গল্প:মাই বিলাভড সানফ্লাওয়ার(০৭)

লেখা – আসফিয়া রহমান

পর্ব :০৭

অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ❌

_

সকাল আটটা পঁচিশ।
ক্লাস চলছে। মিথিলা, তুহিন, রাহাত কেউই আজকে আসেনি। ক্লাসে টিচার লেকচার দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু সেখানে বিনীতার মন নেই। কখনো খাতায় হিবিজিবি আঁকছে আবার কখনো জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছে। নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে টিচারের একটু জোরে কথা বলে ওঠায় চমকে উঠছে কখনো।

রুপন্তি খেয়াল করল, তবে কিছু বলল না। ক্লাস শেষে টিচার বেরিয়ে যেতেই চেপে ধরল বিনীতাকে,
“কিরে ক্লাসের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি?”

“কোথায় আবার হারাবো!” বিনীতা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল।

রুপান্তি চোখ ছোট ছোট করে তাকালো, “ঢং করিস না। তোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুই অন্যমনস্ক। কি হয়েছে বলতো?”

“কিছু না।”

“চল ক্যান্টিনে বসি।” রুপন্তী হঠাৎ করেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল।”

“কেন?”

“ক্যান্টিনে মানুষ কেন যায়? খাব, চল।”

রুপন্তি এক প্রকার টেনেই ক্যান্টিনে নিয়ে গেল বিনীতাকে।
দুটো সমুচা আর দু কাপ কফি অর্ডার করে ফাঁকা একটা টেবিলে বসল ওরা।

“এবার বল কি হয়েছে। একদম ভনিতা করার চেষ্টা করবি না।” রূপন্তি শাসানোর ভঙ্গিতে বলল।

হতাশার শ্বাস ফেলল বিনীতা। রূপন্তি না শুনে কিছুতেই ছাড়বে না। অগত্যা বিনীতাকে বলতেই হল সেদিনের আসমা আন্টির বাড়িতে যাওয়া থেকে হলে ফেরার দিনের ঘটনা।

________________________________

বিনীতারা সেদিন আসমা আন্টির বাসা থেকে ফেরার পরে বিনীতা যেদিন হলের ফিরবে, রাহানুমা বেগম বিনীতার কাছে এসেছিলেন,
“বিনু, তোমার আসমা আন্টি, ওর ছেলে ফাহাদের জন্য তোমাকে পছন্দ করেছে। আসমা আমার ছোটবেলার বান্ধবী, ওকে খুব ভালো করে চিনি আমি। আর আসমার হাসবেন্ড আশরাফ ভাই, দুজনেই খুব ভালো মানুষ। আর ফাহাদকে তো ছোটবেলা থেকেই চিনি, খুবই ভালো ছেলে। এবার ঢাকা মেডিকেলে ইন্টার্ন করছে, সামনে ওর ইন্টার্নশিপ শেষ। চাকরিতে জয়েন করার পরেই আসমা ভাবছে, ছেলেকে বিয়ে করাবে। তাই ফাহাদের জন্য পছন্দ করেছে তোমাকে।”

“মা আমি এখনই এগুলো নিয়ে ভাবতে চাইছি না।” অবাক হয়ে তাকালো বিনীতা।

“এখনই কোথায়? ফাহাদের ইন্টার্নশিপ শেষ হোক। হাতে তো সময় আছেই।”

এ কথা বলে রাহনুমা বেগম বেরিয়ে গিয়েছেন বিনীতার ঘর থেকে। মা চলে গেলে ঘরের দরজাটা লাগিয়ে বিনীতা এসে দাঁড়িয়েছে ওর ঘরের সাথে লাগানো ছোট্ট বারান্দাটায়। বারান্দাটা ওর স্বস্তির জায়গা। বিভিন্ন রকমের পাতাবাহার আর ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো ওর বারান্দাটা।

গাছগুলো ওর কলেজে যাওয়া আসার টাকা বাঁচিয়ে জমানো টাকায় কেনা। কলেজে পড়ার সময় পর্যন্ত বিনীতা যখন বাসায় ছিল, মন খারাপ হোক কিংবা আনন্দ, বিনীতা চলে আসতো এই বারান্দাটায়। এখান থেকে এক টুকরো আকাশ দেখা যায়। রাতের বেলা ওদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিংটার মাথার উপর দেখা যায় শুকতারা। হলে থাকলে বিনীতা বেশিরভাগ সময়ই মিস করে এই বারান্দাটা।

সেদিন বিকেলেই বিনীতার হলে ফেরার কথা। যাবার আগে বিনীতা যখন রেডি হচ্ছে রাহানুমা বেগম ফাহাদের নাম্বারটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন হাতে। বলেছিলেন,
“ছেলেটার সাথে কথা বলে দেখো, ছেলেটা ভালো।”

বিনীতা সেদিন মাকে কিছুই বলেনি, চুপচাপ নাম্বারটা নিয়ে নিয়েছে। তারপর বাবার সাথে বেড়িয়েছিল হলে ফেরার উদ্দেশ্যে।
_____________________

আজকে সকালে রাহানুমা বেগম ফোন দিয়েছিলেন মেয়েকে, জিজ্ঞেস করেছেন ও ফাহাদকে ফোন দিয়েছে কিনা। মাকে মিথ্যে বলেছে বিনিতা,
“কিছুদিন ধরে ক্লাসের চাপ যাচ্ছে আম্মু। সময় পাইনি।”

“তাহলে একটু ফ্রি হয়ে ফোন করো।”

“আচ্ছা।” কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিয়েছে ও।
সেই থেকেই কিছুটা অন্যমনস্ক ভাবনায় ডুবে গেছে বিনীতা।

_____________________

“নাম্বারটা আছে?”

“না, সেদিন বাসা থেকে বের হয়ে ফেলে দিয়েছি। তুই কি আসলেই ফোন করতে চাইছিস নাকি?” ভ্রু কুঁচকে বিনীতা জিজ্ঞেস করল।

“নাহ্। এমনি জিজ্ঞেস করছি। আমি ভাবছি যেহেতু ঢাকা মেডিকেলে ইন্টার্নশিপ করছে বোধহয় সাফিনদের ব্যাচের। সাফিন কে কি জিজ্ঞেস করবো, ফাহাদ নামে কাউকে চেনে কিনা?

“না দরকার নেই এসব ঝামেলার।”

“তুই বিষয়টা এড়াতে চাইছিস কেন?”

“এত তাড়াতাড়ি এসব বিষয়ে জড়াতে চাইছি না তাই!”

রূপন্তি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর কফির কাপ হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে বলল,
“ঠিক আছে, এখন না চাইলে তোর ইচ্ছা। কিন্তু তুই আন্টির সাথে খোলাখুলি কথা বলেছিস?”

বিনীতা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল, তারপর আস্তে করে মাথা নাড়ল, “না। মা যা বলেছে, শুনেছি, কিন্তু কিছু বলিনি। আসলে… মাকে কী বলবো সেটাই বুঝতে পারছি না।”

“সোজাসুজি বলে দে, তোর এখনই বিয়ে-শাদী নিয়ে ভাবার ইচ্ছা নেই!”

বিনীতা জানালার বাইরে তাকাল। ক্যান্টিনের পাশের বটগাছের পাতাগুলো হাওয়ায় দুলছে। রূপন্তি ঠিকই বলেছে। মায়ের সাথে অন্তত খোলামেলা কথা বলে বোঝানো উচিত যে ও এখনই এসব চাইছে না। কিন্তু কখনো কখনো কিছু ব্যাপারে কথা বলাও যেন কঠিন হয়ে যায়।

রূপন্তি এক চুমুকে কফির শেষ চুমুকটা খেল, “এইসব চিন্তা বাদ দে, আপাতত আমরা আমাদের কফিটা এনজয় করি!”

বিনীতা একটু হাসল। “হুম, সেটাই ভালো।”

ক্যান্টিনে বসে কথা বলতে বলতেই রূপন্তির ফোনে নোটিফিকেশন এল। ও একবার স্ক্রিনে চোখ বুলিয়েই হাসতে হাসতে বলল,

“তুহিনের কাণ্ড দেখ! গ্রুপে লিখেছে, “আজ ক্লাস কামাই দিব, কিন্তু আড্ডা কামাই দিলে কসম, খুঁজি খুঁজি ধরে পিটামু!’

বিনীতা হাসল, কিন্তু ওর চোখেমুখে তেমন আগ্রহ নেই।

“চল না বটতলায় যাই? সবাই জড়ো হচ্ছে ওখানে।” রূপন্তি উৎসাহ দেখানোর চেষ্টা করল।

“আজ থাক, তুই যা। আমার মাথাটা কেমন জানি করছে।” বিনীতা কফির কাপটা হাতে ঘুরিয়ে বলল।

রূপন্তি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর হালকা ধমকের সুরে বলল,
“তোর খারাপ লাগছে, আর একা বসে আরো বেশি ভাবতে চাস? ওঠ এখান থেকে, যাই চল।”

_______________________________

বটতলায় গিয়ে ওরা দেখলো, তুহিন একটা ঠোঙা থেকে বাদাম খাচ্ছে, আর রাহাত মোবাইল স্ক্রলে ব্যস্ত। মিথিলা একটু দূরে গাছের নিচে বসে নোটবুকে কী যেন লিখছে। ওদের দেখে তুহিন মুখ তুলে বলল,

“এই যে মহারানীরা এলেন! এত দেরি করলি কেন?”

রূপন্তি বসতে বসতে বলল, “ক্লাস শেষে আসার সময় একটু ক্যান্টিনে ঢু মারলাম।”

রাহাত মোবাইল থেকে মুখ তুলে বলল, “মানে আমাদের বাদ দিয়ে তোরা একা একা কফি খেয়ে এসেছিস?”

মিথিলা ওদের দিকে না তাকিয়েই বলল, “তুহিন যে বাদাম আনবে বলেছিল, সেটাও তো আমাদের ভাগ না দিয়ে একাই খাচ্ছে!”

তুহিন তখনই ঠোঙাটা রাহাতের দিকে ছুড়ে দিল, “নে, ভাগ করে খা!”

রাহাত ঠোঙা থেকে বাদাম নিতে নিতে বলল, “ভাগ মানে কী, বুঝিস তুই? নিজেই অর্ধেক শেষ করে ফেলেছিস!”

রূপন্তি হেসে বলল, “এখন কি বাদামের জন্য যুদ্ধ করবি তোরা?”

সবাই হাসিতে মেতে উঠল, বিনীতা কিছু বলল না। এক হাতে কাঁধের ব্যাগের স্ট্র্যাপ ধরে সামান্য হাসল।

তুহিন খেয়াল করল, চোখ সরু করে বলল, “কীরে বিনু, তোর আজ মুড অফ কেন?”

রূপন্তি কিছু বলার আগেই বিনীতা বলল, “না, কিছু না। ক্লাসেই একটু ঝিমাচ্ছিলাম, ক্লান্ত লাগছে।”

মিথিলা এবার ওর নোটবুক বন্ধ করে বলল, “বসে একটু রিল্যাক্স কর।”

বিনীতাও আস্তে করে বসে পড়ল। ওর সামনে বাদামের ঠোঙাটা এগিয়ে দিয়ে রাহাত বলল, “বাদাম খা।”

বিনীতা মাথা নেড়ে বলল, “এখন খেতে ইচ্ছা করছে না।”

রূপন্তি বলল, “থাক, ওর মুড ভালো নেই, চাপাচাপি করিস না।”

তুহিন একটু ভ্রু কুঁচকে বলল, “আরে বাদামের সাথে মুডের কী সম্পর্ক? খেলে মুড ভালো হয়ে যাবে!”

রাহাত হেসে বলল, “তোর এই বাদামের থিওরি কে, কোথায় স্বীকৃতি দিলো শুনি?”

মিথিলা তখন হাতের নোটবুক বন্ধ করে বলল, “বাদাম বাদ দে, তুই বরং গান ধর, দেখি আজ তোর গলার কী অবস্থা।”

রাহাত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “এই খটখটে গলায় গান গাইতে পারব না, কেউ এক কাপ চা খাওয়া?”

মিথিলা মুচকি হেসে বলল, “চল, তপনদার দোকান থেকে খেয়ে আসি।”

রূপন্তি বিনীতাকে বলল, “চল, একটু হাটলে ভালো লাগবে।”

বিনীতা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। আড্ডা চলল হাসি ঠাট্টার মাঝেই, কিন্তু ওর মনে কোথাও যেন একটা ঝিম ধরা ভাব থেকেই গেল।

To be continued…

বি:দ্র: গল্পটা কেমন লাগছে সবাই একটু কমেন্ট করিয়েন।লেখার আগ্রহ পাচ্ছি না ☹️

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments