লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
পর্ব:০১
সন্ধ্যা সাতটা। মৌলভীবাজার কুলাউড়া রেলস্টেশনে আজ তেমন ভীড় নেই। নীরব স্টেশনে এলো যথাসময়ে।হাতের ঘড়িতে সময় দেখে নিজের সময়ানুবর্তিতায় গর্বিত বোধ করলো সে। প্রশস্ত বক্ষপট গর্বে আরও প্রশস্ত হলো। চারিদিকে রাত নামলেও তার চোখে কালো সানগ্লাস।পরণে জংলি ছাপা জ্যাকেট, কালো ট্রাউজার।বুটের গটগটে আওয়াজ তুলে প্ল্যাটফর্মে থেমে থাকা ট্রেনের দিকে এগিয়ে গেলো নীরব।ওর ইউনিফর্মের কারণেই হয়তো সবার কাছে থেকে আলাদা একটা এটেনশন পায় সর্বদা। আর এই বাড়তি এটেনশনকে ভীষণই উপভোগ করে নীরব। এই যেমন আশেপাশের মানুষের একটু চমকে উঠা, চোখের তারায় ফোটা সামান্য ভয় কিংবা অজানা সংশয়ের কারণে রাস্তা ছেড়ে দেয়া এসব দিন-রাত এক করে, হাড্ডিক্ষয় করা কড়া ট্রেনিং-এর এডভান্টেজ। নিজের অভিব্যক্তিতে ইস্পাত-দৃঢ় ভাবগাম্ভীর্য অমলিন রইলো ওর। থেমে থাকা ট্রেনে নিজের ট্রলিব্যাগ সমেত গিয়ে বসলো নির্ধারিত কেবিনে। দুই সিটের স্লিপার কেবিন। তবে অপর সিটে কেউ থাকবেনা এমনভাবেই টিকিট কাটা হয়েছে। সারারাতের জার্নি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফাইল ঘাটতে হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ সিভিলিয়ানদের সঙ্গে চলাচল করলে কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেনা বিধায় দুটো টিকিট কেটেছে। কেবিনে গিয়ে জ্যাকেট খুলে শুধুমাত্র একটি পাতলা কালো টি-শার্ট পরে ল্যাপটপের সাটার ওপেন করে সিটে বসলো সে। ট্রেন ছাড়তে অবশ্য দেরি নেই। তাতে কি? ওর এখানে তো আর কেউ আসবে না। তাছাড়া এসি স্লিপার কেবিন হবার দরুণ জানালার কাঁচ খুলে বাইরে কিছু দেখারও অবকাশ নেই। অতএব কাজ করা যাক। নিরিবিলি পরিবেশে ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করলে রহস্যের সমাধানও হবে চটজলদি।
সময় গড়াতেই ইতোমধ্যে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ল্যাপটপ থেকে মুখ উঠিয়ে বাইরে তাঁকালো নীরব। তবে অন্ধকারে কিছু দেখতে অবশ্য পেলোনা। এমন সময় শুনলো ওর কেবিনের দরজা ধাক্কাচ্ছে কেউ জোরে জোরে। সম্ভবত ভুলবশত কোনো সিভিলিয়ান এসে হাজির হয়েছে। কপাল কুঁচকে সেদিকে চেয়ে ছোট্ট করে বললো,
— কামিং..
দরজা খুলতেই কুঁচকে থাকা কপাল আরও কুচকে গেলো। গম্ভীরমুখে কিছু বলার আগেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুনীর মেজাজ বিগড়ালো। হাত নাড়িয়ে অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গিতে রুক্ষ্ণভাবে বললো,
— দরজা আটকে রেখেছেন কেন? এটা আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি? নাকি এখানে বিয়ে শাদি করে সংসার পেতেছেন? নৌকায় যেমন ভাসমান সংসার পাতে অমন কিছু? দুনিয়ায় কি সংসার পাতার জায়গার অভাব? শেষমেষ ট্রেনে? সংসার পেতেছেন ভালো কথা? চলন্ত ট্রেনে কেন? নেহাত যদি থাকার জায়গা না থাকে বিভিন্ন জংশনে পরিত্যক্ত ট্রেনের বগি থাকে ওইখানে যান। কি আজব? আবার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সরুন? আরেহ বাবা আজকের জন্য ভেবে নিন আপনার চলন্ত ট্রেনের সংসারে একজন অতিথি এসেছে। আচ্ছা খাবার-দাবার এখানেই রান্না করেন? নাকি ফুড কোম্পার্টমেন্ট থেকে কিনে আনেন? যাই হোক সংসারের বাড়তি মেহমান এর জন্য এক্ষুনি গিয়ে আমার জন্য দুই কাপ কফি আনুন। নো সুগার ওকে? আমি ভাই ডায়েটে আছি।সুগারে মোটা হয়ে আলুর মতো হয়ে যাবো না বলুন?শুনুন কফিমেট দিয়ে দিতে বলবেন। নো পাওডার মিল্ক। দেশের সবকিছুতেই ভেজাল। মেলামাইন গুড়ো করে পাওডার মিল্ক বানায়! মানুষ খাবেটা কি তবে? আর কাপটা ভালোভাবে মেজে দিতে বলবেন। ইশ শীতে মরে গেলাম। এখানে এত শীত কেন? অবশ্য শীতের দিনে শীত না পড়লে আবার ভালো লাগেনা। উফ আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আতিথিয়েতা ভুলে গিয়েছেন? নাকি পায়ের হাড্ডি ক্ষয় হয়ে গেলো?হুম? কথা বলছেন না কেন?
একনাগাড়ে রেলওয়ে রেড়িও স্টেশন থেকে প্রচারিত হওয়া বার্তাযোগে নীরব থ বনে গেলো। বুকে হাত বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে বললো,
— আর কিছু ম্যাডাম?
— আপাতত সরুন। এটা আমার সিট।
— আই থিংক আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।
— দেখুন? মিস্টার হোটেভার? রাত-বিরেতে একা মেয়ে দেখেছেন বলে ঝামেলা করার সুযোগ খুঁজবেন না। কত দেখলাম আপনাদের মতো ছোকরাদের। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ছুকছুক করে। এইযে দেখুন? এটা আমার কেবিন। A-2 সিট নাম্বার আমার। চলন্ত ট্রেনে সংসার পেতেছেন ভালো কথা। কিন্ত একটা ভাড়া নিয়েছেন মাত্র একটা সিট। তাহলে প্রতিবেশী তো আসবেই। প্রতিবেশী ছাড়া আবার সংসার হয় নাকি? সরুন তো। খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনি কি গাছ? শিকড় গজিয়ে গিয়েছে? এক্সাভেটর আনিয়ে নেয়া লাগবে নাকি আপনাকে উচ্ছেদ করতে? নাকি করাত আনতে হবে? করাত বোঝেন তো? বাংলায় বাগধারা আছেনা শখের করাত? বুঝেছেন তো? এবার কফি আনুন? মনে আছেনা? নো সুগার, ওকে?
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ট্রেনে আগত এক নারীর চিল্লাচিল্লিতে পাশের সারির কেবিনের মানুষ জন উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখা শুরু করে বিব্রতবোধ করে নীরব। তন্মাধ্যে ওকে ছুকছুক করা ছোকরা সম্বোধনে ইগোতে বাঁধলো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ট্রেনিং-এর বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের কণ্ঠস্বর। শান্ত মুখশ্রীতে গমগমে গলায় বললো,
— আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মিস। কেবিন আমি পুরোটা বুক করেছি। আপনি অন্যকোথাও যান৷ তামাশা করবেন না। আ’ম স্পিকিং টু ইউ সফটলি।
কথাটা বলেই মনে মনে মৃদু হাসলো নীরব৷ কেননা ওপাশে দাঁড়ানো তরুনীর হয়তো আঁচ করতে পেরেছে কিছুটা। যার কারণে থমকে গিয়েছে। হাহ.. সিভিলিয়ান! কেন যে এত ভয় পায় ওদের?
নীরবের কঠোর কন্ঠস্বরের তড়িৎ কাজ হওয়া দেখে আরও গম্ভীর করলো মুখভঙ্গি। বললো,
— আর কিছু নিশ্চয় বলার নেই ম্যাডাম।
তবে একটু মশকরা করা থেকে নিজেকে দমাতে পারলো না সে। খানিক আগেও যেভাবে চা-কফি আনার অর্ডার দিচ্ছিলো, তাতে নিজেকে নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছি নীরব। সে কোনোভাবে ট্রেনে সত্যিকার অর্থে সংসার পেতে বসেছে কি না। মেয়েটাকে কড়া গলায় কথা বলে এখন ভালো লাগছে। সেই ভালো লাগা থেকে ঠেস দেয়া গলায় বললো,
— সবকিছুর মেয়াদ থাকে মিস। ভোকাল কর্ড বেশি ব্যবহার করলে ড্যামেজ হয়ে যাবে। এখন আপনি আসতে পারেন।
ব্যস এবারে কেবিনের দরজা লাগাতে উদ্যত হয় নীরব। কোনোভাবে এই মুসিবত যদি ওর কেবিনে প্রবেশ করে ফেলত তাহলে আর কান দুটো নিয়ে কাল পঞ্চগড় পৌছানো লাগতো না ওর। কান দুটো আজ আপনা-আপনি ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্নহত্যা করতো!
— সিকিউরিটি? সিকিউরিটি? সিকিউরিটি….
উচ্চস্বরে চেঁচামেচিতে এবারে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলো সকলে। তড়িঘড়ি করে ছুটে এলো ট্রেনের টিটি। সঙ্গে দু’জন গার্ড পুলিশ। মুহুর্তে এ-ওয়ান বগিতে শুরু হলো বিশৃঙ্খলা! ঘটনার আকস্মিকতায় হতবম্ভ হলো নীরব। অবশ্য হিউম্যান বিহেভিয়ারেল সাইকোলজি নিয়ে অনেক গুলো ট্রেনিং সে করেছে। ওর বোঝা উচিত ছিলো এই নারী এত সহজে দমবে না। তবে সে-ওই বা কম কিসে? হতে পারে এটি ওর সুপ্ত ট্রেনিং-এর কোনো অংশ। নিজ ডিপার্টমেন্টের উপর বেজার হলো নীরব। তাই বলে ওকে হ্যানি-ট্র্যাপে ফেলবে? এমনও হতে পারে? অবশ্য ওর ডিপার্টমেন্টে কে দিয়ে সবই সম্ভব। তবে ডিপার্টমেন্টের হানিট্র্যাপের চয়েজের উপরও বেজার হলো সে। এটা ওর জন্য কাঁচাকলাট্র্যাপ। এমন বাচাল হেডেকরুপী নারীর ট্র্যাপে আর যাই হোক নীরব কাবু হবেনা। ঠোঁটের কোনে রহস্যময় হাসিটা চওড়া হলো ধীরে ধীরে ওর। বুকে হাত বেঁধে অপেক্ষায় থাকলো তার জন্য বরাদ্দ কাঁচাকলার যাত্রাপালা দেখতে। নাটক-সিনেমা তো বহুদিন দেখা হয়না। যাক ডিপার্টমেন্টের কল্যানে একটু লাইভ টেলিকাস্টের বায়োস্কোপ উপভোগ করা যাবে ভরপুর। মেয়েটিকে এবারে তীক্ষ্ণ নজরে পরোখ করলো নীরব। চেহারা ছবি বলতে গেলে ভালো। পরণে বেগুনী কুর্তি,লেডিস ডেনিম জ্যাকেট। গলায় দুপ্যাচ দিয়ে কালো ওড়না ঝোনালো। কানে ছোট্ট এক জোড়া এন্টিকের এয়াররিং। চোখে মোটা কাজল টানা। তবে কাজলের বয়স হয়তো কয়েক ঘন্টা। কেননা কাজল লেপ্টে গিয়েছে অনেকটাই। তরুনীর গলায়ও একই ডিজাইনের লকেট এবং চেইন৷ লম্বা চুলে মোটা বিনুনি করে একপাশে ফেলে রাখা, কাধে বেশ বড় একটা ব্যাগপ্যাক। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া কোনো কিশোরী বলে ভ্রম হবে প্রথমে। তাই উচ্চবাচ্য না করে কিছুটা সন্দেহবশত চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকলো নীরব। তবে সে নীরব থাকলেও ওপাশের তরুনী শান্ত রইলো না। তারস্বরে চেঁচিয়ে বললো,
— এক্সকিউজ মি? স্যার? আমার টিকিট দেখুন৷ ওয়ান থাউজেন্ড এন্ড ফোর হান্ড্রেড অনলি টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠেছি আর এই যে সামনে দাঁড়ানো দেখে মনে হওয়া ভদ্রলোক তবে আদতে ভদ্রলোকটির আচরণ মোটেও ভদ্রলোকের মতো নয়, উনি আমাকে কেবিনে প্রবেশ করতে দেননি। এমনকি আমার চৌদ্দশত টাকাটা শুধুমাত্র ভুল বলে বিদায় করে দিতে চাইছেন। না-ও আই ডিমান্ড এক্সপ্লেনেশান। টাকা কি গাছে ধরে? খেটে খাওয়া মানুষের টাকা মেরে খেতে লজ্জা হওয়া উচিত। আমাদের দেশের দামাল ছেলেরা বারংবার রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা আনবে আর এই ভদ্রলোকের মতো অভদ্রলোকেরা স্বাধীনতা খর্ব করবে। এজ আ ফার্স্টগ্রেড সিটিজেন, আই ডিমান্ড জাস্টিস। না-ও!
নীরব জানে এবার কি হবে? হিরোগিরি দেখাতে পুলিশ সদস্য ওকে বেশ কিছু কথা শোনাবে। বাট রুলস আর রুলস। দুটো টিকিট তার নামে বুক করা। সুতরাং এই আপদমস্তক আপদরুপী মেয়েটিকে নিজের কেবিনে কোনোভাবে জায়গা দেবে না নীরব বলে সে নিজ সিদ্ধান্তে অনড়।
ভাবনাটা শেষ হবার সুযোগ না দিয়েই খেঁকিয়ে উঠলো জোয়ান পুলিশ সদস্য। পিঠের ডামি এয়ারগানটা শক্তপোক্তভাবে চেপে ধরে হম্বিতম্বি করে বললো,
— উনাকে ভেতরে যেতে দিচ্ছেন না কেন? সমস্যা কি?
স্বভাবতই ঠোঁটের কোনে সামান্য হাসি ফুটে আবার মিলিয়েও গেলো নীরবের।মানিব্যাগে আইডিকার্ড রাখা। বের করে দেখালে পুলিশ সদস্য এমনকি টিসি অফিসার নগদে সালাম ঠুকবে।তবে নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্বাভাবিকভাবেই বললো,
— আই বুকড হোল কেবিন।
— মিথ্যে কথা.. আমার কাছে টিকিট আছে। আপনি চেক..
তরুনীকে বাকিটুকু বলার সুযোগ না দিয়ে নীরব নিজের টিকিট বের করে টিসি অফিসারের উদেশ্যে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
— লুক।
নীরবকে টিকিট বাড়িয়ে দিতে দেখে সব সমস্যার মূলে থাকা মেয়েটিও নিজের টিকিট দেখিয়ে বললো,
— আমার সঙ্গে কোনো হাংকিপাংকি করবেননা, বুঝেছেন? আমি টিকিট কেটেছি। এটা আমার সিট। এন্ড দ্যাটস ইট। আপনার না পোষালে ট্রেনের ছাদে উঠে ‘ছাইয়া ছাইয়া’ গানে টিকটকে নাচুন।
নীরব তার সামনে দাঁড়ানো নারীর কথার রেলগাড়ীর প্রত্যুত্তরে কোনো কিছুই বললোনা। এমনকি চোখ তুলে দেখলো পর্যন্ত না। এসব কাঁচাকলাট্র্যাপে ওকে ফেলা এত সহজ নয়। তার কথা হবে অফিসারের সঙ্গে।
দুটো টিকিটই মনোযোগ সহকারে দেখলেন টিসি অফিসার। বিনীতভাবে বললেন,
— অনলাইনের সিস্টেমে গোলযোগের কারণে একই টিকিট দু-জনের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে৷ কন্সিডার করুন। রাতের ট্রেনে একজন নারীকে কোথাও সিটের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এডজাস্ট করে নিন প্লিজ।
নীরবের মুখশ্রীতে মেদুর ছায়া পড়লেও ওপাশের তরুনী জিতে যাওয়ার ভঙ্গিতে হাতের মুঠি উপর-নীচ করে বললো,
— ইয়েস। আই নিউ ইট। থ্যাংকস অফিসার। আপনাদের মতো অফিসার আছে বলেই না আমাদের রেলওয়ে এতটা ওয়েল-মেইন্টেইন্ড। নয়তো আজকাল ভদ্রবেশী অভদ্রলোক দিয়ে সব জায়গা ভরে গিয়েছে। সো মাচ থ্যাংকিউ। আম সো প্রাউড অফ ইউ।
সুন্দরী তরুনীর প্রশংসায় গদগদ হলো তরুণ পুলিশ অফিসার। এমনকি মধ্যবয়সী টিসি অফিসারের চেহারাটা চকচক করে উঠলো। আর পুরো বায়োস্কোপের শো শেষ হবার পর নিজের কানের আত্নার মাগফেরাত কামনা করে কেবিনে ফিরে গেলো নীরব। ল্যাপটপটা ওপেন রেখে এসেছে।অফ করাটা জরুরি। এমনও হতে পারে এই মেয়েটা ওর শত্রুপক্ষের তরফ থেকে এসেছে। কোনো ইনফরমেশন হাতিয়ে নিতে। কোনো সম্ভাবনাকে হেলায় ফেলে রাখবে না নীরব৷ কেবিনে ফেরার আগে গম্ভীরমুখে শুধু বললো,
— দিস ইজ নট ডান।
টুকটুক করে হেঁটে কেবিনে এসে কাঁধ থেকে ব্যাগপ্যাক নামিয়ে রাখলো নীতি। নিজের মনে কাজ করলেও তার নজর রয়েছে ওপর পাশে বসা মানুষটির দিকে। একা কামরায় এই লোকের সঙ্গে যাত্রা কতটা সেইফ হবে? প্রথম দর্শনে ভদ্রলোক মনে হলেও ব্যাটা আস্তো নাকউঁচো। আর নাক উঁচু লোক দুচোখে সহ্য করতে পারেনা নীতি। ব্যাগপ্যাক যথাস্থানে রেখে সিটে হেলান দিয়ে দুপা তুলে আরাম করে বসে বললো,
— এইযে ইংরি ইয়াং ম্যান? কেবিনের বাইরে খুব তো টাফ লুক দিলেন। ধমকটা এমন দিলেন যেন গোটা ট্রেন আপনার নিজস্ব সম্পত্তি। এখন হোলো তো? আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ জিততে পারেনি। আরে ভাই জেতার জন্য যেই ব্রেইন দরকার সেটা সবার নেই। আচ্ছা কয়টা বাজে? আজ আরেকটু হলে আমার ট্রেন মিস হয়ে যেতো। আর ট্রেন যদি একবার হয়ে যেতো না? বিয়ে কনফার্ম হয়ে যেতো।
কয়েকবার পলক ঝাপটে নিজের অবস্থার জন্য বড়ই আফসোস হলো নীরবের। তবে ঘড়ির সময় জিজ্ঞেস করলো বলে গম্ভীরকণ্ঠে শুধু বললো,
— সেভেন থার্টি।
— সাতটা ত্রিশ বেজে গেলো? অমনি? টাইম এন্ড টাইড ওয়েট ফর নান। এই যেমন ধরুন আমার সময়? এটা থেমে নেই। পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি এসেছিলাম। এরমধ্যে নাকি আমার বিয়ে দিয়ে দেবে। দাদুর কোন বন্ধুর নাতির সঙ্গে। ছেলে নাকি সরকারি চাকরিজীবী। আচ্ছা আপনি বলুন ভাই? এটা কোনো কথা? মানুষ চাঁদে জমি কিনছে। মঙ্গলগ্রহে পৌছে যাচ্ছে। ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের অতলে চলে যাচ্ছে। এমন যুগে আমায় নাকি অদেখা কোনো সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে! মগের মুল্লুক নাকি? ছেলেকে না দেখে বিয়েতে হ্যাঁ বলি আর বাসর ঘরে ঢুকে যদি দেখি ইয়া বিশাল থলথলে ভুড়ি, মাথায় টাক, বুক ভর্তি পশম, গায়ে পাঠার মতো গন্ধ তখন আমার কি হবে? নারীর শত দোষ। আর ডিভোর্সের কলংক মাথায় নিয়ে চলাটা কতটা কঠিন হনে জানেন? তখন আমাকেই বলবে মানিয়ে নাও। আরেহ এটা মানিয়ে নেয়ার জিনিস? থলথলে ভুড়ি আবার মানিয়ে নেয় কিভাবে? আর গায়ের গন্ধ আবার মানিয়ে নেয় যায় নাকি? সেই আমার দাদুর একই কথা, সে মরার আগে বিয়ে দেখে যেতে চায়। পুরো বাংলা ছবির কপি করে আমার জীবন সিনেমা বানাতে চাইছে জানেন? আরেহ বুইড়া ভাম তুই এমনিও মরবি, ওমনিও মরবি মাঝখানে আমারে কুরবানি করার কোনো মানে আছে বলেন ভাই? আপনি বলেন? আমি বেশি কিছু বলেছি? শুধু বলেছি পেটমোটা টাকলা সরকারি চাকরকে বিয়ে করবো না। বাড়ির সবাই এমন ভাবে কান্নাকাটি করা শুরু করেছে। উফ আমি পালিয়ে বাঁচলাম। আর সেই বাঁচা আমি বাঞ্চাল করে দিচ্ছিলেন একটুর জন্য! আমরা এখন মুসাফির। একটু সমঝে চলবেন তো না কি? হুম?
ননস্টপ বকবকে মাথা ব্যথা শুরু হলো নীরবের। আঙুল ঘষলো কপালে খানিকটা। কুলাউড়া স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী ট্রেনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে থাকা বাক্যালাপে অতিষ্ট নীরব বিড়বিড়িয়ে বললো,
— তবে আমার কান দুটো বুঝি আর বাঁচবেনা। এরচেয়ে কঠোর ট্রেনিং আর দুটো নেই। দুশো পুশ আপ করা সহজ এই মেয়ের বকবক শোনার চাইতে!
— কিছু বললেন?
দুপাশে মাথা নাড়লো নীরব। ফের সে মনোযোগী হলো ল্যাপটপে।যদিও কনফিডেনসিয়াল ফাইল গুলোকে সে অলরেডি লক করে ফেলেছে। এখন তার সামনে বসা চ্যাটার বক্সের আওয়াজ থেকে বাঁচার জন্য কানে এয়ার বাডস গুঁজে চুপচাপ ল্যাপটপে কাজ করতে থাকে।
তবে তার সামনে বসা নমুনার ওর কাজ করাটা হজম হলোনা বোধহয়৷ টেবিলে শব্দ করে ওর মনোযোগ আকর্ষণ করলো নীতি। কম্বল মুড়িয়ে বললো,
— আচ্ছা আমরা যেই একই টিকিট দু’জন কেটেছি? এটার টাকা কি আমি ফেরত পাবো? রিফান্ড রিকোয়েস্ট এক্ষুনি করে ফেলব? কবে নাগাদ ফেরত দেবে? হ্যান্ড টু হ্যান্ড দেবে নাকি কুরিয়ার করবে? কিন্তু টাকা-পয়সা কুরিয়ার করা যায়? আচ্ছা টাকাটা লস যাবার সম্ভাবনা নেই তো? এই সরকারি চাকরিজীবীদের থলথলে ভুড়ি হয়ই দেশের মানুষের টাকা শুষে খেয়ে বুঝলেন? আর রেখেছে কিছু অকেজো বাহিনীর সদস্য। কবে যুদ্ধ হবে সেজন্য পেলেপুষে এদের ভুড়ি থলথলে করে সরকার! আমি যদি প্রধানমন্ত্রী হতাম না? সব আর্মিদের রিক্সা চালাতে বলতাম। রাস্তা ঝাড়ু দেয়াতাম। মানে তারা তো কোনো কাজবাজ করেনা। দেশের সেবার জন্য তাদের রাখা হয়েছে।এখন আপনিই বলুন এতগুলোও তো দেশেরই কাজ তাইনা?
— কিন্তু আপনি তো ট্রাভেল করছেন নিজের টিকিটে।
— ওহ হ্যাঁ ভাই। ভুলেই গিয়েছিলাম। আসলে আপনি যেমন নাটক করলেন না? এটাকে আপনার সিটই ধরে নিয়েছি আমি। আচ্ছা ট্রেন কখন পৌছাবে? জানেন আমি না বাড়ি থেকে পালিয়েছি। চমকে গেলেন তাইনা? জোর করে আমাকে বিয়ে দেয়া এত সহজ নয়। তোমার বিয়ে দেখতে মন চাইলে নিজে বিয়ে করো। তাইনা বলুন? আমার গলায় ঘন্টা বাঁধার দরকার কি ভাই? বিয়ে মানে পেইন। তার উপর বিয়ে কোথায় ঠিক করেছে জানেন? চট্টগ্রামে!মানে আমি তো ওখানকার ভাষাও বুঝিনা। দেখা যাবে আমাকে গালি দিয়ে দিলো কেউ আর আমি বুঝতেই পারলাম না। ইয়া খোদা! ভাবতেই আমার মাথা ঘুরাচ্ছে। আর ওই সরকারি চাকরিজীবীর কি আক্কেল? সুন্দরী মেয়ে শুনেই বিয়েতে রাজী হয়ে গেলো? অমনি? নিজেকে আয়নায় একবার দেখবে না? থলথলে ভুড়ি দেখলেই আমার ফাসায়ে চর্বি বের করতে মন চাই। শুরুটা তো ওই সরকারি চাকরকে দিয়ে করাতে চেয়েছিলাম।সব প্ল্যান রেডি আমার। বুঝলেন ভাই? আমি পঞ্চগড় পালাচ্ছি আমার বান্ধবীর কাছে। আজ একটা বয়ফ্রেন্ডের বড়ই অভাববোধ করছি! সে থাকলে অন্তত আমাকে এই আপনার মতো নিরামিষ লোকের টাকার টিকিটে ভ্রমণ করতে হতো না। আসলে কি বলুন তো? বয়ফ্রেন্ড আরেকটা পেইন। মাঝরাতে বলবে তোমার শাড়িতে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে জান। কেন রে শা লা হারাম জাদা শীতের রাতে কম্বল থেকে উঠিয়ে তোর শাড়ি পর দেখা লাগবে কেন? এসব ন্যাকামি আমি নিতে পারিনা ভাই। ঘরের খেয়ে, বনের মোষ আমি তাড়াই না। হাহ।
বিস্ফোরিত নেত্রে সামনে বসা তরুনীর দিকে চেয়ে রইলো নীরব। স্বভাবতই নিজের নামের মতো সে-ও নীরব। কিন্তু একটা মানুষ এত কথা কিভাবে বলতে পারে? আগামী এক বছরে নীরব যত কথা বলতো সেই পরিমাণ কথা এই মেয়ে আধাঘন্টায় খরচ করে ফেলেছে। এই লাউডস্পিকারকে থামাতে হবে।
— সেই ভদ্রলোক আসলে বেঁচে গিয়েছেন আপনি পালিয়ে আসায়। আম ওয়ার্কিং। প্লিজ ডোন্ট ডিস্টার্ব।
বেশ কড়াস্বরে কথাগুলো বলা শেষ করতেই ম্যাসেজ টোন বাজলো নীরবের। প্রেরক তারই ছোটভাই নীলয়। সম্ভবত কোনো মেয়ের ছবি পাঠিয়েছে। চলন্ত ট্রেনে নেটওয়ার্কের গতি কম থাকায় ছবিটা লোড হতে সময় নিচ্ছে। ছবির ক্যাপশানে নীলয় লিখেছে,
— তোমার কুরবানির বকরি। দাদাভাই জানিয়েছেন তুমি বিয়ে না করা অব্দি দাদাভাই অনশনে বসবেন। গুড লাক ব্রো।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ছবিটার দিকে তাঁকিয়ে রইলো এবং ছবিটা লোড হতেই আজকের সন্ধ্যায় দ্বিতীয়বারের মতো থ বনে গেলো নীরব সাফওয়ান । কারণ ছবিটি আর কারো নয় ওর সামনে বসা তরুনীর। একটা চলতি-ফিরতি লাউডস্পিকার। এই সাংঘাতিক মেয়েকে বিয়ে করলে নীরব একেবারে নীরব হয়ে যাবে নির্ঘাত। ওর-ও তখন সামনে বসা মেয়েটির মতো বলতে মন চাইলো,
— আরেহ বুইড়া ভাম তুই এমনিও মরবি, অমনিও মরবি। মাঝখানে আমারে ক্যান কুরবানি করবি…
ভাবনাটা মনে আসতেই চমকালো নীরব। এই মাত্র সে এক আধাপাগল মেয়ের পাল্লায় পড়ে নিজের শ্রদ্ধাভাজন দাদাভাইয়ের মৃত্যু কামনা করে ফেলেছে! এইটা কোনো মেয়ে নাকি ছোঁয়াচে রোগ! বিড়বিড় করে বললো,
— ইয়া খোদা সেইভ মি।
চলবে….