গল্প: হৃদয়ের আশ্রয়(০১)

লেখিকা:নুসরাত পুতুল

পর্ব:০১

দাদিকে না বলে ভাত খাওয়াতে সংসার ভেঙেছে আমার মায়ের। বিনা অনুমতিতে ভাত খাওয়ার অপরাধে আমার মায়ের যখন ডিভো*র্স হয়, তখন আমার বয়স ৬ বছর। আর সে দিন আমি ঠিক করেছিলাম আমি কাকে বিয়ে করবো। আমার মা ছিল ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, আমার মায়ের গর্ভে তখন আমার ছোট বোন তনিমার শরীরটা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল।
ডিসেম্বর মাস, কনকনে শীত। আমাদের বাড়িতে আমার দুই ফুফুকে দাওয়াত করা হয়েছে। বলে রাখা ভালো আমার বাবা চাচারা তিন ভাই দুই বোন। ভাইদের মধ্যে আমার বাবা সবার ছোট, বড় দুই চাচা আলাদা খায়, আমার দাদা নেই। দাদি আমাদের সাথে থাকে। সে সূত্রে মাস কয়েক পর পর ফুফুদের বাড়িতে আনা হয়, তা আবার এলাহি আয়োজন করতে হয় তাদের জন্য।
আমার বড় দুই চাচা ফিরেও তাকায় না দাদি আর ফুফুদের দিকে। তারই সুদে আসলে যেন পূরণ করে আমার বাবার কাছ থেকে।
এমনই একদিন দাওয়াত করা হয়, ডিসেম্বরের শেষের দিক, জানুয়ারিতে আবার ফুফাতো ভাই বোনদের স্কুল খুলে ফেলবে। তাই এখনই দাওয়াত করার উত্তর সময় বলে মনে করের দাদি।
বউয়ের শরীর ভালো থাক বা মন্দ, তাই বলে কি জী-জামাই নাতি নাতনিদের শীতের পিঠা খাওয়ানো থেকে বঞ্চিত করবে নাকি তিনি। ফলস্বরূপ আমার দুই ফুফু এক ফুপা আর তাদের ৩ ছেলে মেয়েকে নিমন্ত্রণ করা হয় আমাদের বাড়ি। বড় ফুফা বিদেশে থাকে,
আমার মায়ের শরীর অতোটাও ভালো না তখন। উঁচু পেট, তার উপর কনকনে শীত, তবুও শরীরকে দিয়ে জোর করিয়ে সকল কাজ যেন করছেন তিনি, তিন চার কেজি গরুর মাংস, রাজহাঁসের মাংস, পোলাও, গরম ভাত, মাসকলাই ডাল রান্না করলেন দুপুরের জন্য। একা হাত, তার উপর ভারী শরীর, এতো সব রান্না করতে সাড়ে তিনটে বেজে গেলো।
তার পর নিজ হাতে সকলকে বেরে খাওয়ানোর পালা।
মায়ের কাজে আমার ফুফু বা দাদি কেউ কোনো সাহায্য করেনি৷ ফুফুদের সাথে আমার দাদিও যেন মেহমান হয়ে উঠলেন সেদিন ।
মা বিকেল করে গোসল টা সেরে নিলেন।
আমার মনে আছে, ভেজা কাপড় নাড়ছিল মা, তখনই দাদির ডাক পরে।
” কই গো বউ, সন্ধ্যা তো হয়ে যাচ্ছে, পিঠা কি বানানো শুরু করলে নাকি রাতে বানাবে?
কতো সময় লাগব খেয়াল আছে?
দাদির ডাকে কিছু সময়ের জন্য মায়ের হাতটা থেমে যায় কাপড় নাড়ার রশিতেই , তার পর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,
” এখনই বানাবো আম্মা,
বলেই ভেজা চুল গামছা দিয়ে পেচিয়ে পিঠা বানাতে চলে গেলেন রান্না ঘরে।
আমার মা যে দুপুরে খাবারটা খায়নি সে যেন কারো নজরে পরলো না।
তেলের পিঠা, চিতল পিঠা, দুধ চিতল, ভাপা পিঠা আরও কি কি রান্না করে রাত ৮ টায় উনুনের পাশ থেকে উঠলো আমার মা। উচু পেট নিয়ে এতোটা দীর্ঘ সময় বসে থাকা টা ও যে ধৈর্যের তা প্রমান করেছেন তিনি।
তার পর হাত মুখ ধুয়ে এসে এক প্লেট ভাত সাথে গরুর মাংস নিয়ে খেতে বসেন।
দু লোকমা খাবার মুখে দিল মাত্র, তখনই দাদি এসে আহাজারি শুরু করে।
” হায় হায় এ কি অলক্ষ্যে কান্ড ।
৩য় লোকমাটা আর মুখে দেওয়া হয় না মায়ের।। তার মধ্যে দাদির চিতকার সকলে এসে উপস্থিত হয় মায়ের ঘরে।
” কি হয়েছে মা। এমন চিল্লাচ্ছো কেন?
ছোট ফুফুর প্রশ্নে দাদির আহাজারি বারে।
” আমারে জিগাছ কি হইছে।
দেখ দেখ ঐ দিকে তাকাইয়া,এই রাইতের বেলায় ভাত খাইতাছে। তা আবার গরুর গোস্ত দিয়া। পেত’নী ধরছে এরে। তা নয়তো এমন কাজ কেউ করে।
ছোট ফুফু ছো মেরে মায়ের হাত থেকে প্লেট টা নিয়ে নিলেন।
” ভাবী এখন ভাত খাও কেন? পোয়াতি মহিলাদের যে রাতে ভাত খেতে হয়না তা কি জানো না নাকি?
মা নতজানু হয়ে বললো,
” দুপুরেও খাইনি। আমার খিদা লাগছে,
” খিদা লাগছে অন্য খাবার খাও। ঘরে বিস্কুট, মুড়ি আছে সেগুলো খাও।
” আমি বিস্কুট খেতে পারবো না। ভাতই খাব আমি।
বলে ফুফুর হাত থেকে ভাতের প্লেট টা নিতে গেলে তা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় ফুফু। সমস্ত ঘর জুরে ছড়িয়ে পরে আমার মায়ের পাতের ভাত,
বাবা তখন ও বাড়ি আসেনি। কাজের অনেক চাপ। আরও একটু পর ফিরবে।
দাদি রাগান্বিত হয়ে এসে মায়ের চুল চেপে ধরে।
” ভাত খাবি। আয় তোরে ভাত খাওয়াই।
” ছাড়েন আম্মা, লাগছে আমার।
ফুফু এগিয়ে এসে দাদিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় রুম থেকে।
মা কিছুক্ষণ মেঝেতে পরে থাকা ভাতের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার ও গিয়ে আবারও ভাত নিয়ে খেয়ে শুয়ে পরে। হয়তো খিদাটা একটু বেশি ছিল মায়ের।
তার ঘন্টা খানেক পর বাবা বাড়ি ফিরে আসলে দেখতে পায় সমস্ত রুম জুড়ে ভাত আর তরকারির জোল পরে আছে,
মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা প্রশ্ন করে,
” কি বেপার রুমি, ঘরের এমন অবস্থা কেন? ভাত কে ফেলাইছে?
মা কোনো উত্তর দিল না, দেওয়ার সুযোগ ও পেলো না।
তার আগেই ছোট ফুফু এসে উপস্থিত মায়ের রুমে।
ফুফু গলা ছেড়ে বললো,
” ভাই মায়ের রুমে একবার আসো তো। অফিস থেকে এসে একদম বউয়ের আঁচলের নিচে না গিয়ে একটু খোঁজ নিতে তো পারো বাড়ির বাকি লোকদের কি অবস্থা ।
বাবা কোনো শব্দ ছাড়া বেরিয়ে গেলো দাদির রুমে।
দাদির মুখে গাঢ় আমাবস্যা,
চোখে পানি,
” মা কাঁদছেন কেন শরীর খারাপ নাকি?
বাবার প্রশ্ন,
‘ যার কপাল খারাপ তার আর শরীর খারাপে কি আসে যায়,
” কি হইছে, এসব বলতায়চেন কেন?
” আচ্ছা ছামির আমি কি তোর খারাপ চাই বাপ?
কোনো দিন শাইছি তোর খারাপ,?
থমথমে গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,
বাবা তড়িঘড়ি করে জবাব দেয়,
” সে কি কথা মা। খারাপ কেন চাইবেন আপনি আমার।
ব্যাস দাদির কান্নার বেগ বাড়ছে,
” দেখ না বাবা, তোর বউকে বলছিলাম রাইতে ভাত না খাইতে, এ কারনে আমার মুখের উপর কত্তো গুলা কথা শোনাইলো,আমারে কি না কয়, তার স্বামীর টাকার আনা বাজার সে রাঁধছে, আমি খাইতে না করার কে। তার পেটে খিদা সে ভাত খাইব। আমি কেন না করি
আরও কতো কথা শোনাইয়া মুখের উপর ভাতের থালা ছুড়ে মারছে।
( ছোট ফুফু) বিনা আমারে সেখান থেকে টেনে না আনলে তো তোর বউ আমারে মারতোই আজ।
বাড়িতে মাইয়ার জামাই য়ের সামনে তোর বউ আমারে এমন অসম্মান করলো,
বলেই আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছে দাদি,
বাবা চুপ করে শুনে যাচ্ছে সব। কপালের বা পাশের রগটা ফুলে গেছে ইতোমধ্যে, চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, যা দূরে থেকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম আমি।
বড় ফুফু মিনা ফোরন কাটলো,
” আহ মা থামত এবার। কাজ করে বাড়ি আসছে খাইতে দাও ওরে এসব না শুনাইয়া।
” কেন রে আপা, থামতে কেন বলছ মারে, মা রে বলতে দাও, নয়তো ঘরে গেলে তো তার বউ কান পড়াবে,
বলেই দাদির দিকে ইশারা করলো ছোট ফুফু।
” হে রে ছামির, এতো কিছু করেও কিন্তু ক্ষান্ত হয় নাই তোর বউ,
জানিস কি করছে?
আমি এতো কইরা না করলাম রাইতে ভাত খাইয় না গোস্ত দিয়া, পেটের বাচ্চার ক্ষতি হইব, তবুও সে আবার ভাত নিয়া খাইলো তো খাইলোই।
আমারে কি না কয় এগুলা সে মানতে পারবো না।তার পেটে ক্ষিদা সে খাইব।
হে রে তোর বউয়ের পেটে কি রাক্ষস ঢুকছে নাকি?
এগুলো ভাল লক্ষ্মণ না রে বাপ। ভূতে ধরছে তোর বউরে,
সংসার টা শেষ করে ছাড়ব,
বাবা কে চুপ থাকতে দেখে বিনা ফুফু, মুখে ভেংচি কাটলো,
‘ কি ভাই, চুপ করে আছ কেন? তুমি ও তো জানো যে পোয়াতি অবস্থায় রাতে ভাত খাইলে বাচ্চার ক্ষতি হয় ,
জানো না বলো?
আমরাও তো মানছি এ নিয়ম।
তো তোমার বউ আজ নিয়ম কেন ভাঙলো, এবার যদি কিছু হয়? আর মায়রে এতো অপমান করলো তার কি বিচার করবা তুমি? নাকি বউশের আঁচল ধরেই চুপ থাকবা? কিছু বলবা না বউরে?
ফুফুর কথা শুনে হাত মুঠি বদ্ধ করে দাড়িয়ে পরে বাবা।
কিছু না বলেই এগিয়ে যেতে লাগে মায়ের ঘরের দিকে,
বড় ফুফু পিছন ছুটতে নেয় তার,
ছামির বাদ দে, সারা দিন কাজ করছিস আয় খা আগে।
পিছন থেকে বড় ফুফুর হাত ধরে থামিয়ে দেয় ছোট ফুফু।
কি আপা? এতো দরদ কেন বুঝলাম না।
মায়ের সাথে কি করলো দেখলা না?
চুপ করে বসে থাকো এখানে।
,বাধ্য হয়ে বসে পরলেন বড় ফুফু।
আমি বাবার পিছন পিছন গেলাম। কিন্তু আমি ঘরে ডুকার আগেই বাবা ঘরে ডুকে সশব্দে ভিতর থেকে দরজা আটকে দিলেন।
আমার কলিজা কেঁপে উঠছে, বাবাকে এতো রাগতে এর আগে দেখিমি আমি। ভয় ধরেছিল মনে ভিষন। কেন জানি মনে হচ্ছিল মায়ের সাথে খারাপ কিছু হতে চলছে আজ
চলবে…..
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments