পর্ব সংখ্যা: [১]
‘এই অভাগিনী সন্ধ্যাবেলায় পোলার বাড়ি থেইকা তোরে দেখতে আইব। এই লাল শাড়িখান পইড়া নে। আল্লাহ আল্লাহ কইরা এইবার যদি তোরে পছন্দ করে, তাইলে আমি আপদ খানা বিদায় কইরা বাঁচি। নাইলে পাশের পাড়ার বুইড়া মকবুল কাজীর লগে তোর বিয়া পড়াইয়া দিমু।
এই মাইয়াডা আমার জীনবডারে অতিষ্ঠ কইরা ফাইলাইছে। জন্মের সময় নিজের মায়রে খাইছে। ষোলো বছর ধইরা আমার ঘাড়ে ঝুইলা আছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা লয় বিষ খাওয়াইয়া মাইরা ফালাই—
-“এসব কথা বলে, রাগে গজগজ করতে করতে হামিদা বেগম দ্রুত পায়ে দরজা ঠেলে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। কুহেলি তাঁর সব কথা শুনে শুধু মুচকি হাসল। শাড়িটা আলতো করে হাতে তুলে এপাশ ওপাশ উল্টেপাল্টে দেখছে।
আকাশি রঙটা কুহলির ভীষণ পছন্দ—শাড়িটার দিকে তাকাতেই ওর চোখে-মুখে প্রফুল্ল একখানা হাসি ফুটে উঠল। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল—পড়লে ঠিক কেমন লাগবে, কেমন করে ওকে মানাবে!
-“কুহেলির পাশেই দশ বছরের ছোট্ট আরিফা মনখারাপ করে বসে আছে। এবার ছলছল চোখে জমে থাকা অশ্রু সামলে, কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “আফু, আম্মায় তোমার লগে এত খারাপ ব্যবহার করে, তোমার কী কান্দন আয় না?”
কুহেলি উদাস মনে বসে ছিল। এমন কথাবার্তা নতুন কিছু নয়—প্রায় প্রতি-দিনেই ওর কানে আসে। কুহেলি দুঃখিত হৃদয় নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,“মায়েরা এমনই হয় আরু। মেয়েদের একটু কড়া শাসনে রাখেন। এতে খারাপ লাগার কী আছে?”
“আরিফা নাছোড়বান্দা। চোখে এখনো জমে আছে অভিমান। বলল,“আম্মায় সব সময় তোমার লগে রাগ দেহায়, কাজ করায়, বিনা দোষে মারে। কই, আমার লগে তো এমন করে না আফু। তুমি অনেক শক্ত মনের মানুষ—সবকিছু হাসিমুখে মাইনা নেও। তয় আব্বায় কিন্তু তোমারে অনেক বেশি ভালো পায়।”
-“কুহেলি হালকা করে হাসল। আরিফার কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,“আচ্ছা, বনু এইগুলা এখন বাদ দে। এসব কথা বললে, মা শুনলে রেগে যাবে। আমি শাড়ি পড়ে একটুখানি সাজি। দেখ না, আকাশি রঙের শাড়িটা ভীষণ সুন্দর। পড়লে আমাকে কেমন লাগবে বল তো?”
আরিফা এবার একটু মন খুলে তাকাল। চোখের জল মুছে মুচকি হেসে বলল,“এমনি তোমারে অনেক ভালো দেহায়, আর সাজগোজ করলে একদম আকাশের পরির লাহান লাগবে। আইজকা পোলার বাড়ির লোকজন দেখবা, তোমারে খুব পছন্দ করব।”
আরিফা একটু থামল, কণ্ঠটা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো—
“আফু বিয়ার পর তুমি কী আমারে ছাইড়া যাইবা?”
কুহেলি অবাক চোখে তাকিয়ে প্রত্যুত্তর করল, এভাবে বলিস না বনু। তাহলে আমার মন খারাপ হবে। লক্ষ্মী বোন আমার, কান্না বন্ধ কর। তুই কাঁদলে আমারও যে কান্না পায়। আয়, আমাকে শাড়ি পড়তে সাহায্য কর। দেরি করলে মা এসে আবার বকবেন।”
-“গাঢ় আকাশি রঙা শাড়ি পরে সন্ধ্যা সাতটা নয় মিনিটে, ষোলো বছরের কুহেলি ছেলে পক্ষের সামনে বসে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে হামিদা বেগম সৎ মেয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে যাচ্ছেন, আর ঘরে উপস্থিত সবাই হাসিমুখে সেসব শুনছেন।
কুহেলি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে। ছেলের মা, বোন একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে; সে ভয়াতুর কণ্ঠে শুধু সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে।
‘হঠাৎ করেই সামনে বসে থাকা এক পুরুষের দিকে কুহেলির নজর আটকে গেল। উজ্জ্বল বর্ণের মানুষটা, গড়পড়তা বাঙালিয়ান চেহারা—চোখে-মুখে নিরানন্দ এক গম্ভীর ভাব। বুকের কাছে হাত গুঁজে নীরবে বসে আছে।
“কুহেলি যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চারপাশের কোনো শব্দ, কোনো কোলাহল আর ওর কানে ঢুকছে না। মনে হচ্ছে, চোখ সরালেই এই উজ্জ্বল অথচ নিঃশব্দ মানুষটা হারিয়ে যাবে।
হামিদা বেগমের কর্কশ কণ্ঠে কুহেলি সম্বিত ফিরল—“এই মাইয়া কই হারালি রে? উনাদের প্রশ্নের উত্তর দে।”
কুহেলির ছোট্ট হৃদয়টা হঠাৎ প্রকম্পিত হয়ে উঠল। শরীরটা কেঁপে উঠল অজান্তেই। মৃদু, প্রায় শোনা না যাওয়ার মতো স্বরে বলে উঠল,“হুঁ… শুনছি তো!”
এক ভদ্র মহিলা কুহেলির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে প্রশ্ন ছুড়লেন—“মা, তুমি কী রান্না করতে জানো?”
কুহেলি একটু থেমে, মাথা নিচু রেখেই উত্তর দিল—
-“জ্বি… আমি মোটামুটি জানি!”
কায়রা খানম একটু হেসে পুনঃ জিজ্ঞেস করলেন,
বিয়ের পর তোমাকে রান্না করতে হবে—পারবে তো?”
কুহেলি এক মুহূর্ত চিন্তা করে নিল। তারপর ধীর,
কিন্তু স্থির কণ্ঠে জবাব দিল,“আমি খুব পারব!”
ছেলের বাড়ির লোকজন কুহেলিকে বেশ পছন্দ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন করতে চায়।
-“হঠাৎ মেয়ের বিয়ে—এই ভাবনায় আনিস উদ্দিন কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলেন। হুট করেই সব আয়োজন করা মানে বড়সড় ঝামেলার ব্যাপার! তিনি ছেলের মামাকে জানালেন, এত দ্রুত সবকিছু করা সম্ভব নয়; গুছিয়ে নিতে আরও কিছুটা সময় দরকার।
কায়রা খানম শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন,“ভাই সাহেব আমাদের হাতে অতো বেশি সময় নেই। ছেলে আমার ঢাকা শাহবাগ বারডেম হসপিটালের একজন অর্থোপেডিক ডাক্তার। মাত্র দশ দিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। বিয়ের পর বউকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় চলে যাবে। আপনাদের ছোট্ট মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কোনো কিছু দেওয়ার দরকার নেই—শুধু মেয়েটা হলেই চলবে।”
-“এই কথা শুনে আনিস উদ্দিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভেতরের সব দ্বিধা যেন এক লহমায় দূরে সরে গেল। শেষমেশ সবাই মিলে আলোচনা করে আগামী শুক্রবার বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করল।
রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে খান পরিবার একসঙ্গে ডিনার করছিল। বিয়ের ব্যাপারটা ঘিরে টেবিলজুড়ে চলছে, নানান আলোচনা আর নীরব সমালোচনা। খানিকটা সময় চুপচাপ থাকার পর নীরবতা ভেঙে ইশরাক বলল,“আম্মু, আর একটু ভেবে সিদ্ধান্ত নিলে হত না?”
-“ইশরাক একটু থেমে আবার যোগ করল,“মেয়ের বয়স অনেক কম। হুট করেই চিন্তা-ভাবনা ছাড়া কাজ করলে পরে পস্তাতে হবে। তখন আর লাভ হবে না।”
-‘কায়রা খানম নির্বিকার কণ্ঠে জবাব দিলেন, বাবু
আমি যা ভাবার ভেবে নিয়েছি। এই মেয়েটাকেই তোর বউ করে খান বাড়িতে নিয়ে আসব। এই কথার নড়চড় হবে না। কী মিষ্টি দেখতে মেয়েটা, ওর কথা বলার ধরন কতটা গোছানো, কাজকর্ম জানে—ভবিষ্যতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমার কথা মিলিয়ে নিস, বাবু।”
এই বিষয়ে ইশরাক আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ খাওয়া শেষ করে নিজের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করতেই অতীতের নানান ভাবনা ভিড় করতে লাগল। ইশরাক এই বিয়েটা চায় না—মায়ের পীড়াপীড়িতেই একপ্রকার বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছে।
‘অন্যদিকে গভীর রাতে কুহেলি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে। ওই উজ্জ্বল বর্ণের পুরুষ মানুষটার মুখখানা কিছুতেই মাথা থেকে নিষ্কাশন করতে পারছে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার গম্ভীর চাহনি। নামটা অজানা, তবুও কুহেলি মনে মনে ভেবে নিয়েছে—যদি ভবিষ্যতে ওই মানুষটা ওর বর হয়, তবে তাকে শখা বাবু বলে ডাকবে।
অবশেষে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। ছোট্ট কুহেলিকে লাল রঙের বেনারসি পরিয়ে পুতুলের মতো সাজানো হয়েছে। ভারী অলংকারে নুয়ে পড়েছে ওর কিশোরী শরীর। ইশরাক মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কবুল বলেছে।
নিয়মরক্ষার হাসি, যান্ত্রিক উচ্চারণ—সব মিলিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হলো। এরপর এলো বিদায়ের পালা।
-“কুহেলি ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে বিষাদমাখা কণ্ঠে বলল,“বাবা, ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো। আর নিজের খেয়াল রেখো।”
মেয়ের এমন আহ্লাদ দেখে, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা হামিদা বেগম ভেতরে ভেতরে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছেন। তিনি মনে মনে হাজারখানেক গালি দিয়ে ফেলেছেন। তারপর সামনে এগিয়ে এসে চোখ-মুখ কুঁচকে, বিরক্তিতে গলা চড়িয়ে হঠাৎ করে চেঁচিয়ে উঠলেন,“হয়েছে মেয়ে, আর ন্যাকা কান্না কাঁদিস নে। এবার বিদায় হ। আমি খাঁটি গরুর দুধ আইনা রাখছি। গোসল কইরা ঘরে উঠমু।”
-‘কুহেলি সৎ মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। গলাটা কাঁপছে, তবুও আকুল কন্ঠে বলল,“মা, আপনার কাছে সত্যি আমি অনেক কৃতজ্ঞ। ছোট থেকে আমায় এত বড় করেছেন। শেষবারের মতো আমাকে একবার বুকে জড়িয়ে নিবেন। আর কখনো কোনো আবদার করব না।”
-“কথা শেষ হতেই হামিদা বেগম আবার ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি কঠোর স্বরে বললেন,“বড় করছি, ভালা ঘরে বিয়া দিছি—এইডাই অনেক বেশি। জড়াইয়া ধরা অনেক দূরের ব্যাপার। বেশি বিলাসিতা ভালা না, মেয়ে। চক্ষের সামনে থেইকা দূর হ।”
ইশরাক স্তব্ধ দৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখছিল। একটা মানুষ যে এতটা রুক্ষ, এতটা নির্দয় হতে পারে—এটা আসলে ওর জানা ছিল না।
কুহেলি অশ্রুস্নাত চোখে শেষবারের মতো বাড়িটার দিকে তাকাল। এই বাড়িতেই ওর শৈশব কেটেছে, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে প্রতিটি দেয়াল আর উঠোনে।
‘অথচ আজ সবকিছু ছেড়ে যেতে হচ্ছে। সঙ্গে করে নিয়েছে শুধু মায়ের সাদা রঙের একটা শাড়ি—এর বাইরে আর কিছু নয়। কুহেলি মনে প্রানে প্রতিজ্ঞা করল, এই বাড়িতে আর কখনো ফিরবে না।
কুহেলি ওর ছোট বোন আরিফার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এসেছে। অতিরিক্ত কান্নায় শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে; চোখে-মুখে জমে আছে গভীর বিষণ্নতা। বুকে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ভাগ্যকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। ঠোঁট নড়ে উঠল নিঃশব্দে—“মা, তুমি যদি বেঁচে থাকতে, আমায় কী একটু বুকে জড়িয়ে নিতে না?”
হঠাৎ কুহেলির মনে প্রশ্ন জাগল—
“তবে কী সত্যিই আমি অপয়া?”
বিধাতার কাছে আমার একটাই অভিযোগ—এই ছোট জীবনে এত দুঃখ, লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা দিল, সেসব সহ্য করার মতো ধৈর্যটুকু কেন দিল না?
-“এসব ভাবতে ভাবতেই কুহেলির চোখ দু’টো ধীরে ধীরে আবদ্ধ হয়ে এলো। হালকা ঘুমের ঘোরে ছোট্ট শরীরটা একপাশে হেলে পড়তে নিল। ঠিক তখনই ইশরাক হাত বাড়িয়ে ওকে ধরে ফেলল। এবার খুব সাবধানে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে শুইয়ে দিল।
পরবর্তী অংশ নিয়ে খুব শীঘ্রই আসব….