Golpo:Kache Asha Ba...
 
Notifications
Clear all

Golpo:Kache Asha Baron(Writer:Humaira Murtaza)

Page 2 / 2

Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ১২ 
 
ইরার হাতে একটা ডিসকোন আইসক্রিম। স্কুল উইনিফর্ম, ক্রসবেল্ট, দু-বিনুনি সবটা ঠিকঠাক থাকলেও কাঁধের ভারী ব্যাগটা অবশ্য নেই। ওটা ঠায় পেয়েছে রাফির চওড়া কাঁধে। ইরাকে ডান পাশে রেখে বেগুনি রঙের লাবুবু পুতুল দিয়ে সাজানো ব্যাগ সে অনায়েসে কাঁধে নিয়ে, দু-হাত পকেটে গুঁজে হাঁটছে। তখন দোতালা থেকে জামাকাপড় পরে মিনিট দুয়েকের মধ্যেই নেমে এসেছিল। এসে দেখে তার ইরাবতী তখনও দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে আর ভেতরে আসতে বলেনি। ঘরে কেউ নেই। একলা মেয়ে নিয়ে থাকাটা সমীচীন নয় ভেবেই বেরিয়ে এলো। এসে ইরার ব্যাগটা কাঁধ থেকে আলগোছে টান দিয়ে নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল, — ' তোমার কলেজ শেষ হয় দুটোর সময়।' 
রাফি কথাটা অতটাও গম্ভীরভাবে বলেইনি। জানা কথা ফাঁকিবাজ মেয়েটা ক্লাস বাংক করেছে। তারপরও জানতে চাইল। কেননা বন্ধুর ছোটবোনের সঙ্গে কথা শুরু করার একটা যথাযথ কারণ চায় অবশ্যই। ইরাকে নিয়ে ওর অনুভুতি যতই থাক, সেসব আজীবন গোপন রাখতে হবেই ওকে। নির্দিষ্ট দুরুত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাকে রাফি। 
ইরা একটু ভয়ই পেল। রাফি ভাই যদি বড় ভাইয়াকে বলে দেয়? যাক সাহস করে এসেছে যখন তখন সত্যিটায় বলা উচিত। ব্যস সেও রাফির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, — ' ক্লাস ফাঁকি দিয়েছি স্যার।' 
ইরার সরল স্বীকারোক্তিতে কথায় হেসে ফেলল রাফি। খ্যাকখ্যাক করে ভিলেনের মত হাসি নয়। বরং সুন্দর করে অধর ছড়িয়ে হাসল সে। বিস্ময় নিয়ে সেই হাসি দেখল ইরা। তার রামগড়ুলের ছানা স্যার আবার হাসতেও পারে? তবে ওকে পড়াতে গেলে মুখটাকে বাংলার পাঁচ বানিয়ে রাখে কেন? যেন বহু বছর তার ঠিকঠাক পেট পরিস্কার হয়না! 
 ইরার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে রাফির অসুবিধা হচ্ছে। সে তো লম্বা পা ফেলে জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষের অন্তর্ভুক্ত। তার দিন যায় দৌড়ের উপর। সকালে কোচিং ক্লাসে পড়ায়। সেখান থেকে বেরিয়ে বিসিএস এত কোচিং-এ যায়। বাসায় ফিরে আবার পড়তে বসে। এরমধ্যে কোথাও ইন্টারভিউ থাকলে সেদিকে ছোটাছুটি করে। বিকালে দুটো টিউশানি করে, রাতের আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত ইরাকে পড়াত। ঘরে ফিরে খাবার-দাবার খেয়ে আবার নিজের পরীক্ষার প্রিপারেশন। রাত গড়িয়ে কখন সকাল হয় রাফি টেরই পায়না। সারাদিন চরকির মত ঘুরতে থাকা জীবনে এখন ছোট ছোট কদমে ইরার সঙ্গে হাঁটতে অবশ্য মন্দ লাগছেনা। আল্লাহপাক তাঁর জন্য যদি ইরাবতীকে লিখে রাখেন তবে কোনো এক জ্যোস্নারাতে সে-ও তার ইরাবতীকে নিয়ে বেরোবে। অজানার পথে হাঁটবে। স্বপ্নের মত ছোট্ট সংসার সাজাবে। আর.. বাকি ভাবনাটুকু অবশ্য রাফি শেষ করতে পারল না তার আগে ইরার ডাকে ভাবনার সুতোয় টান পড়ল। বাংলার প্রবাদবাক্য আছেনা? গাছে কাঁঠাল,গোঁফে তেল। রাফির অবস্থা ঠিক তেমন। বরঞ্চ তার চেয়েও খারাপ। ওর তো কাঁঠাল গাছই নেই! মন থেকে সমস্ত চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে ইরার দিকে মনোযোগ দেয় রাফি। ঠোঁট ওল্টিয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে বলল,
— ' স্যার আপনি কি এখনো রেগে আছেন?' 
সমস্ত ভাবনাকে একপাশে রেখে স্ব-গম্ভীরতায় ফিরে এলো রাফি। বলল, 
— ' তুমি বলো ইরা? আমার রেগে যাওয়া উচিত?
কপাল কুঁচকে রাফির দিকে তাকাল ইরা। বলল,
— ' আপনি সত্যিই রেগে গেছেন? তাহলে একটু আগে হাসলেন কেন? 
— ' তুমি বলো.. একা, এতদূর চলে এলে? কাউকে জানিয়েছো? ' 
— ' আমি আপনাকে স্যরি বলতে এসেছিলাম স্যার। ' বেশ শিশুসুলভ আর কৌতুহল নিয়ে কথাটা রাফিকে বলল ইরা। বলেই ফের আইসক্রিমে মনোযোগ দিল। 
রাফিও শুনল সে কথা। নিজেকে যথাযথ গম্ভীরতার খোলসে আটকে বলল,
— ' শুদ্ধ আমাকে ভরসা করে তোমার পড়াশোনার দায়িত্ব দিয়েছে। আর তুমি যদি পড়াশোনা না করে দুষ্টুমি করো, রেজাল্ট খারাপ করো তাহলে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা বহাল থাকবে?' 
আইসক্রিম খেতে খেতে মাথা নাড়াল ইরা। যেন সে ঢের বুঝতে পেরেছে আর পেরেছে বলেই বলল,
 — ' আমি আর দুষ্টুমি করব না স্যার। তাহলে আপনি পড়াতে আসবেন? ' 
— ' প্রতিদিন হোমওয়ার্ক করবে?' 
ইরা মুখ বাঁকাল। এই স্যার সুযোগে ওকে বেশি পড়া দেয়ার পায়ঁতারা করছেন। নাহ! স্যারের ফাঁদে পা দেয়া যাবেনা। অভিমানীস্বরে বলল, 
— ' বেশি বেশি পড়া চাপালে করব না স্যার। ' 
ইরার বাচ্চামিতে ফের হেসে ফেলল রাফি তবে পুনরায় নিজের গম্ভীরসত্ত্বায় ফিরে এলো। বলল, — ' অলরাইট।'  
ইরা হয়তো অন্য কিছু বুঝল। ছেলেমানুষী আনন্দে দুটো লাফ দিয়ে ফেলল ইরা। বলল, — ' ওকে স্যার। ডান... ডান। আপনি আজ থেকে আসবেন। অবশ্যই আসবেন। আমি পড়ব৷ সব পড়ব। একটাও বাদ দিব না৷' 
বিনিময়ে রাফি আর কিছু না বললেও হাত উঁচিয়ে রিক্সা ডাকল। গম্ভীরকণ্ঠে আদেশ করল, 
— ' রিক্সায় বসো ইরা।' 
— ' কিন্তু স্যার?' 
— ' রিক্সায় বসো ইরা?' 
— ' আপনি পড়াতে যাবেন? সত্যি করে বলেন নয়তো আমি যাব না৷ ' 
ইরার ব্যাগটা রিক্সার সিটের উপর রেখে দু-হাত বুকে হাত বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে রইলো রাফি। আইসক্রিমটা ফেলে দিয়ে ঝট করে রিক্সায় উঠে গেল ইরা। ইরার উঠতে দেরি, ভাড়া মিটিয়ে দিতে দেরি হলোনা রাফির। রিক্সাওয়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল,— ' সাবধানে যাবেন মামা। ' বলেই পিছু ফিরে হাঁটা শুরু করল। আর ছলছল নেত্রে রাফিকে জায়গাটা থেকে প্রস্থান করতে দেখল ইরা নির্বাক,নিশ্চল। 
---------------
 
অফিসে নিজের রিভলভিং চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসা মাহাদ। পরণে নেভিব্লু শার্ট যার হাতাটা পরিপাটিভাবে কনুই অব্দি ভাঁজ করা। দৃষ্টি অজানায় আটকে আছে। কপালে ভেসে থাকা বেশ কয়েকটি ভাঁজ জানান দিচ্ছে তার অভ্যন্তরীণ দোলাচালের হিসেব। ব্যক্তিগত সহকারী হারুন সাহেব আজই এনেছেন কেয়ার সমস্ত খবরাখবর। সেই থেকে স্থবির। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি। কাছের বন্ধুর অকাল মৃত্যুতে যতটা ধাক্কা খেয়েছে তার চেয়েও বেশি দ্বিধায় পড়েছে তার প্রিয় মানুষের দুরাবস্থায়। হারুন সাহেব বিনীতভাবে দুহাত সামনে এনে সম্মানের সহিত দাঁড়িয়ে আছেন। প্রশ্নটা তাকেই করল মাহাদ, 
— ' আমার কিছু করা উচিত তাদের জন্য?' হারুন সাহেব বিচক্ষণ হবার সঙ্গে এই কোম্পানির পুরোনো কর্মচারী। মানুষের স্বভাব পড়তে তিনি অভ্যস্ত। সেই অভ্যস্ততা থেকেই জানালেন, 
— ' ওনাকে আমার আত্মমর্যাদাপূর্ণ নারী মনে হয়েছে স্যার। ওনি আমাদের সাহায্য নিতে রাজী হবেন না। ' 
মাহাদকে বিভ্রান্ত মনে হলোনা। যেন সে জানে হারুন সাহেব কি বলতে চাইছেন। তারপরও শোনার জন্য উদগ্রীব হলো মাহাদ৷
— 'ওনাদের সাহায্য পৌছে দিতে হয় কৌশলে।' বলেই হারুন সাহেব হাসলেন সামান্য। আর ওপাশে চেয়ারে বসা মাহাদের কপালের ভাঁজ গায়েব হলো। ঠোঁটের কোনে জমা হলো এক টুকরো রহস্যময় হাসি৷ 
-------------
 
বিকেলে বুটিক হাউজে এলো কেয়া। ইদানীং শীত বিদেয় নিতে শুরু করেছে৷ রোদের তীব্রতা বাড়ছে। শেষরাত ব্যতীত সারাদিন তেমন শীত করেনা৷ তবে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে সামনেই শৈত্য প্রবাহ ধেয়ে আসছে। আজ একটু বেশি কাপড় সেলাই করবে কেয়া। মেয়েটার জন্য শীতের কিছু কাপড়চোপড় নেবে। তিতিরপাখির জন্য এক বক্স সিরিয়াল ফুডও নিয়েছে। কেয়া কাজ শুরু করার পর থেকে মেয়েটা বিরক্ত করা কমিয়েছে। খেলনা-পাতি নিয়ে এখন প্রায় সারাদিনই খেলে। বুটিক শপের শায়লা আন্টি কেয়াকে ভীষণ স্নেহ করেন। ও আসতেই বেশ কয়েকটা ড্রেস এগিয়ে দিয়ে বলল,
 — ' এগুলার গলার কাজ করতে হবে।' 
খুশিমনে কাপড় গুলো নিয়ে গুনে দেখল কেয়া। মোট দশটা জামা। যদি পঞ্চাশটাকা করেও আন্টি ওকে আজ মুজুরি দেয়! তবে প্রায় পাঁচশত টাকা পাবে কেয়া। আনন্দে নেচে উঠল কেয়া। অধীর আগ্রহে, বেশ যত্নাসহকারে জামা গুলো শেষ করে, কিছু কাজও শিখে ফেলল। ততক্ষণে সন্ধ্যার আজান দিয়েছে। নামাজটা পড়ে বুটিক শপ থেকে বের হবার আগে শায়লা আন্টিকে কাজ বুঝিয়ে দিল। মহিলা বেশ প্রসন্ন হলেব। মুখাবয়ব দেখেই বুঝল কেয়া। তবে বিস্ময়ের চুড়ান্তে পৌছালো যখন মহিলা ওর জন্য চকচকে একহাজার টাকার নোটটা এগিয়ে দিল! প্রথমে ভাবল ভাংতি নেই আন্টির কাছে। ওর কাছেও নেই। তাই বলল, 
— ' আন্টি আমার কাছে ভাংতি নেই।' 
অমায়িকভাবে হাসলেন মহিলা। জানালেন, 
— ' পুরোটাই তোমার পারিশ্রমিক কেয়া। আমি মুজুরি বাড়িয়ে দিয়েছি৷ প্রতিদিন তুমি আমার দশটা জামার গলার কাজ করে দেবে।চাইলে বেশিও করে দিতে পারো। প্রতিটা জামার জন্য একশটাকা বরাদ্দ তোমার। ' শায়লা আন্টির কথায় চমকে গেল কেয়া। প্রতিদিন একহাজার টাকা ইনকাম করলে ও মাসে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা ইনকাম করতে পারবে! এত টাকা! কেয়ার দুচোখে পানি এলো। শায়লা আন্টির হাত ধরে কেঁদে ফেলল ঝরঝরিয়ে। তিতিরের সমস্ত প্রয়োজন মেটানোর পরও বাবার জন্য ওষুধ কিনতে পারবে,ভাইটা সারারাত পড়াশোনা করে,আবার সারাটাদিন চরকির ন্যায় ঘুরতে থাকে তাকেও কিছুটা সাহায্য করতে পারবে বোধহয়! টাকাটা নিয়ে বাইরে এলো কেয়া। অনেকটা দিন পর আজ কেয়ার গলার কাছে চেপে থাকা কষ্টরা খানিকটা প্রশমিত হলো।শায়লা আন্টি জানিয়েছেন কেয়া চাইলে বুটিক শপ থেকে কিছু জামাকাপড়ও নিতে পারবে। আস্তে-ধীরে টাকা পরিশোধ করলেই হবে। ঠিক তখনই মনে হলো কেয়ার প্রায় চার বছর যাবত জামাকাপড় কেনেনা কেয়া। ঠিক তখনই সেদিনের গাড়িটা এসে থামল কেয়ার ঠিক সামনে। চমকে যাবার সময় পেলো না সে। তার আগেই গাড়ি থেকে নেমে সামান্য হাসল মাহাদ। যেন হাসলে তাকে কেউ পেটাবে। সে এগিয়ে গিয়ে বলল,
— কেয়া? 
আজ ফের হকচকিয়ে গেল কেয়া। বলল,— ‘আপনি? এখানে?’
— ‘একই প্রশ্ন আমার তরফ থেকেও যেতে পারে কেয়া….’
আমতা-আমতা করল কেয়া। বলল, 
— ‘ওই সামনের বুটিক শপে জব করি আমি। রেগুলার আসি।’
মাহাদ এবারে ভাবলেসহীনভাবে জবাব দিল ,— ‘গ্রেইট।’
অকারনেই অস্বস্তিতে গাট হলো কেয়া। ফের মাহাদের দিকে একবারও না তাকিয়ে বলল, — ‘আমি তবে আসি। বাসায় তিতির একা আছে।’
— ‘তিতির কে?’ বেশ গম্ভীরমুখে প্রশ্নটা করল মাহাদ। তবে বিস্মিত হলো। সরাসরি তাকাল মাহাদের চোখের দিকে।বাদামী বর্ণের জ্বলজ্বলে সেই চোখজোড়ায় গভীরতা বিরাজ করছে। বলল, — ‘ তিতির আমার তিন বছরের মেয়ে।’
— ‘আর তিয়াশ? সে কোথায়? ভর সন্ধ্যেবেলা আপনাকে বুটিক শপে পাঠিয়ে দিল!’ 
কিছুক্ষণ চুপটি করে দাড়িয়ে রইলো কেয়া।উথলে আসা কান্নাদের সামলে নিয়ে বলল,
— ‘তিয়াশ ফিরে আসেনি মাহাদ।’ বলেই আর একটুও থামল না কেয়া। দ্রুত পায়ে হেঁটে পেরিয়ে গেল জায়গাটা। 
 
—--------
 
সন্ধ্যে নামতেই উশখুশ শুরু করল ইরা। একবারব উঁকি দিল শুদ্ধর ঘরে।ভাইয়ের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করে ফিরে এলো।শীতের দিনেও এসি ছেড়ে নবাবজাদা ভোদড়ের ন্যায় ঘুমিয়ে আছে। একটি ভেংচি কেটে ফিরে এলো নিজ কামরায়। তখনই এলো স্নিগ্ধ। হাতে চিপসের প্যাকেট। বোনের সঙ্গে শেয়ার করে খেতে এসেছে সে। হাজারহোক ইরা তার প্রিয় বোন তবে এসে বোনকে ব্যস্তভাবে পায়চারি করতে দেখে কপাল কুচকে গেল। বলল, — “রাফিদ ভাইয়া আসবেনা?”
 স্নিগ্ধর কাছ থেকে চিপসের প্যাকেকেড়েট নিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,— “জানলে কি পায়চারি করি?” 
ঠিক তখনই কলিংবেল বাজলে দৌড়ে গেল। যেন সে জানে রাফিই এসেছে তবে দরজা খুলতেই চমকে গেল। ওপাশে ঠিক ওর ন্যায় দেখতে মেয়েটা! সঙ্গে বোধহয় মেয়েটির মা। বোনের পিছু-পিছু স্নিগ্ধও এসেছিল। রিমঝিমকে দেখে চমকে উঠল সে। গলার সমস্ত জোর একত্র করে তারস্বরে চেঁচাল। — ‘আপু! তোর ডুপ্লিকেট কিভাবে এলো? ভুত নাকি?’’ 
ফলাফলস্বরুপ বাড়ির সকলে ছুটে এলো। এলো সুমনা বেগমও। যাকে দেখে চমকে গেল শিরিন! বললেন,— “সুমনা আপা?”
শিরিনকে একটুও পাত্তা দিল না সুমনা। সে তো ব্যস্ত তার নাড়ি ছেড়া ধনকে দেখতে। ভীষণ বিরক্তি নিয়ে সে আজ সুমনার কাছে উপস্থিত হয়েছে। সকলের পেছনে শুদ্ধও এসেছে। ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো হয়ে আছে। ঘুমের কারণে কেমন যেন বোকা বোকা লাগছে চেহারাটা। সেই বোকা ভাব দেখে ঠোঁট টিপে হাসল রিমঝিম। 
 শুদ্ধ আশা করেছিল চাচির মত রিমঝিমও ঝটকা খাবে। তবে ওর মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেলনা।তবে কি ছোট মাকে আগেই দেখেছিল রিমঝিম? পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে থাকল শুদ্ধ। 
সুমনা এগিয়ে এলেন। ওনার চোখভর্তি জল। রিমঝিমকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন ,— ‘আমার বাচ্চা!’
 
চলবে....
Loading spinner

Reply
Posts: 18
Topic starter
(@humaira-murtaza)
Joined: 4 months ago
 
পর্ব — ১৩ 
 
চাচীর জোরাজুরিতে রিমঝিম আজ নিচতালায় এলো। প্রথমে চাচীকে বেশ কয়েকবার নিষেধ করেছে। ওদিকে শিরিন হলেন নাছোড়বান্দা। বাড়িওয়ালার সঙ্গে তাকে নামি দেখা করতেই হবে। এটাকে সামাজিকতা রক্ষা করা বলে। রিমঝিম ব্যপারটা টলানোর চেষ্টা করল। তাছাড়া বাসায় ফেরার সময় গ্যারেজে শুদ্ধর ধেড়ে মার্কা বাইকটাও দেখে এসেছে। ওই লোক থাকাকালীন ওবাসায় যেতে একদমই ইচ্ছে ছিলনা ওর। তবে শিরিন ছাড়লেন না ওকে। সাধারণ ঘরোয়া পোশাকে নিচে নেমে আসতে গেলে আরেকদফা ধমকালেন রিমঝিমকে। রিমঝিম অবশ্য কিছু বলল না। বরং প্রথমদিনের মত চাচীকে একটু ঝটকা খাওয়ানোর জন্য বাধ্য মেয়ের একটা ভালো থ্রিপিস পরল। চিকেনকারী কামিজ আর ফারসি সালোয়ারটা সাদা, ওড়নাটা টকটকে লাল। শ্যামলাবর্ণের রিমঝিমকে লাল রঙে বেশ মানায়। তৈরী হয়ে ভদ্র মেয়ের মত নিচে চলে এলো। তাছাড়া চাচীর উপস্থিতিতে ওই গুন্ডাটা কিছু করতে পারবে না অন্তত। কলিংবেল দিতেই দরজা খুলল সেদিনের ইরা নামের মেয়েটা। রিমঝিম আড়চোখে চাচীর দিকে তাকাল। তিনি হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে আছেন। পরপরই যখন সুমনা এলেন, শিরিনের চেহারার রঙ বদলে গেল! তবে ওকে অবাক করে দিয়ে সুমনা এসে জড়িয়ে ধরল রিমঝিমকে। ঠিক আগেরমত। ছোটবেলায় রিমঝিম যদি সুমনার চোখের আড়াল হত, অল্প সময়ের জন্য হলেও। ঠিক এভাবেই 'আমার বাচ্চা' সম্বোধন করে বুকে টেনে নিতেন রিমঝিমের মা। মায়ের প্রতি ওর আকাশস্পর্শী অভিমান। তবুও মাতৃস্নেহের আকুল আবেদন টলাতে পারলনা রিমঝিম। কতদিন পর মায়ের শরীরের ঘ্রাণ পেল সে! সেই আগের মতই আছে। মুহুর্তে শুদ্ধদের বাড়ির প্রবেশপথে আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণ হলো। একজন মমতাময়ী মায়ের সন্তানের কাছ থেকে দূরে আর্তনাদে ভারী হলো বাতাস। বাকিরা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। শিরিন অবশ্য টলছেন। যেকোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাবার মত অবস্থা! কোনোরকমে বললেন, — ' রিমঝিম বাসায় আয়।' বলেই আর একমুহূর্ত থামলেন না তিনি। টলতে টলতে সিড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। 
সুমনা তখনও রিমঝিমকে ঝাপটে ধরে রেখেছে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে তার বাচ্চাটা। ততক্ষণে রিমঝিমের চোখও ভিজে উঠেছে। মা-মেয়ের আবেগী মুহূর্তে ভাটা পড়ল। ওপাশ থেকে বোধহয় কোনো মহিলা এগিয়ে এলেন। বললেন, — ' ভাবী তুমি কাঁদছো কেন? কে এসেছে?' 
মায়ের কোল থেকে মাথা উঠিয়ে কন্ঠস্বরের মালিকিনের দিকে তাকাল রিমঝিম। মস্তিকে চাপ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতেই চমকে গেল। কাঁপাস্বরে আওড়াল, 
— ' সোহেলী ফুপু!' 
রিমঝিমকে অমন আচমকা দেখে সোহেলী বিমূর্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তবে একমাত্র আদরের ভাইঝির মুখে বহুদিন পর ফুপু ডাক শুনে সামলাতে পারলেন না নিজেকে। একছুটে এসে তিনিও জড়িয়ে ধরলেন রিমঝিমকে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন! রিমঝিম স্তম্ভিত হলো। একবার মায়ের দিকে, একবার আদরের ফুপুর দিকে আর আরেকবার তাকাল অদূরে দাঁড়ানো শুদ্ধর দিকে। ঠোঁটের কোনে কেমন রহস্যময় হাসি নিয়ে ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। যেন তার আগে থেকে জানা কোনো রহস্যের জট রিমঝিমের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আচমকা টান পড়ল বাহুতে। হকচকিয়ে গেল রিমঝিম। সুমনা আর সোহেলী একসঙ্গে ওর দুহাত ধরে ঘরের ভেতরে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷ তৎক্ষনাৎ ঝাঁঝিয়ে উঠল রিমঝিম। ভেজা কন্ঠে ঝাঁঝ আনার চেষ্টা করে বলল, 
— ' চাচী আমায় ডাকছেন।' 
রিমঝিমের মানা করাতে মেদুর ছায়া পড়ল সুমনার চোখে। তবে সোহেলী ওকে ছাড়লেন না। বরং সজোরে টেনে ধরে বললেন, — ' ওই ডাইনী ডাকলেই তোমাকে যেতে হবে কেন?' 
প্রতিবাদ করল রিমঝিম, — ' আমার চাচীকে কিছু বলবেন না। ' 
মুখটা বাঁকাল সোহেলী। ঠিক আগের মত৷ কাউকে বা কোনো কথা পছন্দ না হলে এভাবেই মুখ বাঁকাতেন তিনি। রিমঝিমের এই ফুফু ওর খুব প্রিয় ছিলেন। তবে খুব একটা আসতেন না তিনি। কিন্থ যখন আসতেন তখনকার স্নেহময় সময়ের কথা ভুলতে পারেনি রিমঝিম৷ সম্ভবত ঢাকার কোনো ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন বলে ওর বাবা কথা বলতেন না ফুপুর সঙ্গে৷ তবে বছরান্তে একবার রিমঝিমের সঙ্গে উনি দেখা করতে রংপুর যেতেন। সঙ্গে একটা মেয়েও নিয়ে যেতেন। ঠিক তখনই চোখ পড়ল ইরার উপর। এটাই সেই মেয়েটা নাকি? শেষবার ফুপুকে দেখেছিল ওর আম্মুর বিয়ের দিন। তখন এই মেয়ে কি সাথে ছিল? মনে পড়ল না রিমঝিমের। তবে ইরাও বিস্ময় নিয়ে ওকেই দেখছে! কারো মধ্যে এত মিল থাকতে পারে? স্নিগ্ধও হা করে তাকিয়ে রিমঝিমকে দেখছে। ধীরে ধীরে সুমনার কাছে এসে বলল, — ' আম্মু? এটা কে?' 
রিমঝিম অবাক হলোনা। মায়ের বিয়ে হয়েছে প্রায় দশ বছর হলো। এই বয়সী বাচ্চা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সুমনা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই বাঁধ সাধল শুদ্ধ। বলল, — ' ছোট আম্মু? তোমাদের মেলোড্রামা শেষ হলে এসো। অতিথিকে আর কতক্ষণ বাইরে দাড় করিয়ে রাখবে?' 
সুমনার কাছ থেকে দূরে সরে গেল রিমঝিম। বলল, — ' আমি যাব না। ' 
সোহেলী চেপে ধরলেন, — ' আমি তোমাকে যেতে দিচ্ছিনা। ' বলেই ঠেসেঠুসে রিমঝিমকে এনে সদর দরজা বন্ধ করে দিলেন। ফের উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন,
— ' ডাইনীর জন্য অত চিন্তা করতে হবেনা। আর যাইহোক তোর জন্য মরে যাবেনা। ' 
সোহেলীর কথা কেড়ে নিল শুদ্ধ, 
— ' প্রাণের চাচীর জন্য তোমার ভাইঝি মরেই যায় মেজো আম্মু। ' বলেই ঠোঁট টিপে সামান্য হাসল শুদ্ধ। তারপর বসল রিমঝিমের মুখোমুখি সোফায়। 
ফের মুখ বাঁকালেন সোহেলী। বললেন, 
— ' চাচী তো ভালোবাসার অন্ধ পট্টি পরিয়ে রেখেছে! ' স্নিগ্ধ এগিয়ে গেল ভাইয়ের কাছে। চুপিচুপি বলল, 
— ' ভাইয়া এটা কে?' 
লম্বা একটা হায় তুলল শুদ্ধ৷ কনুইয়ের ভাঁজে স্নিগ্ধর মাথাটা আটকে নিয়ে বলল, — ' ফিসফিস করে বলছিস কেন? এটা লস্ট প্রিন্সেস। তোমার মেলায় হারিয়ে যাওয়া বড় বোন। ডাইনী টাওয়ারে আটকে রেখেছিল এতদিন। রাজকুমারের অপ্পেক্ষায় আছে। বাট নাথিং টু ওরি। রাজকুমার জলদি পৌছে যাবে।' 
কটমট করে শুদ্ধর দিকে তাকাল রিমঝিম। সোহেলী ছেলেমেয়েদের উদেশ্যে করে বলল,
— ' ওকে দেখে রাখ। যেতে দিবিনা। ভাবী চলো? মেয়েটা এতদিন পর এলো। কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করি। ' 
শুদ্ধ ছেড়ে দিল স্নিগ্নকে৷ পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসে বলল, 
 — ' প্রিন্সেসকে আঁটকে রাখব কিভাবে মেজো আম্মু? একটু ধমক দিলেই তো যমুনার পানি ঢালা শুরু করবে৷ ' 
— ' মেয়েটাকে বিরক্ত করিস না শুদ্ধ।' বলেই সোহেলী চলে গেলেন। তবে তার আগে সুমনাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন। মায়েরা যেতেই বানরের মত লাফ দিয়ে রিমঝিমের কাছে এসে বসে পড়ল স্নিগ্ধ। কৌতুহল নিয়ে বলল,— ' তুমি আমার আপু হও?' 
স্নিগ্ধকে উত্তর দেয়ার আগে ইরাও এসে বসল। ওর হতবিহ্বল ভাবটা এখনো কাটেনি। সে-ও স্নিগ্ধর মত রিমঝিমের গা ঘেষে বসে বলল, — ' আম্মুকে ফুপু বললে তাইনা? তাহলে তুমি আমার বোন হও?' 
রিমঝিম পড়ল বিপাকে। অস্বস্তি ঘিরে ধরল। কি বলবে কিছুই বুঝলনা। সে নিজেও হতবুদ্ধি হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে পড়বে জানলে জীবনেও আসত না। সে তো চাচীকে ঝটকা দিতে এনেছিল।মাঝখান থেকে রিমঝিম নিজে ঝটকার উপর পটকা খাচ্ছে। মাথা নাড়িয়ে ইরা আর স্নিগ্ধর কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল রিমঝিম। তবে শুদ্ধ সেখানে উপস্থিত থাকতে আদৌও সেটা সম্ভব? বরং ফের একটা হায় তুলল। তুলে বলল, — ' লস্ট প্রিন্সেস তোদের আপু হয়না। ' 
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শান্ত অথচ ক্ষুরধার চোখে শুদ্ধর দিকে তাকাল রিমঝিম। যার অর্থ তোকে এত বেশি বুঝতে বলেছে কে রে ছাগল? 
— ' তাহলে?' 
— ' ওনি তোদের হবু ভাবী। যা সালাম কর ভাবীকে।' 
কথাটা কানের মধ্যে ঝা ঝা করে উঠল রিমঝিমের। ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল। অহেতুক এখানে বসে এই গুন্ডাটার ফাতরামি সহ্য করার কোনো মানে নেই। যাবার জন্য পা বাড়াতেই ওকে আবার চেপে ধরল স্নিগ্ধ। বলল,
— ' তুমি সত্যি আমার ভাবী?' 
মাঝখান থেকে সংশোধন করে দেয় শুদ্ধ, — ' বড় ভাবী!' 
 এবার রেগে গেল রিমঝিম। কপাট রাগ নিয়ে শুদ্ধকে উদেশ্য করে বলল,
— ' জংলি ছাগল কোথাকার! আর একবার যদি উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন...?' 
— ' আচ্ছা? তাহলে কি কান্নাকাটি করবে? তুমি কান্নাকাটি করলেও তো বিপদ। চোখের পানির আগে নাকের সর্দি ঝরে। ' 
শুদ্ধকে ছাগল বলাতে ওর কিছু এলোগেলো না৷ তবে ইরা লাফিয়ে উঠল। আজ অব্দি শুদ্ধকে কিছু বলে কেউ পার পায়নি! সেখানে এই আপুটা ভাইকে মুখের উপর ছাগল বলে পার পেয়ে গেল! বরং ভাই ঝগড়া করছে এই মেয়েটার সঙ্গে? কেন? তাছাড়া এটা ওর সম্পর্কে বোন হয় বুঝতে বাকি নেই ইরার। সে এসে রিমঝিমকে টেনে সোফায় বসাল। বলল, — ' ওই ছাগলের কথা আমরা বিশ্বাস করিনি আপু। তুমি আমার বোন তাইনা? দেখো আমরা একইরকম দেখতে। প্রথমদিন তোমাকে দেখে তো আমি চমকে গেছিলাম। ' 
— ' লস্ট প্রিন্সেস বেশিক্ষণ থাকবেনা চামচিকাবতী। তার ডাইনী মন্ত্র আওড়ালেই ফুরুত।ওনার পাওয়ারে আমাকে ছাগল বলে বেশিসময় পার পাবিনা। ' 
— ' আর আজ দরজা খুলে আমি চমকে গেছি আপু।তুমি মাহিনের বোন তাইনা?' মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটল স্নিগ্ধ। 
সামান্য মাথা নাড়িয়ে রিমঝিম বলল, — ' হ্যাঁ। ' 
— ' তোদের ভাবী হয়। ভুলে যাস না। ' 
রিমঝিম এতক্ষণ চুপ করেছিল ভদ্রতার খাতিরে। কিন্তু এই লোকটা ওকে ভদ্র থাকতে দিল কোথায়? বেয়াদবি করলেই সবাই মিলে ওর চাচীকে দুষবে। তাই আরও সংযত ব্যবহার করছিল। কিন্তু এই ভাবী, ভাবী জপ শুনতে বিরক্ত লাগছিল। নিজের আসল সত্ত্বায় ফিরল রিমঝিম। বলল,
— ' আপনার এখানে কি কাজ? অহেতুক ফালতু না বকে বিদেয় হোন। ' তারপর বিড়বিড়িয়ে বলল,— ' যতসব উজবুক পাতিনেতা। ' 
 
চলবে.....
Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner