গল্প: মাই বিলাভড সানফ্লাওয়ার (১৩)

পর্ব – ১৩

লেখা – আসফিয়া রহমান

অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌

 

কেনাকাটা শেষ করতে করতে বিকেল শেষ হয়ে এসেছে। আরো কিছু টুকিটাকি কেনা বাকি, সেসব অন্য একদিন এসে কেনা যাবে। শপিং মল থেকে বের হতেই ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল গায়ে। আকাশ কালচে মেঘে ঢেকে গেছে, দোকানপাটের ঝলমলে আলোয় অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারপাশে।

আসমা বেগম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বৃষ্টি নামতে পারে। চলো, তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠি।”

রাহনুমা বেগম হাতের ব্যাগগুলো সামলাতে সামলাতে বললেন,
“হঠাৎ এত দমকা বাতাস কেন? এই সময় তো এমন হওয়ার কথা না!”

বিনীতার ওড়না বাতাসে উড়তে লাগল, ও দ্রুত সেটা সামলে নিল। অর্ণব একটু সামনে এগিয়ে ওদের গাড়ির দরজা খুলে দিল।

ভিতরে বসতেই বিনীতা খেয়াল করল লাল জামদানির প্যাকেটটা দোকানেই ফেলে এসেছে। আকাশের যে অবস্থা তাতে এতগুলো শপিং ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করাও মুশকিল। তাই অর্ণব বলল, “আম্মু আর আন্টি তোমরা দুজন ব্যাগগুলো নিয়ে চলে যাও; আমি আর বিনীতা দোকান থেকে শাড়িটা নিয়ে পরে আসছি।”

আসমা বেগম আর রাহনুমা বেগম কেউই রাজি হলেন না। ওনারা কিছুতেই এই ঝড়-ঝাপটার মুখে বিনীতা আর অর্ণবকে ফেলে যেতে রাজি নন।

অর্ণব এবার মৃদু ধমক দিলো মাকে, “বুঝতে চাইছ না কেন আম্মু? এখনই যদি বৃষ্টি শুরু হয় সবগুলো ব্যাগ ভিজে যাবে। তোমাদের বরং সিএনজি ঠিক করে দেই; তোমরা চলে যাও। আমরা পাঁচ-দশ মিনিট পরেই রওনা দিচ্ছি।”

অগত্যা দুজন রাজি হলেন আগে চলে যেতে। অর্ণব ওদেরকে শপিংমলের নিচে দাঁড় করিয়ে একটা সিএনজি নিয়ে এলো। ব্যাগ সমেত দুজনকে তুলে দিলো সিএনজিতে।

সিএনজিতে এতগুলো ব্যাগসহ তিনজনের জায়গা
হবে না— নয়তো বিনীতাকে এই মুহূর্তে, এখানে, ওর সাথে—  রাখার কোন মানেই ছিল না।

অর্ণব সিএনজিতে দুজনকে বসিয়ে, দরজা বন্ধ করেই  ফিরে এল বিনীতার কাছে। ততক্ষণে বাতাস বেশ বাড়তে শুরু করেছে, বাতাসের সাথে ধুলো উড়ছে।

অর্ণব দ্রুত পা বাড়ালো শপিং মলের ভেতরে, “তাড়াতাড়ি আসুন, বাতাস বাড়ছে।”

বিনীতা কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে হাঁটতে শুরু করল অর্ণবের পাশে পাশে। শপিং মলের মধ্যে এখনও অনেক লোক, সবাই অস্থিরভাবে চেষ্টা করছে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার।

দোকান থেকে শাড়ির প্যাকেটটা নিয়ে ওরা আবার শপিং মলের গেটে এসে দাঁড়ালো। বাতাসের তীব্রতা আরও বেড়েছে, ধুলোর চোটে চারপাশ প্রায় সাদা। অর্ণব বড় বড় পা ফেলে গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল; পিছে পিছে বিনীতা। গাড়ির কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ করে বিনীতার ডাকে থেমে গেল অর্ণবের পা জোড়া।

“অর্ণব…! দাঁড়ান একটু!”

অর্ণব সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরে দাঁড়াল।
“কি হয়েছে?”

বিনীতা এক হাতে চোখ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা কুঁচকে রেখেছে।

অর্ণব তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এলো, “চোখে কি হয়েছে? দেখি!

তারপর চারপাশের ধুলো খেয়াল করে বলল, ” আগে গাড়িতে উঠুন।”

গাড়ির দরজা খুলে বিনীতার হাত ধরে বসিয়ে দিল প্যাসেঞ্জার সিটে। বিনীতাকে বসিয়ে দিয়ে এপাশের দরজা লাগিয়ে দ্রুত ঘুরে গিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে।

“দেখি, কি হয়েছে চোখে?” অর্ণবের গলাটা কেমন অস্থির শোনালো।

বিনীতা তখনো হাত দিয়ে চোখ চেপে রেখেছে। মাথা নেড়ে বলল, “না, ঠিক আছে। একটু ধুলো ঢুকেছে বোধহয়।”

অর্ণব ওর কথায় কান দিল না। কাছে এসে কিছুটা জোর করেই চোখের উপর থেকে বিনীতার হাতটা সরিয়ে দিল।

বিনীতার চোখ শক্ত করে বন্ধ, ভ্রু দুটোও কুঁচকে গেছে। ধুলোটা বেশ ভেতরে ঢুকেছে।

“এভাবে থাকলে তো ভালো হবে না। চোখটা একটু খোলার চেষ্টা করুন দেখি!” নরম গলায় বলল অর্ণব।

বিনীতা চোখের পাতা সামান্য ফাঁক করতেই তীব্র জ্বালায় আবার বন্ধ করে ফেলল। মাথা নাড়ল, “পারছি না তো… জ্বলছে খুব!”

অর্ণব নিজের কপালে হাত ঘষলো, “আপনি দেখি একদম বাচ্চাদের মতো!”

তারপর আর অপেক্ষা করল না, নিজেই বিনীতার চোখের পাতা দু আঙুলের সাহায্যে জোর করেই একটু ফাঁক করল। পুরো চোখ লাল হয়ে গেছে।

লাল হয়ে যাওয়া চোখের কোণ দেখে একটু যেন রাগ হলো ওর, “এই জন্যই বলছিলাম, চোখ বন্ধ করে রাখলে আরো ধুলো আটকে যাবে!”

বিনীতা ঠোট উল্টালো, “আপনি বকছেন?”

অর্ণব এক মুহূর্ত তাকালো বিনীতার ঠোঁট উল্টে রাখা মুখটার দিকে। এভাবে ঠোঁট উল্টে রাখায় বড্ড ইনোসেন্ট দেখাচ্ছে চেহারাটা। অর্ণবের ইচ্ছে করলো ওর ফুলোফুলো গাল দুটো টেনে দিতে! তবে এই মুহূর্তে সেই ইচ্ছা চেপে গম্ভীর গলায় বলল, “না, বকছি না!”

তারপর মুখটা সামনে এনে ওর চোখের একদম কাছে ঝুঁকে এলো। তারপর একবার খুব আলতো করে ফুঁ দিল দু আঙ্গুল দিয়ে খুলে রাখা চোখের ভেতরে।

গরম বাতাসের ধাক্কায় কেঁপে উঠল বিনীতা, অর্ণবের দু আঙুলের মাঝেই চোখ বন্ধ করে ফেলল আবার।

অর্ণব চোখটা খুলে আরেকবার ফুঁ দিল, এবার একটু সময় নিয়ে।

বিনীতা এবার আস্তে আস্তে চোখের পাতা কাঁপিয়ে পলক ফেলল। একটু ঝাপসা দেখলেও জ্বলুনির ভাবটা অনেকটাই কমে এসেছে।

অর্ণব বিনীতার থেকে খানিকটা দূরে সরে এলো; গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এবার ঠিক আছে?”

বিনীতা চোখ বড় করে তাকাল, চোখের কোণে পানি‌ জমেছে। আস্তে মাথা নেড়ে বলল, “হুঁ, একটু ঠিক আছে।”

অর্ণব স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল এবার, তারপর ড্রয়ার খুলে একটা ছোট পানির বোতল বের করল। বোতলের মুখটা খুলতে খুলতে এবার কৌতুক মেশানো গলায় বলল,
“বেশ! তাহলে এইবার তো আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত!”

বিনীতা একটা মিষ্টি হাসি দিলো, “অনেক ধন্যবাদ!”

অর্ণব মাথা ঝাঁকাল, “না, না! এত ঠান্ডা ধন্যবাদ না, আন্তরিকভাবে বলেন!”

বিনীতা ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল,
“থ্যাংক ইউ, ডাক্তার সাহেব!”

অর্ণব হাসল, “এবার ঠিক আছে। এই পানিটা নিন, চোখে একটু পানির ঝাপটা দিলে আরো ভালো লাগবে।”

বিনীতা বাধ্য মেয়ের মত পানির বোতলটা হাতে নিল। জানালার গ্লাসটা একটু নামিয়ে চোখে পানির ঝাপটা দিল কয়েকবার।

অর্ণব গাড়ি স্টার্ট দিল, সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে বৃষ্টি আচমকা বেড়ে গেল, ঝমঝম শব্দে ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরো রাস্তা। বিনীতা জানালাটা আরও একটু নামিয়ে দিল, ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটার সাথে ছিটকে আসা বৃষ্টির ফোঁটা এসে লাগলো বিনীতার চোখে-মুখে। বিনীতা বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটাগুলো ছোঁয়ায় জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে খোলা জানালার বাইরে।

অর্ণব একপলক তাকিয়ে দেখল ওকে। মেয়েটার চোখে একটা তীব্র আনন্দ খেলা করছে— ছোট্ট বাচ্চারা যেমন প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে… ঠিক তেমন। ঠান্ডা বাতাসে ওর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে, কয়েকটা ভেজা চুল লেপ্টে আছে গালের সাথে।

মেয়েটা আর কতভাবে মুগ্ধ করবে ওকে?
আশ্চর্য!

“জানালাটা বন্ধ করে দিন, ভিজে যাচ্ছেন।” অর্ণব ওর দিকে তাকিয়ে বলল। অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা প্রবল।

বিনীতা এবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে হাসলো, “খোলা থাকুক? ভালো লাগছে!”

অর্ণব এক মুহূর্ত কিছু বলল না। বিনীতার মুখে বৃষ্টির ছাঁট, ঠান্ডা বাতাসে কাঁপছে চোখের পলক, তবু ও হাসছে— একটা ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাস মাখা হাসি। এই হাসিটাই বুঝি অর্ণবকে বারবার অদ্ভুত রকমের দুর্বল করে দেয়।

“ভালো লাগলেও ঠান্ডা লেগে যাবে— অসময়ের বৃষ্টি এখন! বুঝেছেন?”

বিনীতা আবার জানালার দিকে ফিরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁলো। “একটু ভিজলে ঠান্ডা লাগবে না, ডাক্তার সাহেব!”

অর্ণব এবার আর ভুললো না ওর কথায়। গাড়ির গতি একটু কমিয়ে, স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে একটু এগিয়ে এসে বিনীতার গালের একপাশে আঙুল ছোঁয়ালো, এতক্ষণ ধরে বৃষ্টির ছাঁট আসার কারণে ঠান্ডা হয়ে গেছে গাল। তারপরে নিজের গরম হাতের মাঝে ধরলো বিনীতার শীতল হয়ে যাওয়া হাতটা। আঙুলের মাঝে ঠান্ডা অনুভব করে অর্ণব বলল, “হাতটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেছে দেখেছেন?”

অর্ণবের উষ্ণ আঙুলের ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো বিনীতা। চোখ  ততক্ষণে নামিয়ে ফেলেছে নিচের দিকে।

অর্ণব ওর ভেজা চুলের দিকে তাকিয়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর আলতোভাবে ওর গালের উপর পড়ে থাকা ভেজা চুলগুলো সরিয়ে গুঁজে দিল কানের পেছনে।

বিনীতা কেঁপে উঠল আবারও। ওর ঠান্ডা গালটা এতক্ষণে গরম হতে শুরু করেছে বোধহয়!

“এই অসময়ের বৃষ্টিতে যদি জ্বর চলে আসে তাহলে কিন্তু আপনাকেই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। দুদিন পরে এংগেজমেন্ট প্রোগ্ৰাম— তখন যদি গলায় মাফলার পেঁচিয়ে বসে থাকতে হয়, তাহলে কেমন লাগবে ভাবুন তো?” অর্ণব এমনভাবে বলল যেন কোনো ছোট বাচ্চাকে বুঝ দিচ্ছে।

বিনীতা এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার মুখ টিপে হেসে ফেলল, “আপনার কি মনে হয়, আমি এত সহজে অসুস্থ হয়ে পড়ব?”

“হ্যাঁ, মনে হয়,” অর্ণব মুখ গম্ভীর করল।
“আপনার হাত দেখেছেন? এমন ঠান্ডা হয়ে গেছে যে মনে হচ্ছে বরফের টুকরো!”

অর্ণব আবার বিনীতার হাত নিজের উষ্ণ হাতে মুঠো করে ধরল, ধীরেসুস্থে আঙুলের ভাঁজে আঙুল রাখল। তারপর হাতটা টেনে একটা উষ্ণ চুমু খেলো বিনীতার ঠান্ডা হয়ে আসা হাতের পিঠে।

বিনীতা এবার একেবারে থেমে গেল। চোখ নামিয়ে ওদের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে ফিসফিস করল, “এত কেয়ারফুল হচ্ছেন কেন?”

অর্ণব হাসলো, “এই কেয়ারফুল হওয়াটাও কি আমার দায়িত্ব নয়?”

বিনীতা কোনো উত্তর দিতে পারলো না, শুধু গালের উষ্ণতাটা বৃদ্ধি পেল বোধহয়।

অর্ণব বাকিটা পথ এক হাতে গাড়ি চালালো। অন্য হাতে ধরে রাখল বিনীতার ঠান্ডা হাতটা। বিনীতাদের বাড়ির গেটে পৌঁছতেই গাড়ি থেকে নামলো দুজনেই।
অর্ণব বিদায় জানালো বিনীতাকে, “আমি আসছি তাহলে? রাতে কথা হবে।”

“উপরে আসবেন না? নিচ থেকে চলে গেছেন—  আম্মু শুনলে রাগ করবে!”

“আজকে আর উপরে যাব না। খুব তাড়াতাড়ি তো এ বাড়ির জামাই হয়ে আসছিই!” একটা দুষ্টুমির হাসি খেলা করলো অর্ণবের পুরো মুখ জুড়ে।

বিনীতা লজ্জা পেল, মুখ নিচু করে মৃদু হাসল।

অর্ণব হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে, আসছি। উপরে গিয়ে প্রথমেই ভালো করে মাথাটা মুছবেন— চুলগুলো এখনো ভেজা।”

বিনীতা আস্তে করে বলল, “হুম.. আপনি সাবধানে যাবেন।”

অর্ণব ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলল,
“যথা আজ্ঞা, ম্যাডাম!”

অর্ণব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল ধীর গতিতে। বিনীতা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ভেতরে ঢুকে গেল। দরজা লাগানোর সময় কাঁচের উপ‌‍র নিজের আবছা প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল ও— গালের লালচে আভা এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।

To be continued…

গল্প পড়ার পর কোন প্রকার রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট না করেই আপনারা যে চলে যাচ্ছেন, এভাবেই চলতে থাকলে পরবর্তী পর্ব দিতে ইচ্ছা করে না..💔

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x