পর্ব — ১০
সন্ধ্যা গড়াতেই ঝুম বর্ষণ নামল। ইদানীং ঝড়-বৃষ্টিরও মুড সুইং হয়। নয়তো শীতকালে আয়েশ বর্ষণ ফিরে আসে কেন? বিদায়ী মাঘের ভারী বর্ষণে ঠান্ডাটা আরও জেকে পড়ল সন্ধ্যাবেলায়। বারান্দায় বৃষ্টি দেখে, আনন্দে দুই চারটে লাফ-ঝাপ দিয়ে টিভি খুলে বসেছিল ইরা। রাফি সাধারণত আটটার দিকে পড়াতে আসে। সাতটা বাজতেই বই খুলে বসেছিল। ইরার উপর ওই লোকটা পাহাড়সম পড়ার বোঝা চাপিয়ে যায় প্রতিদিন! তবে এত সহজে পড়ায় মন বসবেনা ইরার। রাফি আসার একঘন্টা আগে পড়তে বসে সে। এই একঘন্টায় যতটুকু পড়া হবে ততটুকুই তার প্রিয় 'ছারকে' দিয়ে দেবে। বাকিটা ইরা নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগাবে। কিন্তু আচমকা বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দে দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে খুশিতে বাক-বাকুম করে ফিরে এলো সে। ঘন্টাধরে আজ পড়াশোনা করতে হবেনা ভেবে চকচক করে উঠল ভাসা ভাসা আঁখিযুগল। তড়িৎ গতিতে বই বন্ধ করে গিয়ে বসল টিভি খুলে। ইউটিউব খুলে সেখানে ছাড়ল 'বোলে চুড়িয়্যা' গানটা। আহ! হৃত্তিক রোশান! ইরার শ্রদ্ধাভাজন ছারটাও দেখতে একেবারে হৃত্তিক রোশানের কপি। শীতকাল বলে রুমের ফ্যান ছাড়তে হয়না। কিছুদিন পর যখন ফ্যান ছাড়বে তখন তার 'ছারের' কপালে স্টাইলিসভাবে পড়ে থাকা চুল গুলো উড়বে। হৃত্তিক রোশানের থেকে কোনো অংশে কম লাগবেনা। ভেবেই মুচকি হাসল ইরা। স্যারের কথা মনে আসতেই ইরাও গানের সঙ্গে তাল মেলালো,
— 'হায় হায় মে মারজাওয়া তেরে বিন..আব তো মেরি রাতে কাটটি.... '
পুরো সন্ধ্যাটা গান শুনে, ঘরময় নাচানাচি করে কাটাল ইরা। অবশ্য সে একা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ওর গোলুমোলু ভাইটাও এলো ঘুম জড়ানো চোখে। সে স্কুল থেকে ফিরে ঘুমিয়েছিল স্নিগ্ধ। সে-ও মাহিনের বয়সী। পঞ্চম শ্রনীতে অধ্যায়নরত। গানের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছে এবং সরাসরি এলো তিন তালার লিভিংরুমে। এবাড়ির ছেলেমেয়েদের রুম তিন তালায়। নীচ তালায় কাজের লোকেরা আর ড্রয়িংরুম, রান্নাঘর, স্টোররুম, খাওয়া-দাওয়ার সব কিছুর ব্যবস্থা সেখানে আর দোতালায় বাড়ির কর্তা-গিন্নিদের বসবাস। আর ওনাদের ছেলে মেয়েদের জন্য বরাদ্দ তিনতালা। তবে তিনতালায় সবচেয়ে সুন্দর ঘরটা হচ্ছে শুদ্ধর। সেখানে ওর রুমের সঙ্গে লাগোয়া একটা বিশাল ছাদ আছে। অবশ্য ওপেন বেলকনি বললেও ভুল হবেনা। ঘুমের চোটে স্নিগ্ধর এক চোখ বন্ধ হয়ে আছে। তারপরও বোনকে পাগলের মত নাচতে দেখে চোখ জোড়া খোলার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে যখন লাভ হলোনা তখন এক চোখ বন্ধ করে, আরেক চোখ দিয়ে বোনের পাগলামো দেখতে লাগল।
স্নিগ্ধকে দেখেই গাল টেনে, চুল এলোমেলো করে দিল ইরা। বলল, — ' নাচবি?'
মাথা নাড়িয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল স্নিগ্ধ। টিভিতে তখন শাহরুখ খানের মুভির গান চলছে। বোনের হাবভাব দেখে নিয়ে ঘুম জড়ানোস্বরে বলল,
— ' রাফিদ ভাইয়া আজ পড়াতে আসবেনা?'
বিরক্তিতে সোফার কুশন তুলে স্নিগ্ধর দিকে ছুঁড়ে দিল ইরা। নাচতে নাচতে বলল, — ' বাইরে কেমন বৃষ্টি হচ্ছে দেখছিস না? আজ ছার আসবেনা৷ আমার পড়াও লাগবেনা। মজা হি মজা... '
— ' ভাইয়ার পড়া করেছো আপু?' বোনকে অমন আয়েশী ভঙ্গিতে নাচতে দেখে জিজ্ঞেস করল স্নিগ্ধ। কারণ রাফির কাছে আরও এক বছর আগে থেকে পড়ে স্নিগ্ধ। অন্ততঃ এতটুকু জানে সেই বান্দা বৃষ্টিতে থেমে যাবার মত নয়।
— ' নাহ। আজ আমার ছুটি,ও ভাই.. আজ আমাদের ছুটি। পড়াশোনা করবনা। '
— ' ভাইয়া যদি চলে আসে? '
— ' চুপ কর বেয়াদব। আমার ছার আজ আসবেনা। এত বৃষ্টি, এত শীতে কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়? হু? ছারের কি ফিলিংস নেই? '
— ' নাচ বন্ধ করে পড়তে বসো আপু। ভাইয়া কিন্তু পড়ানো মিস করেনা। ' রহসয়ময় হেসে বোনকে কিছুটা সাবধান করল স্নিগ্ধ। হাজার হোক ইরা তার বড় বোন। রাফিদ ভাইয়ের মেজাজের পদতলে পিষ্ট হতে দিতে পারেনা সে। তবে স্নিগ্ধর সর্কতবার্তা কানে তুললনা ইরা। বরং চোখ পাকিয়ে ধমকাল স্নিগ্ধকে, — ' এই আমার চোখের সামনে থেকে যা বেয়াদব...' স্নিগ্ধকে ধমকে ফের নাচে মনোযোগ দিল ইরা। বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি। এর মধ্যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ বাইরে বের হয়না। আর ওর পরম শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা স্যারের মস্তিষ্ক একদম সুস্থ-সবল বলেই জানে ইরা।
ইরার ভুল ধারণা ভাঙল কয়েক মুহুর্তে। টিভিতে সে একটা আইটেম সং চালিয়েছে। ওড়নাটা শাড়ির মত করে জড়িয়ে দেশিগার্ল প্রিয়াঙ্কা চোপড়া সাজল। সোফার ওপর উঠে শুরু করল প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত নাচ। গানের তালে তাল মিলিয়ে নাচতে নাচতে আচমকাই থেমে গেল ইরা। তিনতালার সিড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাফি। অস্বস্তি নিয়ে দরজায় টোকা দিল কয়েকবার। ক্ষীণকন্ঠে ডাকল, — ' ইরা?'
রাফির কন্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌছাতেই তড়াক করে সোফা থেকে নামতে যেয়ে ওড়নায় বেঁধে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ইরা। ব্যথাও পেল।
ইরাকে পড়ে যেতে দেখে স্নিগ্ধ আর রাফি একসঙ্গে ছুটে এলো। কনুই, হাঁটুতে ভালোয় ব্যথা পেয়েছে ইরা। ইরাকে পড়তে দেখে স্নিগ্ধর ঘুম ছুটে গেল।
— ' আপু! আর্তনাদ করে স্নিগ্ধই টেনে তুলল বোনকে। ইরাকে পড়তে দেখে রাফিও ছুটে এলো। সে স্পষ্টতই বিরক্ত! এই মেয়ে এমন লাফাচ্ছিল কেন? রাফি কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে ইরাকে দেখে নিয়ে বলল, — ' ব্যথা পেয়েছো? '
ইরার হাল তখন বেহাল। কপালের এক কোনে ফুলে ওঠেছে৷ টেবিলের কাঁচে কনুইয়ে গুঁতো খেয়ে ছিলে গেছে জায়গাটা। আর এর মধ্যে রাফির ঢংয়ের ব্যথা পেয়েছো শুনে নাক সিটকাল ইরা। সিটকে বলল, — ' না ছার। পড়ে গেলে ব্যথা লাগেনা। আরাম লাগে। '
ব্যথা নিয়েও চটাং চটাং মুখ ঠিকই চলে! রাফিকে সালাম দিয়ে বোনকে আগলে ধরল স্নিগ্ধ। অভিযোগের সূরে বলল, — ' আরো লাফাও সোফায় ওঠে? আমি আম্মুকে ডাকছি এক্ষুনি। ' বলেই সে দৌড়ে নিচে চলে গেল। ঠোঁট ফুলিয়ে আহ্লাদী ইরাকে দেখল রাফি। নাক-মুখ কুচকে রেখেছে। ভালোয় হয়েছে। এত চঞ্চল মেয়ের সঙ্গে এমনই হওয়া উচিত। অথচ ইরাকে পড়তে দেখে ওর বুকের ভেতরও যে মুচড়ে ওঠেছে সেটা ওর অভিব্যক্তিতে এতটুকুও বোঝার উপায় নেই।
— ' যা-ও পড়তে বসো। অতটুকু ব্যথা পেলে কিছু হয়না। ' বলেই মাথাটা যথাসম্ভব নিচু করে পড়ার ঘরের দিকে এগোলো রাফি। ততক্ষণে আবার ফিরে এসেছে স্নিগ্ধ। হাতে আইস-কেস। আইস কিউব নিয়ে কনুইয়ে চেপে ধরে খ্যাকখ্যাক করে হাসল স্নিগ্ধ। বলল, — ' এটা রাফিদ ভাইয়া। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি-ঠান্ডা কোনো কিছুতেই পড়াতে আসা মিস দেয় না। যাও পড়তে বসো। আসার আগে ভাইয়া নিচে আম্মুর কাছে একটা লাঠি চেয়ে এসেছে। আজ তোমার খবর আছে আপু। '
স্নিগ্ধর হাসিতে মেজাজ খারাপ হলেও ভেতরর ভেতরে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল ইরা। আজ ওর একটা পড়াও হয়নি! এই জাঁদরেল স্যারের মাইরের হাত থেকে ওর বাঁচবে না আজ!
— 'সেভেন-এইট জার ইকুয়াল? ' বলেই রাফি এক পলক তাকাল ইরার দিকে। কপালে সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকা চুল গুলোকে কলমে পেঁচিয়ে সে একধ্যানে চেয়ে আছে রাফির দিকে। ভ্রু উঁচিয়ে বলল, — ' কত হয়?'
ইরা দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরল। তারপর খানিকটা ঠোঁট উলটে জানতে চাইল — ' কিসে কত হয় ছার? '
ঠান্ডা একটা চাহনি দিয়ে ইরার কার্যকালাপ দেখছিল রাফি। রুক্ষভাবে বলল, — ' সাত গুণ আট হলে কত হয়?'
— ' বিয়াল্লিশ হয় ছার। '
— ' বিয়াল্লিশ?'
— ' জী ছার। '
ফের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল রাফি, — ' কালকের পড়া করোনি কেন ইরা?'
