গল্প:বিদেশ বাবু বাঙালি ম্যাম(০৫)

লেখিকা:তাছমিয়াতুল জান্নাত

পর্ব :০৫

সুবহার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর গোধূলির কানে তীরের মতো বিঁধল। লীরা বা গোধূলি, যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন, গত দুই বছরের বাস্তবতায় সে যেন এক জীবন্ত পাথর হয়ে গেছে। সুবহার কথাগুলো তাকে নিষ্ঠুরভাবে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল।

​গোধূলি জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ফোনের ওপাশ থেকে সুবহা বিরতিহীনভাবে বলে চলেছে—

​”কিরে লীরা? তুই এখনো চুপ করে আছিস? দুই বছর হয়ে গেল তোদের বিয়ের। অথচ গত এক বছর ধরে তোরা একজন আরেকজনের সাথে কথা পর্যন্ত বলিস না! এক ছাদের নিচে থেকেও তোরা দুজন যেন দুই মেরুর বাসিন্দা। মাহারু এখন বড় হচ্ছে, ও তো সব বোঝে। ও কী শিখবে? ও কি এটাই দেখবে যে তার মা-বাবা একে অপরের ছায়াও মাড়ায় না?”

​গোধূলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে পড়ে গেল সেই বিকেলের কথা, যখন মিথন সিঁড়িতে বসে মাহারুকে কোলে নিয়ে বাচ্চা মানুষের মতো কেঁদেছিল। সেই দিনের সেই মায়া, সেই খুনসুটি—সবই কি তবে অভিনয় ছিল? এলিকার সাথে মিথনের সেই ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা আর ডিভোর্সের হুমকি কি তবে শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো?

​গোধূলি  খুব শান্ত গলায় সুবহাকে বলল—

​”সম্পর্কটা তো কোনোদিন স্বাভাবিক হওয়ার জন্য শুরুই হয়নি সুবহা। আমরা দুজনেই তো এক চুক্তির জালে বন্দি। মাহারু বড় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ও হয়তো শিখবে যে পৃথিবীতে কিছু মানুষ একসাথে থেকেও কতটা একা হতে পারে।”

​সুবহা ওপাশ থেকে রেগে গিয়ে বলল—

​”চুক্তি? কিসের চুক্তি? মিথন তোকে সম্মান দেয় না সেটা মানলাম, কিন্তু তোরা তো একটা বাচ্চার বাবা-মা! এভাবে দিনের পর দিন বোবা হয়ে থাকা কি সমাধান? মিথন তো তার চায়নিজ সুপারস্টার ইগো নিয়ে বসে থাকে, তুই কেন উদ্যোগ নিস না?”

​গোধূলি ম্লান হাসল। সে জানে মিথন এখন আর সেই বমি মাখা টি-শার্ট পরা সাধারণ মানুষটি নেই। সে এখন তার কেরিয়ার আর গ্ল্যামার নিয়ে ব্যস্ত। তাদের মাঝখানে এখন শুধু মাহারুই একমাত্র সুতো, যা ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়ে কেউ কোনো কথা বলে না।
​গোধূলি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে মাহারুর ঘরের দিকে তাকাল। মাহারু হয়তো এখন খেলছে।

গোধূলি  মনে মনে ভাবল—

​”এক বছর ধরে একটাও কথা হয়নি আমাদের। অথচ আমরা একে অপরের নিশ্বাসের শব্দ চিনি। মিথন কি আসলেই বদলে গেছে, নাকি সেই এলিকার স্মৃতি আজও তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে?”

গোধূলির কথায় সুবহা ওপাশে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। গোধূলির গলার স্বরে এক অদ্ভুত বিষাদ আর প্রাপ্তির সংমিশ্রণ।

গোধূলি জানালার পাশে রাখা হিজাবের রুমের  দিকে তাকিয়ে সুবহাকে বলতে লাগল—

​”জানিস সুবহা, মিথন আমার সাথে গত এক বছর একটা শব্দও খরচ করেনি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানিস? এই এক বছরের প্রতিটি দিন সে বাসায় ফেরার সময় আমার জন্য ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো হিজাব দিয়ে বানানো বোকেট নিয়ে আসে। আমার ঘরে এখন হিজাবের সংখ্যা কত জানিস? মোট ৭৩০টি বোকেট! আর সেই হিসেবে মোট হিজাব আর ব্রেসলেটের সংখ্যা ৩,৬৫০টি করে। ভাবা যায়? একটা মানুষ কথা বলে না, অথচ প্রতিদিন এই উপহারগুলো দিতে ভোলে না।”

​গোধূলি একটু থামল, তারপর মাহারুর কথা মনে করে তার গলায় হালকা হাসির আভা ফুটে উঠল—

​”শুধু আমার জন্য নয় রে, মাহারুর জন্যও সে প্রতিদিন চকলেট নয়তো হরেক রকমের হেয়ার ক্লিপ দিয়ে সাজানো বোকেট নিয়ে আসে। এতগুলো জিনিস রোজ সে নিজে পছন্দ করে আনে, অথচ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা কথা বলার সাহস পায় না।”

​সুবহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“মাহারু কোথায় এখন?”

​গোধূলি ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সে ম্লান হেসে বলল—

​”কোথায় আর থাকবে? ওই তো, মেইন দরজার সামনে গিয়ে ঠায় বসে অপেক্ষা করছে। কখন কলিংবেল বাজবে আর কখন তার ‘পাপ্পা’ আসবে। সন্ধ্যা হলেই মাহারুর এটাই অভ্যাস। কিছুক্ষণ পর পরই দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলবে— ‘মাম্মি, তরতা (দরজা) তুলো (খোল)! পাপ্পা (আব্বু) আসবে!'”

​গোধূলি ফোনটা লাউডস্পিকারে দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দেখল ছোট্ট মাহারু তার ছোট্ট দুই হাত দিয়ে দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
★★*

কলিংবেলের আওয়াজ হতেই মাহারু খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল। গোধূলি দরজা খুলতেই দেখল মিথন দাঁড়িয়ে আছে। সারা দিনের ক্লান্তি ওর চোখেমুখে, কিন্তু দুই হাতে দুটো সুদৃশ্য বোকেট। কোনো কথা না বলে সে মাহারুর হাতে তার প্রিয় হেয়ার ক্লিপ দিয়ে সাজানো তোড়াটা দিল, আর গোধূলির দিকে বাড়িয়ে দিল সেই পরিচিত হিজাবের বোকেট।

​মিথন একবারও গোধূলির চোখের দিকে তাকাল না। উপহার দুটো হাতে দিয়ে ও সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল নিজের রুমের উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল এক তরুণী। পরনে উগ্র ওয়েস্টার্ন পোশাক, কড়া লাল লিপস্টিক আর উৎকট পারফিউমের ঘ্রাণে পুরো ড্রয়িংরুমটা ভরে গেল।

​গোধূলি মাহারুকে দ্রুত নিজের কোলে টেনে নিল। তার বুকের ভেতরটা অপমানে আর ঘৃণায় রি রি করে উঠল।

মিথনের চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল—

​”মিথন নওশাদ, তুমি কখনোই পরিবর্তন হবে না। তোমার কাছে মেয়েমানুষ মানে শুধুই টিস্যু পেপার। হাত পরিষ্কার করার পর আমরা যেমন টিস্যু ফেলে দিই, তুমিও ঠিক সেভাবেই মেয়েদের ব্যবহার করার পর ডাস্টবিনে ফেলে দাও। এক বছর ধরে এই নাটুকে উপহার দিয়ে তুমি কি তোমার এই নোংরা চরিত্র ঢাকতে চেয়েছিলে?”

​গোধূলি নিজের রাগ সংবরণ করে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

“তুমি কে?”

​মেয়েটা বেশ অবজ্ঞাভরে গোধূলির আপাদমস্তক একবার দেখে নিল। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—

“টিনা।”

​টিনা নামটা শোনার পর গোধূলি আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। মিথন যে আজ এই বাড়ির পবিত্রতা নষ্ট করতে বাইরে থেকে মেয়ে নিয়ে এসেছে, এটা মেনে নেওয়া তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে মাহারুকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল।

​পেছন থেকে টিনা হয়তো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু গোধূলি শুনতে চাইল না। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তার চোখ ফেটে জল আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। এক বছর কথা না বলেও যে মানুষটাকে সে কোথাও একটু হলেও জায়গা দিয়েছিল, আজ যেন সেই জায়গাটা চিরতরে বিষাক্ত হয়ে গেল।
​গোধূলি রুমে ঢুকে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল।

মাহারুর কান্নাটা যেন গোধূলির বুকের ওপর হাতুড়ির মতো বিঁধছিল। সে দরজা বন্ধ করে দিতে চাইলেও মাহারু তার ছোট ছোট হাত দিয়ে দরজার পাল্লা আঁকড়ে ধরল। তার দুগাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে,

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে গোধূলির শাড়ি টেনে সে একনাগাড়ে বলে চলেছে—

​”মাম্মি! তরতা (দরজা) তুলে (খোল) দাও… পাপ্পা তাতে (আছে)… পাপ্পা তাতে! মাম্মি পিজ (প্লিজ)…”

​মাহারুর এই অবুঝ আবদার গোধূলিকে এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো স্তব্ধ করে দিল। মাহারু তো বোঝে না যে তার ওই আদর্শ ‘পাপ্পা’ দরজার ওপাশে কাকে নিয়ে এসেছে। সে তো শুধু জানে, সন্ধ্যা হলে তার বাবা ঘরে ফেরে এবং তার জন্য উপহার নিয়ে আসে।

মাহারু আবারও চিৎকার করে কাঁদতে
লাগল, “

পাপ্পাআআ… মাম্মি তরতা তুলে দাও…”

মাহারুর ছোট্ট হাতের প্রতিটি থাপ্পড় যেন পুরো  বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। গোধূলি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখছিল তার ২ বছরের অবুঝ মেয়েটা কীভাবে দরজার পাল্লায় মাথা কুটে মরছে।

মাহারুর কান্নায় ভাঙা ভাঙা কণ্ঠস্বর গোধূলির কলিজা ছিঁড়ে দিচ্ছিল—

​”পাপ্পা… পাপ্পা তুলো (খোল)! পাপ্পা উত (ওঠো)… আমি দুদি (দুধ) তাব (খাব)!”

​মাহারু জানে, রাতে ঘুমানোর আগে তার পাপ্পা নিজ হাতে তাকে ফিডার বানিয়ে না দিলে ওর ঘুম আসে না। কিন্তু আজ সেই চেনা দরজার ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। গোধূলি কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েও থমকে দাঁড়াল।

দরজার ওপাশ থেকে টিনার খিলখিল হাসির শব্দ আর মিথনের নিচু কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। গোধূলি বুঝতে পারল, মিথন আর টিনা এখন একে অপরের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। যে মানুষটা প্রতিদিন হিজাবের বোকেট এনে এক নীরব ভালোবাসার নাটক করত, সে আজ নিজের কামনার কাছে কতটা অন্ধ হয়ে গেছে যে মেয়ের আর্তনাদও তার কানে পৌঁছাচ্ছে না।

​গোধূলি এগিয়ে গিয়ে মাহারুকে জোর করে কোল তুলে নিল।

মাহারু পা ছুঁড়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল
,
“নাআআ… পাপ্পা… পাপ্পা…”

​গোধূলি মাহারুর মুখটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল—

​”চুপ কর মা! তোর পাপ্পা এখন অনেক ব্যস্ত। তোর এই ‘দুধ খাওয়ার’ বায়না শোনার সময় ওনার নেই। চল আমার সাথে!”
​গোধূলির চোখ দিয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে

মাহারুর কান্নার আওয়াজ আর দরজায় ওই ছোট ছোট হাতের করাঘাত মিথনের ভেতরে থাকা দানবটাকে যেন আরও উসকে দিল। টিনার সামনে নিজের ‘পারিবারিক ইমেজ’ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ে সে রাগে অন্ধ হয়ে

দরজাটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল।

​মিথনের হাতে তখন নিজের চামড়ার বেল্টটা, যেটা সে হাতের মুঠোয় পেঁচিয়ে নিতে শুরু করেছে। গোধূলি মাহারুকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে যেতে লাগল। তার শরীরের প্রতিটি কোণ আতঙ্কে শিউরে উঠছে। গত এক বছরের বীভৎস সত্যিটা আজ যেন দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত

—বাইরে যে মানুষটা হাজার হাজার হিজাব আর উপহারের তোড়া দিয়ে ‘আদর্শ স্বামী’র মুখোশ পরে থাকে, চার দেয়ালের ভেতরে সে এক পিশাচ। গত ৩৬৫ দিনের প্রতিটি রাত গোধূলির শরীরে এই বেল্টের দাগ জমা হয়েছে।

​গোধূলি মাহারুকে বাঁচাতে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতেই মিথন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। শক্ত মুঠোয় গোধূলির শাড়ির আঁচলটা পেঁচিয়ে ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল সে। ভারসাম্য হারিয়ে গোধূলি ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর।

মাহারু ভয়ে চিৎকার করে উঠল,

“পাপ্পাআআ… মাম্মি না… মাম্মি পিজ (প্লিজ)!”

​কিন্তু মিথন তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে গোধূলিকে হিঁচড়ে নিজের রুমের ভেতর নিয়ে গেল এবং লাথি দিয়ে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ওপাশে মাহারু দরজায় ধাক্কা দিয়ে অবিরত কেঁদে চলল, আর এপাশে শুরু হলো সেই পৈশাচিক তান্ডব।

​চামড়ার বেল্টটা যখন বাতাসের শব্দ তুলে গোধূলির পিঠে, হাতে আর পায়ে আছড়ে পড়ছিল, গোধূলি প্রথমে আর্তনাদ করলেও ধীরে ধীরে তার কণ্ঠস্বর বুজে এল। টিনা দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে লিপস্টিক ঠিক করতে করতে এই দৃশ্য দেখছিল, যেন এটা তার কাছে কোনো সিনেমার শ্যুটিং।

মিথন প্রতিটি আঘাতের সাথে দাঁতে দাঁত চেপে বলছিল—

​”তোমাকে না বলেছি চুপচাপ থাকতে? আমার গেস্টের সামনে নাটক করার সাহস তোকে কে দিয়েছে? এই নে তোর হিজাবের দাম, এই নে তোর মাহারুর কান্নার পাওনা!”

​কিছুক্ষণ পর গোধূলির নড়াচড়া থেমে গেল। রক্তে শাড়ির আঁচল ভিজে উঠেছে, আর সারা শরীরে কালশিটে দাগ নিয়ে সে নিস্তেজ হয়ে মেঝের ওপর পড়ে রইল। মিথন বেল্টটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এখন কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু এক পৈশাচিক তৃপ্তি।

★★

​দরজার ওপাশে মাহারুর কান্নার শব্দটা তখন ক্লান্তিতে ফুপিয়ে ওঠার শব্দে পরিণত হয়েছে। ছোট্ট মেয়েটা জানে না, তার আদরের ‘পাপ্পা’ আজ তার মায়ের শরীরের সাথে সাথে তার আগামীর সবটুকু বিশ্বাসও চুরমার করে দিয়েছে।
​নিস্তেজ গোধূলি ঝাপসা চোখে শুধু মেঝের ওপর পড়ে

মিথনের চেহারায় এক মুহূর্তেই সেই পৈশাচিক ভাবটা বদলে গেল। দরজা খুলে সে খুব শান্ত ভঙ্গিতে মাহারুকে কোলে তুলে নিল। মাহারু তখনো ফোঁপানি থামায়নি, কিন্তু

মিথন অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বলতে লাগল—

​”চুপ করো আম্মু, মাম্মি একটু ঘুমিয়েছে। চলো, আমি তোমাকে সুন্দর করে দুধ বানিয়ে দিই।”

​কিচেনে গিয়ে নিজ হাতে দুধের ফিডার বানিয়ে সে মাহারুকে সোফায় বসিয়ে টিভিতে কার্টুন চালিয়ে দিল। দৃশ্যটা দেখলে যে কেউ ভাববে মিথন পৃথিবীর সবচেয়ে আদর্শ বাবা। অথচ কয়েক মিনিট আগেই সে গোধূলিকে পিটিয়ে নিস্তেজ করে ঘরে ফেলে এসেছে। রাত ৮টা বাজার পর মাহারু কার্টুন দেখতে দেখতেই সোফায় ঘুমিয়ে পড়ল। মিথন অত্যন্ত যমমতায় তাকে তুলে তার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আবার গোধূলির ঘরের দিকে পা বাড়াল।
★★*

​ঘরের ভেতরে গোধূলি তখনো ফ্লোরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। ওর শাড়ির আঁচলটা ধুলোয় লুটিয়ে আছে, শরীরে বেল্টের কালশিটে দাগগুলো নীল হয়ে উঠছে। টিনা এক কোণে দাঁড়িয়ে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল।

মিথনকে ঢুকতে দেখে  টিনা অত্যন্ত বিরক্তির সুরে বলল—

​”কাং, আমি এখনো বুঝলাম না এই ফালতু মেয়েটাকে তুমি কোন দুঃখে বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়া আনলে? গত দুই বছর ধরে এখানে তোমার মুভির কাজ চলছে, অথচ তুমি এই আপদটাকে সাথে করে বয়ে বেড়াচ্ছ! ও তো তোমার ইমেজের জন্য একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।”

​মিথন কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত শূন্যতা আর প্রতিহিংসার আগুন। সে টেবিলের ওপর রাখা ওয়াইনের বোতলটা হাতে নিল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নিস্তেজ গোধূলির কাছে। গোধূলির জ্ঞান তখনো পুরোপুরি ফেরেনি, সে শুধু যন্ত্রণায় মৃদু গোঙাচ্ছে।

​মিথন হঠাৎ করেই হিংস্র হয়ে উঠল। সে গোধূলির চুলে মুঠি করে ধরে ওর মুখটা ওপরের দিকে টেনে ধরল। তারপর অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বোতল থেকে সরাসরি ওয়াইন গোধূলির মুখের ভেতর ঢেলে দিল।
​গোধূলি বিষম খেয়ে কাঁপতে শুরু করল। তীব্র ঝকঝকে ওই পানীয়টা ওর শ্বাসনালীতে গিয়ে জ্বালাপোড়া শুরু করল। জ্ঞান ফেরার আগেই সে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল।

মিথন দাঁতে দাঁত চেপে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

​”খুব তো সতী সাবিত্রী সাজো! এখন এই ওয়াইনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকো। ইন্দোনেশিয়ায় এসেছ কাং হুয়ানের স্ত্রী হতে, অথচ তোমার চালচলন এখনো সেই গেঁয়ো গোধূলির মতোই রয়ে গেল।”

​ওয়াইনের গন্ধে আর যন্ত্রণায় গোধূলির শরীরটা একবার ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে আবার শিথিল হয়ে পড়ল।

টিনা পেছন থেকে হাসতে হাসতে বলল,

“দ্যাটস মাই বয়! এবার চলো, আজ রাতের পার্টিতে আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

​মিথন গোধূলিকে ওই অবস্থাতেই ফ্লোরে ফেলে রেখে নিজের শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় একবারও পিছন ফিরে তাকাল না।
মিথনের ভেতরের সেই দানবটা যেন রক্ত ঝরানোর পর হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল।

★★★★

মেইন গেট পর্যন্ত গিয়েও ওর পা আর চলল না; এক অদ্ভুত অস্থিরতা ওকে আবার গোধূলির ঘরের দিকে ফিরিয়ে আনল। টিনাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে সে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকল।

​ফ্লোরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা গোধূলির শরীরটা দেখে মিথনের বুকের ভেতরটা কি এক অজানা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে পরম মমতায় গোধূলিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল এবং মাহারুর পাশের খাটে শুইয়ে দিল। খুব সাবধানে ওর রক্তাক্ত আর ধুলোবালি মাখা জামাকাপড় পাল্টে দিল। ড্রয়ার থেকে মলম বের করে যেখানে যেখানে বেল্টের আঘাত লেগেছে, সেখানে খুব যত্ন করে মালিশ করে দিতে লাগল।

​গোধূলি যদিও চোখ খুলতে পারছিল না, কিন্তু ওর অবচেতন মন সব বুঝতে পারছিল। মলমের ছোঁয়ায় ক্ষতগুলো দাউদাউ করে জ্বলছে, অথচ এই মানুষটার হাতের স্পর্শ এখন কত নরম!

গোধূলি মনে মনে ডুকরে কেঁদে উঠল—

​”এই লোকটা কি মানুষ নাকি কোনো পিশাচ? প্রতিদিন এভাবে পশুর মতো মারে, আবার রাতের বেলা এসে নিজেই ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দেয়! কেন রোজ সকালে আমার জন্য হিজাবের বোকেট পাঠায়? কেন আমার ড্রয়ারে ডায়মন্ডের পেন্ডেন্টগুলো জমা করছে? একবারের জন্য তো মুখে ‘সরি’ বলে না, শুধু উপহার দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে চায়!”

​গোধূলি অনুভব করল, মিথন ওর খুব কাছে এসে শুয়েছে। এক জোড়া শক্ত অথচ উষ্ণ হাত ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মিথন একহাতে গোধূলিকে আর অন্য হাতে মাহারুকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। ঘরের লাইটটা অফ করে দিয়ে সে অন্ধকারের মাঝে গোধূলির চুলের ঘ্রাণ নিতে লাগল।

​মাহারু ঘুমের ঘোরে একবার ‘পাপ্পা’ বলে ডাক দিল। মিথন মাহারুর কপালে একটা চুমু খেয়ে

​গোধূলির গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না এই জড়িয়ে ধরাটা ভালোবাসা নাকি শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা। মিথনের নিশ্বাসের শব্দে একসময় পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মাহারু আর মিথন দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু গোধূলি তার শরীরের আর মনের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল

★★*

গোধূলির হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। গোধূলি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেও টুঁ শব্দ করার সাহস পেল না। মিথন ফোনের লাউডস্পিকার অন করে দিতেই ওপাশ থেকে

নিতুর চনমনে গলার আওয়াজ ভেসে এল:

​”লিরা কাকিয়া! কেমন আছো গো? ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পর তো আমাদের একদম ভুলেই গেছো। তোমাদের ওখানে এখন নিশ্চয়ই খুব আড্ডা হচ্ছে!”

​নিতু এমনভাবে কথাগুলো বলছে যেন কিছুই হয়নি। সে জানে না এই দুই বছরে গোধূলির জীবনের ওপর দিয়ে কী পরিমাণ ঝড় বয়ে গেছে। সে জানে না এই মুহূর্তে গোধূলির শরীরে বেল্টের কালো দাগগুলো টাটকা হয়ে জ্বলছে।

​মিথন কোনো কথা না বলে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ এখন গোধূলির ওপর নিবন্ধিত।

গোধূলি ধরা গলায় কোনোমতে উত্তর দিল:

​”ভালো আছি রে নিতু। তুই কেমন আছিস? তাহান ভালো আছে?”

​নিতু হেসে উঠে বলল—

​”সবাই ভালো আছে। তোমাদের মাহারু সোনা কী করছে? আংকেল কি এখনো আগের মতোই ওকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে? তোমাদের তো খুব সুখের সংসার কাকিয়া, মিথন আংকেলের মতো অত বড় সুপারস্টার মানুষটা তোমাকে আর বাচ্চাকে অত আগলে রাখে, ভাবলে খুব হিংসে হয়!”

​’সুখের সংসার’ আর ‘আগলে রাখা’—শব্দগুলো গোধূলির কানে বিষের মতো লাগল। সে আড়চোখে মিথনের দিকে তাকাল। মিথন তখন শান্ত মুখে মাহারুর চুলে হাত বোলাচ্ছে, যেন সে সত্যিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী এবং বাবা।

​মিথন হঠাৎ করেই ফোনের খুব কাছে মুখ নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল—

​”হ্যাঁ নিতু, আমরা সবাই খুব ভালো আছি। তোমাদের কাকিয়া একটু ব্যস্ত আছে এখন, পরে কথা হবে।”

​ফোনটা কেটে দিয়ে মিথন গোধূলির দিকে তাকালে গোধূলি দেখল সেই চোখে কোনো ক্ষমা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত মালিকানা। গোধূলি মনে মনে হাসল—দুনিয়া জানে তারা সুখী, কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতর তার হাড়গোড় ভাঙার শব্দ কেউ শুনতে পায় না।

​গোধূলি ম্লান হেসে ভাবল—

​”নিতু যদি জানত ওর এই ‘সুপারস্টার আংকেল’ রাতের আঁধারে কী অমানুষ হয়ে ওঠে, তবে কি ও কোনোদিন এই ফোনটা করত?”
★★★*

ভোরের আলোটা যখন ইন্দোনেশিয়ার জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে এল, গোধূলির শরীরটা তখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। সে খুব সাবধানে বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করল যাতে মিথন বা মাহারুর ঘুম না ভেঙে যায়। মিথনকে সে এখন যমের মতো ভয় পায়। এই মানুষটা কখন দেবতা আর কখন পিশাচ, তা গোধূলির বুদ্ধির বাইরে।
​রুম থেকে বের হতেই দেখল ওদের বাসার ইন্দোনেশিয়ান মেড ‘সারি’ ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে রাখছে। গোধূলিকে দেখেই সারি থমকে দাঁড়াল। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত করুণা। এটা আজ নতুন নয়, গত এক বছর ধরে প্রতিদিন সারির চোখের সামনে গোধূলির এই জীর্ণ দশা ফুটে ওঠে। গোধূলির গলার কাছে বেল্টের কালচে দাগটা দেখে সারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। সে জানে, এই বাড়িতে মুখ খোলার অধিকার কারও নেই।

​গোধূলি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার মনে পড়ে গেল বিয়ের প্রথম ছয় মাসের কথা। তখন জীবনটা অন্যরকম ছিল। মিথন তখন ‘কাং হুয়ান’ ছিল না, ছিল শুধুই ওর ভালোবাসার মানুষ। কত হাসিখুশি, কত সুন্দর খুনসুটিতে ভরা ছিল তাদের সেই ছোট্ট সংসার!

​কিন্তু তারপর? সামান্য একটা বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে শুরু হলো ঝগড়া। ইগো আর জেদ এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকলো যে, আজ এক বছর হয়ে গেল তারা একে অপরের সাথে একটা স্বাভাবিক বাক্য বিনিময় করেনি। এই এক বছরে কথা বন্ধ থাকলেও বন্ধ হয়নি মিথনের অত্যাচার। প্রতিদিন মারধর, আর তারপর একরাশ উপহার—এ যেন এক আদিম খেলা।

​গোধূলি মনে মনে ভাবল—

​”একটা ঝগড়াই কি সব শেষ করে দিল? নাকি মিথন আসলে শুরু থেকেই এমন ছিল? ওই ছয় মাসের ভালোবাসা কি তবে শুধুই একটা মায়া ছিল?”

​ঠিক সেই সময় পেছন থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। গোধূলি আয়নায় দেখল মিথন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে সেই চিরচেনা হিজাবের বোকেট। মিথন কোনো কথা না বলে বোকেটটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দিল।

​গোধূলির শরীরটা ভয়ে হিম হয়ে এল। সে দ্রুত মাথা নিচু করে ওখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। মিথন ওর পথ আটকে দাঁড়াল। ওর চোখে আজ কোনো রাগ নেই, বরং এক অদ্ভুত শীতলতা। সে গোধূলির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, যেন কাল রাতের ক্ষতগুলো সে পরীক্ষা করে দেখছে।

​সারাদিনের এই নীরবতা আর রাতের ওই চিৎকার—গোধূলি বুঝতে পারছে না এই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বের হওয়ার কোনো পথ আদৌ আছে কি না।

চলবে……..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments