নীড়ে ফিরলো শেখর। আজ একটূ বেশি কাজ করা লেগেছে তার। যদিও কিছু টাকা পাওয়ার জন্যই কাজটা করা। তবে অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নিজের ছোট্ট মাটির ঘরের তালা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। ছোট্ট ঘর টায় একটাই কক্ষ। একপাশে ছোট চৌকি, তার পাশেই একটা পুরাতন কাঠের টেবিল, টেবিলের উপর একপাশে ধর্মীয় কিছু কিতাব আর অন্য পাশে গুটি কয়েক থালা বাসন, হাঁড়ি পাতিল; কক্ষের অন্য পাশে পুরাতন কাঠের আলমারি, এবং একটা ছোট ট্যাংক। সঙ্গে লাগোয়া টয়লেট আছে সেটা টিনের তৈরি। এই ছোট্ট ঘরটা শেখরের বাবার রেখে যাওয়া সম্বল। 
টেবিলের উপর রুমুর দেওয়া বাটি টা রাখলো। আগে একটু হাত মুখ ধুয়ে নিতে হবে। হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো শেখর। আধ পোড়া মোমবাতি টা জ্বালিয়ে ঘর থেকে বেরোলো। পাশেই রান্নাঘর। রান্নাঘর বলতে একটা মাটির চুলা,কিছু শুকনো পাতা-লাকড়ি আর উপরে প্লাস্টিক দিয়ে রাখা। শেখর উনুনে আগুন দিলো। ঘর থেকে কিছুটা চাল নিয়ে এলো। ভাত রান্না বসিয়ে দিলো। পাশেই গরুর মাংস গরমে দিলো। অদূরে ইটের দালানের দিকে তাকিয়ে রইল। ওইখানেই তার বোন আছে। তবে চোখের দেখাটাও দেখতে আসেনা। কতটা সময় সেদিকে তাকিয়ে ছিল মনে নেই। আচমকা আকাশে মেঘের গর্জনে হুঁশ ফিরল তার। আকাশটা বেশ গর্জন করছে সঙ্গে বজ্র ও পড়ছে। শেখর তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে ঘরে প্রবেশ করল। মোমবাতি নিভিয়ে হারিকেন টা জ্বালিয়ে দিলো। এর মাঝেই তুমুল বর্ষন শুরু। 
 
———
 
সিএনজি করে তনু অনেকটা দূরে চলে এসেছে। এখন গ্ৰামের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছে। বেশ ভয় লাগছে আশেপাশে কোনো বসতবাড়ি নেই!নেই কোনো দোকান। তারমধ্যে মেঘের গর্জন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বৃষ্টি শুরু হবে। তনু দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলো। কিছুদূর যেতেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়। কিছুটা দূরে একটা মাটির ঘর দেখা যাচ্ছে। তনু দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো সেখানে। আলতো করে টোকা দিল। মাত্রই থালায় ভাত বেড়ে ছিল শেখর। হঠাৎ এই সময় দরজায় কে কড়া নাড়লো। শেখর হারিকেন হাতে এগিয়ে গেলো। আস্তে করে দরজা খুলে দিতেই এক স্নিগ্ধ অপরুপার দেখা মিললো। আধুনিক বেশভূষায় জড়িয়ে আছে সর্বাঙ্গ। সাদা শার্ট বৃষ্টিতে ভিজে লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে। ঠান্ডায় তিরতির করে কাঁপছে নারী কায়া। শেখর এই সময় কোনো মেয়েকে এখানে একদমই আশা করে নি। খানিক থমকালো। 
শ্যাম বর্ণের সুদর্শন পুরুষ দেখে তনু যেন স্থান কাল ভুলে বসেছে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ক্লান্ত সুদর্শন মুখ খানায়। কি স্নিগ্ধ তার চাহনি। হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে ধ্যান ভাঙলো তার। নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টি দেখে আমতা আমতা করে বলল
 
— আসসালামুয়ালাইকুম! আমি তনু! শহর থেকে এসেছি। এখানের কিছু চিনি না তারমধ্যে আবার রাতের বেলা ভারি বৃষ্টিপাত। দয়া করে আজকে রাত টুকু আপনার ঘরে জায়গা দিবেন।
 
প্রাপ্তবয়স্ক নারীর কাছ থেকে এমন কথা মোটেও আশা করেনি শেখর। চরম বিষ্ময়ে আঁখি যুগল বড় বড় হয়ে গেলো। মুখে উচ্চারণ করল 
 
— আপনে কে আফা মনি। এইহানে কি করেন? আমি একলা একডা পোলা মানুষ থাকি। আপনারে কেমনে জায়গা দেই কন 
 
শেখরের কথায় তনুর মনটা খারাপ হলো। কিছুটা মিনতি স্বরে বলল
 
— দয়া করে আজকের জন্য জায়গা দিন ভোর হতেই চলে যাবো 
 
— না আফা পারমু না। মাফ করেন
 
বলেই মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিলো শেখর। তবে তা আর হলো না। তনু লাফিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। 
 
— এই এই আপনে কি কর..
 
শেখরের কথা বন্ধ করে দিলো তনু। মুখের উপর নিজের নরম হাত খানা রেখে। শেখর নিজ জায়গায় জমে বরফ খন্ডে পরিণত হলো। শুকনো ঢোক গিললো। তনু একবার ছোট ঘরটায় নজর বুলিয়ে নিলো। টেবিলের উপর একটা গামছা রাখা দেখেই সে দিকে এগিয়ে গেলো। গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বললো 
 
— আরেকটা থালায় ভাত বেড়ে নিন এটা আমি খাবো।
 
বলেই টয়লেটে চলে গেলো। শেখর এখনো সেখানে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। পা দুটোর বোধ শক্তি লোপ পেয়েছে বোধহয়। নিজেকে নিয়ে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। মেয়েটাকে কিছু বলতে পারলো না কেন সে। শেখরের ভাবনার মাঝে বেরিয়ে এলো তনু। সেদিকে তাকিয়ে শেখর দ্বিতীয় বার বরফ খন্ডে পরিণত হলো। শরীরে কেমন শিরশির অনুভূতি কাজ করছে। চোখ সরিয়ে আনতে চাইলো। তবে অবাধ্য চোখ জোড়া সেদিক থেকে ফিরাতে পারলো না। 
টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তনু। পড়নের ভেজা জামা খুলে সেখানে থাকা শেখরের একটা পুরনো শার্ট গায়ে জড়িয়েছে। ভেজা চুল থেকে একটু একটু পানি ঝড়ছে। তার এই ল্যাসময়ী নারী কায়ায় শেখর নিজের সর্বনাশ দেখতে পেলো।
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 83
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 6 months ago
পর্ব:০৩
 
 
 
 
উত্তরা দক্ষিণখান থানার ওসি বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরীর সামনে বসে আছেন জাহিদ রহমান। সঙ্গে জারিশ ও এসেছে। মূলত তারা তনুর মিসিং রিপোর্ট করতে এসেছে। সব শুনে ওসি সাহেব বললেন 
 
— দেখুন আপনাদের মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক পূর্ণাঙ্গ নারী। এবং সে নিজ ইচ্ছায় চলে গেছে। শুধু শুধু ডায়েরি করে কি লাভ হবে 
 
— আপনাকে টাকা তো দেওয়া হবেই তাহলে নিতে চাচ্ছেন না কেন? 
 
বিরক্তি টেনে বলল জারিশ। ওসি সামান্য কেশে সোজা হয়ে বসলেন। ডায়েরি লেখায় মনযোগ দিলেন। একটু পর লেখা শেষ করতেই জাহিদ রহমান বললেন 
 
— ও এই শহরের মধ্যেই আছে। কারণ গ্ৰামের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে না কখনোই 
 
— আচ্ছা আপনারা এখন আসুন আমি কিছু পেলেই আপনাদের জানাবো। 
 
ওসির সঙ্গে কথা শেষ করে দুজনে বেরিয়ে এলো থানা থেকে। পাশাপাশি হাঁটছে। জারিশ আলতো কন্ঠে শুধালো 
 
— আব্বু বিয়েটা করতে তনু রাজি ছিল তবুও তোমরা কেন জোর করলে? এখন ওকে কোথায় খুঁজবো বলো।
 
ছেলের কথায় জাহিদ সাহেব বাঁকা হাসলেন। তবে তা ঘন বড় গোঁফের আড়ালেই বয়ে গেলো। ছেলের কাঁধ চাপছে বললেন 
 
— তোকে অনেক কথা এখনো জানানো বাকি আছে রে বাবা। একদিন সময় করে সব বলবো তখন তো পারবি জোর করার কারণ ঠিক কি ছিল। 
 
বাবার এমন রহস্যময় কথার অর্থ কি ধরতে পারল না জারিশ। তবে কোনো প্রশ্ন করল না। 
রহমান ম্যানশনে মাথায় হাত দিয়ে সোফার উপর বসে আছেন সৈয়দা বেগম। তার সকল পরিকল্পনার মাঝে জল ঢেলে চলে গেছে তনু। উইন রা তাকে অপমান করে চলে গেছে আরো ঘন্টাখানেক আগেই চলে গেছেন। তার মাঝে তানিয়া মায়ের সঙ্গে কথা বলবে না বলে রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এতোদিনের করা সকল পরিকল্পনা শেষ হয়ে যাওয়ার সৈয়দা বেগমের প্রেসার উঠেছে ভীষণ। তিনি কিছুতেই মানতে পারছেন না। 
 
—————
 
আকাশ ভেঙ্গে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শেখরের ছোট মাটির ঘরের উষ্ণতা। তনুকে খেতে বলেই শেখর এগিয়ে গেলো চৌকির দিকে। আজ আর তার গলা দিয়ে খাবার নামবে না। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলো। এক টানে শরীর থেকে গেঞ্জি টা খুলে পাশে রেখেই শুয়ে পড়লো। চোখ জোড়া বুজলো। তনু এতো সময় শেখরের কর্ম কান্ডে পরখ করেছিল তবে এখন তার কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলো। এগিয়ে আসতে আসতে বলল
 
— এই আপনি না খেয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছে..
 
পুরো বাক্য শেষ করতে পারলো না। নিজেকে আবিষ্কার করলো শেখরের বুকের ঠিক মাঝখান টায়। টেবিলের সঙ্গে পা বিঁধে ভারসাম্য হারিয়ে এসে পড়েছে সে।
নিজের শরীরের উপর হঠাৎ কিছু পড়ায় লাফিয়ে উঠলো শেখর। তনুকে নিজের বক্ষ স্থলে দেখে চরম বিষ্ময়ে আঁখি যুগল বড় কর নিলো। তনুর অবস্থা ও একই। দুজন হতবুদ্ধ , বাকরুদ্ধ। শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে । নিজেদের অবস্থান বুঝতে খানিক সময় লাগলো তাদের। শেখর নিজের অজান্তেই বুঝতেই এক ধাক্কায় তনুকে চৌকি থেকে ফেলে দিলো। তনুর নাজুক শরীর মাটি স্পর্শ করতেই বিকট শব্দে এক চিৎকার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো। তার চিৎকারে শেখর নিজেও ভয় পেলো তবে বুঝতে না দিয়েই গলা ঝেরে সামান্য কেশে বলল
 
— আমি খামু না আপনে খাইয়া এইহানে ঘুমায় পড়েন। আমি পাটি লইয়া নিচে শুইয়া থাকমু
 
শেখরের কথায় তনু উঠে বসলো চৌকির কোণে। একহাতে কোমড় ধরে আছে। ব্যথায় মুখ কুঁচকে রেখেছে। শেখরের দিকে তাকিয়ে মুখে বিরক্তি টেনে কিছু বলতেই নিবে তার আগে বাহির থেকে কারো গলার আওয়াজ ভেসে এলো
 
— ওই শা/লা দুয়ার খোল। ঘরের মইধ্যে মাইয়া মানুষ লাইয়া ফুর্তি করবি ‌এডা আমাগো বাইত চলবো না কইলাম। 
 
মূহুর্তেই শেখরের মুখের রং উড়ে গেল। বিবর্ণ মুখ নিয়ে একবার তনুর দিকে তাকালো আবার নজর সরিয়ে দরজার পানে তাকালো। ওপার থেকে আবার মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো 
 
— কি হারামি দুয়ার খোল। আইজ বিচার বইয়ামো তোর নামে। ঘরের মইধ্যে বে/শ্যা লইয়া ফুর্তি করা ছুডামু 
 
মায়ের গর্ভের আপন বোনের মুখে এমন কথা শুনে শেখর চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। বোন তাকে ভীষণ অপছন্দ করে তবে এমন কথা বলবে সেটা কল্পনা ও করেনি। 
এতোক্ষণ পুরো পরিস্থিতি টা কিছুটা আন্দাজ করে নিলো তনু। দ্রুত পায়ে টয়লেটে ঢুকে গেলো। তখনো দরজায় করাঘাতের শব্দ। এবার যেন ভেঙে ফেলবে দরজা। শেখর আস্তে করে উঠে দরজা খুলে দিলো। দরজা খোলা পেতেই হুড়মুড়িয়ে ভিতরে ঢুকলো শেখরের বোন রোজিনা। এবং তার স্বামী রওনক মির্জা। সম্পর্কে শেখরের বড় চাচার ছেলে রওনক। 
রোজিনা ভিতরে ঢুকেই এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজলো। তবে কারো অস্তিত্ব নেই দেখে সন্দেহ জনক দৃষ্টি তে শেখর কে পরখ করলো। রওনক এসে শেখরের গলা চেপে ধরে বলতে লাগলো 
 
— কিরে শা/লা মাইয়া ডারে কই গুজাই রাখচোত ক । কবে থেইকা বে/শ্যা ঘরে আনোচ হ্যাঁ?
 
চাচাতো ভাই নামক দুলাভাই তার চরিত্র নিয়ে কথা বলছে অথচ শেখর কিচ্ছুটি বলতে পারছে না। অতি লজ্জা অপমানে চোখের জল এসে জমেছে। আঁখি যুগল সামান্য লাল ও বটে। কালচে বেগুনি অধর জোড়া কাঁপছে ভীষণ। কন্ঠ নালী হতে একটা শব্দও বের হচ্ছে না। কান্নারা ধলা পাকিয়ে আসছে কেবল। নিজেকে সামলে নিচু কন্ঠে শুধু বলল
 
— আমারে ছাইড়া দেন ভাইজান। আমি কোন অপরাধ করি নাই। 
 
— আমাগো রে বলদ পাইছোচ তুই? বে/শ্যা গো লগে হুইবি আবার আমরা কইলেই মিছা কতা কস। তোরে ...
 
— মুখ সামলে কথা বলুন মিস্টার। 
 
রওনক ক্ষিপ্ত গলায় আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই একটা গম্ভীর মেয়েলি কন্ঠে থমকে যেতে বাধ্য হলো। 
টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তনু পড়নে সেই ভেজা জামা কাপড় গুলোই। শেখর আঁতকে উঠলো। এখন আফা তাকে নিয়ে বিচার বসাবেন। রোজিনা তনু কে দেখে যেন কথা বলাই ভুলে বসেছে। তনুর সৌন্দর্য দেখে সে মুগ্ধ। শুভ্র লালচে গায়ের রং, হারিনী আঁখি যুগল,ঘন কালো কেশ, ঠোঁট যেন আস্ত এক র'ক্ত জবা। রোজিনাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তনু এগিয়ে গেলো সেদিকে। রোজিনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রুক্ষ কন্ঠে শুধালো 
 
— বৃষ্টির মাঝে ওনার ঘরে আমি আশ্রয় নিয়েছি। তিনি দিতে চাননি তবে আমি অনেক অনুরোধ করেই থেকেছি। এখানে কাউকে সার্ভিস দিতে আসিনি। আশা করছি নিজের মুখের সংযত রাখবেন 
 
নিজের অর্ধ বয়সী মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে খানিক অপমানিত মনে হলো নিজেকে রোজিনার। তবে কিছু ভেবেই বাঁকা হাসলো সে। এই মেয়েকে সে অপমানিত লাঞ্ছিত করে দিবে। তাকে আজ কলঙ্কিত করবে। 
 
— এই মাইয়া আমার বউর লগে জোরে কতা কইবা না কইয়া দিলাম। ভালা হইবো না কিন্তু 
 
রওনকের কথায় তনু এগিয়ে গেলো সেদিকে। শেখরকে রওনকের কাছ থেকে সরিয়ে আনলো আগে। অতঃপর রওনককে নকল করেই বললো 
 
— ভালা হইবো না কিন্তু!!! আপনের ভালা দেখার লাইগা মনে হয় আমি বইয়া রইছি হ্যাহ!!
 
বলেই চোখ উল্টালো তনু। তাজ্জব বনে গেলো রওনক রোজিনা। হতবাক, বিস্মিত, বাকরুদ্ধ কর অবস্থা তাদের। চিন্তায় হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে শেখরের। জানে না আজ কি হবে ওদের। এর মাঝে আরো কিছু কথার ধ্বনি ভেসে এলো। আশেপাশের মানুষ ও আসছে এইদিকে। শেখর দ্রুত তার একটা পুরাতন শাল দিয়ে জড়িয়ে নিলো তনুর সমস্ত শরীর। 
হঠাৎ শেখরের কান্ডে অবাক ঘরে থাকা তিন জোড়া চোখ। তনু অবাক হয়ে দেখলো শ্যাম সুদর্শন পুরুষটির পানে। কবি হয়তো এদেরকেই সুপুরুষ বলে আমি করেছেন। ততক্ষণে আশে পাশের মানুষ এসে পৌঁছেছে শেখরের মাটির ঘরে। তাদের দেখে একজন বলে উঠলো
 
— কিরে শেখর রাইত বেরাইতে এই মাইয়া লইয়া কি করছ তুই?
 
চাঁপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো। মহিলারা একে অপরের সাথে কানাঘুষা করছে। সুযোগ বুঝে হঠাৎ রোজিনা বলে উঠলো 
 
— আবুল চাচা এই দেহেন কি কেলেঙ্কারি কান্ড। ওগো রে এহন বিয়া দিতে হইবো চাচা!!
 
 
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 83
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 6 months ago
পর্ব:০৪
 
 
 
 
ঘন আঁধার রাত। ভারি বর্ষণ, জঙ্গল থেকে নাম না জানা অসংখ্য পোকা মাকড়ের ডাক ভেসে আসছে। সব মিলিয়ে এক গুমোট পরিবেশ তৈরি করেছে। হাওলাদার বাড়ির উঠানে দরবার বসেছে। শেখর তনুকে নিয়ে আসা হয়েছে গ্ৰাম প্রধানের বাড়িতে। এই তুমুল বৃষ্টিপাতের মাঝেই বিচার বসেছে। উঠানের পাশে ছোট দোচালা টিনের ঘরে সকলে বসেছে। গ্ৰাম প্রধান বসে আছেন মাঝে একটা কেদারায়। তার পাশে গ্ৰামের আরো কয়েকজন মুরুব্বি বসেছেন। একপাশে পাটিতে বসে আছে রওনক-রোজিনা , শেখর আর তনু। রোজিন একপাশে অন্য পাশে তনু। দুজনের মাঝে বসেছে রওনক আর শেখর। ক্ষণে ক্ষণে রোজিনা তনুর দিকে তাকাচ্ছে। তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে। আর তনুর চোখ থেকে যেন আগুন ঝড়ছে। রওনক ও একটু পর পর তনুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কি যেন দেখে চলেছে। আবার চোখ সরিয়ে নিলো। একটু পর আবারো তাকালো তনুর দিকে। দুজনের চোখাচোখি হতেই তনু জিব বের করে দেখলো রওনক কে। হঠাৎ এমন করায় রওনক ভরকে গেলো যেন। হাঁটুর বয়সী মেয়েটা তাকে দেখে মুখ ভেংচি কাটলো। ভাবতেই নিজের পুরুষত্বে যেন আঘাত অনুভব করলো। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে মেঝেতে নিবদ্ধ করলো। মনে মনে কিছু চিন্তা ভাবনা করলো। শেখর লজ্জা অপমান মাথা নিচু করে বসে আছে। ভুলক্রমে ও চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। 
অপেক্ষা অবসান ঘটিয়ে গ্ৰাম প্রধান অর্থাৎ রুমু দাদা মুখ খুললেন 
 
— রওনক দাদাভাই কও দেহি কি হইছে মূল কাহিনী ? 
 
গ্ৰাম প্রধানের কথা শেষ হতেই রোজিনা কর্কশ গলায় বলল 
 
— দাদা এই বলে/শ্যারে লইয়া ওয় মাইঝ রাইতে ঘরের দুরায় আটকাই ফুর্তি কর
 
— মুখ সামলে কথা বলুন বুড়ি! আমি চুপ করে আছি তার মানে এই না যা বলবেন মেনে নিবো। আর একটাও মিথ্যা কথা বললে আপনার ওই মুখ আমি ভেঙে দিবো। বুড়ি কোথাকার 
 
রোজিনার মুখের কথা কেড়ে নিলো তনু। চিৎকার করে বললো প্রতি শব্দ। উপস্থিত সকলকে এক মূহুর্তের জন্য থমকে দিলো। সকল হতবাক, বাকরুদ্ধ। গ্ৰাম প্রধান অবাক চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন তনুকে। গায়ের ভেজা পোশাকের উপর শেখরের দেওয়া শাল টা জড়িয়ে রেখেছে। মাথা সহ মুখ টুকু ও আড়াল করে রাখা। তবে হাত দেখে মনে হচ্ছে বেশ সুন্দরী। তেমনি মুখের ভাষাও অত্যন্ত শুদ্ধ, মার্জিত। কোনো দেহব্যবসায়ীর কথার ধরন এমন মার্জিত হতেই পারে না। তনুর কর্কশ বাক্যে রোজিনা বেজায় ক্ষিপ্ত হলো। মেঝে থেকে উঠে তেড়ে এলো তনুর নিকট। উদ্দেশ্য ছিল তনুকে টেনে ছুঁড়ে ফেলা! তবে তা আর সম্ভব হলো না। রোজিনা তনুর হাত ধরার আগেই তনু তার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরলো। একটানে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললো মেঝেতে একদম শেখরের পায়ের কাছ টায়। এতো সময় মাথা নিচু করে থাকলেও এবার আর থাকতে পারলো না শেখর। চোখ তুলে তনুর পানে চাইলো। চোখাচোখি হতেই তনুর সমস্ত রাগ পড়ে গেলো। শেখরের ওই দুটি চোখে যেন আকুতি দেখতে পেলো। যেন শেখর বলছে আর না এবার থামো। তনু নিজেকে সামলে গুটিসুটি মেরে বসে পড়লো শেখরের শরীর ঘেঁষে। যেটা সেখানে উপস্থিত কেউই ভালো চোখে দেখলো না। গ্ৰাম প্রধান কঠিন গলায় শুধালেন
 
— এই মাইয়া রোজিনা তোমার কত্তো বড়। ওরে মারলা ক্যান!? তোমার মতলব তো ভালা লাগতেছে না আমার। সইরা বইয়ো ওই পোলার থেইকা
 
গ্ৰাম প্রধানের কথায় তনু চোখ উল্টে বিরক্তি প্রকাশ করলো। সকলে অবাক করে দিয়ে শেখরের কোলে উঠে বসলো। সবার চোখ যেন কপালে উঠার উপক্রম। রোজিনা অতি বিস্ময়ে কথা বলার ভাষা টুকু হারিয়ে ফেললো। এই মেয়ে তো ভারি নির্লজ্জ। কাউকে সম্মান করে না। একজন মুরুব্বি বললেন 
 
— তওবা তওবা এই মাইয়া কেমন বেশরম রে বাবা‌। তাড়াতাড়ি ওগোরে বিয়া দেন‌। কোন সময় জানি এইহানে নষ্টামি শুরু কইরা দেয়। 
 
— এই বেদ্দাপ মাইয়া সইরা বসো। কেমন কইরা কোলে উইঠা বইছে দেখ 
 
গ্ৰাম প্রধানের কথায় সকলে সায় দিলো। কানাঘুষা ও চলেছে পাল্লা দিয়ে। এসব দেখে তনু বাঁকা হাসলো। ঠাট্টার স্বরে বলল 
 
— দূরে বসলেও আপনারা বিয়ে দিবেন। কোলে বসলেও বিয়ে দিবেন। তাহলে কোলেই বসি। কিছুক্ষণ বাদেই তো স্বামী হবে আমার। 
 
তনুর নির্লজ্জ কথায় উপস্থিত সকলে আবার বিষম খেলো। এবার শেখরও বাদ যায়নি। একসঙ্গে এতো শক নিতে পারছে না সে। মনে মনে নিজেকে গালমন্দ করছে। কেন সে দরজা খুলেছিলো। সেটা তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখরকে আরো একবার বিষম খাইয়ে তনু বললো
 
— আরে দেরি করছেন কেন? তাড়াতাড়ি কাজি নিয়ে আসুন না। আমি বিয়ে করবো। 
 
কথাটা শেষ করেই তাকালো শেখরের পানে। বেচারা ভয়ে লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। ঘেমে একাকার অবস্থা। তনু শালের এক কোনা দিয়ে ঘামে মুছতে মুছতে বললো
 
— আপনার কাছে টাকা হবে? কটা টাকা দিন তো 
 
— ক কেন!?
 
অনেক কষ্টে শব্দ টি উচ্চারণ করলো শেখর। উপস্থিত সকলে তখনো হতবুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। তনু রোজিনার দিকে তাকিয়ে বলল 
 
— শাড়ির জন্য টাকা দিতে বলেছি। তাড়াতাড়ি দিন। আর এই যে কুটনি ননদিনী আমাকে সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দিন তো। বউ সেজে তবেই বিয়ে করবো। 
 
রোজিনা এবার কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। এই মেয়ের চক্করে পড়েছে সে। আর রক্ষা নেই। তনু আড়ালে বাঁকা হাসলো। হঠাৎ কানের কাছে শেখরের ফিসফিস করে বলা কথা গুলো শুনতে পেলো 
 
— আমার আম্মার বিয়ার শাড়ি আছে। একদম লাল টুকটুকে জামদানি শাড়ি। লগে ওড়না আর কিছু সোনা ও আছে। সবই আম্মার। আলমারিতে যতনে রাইখা দিছিলাম। ওইডা পড়েন এহন। আমার ধারে টাহা নাই এহন। 
 
শেখরের কথায় তনুর চোখ চিকচিক করে উঠল। মায়ের শাড়ি! আলাদা একটা টান। সে কখনো মায়ের শাড়ি পড়েনি। এই প্রথম পড়বে তবে মায়ের নয়। শাশুড়ি মায়ের শাড়ি। তনু দ্রুত উঠে দাঁড়ালো একজন মহিলাকে বললো
 
— এই যে খালা ওনার ঘরের আলমারি থেকে লাল শাড়ি টা নিয়া আসেন তো। আর একটা পাঞ্জাবি ও আনবেন।
 
— চাচি লগে একখান পোটলা আছে ওইডাও নিয়া আহেন। 
 
বলল শেখর। গ্ৰাম প্রধান আড়ালে একজন কাজের লোককে ডেকে কাজি আনার ব্যবস্থা করতে বললেন। সেখানেই কথা সমাপ্ত করে তিনি উঠলেন। একটু পর কাজি আসবে। এই ফাঁকে সামান্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে বললেন। 
 
শেখরের মায়ের শাড়ি নিয়ে হাজির হলেন আমেনার মা। তিনি নিজেই শাড়িটা পড়িয়ে দিলেন তনুকে। জীবনে প্রথম নিজ অঙ্গে শাড়ি জড়িয়েছে তনু। যেই শাড়ি কিনা তার শাশুড়ি মায়ের। তনু আঁচল টা উল্টে পাল্টে দেখলো। বেশ সুন্দর লাল জামদানি টা। অন্য ঘরে শেখর ও তৈরি হয়ে নিলো। তনুর ঘরের সামনে এসে আলতো কন্ঠে ডাকলো 
 
— চাচি আসমু?
 
— আহো বাজান। আমি যাই 
 
বলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন আমেনার মা। শেখর ভিতরে প্রবেশ করল। তনুর দিকে তাকাতেই থমকে গেলো। হৃদস্পন্দন দ্রুত হলো। কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। লাল শাড়ি পরিহিতা এক ল্যাসময়ী নারী। মুখে কোনো প্রসাধনী নেই। আছে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাঁসি। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। শেখর যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। পলক ফেলছে না পর্যন্ত। 
অন্যদিকে তনুর ও নাজুক অবস্থা। শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত শ্যাম সুদর্শন পুরুষকে দেখে তার গোটা দুনিয়া থমকে গেছে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। মস্তিষ্ক শুধু একটা কথাই বলছে আজকের পর থেকে এই সুদর্শন পুরুষ টি শুধু তনুর। রূপসেনার শ্যাম পুরুষ। কতটা সময় এভাবে ছিল তাদের কারোই জানা নেই। বজ্রপাতের শব্দে বাস্তবে ফিরলো তারা। বেশ লজ্জা ও লাগছে। শেখর এগিয়ে এলো তনুর নিকটে। অতি নিকটে এসে থামলো। হাতে থাকা পোটলা থেকে একটা সোনার নেকলেস আর একজোড়া কানের ঝুমকা বের করল। তনুকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। নিজ হাতে অতি যত্নে নেকলেস টা পড়িয়ে দিলো গলায়। কানের ঝুমকা জোড়া হাতে দিয়ে বলল
 
— এগুলো সব আমার আম্মার। আইজ থেইকা এগুলা আপনের। যত্ন কইরা রাইখেন। তাড়াতাড়ি এগুলা পইড়া আহেন ওই ঘরে। 
 
বলেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো। তনুর চোখে জল ভীড় করেছে। অনুভুতি রা জেকে ধরেছে তাকে। তাড়াতাড়ি কানের দুল পড়ে নিলো। শূন্যে তাকিয়ে বিরবির করল
 
— আম্মু তোমার তনু বিয়ে তার জীবনের নতুন সূচনা করতে চলেছে দোয়া করো। আর কখনো ফিরবো না তোমাদের কাছে। 
 
—০— 
 
হাওলাদার বাড়ির পরিত্যক্ত দোচালা টিনের ঘরে গুটি কয়েক মানুষের অস্তিত্ব। একপাশে চেয়ারে বসে আছেন গ্ৰাম প্রধান এবং কাজি আরো কয়েকজন মুরুব্বি। আর শেখর। অন্য পাশে মেঝেতে পাটির উপর বসে আছে তনু আর আমেনার মা। রোজিনা অদূরে দাঁড়িয়ে মুখ বাকালো। মাত্রই তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। সামান্য মিষ্টি মুখ করে নিলো সবাই। অতঃপর ঘর ছেড়ে সবাই চলে গেলো। ঘরে শুধুমাত্র শেখর এবং তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী রুপসেনা মির্জা তনু। শেখর আস্তে করে পর্দা সরিয়ে দিল। নিজে গিয়ে তনুর পাশে বসলো। লজ্জা লাগছে ভীষণ। হঠাৎ করে কেমন বিয়ে হয়ে গেলো। দুটো মানুষের জীবন এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গেলো। কি করে সুখে রাখবে তনু কে!!
 
 
 
 
Loading spinner

Reply
Page 1 / 2
Share:

Loading spinner