তীব্র অসন্তোষ নিয়ে গমগমে গলায় জবাব দিল ইরা, — ' আপনি এই ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পড়াতে এসেছেন কেন ছার? ঝড়-বৃষ্টির দিনে কেউ পড়ে? '
— ' আচ্ছা? তো ঝড়-বৃষ্টির দিনে কি করে? আইটেম সং চালিয়ে সোফায় উঠে নাচে? '
ইশ রাফি ওকে নাচতে দেখে ফেলেছে ভেবে লজ্জা পেল ইরা। আলগোছে রাফির সামনে থেকে বই টেনে নিল। নিয়ে আইসিটি বই সামনে রেখে বলল,
— ' ওই সাবজেক্ট আজ থাক ছার। সব পড়া কাল করে রাখব। আজ আইসিটি পড়ব।'
— ' ওকে। কাল পড়া না হলে লাঠির বাড়ি পড়বে।'
বলেই আইসিটি বইয়ের তৃতীয় অধ্যায় থেকে ইরার খাতায় প্রশ্ন লিখতে আরম্ভ করল রাফি।
— ' What is HTML? '
ইংরেজিতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে খাতাটা টেবিলের ওপাশে বসা ইরার দিকে এগিয়ে দিল রাফি। যার অর্থ এখন তাকে উত্তর লিখে দিতে হবে৷ খাতাটা হাতে নেয়ার মুহুর্ত থেকে ছন্দহীনভাবে পলক ঝাপ্টাচ্ছে ইরা! কারণটাও রাফি জানে। গতকাল পড়া করিয়ে গেলেও এই মেয়ে বইখাতা ছুঁয়েও দেখেনি। আইসিটির ম্যাথ করতে দিয়েছিল সেটাও করেনি। এত ফাঁকিবাজ মেয়েকে পড়াতে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে গিয়ে ঠেকছে ওর। ইরার দিকে খেয়াল নেই এমন ভঙ্গিতে আইসিটি বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে রাফি।
বেশ কিছুক্ষণ কলম কামড়ে চিন্তাভাবনা করে প্রশ্নটার উত্তর লিখল ইরা। ঘষ ঘষ শব্দ কলম চালিয়ে অনেক কিছু লিখল বোধহয়। খাতাটা এগিয়ে দিল রাফির দিকে।
বইয়ের পাতা থেকে নজর উঠিয়ে খাতায় নজর পড়তেই চমকাল রাফি। প্রবল আত্নসংযমে হাসি চাপল। চেপে গম্ভীরকন্ঠে বলল, — ' এটা কি লিখছো?'
ওই ভাসা ভাসা চোখে বিষ্ময় নিয়ে রাফির দিকেই চেয়ে আছে ইরা। আজ তার পরণে কালো সালোয়ার-কামিজ। যার সাদা ওড়নাটা গলায় দুই প্যাচ দিয়ে সামনে ঝুলিয়ে রাখা। লম্বা চুলে খোঁপা বেঁধে রাখলেও সামনে কিছু চুল বের করে রেখেছে। সাজগোজও কমতি না থাকলেও পড়াশোনার ব্যপারে সে বেখেয়াল।
রাফির কন্ঠের শীতলতা অনুভব করে ছোট্ট করে ঢোক গিলল ইরা। যথাসম্ভব কন্ঠটা খাদে নামিয়ে বলল, — ' হয়নি ছার?'
— ' তুমি বলো? কাল পড়িয়েছিলাম না? '
— ' জী ছার। কাল এই চ্যাপ্টার পড়িয়েছিলেন। '
— ' তবে?'
— 'তবে কি ছার? হয়নি?'
— ' HTML মানে HoT MaiL? '
ঠোঁট টিপে হাসল ইরা। হেসে বলল, — ' আপনি যেটা পড়িয়েছিলেন ওটা মনে নেই ছার। দেখুন আমি ঠিকই মিলিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করে ফেললাম ছার।'
একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে খাতাটা টেনে নিল রাফি। নিয়ে বলল, — ' হট মেইল জিনিসটা কি সেটাও বলে দেন বিজ্ঞানী ইরা?'
— ' হট মেইল হলো সেসব মেইল যেগুলা নায়ক নায়িকা পাঠায় ছার। '
ইরার কথাটা বলতে দেরি, রাফির বিষম খেতে এক মুহুর্ত দেরি হলোনা! নিজেকে সামলে আইসিটি বইটা এগিয়ে দিল। বেশ কঠোরভাবে বলল, — ' পড়াশোনার ইচ্ছে না থাকলে বলে দাও ইরা। আমি কাল থেকে আসব না। শুদ্ধকেও জানিয়ে দেব আমি। একদিনও পড়া করোনা। এভাবে তো চলতে পারেনা তাইনা?'
রাফি রেগে গিয়েছে বুঝে মিনমিনে কন্ঠে আওড়ালো ইরা, — ' স্যরি ছার। '
আর ঠিক সেই মুহুর্তে খাতাটা রোল করে ইরার মাথার উপর বাড়ি দিয়ে ফেলল রাফি। তামাটে বর্ণের চেহারাটা কেমন লালচে হয়ে গেল। কপালের শিরা টনটন করে উঠল ওর। নিজেকে প্রবলভাবে সামলে নিয়ে বলল, — ' তোমাকে পড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ' বলেই টেবিলের উপর রাখা রাফির ওয়ালেট আর মোবাইলটা উঠিয়ে বেরিয়ে গেল রাফি। সে সত্যিই ভীষণ রেগে গিয়েছে। ইরার প্রতি তার অনুভূতি থাকলেও পড়াশোনার ব্যপারে শুদ্ধ ওকে ভরসা করে বলেই দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু অমন খামখেয়ালি মেয়ের কারণে শুদ্ধর সঙ্গে বন্ধুত্বে দুরত্ব আনতে চায়না সে।
-------------
কেয়া তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভঙ্গিতে। অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে তাকাল থাকল ওর সম্মুখে দাঁড়ানো যুবকের পানে। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে সেও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন খানিক আগের তার কণ্ঠনিঃসৃত বাক্য হতে সে একেবারেই অজ্ঞ। তার ক্ষুরধার দৃষ্টি খেলা করছে কেয়ার আনন জুড়ে। সম্বিত ফিরল কেয়ার। অবিশ্বাসী কন্ঠে আওড়াল, — ' স্বামী!'
মাহাদ এগিয়ে এলো। কদম থমকাল কেয়ার সম্মুখে। কন্ঠটা যথেষ্ট খাদে নামিয়ে বলল,
— ' আপনার পাতানো স্বামীর কথা ভুলে গিয়েছেন কেয়া আপু? কলেজে 'ড্রেস এজ ইউ লাইক ' প্রতিযোগিতায় আমরা গ্রামের জামাই-বউ সেজেছিলাম। লং টাইম রাইট? '
জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করল কেয়া। উচ্চমাধ্যমিকে ওদের কলেজের প্রোগ্রামে কেয়া ওর মায়ের লাল শাড়ি পরে গিয়েছিল কলেজে। আর মাহাদ এসেছিল সাদা পাঞ্জাবি পরে। বন্ধুদের জোরাজুরিতে দুজনই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিযোগিতায়। এমনকি জিতেও গিয়েছিল! দুজনকে একটা করে সিরামিক্সের প্লেট পেয়েছিল। ঘটনাটা প্রায় দশ বছর আগে। অথচ তারা স্মৃতিতে অমলিন। জোর করে হাসল কেয়া। হেসে বলল,
— ' আজ আসি মাহাদ।' বলেই ফের হাঁটার পথ ধরল কেয়া। আকাশের অবস্থা ভালো না। বৃষ্টি নামতে পারে।
কেয়া চলে যেতেই গাড়িতে যেয়ে বসল মাহাদ।পকেট থেকে ফোন বের করে কয়েকবার চেপে কল করল কাউকে। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই বলল, — ' আমি ছবি পাঠাচ্ছি। কালকের মধ্যে তার সমস্ত ডিটেইলস আমার চায়। '
ফোন কেটে শান্ত দৃষ্টিতে কেয়ার ঝাপসা হয়ে যাওয়া অবয়বের দিকে চেয়ে থাকল মাহাদ।
---------
রিমঝিমের ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। চোখ খুলতেই শুকনো ঢোক গিলল। গিলে বাইরে তাকাল। ঝকঝকে রোদ উঠেছে আকাশে।ক'টা বাজে? বেশি দেরি হয়ে গেল নাকি? ওর বিছানা বরাবর দেয়ালে বড় দেয়াল ঘড়িটা জানান দিচ্ছে প্রায় নয়টা বাজে। আজ ভার্সিটিতে না গেলে হবেনা। মিডটার্মের জন্য বেশ কিছু ইম্পোর্টেন্ট ক্লাস আছে। বিগত তিন দিন যাবত একপ্রকার ঘরবন্দি হয়ে আছে রিমঝিম। অবশ্য না থেকে উপায় নেই। সে জানে বাইরে বের হওয়া মাত্র ওই গুন্ডাটা ওর পিছু নেবে। ভেজা মাটিতে মাখামাখি বোকা বোকা চেহারাটা ভাসল মানস্পটে। এত সহজে সে তো রিমঝিমকে ছেড়ে দেবে না এই ভয়ে বাড়ি থেকেই বেরোয় না রিমঝিম। তখনই দরজায় কড়া নাড়লেন শিরিন। একরাশ মিষ্টি হাসি নিয়ে রিমঝিমকে ডাকতে এসেছেন তিনি। তিনি এসেই বারান্দার দরজা খুলে দিলেন৷ জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই আলোয় ঝলমল করে উঠল গোটা ঘর। স্নেহময় কণ্ঠে বললেন, — অনেক ঘুম হয়েছে মা। এবার ওঠ? '
— ' উঠেই যাচ্ছিলাম চাচি। ' বলেই বিছানা থেকে উঠল রিমঝিম। আর উঠেই কোনো অদৃশ্য জাদুবলে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়। সেদিনের পর থেকে কারণে-অকারণে বারান্দায় আসে রিমঝিম। হাজার হোক মা তো! তাকে একঝলক দেখতে চায় রিমঝিম। তবে সেদিনের পর মাকে দেখেনি রিমঝিম। অসন্তোষের একটা ছায়া পড়ল ওর শ্যামবর্ণ আননে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফিরে এলো বারান্দা থেকে।এই বাসায় এসেছে প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেল। সেই মহিলা কি জানে না রিমঝিম তার কতটা কাছে? কেন নেই ওর প্রতি মমত্ববোধ সেই মহিলার? এত ব্যস্ততা নতুন সংসারে? রিমঝিম তো তার নাড়ি-ছেড়া ধন! কেন এতটা পাষাণ সেই মহিলা? ভাসা ভাসা চোখ জোড়া ছলছল হলো। বারান্দা থেকে ফিরে এসে বসল পড়ার টেবিলে। বই গুছিয়ে নিয়ে শুরু করল। ওদিকে শিরিন তার রুম গুছিয়ে দিচ্ছে। কম্বল ভাঁজ করতে করতে রিমঝিমকে উদেশ্য করে বলল, — ' হ্যাঁ রে রিমঝিম? বাড়িওয়ালাকে দেখেছিস তুই? '
ঝট করে চাচীর দিকে ফিরল রিমঝিম। চাচী কি কিছুই জানেনা?
—' না। ' ব্যস্ত ভঙ্গিতে ব্যাগে বই ওঠাতে থাকে রিমঝিম।
— ' ভাবছি আজ যাব ওদের বাড়িতে। কতদিন হয়ে গেল। কাউকেই দেখলাম না। '
— ' ওনারা বোধহয় আমাদের সঙ্গে মিশতে চান না চাচী। ইচ্ছে থাকলে এতদিনে ঠিকই খবর নিত? তাছাড়া বিত্তশালী লোকজন থেকে দূরে থাকায় ভালো। ' শেষের কথাটুকু বলে বিষন্ন হাসল রিমঝিম।
শিরিন অবশ্য ওর কথায় পাত্তা দিলেন না। বরং হঠাৎ কিছু মনে পড়ার মত করে বললেন,
— ' জলপাইয়ের আচার দিয়েছিলাম। বোয়াম গুলো একটু ছাদে রেখে আয় তো মা। আমার কোমরে ব্যথা। নইলে আমি-ই যেতাম। '
চাচীর বলতে দেরি গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রিমঝিমের যেতে দেরি হলোনা। টেবিলে রাখা বোয়াম গুলো উঠিয়ে নিয়ে বলল, — ' এইতো ছাদে গেলাম চাচী।'
ত্রস্তপায়ে ছাদে উঠে এলো রিমঝিম। এসেই মনটা আর-ও ভালো হয়ে গেল৷ এত সুন্দর ছাদ! শীতকালীন ফুল দিয়ে ছাদটা এত সুন্দর করে সাজানো! চোখ ফেরাতে পারল না রিমঝিম। আচার গুলো রেখে ছাদের একপাশে বড় শিউলি ফুল গাছের দিকে গেল। ঝরা শিউলির মোহনীয় ঘ্রাণ টেনে চোখ বুজে ফেলল। কয়েকটা উঠিয়ে নিয়ে ছাদের দরজার কাছে যেতেই ধ্বক করে উঠল রিমঝিমের বক্ষপিঞ্জর। দরজা লক হয়ে গিয়েছে। খুলছেনা কেন? বেশ জোরে টানাটানি শুরু করল রিমঝিম। তবে বৃথা গেল সে প্রচেষ্টা। কেউ সম্ভবত ইচ্ছে করে দরজটা লাগিয়ে দিয়েছে ভাবনাটা মাথায় আসতেই ঝট করে উলটো দিকে ফিরল রিমঝিম। আর ফিরতেই হাতের মুঠোয় থাকা শিউলি ফুল গুলো লুটিয়ে পড়ল ওর পায়ের কাছে। এত জোরে ধুকপুক করা শুরু করল ওর হৃদযন্ত্রটা যেন ও নিজেই শুনতে পেল৷ সেই গুন্ডাটা এসে দাঁড়িয়েছে। রেলিং-এ হেলান দিয়ে, বুকে হাত বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে একটা ছাইরঙা টিশার্ট, কালো ট্রাউজার যার দপাশে সাদা বর্ডার লাইন টানা, পায়ে জুতো। ফুলে থাকা বাহুর পেশী দেখে ঢোক গিলল রিমঝিম। এই হাত দিয়ে ওকে যদি তুলে ছাদ থেকে ফেলে দেয়! ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা রিমঝিম শুদ্ধকে উদেশ্য করে মিনমিনে কন্ঠে বলল, — ' আমাকে যেতে দিন। '
কথাটা বলতেই শুদ্ধ লম্বা লম্বা পা ফেলে এসে থামল রিমঝিমের সামনে। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
— ' সালাম দাও? '
— ' জী?'
— বাংলা জানো না? বড়দের দেখলে সালাম দিতে হয় জানোনা? এক্ষুনি সালাম দাও।'
রিমঝিমের কন্ঠে রাগ ঝরে পড়ল, — ' কাকে সালাম দেব?'
— ' বড়দের মুখে মুখে তর্ক করা? এই ভদ্রতা শিখিয়েছেন তোমার পেয়ারের চাচী? '
— ' দেখুন?'
আরও একটু রিমঝিমের দিকে ঝুঁকে এলো শুদ্ধ। বলল, — ' দেখানোও শিখিয়েছেন নাকি? ওই মহিলাকে দিয়ে সবই সম্ভব। '
— ' আমাকে যেতে দিন। '
— ' একদম বেয়াদব বানিয়েছে তোমার চাচী তোমাকে। আমাকেই মানুষ বানাতে হবে এখন। '
— ' আপনি কি সকাল সকাল নেশাপানি করেছেন? চাবি দিন। নয়তো আমি চেঁচাব। '
রিমঝিমের কথাকে সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করে ফের কড়াস্বরে শুদ্ধ বলল, — ' সালাম দাও বেয়াদব মেয়ে। '
— ' আপনি বেয়াদব।'
— ' আবার মুখে-মুখে কথা বলে? সালাম না দিলে চাবি দেয়া হবেনা। বেয়াদবি একদম ছুটিয়ে দেব তোমার। বেয়ারা মেয়ে। দাও। আমাকে সালাম দাও। ' শেষের কথা টুকু এতটাই ধমকে বলল শুদ্ধ কেঁপে উঠল রিমঝিম। তবে দমে গেল না মোটেও। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
— ' শয়তানদের কেউ সালাম দেয়?'
চলবে.....?