গল্প: বিদেশি বাবু বাঙালি ম্যাম(০২)

 
লেখিকা:তাছমিয়াতুল জান্নাত

 

পর্ব:০২

 

 

 

 



মিথন নওশাদের কথাগুলো ড্রয়িংরুমে যেন একটা অদৃশ্য চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। তার শান্ত অথচ বিষাক্ত কণ্ঠস্বরের প্রতিটি শব্দ ফারুক আরহামের কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধল।

মিথন সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে তার সেই চাইনিজ ঘরানার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সরু করে বলল:

​”আমার বউকে যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে আরও একটা রাস্তা খোলা আছে আরহাম সাহেব। নিতু একা একা পালানোর মেয়ে নয়, ওকে বাড়ির ভেতর থেকে কেউ না কেউ অবশ্যই সাহায্য করেছে। সেই সাহায্যকারী ব্যক্তিটি যদি কোনো মেয়ে হয়, তবে আজ রাতেই আমি তাকে বিয়ে করে আমার বাড়িতে নিয়ে যাব। আমার অপমানের বদলা আমি তার জীবন দিয়েই নেব।”

​মিথনের এই ঘোষণা শোনার পর ড্রয়িংরুমে থাকা সবার রক্ত যেন হিম হয়ে এল। এই সুপারস্টারের রাগের কথা পুরো ইন্ডাস্ট্রি জানে, আর আজ তার ব্যক্তিগত সম্মানে আঘাত লেগেছে।

_____________________________________

​এদিকে কিচেন রুমের এক কোণে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গোধূলির অবস্থা এখন শোচনীয়। মিথনের কথাগুলো স্পষ্ট ভেসে এসেছে তার কানে। সে অনুভব করল, তার কপাল বেয়ে একফোঁটা ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তার ফর্সা হাত দুটো ভয়ে কাঁপছে।
​গোধূলি মনে মনে ভাবল— সে তো শুধু ভালোবেসে নিতুকে মুক্তি দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বিনিময়ে এখন নিজের জীবনটাই বাজি হয়ে গেল? মিথনের সেই শিকারি চোখের সামনে দিয়ে সে কি পালাতে পারবে?

​শান্ত ও লিপ্ত স্বরে গোধূলির স্বগতোক্তি:

​”জেহের… আমি কী ভুল করে ফেললাম? এই লাল দুপাট্টা কি তবে আমার সারা জীবনের বন্দিশালা হয়ে আসবে? ওই মানুষটা যদি জানতে পারে আমিই জানালা খুলে দিয়েছি, তবে সে আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলবে না তো?”

​গোধূলির নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে এল। সে বুঝতে পারছে, সময় ফুরিয়ে আসছে। বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে, আর মাত্র দশ মিনিট বাকি। বাইরে ফারুক আরহামের আর্তনাদ আর মিথনের ঘড়ির কাটার শব্দ যেন একসাথে পাল্লা দিচ্ছে।

মিথন নওশাদের দেওয়া সেই চরম সময়সীমা পার হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের ঘড়িতে যখন তিরিশ মিনিট পূর্ণ হলো, মিথন ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার চেহারায় এখন আর কোনো অভিনেতার কোমলতা নেই, আছে এক হিংস্র জেদ। সে পকেট থেকে লাইটারটা বের করে জ্বেলে নিল, আগুনের শিখাটা তার চাইনিজ ধাঁচের তীক্ষ্ণ চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে।

​শীতল ও ক্রূর স্বরে মিথন বলে উঠল—

​”সময় শেষ, আরহাম সাহেব। মনে হচ্ছে আপনার মেয়ের চেয়ে আপনার কাছে বাড়ির আসবাবপত্রের দাম বেশি। ঠিক আছে, আমার লোকজন বাইরে পেট্রোল নিয়ে তৈরি। এই বাড়িতে আগুন লাগাতে আমার এক সেকেন্ড সময় লাগবে না। তবে হ্যাঁ, যদি নিজের আর পরিবারের মান-সম্মান বাঁচাতে চান, তবে ওই মানুষটাকে আমার সামনে নিয়ে আসুন যে নিতুকে পালাতে সাহায্য করেছে। আমার অপমান আমি তার রক্ত বা চোখের জল দিয়ে উসুল করব।”

