গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (১৪)

পর্বসংখ্যা:১৪

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

 

 

প্রনয়যুগল কথা বলতে বলতে চৌধুরি পাড়ার সরু গলির মুখে এসে থামে। গলিটা পেরিয়ে বামে ঘুরে দুই বাড়ি পরেই প্রীতিষাদের বাসা। চারপাশে সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে নামছে। আকাশের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। সূর্য ঢলে গাঢ় লাল হচ্ছে চারপাশের আকাশ। প্রীতিষা কাবিরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
“দেখেছো? সন্ধ্যা হয়েই গেছে। এবার যাই। বাই বাই! ”

কাবির শুধু মাথা নাড়ায়, ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি দেখা যাচ্ছে। তবে দূর থেকে তা বোঝা যাবে না। প্রীতিষা বাড়ির পথে হাঁটা ধরলেও পুরোপুরি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত কাবির সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। প্রীতিষার বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে একটা চায়ের দোকান পড়ে। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে বখাটে ছেলেপেলেদের ভিড় জমে। হাসি-ঠাট্টা, আর অযথা শব্দে ভরা এক অস্বস্তিকর আড্ডা তাদের। প্রীতিষা এসব খেয়াল না করেই ফোন হাতে সোজা এগোচ্ছিলো। মুলত, সে ফোনে তার ভাইয়ার মেসেজ দেখছিলো।

ঠিক তখনই আড্ডার ভেতর থেকে একজন উঠে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। হঠাৎ পথ আটকে যাওয়ায় প্রীতিষা চমকে দু’কদম পিছিয়ে যায়। বিরক্তি আর অসহিষ্ণুতার ছাপ স্পষ্ট চোখে সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে পরিচিত কিছু মুখকে। হ্যাঁ, এরাই সেদিন প্রীতিষাকে বিরক্ত করতে গিয়ে কাবিরের হাতে মার খেয়েছিলো। তবে আজ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা নতুন। প্রীতিষা অতি বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে দেখে হেংলা-পাতলা ছেলেটার দিকে। ছেলেটার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, উন্মাদের মতো টানতে টানতে ধোঁয়া ছাড়ছে। গন্ধ নাকে আসতেই প্রীতিষার গা গুলিয়ে ওঠে। রাগে মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে পাশে বেঞ্চে বসে থাকা আরেকজন ছেলে চেঁচিয়ে ওঠে বলে,
“ওই রকি! ওই মেয়ারে ছাইড়া দে। ঝামেলা করিস না, বাপ! ল্যাম্পপোস্টের সামনে কেডা খাড়ায়া আছে দেখ। এর আগে কাবির আমাগো সেই ক্যালান কেলাইছে রে এই মাইয়ার জন্য! ”

রকি নামের ছেলেটা কথাটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিষার পেছনে তাকায়। লক্ষ্য করে, ল্যাম্পপোস্টের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাবির। কালো হুডি পরা, মাথায় টুপি দেওয়া, হুডির পকেটে গোঁজা দুই-হাত। ঠোঁটে একরকম রহস্যময় হাসি। কাবির আলতো করে হাত নাড়িয়ে হাই জানায় রকির উদ্দেশ্যে। এর মানে কাবির সবটাই লক্ষ্য করেছে এতক্ষণ।

রকির বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে ওঠে। বুকের ভেতর একরকম ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যায়। বন্ধুদের সতর্কবার্তা পেয়ে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রকি সরে দাঁড়িয়ে প্রীতিষার পথ ছেড়ে। আপাতত, কাবিরের সাথে ঝামেলা করার সাহস নেই ওদের। এসব কাণ্ডের কোনো কিছুই প্রীতিষা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। সে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো। তবে ওদের ভিতু দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকাতেই সে দেখতে পায় কাবিরকে। মুহূর্তেই প্রীতিষার ভ্রু-জোড়া শিথিল হয়ে আসে, ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটে ওঠে।

কাবির কয়েক কদম এগিয়ে এসে কোনো কথা না বলেই প্রীতিষার হাত ধরে নেয় এবং অন্য হাতে প্রত্যেকটা ছেলেগুলোকে একে একে হাতের ইশারায় তর্জনী আঙ্গুলে তাক করে চিহ্নিত করে। এদিকে শক্ত এবং আশ্বস্ত এক পুরুষালী হাতের মুঠোয় বন্দি হয় প্রীতিষার কোমল হাত। কাবির সামনে সামনে হাঁটে, আর প্রীতিষা পেছনে পেছনে। কাবিরের হাতের ধরাটাও প্রবল অধিকারসুলভ ভঙ্গিমা। আশপাশের সব শব্দ কেমন যেন হঠাৎ ম্লান হয়ে যায়। একেবারে বাসার সামনে এসেই কাবির হাত ছাড়ে প্রীতিষার। গলা একটু শক্ত করেই বলে,

“টিউশনি করবা, ভালো কথা। কিন্তু সন্ধ্যা ক্যান হইবো? দিন-সকালে টাইম বানায় নিতে পারো না? এই টাইম চেঞ্জ করবা, বুঝছো? এখন যাও।”

প্রীতিষা ফিক করে হেসে ওঠে। কাবিরের চমৎকার অধিকারবোধ টের পেতেই চোখে দুষ্টুমি কিলবিল করে তার।
” আরে বাহ! খুব অধিকার দেখাচ্ছো যে! ”

কাবির কোনো উত্তর দেয় না। উল্টো দিকে হাঁটা ধরে। জানে, কথা বললে কথা বাড়বে। আপাতত ও সেটা চায় না। যেতে যেতে মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে,
“পিরিতের ফাঁন্দে ফালাইয়া কয় অধিকার দেখাই ক্যান! ঢং-য়ের কথাবার্তা! ”

প্রীতিষাও আর দাঁড়িয়ে থাকে না। হাসিটা ঠোঁটে রেখেই নিজের ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসে। আর বাতাসে ভেসে থাকে কিছু অদৃশ্য টান। যা হয়তো কেউ স্বীকার করতে চাইছে না, কিন্তু অস্বীকারও করতে পারবে না। সন্ধ্যার নীরবতায় শুধু থেকে যায় কিছু অপ্রকাশিত কথা, আর অদ্ভুত এক নিশ্চুপ অনুভুতির আবেশ।

************************

বোর্ডে মনোযোগ নিবদ্ধ করে প্রীষান ক্লাস করাচ্ছিলো। চক-এর টানে টানে সমীকরণ আর ব্যাখ্যাগুলো ফুটে উঠছিলো বোর্ডজুড়ে। প্রীষান নিজের পাঠদানে এতটাই ডুবে ছিল সে যে, ঠিক সামনের বেঞ্চে বসে থাকা দুটো মুগ্ধ নয়ন সেই কবে থেকে নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করছে, সে খেয়ালই করেনি। কায়রা বসেছে একদম ফাস্ট বেঞ্চে। সপ্তাহে মাত্র দু’দিন প্রীষানের ইকোনোমিক্স ক্লাস পাওয়া যায়। এই দু’দিন সে কখনোই মিস করে না। চল্লিশ মিনিটের ক্লাস মানে দু’দিন মিলে মোট আশি মিনিট প্রীষানকে একটু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায় সে। এই একটুখানি আশাতেই কায়রা আগেভাগে ক্লাসে এসে পারলে ঠেলেঠুলে বসে পড়ে সামনের সারিতে। তাই আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অথচ অন্যান্য দিন সামনের সারি কেন, ক্লাসের কোনো সারিতেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না!

কায়রার পাশে বসে থাকা দিপ্তি অস্থির কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো,
“এইবার তো চোখ নামা, কায়রা বা*চ্চা! সেই থেকে দেখেই চলেছিস! কখন জানি স্যার দেখে ফেলে, এই ভেবে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে!”

কায়রা গালে হাত ঠেকিয়ে আছে। চোখ না সরিয়ে বোর্ডে লিখতে থাকা প্রীষানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে ধমকে বললো,
“এই চুপ থাক! ডিস্টার্ব করিস না তো! এই দুটো দিনের জন্য আমার প্রতি সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। তুই কি বুঝবি, সর! ”

দিপ্তি আরও কয়েকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো, সাবধানও করেছিলো। কিন্তু অবশেষে হাল ছেড়ে দিলো। দিপ্তি ভালো করেই জানে এই মেয়েকে আর শুধরানো যাবে না। প্রীষানের ক্লাসে কায়রার চোখ যে বোর্ডের চেয়েও স্যারকে দেখায় বেশি ব্যস্ত এই সত্যিটা মেনে নেওয়া ছাড়া দিপ্তির আর কিছু করার নেই। হাল ছেড়ে ওভাবেই বসে রইল সে।

দীর্ঘ চল্লিশ মিনিটের ইকোনোমিক্স ক্লাস শেষ করে প্রীষান বোর্ডের দিকে একবার তাকিয়ে টেবিলে থাকা বই বন্ধ করলো। ক্লাসের নির্ধারিত সময়ও শেষ।শিক্ষার্থীরা তখনো নোট গুছিয়ে উঠতে ব্যস্ত। ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্লাসরুমের দরজায় আবির্ভূত হলেন কলেজের প্রিন্সিপাল। তাঁকে দেখামাত্রই মুহূর্তের মধ্যে শ্রেণিকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সম্মানের নিদর্শন হিসেবে সকল ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। হালকা হাসি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বসার ইঙ্গিত করে প্রিন্সিপাল বললেন,

“প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আজ তোমাদের জন্য একটি সুখবর নিয়ে এসেছি। চলতি বছরে তোমাদের চমৎকার ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তৃতীয় বর্ষের এই ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ট্যুরের আয়োজন করা হয়েছে। যারা যেতে আগ্রহী, তারা আমিনুল স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।”

খবরটি শুনে শ্রেণিকক্ষজুড়ে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো। উচ্ছ্বাস আর ফিসফিস কথায় ভরে উঠলো শ্রেনিকক্ষের চারপাশ। কেউ কারও দিকে তাকিয়ে হাসছে, কেউ ভবিষ্যৎ সফরের পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে পরছে। এই ভিড়ের মাঝেও প্রীষান চিরচেনা স্বভাবেই নিরব, সংযত হাসলো। প্রিন্সিপাল ক্লাস থেকে বেরোনোর আগে প্রীষানকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। প্রিন্সিপাল ছিলেন প্রীষানের বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাই প্রীষানের মুখে তাঁকে আঙ্কেল বলেই সম্বোধন শোনা যেতো। প্রীষান ধীর পায়ে তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এলো। চলতে চলতেই প্রিন্সিপাল বললেন,
“প্রীষান, তুমি তো কখনো কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাও না। কিন্তু এইবার তোমার কোনো আপত্তি শুনতে চাই না। এই ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা সবাই মিলেই যাচ্ছে।”

প্রীষান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। চোখ নামিয়ে এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে মাথা নেড়ে বললো,
“আপনি তো জানেন’ই আঙ্কেল, বাচ্চাদের ছাড়া আমি একদম থাকতে পারি না। ওদের একা রেখে যাওয়া… তাছাড়া আমার বোনটাও তো একাই থাকে। তবুও চেষ্টা করবো আমি।”

প্রিন্সিপাল স্নিগ্ধ হেসে বললেন,
“শোন প্রীষান, ব্যস্ততা আর পারিবারিক দায়িত্ব আমাদের সবার’ই আছে। তাও নিজের জন্য একটু সময় বের করে নিতে হয়। এবার সত্যিই আমি চাই তুমিও সঙ্গে যাও। জোর তো করতে পারবো না, তবে আশা রাখছি।”

আর কোনো আপত্তি করল না প্রীষান। মৃদু স্বরে বললো,
“আচ্ছা, আঙ্কেল। যেহেতু একদিনের ব্যাপার, দেখা যাক।”

প্রিন্সিপাল সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে প্রীষানের কাঁধে স্নেহের হাত রাখলেন। তারপর ধীরে ধীরে করিডোর ধরে এগিয়ে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন প্রীষানের জন্য একগুচ্ছ ভাবনা আর আসন্ন এক সফরের সম্ভাবনা। প্রীষানও ভেবে নিলো যাওয়াই যাক। তাছাড়া, ঘোরাঘুরি করলে মনটাও ফ্রেশ থাকে। অনেকদিন তেমন কোথাও যাওয়া হয় না।

———————————————-

ক্লাস শেষের ঘণ্টাটা আজ একটু বেশিই দীর্ঘ হলো। ক্লাস শেষে বের হয়েই কায়রা, দিপ্তি আর আরও কয়েকজন বন্ধু হেঁটে চলেছে ক্যাম্পাসের ছায়াঘেরা পথ ধরে। কথার বিষয় একটাই, কাঙ্খিত ট্যুর।
দিপ্তি হালকা উত্তেজনায় কায়রাকে বললো,
” তুই কি যাবি? তুই গেলে আমিও বাসায় বলবো। ”

কায়রা সামান্য ভেবে গালে জিভ ঠেলে উত্তর দিলো,
” যাওয়াই যায়। এমনিতেও বন্ধুরা মিলে আমাদের কখনো ট্যুরে যাওয়া হয়নি। সারাজীবন শুধু প্ল্যানই করে গেলাম। সাকসেসফুল আর হয়নি। ”

পেছন দিক থেকে জিহাদের কণ্ঠ ভেসে এলো,
” সেটাই তো! কায়রা, চল না। একদিনই তো। ঘুরে আসি। ”

কায়রা মাথা নাড়াল, কিন্তু খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়েই বললো,
“সিওর হতে পারছি না। ভাইজানদের আগে জানাতে হবে। দেখি তারা কি বলে। ”

এই কথায় জিসান হেসে উঠল। হালকা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
“এতো ভাইদের ন্যাওটা কেন তুই? সবকিছুতেই ভাইদের বলা লাগে! একটা এডাল্ট মেয়ে তুই, অনার্সে পড়িস। কোনো বাচ্চা না যে সব ব্যাপারে ভাইদের পারমিশন নিতে হবে। কাম অন, ইয়ার! ”

কায়রার চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। সে থেমে জিসানের দিকে তাকালো। চোখে রাগ মিশিয়ে দৃঢ় গলায় বললো,
” ঠিক বলেছিস, এডাল্ট আমি। কিন্তু এতটাও বড় হইনি যে ভাইদের অবাধ্য হবো। ওরা ছাড়া আমি কিছুই না। নেক্সট টাইম আমার সামনে এসব বলার আগে ভেবে বলিস। ”

এই বলে কায়রা এগিয়ে গেল সামনে একাই। কিছু দূর যেতেই পেছন থেকে জিসান দৌড়ে এসে কায়রার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
“দাঁড়া দাঁড়া। আচ্ছা, রাগ করিস না। তোর ভাইরা রাজি হলে গ্রুপে মেসেজ দিস। আমি আর তুই একসাথে বাসের সিট কাটবো। ”

কায়রা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“একদমই না, জিসান। আমি দিপ্তির সাথে বসবো।”

দিপ্তি অস্বস্তিতে আমতা আমতা করে বললো,
” কায়রা… আসলে… আমি না ওই সৌরভের সাথে বসবো ভাবছিলাম।”

কায়রা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল দিপ্তির দিকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর মুখ শক্ত করে বললো,
“ঠিক আছে, ফাইন! তোর বিএফের সাথে বসবি, ভালো কথা। কিন্তু আমি জিসানের সাথে বসবো না।”

জিসান অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
“কি সমস্যা? কেন বসবি না?”

সে উত্তর না দিয়েই কায়রা সামনে এগোতে চাইলে হঠাৎ পেছন থেকে জিসান তার হাত টেনে ধরে। আচমকা এমন করায় কায়রা বিস্মিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তার চোখে তীব্র ক্ষোভ স্পষ্ট। কায়রা হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে, কিন্তু জিসানের ধরা হাত অস্বাভাবিক রকমের শক্ত। জিসানের কণ্ঠে একরকম উন্মাদনা,
” কেন এমন করিস আমার সাথে, কায়রা? আই লাভ ইউ, না! কেন বুঝিস না?”

এই মুহূর্তে কায়রার ভেতরটা তীব্র বেগে জ্বলে উঠলো। ঠিক এই কারণেই সে জিসানকে দূরে রাখতে চায়। উপেক্ষা করে চলে জিসানকে। দাঁতে দাঁত চেপে কায়রা বললো,
” হাত ছাড়, জিসান। মাথা গরম করিস না। হাত ছাড়!”

দিপ্তি নিজেও এমন কান্ডে ভরকে গেছে। আতঙ্কিত গলায় বললো,
” কী করছিস জিসান! ছেড়ে দে ওকে! ”

জিহাদ এগিয়ে এসে বললো,
” পাগল হয়ে গেছিস! ক্যাম্পাসে সবাই দেখছে। বসে কথা বল। ওর হাত ছাড়! ”

কিন্তু জিসানের চোখে তখন কোনো সংযম নেই। কেমন একটা বিকারগ্রস্ত লাগছে তাকে। কায়রা সবসময় তাকে অবহেলা করে চলে। আজও সেরকম হওয়ায় জিসানের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছে যেন। তাই লাগামছাড়া হয়ে বলে,
” দেখুক! আই ডোন্ট কেয়ার! আমাদের মাঝে তোরা কেউ আসবি না। কায়রা কেন আমাকে ইগনোর করে সবসময়, আজ বলতেই হবে! আমার কী কমতি আছে? আমি তো ওকে পাগলের মতো ভালোবাসি! বোঝেনা কেন ও? ”

“কিসের ভালোবাসা? তুই শুধুমাত্র আমার বন্ধুই ছিলি! আজকের পর তো সেটাও থাকবি না! ছাড় আমায়, বাস্টা*র্ড! ”

এমন কথায় কায়রার ধরা হাতে জিসান আরও জোর বাড়ায়। কায়রা ছটফট করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। এমন স্পর্শে তার গা শিউরে ওঠে, বুকের ভেতর জমে ওঠে অসহ্য অস্বস্তি। চোখে তখন শুধু একটাই অনুভূতি, নিজেকে রক্ষা করার তাগিদ। ভালোবাসা কখনো এমন জোর করে হতে পারে না। কোনো মানুষকে কষ্ট দিয়ে তো নয়’ই।

পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছিলো। হঠাৎ কোথা থেকে যেন ব্যঘ্র থাবার ন্যায় এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত এসে পড়লো জিসানের গালে। আকস্মিক আঘাতের তীব্রতায় সে কয়েক সেন্টিমিটার দূরে ছিটকে গেলো। এমন কান্ডে কায়রাও হতবিহ্বল হয়ে গেলো কিছু সেকেন্ডের জন্য। সে ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে থাকে প্রীষানের দিকে। এদিকে বিস্ময় আর যন্ত্রণায় গালে হাত দিয়ে জিসান চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে প্রীষান স্যার। ঠোঁটের কোণে একপাশে বাঁকা হাসি টেনে প্রীষান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। জিসানের কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে কঠিন শান্ত কণ্ঠে বললো,

“হোয়েন আ ওম্যান সেজ নো, দ্যাট মিন্‌স নো। ইউ স্টপ রাইট দেয়ার। এর পরে ছেলেদের আর কোনো ব্যাখ্যা বা দ্বিতীয় কোনো কথা বলার অধিকার থাকে না। সে ভালোবাসার প্রস্তাবই হোক, কিংবা অন্য কিছু। আশা করি ক্লাসের বাইরে দেওয়া আমার এই লেকচারটা তোর কাজে লাগবে। সাথে এই মারটাও।”

মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল ভিড়ের সমুদ্রে পরিণত হলো। ছাত্রছাত্রীরা কৌতূহল ও উত্তেজনায় চোখে চোখ রেখেই সব কিছু দেখছে। যেন সার্কাস হচ্ছে! এদিকে কায়রা প্রীষানের দিকে তাকিয়ে আছে কৃতজ্ঞতার চোখে। কায়রার মনে হলো, কোথা থেকে একজন দেবদূত বাস্তবে উপস্থিত হয়েছে তার সামনে। অন্যদিকে জিহাদ আর দিপ্তি ভয়ে স্তব্ধ। সাধারণ একটা ইস্যু নিয়েই এতো বড় তোলপাড় হয়ে যাবে তারা ভাবতেও পারেনি। আশেপাশে ছড়ানো ছাত্রছাত্রীদের ভিড় দেখে জিসান নিজের প্রতি অপমান বোধ করে। সব এই প্রীষান স্যারের জন্য! অন্তরে ক্ষোভ জমতে থাকে তাকে নিয়ে, কিন্তু জিসান তা দমিয়ে রাখে। প্রতিশোধ পরে নেবে ভেবে ভিড় ঠেলে চলে যায় সেই স্থান থেকে।

প্রীষান দেখে ইতিমধ্যে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় জমেছে। তাই ভিড়ে থাকা সবার উদ্দেশ্যে ধমক দিয়ে বললেন,
“সার্কাস হচ্ছিলো না এখানে! এখন সবাই যেখানে যাচ্ছিলে সেখানে ফিরে যাও। ফাস্ট!”

মুহূর্তের মধ্যে ভিড় ছড়িয়ে পড়লো। সেখানে অবস্থান করলো শুধু জিহাদ, দিপ্তি, কায়রা আর প্রীষান। কিছুক্ষন পর জিহাদ আর দিপ্তিও সরে যায় সেই জায়গা থেকে। প্রীষানের চোখ অমনি কায়রার কব্জিতে চলে যায়। জায়গাটা হালকা লাল হয়ে আছে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে ধীর ও গভীর স্বরে বললো,
“বন্ধু বানালেই সবাই বন্ধু হয় না। আর এমন মানসিক বিকারগস্ত বন্ধুর কাছ থেকে দশ হাত দূরে থাকা উচিত।”

কায়রা অস্ফুটে শুধু বললো,
“ধন্যবাদ, স্যার।”

প্রীষান চশমা পড়ে স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলো,
“তোমাকে বাঁচিয়েছি বলে নিজেকে বিশেষ ভেবো না। তোমার জায়গায় অন্য যেকোনো মেয়ে হলেও আমি একইভাবে হেল্প করতাম। হিউম্যানিটিস বলে একে।”

কায়রা মলিন হেসে বললো,
“ভাবি নি, স্যার। সত্যিই ভাবিনি।”

প্রীষান একটু থেমে বললো,
“গুড। আশা করি তুমি খুব দ্রুত তোমার ফ্যান্টাসি জগত থেকেও বেরিয়ে আসবে। বাস্তব দুনিয়া চেনা উচিত।”

কায়রা হেসে উত্তর দিলো,
“সেটা সম্ভব নয়, স্যার। কাল্পনিক দুনিয়ায় আমি সুখী আছি। সেই জগত ছেড়ে বেরিয়ে আসলে যে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো!”

প্রীষান দীর্ঘশ্বাস নিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করলো। কায়রার সামনে মোবাইল ওয়ালপেপারে দেখালো একজন হাসোজ্জ্যল লাল শাড়ি পড়া মেয়ের ছবি। বললো,
“ও আমার স্ত্রী, পৃথা। ওকে ভালোবেসে আমি বিয়ে করেছিলাম। পৃথা নেই বেশ কিছু বছর, কিন্তু আমার ভালোবাসা একটুও কমেনি তার প্রতি। আর না কোনোদিন কমবে। ওর আমার ভালোবাসার অংশ হিসেবে আমাদের দুজন সন্তানও আছে। তাহলে তুমি ভাবছো কি করে ওর জায়গা নেবে? আর আমার সাথে বিয়ের প্রসঙ্গ বার বার টানো কেন! আল্লাহ না করুক তাও যদি তোমার কোনো খুঁত থাকতো?”

কায়রা আলতো হেসে বললো,
“ভুল বুঝছেন, স্যার। আমি কখনো ওনার জায়গা নিতে চাইনি। আমি কেবল নিজের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করতে চেয়েছি। আর কি বললেন? খুঁত! কি খুঁত চান আপনি? কোন খুঁতটা আপনাকে বিয়ে করার জন্য পারফেক্ট হবে? ”

প্রীষান বুঝতে পারলো কায়রাকে কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে এই মেয়েকে সাইকো লাগে প্রীষানের! নাহলে কোনো মেয়ে কিভাবে নিজের খুঁত চায়! তাই হতাশ হয়ে মোবাইলটা পকেটে গুঁজে বললো,
“তুমি খুব জেদি, তাই না?”

কায়রা সরল হেসে বললো,
“ছোটবেলা থেকে।”

“যা ভাবছো, তা অসম্ভব।”

কায়রা দৃঢ় স্বরে বললো,
“আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব।”

” আমাকে কখনো পাবে না। ”

কায়রা প্রতিউত্তরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলিন হেসে বলে,
“পৃথিবীতে যা কিছু পাওয়া অসম্ভব তার মধ্যে আপনি অন্যতম, স্যার৷ আপনাকে সহজলভ্যভাবে পাওয়ার সাধ্য আমার নেই। আমার জন্য আপনি পুরোটাই নসিব। ”

প্রীষান আর অপেক্ষা করলো না। এ কেমন ধরনের কথা! হাঁসফাঁস লাগলো ওর। তাই অপেক্ষা না করে দৃঢ় ভঙ্গিতে নিজের পথে এগিয়ে গেলো। পেছনে শুধু কায়রা থমকে দাঁড়িয়ে রইল, ভাবনার অতল গভীরে ডুবে। সত্যি কায়রা জানে না কোন পথে হাঁটছে। ঠিক না ভুল! কিন্তু তার মানসিক যুক্তি একটাই, কাওকে ভালোবাসা ভুল নয়। ভুল হতেই পারে না।

 

 

চলমান…….

হাই পাঠক! 🙋‍♀️

 

 

 

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x