গল্প:অন্তরের স্পর্শ(০১)

লেখিকা:আয়াতবিনতে নূর

পর্ব:০১

রাতের অন্ধকার যেন পুরো শহরকে ঘিরে ধরে নিঃশব্দ হয়ে গেছে। বাতাসে হালকা কুয়াশা, দূর থেকে শহরের অচেনা শব্দ ভেসে আসে—একটি নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে রহস্যময়তা। সেই নির্জন রাস্তা দিয়ে চলছিল একটি কালো, দামী গাড়ি, যার হালকা হিউমার বাতি চারপাশকে অস্থির আলো দিয়ে আলোকিত করছিল।

গাড়ির ভিতরে বসে ছিলেন ধুসর বাদামি চোখের একজন যুবক, হাতের ফোনে স্ক্রল করতে করতে অল্প অস্থির মনে হচ্ছিল। ড্রাইভার তার পাশে ছিল, সামান্য দমবন্ধের মতো নীরবতায়। ঠিক সেই মুহূর্তে, একটা তাদের গাড়ির সমনে এসে পরলো।ড্রাইভার গাড়িতা কোনো রকম ঠিক সময়ে থামাতে পারে।।


“হুয়াট দ্যা হেল? এইভাবে গাড়ি থামানোর মানে কি?”
—যুবকের কণ্ঠে রাগের ঝড় বইছে।
ড্রাইভার কিছু বলতে পারল না, সামনের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠল। চোখে ভয়, হৃদয় ধুকধুক করছে।
গাড়ির ভিতরে যুবকের রাগ যেন সপ্তম আকাশে পৌঁছে গেছে*

*“কি সমস্যা? কিছু বলছ না কেন?”—রাগে কণ্ঠ কাঁপছে।

ড্রাইভার কাঁপা কন্ঠে বলল, —
“স্যার, একবার সামনে দেখুন…”

যুবকের চোখ সামনে তাকাল—রাস্তার মধ্যেই লাল পোশাক পরা একটি মেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে।
অল্প বিরক্তির ছাপ তার মুখে ফুটল। মনে মনে বলল, “হয়ত অচেতন হয়েছে…”
ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল, “যাও , গিয়ে দেখে এসো কি হয়েছে।”

ড্রাইভার ধীরে ধীরে মেয়েটির কাছে গেল। শ্বাস আছে কি না পরীক্ষা করল।
স্বস্তি পেল—মেয়েটি বেঁচে আছে।

****–
যুবক নিজেই গাড়ি থেকে নেমে মেয়েটির দিকে এগোল।এরপর হাটু গেড়ে বসে,মেয়েটার
চুল সরিয়ে মুখটা দেখল।
তার চোখে মায়া মাখা সৌন্দর্য, ফর্সা গায়ের রং, টানাটানা হরিণী চোখ—ঠিক যেন কোনো ঘুমন্ত পরী। তার চোখ গুলো যেন পুরো আটকে গেলো।

ড্রাইভার বলল—
“স্যার, মনে হচ্ছে খুবই মার্জিত পরিবারের মেয়ে। কিন্তু এত রাতে এখানে কী করছিল?”

যুবকটির কেবল ধ্যান ভাঙল, এবং মেয়েটিকে কোলে তুলে গাড়িতে বসল। মেয়েটির মাথা তার কোলে রাখল।
মেয়েটি পুরোপুরি জ্ঞান হারায় নেই চোখ গুলো দিয়ে যুবকটিকে কোন রকম দেখতে পেল। আর যুবকটি মেয়েটির দিকে না তাকিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট করল দিতে বলল,
তারপর প্রায় ১ঘন্টাপর কালো গাড়িটি একটি হসপিটালের সামনে এসে থামল।


তারপর মেয়েটিকে কোলে নিয়ে যুবকটি হসপিটালের ভিতরে ডুকলো। সাথে সাথে ডাক্তার চলে আসলো।এরপর মেয়েটিকে কেবিনে নিজে যেতে বলল।যুবকটি কেবিনে ডুকে বেডে মেয়েটিকে শুয়িয়ে দিলো।
তারপর ডাক্তার কে বলল দেখতে—

ডাক্তার দেখেই বলল, “প্রচণ্ড ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে । “তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরবে। “শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই। সম্ভবত কোনো মানসিক ট্রমা হয়েছে।” এইবলে ডাক্তার চলে গেলো।

যুবক শান্ত থাকল, কিন্তু চোখ যেন মেয়েটির দিকে লেগে গেল। তখন ফোনে কল আসে। যুবক কল রিসিভ করে বাহিরে চলে গেলো তারপর
&উত্তর দিল, “আমি আসছি, অন দ্য ওয়েঃ। কাউকে কিছু বলিস না।”

এরপর ফিরে এসে দেখে মেয়েটি বেডে নেই
কিন্তু ফিরে দেখলো মেয়েটি নেই।
ফ্ল্যাসব্যাক ****
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি চোখ খুলল। ভয়, আতঙ্ক—সব মিলেমিশে কান্নায় ফেটে পড়ল। এরপর সারা রুমে একবার চোখ বুলাল তারপর বলল*
—আমি এই খানে কি করছি? সেই গাড়ি?? সেই ল লোকটি? সেই ছেলেগুলা?? তারা কোথায়????

এরপর দেখে রাত ৮টা বেজে গেছে। তার চোখ কপালে, সে যানে যদি এখন বাড়িতে না যায় তাহলে অনেক সমস্যা হবে।তাই সে তাড়াতাড়ি বের হতে নিলে নার্স এসে বলে
—আপনি কোথায় যাচ্ছেন?আপনার শরীর এখন ভালো না, আপনার রেস্ট নিতে হবে। রেস্ট প্রয়োজন।

নার্সটির কথা শুনে মেয়েটি বলল—
আমি এইখানে কিভাবে এলাম?? আপনি কিছু বলতে পারবেন??

মেয়েটির কথা শুনে নার্সটি বলল—
* আপনাকে এইখানে একটা লোক নিয়ে এসেছে। মেয়েটি অনেক কান্নারত অবস্থায় বলল*
—আপনার কাছে পেন আছে? আর কাগজ থাকলে দিন।
নার্সটি মেয়েটিকে পেন আর কাগজ দিয়ে দিলো।
পেন আর পেয়ে মেয়েটি কিছু একটা লিখে

নার্সটিকে বলল
—আমাকে যেতে হবে। আপনি ওনাকে আমার হয়ে এইটা দিয়ে দিবেন। আর ধন্যবাদ জানিয়ে দিবেন।
এরপর তারাফোরা করে ক্যাবিন থেকে বের হয়ে গেলো।।।


বর্তমান*
কিন্তু ফিরে দেখলো মেয়েটি নেই। সে ভালো করে খুজতে লাগলো।
এরপর নার্স এসে বলল—
*—মেয়েটি চলে গিয়েছে ।”আর এইটা আপনাকে দিতে বলেছেন।এই বলে কাগজটি যুবকটির হাতের দিকে এগিয়ে দিল।এরপর নার্সটি চলে গেলো।

যুবকটি কাগজটি হাতে নিতেই—যেখানে লেখা,
—“আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।”

যুবকটি পড়তে পড়তে মুচকি হাসল, কিছু একটা ভেবে মনে মনে বলে —
-_ আমাদের কি আবার দেখে হবে?**

কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।মনের মধ্যে শুধু মেয়েটির মায়াবী মুখ, চোখ, অজানা আকর্ষণ—সব মিলেমিশে ঘুরপাক খাচ্ছে।


এরপর চিঠিটি ফেলে না দিয়ে ভালো করে ভাজ করে।প্যান্টের পকেটে রেখে দিলো।তারপর ক্যাবিন থেকে বের হয়ে, ড্রাইভারকে উউদ্দেশ্য করে বলল—
—আপাতত আজকের রাতটা কোন হোটেলের দিকে নিয়ে যাও আমি হোটেলেই থাকব।

যুবকটির কথা শুনে, ড্রাইভারটি বলল—
—জি স্যার, এমনিতেই আপনি অনেকটা জারনি করে কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসেছেন।
এইবলে ড্রাইভারটি চলে যায়।
যুবকটিও চল যায়।


এদিকে মেয়েটি তখন হসপিটাল থেকে বের হয়ে। রাস্তায় চলেত আসে কিন্তু বাড়ি এইবার যাবে কিভাবে।সেটাই ভাবছিল—

সে লেডিস জিন্স পড়েছিল তাই মোবাইল আর পার্সটা পকেটেই আছে তাই সে আর দেরি না করে একটা পরিচিত নাম্বারে কল লাগায় —ওপাশ থেকে

একটা পরিচিত পুরুষালি কন্ঠ শুনা গেলো —
*—‘কিরে তানভী তুই কোথায়? তুই ঠিক আছিস?তুই জানিস ছোট কাকিয়া কতটা চিন্তিত।

তারপর তানভীকা বলল—
—ফাহিম ভাইয়া আমি আমি ঠিক আছি। তুমি সিটি হসপিটালের সামনের রাস্তায় চলে এসো। আমি অপেক্ষা করছি।এই বলে তানভীকা কল কেটে দিলো।


চলুন তাদের পরিচয় দেওয়া যাক। তানভীকা তাহি।
সে শেখ বাড়ির ছোট মেয়ে। আসলে মেয়ে বললে ভুল হবে তাকে এই বাড়ির বড় কর্তা রাশেদ শেখ তাদের বাড়িরর অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছিল।তার পিছনে কারণ আছে। এই
গল্পের প্রথমে লোক বলে যাকে তুলে ধরা হয়েছে সে হলো ‘রিদওয়ান আহিল শেখ’। শেখ বাড়ির বড় ছেলে। রাফিউল শেখ আর তাহমিনা শেখকের একমাত্র ছেলে। রিদওয়ান আহিল শেখের বয়স ৩০ বছর।তার যখন ১৭ বছর তখন তাকে জোর করে তাদের বাড়ির আশ্রিতার সাথে তার দাদা রাশেদ শেখ আর বাবা মিলে বিয়ে দিয়েছিলো। আর সেই মেয়েটির মাত্র ৭ বছর বয়স ছিল। এইটা জানার পর সেই দিন রাতে কাউকে না বলে কানাডায় চলে গিয়েছিল।
রাফিউল শেখের আরও ২ ভাই আছে। তারা মোট তিন ভাই বোন নেই। রাফিউল শেখের মেঝ। মিজান শেখ আর তার স্ত্রী সালমা শেখ। তাদের ২ ছেল আর ১ মেয়ে। বড় ছেলের নামে ফাহিম শেখ আর ছোট ছেলে রিহান শেখ আর ছোট মেয়ের নাম রুবিনা শেখ । ফাহিম শেখ ইন্ডাস্ট্রি সামলাচ্ছে। তার বয়স ২৮ আর রিহান শেখ তার বয়স ২৫ ও শেখ ইন্ডাস্ট্রি সামলাচ্ছে।বলতে গেলে দুই ভাই মিলে তাদের বাড়ির ব্যবসা দেখা শুনা করছে।অন্যদিকে রিদওয়ান কানাডা থেকে সব খবর রাখে।
মিজান শেখের মেয়ে রিহান ও ফাহিমের আদরের বোন রুবিনা শেখ তার বয়স ২২ বছর।অনার্স ফাইনাল ইয়ার এক্সাম দিবে দেখতে সুন্দরী বলা চলে কিন্তু কিন্তু বেশ অহংকারী। গল্পের নায়কা তানভীকা তাহি, বয়স ২০ অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী। দেখতে অনেক সুন্দর, মায়াবী চেয়ারা,হরিনী টানা টানা চোখ। কথা বার্তা ব্যবহার চলা ফেরা খুবি ভালো। রান্না থেকে শুরু করে সব পারে। তারপর পড়া শুনায় ও ভালো।
রিহান এবং ফাহিমও তানভীকাকে অনেক ভালোবাসে।


তারপর তানভীকা ভাবতে থাকে অতীতের কথা —

অতীত****

রাফিউল শেখের ছোট ভাই সামিউল শেক।
সামিউল শেখের স্ত্রী মালিহা শেখ।
তাদের কোন সন্তান নেই মালিহা শেখ দিনরাত একটি সন্তানের জন্য কাঁদতেন । অনেক ডাক্তার দেখার লাভ হয় নাই। প্রতিবার তাদের হতাশ হতে হয়। কিন্তু এমন একদিন পরিবারের বড় কর্তা রাশেদ শেখ বাড়িতে একটা ৭ বছর বয়সি একটা মেয়ে আনেন।সেই মেয়েটিকে রাশেদ শেখ ও বাড়ির বড় ছেলে তার বড় ভাসুর রাফিউল শেখ তাদের বাড়ির অনাথ আশ্রম থেমে নিয়ে আসে। তারপর সেই মেয়েটিকে রাশেদ শেখ নিজে সেউ মেয়েটিকে তার ছোট ছেলের বউ মালিহা শেখের হাতে তুলে দেন। পরিবারের সবাই অনেক অবাক হন। রাশেদ শেখ তারপর বলেন
—আজ থেকে ও তোমার আর সামিউলের মেয়ে ওর দায়িত্ব তোমাদের হাতে তুলে দিলাম মা।
এইপুতুলটির কেউ নেই ওকে তোমরা নিজেদের মতো মানুষ করবে।আর আমি কোন কথা বলতে চাইনা ছোট বউ মা। তুমি ওকে দেখে রেখো।

মালিহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন তার শশুরের উপর তারপর কাপা কাপা কন্ঠে বললেন —
****বাবা বাবা আপনি কি বলছেন এই পুতুলটিকে আমি লালন পালন করব??

রাশেদ শেখ বললেন” হ্যাঁ মা “
রাশেদ শেখ বললেন—
*** ওকে একবার জরিয়ে দেখবে না?
শশুরের কথা শুনে মালিহা শেখ একবার নিজের স্বামির দিকে তাকালেন। সামিউল শেক মাথা নেড়ে শায় জানালে। মালিহা শেখ কাপা কাপা পায়ে সামনে এগিয়ে গেলেন।
এইদিকে মেয়েটি মহিলাটিকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে দাদার দিকে তাকালেন। রাশেদ শেখ মালিহা শেখ আর সামিউল শেখের দিকে হাত উঠিয়ে দিয়ে বললেন—
“আজ থেকে ওরা তোর মা এবং বাবা।যা ওদের কাছে।”

মেয়েটি দাদার কথায় ছল ছল নয়নে মালিহার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায়।মালিহা শেখ এগিয়ে এসে মেয়েটিকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে। কাদতে থাকে। এদিকে মেয়েটি মায়ের গন্ধ পেয়ে। মালিহা শেখের সাথে মিশে থাকে। মালিহা শেখ কাদতে কাদতে বলেন* — সামিউল আল্লাহ আমাদের নিরাস করে নাই। দেখো আমাকে বাবার মাধ্যমে একটা পুতুল পাঠিয়েছে দেখেছ। তাদের এই মুহূর্ত দেখে রাশেদ শেখ বলেন
— ছোট বউ মা মেয়েটির নাম কি রাখা যায়।

কান্নারত মালিহা শেখ খুশি মনে বলে উঠে
তানভীকা তাহি।
সেই থেকে তানভীকার পরিচয় হয়ে উঠে।সে শেখ বাড়ির ছোট মেয়ে তানভীকা তাহি।
তারপর রাশেদ শেখ আর রিদওয়ানের বাবা রাফিউল শেখ সেই মেয়ের সাথে রিদওয়ানের বিয়ে ঠিক করেন। তারপর তাদের বিয়ে হয়ে যায়
*
কিন্তু পরিবাবের কেউ এই বিয়েটা মেনে নেয় নি। রিদওয়ান দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তার মা ভেঙ্গে পরেন। আর তার দাদা নাতির এইভাবে চলে যাওয়া মেনে না নিতে পেরে তিনি মারা যান।কিন্তু এই খবর রিদওয়ান জানার পর ও দেশে ফিরে না।
এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পর সবাই শুধু আনভিকে
দোসা রপ করত। কিন্তু সামিউল আর মালিহা মেয়েটাকে তাদের বাবার শেষ সৃতি হিসেবে আগলে রেখেছেন।
কিন্তু সেই ১৩ বছর আগের সেই বিয়ের রাত কিছুই ভুলতে পারে না তানভীকা।
সেই লোকটির জন্য তার জীবনটা এলোমেলো হয়েগিয়েছে।


বর্তমান

এইসব ভাবতে ভাবতে কেউ ওর মাথায় হাত রাখে। সামনে দাড়ানো ব্যক্তিটিকে দেখে তানভীকা মুচকি হাসে তারপর জরিয়ে ধরে বলে—
***ভাইয়া তুমি এসেছ।
ফাহিম আর রাফাহিম বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় বলে —
*—চল ছোট কাকিমা অপেক্ষা করছেন, তোর জন্য।
এইবলে তানভীকাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পরে।
তারপর তাড়া বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়………..

চলবে……….

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments