গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২৩-২)

পর্বঃ২৩(বাকি অংশ)

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

 

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔

 

স্কুল ছুটির পর আবৃতি আগে আগেই ব্যস্ত গতিতে বের হয়ে আসলো। উদ্দেশ্য ধ্রুবকে এড়িয়ে বাড়ি ফেরা। তখন বাচ্চারা ক্লাসে যাওয়ার পরও যখন ধ্রুব ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল তখনই বুঝেছে আবৃতি, ধ্রুব ওদের আজ ছাড়বেনা। আবৃতি কিছুতেই চাইছেনা এই ধ্রুব নামক প্রতারকের সঙ্গ। শুধুমাত্র ছেলেটার জন্য ধ্রুবকে দাঁত চেপে সহ্য করতে হচ্ছে। ধ্রুবর এক্সিসটেন্সেও আবৃতির অস্বস্তি হয়। ঘেন্নায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। আবৃতি বুঝে উঠতে পারেনা এই পুরুষ জাতিকে। অবশ্য ও ধ্রুবকে কখনোই বুঝে উঠেনি৷ সেই সুযোগটা ওকে দেওয়াই হয়নি। দুটো বালিশে পাশাপাশি শুয়েও ওদের দু’জনের মধ্যে ছিল এক পৃথিবীসম দূরত্ব। যেই দূরত্বটা আবৃতি পাঁচবছর চেষ্টা করেও মেটাতে পারেনি। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবৃতি কয়েকটা সিএনজি দাঁড় করাতে চাইলো। কিন্তু সবগুলো সিএনজি যাত্রী বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। আবৃতি ভয়ে ভয়ে বারবার পেছন তাকাচ্ছে। তখন ছুটির সময় একটা কল আসায় ধ্রুব সেটা রিসিভ করে সাইডে চলে গিয়েছিল৷ সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে আবৃতি তড়িঘড়ি করে আরশানকে নিয়ে বের হয়ে এসেছে।

— মাম্মা পাপা কোথায়? পাপা যাবেনা আমাদের সাথে?

–না বাবা।

— কেন্নোও?

— আবৃতি?

আবৃতির আঁতকে উঠে৷ দাঁত কিড়মিড় করে বিরবিরায়,

— ইয়া আল্লাহ৷ শেষ রক্ষা হলোনা।

ধ্রুব বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এসে একদম আবৃতির সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। ওর শান্ত দৃষ্টি আবৃতির পেলব আননে। আরশান স্বভাবসুলভ উৎফুল্লতায় মজে যায় স্বীয় জনককে দেখে। সে তো আর জানেনা তার বাবার কীর্তি। ধ্রুব আরশানকে কোলে তুলে আবৃতিকে শুধায়,

— পালিয়ে যাচ্ছ?

— হ্যাঁ।

আবৃতি ভণিতা না করে প্রতিত্তোর করল। ধ্রুব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

— প্লিজ বি কম্পোটেবল। আমার উপস্থিতি যদি তোমার জন্য এতটাই ঘৃণার হয়। আমি আসব না আর তোমার সামনে৷

আবৃতি থমথমে মুখ করে রইল। ধ্রুব অনুরোধের স্বরে বললো,

— আমি পোঁছে দিয়ে আসছি। চলো প্লিজ। এখানে দাঁড়িয়ে গাড়ি পাবে বলে মনে হয়না।

আবৃতি কিছু বলবে বলে মুখ খুলবে এর পূর্বেই ধ্রুবর ফোনটা তারস্বরে বেজে উঠে। ধ্রুব পকেট থেকে ফোনটা বের করে৷ আবৃতি স্পষ্ট দেখে স্ক্রিনে ‘ইরানি’ কলার নেইমটা জ্বলজ্বল করছে৷ আবৃতির বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। ধ্রুব বিব্রত হয়ে ফোনটা রিসিভ করে। প্রাক্তনের সামনে বর্তমানের কল। প্রাক্তন আর বর্তমান মিক্সট হয়ে যাওয়ায় বেচারা বেশ বিড়ম্বনায় ভুগছে। ফোনের ওপাশে কি বললো আবৃতি শুনলোনা। কিন্তু এর পরই ধ্রুবর চেহারা খানা বেশ বিচলিত দেখা গেল। আবৃতি ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলো। ধ্রুব ফোন কাটতেই যেন ওর নাভিশ্বাস উঠে গেল। সেভাবেই হড়বড়িয়ে বললো,

— আবৃতি আমাকে যেতে হবে। ইরার শরীর ভাল নেই। হঠাৎ…

আবৃতি হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল ধ্রুবকে। বললো ধীরে সুস্থে,

— বুঝেছি। আমিও সেটাই বলছি আপনাকে আপনার অসুস্থ স্ত্রীর পাশে থাকা দরকার। অথচ আপনি এখনো প্রাক্তনকে বাড়ি পৌঁছে দিতে দাঁড়িয়ে আছেন। প্লিজ গো।

আবৃতি হাত দিয়ে যাওয়ার ইশারা করে বললো। ধ্রুব চুপচাপ হজম করে নিল আবৃতির কটুবাক্য গুলো। প্রতিত্তোরে কিছু না বলে মাথা নিচু করে প্রস্থান নিল। ধ্রুব যেতেই আবৃতি মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাল এই যাত্রায় বাঁচিয়ে নেওয়ার জন্য। আবৃতি মনে মনে প্রার্থনা করে প্রাক্তনকে ফেইস করার মতো জঘন্য যন্ত্রণা উপরওয়ালা আর কাউকে না দিক।একটা ব্যাথাতুর নিঃশ্বাস ফেলে সে পিছু ফিরলো। খানিকটা চমকে দেখলো ঐক্য একদম ওদের সন্নিকটে এগিয়ে আসছে। আবৃতি কিছু বলার আগেই ঐক্য নিজ থেকেই স্বভাবসুলভ গম্ভীর কন্ঠে বলে,

— বাড়ি ফিরবেন না?

— জি ফিরব।

ঐক্য ইতস্তত ভঙ্গিতে বললো,

— যদি কিছু মনে না করেন। আই ক্যান ড্রপ ইউ।

আবৃতি সাবলীলভাবে হেসে বললো,

— জি অবশ্যই।

— প্লিজ কাম।

আবৃতির গাড়ির কাছে আসতেই ওয়াফা আবৃতির ওরনার প্রান্ত টেনে ধরলো। আবৃতি তাকাতেই ওয়াফা আদো সুরে আবদার পাড়ল,

— সুইটি আন্টি আমি তোমার কোলে বসব।

আরশান হড়বড়িয়ে বললো,

— একদম না ৷ আমি বসব আমার মাম্মামের কোলে। তাইনা মাম্মাম?

ওয়াফা নিজের দুই কোমরে হাত রেখে চোখ পাকিয়ে বলে,

— আমি আগে বলেছি। তাই আমি সুইটি আন্টির কোলে বসব

আরশান নিচের ঠোঁট কামড়ে নিজের অনামিকা আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে শাসিয়ে বলে,

— আমি বলেছি না আমি বসব মাম্মামের কোলে।

ওয়াফা নাক ফুলিয়ে বললো,

— না আমি বসব।

— না আমি।

আবৃতি আর ঐক্য হতবিহ্বল বনে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের ঝগড়া দেখছে। ওয়াফা রাগে ফেটে পড়ে পিচ ঢালাই করা সড়কে ডান পা দাপিয়ে বলে,

— আমি আগে বলেছি না পঁচা ছেলে। আমি বসব সুইটি আন্টির কোলে।

— আমি বলেছি মানে আমিই বসব আমার মাম্মামের কোলে। তোমার কি মাম্মা নেই? আমি কি কখনো বলেছি আমি তোমার মাম্মামের কো….

— স্যাট আপপপ।

আবৃতি দুকানে হাত চেপে বলে মৃদু চিৎকার করে। আরশানকে ধমকে বলে,

— এটা কেমন কথা আরশান। যাও চুপচাপ বসে পড়। ওয়াফা কি সবসময় বায়না করার জন্য আমাকে পাবে? যাও বসো ওখানে।

আরশানের চোখ টলমল করে উঠে আবৃতির ধমক খেয়ে। মাম্মাম অলওয়েজ তাকেই বকে দেয়। ওয়াফা মুখ টিপে হাসে,

— ভাল হয়েছে একদম। এবার আমি বসব সুইটি আন্টির কোলে।

ওয়াফার গা জ্বালাময়ী হাসিতে আরশানের নাকের পাটা ফুলে উঠে।

— ওয়েট আ মিনিট মিস আবৃতি।

ঐক্য এগিয়ে এসে গম্ভীর আওয়াজে আদেশ ছোড়ে একপ্রকার,

— তোমরা কেউ মিস আবৃতির কোলে বসতে পারবেনা। দু’জন পেছনের সিটে চুপচাপ বসো গিয়ে। উনি আমার পাশের সিটে বসবেন।

ওয়াফা নাক ফুলিয়ে মিনমিনিয়ে বলে,

— পাপা আমি সুইটি আন্টির কোলে বসব।

— ওয়াফা নোর মোর ওয়াডস। পাপা যেটা বলেছি সেটা করো।

অগত্যা দু’জনেই মুখ লটকে ব্যাক সিটে বসে পড়ে। আবৃতি ঠোঁট কামড়ে নিজের উপচে হাসি আটকায়। ঐক্যকে কে হাতের বুড়ো আঙুল ইশারা করে সাবাসি দেয়। লোকটা কি কৌশলেই না সামলে নিল দু’জনকে। ঐক্য ঠোঁট এলিয়ে হাসলো বিপরীতে। আবৃতি এই প্রথম ঐক্যকে হাসতে দেখল। অজান্তেই মুগ্ধ হলো ওর দু’নয়ন।

— প্লিজ সিট৷

ঐক্য ইশারা করে বলতেই আবৃতির ভ্রম কাটে। দেখে ঐক্য ওর জন্য গাড়ির ডোর খুলে রেখেছে। আবৃতি অপ্রস্তুত হলো সামান্য। আবৃতি উঠে বসতেই ঐক্য গাড়ি স্টার্ট দিল। লুকিং মিররে তাকিয়ে দেখল মুখ লটকে দুজনে বুকে দুহাত বেঁধে দুদিকে তাকিয়ে আছে। আবৃতি হেসে ফিসফিস করে বললো,

— একদম ঠিক হয়েছে৷

বিপরীতে ঐক্যও হাসল। আবৃতি বললো,

— আপনি খুব সুন্দর করে বাচ্চা ম্যানেজ করতে পারেন।

ড্রাইভিং এ মত্ত ঐক্য মৃদু হেসে বলে,

— ওয়াফাকে ছোট থেকে একা হাতে মানুষ করতে করতে শিখে গিয়েছি৷

ঐক্য কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো,

— ক্যান আই আস্ক আ কোয়েশশান মিস আবৃতি?

— জি করুন৷

— ইয়ে মানে আজ ধ্রুবকে আপনি ডেকেছিলেন।

— জি৷

আবৃতির সহজ উত্তর। ঐক্য বোধহয় খানিক নারাজ হলো তা শুনে,

— আমার মনে হয় আপনার ধ্রুবকে এভোয়েড করে চলা উচিত। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড ওর হাবভাব আমার কাছে সুবিধাজনক ঠেকছেনা৷

— কি করব বলুন। আমি চাইলেও যে ধ্রুবকে এড়িয়ে চলতে পারছিনা আমার আরশানের জন্য।

— মানে?

আবৃতি ক্লান্ত শ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললো,

–আমি আরশানের জন্য যত যাই করিনা কেন ওর বাবার অভাবটা আমার পক্ষে পূরণ করা কোনদিনও সম্ভব না। কেউ কোনদিন কারো বিকল্প হতে পারেনা ঐক্য সাহেব৷ এটি চিরন্তন সত্য।

— ওর সেই অভাবটা আপনি চাইলেই পূরণ করতে পারেন মিস আবৃতি।

— কিভাবে?

— নিজের জীবনে দ্বিতীয় সূচনার মাধ্যমে!

আবৃতির পিলে চমকে উঠে। হতবাক নেত্রে সে তাকায় নির্লিপ্ত হাতে ড্রাইভ করতে থাকা ঐক্যর দিকে। ঐক্য দৃষ্টি সামনে রেখে সমস্ত মনোযোগ ড্রাইভিং এ দিচ্ছে। আবৃতির বুকটা ঢিপঢিপ করছে। হৃদয়ের মনি কোঠরে বেজে উঠে যেন কয়েক লাইন,

“আমি আড়ালে থেকেও আগের থেকে বেশি ভালোবাসি আপনার, কিন্তু সেটা অগোচরে….
তুমি দুরে আছো __
দুরেই থাকো কাছে আইসো না।
আমার মায়ায় পইড়া যাইবা বন্ধুরে__
বন্ধু মায়া হইলো দারুন যন্ত্রনা।
ও ও ও……”

চলমান……

 

 

[ আসসালামু আলাইকুম প্রিয় পাঠক। কেমন হয়েছে অবশ্যই নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করবেন। আপনাদের রেসপন্স আমাকে লিখতে আরো বেশি উদ্বুদ্ধ করে।আজ ওদের চারজনকে ইনজয় করুন৷ হ্যাপি রিডিং। 💜]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x