লেখিকা:জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:৩
কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো কই! পিঠটা বিছানায় লাগানোর আগেই ভদ্রলোকের রাশভারী গলার স্বর কানে এসে বারি খেল, ‘এত তাড়াতাড়ি রান্না শেষ?’
মেহেরুনের মেজাজ খারাপ হলেও যথেষ্ট সাবলীল গলায় বলল, ‘খালা সব রেঁধে ফেলেছেন।’
‘বেশ। সময়টা তবে অন্য কাজে লাগাও। পাগুলো টিপে দাও আমার।’
‘কী?’ হকচকাল মেহেরুন। ড্যাবড্যব করে চেয়ে রইল ওয়াহীদের দিকে। ওয়াহীদ এখনো তার দিকে ফিরেনি। ওভাবেই বলল,
‘এত অবাক হওয়ার মতো কিছু হয়নি, মেহেরুন। স্ত্রী হয়ে স্বামীর সেবা করাটা তোমার কর্তব্য। অযথা নাটক না করে, যা বলা হয়েছে তা করো।’
মেহেরুন বুঝতে পারল, লোকটা তার সাথে ইচ্ছে করে এমন করছে। তাকে পছন্দ হয়নি বলে ইচ্ছে করেই জ্বালাচ্ছে তাকে। কষ্ট দিতে চাইছে। সে চোখ বুজে বার কয়েকবার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘আমাকে যদি আপনার এতই অপছন্দ হয় তবে বিয়ে কেন করতে গেলেন? আমার মা বাবা তো আর মরে যাচ্ছিল না আপনার কাছে আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য। অযথা বিয়ে করে এখন কেন আমার সাথে এমন আচরণ করছেন? আমার অন্যায়টা কোথায়?’
ওয়াহীদ উঠে বসল চট করে। চোয়াল শক্ত করে তাকাল মেহেরুনের দিকে। মেহেরুন চোখ নামাল। ভীত হলো বোধহয়। ওয়াহীদ আমর্ষ গলায় বলে উঠল,
‘গলার স্বর যেন কখনো আমার উপর চড়াও না হয়। আমাকে বিয়ে করার আগে তোমার ভাবার উচিত ছিল। চেন না জানো না, অথচ নাচতে নাচতে বিয়ে করে বসলে? কেন? আর এখানে অন্যায়ের কথা আসছে কোথ থেকে? আমি তো তোমার সাথে অন্যায় কিছু করিনি এখনো। ঘরের কাজ করা, স্বামীর সেবা যত্ন করা এগুলো তো প্রত্যেক স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নাকি তুমি চেয়েছ, বড়োলোক একটা ছেলেকে বিয়ে করে পায়ের উপর পা তুলে রানী হয়ে জীবন পাড় করবে? ওসব সম্ভব নয়, মেহেরুন। আমার এখানে থাকতে হলে তোমাকে আমার মর্জি মতোই চলতে হবে। এবং এই নিয়ে যেন আমাকে দ্বিতীয়বার আর কোনো কথা বলতে না হয়।’
মেহেরুন আর চোখ তুলল না। সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া মেয়ে স্বামীর মুখের উপর জবাব দিতে পারল না কোনো। সংযত করল নিজেকে। ওয়াহীদ ফের শুয়ে পড়ল। পাগুলো লম্বা করে দিয়ে বলল,
‘কী হলো? এখনো বসে কেন?’
মেহেরুন ধীরে ধীরে ওয়াহীদের পায়ের কাছে এগিয়ে গেল। তার পা টিপে দিতে লাগল আস্তে আস্তে। চোখ বুজল ওয়াহীদ। মেহেরুন পিঠ শক্ত করে বসে হাত চালাচ্ছে কেবল। ভীষণ খারাপ লাগা কাজ করছে তার। কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, খুব ভুল একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছে। একটাবার, একটাবার ভাবা উচিত ছিল আগে। সে টিমটিমে আলোয় বিষন্ন চোখে তাকাল তার স্বামীর মুখটার দিকে। মানুষটার মুখটার সাথে তার এই আচরণ একদম মানায় না। এতটা রাগী, বদমেজাজি, রুক্ষ কেন উনি? কী কারণে? বিয়ের সাথে এত কীসের দুশমনি উনার? কেন অযথা তার উপর এমন রাগ দেখাচ্ছে?
প্রশ্নগুলো করার খুব ইচ্ছে থাকলেও আপাতত চুপ থাকল মেহেরুন। তবে একদিন সে ঠিক করবে। আর সেদিন এই সবগুলো প্রশ্নের কৈফিয়ত লোকটাকে দিতে হবে। অবশ্যই হবে।
‘কী ব্যাপার? গায়ে শক্তি নেই? খাওয়া দাওয়া করো না ঠিক মতো?’
মেহেরুন হাতের বল বাড়াল আরো। তবে ইচ্ছে করল বরং জোরে চেপে ধরে কয়েকটা চিমটি বসিয়ে দিতে।
___
মেহেরুনকে দিয়ে অনেকক্ষণ পা টিপিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো ওয়াহীদ। তাও এমনি এমনি না মেয়েটা পা টিপতে টিপতেই ঘুমিয়ে পড়াতেই সে থামল। উঠে বসে বিরক্তির গলায় বলে উঠল, ‘এই মেয়ে, বসে বসে ঘুমাচ্ছ কেন? নিজের জায়গায় যাও।’
মেহেরুন ঢুলুঢুলু চোখে কোনোমতে তাকিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। ওয়াহীদ আর শুতে পারল না। উঠে চলে গেল বারান্দায়। রেলিং ধরে দাঁড়াতেই শুনতে পেল মাইকিং এর শব্দ। সেহেরির জন্য ডাক শুরু হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যেই। ওয়াহীদ চোখ বুজল। ভালো লাগছে না তার কিছু। মানতে চাইছে না সে বিবাহিত, তার বউ আছে। বাবার উপর রাগ হচ্ছে। এই মেয়েটা, মেহেরুন, এর উপরেও খুব রাগ হচ্ছে তার। ও কেন একবার বলাতেই বিয়েটা করে ফেলল? কেন রাগ, জেদ দেখিয়ে বিয়েটা ভেস্তে দিতে পারল না? অদ্ভুত মেয়ে মানুষ!
ওয়াহীদ ঘুরে তাকাল মেহেরুনের দিকে। তার শান্তির ঘুম দেখে মেজাজ হারাল আবার। অচিরাৎ ঘরে এসে গলা ছেড়ে ডাকল, ‘এই মেয়ে! মেহেরুন, ওঠো। আর ঘুমাতে হবে না। তোমাকে কি এখানে ঘুমানোর জন্য আনা হয়েছে? কানে কথা যাচ্ছে না আমার? এই মেহেরুন!’
ধরফরিয়ে ওঠে বসল মেয়ে। শেষের “এই মেহেরুন”টা খুব জোরে গিয়ে কানে লাগাতে ঘাবড়ে গিয়েছে। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে এখন। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে বলল, ‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?’
রোষপূর্ণ চোখে ওয়াহীদ মেহেরুনকে দেখছে। মেয়ের নাটক দেখো, এইটুকু সময়ে কী গভীর ঘুমেই না চলে গিয়েছিল। রাগ বাড়ল তার। তপ্ত গলায় বলে উঠল, ‘কফি বানিয়ে নিয়ে এসো আমার জন্য।’
মেহেরুন হতভম্ব হয়। সামান্য কফি বানানোর জন্য এভাবে কেউ কাউকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে। সে অসহায় সুরে বলল,
‘এর জন্য আপনি আমাকে ডেকেছেন?’
‘হু। দ্রুত যাও। একটু পরেই আবার সেহেরি করতে হবে।’
মেহেরুন ক্ষুব্ধ চোখে কিছুক্ষণ লোকটাকে দেখে নিয়ে বিছানা ছাড়ল। এরপর যেতে যেতে মিনমিনিয়ে বলল, ‘একটা কাজের মেয়ে বিয়ে করে আনলেই হতো। অসহ্য!’
মেহেরুন বের হতেই কিছুটা শান্তি পেল ওয়াহীদ। নিজের ইজি চেয়ারটায় আরাম করে বসল গিয়ে।
কফি এল কয়েক মিনিট বাদেই। গাল ফুলিয়ে মেহেরুন সেটা এগিয়ে দিল ওয়াহীদের দিকে। ওয়াহীদ নিল। চুমুক বসাল। এরপর তাকাল মেহেরুনের পানে। বলল,
‘আমি চিনি ছাড়া কফি খাই।’
গলার স্বর ঠান্ডা। কিন্তু মেহেরুনের মনে হলো, লোকটা তাকে আবারো ধমক দিয়েছে একটা। সে ছোট্ট করে বলল, ‘আমি জানতাম না।’
‘শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই বুদ্ধিমান হওয়া যায় না। কফি বানাতে যাওয়ার আগেই তোমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।’
বিরক্তির মুখটা নুইয়ে রাখল মেহেরুন। বলল, ‘দুঃখিত।’
‘আবার বানিয়ে নিয়ে এসো।’
বলেই মগটা এগিয়ে দিল ওয়াহীদ। মেহেরুন কতক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে মগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সেখান থেকে। রান্নাঘরে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। কেমন দম বন্ধ লাগছে যেন। বুকটা ভার লাগছে। কান্না পাচ্ছে। এমনটা তো সে চায়নি। বিয়ে, স্বামী, সংসার—এসব নিয়ে তো তার অন্যরকম ভাবনা ছিল। সুন্দর, সুখের ভাবনা। মানছে সবার ভাগ্য একরকম হয় না। কিন্তু তাই বলে তার ভাগ্যেই একরকম একটা লোক জুটল! সে কী করবে এখন? কী করে মানিয়ে চলবে এই লোকটার সাথে। যতটুকু বুঝেছে, লোকটা তাকে একদমই সহ্য করতে পারছে না। আর এই সবকিছু করছে শুধুমাত্র তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।
মেহেরুন জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলল কয়েকবার। মাত্রই বিয়েটা হলো। এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে না। আরেকটু সময় যাক। লোকটাকে আরেকটু চেনা হোক। এরপর বাকিটা ভাবা যাবে।
পরেরবার কফির মগ হাতে নিয়ে ওয়াহীদ গম্ভীর গলায় বলল, ‘এক কাজে এত সময় লাগালে হবে না। সময়ের মূল্য অনেক। সঠিক ভাবে ব্যবহার করবে।’
মেহেরুন জবাব দিল না। বিছানায় বসল গিয়ে। ওয়াহীদ কফিতে চুমুক বসিয়ে তার দিকে চাইল। বলল, ‘বসলে যে? সেহেরির সময় হয়ে গিয়েছে। খাবার-দাবারগুলো ডাইনিং এ সাজাও।’
মেহেরুন বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিল তার কথা। চলে এল সেখান থেকে।
ডাইনিং এ খেতে বসেছে ওয়াহীদ আর তার বাবা। শিকদার সাহেব খাবার ধরার আগে মেহেরুনকে বললেন, ‘তুমিও ওয়াহীদের পাশে বসে পড়ো, মা।’
মেহেরুন হেসে বসতে নিলেই ওয়াহীদ আটকাল, ‘ও পড়ে খাবে। এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। সময় আছে অনেক।’
‘পড়ে কেন খেতে যাবে? এখন বসলে কী সমস্যা?’
‘সমস্যা আছে, আব্বা। ও এখন খেতে বসলে আমাদের বেড়ে দিবে কে?’
‘জমেলা আছে তো।’
‘বাড়ির বউ এসেছে এখন। এসব কাজ আজ থেকে সব মেহেরুনের।’
সেহেরির সময় অযথা আর ছেলের সাথে তর্কে জড়াতে চাইলেন না মামুন শিকদার। একপলক মেহেরুনকে দেখে বললেন, ‘ও উঠে গেলেই তুমি বসবে।’
সেহেরিতে ওয়াহীদ খুব বেশি কিছু খায় না। যৎসামান্য খেয়ে উঠে পড়ে সবসময়। আজও তাই হলো। শিকদার সাহেবের খাবার শেষ হওয়ার আগেই ওয়াহীদ উঠে চলে গিয়েছে। ছেলে যেতেই তিনি মেহেরুনকে বসতে বললেন। মেহেরুন বসল। প্লেটে খাবার নিয়ে ক্ষীণ সুরে বলল,
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব, বাবা?’
‘ওয়াহীদের কথাই জিজ্ঞেস করবে, তাই তো? ছেলেটা একটু এমনই। ছোট থেকেই। ওকে আমিও ঠিকঠাক মতো বুঝে উঠতে পারি না। তবে মনটা ভালো। উপর দিয়ে একটু কর্কশ হলেও ভেতরটা নরম। তুমি কিছু মনে কোরো না, মা। একটু সময় দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
মেহেরুন ভদ্রতা দেখিয়ে অল্প হেসে আর কথা বাড়াল না। খাওয়া-দাওয়া শেষে সব গুছিয়ে ঘরে গেল এরপর। লোকটা ওয়াশরুমে। হয়তো ওযু করছে। সে সেই ফাঁকে বারান্দায় গিয়ে তার মা’কে কল লাগাল। কথা বলল কিছুক্ষণ। এখানের কথা তেমন কিছু জানাল না। কেবল বলল, লোকটা যেন একটু কেমন। তার সাথে ভালো মতো ঠিক কথা বলছে না। মাও বললেন, সময় দিতে খানিক। আস্তে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে না-কি।
ঘরে এল মেহেরুন। ওয়াহীদকে দেখল ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে। গায়ে সাদা পাঞ্জাবী। মাথায় টুপি পরেছে। একটা আতর নিয়ে সেটা হাতে মাখল অল্প। এরপর মোবাইলটা পকেটে পুরে সরাসরি তাকাল মেহেরুনের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই চমকে চোখ নামাল মেহেরুন। ওয়াহীদ কপাল কুঁচকে বলল, ‘অসভ্যের মতো চেয়ে থাকার অভ্যেসটা কবে থেকে? এভাবেই নিশ্চয়ই তোমরা মেয়েরা ছেলেদের মাথা খাও?’
“অসভ্যের মতো চেয়া থাকা?” সে মোটেও অসভ্যের মতো চেয়ে ছিল না। লোকটা নিজেকে কী ভাবে? হলিউডের টম ক্রুজ নাকি বলিউডের শাহরুখ খান? এমন ভাব যেন তাকে দেখার জন্য মেহেরুন মরে যাচ্ছে। আঁড়ালে মুখ ঝামটা মেরে সে বলে উঠল,
‘আপনি এমন কেউ নন যে আপনাকে অসভ্যের মতো দেখতে হবে।’
‘কিন্তু তুমি তাও দেখছিলে।’
ফিচেল হাসল ওয়াহীদ। কয়েক কদম এগিয়ে এল। মেহেরুনের বেশ অনেকটা কাছে এসে থামল। এতটা কাছে আসায় বিব্রত হলো মেহেরুন। অপ্রস্তুত হয়ে পিছিয়ে যেতে চাইলেই ওয়াহীদ তার কোমর চেপে ধরল। গায়ের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
‘মানুষটা আমি বলে চোখের দৃষ্টি আর সংযত করতে বললাম না। তবে কখনো যদি মনের ভুলেও মানুষ বদলায় তবে এই সুন্দর দৃষ্টি থাকবে না নিশ্চিত।’
চলবে…