লেখক:DRM Shohag পর্ব:০৫ [প্রথম অংশ] ————– হৃদয়ের কথা শুনে রজনীর চোখ দু’টোর আকার বড় হয়ে যায়। লোকটা বলে কি? চুপচাপ দেখো মানে? সে ছেলেদের অ’শ্লীল জিনিস কেন দেখবে? আর এই লোকটাই বা কেমন অদ্ভুদ! লা’জ’ল’জ্জা বলতে কিচ্ছু নেই। এই প্রথম দেখল, কোনো ছেলে নিজে থেকে এভাবে নিজের লা’জ’ল’জ্জা সরিয়ে নিজেই নিজের সবকিছু দেখিয়ে দিতে চায়৷ রজনী লোকটাকে ভালো ভেবেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে হৃদয়কে যতটা ভালো ভেবেছিল, হৃদয় তার থেকে ১০০ গুণ বেশি খা’রা’প ছেলে। কত খা’রা’প ছেলে হলে নিজেই নিজের কাপড় খুলে প’র’নারীকে সব দেখাতে চায়। কথাগুলো ভাবতেই রজনীর চোখমুখ কুঁচকে এলো। এদিকে হৃদয় তাওয়ালে হাত দিয়ে আলতো করে হাত ঘোরাচ্ছে। দৃষ্টি তখনো রজনীর বাদামি চোখের মণিতে। মুখাবয়ব গম্ভীর। হঠাৎ-ই পাশ থেকে হৃদম হৃদয়ের দিকে হেলে এসে হৃদয়ের মুখের দিকে মুখ এগিয়ে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে, “এতো টাইম নিচ্ছিস কেন? খুলে ফেল। তোর-ই তো বউ। এতো টাইম নেয়ার কি আছে?” কথাটা শুনে হৃদয় তড়াক করে বড় ভাইয়ের দিকে তাকায়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “হোয়াট ইজ বউ?” হৃদম সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অসহায় কণ্ঠে বলে, “বউ ইজ কখনো কখনো কাঁচা মরিচ, আবার কখনো শুকনো মরিচ, আবার কখনো কারেন্ট মরিচ। দিজ ইজ বউ।” হৃদয় চরম বিরক্তি নিয়ে বড় ভাইয়ের ফা’ল’তু কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করল। এদিকে রজনী দুই ভাইকে কথা বলতে দেখে সুযোগ পেয়ে দ্রুত জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য ধীরে ধীরে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে হঠাৎ-ই একটা দৌড় দেয়। এই বে’লাজ লোকটার সামনে থেকে সরতে পারলেই আপাতত মেয়েটার শান্তি। সে জান হাতে নিয়ে এক দৌড় দেয়। হৃদয় বিরক্ত হয়ে বড় ভাই হৃদমের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে নেয়, কিন্তু শব্দ পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে ডানদিকে তাকালে চোখে পড়ে রজনী এক দৌড়ে তার পাশের রুমের ভেতর চলে গিয়েছে। হৃদয় ডান হাত বাড়িয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে, “এ্যাই ম্যানারলেস মেয়ে দাঁড়াও বলছি।” ততক্ষণে রজনী তার রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটি হৃদয়ের মোটেও পছন্দ হলো না। কত্ত বড় সাহস, তার বাড়ি থেকে তার কথা অগ্রাহ্য করে তার বাড়ির দরজাই ঠাস করে লাগালো। হৃদয় ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দরজার কোণায় একটা পাঞ্চ মে’রে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “ওর সাহস কি করে হয়, আমার পারমিশন ছাড়া আমার সামনে থেকে চলে যাওয়ার? আমার তো দেখা শেষ হয়নি।” কথাটা শুনে হৃদম চোখ ছোট ছোট করে বলে, “কি দেখা শেষ হয়নি?” হৃদমের কথায় হৃদয় কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। তবে সেটা ভাইকে বুঝতে না দিয়ে বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “তোমাকে কেন বলব?” হৃদম মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাকে কেন বলবি? তোর বউ আর তোর ব্যাপার। তোদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ব্যাপার আমি শুনতে চাই-ও না। বাট আই হ্যাড আ গভীর প্রশ্ন, তুই কি মেয়েটাকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিস না-কি? মন ভরে দেখতে না পেয়ে আফসোস করছিস যে!” কথাগুলো শুনে হৃদয় অদ্ভুদভাবে তাকালো হৃদমের দিকে। কিসের বউ? কিসের স্বামী-স্ত্রী? আবার সে না-কি পছন্দ করে বিয়ে করেছে? সে করবে মেয়েকে পছন্দ? এটা সম্ভব? তাও আবারও ওই গেয়ো মেয়েটাকে? দেখেই মনে হয়, একটা জঙ্গল থেকে উঠে এসেছে। সে ওই মেয়েকে কিভাবে পছন্দ করতে পারে? তার ভাই কি সত্যি সত্যি পা’গ’ল হয়ে গেল না-কি? হৃদয় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে, “এতো অল্প বয়সে পা’গ’ল না হলেও পারতে। মনে হচ্ছে তোমাকে একা ছাড়া যাবে না। চিন্তা নেই, আমি নিজ দায়িত্বে তোমাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো।” হৃদম বিস্ময় কণ্ঠে বলে, “কিহ্! আবার তুই আমাকে অ’প’মা’ন করছিস? আমার হাতে মা’র খেয়েও তোর শিক্ষা হয়নি?” হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “মা’র তো তুমি বেশি খেলে।” হৃদম আমতা আমতা করে বলে, “ছোট ভাইয়ের দশটা মা’রের সমান বড় ভাইয়ের একটা মা’রের ওজন, বুঝলি?” হৃদয় উপহাসের সুরে বলে, “এইজন্যই আমার হাতের দু’টো বারি খেয়ে তোমার নাক দিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে এলো। আর আমি দিব্যি সুস্থ!” কথাটা বলে হৃদয় তার ঘরের ভেতর চলে যায়। হৃদমের চোখেমুখে অসহায়ত্ব। তার দাদা, বাবা, ফুপুরা সবাই খুব জোয়ান আর স্বাস্থ্যবান। যে ধারাটি তার ছোট ভাই হৃদয় পেয়েছে। আর সে চিকন, পাতলা মানুষ। এটা সে তার নানার থেকে পেয়েছে। তার নানার বাড়ির সবাই রোগা- পাতলা। তার মা-ও ভীষণ রোগা ছিল। তবে হৃদয় তার থেকে কম নয় বরং গুণে গুণে ৯ বছরের ছোট। কিন্তু তারা দু’জন একসাথে দাঁড়ালে, হৃদয়কেই বড় বড় লাগে। এ নিয়ে ছোট ভাই হৃদয়ের কাছে খোঁচা শুনতে শুনতে হৃদমের শরীর জ্ব’লে যায়। তবে তাদের দু’ভাইয়ের হাইট ৬ ফুট। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা। একেবারে বাঙালিয়ান ছেলেদের মতো। তাদের দু’ভাইয়ের মুখের গঠন অনেকটা একইরকম, শ্যামলা হলেও মুখের গঠন চোখে পরার মতো সুন্দর বলা যায়। এইদিকটা তারা তাদের বাবার থেকে পেয়েছে। হৃদম হৃদয়কে আর আর কিছু বলল না। কিছু বললে আরও তিনটে বেশি শুনতে হবে। কোনো দরকার নেই সেসবের। অতঃপর হৃদম বড় বড় পায়ে জায়গাটি প্রস্থান করল। এদিকে হৃদয় ঘরে এসে নেভিব্লু রঙের একটি গ্যাবার্ডিন প্যান্ট পরে নেয়। এরপর দু’পায়ের প্যান্ট গিরার উপর পর্যন্ত ভাঁজ করে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সোজা হয়ে। চোখেমুখে অসম্ভব বিরক্তি। মাথার চুল, দাঁড়ি ঠিকঠাক মোছেনি বোধয়। এখনো অনেকটাই ভেজা ভেজা। কিন্তু হৃদয়ের ধ্যান নিজের দিকে নয়৷ তার ধ্যান বার বার ঘুরেফিরে মেয়েটার বাদামি চোখের মণির কাছে চলে যাচ্ছে। হৃদয় চরম বিরক্ত হয়ে দু’দিকে মাথা নাড়ালো কয়েকবার৷ নাহ্, তার অস্থিরতা কমে না। ছেলেটার রা’গ তড়তড় করে বেড়ে গেল। কপালের রগ ফুলে উঠল। পেশিবহুল দু’হাত ফুলে ফেঁপে উঠল। শ’ক্ত চোয়াল নিয়ে ঘরের এপাশ-ওপাশ সমানে পায়চারি করতে লাগলো। তার এই অনিয়ন্ত্রিত স্বভাব হজম হচ্ছে না। বিন্দুমাত্র হজম হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে পুরো বাড়ির সব ভেঙে তছনছ করে দিতে। এসব অ’সহ্যকর অনুভূতি তার মাঝে কোথা থেকে এসে হাজির হলো? সে যাস্ট নিতে পারছে না। সব দোষ ওই মেয়েটার। মেয়েটি তার সামনে আসার পর থেকেই তো তার স্বাভাবিক জীবনটা চোখের পলকে উল্টে গেল৷ উফ! কি হচ্ছে তার সাথে? রা’গে মাথা ফেটে যাচ্ছে। সে ব্যস্ত পায়ে পায়চারি করতে করতে পায়ের কাছে ইজি চেয়ার পেয়ে হঠাৎ-ই চেয়ারটিতে জোরেসোরে একটি লাথি বসায়। চেয়ারটি উল্টে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়ে। হৃদয় সেদিকে তাকালো না। সে দৃঢ় পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। উদ্দেশ্য দাদুর ঘর। প্রতিটি পদক্ষেপে তার অসম্ভব রা’গ প্রকাশ পাচ্ছে। . . রজনী ঘরের দরজা আটকে তখন থেকে ঘরের এক কোণায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে৷ বেচারি হৃদয়ের হঠাৎ ওরকম উদ্ভট বিহেভে ভীষণ ভ’য় পেয়েছে। গতরাতে ছেলেটার গায়ের সাথে একটু টাচ লেগেছিল বলে, কি বি’দ্ঘু’টে আচরণ করল। তাকে একটু সাহায্যও করল না। আর আজ সেই ছেলেটা তাকে কিসব দেখতে বলছিল। কথাগুলো ভেবে রজনীর চোখমুখ আবারও কুঁচকে আসে। মেয়েটি ঘরের চারপাশটা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে। আসার পর থেকে যা কান্ড ঘটল, তাতে সে বাড়ির দিকে মনোযোগ-ই দিতে পারেনি। কিন্তু রুপসা নামের ওই মেয়েটি তাকে এই ঘরে রেখে যাওয়ার একটু পর রজনী পুরো ঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে ঘরের বাইরে চলে যায়। এতো সুন্দর বাড়ি, এতো সুন্দর ঘর, এতো সুন্দর সুন্দর আসবাবপত্র সে এর আগে কখনো দেখেনি। তাদের গ্রামে তো বেশিরভাগ-ই মাটির তৈরী বাড়ি। কিছু কিছু বাড়ি ইটের, তবে সে বাড়িগুলোর উপরে টিন। গ্রামের চেয়ারম্যান এরসহ হাতেগোনা দু’তিনটে বাড়ি ছাদযুক্ত। চেয়ারম্যানের বাড়ির বাইরে থেকেই দেখা হয়েছে। আজ প্রথম এরকম বড়লোকদের বাড়ির ভেতর পা রেখে মেয়েটি অতি বিস্ময়ে বাড়িটি ঘুরে দেখতে গিয়ে কে’লে’ঙ্কা’রি হয়ে গেল। আপাতত হৃদয়ের ব্যাপারটি বাদ দিয়ে রজনী আবারও এই ঘরটি নিখুঁতভাবে দেখতে লাগলো। ঘরের কোণ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। কখনো উঁচু ছাদের দিকে তাকালো, আবার কখনো রাজকীয়দের মতো ছাদে টানানো ঝাড়বাতির দিকে তাকালো। এসব দেখতে দেখতে রজনীর মুখখানা বিস্ময়ে ভরে ওঠে। ছোট্ট থেকে মাটির বাড়িতে বেড়ে ওঠা রজনীর কাছে এই ঘরটি জান্নাতের বাগানের মতো লাগলো৷ সে ধীরে পায়ে ঘুরে ঘুরে ঘরটি দেখার মাঝে একটু পর পর গলায়, পিঠে, পেটে চুলকায়। একসময় বিরক্ত হয়ে কোমরে গুঁজে রাখা শাড়ির আঁচল ফেলে দেয়। হাত, পেটে চোখ বুলায়৷ দেখে পুরো শরীর লালচে হয়ে গেছে। ফর্সা, তুলতুলে শরীরটার জায়গায় জায়গায় ফুলেও উঠেছে। রজনী চুপ করে শুধু দেখল। এসবে তার অভ্যেস আছে। রজনীর স্কিন ফর্সার পাশাপাশি পাতলা হওয়ায় একটু-আধটুতেই শরীর লালচে হয়ে ওঠে। নয়তো ফুলে ওঠে। গ্রামের মেয়ে সে। সারাদিন ধুলোবালির মাঝে খেলেই তার দিন কাটে। এর ফলে এসবের সম্মুখীন তাকে প্রায়ই হতে হয়। মায়ের বকাও খায়। কিন্তু গ্রামের মেয়ে হয়ে সে কি আর চুপ থাকার মেয়ে? ধুলোবালির মধ্যে সারাদিন খেলার পর মায়ের বকা খাওয়ার ভ’য়ে গোসল করে নিজেকে কাপড়ে মুড়িয়ে নেয়। যেহেতু ছোট থেকে এভাবেই তার অভ্যাস, তাই রজনীকে এসব আহামরি ব্য’থা দিতে পারে না। যেমন ব্য’থা এখনও রজনীকে দিতে পারলো না। কিন্তু বাড়ির সবার কথা খুব মনে পড়ল। রজনী আপাতত এসব চিন্তা রেখে পরনের শাড়ি একেবারে খুলে ফেলল। এরপর এগিয়ে গিয়ে তার ছেটোখাটো ব্যাগের ভেতর থেকে একটি শাড়িসহ বাকি কাপড়গুলো বের করে খুঁজে খুঁজে ওয়াশরুমে গেল। ওয়াশরুমে এসেও অনেক বিপত্তি পোহাতে হলো মেয়েটাকে। শেষমেশ সে কোনোরকমে নতুন নতুন জিনিস আসবাবপত্র দিয়ে গোসল করে বাইরে বেরিয়ে আসে। স্বভাবসুলভ গায়ের কাপড় ওয়াশরুমে রেখেই বেরিয়ে আসে। শাড়ির দু’টো অংশ পরে হাতে শাড়ি নিয়ে ঘরে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল মেয়েটা। আয়নায় আরও ভালোভালো দেখা যাচ্ছে, তার সারা শরীর লালচে হয়ে উঠেছে। এর কারণ গতকাল থেকে গোসল না করা। গোসল করার সময় শরীর একটু-আধটু জ্ব’লে’ছে। তবে রজনী সেসব পাত্তা দেয়নি। মেয়েটিকে কোনো ব্য’থা-ই সহজে কাবু করতে পারেনা। এর কারণ গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা। সারা গ্রাম খেলতে গিয়ে কত কা’টাছি’ড়া হয়! এসব তারা গায়ে মাখেনা। রজনীকে শরীরের ব্য’থা কাবু করতে না পারলেও, মেয়েটা কাজের বেলায় একেবারে অষ্টরম্ভা। মায়ের বকুনি খেয়ে একটু- আধটু পড়ত, নয়তো সারাদিন শুধু খেলা। এটাই ছিল তার জীবন। এই যেমন এখন সামান্য শাড়িটুকুই পরতে পারছে না। তার সব কাজ তো তার মা-ই করে দেয়। রজনী গোসল শেষে দৌড়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ালে মা তাকে দু’মিনিটে শাড়ি পরিয়ে দিত। রজনী অনেকক্ষণ যাবৎ চেষ্টা করল, শাড়িটি পরার। কিন্তু একবিন্দুও সফল হলো না। ওদিকে পায়ের পাতা সমান লম্বা ঘনকালো ভেজা চুলগুলো দিয়ে টপটপ করে পানি পরে, মেয়েটির পিছন পার্ট পুরো ভিজে গিয়েছে। রজনী একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল। তার চুলগুলো মেঝেতে ছুঁইছুঁই হয়েছে। ছোট থেকেই রজনীর চুল বেশ লম্বা ছিল। এরপর ধীরে ধীরে চুল আরও বড় হতে লাগলো। রজনীর হাইট ৫ ফুট। এরপর রজনীর হাইট আর না বাড়লেও চুল ঠিকই বেড়েছে। আর সে চুল বাড়তে বাড়তে পায়ের পাতা ছাড়িয়েছে। রজনীকে দেখতে একটু-আধটু খাটো লাগে। তবে চেহারায় ভীষণ বাচ্চামি ভাব, যার ফলে মেয়েটিকে দেখতে শুনতে বেশ কিউট লাগে। রজনীর চোখেমুখে ভীষণ অসহায়ত্ব ঘিরে। চুল মুছে দেয়া, চুল বেঁধে দেয়া, তাকে খাইয়ে দেয়া,, সব কাজ মা করে দিত। সে তো কিচ্ছু পারেনা। শুধু ব্য’থা সহ্য করার ক্ষেত্রে রজনীকে একটু বড় লাগলেও, বাকিসব অর্থাৎ দেখতে শুনতে থেকে শুরু করে, প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে রজনী একেবারেই বাচ্চা একটা মেয়ে। যে শুধু খেলতে, খেতে আর পড়তে জানে। আর কিছুই পারেনা সে। রজনী আয়নার সামনেই ধীরে ধীরে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। মায়ের কথা ভেবে চোখদু’টো টলমল করে উঠল। ইচ্ছে করল, এক দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে যেতে৷ কিন্তু সে কিভাবে যাবে? সে যে এক অচেনা জায়গায় এসে হারিয়ে গেছে। মা-ও নিশ্চয়ই তার জন্য খুব কাঁদছে? তার বোধয় ওই ট্রেনে ওঠা একদম উচিৎ হয়নি। এবার সে কি করে গ্রামে ফিরবে? মায়ের কাছে কি করে যাবে? কথাগুলো ভেবে ছোট রজনীর বড্ড দুঃ’খ হলো। মেয়েটি হাঁটুতে মাথা গুঁজে ভাঙা গলায় শব্দ করে ডেকে উঠল, “আম্মা?” ভেজা চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ে, রজনী ভিজে একাকার। সাথে মেঝেতেও পানি ছড়িয়ে যাচ্ছে। রজনী কোনোদিকে মন দিল না। তার বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে। _______________________ “মেয়েটি কে দাদু?” আরমান নওরোজ তাদের বাগানে বড়সড় একটি পেয়ারা গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে চা খাচ্ছিল। সামনে ছোটখাটো একটি টেবিল। টেবিলের উপর কিছু ফল রাখা, সাথে কিছু খেজুর। ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিচ্ছিল, তখনই ছোট নাতির কণ্ঠে মাথা তুলে তাকায়। খুব বুঝল হৃদয় রজনীর কথা জিজ্ঞেস করছে। আরমান নওরোজ খুব স্বাভাবিকভাবে বলে, “মেয়েটি মানুষ। কেন তোমার চোখের কি প্রবলেম হয়েছে?” হৃদয়ের চোখেমুখে রা’গ। সে খুব ভালো করেই জানে, তার দাদু মেয়েটিকে চেনে বলেই তাদের বাড়ি এনেছে৷ আর মজার ব্যাপার হলো, সে তার দাদুর কারসাজিও কিছুটা ধরতে পেরেছে। হৃদয় রে’গে বলে, “ওকে ওর বাড়ি দিয়ে এসো।” আরমান নওরোজ ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?” হৃদয় বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “মেয়েটি ভালো নয় দাদু। ও চোখ দিয়ে মানুষকে বশ করতে পারে। আমাকেও ওর বশে আনতে চাইছে।” আরমান নওরোজ মনে মনে হাসলো৷ অতঃপর উপর থেকে খুব স্বাভাবিক স্বরে বলে, “তুমি বশ হচ্ছো কেন? নিজের উপর কন্ট্রোল রাখো দাদুভাই।” হৃদয় বিভ্রান্ত হলো। অস্থির কণ্ঠে বলে, “আই কান্ট কন্ট্রোল দাদু। প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড!” আরমান নওরোজ দৃষ্টি এলোমেলো করল। মুখে হাত দিয়ে হাসি আড়াল করল। হৃদয় বুঝতে পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “আই নো, তুমি ইচ্ছে করে আমার সাথে এমন করছ। বাট তুমি কখনো সফল হবে না দাদু।” আরমান নওরোজ হৃদয়ের দিকে তাকালো। ছেলেটা পারলে যেন তাকে খেয়ে ফেলবে। ভদ্রলেক খুব ক’ষ্টে তার হাসি চেপে রেখেছে। হৃদয় আবারও একই স্বরে বলে, “তুমি কি মেয়েটাকে এই বাড়ি থেকে সরাবে?” আরমান নওরোজ খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, “নো দাদুভাই।” হৃদয় রে’গে তার পাশের চেয়ারে ডান হাতে একটি শ’ক্ত পাঞ্চ মে’রে বলে, “ওকেই। মেয়েটা এই বাড়িতেই থাকুক। বাট আই সোয়ার, ওই মেয়েটাকে যেকোনো মুহূর্তে আমি মে’রে ফেলবো। তারপর আমাকে দোষাতে পারবে না তুমি।” আরমান নওরোজ এর কপালে ভাঁজ পড়ল। হৃদয়কে একটু বেশিই হাইপার লাগছে। সে মৃদুস্বরে বলে, “এতো রা’গ করছ কেন? তুমি তোমার মতো থাকো। আমি তো তোমাকে কিছু বলছি না। বাট তুমি চাইলে, ট্রাই করতে পারো, ওকে মে’রে ফেলার। আমি বাঁধা দিব না।” হৃদয় তার দাদুর দিকে ডান হাত উঠিয়ে বিস্ময় কণ্ঠে বলে, “আরে তোমার মনে কি দয়ামায়া নেই? মেয়েটা ম’রে গেলে তোমার কিছু যায় আসেনা?” আরমান নওরোজ ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলে, “না নেই। তোমার মায়া হচ্ছে না-কি?” হৃদয় শুকনো ঢোক গিলল। রা’গের চোটে ছেলেটার উদাম শরীরে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। দু’হাত কোমরে রেখে এপাশ-ওপাশ করে কয়েক পা হেঁটে নিজেকে সামলাতে চাইলো৷ এরপর তার দাদুর সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে, “তুমি সব জেনেও এরকম কেন করছ দাদু? আমি কোনো মেয়েলি ব্যাপারে জড়াতে চাইনা। প্লিজ হেল্প মি। মেয়েটাকে বের কর এই বাড়ি থেকে। আমার প্রচুর প্রবলেম হচ্ছে।” এমন কথায় নওরোজ বিরক্ত হলো। হৃদয়ের কাজ সম্পর্কে তার ধারণা আছে। যেটা সে সহ্য করতে পারেনা। আর হৃদয়ের কাজ তার দাদুর অপছন্দ এটা হৃদয় সহ্য করতে পারেনা, আবার দাদুর এই অপছন্দের ব্যাপার সে পাত্তা-ও দেয় না। আরমান নওরোজ সে ব্যাপারে কিছু বললেন না। সে মৃদুস্বরে বলে, “তুমি তোমার মতো থাকো। মেয়েটাকে আমি সপ্তাহখানেক আমার বাড়ি রাখবো।” কথাটা হৃদয়ের মোটেও পছন্দ হলো না। সে রাগ প্লাস বিস্ময় কণ্ঠে আওড়ায়, “হোয়াট? এক উইক? মাথা ঠিক আছে তোমার?” আরমান নওরোজ ভাবলেশহীনভাবে বলে, “আমার মাথা ঠিক আছে। বাট তোমার মাথা ঠিক নেই। আমি আমার মেহমানকে যতদিন ইচ্ছা আমার বাড়ি রাখতেই পারি। এখানে তোমার তো কোনো প্রবলেম হওয়ার কথা না ছোট দাদুভাই।” হৃদয় ছটফটিয়ে উঠল। এতক্ষণ কি বলল, আর তার দাদু কি বলছে? ছেলেটা দু’হাতে মাথার চুল টেনে আবারও এপাশ-ওপাশ পায়চারি করল কয়েকবার। ইচ্ছে করছে, মাথার সব চুল ছিঁড়ে ফেলতে। উফ! এক বেলার মধ্যে এটা কোথায় ফেঁসে গেল সে। হৃদয় আবারো চুপ হয়ে দাঁড়ালো। আরমান নওরোজ পায়ের উপর পা তুলে চায়ে চুমুক দিতে দিতে হৃদয়কে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছিল। হৃদয়কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে সে নিজেকে সামলালো। হৃদয় রে’গে বলে, “মেয়েটা এই বাড়ি এক উইক থাকলে আমার কি অবস্থা হবে, তুমি একবারো ভেবে দেখছ না?” আরমান নওরোজ অবুঝ গলায় বলে, “কি হবে তোমার?” হৃদয় দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “বা’ল হবে বা’ল।” আরমান নওরোজ মিটিমিটি হেসে বলে, “বুঝেছি তুমি খেতে চাইছ গাছের ছাল গাছের ছাল। এখানে অনেক গাছ আছে। তুমি খাওয়া শুরু কর, তুমি চাইলে আমি ছিঁলে দিব।” হৃদয় রে’গে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় বেখেয়ালে দৃষ্টি দেতলায় পড়লে। ছেলেটার চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে বেলকনিতে দাঁড়ানো রজনীকে দেখে। মেয়েটার পরনে কেবল শাড়ির ভাঁজের ভেতরে থাকা দু’টো অংশ। শরীরে শাড়ির কোনো হদিশ নেই। এভাবে অর্ধেক পেট খোলা, শরীরে ওড়না জাতীয়-ও কিছু নেই। এমন মেয়েকে দেখলে কোন ছেলে ঠিক থাকবে? রজনীর এই বেহাল দশা দেখে হৃদয়ের দু’সেকেন্ডে গলা শুকিয়ে যেমন কাঠ হয়ে আসলো, তেমনি পরবর্তী দু’সেকেন্ডের মাঝে রা’গে মাথাসহ পুরো শরীর টগবগিয়ে উঠল। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। তখনই হৃদম তার দাদুকে ডাকতে ডাকতে বাগানে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হৃদয়কে দেখে তার রা’গ হলো। এখন সে তার দাদুর কাছে বিচারের আসর বসাবে। এই ছোট ভাই নামের বে’য়া’দ’ব তার গায়ে হাত তুলবে কেন, সেই বিচার। কিন্তু হৃদয়কে একদিকে এভাবে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হৃদম হৃদয়ের মুখের সামনে হাত নাড়ালো, কিন্তু হৃদয়ের দৃষ্টির কোনো নড়চড় নেই। সে ভ্রু কুঁচকে বলে, “কি রে, এই জগতে আছিস না গেছিস? গেলে দ্রুত ফের। তোর বিচারসভা বসবে।” হৃদয়ের কোনো নড়চড় না দেখে হৃদমও হৃদয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে দোতলার দিকে তাকাতে নেয় আর বলে, “উপরে কি আছে রে?” বেচারা হৃদম পুরে ঘাড় ঘোরানোর আগেই হৃদয় তার বড় ভাইয়ের শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে রে’গে বলে, “তুমি যেখানে সেখানে চোখ দিচ্ছ কেন? ভাবি ছাড়া অন্যদিকে তাকালে তোমার চোখ গে’লে দিব একদম।” হৃদম অবুঝ গলায় বলে, “মানে কি বলছিস? আবার থ্রেট দিচ্ছিস? কত্ত বড় সাহস, বড় ভাইকে….” হৃদমের কথা হৃদয় কানে নিল না। সে হৃদমের পিছে আসতে থাকা হৃদমের স্ত্রী রূপসাকে দেখে রূপসার উদ্দেশ্যে বলে, “ভাবি তোমার স্বামীকে সামলাও। এ তো বি’কি’নি পরা মেয়েদের দেখতে দেখতে চোখদু’টো ন’ষ্ট বানিয়ে ফেলছে৷” কথাটা শুনে হৃদম বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় হৃদয়ের দিকে। এদিকে হৃদয় কথাটা বলেই হৃদমের শার্টের কলার ছেড়ে দেয়। হৃদম হৃদয়কে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। দ্রুত উল্টে ঘুরে দাঁড়ালে দেখে রূপসা তার দিকে চেয়ে ফোঁসফোঁস করছে। হৃদম অসহায় চোখে চেয়ে কিছু বলতে নেয়, কিন্তু রূপসা সে সুযোগ দিলে তো। সে দ্রুত উল্টো ঘুরে ধুপধাপ পা ফেলে বাড়ির দিকে এগোলো। হৃদম বউয়ের পিছু পিছু দৌড়ায় আর বলে, “এ্যাই বউ, কসম আমি বি’কি’না ওয়ালা তো দূর, বি’কি’না ছাড়া মেয়েদের দিকেও তাকাই না বউ। তোমার দেবর একটা ফা’জি’ল আর গ্রেট বে’য়া’দ’ব। এ্যাই বউ দাঁড়াও।” রূপসা শুনলে তো। সে রা’গে ফুঁসছে। হৃদয় খুব সিরিয়াস মানুষ। ও জীবনেও মিথ্যা বলবে না। এদিকে রূপসার সাড়া না পেয়ে হৃদম উল্টো ঘুরে তার দাদুর উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলে,, “আজ যদি তোমার ছেট নাতির বিচার না করেছ, তবে তোমার খবর আছে দাদু। আমার বউটার সাথে দু’দিনও শান্তিতে থাকতে দেয় না তোমার বে’য়া’দ’ব ছোট নাতি। শা’লা কু’ত্তা একটা।” এটুকু বলে বেচারা হৃদম আবারো বউয়ের পিছে গিয়েছে। আরমান নওরোজ কি বলবেন বুঝল না। হৃদয়টা কেমন যেন! এ সত্যিই তার বড় ভাইকে শান্তি দেয়না। আহারে! তার হৃদম দাদুভাইটার আসলেই ক’ষ্ট! ভদ্রলোক হৃদয়ের দিকে তাকালে দেখল হৃদয় বেশ কয়েক মিনিট সময় নিয়ে শক্তপোক্ত চেয়ারের পায়া চাড়া দিয়ে চেয়ার থেকে একেবারে আলাদা করে নিল। আরমান নওরোজ বিস্ময় চোখে চেয়ে বলে, “আরে আরে কি করছ? চেয়ার ভাঙলে কেন? কি করবে এটা দিয়ে?” হৃদয় চেয়ারের মোটাসোটা পায়া ডান হাতের মুঠোয় চেপে ধরে রেখে আরেকবার দেতলায় তাকালো। রজনী একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা শাড়ি পরতে না পেরে হতাশ হয়ে বসে ছিল অনেকক্ষণ। এরপর বেলকনি চোখে পড়লে সে ওভাবেই বেলকনিতে চলে আসে। বেলকনিতে আসার পর মেয়েটার চোখে পড়ে অসংখ্য বিল্ডিং। দেখতে ভীষণ সুন্দর লাগছে। রজনীর কোনোদিকে খেয়াল নেই। সে ঘুরে ঘুরে এই শহর দেখছে। বোকা মেয়েটার মাথাতে আসেনি, এখান থেকে কেউ তাকে দেখতে পারে। সে গ্রামের মতোই ভাবে, নিজের বাড়িতে থাকলে তাকে আর কেউ দেখতে পাবে না। এজন্য সে ঘুরে ঘুরে উৎফুল্ল মনে এই শহর দেখছে। এদিকে হৃদয় চোখমুখ শ’ক্ত করে রজনীকে দেখল আরেকবার। বিড়বিড় করল, “বে’য়া’দ’ব, বে’হা’য়া মেয়ে কোথাকার। চাপকে মানুষ বানাবো আজ।” কথাগুলো বিড়বিড়িয়ে বলে হৃদয় দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে। আরমান নওরোজ দ্রুত দাঁড়িয়ে গেলেন। হৃদয়ের উদ্দেশ্যে চিন্তিত কণ্ঠে বলেন, “দাদুভাই এটা দিয়ে কি করবে? কোথায় যাচ্ছো? হৃদয় দাদুভাই?” হৃদয় দাদুর ডাক শুনলো না। সে শ’ক্ত হাতে চেয়ারের ভাঙা পায়াটি ধরে রেখে বড় বড় পায়ে এগোয় আর শক্ত কণ্ঠে আওড়ায়, “আজ ওই ম্যানারলেস মেয়েকে ম্যানারস্ শেখিয়েই ছাড়বো।” চলবে…… |