লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি
পর্ব:০৬
যে পুরুষ ঘরে বউ থাকা সত্ত্বেও এই মাঝরাতে অন্য এক মেয়ের কাছে ছুটে যেতে দ্বিধা বোধ করে না সে জিজ্ঞেস করছে মিথিকে হসপিটালে কোন পুরুষ ফুল বলে ডেকেছে! একেই বোধহয় বলে পুরুষালি ইগো হার্ট হওয়া। পুরুষদের আধিপত্য দেখানো। মিথির তাচ্ছিল্য ভরা হাসি পেল কেন জানি না। আদ্রর রাগ রাগ মুখটার দিকে তাকিয়ে ও উত্তর দিল,
“ সে যেই হোক আদ্র, অন্তত আপনার মতো পরকীয়ায় জড়াইনি আমি। এটুকু বোধজ্ঞান আমার আছে আদ্র। ”
আদ্র চোয়াল শক্ত করে তাকাল। হাতটা আরো জোরে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ শাট আপ মিথি,আমি পরকীয়ায় জড়াইনি।আমি মুহুকে ভালোবাসি, পাগলের মতো ভালোবাসি। অনেক আগ থেকেই ভালোবাসি। মাঝখানে তুই কোথ-থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিস মিথি। ”
মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে শুধাল এবারে,
“ ঐ যে ভাগ্য! বিধাতা আমার ভাগ্য এমন ভাবে লিখেছে যে কোন ভালো পুরুষের জীবনে উড়ে গিয়ে জুড়ে বসতে পারিনি। আপনার মতো একটা অমানুষের জীবনেই বসতে হলো। ”
আদ্র হাতটা আরো শক্তভাবেই চেপে টেনে আনে। চোখজোড়া লাল রক্তিম করে বলে,
“ বারবার অমানুষ বলে কি বুঝাতে চাইছিস তুই মিথি? এত সাহস কোথায় থেকে আসছে তোর? আমায় অমানুষ বলছিস? আমায়? ”
যখন থেকে মিথি দেখল তার সন্তানুভূতিতে আদ্র আঘাত হেনেছে, চরিত্রকে নোংরা করতে একটা সেকেন্ডও সময় নেয়নি তখন থেকে মিথির মধ্যে এই পুরুষটার প্রতি কেবল ক্ষোভই কাজ করছে। এবং এই পুরুষটাকে কেবল এই কথাগুলো বলার সাহসই নয়, বরং এই পুরুষটাকে ইচ্ছে করছে কষিয়ে থাপ্পড় ও মারতে।আর আদ্র বলছে সাহস কোথায় থেকে আসছে? মিথি অবশ্য চড় মারল না৷ শুধাল,
“ হাসালেন৷ অমানুষকে অমানুষ বলব না তো মানুষ বলব আদ্র? আপনি শিওর আপনার মধ্যে মনুষত্ব্য আছে? ”
আদ্রর চোখগুলো প্রচন্ড লাল হয় এবারে রাগে। চোখ রাঙ্গিয়ে ধমকে বলল,
“ মিথি..”
মিথিও দ্বিগুণ আওয়াজ তুলেই জেদ নিয়ে বলল,
“ হাতটা ছাড়ুন আদ্র। ছাড়তে বলেছি হাতটা…”
আদ্র তর্জনী আঙ্গুল উঁচাল। বলতে লাগল,
“ এই এই, উঁচু গলায় কার সাথে কথা বলছিস তুই? আমার বাড়িতে থেকে, আমার রুমে থেকে তুই আমার সাথে গলা উঁচিয়ে কথা বলছিস? সোজা বের করে দিব বাড়ি থেকে মিথি। ”
“ আমারও ইচ্ছে নেই আপনার মতো কাপুরুষের সাথে বসবাস করার। বরং ঘৃণা হয় আপনাকে দেখে আমার।ঘৃণা! ”
আদ্র ফুসতে ফুঁসতে বলল,
“ আম্মুর আশকারায় এসব করছিস না? সকাল হোক। সকাল হোক খালি। দেখবি তোকে আম্মু নিজেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে। তখন এসব বড়বড় কথা কোথায় যায় তোর আমিও দেখব! ”
এটুকু বলেই রাগে ফোঁসফাঁস করে ধপাধপ পা ফেলে আদ্র বেরিয়ে গেল। মিথি সেদিকে তাকিয়ে কেবল তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল।
.
মিথির সাথে রেগে আগুন হয়ে হনহন করে বেরিয়ে আসা আদ্র মুহুর বাসায় এসেই পানি হয়ে গেল। আদ্রর কাছে আগে থেকেই মুহুর ফ্ল্যাটের চাবি ছিল। মুহু একাই থাকে এখানে। আদ্র ফ্ল্যাটে পৌঁছিয়েই বিছানার এককোণে বসে থাকা মুহুকে চোখ খিচে বসে থাকতে দেখে শান্ত হয়ে তাকাল। কি স্নিগ্ধ মুখটা। কি শীতল শীতল লাগে আদ্রর এই মুখটায় তাকালে। আদ্র এগোল। মুহুর গোল মুখটা দুইহাতের তালুতে আগলে ধরে বলল,
“ মুহু? মুহুপাখি? ওপেন ইওর আইস মুহুপাখি। ”
মুহু ফিটফিট করে তাকাল। পাখির ছানার মতো করে তাকিয়ে বলল,
“ এসেছো তুমি? ”
“ না এসে উপায়? ভয়ে কুঁকড়ে মরতে দিতাম আমার মুহু পাখিকে? ”
পরপরই আবার মুহুর মুখটা পরখ করে জিজ্ঞেস করল,
“খেয়েছিলে রাতে? মুখচোখ শুকনো কেন পাখি? ”
“ বুয়া আসেনি কাল। রাতে রান্না হয়নি তাই।”
“ সে কি। খাও নি? ”
“ নাহ। ”
“ গুড গার্ল! ”
আদ্র কথাটা বলে উঠতে নিতেই পেছন থেকে জড়িয়ে নিল মুহু। চোখ বুঝে বলে উঠল,
“ আদ্র? তুমি এত শান্তি শান্তি কেন আদ্র? আমার কেন তোমাকে দেখলেই সুখ সুখ লাগে আদ্র? বিশ্বাস করো, এতোটা সুখ আমি কখনো কারোর মধ্যে পাইনি। ”
আদ্র ঠোঁট এলিয়ে হাসল খালি। উত্তর দিল,
“ বিকজ ইউ লাভ মি পাখি। ”
“ নো, ইউ লাভ মি আদ্র। ”
“ কে বলল? ”
“ বোকা আমি? তোমাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনি আমি আদ্র চৌধুরী। ”
আদ্র উঠল। বলল,
“ তাই নাকি? এত চেনা তো ভালো না। প্রেমে ট্রেমে পড়ে যাবে পাখি। পরে নিজেকেই সামলাতে পারবে না। ”
“ চাইছি কই সামলাতে? ”
আদ্র আবারও হাসে। এই মুহু তার কাছে আস্ত এক প্রেম, আস্ত এক দুর্বলতা। কতোটা আদুরে মুহুটা তার! আদ্র হেসেই বলল,
“ খাবে? নাকি না খেয়েই সকাল অব্দি কাঁটাবে। ”
“ তোমার রান্না খুব বেশি মজা না আদ্র। ”
“ তবুও এই অদক্ষ হাতের রান্নাই তো মাঝেমাঝে খাও। ”
এইটুকু বলেই সে কিচেনে গেল। ফ্রিজ থেকে সবজি নিয়ে অদক্ষ হাতে কাঁটতে লাগল। আদ্র মুহুর জন্য বহুবার রান্না করেছে এই নিয়ে। খাবার খুব একটা সুস্বাদু হয়না, তবে খাওয়া যায়। আদ্র কিছুটা সময় নিয়েই রান্না করল। ততোটা সময় মুহু ওর পিছুপিছু ঘুরঘুর করেছে কেবল। অতঃপর রান্না শেষ হওয়ার প্লেটে খাবার তুলে নিজ হাতে খাইয়েও দিল তার মুহুকে। যেন আদুরে কোন বাচ্চা।
অথচ এই আদ্রই মিথির কাছে অন্যরূপে ধরা দেয়। এই আদ্রই মিথির কাছে পিশাচের মতো আচরণ করে,পাশবিক অত্যাচার করে এবং মনুষত্ব্যহীন পশুর মতো মিথির সন্তানকেও পর্যন্ত শেষ করতে চেয়েছে এই আদ্র। এই আদ্রই! একই পুরুষেরই দুটো ভিন্ন ভিন্ন রূপ, ভিন্ন ভিন্ন নারীর জন্য।
.
সকাল প্রায় আটটা। আদ্র আর মিথির বিষয়েই কথা হওয়ার ছিল আদ্রর বাবা মা সহ। অথচ আদ্র বাসায় নেই। আদ্রর মা পুরো বাসা খুঁজেও যখন ছেলেকে পেল না তখন না পেরে কল দিল আদ্রকে।কল তুলতেই জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় তুমি? ”
আদ্র একদম ভদ্র বাচ্চার মতোই বলে,
“ একটু বাইরে এসেছিলাম আম্মু। কেন? ”
“ মিথ্যে বলবে না আদ্র। আবারও ঐ মুহুর কাছে গিয়েছো তুমি আদ্র? লজ্জা করে না তোমার? কতবার বলেছি ঐ মেয়ের আশপাশ ঘেষবে না তুমি? কতবার বলেছি?”
আদ্র শুনল। অতঃপর মনে মনে ধরে নিল যে মুহুর কাছে আসার কথাটা মিথিই বোধহয় বলেছে। জিজ্ঞেসও করল,
“ কে বলেছে মুহুর কাছে এসেছি? মিথি বলেছে? ওর কথা এখনও বিশ্বাস করো তুমি? ”
“ আমি তোমার আম্মু আদ্র। তুমি কোথায় গিয়েছো এটা বুঝতে আমার মিথির সাহায্য লাগবে না। বাসায় এসো৷ দশ মিনিট সময় দিচ্ছি। তাড়াতাড়িই আসবে। ”
এটুকু বলেই ওর আম্মু কল রাখল। আদ্র রাগে কপাল কুঁচকায়। মাঝেমাঝে তার আম্মুর প্রতি ভীষণ রাগ হয়। ক্ষোভ জম্মায়। আম্মু কেন বরাবর তার সাথে এমন করে? কেন?
.
আদ্র বাসায় এল। এসেই নিজের রুমে গিয়ে সর্বপ্রথম মিথিকে দেখতে পেল জিনিস পত্র নিয়ে যেতে। জিনিসপত্র বলতে মিথির কাপড়চোপড় আর কয়েকটা বই। এইচএসসি দেওয়ার পর এডমিশন এক্সামের জন্য যে বইগুলো কিনেছিল। মিথি এই অল্প কয়েকটা জিনিসপত্র যখন ঘর থেকে বের করে রাখছিল ঠিক তখনই আদ্র এল। ভ্রু উঁচিয়ে সর্বপ্রথম বলল,
“ তুই বলেছিস না মিথি? তুই বলেছিস আম্মুকে যে আমি মুহুর কাছে গিয়েছি?”
মিথি তাকাল। খুব বিস্ময় নিয়ে আদ্রর দিকে তাকিয়ে পরমুহুর্তেই মুখচোখ শক্ত করে উত্তর দিল,
“ আমি চাইলে তো আপনি নেশা করেন এটাও বলতে পারতাম।নেশা করে আমার উপর কতোটা পাশবিক নির্যাতন চালাতেন তাও বলতে পারতাম। এমনকি আপনি কাল কি কি করেছেন এসবও বলতে পারতাম। এসব যখন বলিনি তখন মুহুর বিষয়টা বলে আমার কি এমন লাভ হয়ে যাবে? ”
আদ্র মানল না। বিছানায় বসে ধমকে বলল কেবল,
“ চুপ। একদম চুপ। তুই-ই বলেছিস। জানি আমি। ”
.
আদ্রর মা বাবার বড্ড আদরের ছেলে আদ্র। ছোট থেকেই আদ্রকে আদরে আদরে মানুষ করেছে। আদ্রর মা অবশ্য ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। বাবার পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার হলেও স্বামীর পরিবার ছিল উচ্চবিত্ত। আদ্রর মায়ের সাথে এই কারণেই অনেকগুলো বছর হলে মিথির বাবার সম্পর্ক ছিল। পরে যখন সম্পর্ক ঠিকঠাক হলো নিজের নিম্ন মধ্যবিত্ত ভাইয়ের মেয়েটার প্রতিই আদ্রর মায়ের এতোটা স্নেহ হলো, এতোটা আদর জমল যে ছেলের সাথে নিজের ভাইয়ের মেয়েটার বিয়ে দিবেন বলেই স্থির করলেন। এর মধ্যে মিথির মা মারা গেল, মিথির বাবা ও কয়েক বছর পর মারা গেল। অতঃপর ভাই এর সংসারে মিথির যখন তীব্র অবহেলা তখনই আদ্রর মা প্রস্তাবটা রাখলেন।অথচ এখন মনে হচ্ছে নিজের ছেলের জন্য এই মেয়েটার হাত চেয়ে উনি ভুল করেছেন। মেয়েটার জীবন নষ্ট করেছেন বোধহয়। তবুও উনি স্বপ্ন দেখেন তার ছেলে ঠিক হয়ে যাবে, মিথিকে ভালোবাসবে। একটা সুন্দর সংসার করে। তারই চোখের সামনে তার আদরের দুই ছেলেমেয়ে থাকবে। আদ্রর মা মনে মনে এটুকুই তো কেবল চেয়েছিল। অথচ হচ্ছে কি?তাই তো সবটা ঠিক করার জন্য আদ্রর বাবা এবং দাদীকেও সবটা জানানো হলো। আদ্রর গতকাল রাতের সবটুকু কান্ডকারখানা জানানো হলো। অতঃপর আদ্র সে দায় অস্বীকার করতে এখানেই বলল যে বাচ্চাটা তার নয়। বাচ্চাটা অন্য কারো। আদ্রর দাদী যদিওবা আদ্রর এসব মিথ্যে কথা বিশ্বাস করে নিল কিন্তু আদ্রর বাবা বিশ্বাস করল না। গমগমে স্বরে কেবল বলে গেল,
“ আদ্র, সময় দিচ্ছি তোমায়। শুধরে যাও। বারবার বলছি শুধরে যাও আদ্র। মিথিকে মেনে নাও।সংসার গুঁছাও৷ তোমার জন্যই ভালো। নয়তো একটাকাও খরচ দিব না আমি তোমায় মনে রেখো। ”
আদ্র শুধু ফোঁসফাস করল মিথির দিকে চেয়েই। তার ধারণা সবটা মিথিই বলেছে তার আম্মুকে। মিথিই করেছে সবটা। কা নয়তো কে করবে? আদ্রর শুধু ক্ষোভ জম্মায় মিথির প্রতি, ক্ষোভ!
.
মিথির কথানুযায়ী মিথিকে অন্য একটা রুম দেওয়া হলো। সে রুমেই বিছানা ঝাড় হতে মেঝে ঝাড় দেওয়া সবটা করে মিথি যখন গোসলে তখন শরীর বড্ড ক্লান্ত। এমনিতেই প্র্যাগনেন্সির লক্ষন স্বরূপই বোধহয় এই কয়েকটা দিন শরীর দুর্বল লাগছে তার। মিথি গোসল সারে। অতঃপর কাপড় মেলে দিয়ে ফুফির কাছে গেল সে। ফোনটা চেয়ে নিল একটাবার নিজের বড়ভাইকে কল দেওয়ার জন্য। মিথির নিজের ফোন নেই। যা যোগাযোগ করার ফুফির ফোন থেকেই করে ও। তাছাড়া তার ভাইতো এমন যে বোনকে বিয়ে দিয়ে ভুলেই বসেছে! এমনকি বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত একটাবার নিজ থেকে এক মিসড কল ও দেয়নি তার ভাই৷ মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তিনবার কল দেওয়ার পর যখন তার ভাই কল রিসিভড করল তখন সে বড্ড আবদার নিয়ে বলে উঠল,
“ ভাইয়া? কেমন আছো ভাইয়া? ”
ওপাশে তার ভাইয়া বোধহয় তার স্বর শুনে খুব একটা খুশি হলো না। এই যে যতোটা আগ্রহ নিয়ে সে শুধাল, ওপাশ থেকে ঠিক ততোটাই নিরাশ স্বরে তার ভাই বলল,
“ তুই? তুই হঠাৎ ফোন দিলি কেন? কি দরকারে মিথি? ”
মিথির মুখটা ছোট হয়ে আসে। উত্তর করে,
“ দরকার ছাড়া কি কল দিতে পারব না ভাইয়া? ”
“ তা কখন বলছি? তোর কাছে তো ফোন নেই। ফুফির থেকে নিয়ে কল করেছিস, তার মানে কোন প্রয়োজন আছে নিশ্চয়৷ ”
মিথি চুপ থাকে কিয়ৎক্ষন। অতঃপর শ্বাস ফেলে বলল,
“ আমায় একটু বাড়ি নিয়ে যাবা ভাইয়া? বিয়ের পর তো আর যাওয়া হয়নি বাড়িতে।”
তার ভাই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল,
“ বাড়ি আইসা কি করবি?না মানে ঐখানে এত ভালো আছিস বাড়ি এসে কি করবি আর? তোর ভাবিও তো নাই। বাপের বাড়ি গিয়েছে।”
মিথি বুঝতে পারল ভাই চাইছে না সে ঐ বাড়ি যাক। অবশ্যই কিভাবেই বা চাইবে। যেখানে বিয়ের আগেই সহ্য করতে পারত না, এখন কি করে সহ্য করবে? গেলেও তো অনেকটা বোঝার মতোই ওদের ঘাড়ে বসে খাবে। মিথি তবুও অসহায়ের মতো বলল,
“ ভাইয়া, একটু আসো না। আমি বাড়ি যেতে চাই ভাইয়া। ”
তার ভাই তার অসহায় গলা শুনেও উত্তর করল,
“ এখন কয়েকদিন ব্যস্ত বুঝলি। কয়েকদিন পর যাব নাহয়। কেন, কিছু হইছে ঐদিকে? ”
মিথির গলা এবারে শক্ত হলো। ভাইয়ের প্রতি জম্মাল অভিমান। জানাল,
“ না! কিচ্ছু হয়নি।ভালো থেকো। ”
অতঃপর কল রেখে ফুফির কাছে গেল। ফোন রেখে চলে আসতে নিলেই তার ফুফি বলে উঠল,
“ কি বললি মিথি? ”
মিথি তাকায়। শ্বাস টেনে বলে,
“ বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম ফুফি। ভাইয়া বলল এখন নাকি ব্যস্ত। ”
“ বাড়ি? ”
“হু, একেবারে বাড়ি চলে যেতে পারলে ভালো হতো ফুফি। কিন্তু যেখানে নিজের বড়ভাই-ই বিয়ের আগে এতোটা অবহেলা অপমান করেছে, বিয়ের পর ওদের বাড়ি গিয়ে উঠলে আরো কত কি বলবে তা ভাবছি। ”
আদ্রর মা মিথিকে কাছে ডাকলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়ের মতোই আদর করে বললেন,
“ চিন্তা করিস না মিথি। দেখবি বাচ্চাটা হলেই বাচ্চাটার মুখের দিকে চেয়ে হলেও আদ্র বদলে যাবে মিথি।দেখিস।একটু ধৈর্য্য ধর।”
মিথি তাকায়। অস্পষ্ট স্বরে বলে,
“ হু? ”
উনি আবারও বলল,
“ দেখবি একদিন তোদের সংসারটা অনেক সুন্দর হবে মিথি। আমি বলছি। ”
মিথি হাসল। অবশ্য মা তো। মায়েদের চোখে কি আর সন্তানের দোষ চোখে পড়ে? আদ্রর মায়ের চোখে পড়েছে ছেলের দোষ? পড়লে তো বলত না এই ছেলের সাথে সংসার করতে। বলত? মিথি উত্তর করল,
“ ফুফি? তোমার ছেলের দিকটা ভাবছো কেবল তুমি। আমার দিকটা ভাবলে এটা বলতে না। ”
“ মানে? ”
“ মানে যে সংসারে আমার স্বামীই আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে, যে সংসারে আমার স্বামীই আমার অনাগত সন্তানকে মেরে ফেলার জঘন্যতম চেষ্টা করে সে সংসারে আমার থাকা উচিত ফুফি? তুমি বলো? তোমার মেয়ে হলে কি করতে তুমি? এই সংসারে থাকতে দিতে? ধৈর্য্য ধরতে বলতে?”
আদ্রর মা এবারে নিরব থাকলেন। বোধহয় কি উত্তর দিবে খুঁজে পাচ্ছে না। মিথি আবারও ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,
“ আমি সংসারটা ছাড়তে চাই ফুফি। যে কাপুরুষ আমার সন্তানকে অস্বীকার করেছে, শেষ করতে চেয়েছে তার ছায়াতে আমি আমার সন্তানকে বড় হতে দেখতে চাই না ফুফি। আমি, আমি একা ওকে বড় করতে চাই ফুফি। ”
আদ্রর মা সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধীতা করলেন। জানালেন,
“কিসব বলছিস মিথি। এসব ভাবতে নেই। তুই একা কিভাবে মানুষ করবি বাচ্চাকে? বাচ্চাটার জন্য হলেও তোকে একসাথে থাকতে হবে মিথি।সংসারটা করতে হবে। বাচ্চাটাকে বাবাহীন করবি তুই ? বাবাছাড়া বাঁচবে বাচ্চাটা?”
মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে জানাল,
“ যে বাবা তার সন্তানকে শেষ করতে উঠেপড়ে লাগে সে বাবা না থাকলেও কিচ্ছু হয়না ফুফি। তুমি স্বার্থপরদের মতো কথা বলছো আজ। তোমার ছেলে বলে তুমি…”
“ মিথি…”
“ জানি কি বলবে ফুফি। ”
মিথি আর শুনতে চাইল না। কান্না এল তার শুধু। নিজেকে অসহায় লাগছে। পৃথিবীর সবচাইতে অসহায় মানুষ লাগছে তার নিজেকে। কি করবে এরপর ও? সত্যিই ধৈর্য্য ধরে পড়ে থাকবে ও? সম্ভব এটা? আর যদি এই সংসার ছাড়েও কোথায় যাবে ও? নিজের ভাই ও তো মুখে তুলে চাইবে না। কার বাড়িতে যাবে? কে থাকতে দিবে ওকে? মিথি এসব ভাবতে ভাবতেই চলে যেতে নিল। যেতে যেতেই শুনল আদ্রর দাদী বলল,
“ যেইহানে আমার নাতি নিজেই কইছে বাচ্চাটা আমার নাতির না ঐহানে তোমরা ঐ মাইয়ারর নিয়া এত নাচতাছো কেন আমি তো বুঝতেছি না। ঐ মাইয়া চরিত্রহীন না হইলে আমার নাতি এমনে এমনে কইছে? যা রটে তার কিছু হইলেও ঘটে। স্বামী বুঝি বুঝব বউএর চরিত্র কেমন? ”
আদ্রর মা নিজের শ্বাশুড়ির কথা শুনে প্রতিবাদস্বরূপ বলল,
“ আম্মা! আপনার নাতিকে আপনার থেকেও আমি ভালো চিনি। চিনি বলেই ঐ মেয়েটাকে নিয়ে এত নাচতেছি। ”
আদ্রর দাদী মুখ বাঁকালেন। বললেন,
“ হ, তোমার ভাইয়ের মাইয়া। নাচবাই তো। কোথ-থেকে চরিত্রের ঠিক নাই এমন মাইয়ারে ধইরা আনছে। কার সাথে না কার সাথে কি কইরা এখন পেটে একটা আনছে। মাঝখান দিয়া আমার নাতিরে বিয়ে কইরা ফাঁসাইল। তোমগো জায়গায় আমি থাকলে এই মাইয়ারে বাড়ি থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাইর করতে দুই মিনিট লাগত না। ”
“ ঘরে যান আম্মা। বয়স হয়েছে আপনার। এতসব না ভেবে ঘরে গিয়ে রেস্ট করুন। ”
.
আদ্র রাতে যখন বাসায় ফিরল তখন রাত বারোটা। দরজায় টোকা দিয়ে বাইরে থেকে শুধাল ও,
“ মিথি? এই মিথি? দরজা খোল। ”
ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলল না অবশ্য। অন্যদিন হলে মিথি জেগে থাকে। ও আসলেই দরজা খুলে দেয়। আদ্র ভ্রু কুঁচকে দরজা ধাক্কাতেই দেখল দরজা খুলে গেল। অতঃপর ভেতরে ডুকে আলে জ্বালিয়ে ঘরে মিথিকে দেখতে না পেয়ে আবারও কপাল কুঁচকায়। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে মিথি নেই এটজ শিওর হয়ে শুধাল,
“ চলে গেছে? চলে গেছে নাকি এই জা’নোয়ার? নাকি ভয় পেয়ে লুকিয়ে পড়েছে কোথাও? ”
অতঃপর বেলকনিতে গিয়ে দেখল। না নেই। আদ্র নিজের শার্টটা খুলে ফ্লোরে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বলল,
“থাকলে আজ ওকে বুঝাতাম আমার বিষয়ে সবকিছু বলার ফলটা কেমন হয়। ও কি ভেবেছে ওকে এত সুন্দরভাবে থাকতে দিব আমি? ও আমায় কথা শুনিয়েছে আব্বু আম্মুকে দিয়ে? আমাকে? ওকেও দেখাব আমি এর ফল কেমন হয়। ”
চলবে…….
[ অনেক বড় পর্ব। কাল জ্বরে লিখতে পারিনি বলে এইজন্য দুঃখিত। আজকের পর্বে বেশি বেশি রিয়্যাক্ট করলে রাতে আরেক পর্ব দি দিব। আর হ্যাঁ, কেমন হচ্ছে তা অবশ্যই জানাবেন।]