গল্প:বিষাদ ও বসন্ত(০৭)

 

লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি

পর্ব:০৭

 

 

মিথিকে আলাদা ঘর দেওয়ার পর থেকে ও আদ্রর সম্মুখীনই হয়নি এই দুইদিন। পুরোপুরি আদ্রের সামনে না পড়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। যতটা সময় বাড়ির কাজ কর্ম করেছে ততোটা সময়ও খুব সাবধানতার সাথে কাজ করে গিয়েছে যাতে আদ্র সামনে না পড়ে। আদ্র অবশ্য এরপরদিন সকালেই জেনেছিল মিথি আলাদা ঘরে থাকছে। এরপর খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি সে। মিথি ভাবল সবটা স্বাভাবিক। সবটা স্থির। অতঃপর নিজের মতোই থাকল এই দুটো দিন। উল্টোদিকে এই দুটো দিনই আদ্রর মা প্রতিনিয়ত কেবল এটাই বুঝাল মিথিকে যে সে যেন এই সংসারটা ছাড়ার কথা না ভাবে, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে। একদিন ঠিকই আদ্র শুধরাবে। তার সুখের সংসার হবে। বাঙালি মেয়ের বৈশিষ্ট্যই তো এটা৷ মিথি এসব এখন নিরবে শুনে কেবল। প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এই সমাজের ধারণা গুলো বড্ড অদ্ভুত। এই যেমন, একজন মা একা কখনো একটা সন্তানকে বাবা ছাড়া মানুষ করতে পারবে না। কিংবা ছেলেমেয়ে আছে মানে সংসারে মেয়েটার পরিণতি যায় হোক না কেন, সংসারটা তাকে চালিয়ে যেতে হবে। বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও সংসারটা চালিয়ে যেতে হবে। এই প্রচলিত ধারণা মাথায় নিয়েই সমাজে প্রতিনিয়ত অত্যাচারের সম্মুখীন হওয়া হাজারও নারী সংসার করে যাচ্ছে সবকিছু সহ্য করেই। সবকিছু মুখ বুঝে মেনে নিচ্ছে অবলীলায়। মিথির ভবিষ্যৎ ও এমন হবে? ও মেনে নিবে এসব? এসবই ভাবছিল মিথি। তখন প্রায় রাত দেড়টা! অথচ চোখে ঘুম নামে নি। আঠারো বছর বয়সেই জীবনের চরম বাস্তবতা দেখতে পাওয়া মিথি জীবনের হিসেবই মিলাতে পারে না যেন। অতঃপর ঘড়ির কাঁটা যখন দুই এর কাঁটায় পৌঁছাতে নিল তখনই মিথির ঘরের দরজায় আওয়াজ হলো। মিথি ভ্রু কুঁচকাল সর্বপ্রথম। এত রাতে তার দরজায় কে টোকা দিবে? আশ্চর্য! মিথি কপাল কুঁচকাতে কাুুঁচকাতে আরো দুয়েকবারও আওয়াজ হলো। কে জিজ্ঞেস করার পরও ওপাশ থেকে উত্তর এল না। ভাবুক মিথি উত্তর না পেয়ে আবারও যখন দরজায় ধাক্কা তখন উঠল। আলো জ্বালিয়ে এবারে গিয়ে দরজাই খুলল ও। অতঃপর দরজা খুলেই দেখা গেল আদ্রকে । দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। মিথি একবার তাকিয়েই সঙ্গে সঙ্গে যখন দরজা বন্ধ করতে নিবে তখনই আদ্র দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে পা রাখল। মিথির দিকে চেয়ে বিদ্ঘুটে হেসে বলল,

“ বাহ! নতুন রুম দখলে নিয়েছিস? তুই জানিস না বিয়ের পর বউরা বরদের সাথে একরুমে থাকে। রুমে চল, আমার তোকে লাগবে মিথি। ”

আদ্রর মুখ থেকে বিদ্ঘুটে গন্ধ আসছে। বোধহয় নেশা করেছে। এটা নতুন নয়। আদ্র মাঝে মাঝেই নেশা করে বাসায় ফিরত। তবে মাতাল হিসেবে নয়। আদ্র বেশ ভদ্রসভ্য লোকের মতোই নেশা করার পরও স্বাভাবিক থাকে, স্থির থাকে। কোন মাতালের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায় যখন সে মিথির শরীরের সান্নিধ্যে আসে। অতঃপর হুশজ্ঞান হারিয়ে সব রাগ উড়াত মিথির শরীরের উপর। বোধহয় আজও সেই কামনা বাসনা নিয়েই আদ্র এভাবে এসেছে। মিথি জানে কেন তাকে লাগবে৷ শরীর ঘিনঘিন করে তার। একটা পুরুষ কতোটা নিচ! কতোটা?মিথি চোখ টানটান করেই চাইল। ঘৃণা হচ্ছে ওর। শুধু ঘৃণা। যেখানে বউ হিসেবে মানে না, ঘরে বউ রেখে অন্য এক মেয়ের সাথে সম্পর্কে থাকে, চরিত্রহীন বানাল সবার সামনে সেখানে এখন এসে বলছে বউরা বরদের সাথে একঘরে থাকে? হাস্যকর! মিথি মুহুর্তেই প্রতিবাদ করে বলল,

“ বের হোন আদ্র, এক্ষুনি বের হোন এই ঘর থেকে। আমার ঘরে আসার অধিকার আপনাকে দিইনি আমি। ”

“ স্বামী হই আমি তোর। রুমে আসার অধিকার আছে আমার জানিস? না করার তুই কে হু? ”

নেশা করে বাসায় আসা মদ্যপ আদ্রর শরীর থেকে বিচ্ছিরি গন্ধটাও আদ্রর সাথে সাথে নিকটে আসছে যেন। মিথি ঘৃণায় চোখ সরায়। গন্ধে বমি পাচ্ছে তার। অতঃপর নাক চেপে ধরতে নিতেই আদ্র যখন তার হাতটা ধরে টান দিয়ে নিজের দিকে মিথিকে টানল তখনই মিথি সর্বশক্তি দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে আনল। বলল,

“ হাত ধরবেন না আদ্র। আপনার স্পর্শে ঘৃণা হচ্ছে আমার। ”

আদ্র বোধহয় শুনতে চাইল না কথাগুলো। মিথির দিকে চেয়ে শুধাল,

“ উহ মিথি। রাগ বাড়াবি না আমার। বললাম তো আমার এখন তোকে লাগবে। লাগবে মানে লাগবে। ”

মিথি স্পষ্ট চাহনি ফেলল আদ্রর দিকে। অতিরিক্ত রাগে তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। টলমল করছে।কিছুটা চেঁচানো স্বরেই বলল ও,

“ সোজা হিসেবে আমার শরীর লাগবে তাই তো? সজ্ঞানে হোক বা নেশায় মত্ত থেকেই হোক এই মাঝরাতে আপনার কেবল নারী শরীরেই চাহিদা মিটে তাই না আদ্র? ”

আদ্র চাইল। অতঃপর শুধাল,

“ তোকে আমি ভালোবাসি না ঠিক, তবে আমি তোর সাথে ফিজিক্যালি অসন্তুষ্ট ও হই না মিথি। যার কারণে আমি তোর শরীরটা পেতে অবশ্যই ইচ্ছুক থাকি।”

মিথির শরীরই কেমন ঘিনঘিন করে যেন আদ্রর কথা শুনে। ঘৃণারা উগড়ে আসে। নাকমুখ কুঁচকে ও শুধু এইটুকুই বলল,

“ ছিহ!”

“ চল না মিথি। ”

মিথি দূরে সরল। বলল,

“ আপনার মতো নোংরা মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি ভাবলেই লজ্জা লাগছে আমার আদ্র। শরীর ঘিনঘিন করছে। আমাকে ভালোবাসেননি ভালো, কিন্তু আধৌ আপনি মুহুকে ভালোবেসেছিলেন কখনো? কিভাবে একটা মানুষ এতোটা নিচু হয় আদ্র?কিভাবে? ”

আদ্র এবার চুপ থাকল হঠাৎ। অতঃপর কিছুটা সময় দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে মুহুর কথা ভাবল। ঠোঁটে হাসি ফুটল আচমকাই। চোখ খুলে বলল,

“ ইয়েস, আই লাভ হার। আমি ওর কাছে আমার মানসিক শান্তি খুঁজে পাই। ওকে দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। ও আস্ত একটা আদর আমার কাছে। ও, ও এতোটা শান্তি, এতোটা সুখ আমার কাছে বলে বুঝাতে পারব না আমি। ”

মিথি ঘৃণা নিয়ে বলল এবারে,

“ অথচ ওকে ভালোবেসেও অন্য নারীর দেহে সুখ খুঁজতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছেন? ছিহ! ঘৃণা হচ্ছে আমার। ”

আদ্র আবারও মিথির হাত টেনে ধরল। টেনে নিয়ে দরজা অব্দি যেতেই মিথি আবারও হাত ছাড়াল। রাগে জেদে শরীর জ্বলছে তার। এতোটা ঘৃণা হচ্ছে যে শরীর কাঁপছে।মিথি আর সহ্য করতেই পারল না। হাতটা ছাড়িয়েই চড় বসাল আদ্রর বা গালে। আদ্র সঙ্গে সঙ্গেই গালে হাত রাখল। অবিশ্বাস্য চোখে মিথির দিকে ফিরে চাইতেই মিথি তৎক্ষনাৎ আদ্রকে বলে উঠল স্পষ্ট স্বরে,

“দূরে, দূরে থাকুন আদ্র। এতগুলো দিন চুপ ছিলাম কারণ আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল। স্বামী আপনি না? অথচ সে স্বামীই আমায় চরিত্রহীন প্রমাণ করে সবাইকে বলেছেন আমার গর্ভের বাচ্চাটা আপনার না। এখন আবার মাঝরাতে নিজের পুরুষত্ব জাহির করতে বউ হিসেবে মানতে এসেছেন? যেখানে অলরেডি সে একজন চরিত্রহীনা নারী!”

আদ্র তখনও বোধহয় বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি মিথি তাকে চড় মেরেছে। ভীতু, গ্রামে মেয়ে মিথি তাকে চড় মেরেছে! তাকিয়ে থাকল কেবল। মিথি ততক্ষনে কথা গুলো বলেই আদ্রর মুখের উপরে দরজা আটকে দিল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়েই রাগে কাঁপতে কাঁপতে ও কেঁদে ফেলল। মিথির চোখ থেকে নোনা পানি পড়ে। নোনা পানির ভীড়ে রাগ,জেদ, ঘৃণা, ক্ষোভ নিয়ে ও বলে উঠল হঠাৎ,

“ আমি, মিথিয়া মাহমুদ এই মুহুর্তেই আপনার থেকে মুক্তি চাইছি আদ্র। এই মুহুর্তেই আমার দুই মাসের সংসার থেকে অব্যাহতি নিতে চাই। আমায় মুক্তি দিন, দয়া করে মুক্তি দিন আদ্র। আমি বাঁচতে চাই। আমার অনাগত সন্তানকে নিয়ে একটা সুস্থ জীবনযাপন করতে চাই। আপনার মতো কাপুরুষের সঙ্গে থেকে দমবন্ধ হয়ে মরতে চাই না আমি…”

.

মুহিব জানালার ধারে বসা। দূরের আকাশে চিকন কাঁচির ন্যায় চাঁদ। যা সুন্দর দেখাচ্ছে আকাশে।সত্যিই সুন্দর।অথচ মুহিবের মনটা বিক্ষিপ্ত। বিষাদরা হৃদয়ের দহন জ্বলজ্যান্ত করছে।মুহিব নিকোটিনের ধোঁয়ায় সুখ খুঁজে। রুমম্যাটরা সবাই ঘুমাচ্ছে।প্রকৃতি স্থির, নিরব।আর মুহিব মনে মনে আওড়ায়,

ফুল,
ভুলটা আমার তাই না? যদি আমি তোকে ভালোবাসতাম তখন? যদি একটাবার তোকে নিজের করে নিতাম তখন? তাহলে তো তুই অন্য কারোর হতিই না ফুল। অন্য কেউ তোকে কষ্টও দিতে পারত না ফুল। আমি তোকে ভালোবাসিনি ফুল? কেন নিজের ভাবিনি তোকে? কেন অন্যের হতে দিলাম ফুল? এই বিষাদ আজীবন বয়ে বেড়াব কি করে বল?কেন তুই ভালো নেই? কেন আমার মনে হচ্ছে আমিই দায়ী ফুল?

চলবে…….

[ দিয়ে দিয়েছি। ১১০০+ শব্দ। ছোট বলবেন না 🙁।]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments