গল্প: রিদ মায়ার প্রেম গাঁথা (০১)

লেখিকাঃরিক্তা ইসলাম মায়া

পর্ব:০১





দুপুর ১:২৫। দুপুরের প্রখর রোদে শরীর জ্বালা ভাব। মায়া এই অসময়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়াল। যানজটপূর্ণ রাস্তার এদিক-ওদিক তাকিয়ে খালি রিকশা খুঁজল। অসময়ে খালি রিকশা পাওয়া মুশকিল। তারপরও মায়া তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে রইল রিদের পাঠানো গাড়িতে না উঠে। মায়া হাত উঠিয়ে এক রিকশা চালককে ডেকে বলল…

‘এই মামা, যাবেন?

মূহুর্তে খালি রিকশাটি মায়ার দিকে এগিয়ে আসল।
বয়স্ক রিকশা চালক মায়ার উদ্দেশ্যে বলল…

‘ কই যাবেন আপা?

‘ এইতো সামনে, যাবেন?

‘ এই গরমে ভাড়া কিন্তু ৫০টাকা দিবে আপা।

‘ আচ্ছা।

মায়া রিকশায় উঠে বসতেই রিকশা চলল মায়ার বলা ঠিকানা অনুযায়ী। মায়া ব্যস্ত নগরীর উঁচু উঁচু দালানগুলোর দিকে তাকাল। মায়া ঢাকা শহরে আছে আজ প্রায় ছয় মাস হলো। মায়াকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা টান্সফার করিয়েছিল রিদ, কিন্তু মায়া রিদের সঙ্গে নয়, বরং ওর শাশুড়ির সঙ্গে থাকছে। মায়ার রিদের সঙ্গে না থাকার পিছনে অবশ্য যথাযথ কারণ আছে একটা, যার জন্য মায়া সুফিয়া খানের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এখন এই অসময়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে মায়ার রিদের অফিসের দিকে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, মায়া কাল রাতে রিদকে নিয়ে একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছিল। সেই থেকে মায়ার মন ছটফট করছে রিদকে একটু সশরীরে দেখার জন্য। মায়ার ইচ্ছে, রিদকে একটু আড়াল থেকে দেখেই সে চলে যাবে। রিদের সামনে যাবে না, কথাও বলবে না। মায়ার রিদকে অগোচরে দেখার মনস্থির থেকে গিয়ে পৌঁছাল রিদের অফিসের বিল্ডিংয়ের নিচে। রাস্তার উল্টো পাশে রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে মায়া গিয়ে দাঁড়াল রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের নিচে। মুখে মাস্ক আর দৃষ্টি অদূরে রিদের বিল্ডিংয়ের দিকে আটকে, মায়া একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল পরপর চল্লিশ মিনিট।

তপ্ত গরমে যখন মায়ার কলেজ ড্রেস ভিজে পিঠে লেপ্টে গেল, ঠিক তক্ষুনি রিদকে দেখা গেল বিল্ডিং থেকে বেরোতে, একজন বিদেশিনির পাশাপাশি হেঁটে। রিদের পাশে সুন্দরী রমণীকে দেখেই মায়ার শরীর-মন জ্বলে উঠল তিক্ত অনুভূতিতে। জেদি মায়ার ঘর্মাক্ত শরীরের চোখ দুটো নোনাজলে ছলছল করে উঠল তক্ষুনি। অথচ রিদ তখনো মায়াকে খেয়াল করেনি। সে মূলত পেশাগত গম্ভীরতা টেনে বিদেশী ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা চালাচ্ছিল। পাশাপাশি আরও দুজন ফরেনার ছেলের সঙ্গে আসিফও রিদের পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ মায়ার চোখে তাদের কাউকে পড়ল না। পড়ল শুধু রিদের সঙ্গে হেঁসে কথা বলা সুন্দরী বিদেশিনিটিকে। মায়ার সঙ্গে যেহেতু রিদের বৈবাহিক মনোমালিন্যতা চলছে, তার মানে রিদ এসব সুন্দরী মেয়েদের পেয়েই মায়ার খোঁজ করে না। জেদি মায়ার কষ্ট হঠাৎ আসিফের নজরে পড়ল রাস্তার ওপাশে কলেজ ড্রেসে দাঁড়িয়ে থাকা মায়াকে। প্রথমে চিনতে না পারলেও পুনরায় সেদিকে তাকিয়ে মায়াকে চিনেই রিদের উদ্দেশ্যে বলল:

‘ভাই, ভাবি এসেছেন এখানে।

আসিফের কথায় রিদ নিজের কথা থামিয়ে আসিফের দিকে তাকাল, কপাল কুঁচকে। রিদের তাকানোতে আসিফ আঙুল তুলে অদূরে মায়াকে দেখিয়ে বলল:

‘ঐ যে ভাই, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন ভাবি।

রিদের নজরে মায়াকে পড়তে রিদ তৎক্ষণাৎ হাতঘড়িটার দিকে তাকাল। সময় ২:৩১। এই অসময়ে মায়ার বাড়ি থাকার কথা অথচ সে রিদের অফিসের নিচে কী করছে? রিদ কথাটি ভেবেই সবাইকে ছেড়ে তৎক্ষণাৎ হাঁটলো মায়ার দিকে। রিদকে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসতে দেখেও মায়া জায়গা ছেড়ে নড়ল না। রিদ রাস্তা পার হয়ে মায়ার কাছাকাছি আসতে মায়ার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে বলল:

‘তুমি এখানে কী কর…

রিদের বাকি কথা শেষ করার আগেই রাগান্বিত মায়া নিজের কলেজের ব্যাগটা রিদের দিকে ছুড়ে মারতে মারতে বলল:

‘কেন, আমি এসেছি বলে আপনার প্রেমে বাঁধা পড়েছে? তাহলে আমি চলে যাচ্ছি, আর আসব না।

রিদের ওপর ব্যাগ ছুড়ে মায়া যে পথে এসেছিল, তার উল্টো পথে হাঁটতে লাগল রাগে। রিদ বিরক্তির চোখে মায়ার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রাস্তা থেকে মায়ার ব্যাগটা উঠিয়ে ধুলো ঝাড়ল। ততক্ষণে মায়ার কান্ডে আসিফসহ রিদের বিদেশী ক্লায়েন্টরাও সকলে হতবাক দৃষ্টিতে এইদিকটাই তাকিয়ে। তাদের ধারণা, রিদ খানের মতো মানুষের উপর কেউ ব্যাগ ছুড়ে মারার দুঃসাহসিকতা দেখাবে না কখনো। আর যদি দেখায়ও তাহলে সে ব্যাক্তির প্রাণ বাঁচবে না। অথচ রিদ সবার ধারণা মিথ্যা করে সে মায়াকে কিছুই বলল না। মূলত রিদ বেয়াদব বউয়ের পাল্লায় পড়ে সে আজকাল সবই সহ্য করে বেড়ায়। বিয়ে করেই যেন রিদ ফাঁসে গেছে। অকারণে বউয়ের রাগও তাঁকে সইতে হচ্ছে। আর এর থেকে বড় ব্যর্থতা রিদের জীবনে কি হতে পারে? বিরক্তির রিদ মায়ার ব্যাগ নিয়ে বড় বড় পা ফেলে মায়ার বাহু টেনে আটকে বলল:

‘কী সমস্যা তোমার? বেয়াদবি করছো কেন?

‘আমি করলেই বেয়াদবি, আর আপনি করলে আদব? যান, ছোঁবেন না আমায়। ছাড়ুন বলছি। আমি বাড়ি যাব।

‘তাহলে উল্টো রাস্তায় যাচ্ছো কেন? তোমার বাড়ি পিছনে।

রিদের কথায় মায়া রিদের থেকে নিজের বাহু ছাড়াতে চেয়ে জেদি গলায় বলল:

‘আমি উল্টো রাস্তায় যাব। তাতে আপনার কী? ছাড়ুন, অসম্ভব লোক।

মায়া একরোখা স্বভাবে রিদের মেজাজ খিঁচে গেল। সে রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল..

‘রিত, বাড়াবাড়ি করছিস এখন।

‘আমি করলেই বাড়াবাড়ি? আর আপনি করলে কিছু না?

‘আরে ভাই, কী করেছি আমি? সেটা না বললে বুঝব কীভাবে বাল।



রিদ মায়ার মনোভাব বুঝতে না পারায় মায়া রাগে চেতে উঠে বলল…

‘ আপনি সব বুঝেন শুধু আমার বেলায় অবুঝ থাকেন। বাইরে সুন্দরী মেয়ে পান সেজন্য আপনার ঘরের বউয়ের প্রয়োজন হয় না, তাই না?

মায়ার রাগারাগির কারণটা এবার রিদের কাছে পরিষ্কার হলো। মায়া তখন রিদকে মিস লিটার সাথে কথা বলতে দেখে সেটা নিয়েই এত জেলাস। মিস লিটা ফরেনার, রিদের শেয়ার বাজারের ক্লায়েন্ট। এতক্ষণ তাঁরা এই নিয়েই মিটিংয়ে ছিল। মিটিং শেষে রিদ প্রোজেক্টের জমি দেখতে মিস লিটার সঙ্গে যেতে বের হয়েছিল। ড্রাইভার গাড়ি বের করার সময়টুকু তাঁরা কথা বলছিল। এর মাঝে আসিফ মায়ার কথা জানাতে সে ক্লায়েন্ট ছেড়ে বউয়ের পিছনে দৌড়ে আসল। অথচ এখানে এসে বুঝতে পারল বউ তার জেলাস। রিদ মায়ার রাগান্বিত মুখটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। রাগ ছেড়ে কৌতুক করে বলল:

‘জ্বলে?

রিদের কথায় মুহূর্তে মায়ার রাগান্বিত মুখটা থমথমে হয়ে গেল। মায়া রিদের দিকে কয়েক সেকেন্ড থমথমে মুখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল:

‘আমি আপনার মাকে আজই বিচার দেব। আপনি আমায় ডিস্টার্ব করেন।

মায়ার কথায় রিদও পাল্টা জবাবে বলল…

‘আমিও আপনার নামে মামলা ঠুকে দেব। রোজ যে আমার অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে আমাকে ইভটিজিং করেন, সেটার প্রমাণ কিন্তু আমার ফোনে আছে ম্যাডাম।

রিদের কথায় মায়া চলে যেতে গিয়েও থেমে যায়। আগ বাড়িয়ে এসে রিদের হাত থেকে নিজের ব্যাগটা ছিনিয়ে নিতে নিতে মায়া বলল…

‘আমার শাশুড়ি ক্ষমতাবান অ্যাডভোকেট। জেলে যাওয়ার আগেই আমার জামিননামা হয়ে যাবে। এসবে আমি ভয় পাই না।

‘শাশুড়ির ক্ষমতা আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই, ম্যাডাম। আপনার যদি নাটক শেষ হয়ে থাকে, তাহলে স্বামীর ঘরে ফিরবেন কবে, সেটা বলে যান।

রিদের কথায় মায়া কলেজ ব্যাগটা কাঁধে নিতে নিতে খানিকটা গাল ফুলিয়ে বলল…

‘আমার স্বামী নেই।

মায়ার কথায় রিদ কপাল কুঁচকে বলল…

‘তাহলে আমি কে?

‘পরপুরুষ।

‘তিনবার বিয়ে করেও পরপুরুষ? তাহলে সঠিক পুরুষ কে তোমার?



রিদের কথায় মায়া এবার নমনীয় হয়ে আসল। নিজের রাগ ছেড়ে রিদের কাছে আবদার করে বলল…

‘আমাকে আরেকবার বিয়ে করুন, তাহলেই সঠিক পুরুষ হয়ে যাবেন।

মায়ার কথায় রিদ খানিকটা অসন্তুষ্টির গলায় শুধালো…

‘বা’ল, একি বউকে কতবার বিয়ে করব আমি?

মায়া ফের রিদের কাছে আবদার জানিয়ে বলল…

‘তিনবার করেছেন, আর একবার করলে দোষ কী? আমাদের এখনো আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি। দুই পরিবার চাচ্ছে আমরা আবার আনুষ্ঠানিক বিয়ে করি, তাহলে আপনার সমস্যা কোথায় এতে?

রিদ দাঁতে দাঁত পিষে বলল…

‘ একি কথা আমার বারবার রিপিট করতে হবে কেন? বলেছি না আমার এসব লোক দেখানো নাটক পছন্দ না।

রিদের কথায় মায়াও রাগ দেখিয়ে চলে যেতে যেতে বলল…

‘ঠিক আছে, তাহলে থাকুন একা। আমিও যাব না আপনার ঘরে।

‘রিত!

চলবে…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x