লেখক: সফিয়ার রহমান
পর্ব:০১
নীল! ওরে ও কুঁড়েঘরের বাদশা! আর কতক্ষণ ঘুমাবি? সূর্য তো মাথার ওপরে উঠে খই ভাজতে শুরু করেছে!”
জানালার হালকা নীল পর্দা ভেদ করে রোদের একটা অবাধ্য রেখা ঠিক আমার নাকের ডগায় এসে পড়েছে। আমি আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরলাম। স্বপ্নের ঘোরে মাত্র দেখতে শুরু করেছিলাম যে আমি একটা বিশাল পাহাড়ের চূড়ায় বসে চমৎকার একটা বিয়োগান্তক কবিতা লিখছি, আর উদাসীন মেঘেরা আমার চারপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু স্বপ্নের সেই কাব্যিক আবহটা কেন জানি হঠাৎ কর্কশ চিৎকারে রূপ নিল!
“নীল! তোকে কি লাঠি নিয়ে এসে ওঠাতে হবে? আজ বাড়িতে মেহমান আসছে আর তুই এখনো ড্রাগন হয়ে নাক ডাকছিস? ওঠ বলছি!”—এই বলেই রিয়া আপু কম্বলটা এক হ্যাঁচকায় টান দিয়ে নিয়ে গেল।
অগত্যা উঠতে হলো। বিছানা ছেড়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথায় বাবরি দোলানো চুলগুলো এখন বাবুই পাখির বাসার মতো হয়ে আছে। আমি সফিয়ার রহমান, তবে বন্ধুমহলে আর এই ছোটখাটো সাহিত্যপাড়ায় সবাই আমাকে ‘নীল’ নামেই চেনে। মা-বাবা গ্রামে থাকেন, আমি আর আপু এই শহরে থাকি। আপু একটা সরকারি কলেজে পড়ায়, আর আমি… আমি মূলত নীল আকাশ আর মেঘের রহস্য খুঁজে বেড়াই, মানে তথাকথিত বেকার কবি কাম গোয়েন্দা যাকে বলে!
গোসল সেরে ড্রয়িং রুমে আসতেই একটা অদ্ভুত সুগন্ধ নাকে এল। খুব দামী কোনো ফ্রেঞ্চ পারফিউমের ঘ্রাণ। সোফায় একজন বসে আছে। পরনে কালো টপস আর নেভি ব্লু জিন্স, কাঁধ অবধি স্ট্রেট কাট চুল। পাশ ফিরে বসে ল্যাপটপে কী যেন দ্রুতগতিতে টাইপ করছে। আমি থমকে গেলাম। আমার বাসার সোফায় এমন একজন রহস্যময়ী রূপসী বসে আছে, আর আমি কি না গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে তার সামনে হাজির হলাম? নিজেকে খুব ছোট মনে হলো এক মুহূর্তের জন্য।
ততক্ষণে রিয়া আপু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। “আরে নীল, এসেছিস? পরিচয় করিয়ে দিই। ও শিফা, আমার ছোটবেলার বন্ধু। এখন একটা স্পেশাল প্রজেক্টে কাজ করছে। আর শিফা, এই হলো আমার সেই কুঁড়ে ভাই নীল। সারাদিন কবিতা আর কল্পনা নিয়ে থাকে।”
শিফা ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো হাসি নেই, কোনো চপলতা নেই। এক জোড়া স্থির, শান্ত আর তীব্র বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। তার চাহনি দেখে মনে হলো সে যেন এক সেকেন্ডেই আমার হাড়হাড্ডির এক্স-রে করে ফেলেছে।
“হ্যালো।”—ব্যস, এটুকুই! শিফার কথা বলাটা যেন কৃপণতা। খুব মেপে কথা বলা মানুষ।
আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে হাসিমুখে বললাম, “হ্যালো শিফা ম্যাম! আপু আমার যে বিশেষণে বিশেষায়িত করল, তার সবটুকুই সত্যি। তবে আমার আরও একটা পরিচয় আছে, আমি মানুষের মনের খবর একটু আগেভাগে বুঝতে পারি।”
শিফা আবার ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে বলল, “মনের খবর দিয়ে কি পেটের ভাত হয়? নাকি ওটা শুধুই সময় নষ্টের অজুহাত?”
বাপরে! প্রথম কথাতেই একদম বাউন্সার। আমি একটু দমে গেলাম ঠিকই, কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নই। বললাম, “সময় নষ্ট নয় ম্যাম, সময়কে অনুভূতির ফ্রেমে বন্দি করা বলে একে।”
রিয়া আপু হেসে কুটিপাটি। “নীল, তুই ওর সাথে কথা বলে পারবি না। ও কিন্তু যেমন গম্ভীর, তেমনি ডেঞ্জারাস। ওর ওই কালো ব্যাগটার দিকে ভুলেও হাত দিস না।”
আমি হাসলাম ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর একটা খটকা লাগল। রিয়া আপু যখন নাস্তার টেবিলে শিফাকে নিয়ে ব্যস্ত, আমি দূর থেকে লক্ষ্য করলাম শিফা তার ফোনের একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজ দেখে বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে খুব সাবধানে তার ব্যাগের ভেতর একটা ছোট মেটাল ডিভাইস ঢুকিয়ে রাখল। জিনিসটা দেখতে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের মতো নয়।
খাওয়ার টেবিলে বসে আমি শিফাকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। সে যখন চা খাচ্ছিল, তার চোখ জোড়া বারবার জানালার বাইরে আর কলিং বেলের দিকে ঘুরছিল। যেন সে কোনো সংকেতের অপেক্ষায় আছে। রিয়া আপু বলল, “শিফা কয়েকদিন আমাদের সাথেই থাকবে নীল। ওর অফিস থেকে ওকে এই এরিয়াতে একটা এসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে।”
এসাইনমেন্ট? এই শান্ত আবাসিক এলাকায় কী এসাইনমেন্ট হতে পারে? শিফা এক ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “নীল সাহেব, আপনি কি আমার দিকে তাকিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি করছেন?”
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “না মানে… আপনি চা-টা খুব গম্ভীর হয়ে খাচ্ছেন তো, তাই ভাবছিলাম চায়ের কি কোনো অপরাধ আছে?”
শিফা উত্তর দিল না, শুধু একটা রহস্যময় মুচকি হাসি দিল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল এক ধরণের চ্যালেঞ্জ। নাস্তা শেষে রিয়া আপু কলেজে চলে গেল। বাসায় এখন শুধু আমি আর শিফা। ভাবলাম এই সুযোগে একটু সাহিত্যিক কায়দায় ভাব জমানো যাক। বারান্দায় গিয়ে আমার গিটারটা নিয়ে টুংটাং করে একটা সুর তুললাম। ইচ্ছা ছিল শিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
শিফা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দার দরজায় দাঁড়াল। পরনে এখন একটা ঢিলেঢালা কুুর্তা। আমি মনে মনে ভাবলাম, “ইয়েস! কাজ হয়েছে। কোনো মেয়েই নীলের গিটারের সুর এড়িয়ে যেতে পারে না।”
“নীল?” (শিফা ডাকল)
“বলুন শিফা ম্যাম।” (আমি একটু ভাব নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বললাম)
“গিটারের চার নম্বর স্ট্রিংটা একটু আলগা, সুরটা কর্কশ লাগছে। আর দয়া করে এই দুপুরে অসময়ে টুংটাং করবেন না, আমার কনসেন্ট্রেশন ব্রেক হচ্ছে।”
আমি গিটারটা নামিয়ে রাখলাম। ইশ! মেয়েটা কি পাথর দিয়ে তৈরি? কোনো রোমান্টিক সেন্স নেই? কিন্তু রহস্যটা আরও ঘনীভূত হলো বিকেলে। আমি যখন নিজের ঘরে বসে একটা গল্পের প্লট সাজাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম শিফা ড্রয়িং রুমে পায়চারি করছে আর ব্লুটুথ হেডসেটে খুব নিচু স্বরে কথা বলছে।
“না, টার্গেট এখনো মুভ করেনি। সম্ভবত আজ রাতে অপারেশন হবে। ব্যাকআপ টিমকে স্টান্ডবাই থাকতে বলুন। আমি সিগন্যাল দিলেই যেন মুভ করে।”
টার্গেট? অপারেশন? ব্যাকআপ টিম? এসব কী শুনছি আমি! শিফা কি তবে কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত? নাকি সে কোনো দুর্ধর্ষ ইন্টেলিজেন্স অফিসার? আমার হৃৎপিণ্ডটা এখন ড্রামের মতো বাজছে।
আমি চুপিচুপি শিফার ঘরের দিকে তাকালাম। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম বেডের ওপর সেই কালো লেদার ফাইলটা রাখা। আমার ভেতরকার গোয়েন্দা সত্তা জেগে উঠল। রিয়া আপু বাসায় নেই, এই সুযোগ! আমি বিড়ালের মতো পা ফেলে শিফার ঘরে ঢুকলাম। ফাইলটা ছুঁতে যাব, অমনি আমার ঘাড়ের ঠিক পেছনে ঠান্ডা কিছু একটা অনুভব করলাম। লোহার মতো শক্ত কিছু একটা আমার ঘাড়ে চেপে আছে।
“অন্যের প্রাইভেট ফাইলে হাত দেওয়াটা কি তোমার কবিতার কোনো ছন্দের মধ্যে পড়ে, নীল?”
শিফার ঠান্ডা গলার স্বর আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিল। আমি ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকালাম। শিফা আমার একদম সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটা কালো রঙের কোনো একটা বস্তু—যা দেখতে অনেকটা ছোট পিস্তলের মতো, কিন্তু আসলে ওটা ছিল একটা বিশেষ ডিভাইস। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত খুনে আভা।
আমি শুকনো ঢোক গিলে বললাম, “না মানে… আমি দেখছিলাম আপনার ফাইলে কোনো মশা বসেছে কি না… আমি তো শুধু সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।”
শিফা এক কদম এগিয়ে এল। আমাদের মধ্যে দূরত্ব এখন নেই বললেই চলে। তার গায়ের সেই চড়া পারফিউমের ঘ্রাণে আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। শিফা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করতে এসো না নীল। আমি যা ভাবো তার চেয়েও বেশি বিপদজনক। এই মায়াটা তোমার জীবনের শেষ ভুল হতে পারে। সাবধানে থেকো।”
বলেই সে ফাইলটা এক ঝটকায় তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি সেখানেই স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। এই মেয়েটা কে? সে কি সত্যিই কোনো বিপদে আছে নাকি সে নিজেই একটা বিশাল রহস্য? আর রিয়া আপু কেনই বা এমন একজনকে বাসায় নিয়ে এল?
রাতে খাবার টেবিলে শিফা আবার একদম স্বাভাবিক। রিয়া আপুর সাথে হাহা-হিহি করে তার ছোটবেলার দুষ্টুমি নিয়ে গল্প করছে। যেন বিকেলে আমার ঘরে কিছুই হয়নি! আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। শিফা একবার আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসল। সেই হাসিতে এখন কোনো শাসন নেই, বরং আছে এক অব্যক্ত আমন্ত্রণ।
আমি মনে মনে বললাম, “শিফা ম্যাম, আপনি যতই রহস্যের জাল বোনেন না কেন, এই নীল আপনার হৃদয়ের অন্দরে পৌঁছাবেই। শুরু হোক তবে আমাদের এই অসম লড়াই!”
কিন্তু সেই রাতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, দেখলাম আমাদের বাসার উল্টোদিকের গলিতে একটা কালো গাড়ি অনেকক্ষণ ধরে স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ভেতরে থাকা লোকগুলো সারাক্ষণ আমাদের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। শিফা কি তবে বিপদে? নাকি বিপদে আমি?
চলবে…..