​ফারুক আরহামের শরীর কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ঠিক তখনই কিচেন রুমের পর্দা সরিয়ে কাঁপাকাঁপা পায়ে বেরিয়ে এল গোধূলি। তার পরনে সেই সাদা জামদানি, মাথাটা নিচু করে আছে সে। ভয়ের চোটে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
​গোধূলি ফারুক আরহামের সামনে এসে দাঁড়াল। মিথন নওশাদ তার শিকারি দৃষ্টি গোধূলির ওপর স্থির করল।

গোধূলি মাথা নিচু করেই খুব অস্ফুট এবং কান্নাকাটি মাখা স্বরে ফারুক আরহামকে উদ্দেশ্য করে বলল—

​”ভাইয়া… আপনি এই ঘরটা জ্বালিয়ে দিতে দেবেন না। বাড়ির সবাইকে মরতে দেবেন না। নিতু… নিতুকে আমিই জানালা খুলে দিয়েছি। ও এই বিয়েটা করতে চায়নি, তাই আমি ওকে পালাতে সাহায্য করেছি। যা শাস্তি দেওয়ার আপনি আমাকে দিন, কিন্তু এই মানুষকে শান্ত হতে বলুন।”

​গোধূলির কথাগুলো শেষ হতে না হতেই মিথন নওশাদের মুখে একটা পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে গোধূলির দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। ড্রয়িংরুমের প্রতিটি মানুষ তখন আতঙ্কে পাথর হয়ে গেছে।

গোধূলির স্বীকারোক্তি ড্রয়িংরুমে যেন একটা বোমা ফাটাল। ফারুক আরহাম স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন তার ছোট ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর দিকে। যাকে তিনি মেয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন, সেই গোধূলিই আজ তার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে!

​ফারুক সাহেবের স্তব্ধতা ভেঙে চিৎকার করে উঠলেন তার স্ত্রী শিরিন। তিনি গোধূলির দিকে ধেয়ে এসে ঘৃণাভরা কণ্ঠে বললেন—

​”তোর লজ্জা করল না রে গোধূলি? বিয়ের ছয় মাসের মাথায় নিজের স্বামীটাকে তো খেয়েছিস, তারপর থেকে আমাদের সংসারে পড়ে আছিস। আমার মেয়েটাকে পালাতে সাহায্য করতে তোর একবারও বুক কাঁপল না? তুই তো মানুষ নোস, তুই একটা আপদ!”

​শিরিনের কথাগুলো তীরের মতো গোধূলির বুকে বিঁধছিল। সে মাথা নিচু করে কেবল চোখের জল ফেলছিল। কিন্তু মিথন নওশাদ এসব ‘ফ্যামিলি ড্রামা’ পছন্দ করার মানুষ নয়। সে তার হাতের লাইটারটা অফ করে পকেটে ভরল।

তারপর শীতল চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল—

​”আপনাদের এই কান্নাকাটি আর ঝগড়া দেখার জন্য আমি এখানে আসিনি। আমার সময় খুব দামী। আরহাম সাহেব, আপনাদের জীবন আর সম্মান যদি বাঁচাতে চান, তবে এই মেয়েটা আপনার কে হয় বা কী করেছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। শর্ত অনুযায়ী ওকে আমার হাতে তুলে দিন, ব্যাস।”

​এরপর মিথন কয়েক পা এগিয়ে এসে গোধূলির খুব কাছে দাঁড়াল। গোধূলির সেই ধবধবে সাদা জামদানির শুভ্রতা যেন মিথনের চোখের আগুনকে আরও উসকে দিল।

মিথন বাঁকা হেসে গোধূলিকে উদ্দেশ্য করে বলল—

​”নিজের এক্স হাজবেন্ডের জন্য আর দেবদাস সেজে থেকো না বাঙালি ম্যাম। অতীত আঁকড়ে ধরে থেকে লাভ নেই। বরং বর্তমানে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাবো, তোমার ভবিষ্যতে আমি আর কী কী ঝড় নিয়ে আসব।

​ফারুক আরহাম তখন দিশেহারা। একদিকে মৃত ভাইয়ের স্মৃতি, অন্যদিকে জ্যান্ত পরিবারের সম্মান আর মিথনের হুমকি। নিজের সম্মান বাঁচাতে তিনি শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিলেন। তিনি গোধূলিকে মিথনের হাতে তুলে দিলেন।
​আরহাম বাড়ির সেই সাজানো ছাদনাতলায়, যেখানে নিতুর বসার কথা ছিল, সেখানে এসে বসল সাদা শাড়ি পরা গোধূলি। কাজী সাহেবের খুধবা সম্পন্ন হলো এক অদ্ভুত বিয়ে। জেহেরের বিধবা স্ত্রী গোধূলি ইসলাম লিরা আজ থেকে সুপারস্টার মিথন নওশাদের স্ত্রী।

​বিদায় বেলায় গোধূলির মাথার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো সেই লাল দুপাট্টা। সাদা শাড়ির ওপর সেই লাল রঙটা যেন গোধূলির জীবনে এক রক্তক্ষয়ী নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল

★★★★
বিশাল অট্টালিকার সদর দরজায় গাড়িটা থামতেই মিথন গটগট করে নেমে পড়ল। গোধূলির জন্য অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজনই সে বোধ করল না। গোধূলি নিজে নিজেই গাড়ি থেকে নামল। তার হাতে কোনো ব্যাগ নেই, কোনো গয়না নেই—শুধু সেই ধবধবে সাদা জামদানির ওপর আলুথালু হয়ে থাকা লাল দুপাট্টাটা।

​ভেতরে প্রবেশ করতেই গোধূলির চোখ ছানাবড়া। চারদিকে দামি সব আসবাবপত্র, বড় বড় ঝাড়বাতি আর দেয়ালে মিথনের পেল্লায় সব পোস্টার। ঠিক যেন কোনো সিনেমার সেট। মিথন ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোটটা খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলে দিল।

তারপর ঘুরে গোধূলির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল—

​”শুনে রাখো, এটা আমার ব্যক্তিগত জায়গা। এখানে কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো স্ক্রিপ্ট নেই। তাই তোমার ওই উপন্যাসের ঢং এখানে না দেখালেই ভালো। ওপরে গিয়ে হাতের বাঁ দিকের শেষ ঘরটা তোমার। কাল সকাল থেকে এই বাড়িতে কী কী নিয়ম চলবে, সেটা আমি ঠিক করে দেব।”

​গোধূলি ম্লান হেসে তার শান্ত স্বরে বলল—

​”জানেন বিদেশি বাবু , আপনার এই দাম্ভিকতা দেখে আমার ‘অচেনা রাজপুত্র’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই রাজপুত্রও ভাবত তার হুকুমেই পৃথিবী চলে। কিন্তু একদিন একটা সাধারণ মেয়ে এসে তার সব অহংকার ভেঙে দিয়েছিল।”

​মিথন এবার রেগে গোধূলির খুব কাছে এগিয়ে এল। গোধূলির নিশ্বাস আটকে এল, মিথনের গায়ের কড়া পারফিউমের গন্ধ তার নাকে লাগছে।

মিথন নিচু স্বরে ধমকে উঠল—

​”আবার উপন্যাস? তোমার কি মাথা খারাপ, নাকি তুমি ইচ্ছা করে আমাকে বিরক্ত করছ?”

​গোধূলি এক পা-ও পেছাল না। সে বরং তার সেই অদ্ভুত লিপ্ত চোখে মিথনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—

​”বিরক্ত করছি না তো, আমি তো শুধু আপনাকে আপনার ভবিষ্যতের কথা বলছি। আপনি সুপারস্টার হতে পারেন, কিন্তু এই মুহূর্তে আপনি একজন হারানো পথিকের মতো রেগে আছেন। আর আমি? আমি হলাম সেই চরিত্র, যে এই গল্পের শেষটা বদলানোর জন্য এখানে এসেছে।”

​মিথন রাগে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। এই মেয়েটার চোখের দিকে তাকালে কেমন একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করে, যা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।

সে গোধূলিকে একরকম তাচ্ছিল্য করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বলল—

​”পাগলের প্রলাপ! কাল সকালে দেখা হবে।”

​গোধূলি দাঁড়িয়ে রইল সেই জনমানবহীন বিশাল হলঘরে। সে জানে, এই বাড়িটা যতটা বড়, এখান থেকে পালানো তার চেয়েও কঠিন।

সে ধীরে ধীরে ওপরের ঘরের দিকে পা বাড়াল। মনে মনে জেহেরকে উদ্দেশ্য করে বলল—

​”জেহের, আজ থেকে আমার উপন্যাসের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হলো। তুমি কি ওপর থেকে দেখতে পাচ্ছ? এই লাল দুপাট্টাটা হয়তো আমার গলায় ফাঁসি হয়ে ঝুলছে, কিন্তু আমি এই ফাঁসিতেই তোমার দেওয়া সেই সাদা শাড়ির মান রাখব।”
★★★★★

গোধূলি তার কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরলেও মনটা যেন এখনও কোনো এক রহস্যের জালে আটকে আছে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রাতের নিস্তব্ধতা অনুভব করার সময় হঠাৎ তার কানে এল এক ক্ষীণ আর্তনাদ। কোনো এক নবজাতকের কান্নার শব্দ, যা বাতাসের সাথে ভেসে আসছে।

​গোধূলি দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগোতেই দেখল মিথন নিজের রুমের দিকে আসছে। মিথনকে দেখেই

গোধূলি অস্থির হয়ে বলে উঠল,

“বিদেশী বাবু! আমার মনে হচ্ছে দূরে কোথাও কোনো একটা বাচ্চা কান্না করছে। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?”

​মিথন ক্লান্ত ছিল, গোধূলির এমন অদ্ভুত কথা শুনে সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

“বাঙালি ম্যাম, আপনি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন? এই মাঝরাতে, এই নির্জন এলাকায় বাচ্চা আসবে কোত্থেকে? আপনার মাথায় ওই উপন্যাসের ভূতগুলো আবার চড়ে বসেছে।”

​গোধূলি নাছোড়বান্দা। সে মিথনের হাত ধরে একরকম টেনে জানালার দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

“বিদেশী বাবু, আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন! আমি স্পষ্ট শুনেছি। কোনো একটা ছোট শিশু খুব অসহায়ভাবে কাঁদছে। আমি বানিয়ে বলছি না!”

​মিথন গোধূলির জেদ দেখে বিরক্তি নিয়ে বলল, “

ঠিক আছে, দেখি আপনার বাচ্চার কান্না কোথায়। দেখাতে পারবে?”

​গোধূলি কোনো কথা না বাড়িয়ে মিথনকে জানালার একদম কাছে নিয়ে গেল। বাইরের বাগান আর গাছপালার ছায়া ঘেরা অন্ধকারটা তখন রহস্যময় দেখাচ্ছিল। মিথন প্রথমে বিরক্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকালেও, কয়েক সেকেন্ড পার হতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। তার সেই তীক্ষ্ণ চাইনিজ চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল।

​বাতাসে ভেসে আসছে এক অস্পষ্ট কিন্তু হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার মতো কান্নার সুর। কোনো এক নবজাতক যেন তার সর্বশক্তি দিয়ে কাউকে ডাকছে। মিথন এবার সত্যিই হতভম্ব হয়ে গেল। এই জনমানবহীন প্রাসাদের আশপাশে এই অসময়ে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসাটা যেমন অসম্ভব, তেমনি ভয়ংকর।

​মিথন বিড়বিড় করে বলল,

“এটা তো সত্যি… সত্যিই তো একটা বাচ্চা কাঁদছে! কিন্তু এখানে কীভাবে সম্ভব?”

গোধূলির চোখে তখন গভীর উদ্বেগ। সে মিথনের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,

“আমাদের মনে হয় গিয়ে দেখা উচিত। বাচ্চাটা হয়তো খুব বিপদে আছে।”

​মিথন সাধারণত এসব ঝামেলায় জড়ানোর মানুষ নয়, কিন্তু বাচ্চার সেই করুণ আর্তনাদ তার পাথুরে মনেও যেন একটা মোচড় দিল। সে গোধূলির কথায় একমত হয়ে মাথা নাড়াল। গোধূলি ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিজের মাথার সেই ভারী লাল ওড়নাটা খুলে আলগোছে বিছানায় রেখে দিল—যেন এই মুহূর্তে সে কোনো মিথ্যে সম্পর্কের স্ত্রী নয়, বরং একজন মমতাময়ী নারী।

​মিথন বড় একটা টর্চলাইট হাতে নিল। দুইজনে মিলে প্রাসাদের বাইরে পা রাখল। রাতের আঁধারে টর্চের আলোটা বনের ঝোপঝাড় আর মেঠোপথ চিরে এগিয়ে চলল। প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর তারা একটা পরিত্যক্ত ময়লার স্তূপের কাছে এসে থামল। উৎকট দুর্গন্ধে চারপাশটা ভারী হয়ে আছে।
​মিথন নাকে রুমাল চাপা দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার সেই সুপারস্টার সুলভ আভিজাত্য তাকে এই নোংরার কাছে ঘেঁষতে বাধা দিচ্ছিল।

মিথন মুখ কুঁচকে বলল

​”আমি জীবনেও এই ময়লা আর দুর্গন্ধের ভেতরে ঢুকব না। , চলো এখান থেকে! অন্য কাউকে খবর দেই।”

​কিন্তু গোধূলি থামল না। সে টর্চটা মিথনের হাত থেকে নিয়ে ময়লার স্তূপের একদম কিনারে চলে গেল। দুর্গন্ধ তার নাকেও লাগছে, কিন্তু বাচ্চার কান্নার আওয়াজটা এখন অনেক বেশি স্পষ্ট। সে আলো ফেলতেই দেখল, একটা পুরনো কাগজের কার্টুন নড়াচড়া করছে।

​গোধূলি দ্রুত হাত বাড়িয়ে কার্টুনটা টেনে বের করে আনল। ভেতরে যা দেখল, তাতে তার আর মিথনের কলিজা যেন কেঁপে উঠল।
​কার্টুনের ভেতরে নীল হয়ে যাওয়া শরীরে এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে শুয়ে আছে একটা ফুটফুটে নবজাতক মেয়ে। দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স বড়জোর দুই দিন। ক্ষুধার জ্বালায় আর ঠান্ডায় বাচ্চাটা মরণপণ চিৎকার করছে। এই আবর্জনার স্তূপে কে যেন এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়ে গেছে।

​মিথন এবার ঘৃণা আর আভিজাত্য ভুলে সামনে এগিয়ে এল। টর্চের আলোতে বাচ্চার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে তার বুকটা হু হু করে উঠল।

মিথন নিচু স্বরে বলল—

​”মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কী করে হয় গোধূলি? এইটুকু একটা প্রাণকে এই নরকে ফেলে দিল?”

​গোধূলি পরম মমতায় বাচ্চাটাকে কার্টুন থেকে কোলে তুলে নিল। তার সেই সাদা জামদানি ময়লায় মাখামাখি হয়ে গেল, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

সে বাচ্চাটাকে নিজের বুকের কাছে আগলে ধরে বলল—

​”জেহেরের মৃত্যুর পর আমার পৃথিবীটা যেমন শূন্য হয়ে গিয়েছিল, এই বাচ্চাটার পৃথিবীটাও আজ ঠিক তেমনই শূন্য। কিন্তু আমি ওকে মরতে দেব না বিদেশি বাবু ।”

বাচ্চাটার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল, তাই দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নিলে তাকে বাঁচানো কঠিন। মিথন কালবিলম্ব না করে বাচ্চাটাকে নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটল। গোধূলি দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে নিল। এরপর মিথন তার ব্ল্যাক মার্সিডিজ বের করল। গোধূলির কোলে সযত্নে শুয়ে আছে সেই কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতক।

​গন্তব্য—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

★★★★

​রাত গভীর হওয়ায় রাস্তা ছিল ফাঁকা। মিথন যেন আজ রাস্তায় গাড়ি নয়, এক টুকরো প্রাণ বাঁচাতে গতির ঝড় তুলল। ঠিক ত্রিশ মিনিটের মাথায় তারা হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটে এসে পৌঁছাল।

​গাড়ি থেকে নামতেই স্ট্রেচার আর নার্সদের ভিড়। ডাক্তাররা যখন দেখলেন একজোড়া যুবক-যুবতী মাঝরাতে একটা অপরিচ্ছন্ন বাচ্চা নিয়ে এসেছে, তারা রেগে অস্থির হয়ে উঠলেন।

এক ইন্টার্ন ডাক্তার চেঁচিয়ে বলে উঠলেন—

​”আপনারা কি কাণ্ডজ্ঞানহীন? বাচ্চার এই অবস্থা কেন? এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলেন আপনারা? নিজেদের বাচ্চার খেয়াল রাখতে পারেন না?”

​গোধূলি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মিথন তার চোখের সানগ্লাসটা খুলে ফেলল। করিডোরের কড়া আলোয় মিথনের সেই তীক্ষ্ণ চাইনিজ চেহারাটা পরিষ্কার হয়ে উঠল। মুহূর্তে চারপাশের হট্টগোল থেমে গেল। উপস্থিত ডাক্তার, নার্স আর ওয়ার্ড বয়রা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। ইন্টার্ন ডাক্তারটির হাত থেকে ক্লিপবোর্ডটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

​সবার মুখে তখন একটাই ফিসফিসানি—

“আরে, এ তো কাং হুয়ান!”

​হ্যাঁ, মিডিয়া জগত আর সাধারণ মানুষের কাছে মিথন নওশাদ তার চাইনিজ নাম ‘কাং হুয়ান’ হিসেবেই পরিচিত। এশিয়ার অন্যতম হার্টথ্রব আর বিখ্যাত অভিনেতা আজ এই সরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে দাঁড়িয়ে!

​মিথন অত্যন্ত গম্ভীর এবং শান্ত স্বরে বলল—

​”এই বাচ্চাটা আমাদের নয়, আমরা একে রাস্তার ধারের ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি। ওর অবস্থা খুব খারাপ। দয়া করে চিৎকার না করে আগে ওর ট্রিটমেন্ট শুরু করুন। আমি কাং হুয়ান হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে আপনাদের অনুরোধ করছি।”

​মিথনের কথা শেষ হতে না হতেই ডাক্তারদের মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়ে গেল। সিনিয়র ডাক্তাররা ছুটে এলেন। মুহূর্তের মধ্যে বাচ্চাটাকে এনআইসিইউ (NICU)-তে নেওয়া হলো। হাসপাতালের সেই ব্যস্ত করিডোরে গোধূলি আর মিথন একা দাঁড়িয়ে রইল।
​গোধূলি দেখল, মিথনের চোখে এখন আর সেই আভিজাত্যের দম্ভ নেই, বরং আছে এক অজানা উৎকণ্ঠা।

সে মিথনের খুব কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল—

​”দেখলেন তো বিদেশী বাবু, পর্দার কাং হুয়ান আজ বাস্তবের নায়ক হয়ে গেলেন। উপন্যাসে এমন দৃশ্যকে বলে ‘হৃদয় পরিবর্তন’।”
​মিথন এবার আর রাগ করল না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলল—
​”চুপ করো বাঙালি ম্যাম। এখন প্রার্থনা করো যেন বাচ্চাটা বেঁচে ফেরে।”

গোধূলি মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“চুপ করব মানে? আপনি নিজেকে কী ভাবেন শুনি? আপনি কোন ক্ষেতের মূলা? আপনি যদি উপন্যাসের সেই আবির ভাই কিংবা রিদ খান হতেন, তবে না হয় একটু চুপ থাকতাম। তাদের একেকটা চাউনিতে তো মেয়েরা কুপোকাত হয়ে যায়, আর আপনি?”

​মিথন বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে বলল,

“বাঙালি ম্যাম, দয়া করে আপনার ওই ফালতু উপন্যাস থেকে বেরিয়ে আসুন। এটা বাস্তব জীবন, কোনো শুটিং সেট নয়।”

গোধূলি ভেঙচি কেটে জবাব দিল

​”এ্যাহহহহ… আপনি বললেই হলো? আপনার চাইতেও তো হাজার গুণ ভালো আমার প্রিয় চরিত্র মাইরার শুদ্ধ ভাই! আপনার মতো এমন খিটখিটে তো উনি নন,”

​মিথন এবার ফেটে পড়ল। সে গোধূলির দিকে এক পা এগিয়ে এসে বলল,

“একদম ফালতু কথা বলবে না বাঙালি ম্যাম। আপনাকে দেখতে এমনিতে পুরা শাকচুন্নির মতো লাগে, তার ওপর আবার এইসব আবোল-তাবোল কথা!”

​’শাকচুন্নি’ শব্দটা শোনা মাত্রই গোধূলির মেজাজ সপ্তম আকাশে চড়ে গেল। মিথন কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোধূলি ঝাঁপিয়ে পড়ে মিথনের সিল্কি চুলে হাত চালিয়ে দিল।

সে জুতমতো মিথনের একগুচ্ছ চুল ধরে টান দিতেই মিথন যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল:-

​”আরে ছাড়ো! কী করছ কী? পাগল নাকি আপনি?” মিথন চিৎকার করলেও গোধূলি ছাড়ার পাত্রী নয়।

সে জেদ ধরে টেনে ধরে রইল। মিথনও রাগে আর থাকতে না পেরে গোধূলির অবিন্যস্ত চুল টেনে ধরল। দুইজন তখন করিডোরে একে অপরের চুল ধরে টানাটানি করছে, যেন দুই জনম শত্রু!

​ঠিক সেই মুহূর্তে ডাক্তার এনআইসিইউ থেকে বেরিয়ে এলেন। তাদের এই কাণ্ড দেখে তিনি তো থ!

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি গম্ভীর স্বরে ধমক দিলেন—

​”থামুন! থামুন আপনারা! এসব কী হচ্ছে? আমি ভেতরে বাচ্চাটার অবস্থা নিয়ে চিন্তিত, আর বাইরে আপনারা এই অবস্থায়? আমি তো ভেবেছিলাম বাচ্চাটাকে সুস্থ করে আপনাদের জিম্মায় দেব। কিন্তু আপনারা যেভাবে মারামারি করছেন, তাতে তো মনে হচ্ছে আপনারা দুই ভাই-বোন ঝগড়া করছেন! আপনাদের কি একটুও কাণ্ডজ্ঞান নেই?”

​ডাক্তারের কথায় গোধূলি চট করে মিথনের চুল ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে লাল হয়ে গেছে। মিথনও নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে একটা বিজয়ীর হাসি দিল।

তারপর ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে সাবলীলভাবে বলল:

​”না ডাক্তার সাহেব, ও আমার বোন নয়। ও আমার ওয়াইফ।”


চলবে …….

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments