গল্প: মাই বিলাভড সানফ্লাওয়ার (০৪)

 

লেখা – আসফিয়া রহমান
পর্ব :০৪

——————————


পরদিন সকাল ৭:৩০।

সাতটার দিকে এসে বিনীতারা কালকের রিপোর্ট কালেক্ট

করেছে। বিনীতা এখন ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছে রিপোর্ট

দেখাতে। রূপন্তি একটু চিন্তিত মন নিয়ে পাশের বসার

জায়গায় বসে কখনো আবার উঠে দাঁড়িয়ে আশপাশটা ঘুরে

দেখছিল। হাসপাতালের করিডোরে বেশ ভীড়, রোগী এবং

তাদের স্বজনদের পদচারণায় সোরগোল তৈরি হয়েছে। “>সবগুলো পর্বর লিঙ্ক 

ঠিক তখনই ওর সামনে এসে দাঁড়াল সাফিন।

“আরে মিস রূপন্তি, আপনি এখানে?” সাফিন অবাক হয়ে বলল।

রূপন্তিও খানিকটা অবাক, সৌজন্যতামূলক হেসে বলল,

“হ্যাঁ, বিনীতা ডাক্তার দেখাতে এসেছে। ওর সাথে এসেছিলাম।”

“কি হয়েছে ওনার?” সাফিন জিজ্ঞেস করল।

“এই তো, কালকে শ্বাসকষ্ট হয়েছিল…” রূপন্তির চোখে

দৃশ্যমান চিন্তার রেখা।

“এখন কেমন আছে?” সাফিন কন্ঠে খানিকটা উদ্বেগ দেখা গেল।

“ঠিক আছে, এখন। তবে ডাক্তার আরও কিছু পরীক্ষা করতে

বলেছিল- আজকে সে রিপোর্টগুলোই দেখাতে এসেছিলাম।”

রূপন্তি বলল।

“কোন বিভাগে দেখিয়েছেন?” সাফিন জিজ্ঞেস করল।

“প্রাথমিক পর্যায়ে তো… মেডিসিন বিভাগেই দেখিয়েছি।”

রূপন্তি বলল, তারপর একটু থেমে যেন কিছু ভাবতে ভাবতে

বলল, “তবে ডক্টর বলেছে আশা করা যায় কোনো বড় সমস্যা

হবে না।”

“অর্ণব তো মেডিসিন বিভাগে আছে, ওর সাথে দেখা হয়েছে?”

সাফিনের খেয়াল হলো হঠাৎ।

“হ্যাঁ, উনিই বিনীতার চেকআপ করেছেন,” রূপন্তি এক পলক

তাকাল সাফিনের দিকে।

সাফিন এবার মাথা নাড়লো, “আচ্ছা, বিনীতা এখন

কোথায়?”

“ও ইসিজির রিপোর্ট দেখাতে ভেতরে গেছে।” রূপন্তি বলল।

“ওহ্। তো চলুন, আমরা ক্যান্টিনে বসি? আমার ওয়ার্ড শুরু

হতে দেরি আছে। সকালে খেয়ে এসেছেন?” সাফিন জিজ্ঞেস

করল।

“না, আসলে সকালে তাড়াহুড়ো করে বের হয়েছিলাম, খাওয়া

হয়নি।” রূপন্তি বলল।

“আমিও খেয়ে আসিনি…” সাফিন বলল, “চলুন, যাওয়া

যাক। খাওয়া দরকার।”

“বিনীতা বের হোক, একসাথে যাই?” রূপন্তি বলল।

“আচ্ছা, বিনীতা বের হতে হতে আমরা গিয়ে বসি, ওকে ফোন

করে ডেকে নেব?” সাফিন বলল এবার।

“ঠিক আছে, চলুন।” রূপন্তি বলল অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে।

ক্যান্টিনে গিয়ে ওরা কর্নারের দিকে একটা টেবিলে বসলো।

 রূপন্তিকে বসিয়ে রেখে সাফিন উঠে গেল কাউন্টারের দিকে।

যেতে যেতে ফোন দিল অর্ণবের নাম্বারে।

— অর্ণব, তুই কি ভিতরে?

— হ্যাঁ, আমি তো আফাজ স্যারের সাথে। কেন, কি হয়েছে?”

— কিছু না, এমনি। বাইরে আসতে পারবি? ক্যান্টিনে?

— দাঁড়া, দেখছি।

— আর শোন, মিস বিনীতা কি ভেতরে আছে? সাফিন আবার

প্রশ্ন করল।

— হ্যাঁ, উনি রিপোর্ট দেখাতে এসেছে স্যারের কাছে। 

— কতক্ষণ লাগবে?

— এই তো, কিছুক্ষণ। অর্ণব বলল।

— আচ্ছা, তাহলে যখন বের হবে, ওনাকে সাথে নিয়ে ক্যান্টিনে আয়।

— তুই কি ক্যান্টিনে?

— হ্যাঁ, সাথে রূপন্তিও আছে।” 

— ওরে বাবা! প্রপোজ করে ফেলেছিল নাকি?” 

— এখনো করি নাই…” সাফিন মাথা চুলকে বললো।

— করে ফেল, করে ফেল। সুযোগ হারাস না! 

ফোন রাখতেই অর্ণব দেখলো বিনীতার রিপোর্ট দেখানো হয়ে গেছে।

ড. আফাজ আহমেদের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে, অর্ণব

বিনীতার সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলো।

“কি ব্যাপার, আপনি বাইরে এলেন যে?” বিনীতা অবাক হয়ে

প্রশ্ন করল।

“আপনার সাথে হাঁটতে এলাম!” অর্ণব কৌতুকের সুরে

বললো।

বিনীতার চোখে কিছুটা বিভ্রান্তি, কিছুটা অবাক ভাব। ও যেন

বুঝে উঠতে পারছে না অর্ণবের কথার মানে।

অর্ণব ওর চোখের বিভ্রান্ত চাউনি প্রত্যক্ষ করে আরেকটু

ভড়কে দেয়ার জন্য বলল, “আপনার পাশে কিছুটা পথ হাঁটতে

পারি না?”

বিনীতা এবার আরও অবাক হয়ে এক পলক দেখল ওকে,

“মানে?” একটা শব্দ, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন পুরো মহাবিশ্বের

প্রশ্ন ওর একটা কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে!

অর্ণব কিছু বলল না। আর বিনীতাও বুঝলো না কিছুই। শুধু

দেখল হাঁটতে হাঁটতে ওরা ক্যান্টিনের সামনে চলে এসেছে।

ভেতরে ঢুকে বিনীতা দেখল রূপন্তি বসে, সাফিনের সাথে।

অর্ণবের মাথা-মুন্ডু ছাড়া কথা শুনতে শুনতে ও ভুলেই বসেছিল

রূপন্তির কথা! রূপন্তি আবার এখানে সাফিনের সাথে কী করছে?

ওরাও গিয়ে বসল সাফিনদের টেবিলে। খাবার অর্ডার দিয়ে

টুকটাক কথা হলো চারজনের। এর মাঝে বিনীতা খেয়াল

করল, রূপন্তির দিকে তাকিয়ে সাফিন চোখে চোখে যেন কিছু

একটা ইঙ্গিত করছে। 

ব্যাপার কি? 


আজকে কি বিনীতার সবকিছু মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার

দিন? 

বিনীতা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল।

ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে রূপন্তি এবং বিনীতা বিদায় নিয়ে

হাসপাতাল থেকে চলে গেল। 

আগামী সাত দিন ওদের শীতকালীন ছুটি। আর এই সুযোগে

রূপন্তি এবং বিনীতা সিদ্ধান্ত নিল দুজনেই বাসায় যাবে। তাই

হালকা পাতলা কিছু কেনাকাটা করতে ঢুকলো পাশের একটা

শপিং কমপ্লেক্সে।<>
__________________________

বিনীতার মা রাহনুমা বেগম আজ সকাল থেকেই মেয়ের

পছন্দের খাবার রান্না করছেন। কতদিন পর মেয়ে বাড়িতে

আসছে। বিনীতার বাবা ফারুক রহমান ও অপেক্ষা করছেন

মেয়ের বাড়ি আসার। তাদের একমাত্র মেয়ে বিনীতা। হলে

থেকে পড়াশোনা করার কারণে বাড়িতে থাকাই হয় না। বিভিন্ন

ছুটিতে বাড়ি আসলেও বেশিদিন থাকতে পারে না। একমাত্র

মেয়ে হওয়ায় বিনীতা আদরটাও বেশি। মা-বাবা দুজনেই

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন মেয়ের বাড়ি ফেরার। বেল

বাজতেই রান্নাঘর থেকে রাহনুমা বেগমের গলা শোনা গেল,

“দরজাটা খোলো তো। দেখো, বিনু মনে হয় এসে পড়েছে।”

ফারুক সাহেব সোফা থেকে উঠে দরজা খুললেন। প্রায় তিন

মাস পর দেখছেন মেয়েকে। বিনীতাও এতদিন পর বাবাকে

দেখে ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরল।

“কেমন আছো, আব্বু?” 

ফারুক সাহেবও অনেক দিন পর মেয়েকে কাছে পেয়ে

আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। 

“আমি ভালো আছি, মা, তুমি কেমন আছো?”

“আমিও ভালো আছি আব্বু। আম্মু কোথায়?”

এতক্ষণে রাহনুমা বেগমও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। 

“আম্মু..!!” বিনীতা ছুটে গিয়ে মায়ের গলা আঁকড়ে ধরল।

কুশলাদি বিনিময় শেষে, রাহনুমা বেগম বিনীতাকে ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হতে বললেন। 

“এতদিন পর বাড়ি ফিরলে, গোসল করে একটু রেস্ট করো।”

বিনীতা মায়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে দোতলায় চলে গেল।

নিজের ঘরে পা রেখেই অনুভব করল— কতদিন পর এলো এই

ঘরটায়! প্রতিবারই যখন আসে, মনে হয় ঘরটা এতদিন ওরই

ফেরার অপেক্ষা করছিল।

_________________________________

আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। বিনীতার বাবা ফারুক সাহেব

আজ বাসায় আছেন। বিনীতার মা রাহনুমা মা বেগমের এক

পুরোনো বান্ধবীর বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার কথা

বিনীতাদের। বিনীতা আর রাহনুমা বেগম রেডি হয়ে গাড়িতে

অপেক্ষা করছেন বিনীতার বাবার জন্য, তিনি গাড়ির চাবি ভেতরে ফেলে এসেছেন।

রাহনুমা বেগমের তাড়াহুড়ায় বিনীতারা সকাল-সকালই

বেরিয়ে পড়েছে। পুরোনো বান্ধবী, কতদিন পর দেখা, কত

গল্প, কত কথা জমে আছে, তাই বান্ধবীর সাথে দেখা করার

তর সইতে না পেরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছেন।


গাড়িতে বসে রাহনুমা বেগম ফোন দিলেন বান্ধবীর নাম্বারে, 

— কিরে রাহনুমা, তোরা কতদূর?

— এইতো রওনা দিয়েছি, আসছি।

— বিনীতা আসছে না সাথে?

— হ্যাঁ হ্যাঁ, বিনুও আছে।

— আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আয়। রাখছি।

ফোন রাখতেই ফারুক সাহেব ফোঁরন কাটলেন,

“বিনু দেখ, তোর মা বান্ধবীর সাথে দেখা করার জন্য কেমন উতলা হয়ে আছে।”

রাহনুমা বেগমও উত্তর দিলেন,

“উতলা হব না! কতদিন পর দেখা হচ্ছে বলতো! তোমরা তো

বন্ধুরা নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করো। আমাদের মেয়েদেরইতো

বান্ধবীদের সাথে দীর্ঘদিন যোগাযোগ থাকে না।”

“না না, তা তো ঠিকই। আমি তো মজা করছি।”

বিনীতা এখানে নিরব দর্শক। ও শুধু দেখছে আর হাসছে,

আম্মু-আব্বু এখনো কতটা প্রাণবন্ত!

_____________________

“কিরে সাফিন তোদের প্রেম কেমন চলছে?” অর্ণবের গলায় কৌতুক।

দুঃখী দুঃখী মুখ বানিয়ে সাফিন বলল,


“আর প্রেম! প্রেম শুরু হতে না হতেই প্রেমিকা বাড়ি গিয়ে বসে

আছে! দেখা সাক্ষাৎ নেই, কেমন আর চলবে!!” 

সাফিনের দুঃখী মুখ দেখে কোনোমতে হাসি চেপে অর্ণব

বলল, “আহারে বেচারা প্রেমিক সাফিন!” 

“প্রেমের আর তুই কি বুঝবি! জীবনে তো কোন মেয়েকে ভালো করে দেখলিই না।”

“দেখার দরকার নাই। এভাবেই ঠিক আছি।” 
অর্ণবের গম্ভীর স্বর।

“তোর যে কি হবে!!” সাফিনের গলায় হতাশা।

________________________

ঢাকা শহরের বিখ্যাত জ্যামের কবলে পড়ে বিনীতারা যখন

আসমা আন্টির বাসায় পৌঁছালো, তখন প্রায় দ্বিপ্রহর। গেটের

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চিকন, লম্বা ছেলেটা সম্ভবত ওদের

জন্যই অপেক্ষা করছিল। বিনীতা একটু অবাক হয়ে ছেলেটার

দিকে তাকাল। মুখটা চেনা মনে হচ্ছে না, তবে হয়তো আসমা

আন্টির ছেলে হবে। ছোটবেলায় একবার দেখা হয়েছিল

আসমা আন্টির সাথে, বিনীতা তখন সম্ভবত ক্লাস ফোর-

ফাইভে পড়ে। 



আসমা আন্টির দুই ছেলে। এই লম্বা ছেলেটা হয়তো আন্টিরই

ছেলে হবে। তবে এতদিন পর বিনীতা চিনতে পারছে না।

আসমা আন্টিরা এতদিন নরসিংদী থাকতেন। দুই-তিন মাস

হলো ঢাকা শিফট করেছেন। তাই ওদের দুই পরিবারের

যোগাযোগ থাকলেও যাওয়া আসা হতো না তেমন।



ওরা ড্রয়িংরুমে এসে বসতেই আসমা আন্টি আর রাহনুমা

বেগম একে অপরকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন।

পুরোনো দিনের গল্প শুরু হয়ে গেল সাথে সাথে। এদিকে

ফারুক সাহেব আর আশরাফ সাহেবও নিজেদের মধ্যে গল্পে

মেতে উঠলেন।



আসমা আন্টি পরিচয় করিয়ে দিলেন তার ছোট ছেলে

ফাহিমের সাথে, যে ওদের গেট থেকে রিসিভ করেছিল।

“এই যে রাহনুমা, আমার ছোট ছেলে ফাহিম। এবার

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। আর ফাহাদ তো এখন ঢাকা

মেডিকেলে ইন্টার্ন করছে।”

“হ্যাঁ, ফাহাদ-ফাহিম দুজনকেই ছোটবেলায় দেখেছি, তারপর

কতদিন দেখা হয়নি।”

“আসমা আপা, আপনার দুই ছেলেই তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে!”

ওদের এই কথোপকথনের মাঝে বিনীতা চুপচাপ একপাশে

বসে আছে। ছোটবেলায় এই আন্টির সাথে একবার দেখা

হয়েছিল, কিন্তু এতদিন পর মনে থাকার প্রশ্নই আসে না। 

আসমা বেগম এবার বিনীতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“বিনীতা আম্মু, তোমার কি খবর? কত বড় হয়ে গেছো, সেই

ছোটবেলায় দেখেছিলাম।”

কথাবার্তা শেষ করে রাহনুমা বেগম বান্ধবীর সাথে রান্নাঘরে

গেলেন হাতে হাত লাগিয়ে একটু সাহায্য করতে। ফাহাদের

বাবা আশরাফ সাহেব চলে আসায় বিনীতার বাবা ফারুক

সাহেব তার সাথে গল্প করতে বসে গেছেন। এদিকে বিনীতা

একা একা বসে বোর হচ্ছে।



আসমা বেগমের বড় ছেলে ফাহাদ যে কিনা ঢাকা মেডিকেলে

ইন্টার্ন করছে, সে এখন বাসায় নেই। থাকে মেডিকেল

কলেজের কাছে। বাসায় খুব একটা আসা হয় না ফাহাদের।

বাসায় আছে শুধু আসমা বেগমের ছোট ছেলে ফাহিম।

ফাহাদ-ফাহিম কারো সাথেই বিনীতার সেভাবে পরিচয় নেই,

অনেক আগে দেখা হয়েছিল তাই। বিনীতা একা বসে বোর

হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর, ফাহিম এসে বলল,

“আপু, আপনি ছাদে যাবেন? এখানে বসে বোধহয় বোর হচ্ছেন।”

বিনীতা একটু চমকে তাকাল। ছাদে যাওয়ার প্রস্তাবটা

আকর্ষণীয় মনে হলো ওর কাছে। 


“হ্যাঁ, একটু বোর হচ্ছি। চলো ছাদে যাই।”

ফাহিমদের ছাদটা বেশ বড়। সুন্দর সাজানো বাগান। ছোটবড়

অনেক গাছ, কিছুতে ফুল ফুটেছে, কিছুতে শুধু কচি পাতা।

বাতাসে মৃদু মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে। এক পাশে একটা

দোলনাও ঝুলছে। এক দেখায় বিনীতার পছন্দ হয়ে গেল

ছাদটা।

বিনীতা দোলনায় বসতে বসতে বলল, “ছাদটা তো চমৎকার!

কে সাজিয়েছে?”

ফাহিম গর্বের সাথে বলল, “আম্মুই করেছে সব। তবে

ভাইয়ারও টুকটাক শখ আছে গাছপালার। কিছু গাছ ওর

পছন্দের, বাকিগুলো আম্মুর।”



“তুমি গাছ পছন্দ করো?”

“হুম, কিন্তু যত্ন করি না তেমন, আম্মুই করে। ভাইয়া যখন

বাসায় থাকে আম্মুর সাথে ভাইয়াও যত্ন করে। তুমি গাছ পছন্দ করো?”

বিনীতা হাসল, “অনেক! আমার বারান্দায় অনেক ফুলগাছ

আছে— কাঠগোলাপ, কামিনী, হাসনাহেনা।”



“ওহ! আম্মুরও হাসনাহেনা খুব পছন্দ। রাতে ফুল ফুটলে

দারুণ গন্ধ আসে, তাই না?”

“হ্যাঁ, আমার পছন্দের!”

কথা বলতে বলতেই ফাহিমকে নিচে ডাকছেন আসমা বেগম।

“আপু আপনি এখানে থাকুন। আম্মু ডাকছে, আমি দেখে আসি।”

“ঠিক আছে। আর আমাকে তুমি করে বোলো, আমি তোমার

চেয়ে খুব বেশি বড় না।”

____________________________ 

ফাহিম চলে গেলে বিনীতা দোলনায় বসে বসে ছাদটা দেখতে

লাগলো। ছাদটা একদম নিরিবিলি, চারপাশে ফুল আর

পাতার স্নিগ্ধ ছায়া। হালকা বাতাস দোল খাচ্ছে, মাঝে মাঝে

পাতার ফাঁক গলে রোদ এসে মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। বিনীতা

দোলনার রশিটা ধরে আলতো করে দোল খেতে খেতে

চারপাশটা দেখছিল। 

শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে এই ছোট্ট সবুজের রাজ্যটা

ওর ভালো লেগে গেল। মনে মনে ভাবলো, এমন একটা ছাদ

যদি ওর নিজের থাকতো, তাহলে প্রতিদিন এখানে এসে

বসতো। ওদের বাসার ছাদেও চাইলে এমন করা যায় কিন্তু

বিনীতা তো বাসাতেই থাকে না!

কিছুক্ষণ পর আসমা আন্টি নিজেই ছাদে এলেন।

“কি ব্যাপার, তুমি এখানে বসে আছো? তোমাকে তো নিচে

খুঁজছিলাম!”

“আন্টি, ছাদটা এত সুন্দর! আপনি সাজিয়েছেন?”

“তোমার পছন্দ হয়েছে?” আসমা আন্টি হাসলেন।

“হ্যাঁ, খুব! এত গাছ, এত ফুল, একদম নিরিবিলি আর শান্ত

একটা পরিবেশ!” বিনীতা চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ গলায় বলল।

“দোলনাটা আমার পছন্দে কেনা, কিন্তু বেশিরভাগ গাছ

ফাহাদের লাগানো, আমার পছন্দেরও কিছু আছে,” আসমা আন্টি বললেন।

বিনীতা একটু চুপ করে রইল। ফাহাদ নামের ছেলেটা ওর

কল্পনায় মনে হলো একজন ডাক্তার, যাকে গাছপালা আর প্রকৃতির ছোঁয়ায় পাওয়া যায়!

“চল, নিচে যাই। সবাই খাবার টেবিলে বসেছে, তোমার

আম্মুরা অপেক্ষা করছে।” আসমা আন্টির কথায় ভাবনা কাটল বিনীতার।

“হ্যাঁ, আসছি!” বলে শেষবারের মতো ছাদের চারপাশটা

একবার ভালো করে দেখে নিল বিনীতা। সবুজ পাতার ফাঁক

গলে নরম রোদ এসে দোলনার ওপর পড়ছে, বাতাসে হালকা

দোল খাচ্ছে ফুলের ডালপালা। জায়গাটা এতটাই প্রশান্তিময়

যে যেতে ইচ্ছে করছে না ওর, কিন্তু সবাই নিচে অপেক্ষা করছে।



ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আসমা আন্টির দিকে

তাকিয়ে বলল, “আপনার ছাদটা এত সুন্দর, আন্টি! এখানে

বসে থাকলে একদম সময়ের হিসেবই থাকবে না।”



আসমা বেগম হেসে বললেন, “ভালো লেগেছে তো? তুমি

চাইলে বিকেলে আবার উঠে বসতে পারো, যখন মন চাইবে তখনই এসো।”

বিনীতা হাসল, “ঠিক আছে!”

নিচে এসে বিনীতা দেখলো খাবার টেবিলে সবাই বসে

পড়েছে। টেবিল ভর্তি সুস্বাদু খাবার, বাসায় স্পেশাল অতিথি

এসেছে বলে আয়োজন বেশ ভালোই হয়েছে। বিনীতার মা

রাহনুমা বেগম আসমা আন্টির পাশে বসে গল্প করছেন,

ফাহিম পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল।



“বিনীতা, তুমি কি খাবে? মাছ নাকি মাংস?” আসমা আন্টি

জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি একটু একটু করে দুটোই নেব!” বিনীতা হাসিমুখে বলল।

সবাই খেতে খেতে হাসছিল, গল্প করছিল। খাবার শেষে

রাহনুমা বেগম আর আসমা বেগম আবার গল্পে মেতে

উঠলেন, ফারুক সাহেব আশরাফ সাহেবের সাথে বসে চা

খেতে লাগলেন।



আর বিনীতা? 

খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই একটু রেস্ট করার পর সবাই যখন

গল্পে মশগুল বিনীতা আবার ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল

ছাদে! ছাদের রেলিং ধরে বাইরে তাকিয়ে দেখল বিকেলের

আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। এই বাসার গল্প, এই

মানুষগুলো— সবকিছুই কেমন আপন আপন লাগছে!



To be continued………

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x