Golpo:Kache Asha Ba...
 
Notifications
Clear all

Golpo:Kache Asha Baron(Writer:Humaira Murtaza)

Page 1 / 2

Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago

গল্প: কাছে আসা বারণ (kache asha baron)

Writer:Humaira Murtaza

 

এখন থেকে এইখানে বাকি সব গুলো পর্ব পোস্ট করা হবে,

 

আর আগের পর্ব গুলো যাদের পড়া হয় নি তাদের জন্য সবগুলো পর্বের লিংক দেওয়া হয়েছে নিচে।

গল্পের:Links

 

Loading spinner

Reply
6 Replies
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
আগের পর্ব গুলোর লিঙ্ক উপরে দেওয়া আছে,
 
  
পর্ব— ৮
 
কেয়া বাড়ি ফিরল বেশ দেরিতে। এসে দেখল ডাইনিং টেবিলে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসা রাফি আর ওর মা। বহুদিনের পুরোনো সাবেকি আমলের কাঠের ডাইনিং টেবিলে দৃশ্যটা দেখে ফের ঝাপসা হল ওর আঁখিযুগল। তিতিরকে রাফি কোলে বসিয়ে রেখেছে আর চামচ দিয়ে ফরিদা বেগম ওকে সুজি খাইয়ে দিচ্ছেন পরম মমতায়। চিনির অভাবে বাচ্চাটা না খেয়ে ছিল উপলব্ধিটা উনিও করেছিলেন বোধহয়। বাচ্চা মেয়েটা পা দুটো উঠিয়ে দিয়েছে নানুমনির কোলের উপর। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল কেয়া। খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে তিতিরের মাথা আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে দিচ্ছিল রাফি। ভাগ্নিকে আদুরে কন্ঠে বলল,
 — ' তিতিরপাখি জলদি খেয়ে না-ও। তাহলে মামা তোমাকে গিফট দেবে। ' 
খাওয়া থামিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে মামার দিকে চাইল তিতির। বড় বড় চোখ করে জানতে চাইল, 
— ' তে..বিবিয়ার দিবা মাম্মা?' 
— 'তে..বিবিয়ার!' মায়ের দিকে জিজ্ঞাসাসূচক নজরে চাইল রাফি। কারণ তিতিরপাখির চাইনিজ ভাষা সে একটুও বোঝেনি।
 ফরিদার হাত থেমে নেই। স্টিলের গোল চামচ দিয়ে তিতিরকে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন,
 — ' পান্ডার কথা বলছে? ' 
— ' পান্তা না.. তেবি বিয়ার.. ' মুখের খাবারটুকু গিলে নিয়ে প্রতিবাদ করল তিতির৷ এবারে রাফিও বুঝল। এই তেবি বিয়ার আসলে টেডিবিয়ার। সে-ও তাল মিলিয়ে মাকে মেকী ধমকাল, 
— ' নানুমনি কিচ্ছু জানেনা। তাইনা তিতিরপাখি? আমরা আজই তেবিবিয়ার কিনতে যাব। খাওয়া শেষ করো। '
— ' ছত্তি?' 
— ' সত্যি। এবার জলদি ফিনিশ করো৷ তোমার পঁচা মাম্মাম এলে আবার মারবে।' 
ঠোঁট উল্টাল তিতির। বলল,— ' মাম্মাম ভায়ো। তুমি পতা মাম্মা।' 
হেসে ফেলল রাফি। সেই দুমাস বয়স থেকে তিতির ওদের সঙ্গে থাকে। প্রথমদিকে সারারাত কাঁদত মেয়েটা। কলিক বাচ্চা ছিল সে। একটুও ঘুমোতে দিত না কেয়াকে। মেয়ের সঙ্গে কেয়াও কাঁদত। একদিকে কেয়া আরেকদিকে তিতির! কাকে সামলাবে রাফি? অবশ্য রাফি বোনকে একটু কম আগলে তিতিরকে বুকে জড়িয়ে নিত। আর অমনি তিতিরের কান্নাকাটি বন্ধ হয়ে যেত। শুধু খাওয়ার সময়টা কেয়ার কাছে গেলে, পেট ভরে গেলে ফের কান্নাকাটি জুড়ত তিতির। তখন রাফি ওকে বুকে নিয়ে দোতালার টানা বারান্দায় হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়িয়ে দিত। কিছুটা বড় হবার পর তিতির যখন আধো আধো বুলিতে কথা শিখল তখন রাফি কতকরে 'মামা' ডাক শেখাতে চাইল! কিন্তু সেই ছোট থেকে তিতির ওকে মাম্মা বলে ডাকে। এখন তো রাফির নিজেরও মাম্মা ডাক ছাড়া অন্যকিছু ভালো লাগেনা। মামারা তো মায়ের চেয়েও আপন হয়। এইজন্যই তাদের দুবার মা বলে সম্বোধন করা হয় তাইনা? 
 
তিতিরের খাওয়া শেষ হতেই সটকে পড়ল তিতির।মোচড়ামুচড়ি করে সে নেমে পড়ল মামার কোল থেকে। মাথা নাড়িয়ে বলল,— 'পেত ভলে গেতে নানু।' বলেই সে ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেল ওখান থেকে। 
 ভরা পেটে সে এখন চিল মুডে আছে। টিভিতে কিছু একটা দেখছিল। প্রশান্তি নিয়ে ভাগ্নিকে দেখছিল রাফি। বাচ্চাটার জন্য হলেও আজ থেকে দু'ঘন্টা বেশি পড়বে রাফি। একটা চাকরি তার অবশ্যই নিতে হবে। মেয়েটাকে অমন হাসি-খুশি দেখে ফরিদাকে উদেশ্যে করে রাফি কঠিনস্বরে বলল, 
— ' ওর সুজির চিনি আলাদাভাবে রেখে দেবে মা। ফুরানোর আগে আমাকে জানাবে। মেয়েটাকে যেন আমি কষ্ট দিতে না দেখি আর। তোমার মেয়েটা? সে কোথায়? তিতিরকে না খাইয়ে রাখছে কেন? আমি কি ম রে গিয়েছি? হুম? আমি নতুন একটা টিউশনি পেয়েছি। ক'টা দিন সবুর করো৷ অভাব-অনটন আল্লাহ মিটিয়ে দেবেন। তুমি দোয়া করো আমার জন্য। ' 
 
রাফির কথা শেষ হতেই তখন ঘরে প্রবেশ করল কেয়া। ভীষণ শুকনো মুখে এগিয়ে এলো। দীর্ঘদিনের অযত্নে গায়ের রঙ ফিকে হয়েছে ওর। চোখের নিচে একপোচ কালি, ভাঙা চোয়াল আর তীব্র বিষাদ লেপ্টে থাকা মুখশ্রীতে জমা হয়েছে অলিখিত শতশত অভিযোগ। অনেক সময় নিয়ে কান্নাকাটিতে নাক লাল হয়ে আছে। চোখের পাতাও ফুলে গিয়েছে ওর। বোনের মুখটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল রাফি। বুঝতে বাকি নেই কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। বোনের দিকে শান্ত এবং শীতল দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে পলেস্তারা খসে পড়া সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে যেতে যেতে বলল,— 'তিতিরকে তৈরী করে দাও আপু।' 
 
তখন রাফির সঙ্গে বাইরে গিয়ে একটা গোলাপি টেডিবিয়ার, গোলাপি কিচেন সেট আর একটা বড় বল কিনে এনেছে তিতির।ওকে দিয়েই ফের বেরিয়ে গিয়েছে রাফি। সেগুলা নিয়েই বিছানায় বসে খেলছিল আপন মনে বাচ্চাটা৷ রান্নাবান্না করে টেডিবিয়ারকে খাওয়াচ্ছে৷ কখনো বল নিয়ে খেলছে। মেয়ের দিকে অনুভুতিশূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কেয়া। ঠান্ডা পড়ছে আবার। মেয়েটার পা খালি। ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে পা জোড়া। ঠিক কেয়ার মত। কাল কেয়া মেয়ের জন্য দু জোড়া মোজা কেনার মত করে কাজ করবে.... ওর রুমের সঙ্গে একটা বারান্দা আছে। বাহিরে হিম-শীতল পরিবেশ হওয়া সত্ত্বেও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল কেয়া। ওদের বাড়ির সামনের দিকে একটা কালো গাড়ি থেমে আছে। গাড়িটার কাঁচ উপরে তোলা। অন্ধকারে কাঁচের ওপাশে দেখা যাচ্ছেনা। নিগূঢ়তম নজরে চেয়ে রইল সেদিকে কেয়া। কে আছে সেখানে? 
 
------------- 
 
রাফি গোপনে তপ্তশ্বাস ফেলল। ফেলে টেবিলে ওয়ালেট এবং মোবাইল রাখা ছিল। সেখান থেকে মোবাইল উঠিয়ে ব্যস্তহাতে শুদ্ধর নাম্বার বের করে ডায়াল করতে করতে বলল, — ' তুমি বরং শুদ্ধর সঙ্গে কথা বলে ইংরেজিটা জেনে নাও ইরা।'  
টেবিলের ওপাশে ইরার মুখটা শুকিয়ে গেল তৎক্ষনাত। ভয়ের একটা ছাপ পড়ল তার আদুরে আননে। ভাসা ভাসা চোখে রাগ নিয়ে তাকাল রাফির দিকে। ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,— ' মজা করছিলাম ছার।' 
— ' আবার মজা করতে ইচ্ছে হলে আগেভাগে জানিও। শুদ্ধকে কল করে একসঙ্গে শুনব, কেমন? বই বের করো। পড়া বাদে অন্য কোনো বিষয়ে আমি যেন একটা কথাও না শুনি। বুঝেছেন? ' বেশ শক্ত কন্ঠে আওড়ায় রাফি। সে নিজেকে যতই শেয়াল মনে করুক তবুও বন্ধুত্বের খাতিরে নিজেকে সংযত রাখবে সে। তার ইরাবতীর যোগ্য হয়ে ওঠা অব্দি নিজের অনুভুতি লুকিয়ে রাখবে। আর যদি যোগ্য না হয়! মাঝেমাঝে আমাদের জীবনে যদি নামক শব্দটা খুব কঠিন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। মাথাটা নিচু করে বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে রাফি। 
 
— ' জ্বি ছার। ' বলেই বিড়বিড়িয়ে ইরা ফের বলল, — ' সিনেমার হিরো সামনে থাকলে কোনোদিন পড়ালেখা করা যাই?' কথাগুলো শুনল ঠিকই কিন্তু না শোনার ভান করে পড়ানো শুরু করল। ভালোভাবে বোধহয় দশমিনিট মত পড়িয়েছে রাফি। তখনই এলেন সুমনা। চা-নাস্তা এনেছেন। টেবিলে রেখে রাফিকে উদেশ্যে করে বললেন,
— ' স্টুডেন্ট কেমন পড়ছে বাবা? '
— ' ফাঁকিবাজ, মহাফাঁকিবাজ। ' সালাম দিয়ে সুমনার উদেশ্যে বলল রাফিন।
মৃদু হাসলেন সুমনা।বললেন, — ' শুদ্ধই তোমার কথা জানাল আমাকে। একটু ধরে ধরে পড়িও। নয়তো এবছর আর পাশ করতে পারবেনা। ' 
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী কন্ঠে আওড়ায় ইরা, 
— ' আমার পড়তে ইচ্ছে করেনা আম্মু। '
— ' না পড়লে বিয়ে দিই? ' মেয়েকে বললেন সুমনা। 
— ' দাও। ' 
সবেই চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছিল রাফি৷ বিষম খেল মুহুর্তে। নাক-তালুতে উঠে গেল চা। ইরাও হড়বড়িয়ে বলল,— ' ষাট, সত্তর, আশি। ঠিক হয়ে যা কাশি। ' 
 অদ্ভুত দৃষ্টিতে ইরাকে দেখে নিয়ে হেসে ফেলল। রাফি৷ হাসলেন সুমনাও। কাপটা রেখে বলল,
 — ' আমার খোঁজে একজন পাত্র আছে আন্টি। আমাদের গলিতে বাড়ি। ছেলে পাইলট৷ বাংলার উড়োজাহাজ চালায়। ' 
— ' বাংলার উড়োজাহাজ কি স্যার?' 
স্যার শব্দটা কানে বাজল রাফির। এতক্ষন ওকে ছার সম্বোধন করে মায়ের সামনে স্যার বলছে বিচ্ছু মেয়েটা। হাসিটা আটকে বলল,— ' যেটাতে চড়ে তুমি কলেজে যাও। ' 
ভাসা ভাসা চোখ জোড়া বিস্ময়ে ফেটে যাবার উপক্রম হল ইরার৷ মানে রাফি ওকে রিক্সাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছে! হাসলেন সুমনাও। মেয়েকে কড়াকড়ি করে যেতে যেতে বললেন, 
— ' চুপচাপ পড়ো। ভাইয়াকে বিরক্ত করবে না। ' 
মায়ের প্রস্থানে সাহস বাড়ল তরুনীর। মুখ বাঁকিয়ে বলল,— ' আপনার কামের বেটিদের সঙ্গে বিয়ে হবে ছার। ' 
— ' হলে আমার হবে। তোমার কি? বই বের করো।' 
একটা ভেংচি টেন্সের তিন প্রকার লেখায় মনোযোগ দিল ইরা। তার আগে বিড়বিড়িয়ে বলল, — ' খবিশ। ' 
 
-------------- 
 
রিমঝিম বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হাতে একটা গল্পের বই। উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল তার মাকে দেখা যায় কি না? তবে মাকে দেখল না। কিন্তু তখনকার ধাক্কা লাগা মেয়েটা পা টিপে টিপে খোলা ছাদে এলো। এতক্ষণ উজ্জ্বল আলোয় ছাদটা আলোকিত হয়ে থাকলেও মেয়েটা এসেই বাতিটা নিভিয়ে দিল তবুও ঘরের ভেতর থেকে আসা আবছা আলোয় মেয়েটার সাদা জ্যাকেট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পা টিপে টিপে ফুলের টবের কাছে এগিয়ে গেল সে। কুয়াশায় ভেজা মাটি উঠিয়ে নিয়ে গোল করল। তারপর রেলিংয়ের ধারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল৷ কৌতুহল নিয়ে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষন করতে থাকে রিমঝিম। এই আধাপাগল মেয়েটা কি করবে? ঠিক তখনই দেখল গেট দিয়ে একটা ছেলে বেরোচ্ছে। আর বুঝতে কিছু বাকি রইল না রিমঝিমের। ঠোঁট টিপে হাসল রিমঝিম। ঠিক ওর মত দেখতে হলেও মেয়েটার স্বভাব ওর একেবারেই উলটো। ছেলেটা কিছুদূর এগিয়ে যেতেই মাটি ছুড়ে মার ল ইরা। ছুঁড়ে দিয়েই সে পগারপার। তবে রিমঝিম দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। বারান্দার লাইট সে বন্ধ করে নিয়েছে। তাই ওর ধরা পড়ার কোনো চান্স নেই। ঠিক তখনই দেখল সে ওই ছেলেটার ঠিক সামনে শুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। আর মাটির গোলাটা গিয়ে পড়েছে তার ঝাকড়া চুলে। সাদা পাঞ্জাবি ভিজে মাটিতে যাচ্ছেতাই অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় উঁচিয়ে উপরের দিকে চাইল শুদ্ধ আর ওই মুহুর্তে রিমঝিমের চাচী বারান্দার লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। তিনি এসেছেন ওকে খাবার জন্য ডাকতে। উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করে উঠল রিমঝিম। চোখাচোখি হল শুদ্ধর সঙ্গে। সে হতবাক হয়ে একবার মাটিতে মাখামাখি নিজেকে দেখছে। আরেকবার দেখছে চারতালার উপরে থাকা রিমঝিমকে। যেন এখনো বিশ্বাসই করতে পারছেনা এটা ওর সঙ্গে ওই মুহুর্তে কি ঘটে গেল! দৃশ্যটা রাফিও দেখল। সে তো ভেবেছিল এটা বোধহয় তার ইরাবতী। জোর করে অনেক পড়া দেয়ার প্রতিশোধ নিয়েছে। কিন্তু এখানে তো কেস পুরো উলটো। মেয়েটার দিকে রাফিও তাকাল। সেদিন সকালে ভালোভাবে খেয়াল না করলেও আজ দেখল। মেয়েটা চেহারা-ছবি অবিকল তার ইরাবতীর ন্যায়। যেন দু'জন আপন বোন? তবে নজর সরিয়ে নেয় সে। বরং ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলল, — ' বাড়ি ফিরে ফুলের বদলে মাটির গোলা পেলে বন্ধু? আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিস নাকি? দেরি করে বাড়ি ফেয়ায় বউ শাস্তি বর্ষণ করল নাকি তোকে? সত্যি করে বল তো? ' 
 তখনও হতচকিত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি শুদ্ধ। রাফির কথাও বোধহয় শুনল না৷ কোনোরকমে বলল,— ' তোকে বাড়ি পৌছে দেয়া লাগবে? ' 
— ' না। তুই যা। তোর বউ অপেক্ষায় আছে ' বলেই ঠোঁট টিপে হেসে চলে গেল রাফি। 
আর শুদ্ধ? রাফি চলে গেলেও সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। নড়াচড়ার কথাও যেন ভুলে গেল.... 
 
চলবে.....?
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ৯ 
 
— ' এইই পিচ্চিইই.... '
 কথাটা শোনামাত্র রিমঝিম পিছু ফিরল। আর ফিরতেই ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে শুরু করল। গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে থামল ওকে পিচ্চি সম্বোধন করা কিশোরের কাছাকাছি। ছোট হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল, — ' তুমি? তুমি কোথায় ছিলে? ' ছেলেটা আজও টিস্যু এগিয়ে দিল রিমঝিমকে। আর ঠিক সেদিনের মতই টিস্যু চেপে চোখ মুছে তারপর নাক মুছল রিমঝিম। মুছে টিস্যু আবার ফেরত দিল ছেলেটাকে। কান্নার দমকে সে তখনও ফোঁপাচ্ছে, — ' না-ও ধরো। ' 
বলেই চলে যাবার জন্য পা বাঁড়াল সে। তার কাঁধ ছেড়ে অনেকটা নিচে নেমে আসা চুলে ঢিলেঢালা পনিটেইল বাঁধা। চুলটা যে ভীষণ অযত্নে বাঁধা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নীল-সাদা ইউনিফর্ম, পায়ে কেডস আর গোলাপি স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে সে হেঁটে হেঁটে একাই ফিরছিল স্কুল থেকে। বাকি বাচ্চাদের বাবা না-হয় মা সঙ্গে থাকলেও আট বছরের রিমঝিমের পাশে কেউ ছিল না। সেই ছেলেটাও হাঁটা শুরু করল রিমঝিমের পাশাপাশি। রাস্তা পার হবার সময় ছোট্ট হাতটা মুঠোয় পুরে নিয়ে বলল, — ' তুমি কাঁদছিলে কেন পিচ্চি?' 
ভাসা ভাসা চোখ জোড়ায় এক রাশ অভিযোগ এনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, — ' মিরাজ আমাকে মেরেছে। চুল টেনে দিছে। আমার পেন্সিল নিয়ে নিছে। আমার বই ছিঁড়ে দিছে। আর.. আর জানো বলেছে আমি পঁচা মেয়ে। তুমি মিরাজকে একটু বকে দিবা? ' অভিযোগের বাহার দেখে হেসে ফেলল ছেলেটা। বলল, 
— ' আচ্ছা বকে দিব। ' 
— ' কখন বকা দিবা? ' 
— 'একটু পর। ' 
— ' আচ্ছা। ' 
— ' প্রতিদিন তোমাকে রাস্তা পার করে দেয় কে পিচ্চি? ' 
— ' কেউ না। আম্মু যখন ছিল তখন আম্মুর সঙ্গে আসতাম। জানো আমার আম্মুর বিয়ে হয়ে গেছে। আর আসবেনা আমাকে নিতে। সবাই তাই বলে। আমাকে নিয়ে গেলে কি হয় বলো? আমি আম্মুকে ছাড়া ঘুমাতে পারিনা। ' বলতে বলতে ফের ঠোঁট ফোলালো বাচ্চাটা৷ 
— ' আইসক্রিম খাবে পিচ্চি? ' 
সেই ছেলেটার হুট করে আইসক্রিমের কথা শুনে লাফিয়ে উঠল আট বছরের রিমঝিম। চকচকে চোখে তাকাল রাস্তার পাশে মুদি দোকানের আইসক্রিম ফ্রিজারের দিকে।
রিমঝিমকে লাফাতে দেখে হাসল সেই ছেলেটা। হাতটা ফের শক্ত করে ধরে বলল, — ' চলো আইসক্রিম খেয়ে আসি। ' 
দোকান থেকে দুইহাতে দু'টো আইসক্রিম হাতে নিয়ে খেতে থাকে রিমঝিম। এখন অবশ্য ওর পিঠের স্কুল ব্যাগটা ঠায় পেয়েছে ওর পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার কাঁধে। তার হাতেও আইসক্রিম। তবে সে রিমঝিমের খাওয়া দেখতেই বেশি ব্যস্ত। হাতে রাখা টিস্যু দিয়ে আইসক্রিম লেগে থাকা খাঁজকাটা থুতনি মুছে দিয়ে বিনাকারণে হেসে ফেলল সে। আদুরে শাসন করে বলল, — ' আস্তে খাও পিচ্চি। ' 
অমনি আইসক্রিম খাওয়া হাত থেমে গেল রিমঝিমের। সন্দেহ নিয়ে তাকাল ছেলেটার দিকে। বলল, — ' তুমি আইসক্রিম দিয়ে কি কিডন্যাপ করবা আমাকে? ' 
ফের হাসল ছেলেটা। তার ঝাকড়াচুল বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেলে চুলের গোড়ায় ব্যস্তভাবে হাত চালিয়ে বলল, — ' তুমি বড় হলে কিডন্যাপ করব। এই ধরো আর দশ বছর পর। ওকে? ' 
— ' কিডন্যাপ করে কি আমার হাত-পা-চোখ বিক্রি করে দিবা?' কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইল বাচ্চাটা। 
— ' না। ' 
— ' কিন্তু বাবা যে বলে কিডন্যাপ করলে হাত-পা কেটে দেয়। তুমি কাটবা না কেন? ' 
— ' পিচ্চিদের আদর করতে হয় কিডন্যাপ করে। হাত-পা কাটতে হয়না। '
— ' ওহ আচ্ছা।' বলেই বিজ্ঞের মত মাথা নাড়াল রিমঝিম। ফের ব্যস্ত হলো আইসক্রিমে। আর ততক্ষণ রিমঝিমের গোলাপি ব্যাগ যার উপর সিন্ডারেলার ছবি আঁকা সেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল ছেলেটা। সে-ই বাড়িতে পৌছে দিল রিমঝিমকে। গেটের কাছে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসল রিমঝিমের উচ্চতায়। তবুও সে রিমঝিমকে ছাড়িয়ে গিয়েছে অনেকটা। আর কিছু বছর পর সন্দেহাতীত ভাবে সে একজন ঝাকড়াচুলের সু-উচ্চ সুপুরুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে। আদুরেস্বরে বলল, 
— ' আমি কাল ঢাকা চলে যাচ্ছি পিচ্চি। ওখানকার স্কুলে ভর্তি হব। ততদিন তুমি নিজেকে সেইফ রাখবে। বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে যাবেনা। রাতে বাইরে বের হবেনা। কেউ কিছু দিলে খাবেনা। কেউ একা কোথাও ডাকবে যাবেনা। সব কিডন্যাপার আমার মত ভালো নয়। হাত-পা কেটে দিবে যদি তুমি ওদের সঙ্গে যাও। ওকে? আমার কথা মনে রেখো। আমি ছুটিতে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব। ' 
— ' আমাকে কিডন্যাপ করলে কি তোমার খারাপ লাগবে? ' সরল কন্ঠে আওড়ালো বাচ্চা মেয়েটা। সে ভীষণই উৎসুক। 
— ' আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। ' 
বলেই ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটা রিমঝিমের হাতে দিয়ে ওদের বাড়ির সামনে রাখা গাড়ি থেকে একটা বড় ব্যাগ বের করে আনল। সেটাও একটা স্কুল ব্যাগ। ব্যাগটা রিমঝিমকে এগিয়ে দিয়ে বলল, — ' এটা রেখে দাও। তোমার গিফট। তোমাকে কেউ মারলে তাকে ও মারবে, একদম ছাড়বেনা, বুঝছো পিচ্চি? যাও বাসায় যাও। তোমার আম্মু এসেছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে।'
 
মায়ের কথা শোনামাত্র আর এক মুহুর্ত থামল না রিমঝিম। সেই ছেলেটাকে পেছনে ফেলে দৌড়ে গেল। আঙিনায় সুমনা বসে আছেন। পরণে ভাঁজভাঙা শাড়ি, সোনার গহনা আর তার উজ্জ্বল মুখাবয়ব। দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল রিমঝিম। খুলে বসল আদরের ঝাঁপি। আর সুমনা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে শুধু পরম মমতায় মেয়েকে বুকের কাছে জড়িয়ে রাখলেন। সেদিন গোটা দিন মেয়ের সঙ্গে কাটালেন সুমনা। মেয়ের জন্য জামা,জুতো, ব্যাগ, চুলের ক্লিপ উপহার এনেছেন। রাতে নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তারপর সেই যে সুমনা চলে গেলেন। ছ'মাস পেরিয়ে গেলেও আর ফিরে এলেন না......চোখ মেলে উঠে বসল রিমঝিম। সে তখনও আলিশান কামরায় বন্দি। পরণে সুতো অব্দি নেই। সাদা কম্ফর্টারে আবৃত অবস্থায় উঠে বসতেই টের পেল অপরিচিত ব্যথায় আচ্ছন্ন গোটা তনু। এলোমেলো ভেজা চুল লেপ্টে আছে কপালের চারপাশে। ঝট করে মাথার উপরে তাকাল সে। সিলিং ফ্যানের দিকে মোহাবিষ্টর ন্যায় চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। মার্বেলের পাথুরে মেঝেতে জুতোর আওয়াজ পাওয়া গেল সেই মুহুর্তে। রিমঝিম ঘৃণাভরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল শুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।একহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা, আরেকহাতে ধরা লেটেস্ট মডেলের নেভিব্লু রঙের আইফোন।কোথায় বিন্দুমাত্র কুঁচকে না থাকা সাদা শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট, গলায় কালো টাই এবং কালো ব্লেজার। ঠিক যেমনটা হয় কোনো কর্পারেট কোম্পানির বস্। কয়েক ঘন্টার আগে যেই হিংস্র মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রিমঝিমের, চেহারায় তার লেশমাত্র নেই। ঠোঁটের কোনে রহস্যময় হাসিটা অমলিন রেখে কব্জিটা বাঁধা কালো ঘড়িটা দেখল শুদ্ধ। স্বাভাবিকভাবে বলল, — ' তুমি এখনো তৈরী হওনি কেন রিমঝিম? উই আর গেটিং লেইট। ' 
শুদ্ধর কন্ঠস্বর এতটাই স্বাভাবিক, সাবলীল যেন কয়েকঘন্টা পূর্বে তারা দ্বারা কোনোরুপ সাংঘাতিক অ পরা ধটা হয়নি। বরং এমন কোনো মুহুর্ত অব্দি তাদের মাঝে আসেনি৷ তারা বরাবরই কোনো আদর্শ দম্পতি৷ যাদের মাঝে কোনো তিক্ততা নেই। 
শুদ্ধর কন্ঠস্বরের নিরুত্তাপ উদাসীনতা বুঝেও চুপ করে থাকল রিমঝিম। ওর কিছু বলার নেই। আজ যা হলো! তারপর আর কি-ইবা বলার আছে? কেন করলো এই লোকটা ওর সঙ্গে পশুর ন্যায় আচরণ? চাচীকে কিভাবে মুখ দেখাবে সে? দশ বছর বয়স থেকে শিরিন চাচী বিনা কোনো তিক্ত বাক্যবাণ বা অযাচিত ভেবে রিমঝিমকে অবহেলা করেননি। সেই মানুষটা তার প্রতিদান চাইল তখন রিমঝিম কিভাবে পারত তাকে এড়িয়ে যেতে? শিরিন চাচী তো রিমঝিমের ভালো চান। শুদ্ধর মত একজন বদমেজাজি, জেল ফেরত আসামীর সঙ্গে কিভাবে মেনে নেবেন? তিনি যে কসম দিয়েছিলেন! চাচী ঠিকই বলেন ভদ্রতার মুখোশ, কুমিরের মায়াকান্না জুড়ে ওর মায়ের কথা বিশ্বাস করা উচিত নয়। শিরিন চাচী রিমঝিমের মা। জন্ম না দিলেও তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি ওর ভালো চান। এতগুলো বছর চাচীই তো ওকে সামলে আসছেন। আর আজ শুধুমাত্র এই লোকের কারণে চাচীর কথা অমান্য করে ফেলল রিমঝিম। গলার কাছটাই কান্নারা ঝট পাকিয়ে ওঠল ফের৷
— ' গেট আপ ওয়াইফি। উই আর গেটিং রিয়েলি লেইট।যেতে ইচ্ছে আমারও করছে না আপাতত আমার জরুরি মিটিং আছে।' 
 
বলেই অপেক্ষমান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল শুদ্ধ। ওদিকে শুদ্ধকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কান্নাদের চেপে আহত স্বরে রিমঝিম বলল, 
— ' আমি একা যেতে পারব।' 
— ' আর ইউ শিউর?' 
— ' কেন? আপনার কেন মনে হয় আমি বাড়ি যেতে ইচ্ছুক নয়? আপনার বন্দিশালায় আটকে থাকতে আমার ভালো লাগছে?' 
শুদ্ধ খানিকটা ঝুঁকে এলো রিমঝিমের দিকে। অমনি কম্বলটা শক্ত করে চেপে ধরে পেছনে সরে গেল রিমঝিম। সেঁটে গেল দেয়ালের সঙ্গে। চেঁচিয়ে বলল, — ' দূরে.. একদম দশ হাত দূরে। ' 
ওদিকে শুদ্ধ হেসে ফেলল ঠোঁট টিপে। যেন মাত্রই সে খুবই হাস্যরসাত্মক কোনো দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। নিচের দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভাবল বোধহয়। তারপর বলল, — ' রিল্যাক্স। আমার মিটিং আছে। তোমার সঙ্গে ডেটিং করার সময় নেই আপাতত। বাসায় ড্রপ করে দিই তোমাকে। গেট রেডি।' 
— ' অভিনয় করতে করতে আপনি ক্লান্ত হোন না?' 
— ' না। ' 
— ' কেন? ' 
— ' তোমাকে বিয়ে করতে হবে যে তা-ই। নাও গেট রেডি। উফফ প্যানপ্যানানি বন্ধ করো। সাজতে বসে যেও না আবার। তোমার সাজগোজ করা দেখলে মিটিং ক্যান্সেল করিয়ে দিতে পারি। উফফ! বিয়ের পর পুরুষ মানুষ অফিসে টাইম মত পৌছাতে পারেনা কেন আজ বুঝেছি।' বলেই গালের দাড়িতে হার বুলিয়ে ফিচেল হাসল শুদ্ধ। 
 
 — 'ইতর কোথাকার। ' বিড়বিড়িয়ে বলল রিমঝিম। সে তখনও দেয়ালের সঙ্গে চেপেই আছে। 
আবার ঘড়ি দেখে তাড়া দিল শুদ্ধ, — ' তোমার ফেরেশতা তূল্য চাচী ওদিকে তোমাকে না পেয়ে ছোট আম্মুর সঙ্গে ঝামেলা করছে। জলদি চলো। একটা মহিলা এতটা ডায়নী হতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারিনা। আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আলমিরাতে কাপড়চোপড় আছে। ওখান থেকে পরে নিও। আবার কম্বল পেঁচিয়ে বাইরে চলে এসোনা। আগুন জ্বালানো রুপ শুধুমাত্র আমার জন্য বরাদ্দ, তাইনা? ' বলেই ফের মেইন দরজার কাছে এগিয়ে গেল শুদ্ধ। 
চাচীর বিরুদ্ধে কথা শুনে পুনরায় গর্জে উঠল রিমঝিম, — ' একদম আমার চাচীর নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না। ডায়নী আমার চাচী নন। আপনার আদরের ছোট মা যার গুণগান গাইতে গাইতে আপনার মুখে ফ্যানা উঠে যায়। ' 
রিমঝিমের কথায় একবিন্দ পাত্তা না দিয়ে দরজাটা খুলে বাইরে যাবার উদেশ্যে বেরিয়ে গেল শুদ্ধ। বেরোনোর আগে বলল, — ' এইই পিচ্চি... দেরি করোনো। ' 
শিরিন চাচীকে ব্যাঙ্গ করায় এমনিতেও মেজাজ খারাপ হয়েছিল রিমঝিমের। সে তো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলও না শুদ্ধর কথা। কিন্তু শেষে ওটা কি বলে গেল লোকটা? নাহ! বিস্ফোরিত নেত্রে শুদ্ধর অবয়ব যেখানে অদৃশ্য হয়েছে সেদিকে চেয়ে থাকল রিমঝিম। এই লোকটা ওকে 'পিচ্চি' বলে সম্বোধন করল কেন? ব্যাপারটা শুধুই কি কাকতালীয়? 
 
----------------
 
মাগরিবের আজান দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। আজ ঠান্ডার প্রকোপও কমে এসেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে কুয়াশাহীন শীতের সন্ধায় আজ বুটিক্সের দোকানের আপা ওকে দেড়শ টাকা দিয়েছেন! সন্ধ্যায় কেয়ার অনেক ঠান্ডা লাগলেও আজ যেন ঠান্ডা বাতাসটাও ভালো লাগছে। থানা মোড়ের গলিতে একজন লোক ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবিশ্বাস্যভাবে লোকটার দোকানের বাচ্চাদের প্রত্যেকটা কাপড়চোপড় এত সুন্দর, সফট। অথচ লোকটা মাত্র দশ টাকা পিচ হিসেবে বিক্রি করছে। কেয়ার প্রথমে খটকা লেগেছিল। কাপড় গুলো হয়তো ভালো না,ছেঁড়া ফাটা কিছু একটা হবে। কিন্তু হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল প্রত্যেকটা কাপড় নতুনের মত চকচকে। এমনকি ব্র‍্যান্ডের মত লাগছে। একবার ঈদে রাফির সঙ্গে তিতিরের জন্য ড্রেস কিনতে ধানমন্ডির বেবিশপে গিয়েছিল কেয়া। ওখানে এমন অনেক ভ্যারাইটিজের ড্রেস দেখেছিল। ঠিক তেমনই ড্রেস এই লোকের ভ্যানের উপরও আছে। তাও আবার দশ টাকা পিস! কেয়া তিতিরের জন্য পাঁচ সেট ড্রেস কিনল। দুই জোড়া মোজা আর তিনটা ট্রাউজার। প্রতিটা ড্রেস অসম্ভব সুন্দর। দোকানদার কাপড় গুলো পলিব্যাগে দিলেও আজ আর ভুল করেনি কেয়া। কাঁধের ব্যাগে রেখে দিয়েছে। হাতে এখনো পঞ্চাশ টাকা আছে। এই টাকাটা কেয়া জমাবে। তারপর তিতিরপাখিকে সামনের দিনে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে। আগামীমাসে সেলাই মেশিনও কিনে ফেলবে কেয়া। মা-মেয়ের দিন আগামীতে ভালো হবে বলেই সে আশাবাদী। কেয়া অনেক কাজ করবে বাচ্চাটাকে ভালো রাখার জন্য। আপন ভাবনায় হেঁটে চলা কেয়া হয়তো খেয়ালও করেনি ঠিক ওর পেছনে ধীর গতিতে চলতে থাকা গাড়িটা। খেয়াল করলে হয়তো দেখতে পেত ফ্রেমবিহীন চশমার আড়ালে থাকা একজোড়া আকুল অনুভূতি আর দীর্ঘশ্বাস মেশানো দৃষ্টির। আচমকা সে চাপ বাড়াল এক্সেলেটরে। আজও কেয়াকে একটা ছোট খাট ধাক্কা দিয়ে ফেলবে এমনই ভাবসাব তার। তবে ঝড়ের বেগে উড়ে গেলেও ঠিক সময় মত ব্রেক চাপল সে৷ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। এসে দাঁড়াল কেয়ার সামনে।
 
 ভাবনার সাগরে বুদ কেয়া আজও ঝড়ের গতিতে উড়ে আসা গাড়ির অস্তিত্ব অনুভব করতেই কাঁধের ব্যাগ চেপে ধরল। তিতিরের জামাকাপড় গুলো ড্রেনে ফেলতে চায়না সে। গাড়ির মালিক ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে তার উড়োজাহাজ হতে। রাগে চেঁচিয়ে উঠল কেয়া,
  — ' এই-ই.. রাস্তাটা কি কিনে নিয়েছেন? ' 
 
তবে বিদ্যুৎ বেগে গাড়ির মালিক ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল। বলল, — ' আম এক্সট্রিমলি স্যরি। ' বলতে বলতে সম্মুখে সটান দাঁড়ানো যুবকের মুখাবয়ব ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পরিস্কার দেখতে পেলো কেয়া। নীল শার্ট, নেভিব্লু প্যান্ট আর অফহোয়াইট ব্লেজার পরিহিত নিঃসন্দেহে একজন সুদর্শন মুখবিবরের অধিকারী সে। লম্বায় কেয়া তার বুক অব্দিও পৌছাবে না। তার দামী পারফিউমের ঘ্রাণ কেয়া কয়েক হাত দুরত্বেও অনুভব করতে পারছে৷ আপাতত এই লোকের ' লুক এনালাইসিস' করা বাদ দিয়ে তাকে ধমকে উঠল কেয়া, — ' আপনি গতদিনও আমাকে ধাক্কা দিয়েছেন তাইনা? আজ আবার ধাক্কা দিলেন? মতলবটা কি? গতকাল আমার কতটা ক্ষতি হয়েছে জানেন? ' বলেই ফের যুবকের পানে চাইল কেয়া। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটা ওর দিকেই চেয়ে আছে যেন কিছু স্মরণ করতে চাইছে। আচমকাই লোকটা বলল, 
— ' কেয়া আপু ? ' 
এতবড় হাট্টাগোট্টা সাইজের লোক ওকে আপু সম্বোধনে অজান্তেই একটা মেদুর ছায়া পড়ল কেয়ার মুখশ্রীতে। কবে কবে এত বয়স হয়ে গেল ওর! টেরই পেল না। জীবনটা সুন্দরমত উপভোগ করার আগেই সমস্ত রঙ ফিকে হয়ে গিয়েছে ওর। ওর পোড়াকপালের ফেরে তিতিরের শৈশবে দাগ লাগছে। কোনোরকমে বলল, — ' জী? ' 
— ' আপনি কেয়া আপু না? মাইলস্টোন কলেজ, ১৫ ব্যাচ? '
— ' জী! '
— ' আমাকে চিনতে পেরেছেন আপু? ' 
হতচকিতভাবে দু'পাশে মাথা নাড়াল কেয়া। সে কোনোভাবেই এই ছেলেটাকে মনে করতে পারল না। 
— ' আমি মাহাদ। মুশফিকুর মাহাদ। আলী স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তাম আপনার ব্যাচে।' মাহাদের নাম বলা মাত্র চমকে উঠল কেয়া। হুট করেই মানস্পটে ভাসল একটা অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। চেহারায় দৃশ্যমান মেদুর ছায়াটা আরও গাঢ় হলো৷ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ভীষণ দোটানায় পড়ে কি বলবে কিছুই বুঝল না সে। কোনোরকমে বলল, 
— ' কোন মাহাদ? আমার ঠিক মনে নেই। অনেকদিন আগের কথা তো।' বলেই এক মুহূর্তের জন্য থামল না কেয়া। দ্রুত গতিতে হেঁটে মাহাদের সামনে থেকে চলে এলো সে। ঠিক তখনই শুনল মাহাদের কন্ঠস্বর, — ' বিয়ে করা স্বামীকে কেউ ভুলে যায় কেয়া আপু? ' 
 
চলবে.....
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ১০ 
 
 সন্ধ্যা গড়াতেই ঝুম বর্ষণ নামল। ইদানীং ঝড়-বৃষ্টিরও মুড সুইং হয়। নয়তো শীতকালে আয়েশ বর্ষণ ফিরে আসে কেন? বিদায়ী মাঘের ভারী বর্ষণে ঠান্ডাটা আরও জেকে পড়ল সন্ধ্যাবেলায়। বারান্দায় বৃষ্টি দেখে, আনন্দে দুই চারটে লাফ-ঝাপ দিয়ে টিভি খুলে বসেছিল ইরা। রাফি সাধারণত আটটার দিকে পড়াতে আসে। সাতটা বাজতেই বই খুলে বসেছিল। ইরার উপর ওই লোকটা পাহাড়সম পড়ার বোঝা চাপিয়ে যায় প্রতিদিন! তবে এত সহজে পড়ায় মন বসবেনা ইরার। রাফি আসার একঘন্টা আগে পড়তে বসে সে। এই একঘন্টায় যতটুকু পড়া হবে ততটুকুই তার প্রিয় 'ছারকে' দিয়ে দেবে। বাকিটা ইরা নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগাবে। কিন্তু আচমকা বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দে দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে খুশিতে বাক-বাকুম করে ফিরে এলো সে। ঘন্টাধরে আজ পড়াশোনা করতে হবেনা ভেবে চকচক করে উঠল ভাসা ভাসা আঁখিযুগল। তড়িৎ গতিতে বই বন্ধ করে গিয়ে বসল টিভি খুলে। ইউটিউব খুলে সেখানে ছাড়ল 'বোলে চুড়িয়্যা' গানটা। আহ! হৃত্তিক রোশান! ইরার শ্রদ্ধাভাজন ছারটাও দেখতে একেবারে হৃত্তিক রোশানের কপি। শীতকাল বলে রুমের ফ্যান ছাড়তে হয়না। কিছুদিন পর যখন ফ্যান ছাড়বে তখন তার 'ছারের' কপালে স্টাইলিসভাবে পড়ে থাকা চুল গুলো উড়বে। হৃত্তিক রোশানের থেকে কোনো অংশে কম লাগবেনা। ভেবেই মুচকি হাসল ইরা। স্যারের কথা মনে আসতেই ইরাও গানের সঙ্গে তাল মেলালো,
 — 'হায় হায় মে মারজাওয়া তেরে বিন..আব তো মেরি রাতে কাটটি.... '
পুরো সন্ধ্যাটা গান শুনে, ঘরময় নাচানাচি করে কাটাল ইরা। অবশ্য সে একা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ওর গোলুমোলু ভাইটাও এলো ঘুম জড়ানো চোখে। সে স্কুল থেকে ফিরে ঘুমিয়েছিল স্নিগ্ধ। সে-ও মাহিনের বয়সী। পঞ্চম শ্রনীতে অধ্যায়নরত। গানের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছে এবং সরাসরি এলো তিন তালার লিভিংরুমে। এবাড়ির ছেলেমেয়েদের রুম তিন তালায়। নীচ তালায় কাজের লোকেরা আর ড্রয়িংরুম, রান্নাঘর, স্টোররুম, খাওয়া-দাওয়ার সব কিছুর ব্যবস্থা সেখানে আর দোতালায় বাড়ির কর্তা-গিন্নিদের বসবাস। আর ওনাদের ছেলে মেয়েদের জন্য বরাদ্দ তিনতালা। তবে তিনতালায় সবচেয়ে সুন্দর ঘরটা হচ্ছে শুদ্ধর। সেখানে ওর রুমের সঙ্গে লাগোয়া একটা বিশাল ছাদ আছে। অবশ্য ওপেন বেলকনি বললেও ভুল হবেনা। ঘুমের চোটে স্নিগ্ধর এক চোখ বন্ধ হয়ে আছে। তারপরও বোনকে পাগলের মত নাচতে দেখে চোখ জোড়া খোলার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে যখন লাভ হলোনা তখন এক চোখ বন্ধ করে, আরেক চোখ দিয়ে বোনের পাগলামো দেখতে লাগল। 
স্নিগ্ধকে দেখেই গাল টেনে, চুল এলোমেলো করে দিল ইরা। বলল, — ' নাচবি?' 
মাথা নাড়িয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল স্নিগ্ধ। টিভিতে তখন শাহরুখ খানের মুভির গান চলছে। বোনের হাবভাব দেখে নিয়ে ঘুম জড়ানোস্বরে বলল,
 — ' রাফিদ ভাইয়া আজ পড়াতে আসবেনা?' 
বিরক্তিতে সোফার কুশন তুলে স্নিগ্ধর দিকে ছুঁড়ে দিল ইরা। নাচতে নাচতে বলল, — ' বাইরে কেমন বৃষ্টি হচ্ছে দেখছিস না? আজ ছার আসবেনা৷ আমার পড়াও লাগবেনা। মজা হি মজা... ' 
— ' ভাইয়ার পড়া করেছো আপু?' বোনকে অমন আয়েশী ভঙ্গিতে নাচতে দেখে জিজ্ঞেস করল স্নিগ্ধ। কারণ রাফির কাছে আরও এক বছর আগে থেকে পড়ে স্নিগ্ধ। অন্ততঃ এতটুকু জানে সেই বান্দা বৃষ্টিতে থেমে যাবার মত নয়। 
— ' নাহ। আজ আমার ছুটি,ও ভাই.. আজ আমাদের ছুটি। পড়াশোনা করবনা। ' 
— ' ভাইয়া যদি চলে আসে? ' 
— ' চুপ কর বেয়াদব। আমার ছার আজ আসবেনা। এত বৃষ্টি, এত শীতে কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়? হু? ছারের কি ফিলিংস নেই? ' 
— ' নাচ বন্ধ করে পড়তে বসো আপু। ভাইয়া কিন্তু পড়ানো মিস করেনা। ' রহসয়ময় হেসে বোনকে কিছুটা সাবধান করল স্নিগ্ধ। হাজার হোক ইরা তার বড় বোন। রাফিদ ভাইয়ের মেজাজের পদতলে পিষ্ট হতে দিতে পারেনা সে। তবে স্নিগ্ধর সর্কতবার্তা কানে তুললনা ইরা। বরং চোখ পাকিয়ে ধমকাল স্নিগ্ধকে, — ' এই আমার চোখের সামনে থেকে যা বেয়াদব...' স্নিগ্ধকে ধমকে ফের নাচে মনোযোগ দিল ইরা। বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি। এর মধ্যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ বাইরে বের হয়না। আর ওর পরম শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা স্যারের মস্তিষ্ক একদম সুস্থ-সবল বলেই জানে ইরা। 
 
ইরার ভুল ধারণা ভাঙল কয়েক মুহুর্তে। টিভিতে সে একটা আইটেম সং চালিয়েছে। ওড়নাটা শাড়ির মত করে জড়িয়ে দেশিগার্ল প্রিয়াঙ্কা চোপড়া সাজল। সোফার ওপর উঠে শুরু করল প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত নাচ। গানের তালে তাল মিলিয়ে নাচতে নাচতে আচমকাই থেমে গেল ইরা। তিনতালার সিড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাফি। অস্বস্তি নিয়ে দরজায় টোকা দিল কয়েকবার। ক্ষীণকন্ঠে ডাকল, — ' ইরা?' 
 
রাফির কন্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌছাতেই তড়াক করে সোফা থেকে নামতে যেয়ে ওড়নায় বেঁধে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ইরা। ব্যথাও পেল। 
ইরাকে পড়ে যেতে দেখে স্নিগ্ধ আর রাফি একসঙ্গে ছুটে এলো। কনুই, হাঁটুতে ভালোয় ব্যথা পেয়েছে ইরা। ইরাকে পড়তে দেখে স্নিগ্ধর ঘুম ছুটে গেল। 
— ' আপু! আর্তনাদ করে স্নিগ্ধই টেনে তুলল বোনকে। ইরাকে পড়তে দেখে রাফিও ছুটে এলো। সে স্পষ্টতই বিরক্ত! এই মেয়ে এমন লাফাচ্ছিল কেন? রাফি কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে ইরাকে দেখে নিয়ে বলল, — ' ব্যথা পেয়েছো? ' 
ইরার হাল তখন বেহাল। কপালের এক কোনে ফুলে ওঠেছে৷ টেবিলের কাঁচে কনুইয়ে গুঁতো খেয়ে ছিলে গেছে জায়গাটা। আর এর মধ্যে রাফির ঢংয়ের ব্যথা পেয়েছো শুনে নাক সিটকাল ইরা। সিটকে বলল, — ' না ছার। পড়ে গেলে ব্যথা লাগেনা। আরাম লাগে। '  
ব্যথা নিয়েও চটাং চটাং মুখ ঠিকই চলে! রাফিকে সালাম দিয়ে বোনকে আগলে ধরল স্নিগ্ধ। অভিযোগের সূরে বলল, — ' আরো লাফাও সোফায় ওঠে? আমি আম্মুকে ডাকছি এক্ষুনি। ' বলেই সে দৌড়ে নিচে চলে গেল। ঠোঁট ফুলিয়ে আহ্লাদী ইরাকে দেখল রাফি। নাক-মুখ কুচকে রেখেছে। ভালোয় হয়েছে। এত চঞ্চল মেয়ের সঙ্গে এমনই হওয়া উচিত। অথচ ইরাকে পড়তে দেখে ওর বুকের ভেতরও যে মুচড়ে ওঠেছে সেটা ওর অভিব্যক্তিতে এতটুকুও বোঝার উপায় নেই।
— ' যা-ও পড়তে বসো। অতটুকু ব্যথা পেলে কিছু হয়না। ' বলেই মাথাটা যথাসম্ভব নিচু করে পড়ার ঘরের দিকে এগোলো রাফি। ততক্ষণে আবার ফিরে এসেছে স্নিগ্ধ। হাতে আইস-কেস। আইস কিউব নিয়ে কনুইয়ে চেপে ধরে খ্যাকখ্যাক করে হাসল স্নিগ্ধ। বলল, — ' এটা রাফিদ ভাইয়া। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি-ঠান্ডা কোনো কিছুতেই পড়াতে আসা মিস দেয় না। যাও পড়তে বসো। আসার আগে ভাইয়া নিচে আম্মুর কাছে একটা লাঠি চেয়ে এসেছে। আজ তোমার খবর আছে আপু। '  
স্নিগ্ধর হাসিতে মেজাজ খারাপ হলেও ভেতরর ভেতরে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল ইরা। আজ ওর একটা পড়াও হয়নি! এই জাঁদরেল স্যারের মাইরের হাত থেকে ওর বাঁচবে না আজ! 
 
— 'সেভেন-এইট জার ইকুয়াল? ' বলেই রাফি এক পলক তাকাল ইরার দিকে। কপালে সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকা চুল গুলোকে কলমে পেঁচিয়ে সে একধ্যানে চেয়ে আছে রাফির দিকে। ভ্রু উঁচিয়ে বলল, — ' কত হয়?' 
ইরা দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরল। তারপর খানিকটা ঠোঁট উলটে জানতে চাইল — ' কিসে কত হয় ছার? ' 
ঠান্ডা একটা চাহনি দিয়ে ইরার কার্যকালাপ দেখছিল রাফি। রুক্ষভাবে বলল, — ' সাত গুণ আট হলে কত হয়?' 
 — ' বিয়াল্লিশ হয় ছার। ' 
— ' বিয়াল্লিশ?' 
— ' জী ছার। ' 
ফের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল রাফি, — ' কালকের পড়া করোনি কেন ইরা?' 
তীব্র অসন্তোষ নিয়ে গমগমে গলায় জবাব দিল ইরা, — ' আপনি এই ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পড়াতে এসেছেন কেন ছার? ঝড়-বৃষ্টির দিনে কেউ পড়ে? ' 
 
— ' আচ্ছা? তো ঝড়-বৃষ্টির দিনে কি করে? আইটেম সং চালিয়ে সোফায় উঠে নাচে? '  
 
ইশ রাফি ওকে নাচতে দেখে ফেলেছে ভেবে লজ্জা পেল ইরা। আলগোছে রাফির সামনে থেকে বই টেনে নিল। নিয়ে আইসিটি বই সামনে রেখে বলল, 
— ' ওই সাবজেক্ট আজ থাক ছার। সব পড়া কাল করে রাখব। আজ আইসিটি পড়ব।' 
— ' ওকে। কাল পড়া না হলে লাঠির বাড়ি পড়বে।' 
বলেই আইসিটি বইয়ের তৃতীয় অধ্যায় থেকে ইরার খাতায় প্রশ্ন লিখতে আরম্ভ করল রাফি। 
— ' What is HTML? ' 
ইংরেজিতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে খাতাটা টেবিলের ওপাশে বসা ইরার দিকে এগিয়ে দিল রাফি। যার অর্থ এখন তাকে উত্তর লিখে দিতে হবে৷ খাতাটা হাতে নেয়ার মুহুর্ত থেকে ছন্দহীনভাবে পলক ঝাপ্টাচ্ছে ইরা! কারণটাও রাফি জানে। গতকাল পড়া করিয়ে গেলেও এই মেয়ে বইখাতা ছুঁয়েও দেখেনি। আইসিটির ম্যাথ করতে দিয়েছিল সেটাও করেনি। এত ফাঁকিবাজ মেয়েকে পড়াতে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে গিয়ে ঠেকছে ওর। ইরার দিকে খেয়াল নেই এমন ভঙ্গিতে আইসিটি বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে রাফি। 
বেশ কিছুক্ষণ কলম কামড়ে চিন্তাভাবনা করে প্রশ্নটার উত্তর লিখল ইরা। ঘষ ঘষ শব্দ কলম চালিয়ে অনেক কিছু লিখল বোধহয়। খাতাটা এগিয়ে দিল রাফির দিকে। 
বইয়ের পাতা থেকে নজর উঠিয়ে খাতায় নজর পড়তেই চমকাল রাফি। প্রবল আত্নসংযমে হাসি চাপল। চেপে গম্ভীরকন্ঠে বলল, — ' এটা কি লিখছো?'
ওই ভাসা ভাসা চোখে বিষ্ময় নিয়ে রাফির দিকেই চেয়ে আছে ইরা। আজ তার পরণে কালো সালোয়ার-কামিজ। যার সাদা ওড়নাটা গলায় দুই প্যাচ দিয়ে সামনে ঝুলিয়ে রাখা। লম্বা চুলে খোঁপা বেঁধে রাখলেও সামনে কিছু চুল বের করে রেখেছে। সাজগোজও কমতি না থাকলেও পড়াশোনার ব্যপারে সে বেখেয়াল। 
রাফির কন্ঠের শীতলতা অনুভব করে ছোট্ট করে ঢোক গিলল ইরা। যথাসম্ভব কন্ঠটা খাদে নামিয়ে বলল, — ' হয়নি ছার?' 
— ' তুমি বলো? কাল পড়িয়েছিলাম না? ' 
— ' জী ছার। কাল এই চ্যাপ্টার পড়িয়েছিলেন। ' 
— ' তবে?' 
— 'তবে কি ছার? হয়নি?' 
— ' HTML মানে HoT MaiL? ' 
ঠোঁট টিপে হাসল ইরা। হেসে বলল, — ' আপনি যেটা পড়িয়েছিলেন ওটা মনে নেই ছার। দেখুন আমি ঠিকই মিলিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করে ফেললাম ছার।' 
একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে খাতাটা টেনে নিল রাফি। নিয়ে বলল, — ' হট মেইল জিনিসটা কি সেটাও বলে দেন বিজ্ঞানী ইরা?' 
— ' হট মেইল হলো সেসব মেইল যেগুলা নায়ক নায়িকা পাঠায় ছার। ' 
ইরার কথাটা বলতে দেরি, রাফির বিষম খেতে এক মুহুর্ত দেরি হলোনা! নিজেকে সামলে আইসিটি বইটা এগিয়ে দিল। বেশ কঠোরভাবে বলল, — ' পড়াশোনার ইচ্ছে না থাকলে বলে দাও ইরা। আমি কাল থেকে আসব না। শুদ্ধকেও জানিয়ে দেব আমি। একদিনও পড়া করোনা। এভাবে তো চলতে পারেনা তাইনা?' 
রাফি রেগে গিয়েছে বুঝে মিনমিনে কন্ঠে আওড়ালো ইরা, — ' স্যরি ছার। ' 
আর ঠিক সেই মুহুর্তে খাতাটা রোল করে ইরার মাথার উপর বাড়ি দিয়ে ফেলল রাফি। তামাটে বর্ণের চেহারাটা কেমন লালচে হয়ে গেল। কপালের শিরা টনটন করে উঠল ওর। নিজেকে প্রবলভাবে সামলে নিয়ে বলল, — ' তোমাকে পড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ' বলেই টেবিলের উপর রাখা রাফির ওয়ালেট আর মোবাইলটা উঠিয়ে বেরিয়ে গেল রাফি। সে সত্যিই ভীষণ রেগে গিয়েছে। ইরার প্রতি তার অনুভূতি থাকলেও পড়াশোনার ব্যপারে শুদ্ধ ওকে ভরসা করে বলেই দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু অমন খামখেয়ালি মেয়ের কারণে শুদ্ধর সঙ্গে বন্ধুত্বে দুরত্ব আনতে চায়না সে। 
 
-------------
 
কেয়া তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভঙ্গিতে। অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে তাকাল থাকল ওর সম্মুখে দাঁড়ানো যুবকের পানে। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে সেও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন খানিক আগের তার কণ্ঠনিঃসৃত বাক্য হতে সে একেবারেই অজ্ঞ। তার ক্ষুরধার দৃষ্টি খেলা করছে কেয়ার আনন জুড়ে। সম্বিত ফিরল কেয়ার। অবিশ্বাসী কন্ঠে আওড়াল, — ' স্বামী!' 
মাহাদ এগিয়ে এলো। কদম থমকাল কেয়ার সম্মুখে। কন্ঠটা যথেষ্ট খাদে নামিয়ে বলল, 
— ' আপনার পাতানো স্বামীর কথা ভুলে গিয়েছেন কেয়া আপু? কলেজে 'ড্রেস এজ ইউ লাইক ' প্রতিযোগিতায় আমরা গ্রামের জামাই-বউ সেজেছিলাম। লং টাইম রাইট? '
জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করল কেয়া। উচ্চমাধ্যমিকে ওদের কলেজের প্রোগ্রামে কেয়া ওর মায়ের লাল শাড়ি পরে গিয়েছিল কলেজে। আর মাহাদ এসেছিল সাদা পাঞ্জাবি পরে। বন্ধুদের জোরাজুরিতে দুজনই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিযোগিতায়। এমনকি জিতেও গিয়েছিল! দুজনকে একটা করে সিরামিক্সের প্লেট পেয়েছিল। ঘটনাটা প্রায় দশ বছর আগে। অথচ তারা স্মৃতিতে অমলিন। জোর করে হাসল কেয়া। হেসে বলল, 
— ' আজ আসি মাহাদ।' বলেই ফের হাঁটার পথ ধরল কেয়া। আকাশের অবস্থা ভালো না। বৃষ্টি নামতে পারে।
কেয়া চলে যেতেই গাড়িতে যেয়ে বসল মাহাদ।পকেট থেকে ফোন বের করে কয়েকবার চেপে কল করল কাউকে। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই বলল, — ' আমি ছবি পাঠাচ্ছি। কালকের মধ্যে তার সমস্ত ডিটেইলস আমার চায়। ' 
ফোন কেটে শান্ত দৃষ্টিতে কেয়ার ঝাপসা হয়ে যাওয়া অবয়বের দিকে চেয়ে থাকল মাহাদ। 
 
---------
রিমঝিমের ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। চোখ খুলতেই শুকনো ঢোক গিলল। গিলে বাইরে তাকাল। ঝকঝকে রোদ উঠেছে আকাশে।ক'টা বাজে? বেশি দেরি হয়ে গেল নাকি? ওর বিছানা বরাবর দেয়ালে বড় দেয়াল ঘড়িটা জানান দিচ্ছে প্রায় নয়টা বাজে। আজ ভার্সিটিতে না গেলে হবেনা। মিডটার্মের জন্য বেশ কিছু ইম্পোর্টেন্ট ক্লাস আছে। বিগত তিন দিন যাবত একপ্রকার ঘরবন্দি হয়ে আছে রিমঝিম। অবশ্য না থেকে উপায় নেই। সে জানে বাইরে বের হওয়া মাত্র ওই গুন্ডাটা ওর পিছু নেবে। ভেজা মাটিতে মাখামাখি বোকা বোকা চেহারাটা ভাসল মানস্পটে। এত সহজে সে তো রিমঝিমকে ছেড়ে দেবে না এই ভয়ে বাড়ি থেকেই বেরোয় না রিমঝিম। তখনই দরজায় কড়া নাড়লেন শিরিন। একরাশ মিষ্টি হাসি নিয়ে রিমঝিমকে ডাকতে এসেছেন তিনি। তিনি এসেই বারান্দার দরজা খুলে দিলেন৷ জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই আলোয় ঝলমল করে উঠল গোটা ঘর। স্নেহময় কণ্ঠে বললেন, — অনেক ঘুম হয়েছে মা। এবার ওঠ? ' 
— ' উঠেই যাচ্ছিলাম চাচি। ' বলেই বিছানা থেকে উঠল রিমঝিম। আর উঠেই কোনো অদৃশ্য জাদুবলে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়। সেদিনের পর থেকে কারণে-অকারণে বারান্দায় আসে রিমঝিম। হাজার হোক মা তো! তাকে একঝলক দেখতে চায় রিমঝিম। তবে সেদিনের পর মাকে দেখেনি রিমঝিম। অসন্তোষের একটা ছায়া পড়ল ওর শ্যামবর্ণ আননে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফিরে এলো বারান্দা থেকে।এই বাসায় এসেছে প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেল। সেই মহিলা কি জানে না রিমঝিম তার কতটা কাছে? কেন নেই ওর প্রতি মমত্ববোধ সেই মহিলার? এত ব্যস্ততা নতুন সংসারে? রিমঝিম তো তার নাড়ি-ছেড়া ধন! কেন এতটা পাষাণ সেই মহিলা? ভাসা ভাসা চোখ জোড়া ছলছল হলো। বারান্দা থেকে ফিরে এসে বসল পড়ার টেবিলে। বই গুছিয়ে নিয়ে শুরু করল। ওদিকে শিরিন তার রুম গুছিয়ে দিচ্ছে। কম্বল ভাঁজ করতে করতে রিমঝিমকে উদেশ্য করে বলল, — ' হ্যাঁ রে রিমঝিম? বাড়িওয়ালাকে দেখেছিস তুই? ' 
ঝট করে চাচীর দিকে ফিরল রিমঝিম। চাচী কি কিছুই জানেনা? 
—' না। ' ব্যস্ত ভঙ্গিতে ব্যাগে বই ওঠাতে থাকে রিমঝিম। 
— ' ভাবছি আজ যাব ওদের বাড়িতে। কতদিন হয়ে গেল। কাউকেই দেখলাম না। ' 
— ' ওনারা বোধহয় আমাদের সঙ্গে মিশতে চান না চাচী। ইচ্ছে থাকলে এতদিনে ঠিকই খবর নিত? তাছাড়া বিত্তশালী লোকজন থেকে দূরে থাকায় ভালো। ' শেষের কথাটুকু বলে বিষন্ন হাসল রিমঝিম। 
শিরিন অবশ্য ওর কথায় পাত্তা দিলেন না। বরং হঠাৎ কিছু মনে পড়ার মত করে বললেন,
 — ' জলপাইয়ের আচার দিয়েছিলাম। বোয়াম গুলো একটু ছাদে রেখে আয় তো মা। আমার কোমরে ব্যথা। নইলে আমি-ই যেতাম। ' 
চাচীর বলতে দেরি গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রিমঝিমের যেতে দেরি হলোনা। টেবিলে রাখা বোয়াম গুলো উঠিয়ে নিয়ে বলল, — ' এইতো ছাদে গেলাম চাচী।' 
ত্রস্তপায়ে ছাদে উঠে এলো রিমঝিম। এসেই মনটা আর-ও ভালো হয়ে গেল৷ এত সুন্দর ছাদ! শীতকালীন ফুল দিয়ে ছাদটা এত সুন্দর করে সাজানো! চোখ ফেরাতে পারল না রিমঝিম। আচার গুলো রেখে ছাদের একপাশে বড় শিউলি ফুল গাছের দিকে গেল। ঝরা শিউলির মোহনীয় ঘ্রাণ টেনে চোখ বুজে ফেলল। কয়েকটা উঠিয়ে নিয়ে ছাদের দরজার কাছে যেতেই ধ্বক করে উঠল রিমঝিমের বক্ষপিঞ্জর। দরজা লক হয়ে গিয়েছে। খুলছেনা কেন? বেশ জোরে টানাটানি শুরু করল রিমঝিম। তবে বৃথা গেল সে প্রচেষ্টা। কেউ সম্ভবত ইচ্ছে করে দরজটা লাগিয়ে দিয়েছে ভাবনাটা মাথায় আসতেই ঝট করে উলটো দিকে ফিরল রিমঝিম। আর ফিরতেই হাতের মুঠোয় থাকা শিউলি ফুল গুলো লুটিয়ে পড়ল ওর পায়ের কাছে। এত জোরে ধুকপুক করা শুরু করল ওর হৃদযন্ত্রটা যেন ও নিজেই শুনতে পেল৷ সেই গুন্ডাটা এসে দাঁড়িয়েছে। রেলিং-এ হেলান দিয়ে, বুকে হাত বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে একটা ছাইরঙা টিশার্ট, কালো ট্রাউজার যার দপাশে সাদা বর্ডার লাইন টানা, পায়ে জুতো। ফুলে থাকা বাহুর পেশী দেখে ঢোক গিলল রিমঝিম। এই হাত দিয়ে ওকে যদি তুলে ছাদ থেকে ফেলে দেয়! ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা রিমঝিম শুদ্ধকে উদেশ্য করে মিনমিনে কন্ঠে বলল, — ' আমাকে যেতে দিন। ' 
কথাটা বলতেই শুদ্ধ লম্বা লম্বা পা ফেলে এসে থামল রিমঝিমের সামনে। ভ্রু উঁচিয়ে বলল, 
— ' সালাম দাও? ' 
— ' জী?' 
— বাংলা জানো না? বড়দের দেখলে সালাম দিতে হয় জানোনা? এক্ষুনি সালাম দাও।' 
রিমঝিমের কন্ঠে রাগ ঝরে পড়ল, — ' কাকে সালাম দেব?'
— ' বড়দের মুখে মুখে তর্ক করা? এই ভদ্রতা শিখিয়েছেন তোমার পেয়ারের চাচী? ' 
— ' দেখুন?' 
 আরও একটু রিমঝিমের দিকে ঝুঁকে এলো শুদ্ধ। বলল, — ' দেখানোও শিখিয়েছেন নাকি? ওই মহিলাকে দিয়ে সবই সম্ভব। '
— ' আমাকে যেতে দিন। ' 
— ' একদম বেয়াদব বানিয়েছে তোমার চাচী তোমাকে। আমাকেই মানুষ বানাতে হবে এখন। ' 
— ' আপনি কি সকাল সকাল নেশাপানি করেছেন? চাবি দিন। নয়তো আমি চেঁচাব। ' 
রিমঝিমের কথাকে সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করে ফের কড়াস্বরে শুদ্ধ বলল, — ' সালাম দাও বেয়াদব মেয়ে। ' 
— ' আপনি বেয়াদব।' 
— ' আবার মুখে-মুখে কথা বলে? সালাম না দিলে চাবি দেয়া হবেনা। বেয়াদবি একদম ছুটিয়ে দেব তোমার। বেয়ারা মেয়ে। দাও। আমাকে সালাম দাও। ' শেষের কথা টুকু এতটাই ধমকে বলল শুদ্ধ কেঁপে উঠল রিমঝিম। তবে দমে গেল না মোটেও। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 
— ' শয়তানদের কেউ সালাম দেয়?' 
 
চলবে.....?
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
পর্ব  — ১১
 
— ' এই-ই বেয়াদব!' বলেই রিমঝিমের পানে কয়েক কদম এগিয়ে গেল শুদ্ধ। কপালের শিরা টনটন করে উঠল। ভীষণ রেগে গিয়েছে সে। অবশ্য রিমঝিমের কিছু এলোগেলো না। এই লোকের রাগ দেখবে কেন? তার কোন ঠ্যাকা? সাত-সকালে একজন যুবতী মেয়েকে পরপুরুষ, অনাত্মীয় যুবক ছাদে আটকে যে রেখেছে সে শয়তান ছাড়া আর কি? শয়তানকে সালাম নয়, পাথর নিক্ষেও করতে হয়। সময়-সুযোগ পেলে ওটাই করত রিমঝিম৷ অতএব রিমঝিম তাকে ঠিক বিশেষণে বিশেষায়িত করেছে বলেই মনে হলো। রিমঝিমের পানে ষাঁড়ের মত তেড়ে এলেও দমে গেল শুদ্ধ। বরং পিছিয়ে গেল কয়েক পা। গিয়ে ফের রেলিঙ এর সঙ্গে সটান দাঁড়ালো। রিমঝিমকে আগাগোড়া স্ক্যান করে ফের শীতল কণ্ঠে আওড়ালো, — ' মেয়ে মানুষ হবে তুলোর মত। সাত চড়ে রা কাটবেনা। তুমি কোন জাতের? জবান চলে কেঁচির মত! আবার আমার মুখে মুখে কথাও বলে? ইচ্ছে তো করছে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিই। ' 
শুদ্ধর শীতল হুমকিতে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করলনা রিমঝিম। সে-ও চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, — ' আমি যে-ই জাতের না হই? আপনি যে আস্ত অজাত সেটা নিশ্চয় জানেন? ' 
ঠোঁটের কোনে শুদ্ধর হাসিটা চওড়া হলো। রেলিংএ গা এলিয়ে দিয়ে ট্রাউজারের পকেট থেকে ছাদের গেটের চাবি বের করে আঙুলের মাঝে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, — ' ওকে! বেয়াদবি প্রথমবারের মত করেছো বলে মাফ করা হলো। না-ও লেটস স্টার্স্ট। নাম কি? ঠিকঠাক উত্তর না দিলে তোমাকে সহ চাবি ছাদ থেকে ফেলে দেব।' 
 
রিমঝিম তখনও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামবর্ণ আনন রোদের তাপে রক্তিম হলো। নাকের উপর মুক্তোর নাকফুল জ্বলজ্বল করছে ওর। ওকে ঠিক কতটা আদুরে লাগছে সেটা বোধহয় জানা নেই ওর। আর নেই বলেই হয়তো অনায়েসে দাঁড়িয়ে ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যস্ত৷ শুদ্ধর কথায় ওর মেজাজ খারাপ হলো আরও। এই লোক এমন করছে কেন ওর সঙ্গে? ঝাঝালো কণ্ঠে বলল,
 — ' আপনি স্পাইডার ম্যান?' 
 একহাত পকেটে গুঁজে, আরেকহাতে চাবি ঘোরাচ্ছে নির্বিকার ভঙ্গিতে। রিমঝিমের ঝাঝালো স্বরকে চার আনা পাত্তা না ভ্রু উঁচিয়ে দিয়ে বলল, — ' তোমার স্পাইডার ম্যান পছন্দ? ' 
— ' আপনি বলুন? ' 
— ' তোমার রুচি এত খারাপ? অবশ্য সবই সঙ্গদোষ। ' 
— ' মানে কি? ' 
শুদ্ধও ঠিক একই সূরে বলল, — ' নাম কি?'  
শুদ্ধর এই নাম কি, নাম কি জপতে দেখে মহাবিরক্তি হলো রিমঝিম। সেদিন লিফটে আটকে ওর পুরো নাম বলেছিল আর আজ এমন ভাব করছে যেন কিছুই জানেনা! নাম নিয়ে এত ক্যাচাল আর ভালো লাগছেনা ওর। নাম বলে দিলে যদি এই লোক আজকের মত পিছু ছাড়ে তবে নাম শুনেই খুশি থাক জংলি বন মানুষ। গোফ-দাঁড়ির যেই অবস্থা তাতে বনমানুষের বংশধর থেকে তো কোনো অংশে কম লাগছেনা। নাম বলতে চেয়েও ত্যাড়ামি ছাড়তে পারলনা রিমঝিম। নাক-মুখ কুচকে প্রতুত্তর করল, 
— ' আপনি জানেন না?' 
— 'তুমি জানো না?' 
— 'জানি। ' 
— ' জানলে আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? মিষ্টি করে সালাম দিয়ে, নাম বলে বিদেয় হও। আমার কাজ আছে।' 
— 'তোর ঘোড়ার ডিম আছে বন মানুষ।' কথাটা বিড়বিড় করে বললেও রিমঝিম ত্যক্তবিরক্ত হলো। নাম নিয়ে এই লোকের এত ত্যানা প্যাচানোতে মেজাজ চড়ল। একটা ইট তুলে মাথায় মারতে পারলে সব তামাশা বের হয়ে যেত জংলিটার। সেই বিরক্তির রেশ ধরে রুক্ষ্ণভাবে বলল,— ' রিমঝিম। ' 
 
— ' কি?' 
 
— ' রিম..ঝিম। কানে শোনেন না?' 
 
— ' হুম...ছ্যাত..ফ্যাত.... গুড..... নাম আর কাম দুটোই মিলে যায়। কথায় কথায় ছ্যাত করে উঠে ফ্যাত করে নাক দিয়ে সর্দি বের হয়। এবার ওড়নাটা মাথায় ভালোভাবে জড়িয়ে সালাম দাও।' 
স্বীয় নামের বিকৃতিকে পাত্তা দিল না রিমঝিম।বরং নরম হলো খানিকটা। অনুরোধের সূরে বলল , 
— ' চাবিটা দিন ভাইয়া।' 
— ' ভাইয়া! ' ভাইয়া ডাক শোনামাত্র তড়াক করে সোজা হলো শুদ্ধ। ওর চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে ভাইয়া ডাকটা ঠিক পছন্দ হয়নি। পছন্দ না হলে নেই। রিমঝিম তো তাকে ভাইয়া বলবেই। বরং একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। রিমঝিম একটু এগিয়ে এলো শুদ্ধর কাছাকাছি। মিষ্টি করে হাসল। হেসে বলল, — ' আসসালামু আলাইকুম বড় ভাইয়া। ছাদের দরজাটা লক হয়ে গিয়েছে। চাবিটা দিন প্লিজ। বাসায় যেতে পারছিনা। আমি আপনার ছোট বোনের মত, তাইনা? ' 
কিয়ৎক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অদ্ভুতভাবে রিমঝিমকে দেখল শুদ্ধ। আঙুলে ঘোরানো চাবিটা বলের মত ছুঁড়ে দিল। চাবিটা এসে রিমঝিমের পায়ের কাছে পড়তেই তড়িঘড়ি করে উঠিয়ে নিয়ে দরজাটা খুলে চলে এলো রিমঝিম। আসার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে একপল তাকাল শুদ্ধর দিকে। সে তখনও রেলিং-এ হেলান দিয়ে আছে। দৃষ্টি অবশ্যই রিমঝিমের দিকে। চোখজোড়া কেমন জ্বলজ্বল করেছে ওর। নাক সিঁটকে বিড়বিড় করে বলল,
 — ' ইতর। ' 
তবে ফিরে আসার আগে ঝড়ের গতিতে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল শুদ্ধ। যাবার আগে বলল,
 — ' ভাইয়া ডাকার অপরাধ মার্জনা করা হয়নি। হিসেবটা তোলা রইলো রিমঝিম মেহরিন।' 
 
--------------- 
 
ঘড়ির কাঁটায় দুপুর বারোটা বাজতেই কলেজ থেকে বেরিয়ে এলো ইরা। ছাইরঙা কামিজের সঙ্গে সাদা ক্রসবেল্ট, সাদা সালোয়ার, চুল গুলো দুদিকে বিনুনি গেঁথে সাদা ফিতা দিয়ে ফুল বানিয়ে রাখা। এককাঁধে ঝুলছে পার্পল রঙের ব্যাগ। ব্যাগের সঙ্গে ঝুলছে ভয়ংকরভাবে হাসতে থাকা 'লাবুবুডল'। ওর গন্তব্য এখন নাজিরাবাজার। রাফি সেদিন রাগ করে চলে যাবার পর দু'দিন পড়াতে আসেনি। যদিও ইরার মোবাইল থেকে স্যরি লিখে পাঠিয়েছিল কিন্তু রাফি কোনো জবাব পাঠায়নি। অগত্য আজ ইরাকেই যেতে হবে রাফির সঙ্গে কথা বলতে। কয়েকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেনি জাঁদরেল স্যারটা। রাফিদের বাসা চেনে ইরা। শুদ্ধর সঙ্গে আগেও কয়েকবার এসেছে ছোটবেলায়। বিশাল বড় সাবেকি আমলের দোতালা বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট পুকুর ছিল ওদের। ইরার মনে আছে। সেই পুকুরে পদ্মফুল ফুটে থাকত। অবশ্য অনেক বছর আগে এসেছিল ইরা। এখনও সেই ফুল আছে কি না কে জানে? রিক্সা থেকে নেমে রাফিদের বাড়ি খুঁজে পেতে একটুও বেগ পেতে হলোনা ইরার। তবে আগের মত বাড়িটার জৌলুস নেই। দোতালা বাড়ির সামনের সেই পুকুরের অবস্থা আরও খারাপ৷ দুরুদুরু বুকে কলিংবেল চেপে দাঁড়িয়ে থাকল ইরা। রাফি যদি বাসায় না থাকে? চলে যাবে নাকি? কিন্তু কি বলবে? বাসায়ও কাউকে বলে আসেনি ইরা। দরজা খুলল রাফি-ই। ভরদুপুরে ইরাকে দেখে থমকাল। হাতে বই ধরা তখনও। ইরাকে যখন পড়াতে যায়, তখন রাফি পরিপাটিভাবেই যায়। তবে এখন সে সবের বালাই নেই। ওর পরণে শুধুমাত্র একটা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। আম্মা আর কেয়া আপু তিতিরকে নিয়ে কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিল। সে তো ভেবেছিল ওনারা ফিরে এসেছেন। দোতালা থেকে বই আর খালি গায়েই নেমে এসেছে। কে জানত তার ইরাবতী হুট করে উদয় হবে? হাতের কারেন্ট এফেয়ার্স বইটা বুকের উপর আড়া আড়ি ভাবে ধরে লজ্জা নিবারণের প্রচেষ্টা চালাল। তবে প্রশস্ত বক্ষপট উন্মুক্ত রয়েই গেল। কোনোরকমে বিস্ময় চেপে হড়বড় করে বলল, — ' ইরা?' 
 
ইরার এতক্ষণ ভয় না লাগলেও হুট করে কাঁপা-কাঁপি শুরু হল। হাঁটু জোড়া বেঈমানী করল ওর সঙ্গে। কিশোরি মনে অন্যরকম অনুভূতির আনাগোনা অত্যাধিক বেড়ে গেল ইরার। রাফির বুকে পশম নেই। ওর প্রিয় স্যার বইয়ের ফাঁক দিয়ে লজ্জা নিবারণের প্রচেষ্টা করলেও তিনি পুরোদস্তুর সফল হোন নি। বইয়ের কোনা ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে পুরুষালি বক্ষের কালচে সার্কেল। সেই দৃশ্যে ঠোঁট জোড়া কাঁপল তিরতির করে। সেই কাঁপনি আটকে কোনোরকমে কাঁধের ব্যাগটা চেপে ধরে হড়বড়িয়ে বলল, — ' আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমি সেদিনের জন্য স্যরি। আপনি পড়াতে আসবেন আজ থেকে। আমি অনুরোধ করছি। আমি প্রতিদিন পড়া করব। কোনো উল্টাপাল্টা কিছু লিখব না। আমি স্যরি স্যার। ' 
ইরার ভয়ে কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়ায় কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গেল রাফি৷ তবে মেয়েটার নজর খেয়াল করে অপ্রস্তুত হলো ভীষণই৷ দরজা থেকে সরে কোনোরকমে বলল, —' কাম ইনসাইড ইরা।' বলেই স্ত্রস্ত পায়ে দোতালার দিকে ছুটে গেল রাফি। কোন কুক্ষণে কাপড়-চোপড় ছাড়া দরজা খুলেছিল ভেবেই কপাল চাপড়াল।  
 
চলবে....
Loading spinner

Reply
Page 1 / 2
Share:

Loading spinner