লেখক: রাকিবুর রহমান আতিক
২রা ডিসেম্বর ২০২৩। আমার এম.বি.এ এর ভাইবা পরীক্ষা। অন্যান্য পরীক্ষা আর ভাইভা পরীক্ষার মধ্যে একটা বিশেষ পার্থক্য আছে। অন্যান্য পরীক্ষায় যেমন ইচ্ছা তেমন ভাবে গেলেও ভাইবা পরীক্ষায় একটু পরিপাটি হয়ে যেতে হয়। সে কারণে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নতুন শার্ট, পেন্ট পরে মেরুন রঙের একটা ব্লেজার পরে নিলাম। দুইদিন আগে কেনা নতুন জুতো পায়ে আর চোখে চশমা দিয়ে রওয়ানা হলাম ভার্সিটিতে। আমি মানুষটা কালো হলেও নায়ক নায়ক ভাব সব সময় থাকে।
ভার্সিটিতে পৌঁছে দেখলাম সবাই আজ নতুন সাজে এসেছে। যার পাশে বসে পরীক্ষা দিলাম, তাকেও প্রথমে চিনতে পারি নি। কারণ সব সময় সে বোরখা পরলেও ওইদিন সে এসেছিলো শাড়ি পরে, তার উপর ময়দার ওভারডোজ তো আছেই। যাই হোক যথা সময়ে আমাদের পরীক্ষা শুরু হলো। মোটামুটি ভালোই হলো পরীক্ষা।
আমাদের আগের পরিকল্পনা ছিলো পরীক্ষা শেষে সবাই মিলে একসাথে কোথাও ঘুরতে যাবো। আমার ইচ্ছে ছিলো পাম বাগানে যাবো। সেখানে সুন্দর মনোরম পরিবেশ, সাড়ি সাড়ি পাম গাছ বেশ ভালো লাগে আমার। সমস্যা বাঁধালো মেয়েরা। দূরে যেতে তারা রাজি নয়। সামিয়া বলল____দূরে না, শহরের ভেতরেই কোথাও গিয়ে সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া করি।
তার কথায় সায় দিয়ে ফাহমিদা বলল____ সামিয়ার সাথে আমিও একমত।”
আমাদের সাথে আরো দুইটা মেয়ে ছিলো। একজনের নাম তান্নি, অন্যজনের নাম রোমানা।
আমি তাঁদেরকে বললাম____কী রে, তোদের কী অভিমত।
তান্নি আর রোমানা বলল____তোমরা যেখানে যাবে আমি সেখানে যাবো, কোনো অসুবিধা নেই। তবে মিনফা আর পাপিয়ার একটু তাড়া থাকায় ওরা চলে গেলো।
অবশেষে সবার মতামত নিয়ে আমরা চলে যাই আর্কিডিয়ায়। সেখানে গিয়ে যার যার পছন্দমতো খাবার অর্ডার করে দুপুরের লাঞ্চটা সেরে নিলাম। আর্কিডিয়া থেকে যখন বের হলাম তখন ঘড়ির কাটায় বিকেল তিনটা।
আমার সাথে ছিলো বন্ধু বাশার। আর্কিডিয়া থেকে বের হয়ে সবাইকে বিদায় দিয়ে দুজনেই চলে গেলাম হোটেল নূরজাহানে। বারোতলার উপরে সুইমিং পুল। সুইমিং পুলের উপরে ভাসতে ভাসতে দুজনে দুইকাপ কফি খেলাম।
এরপর তাকে বললাম দোস্ত চল ঘুরে আসি কোথাও থেকে।
______ কোথায় যাবি?
___ পাম বাগান।
___ আরে না, পাম বাগান বেশি দূর হয়ে যায়। ধারে কাছে কোথাও চল।
____ ধারে কাছে কোথায় যাওয়া যায়?
সে একটু ভেবে বলল_____ চল,ইকোপার্কে যাই।
আমি তার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললাম ____আচ্ছা চল।
এরপর দুজনেই একটি সিএনজিতে করে রওয়ানা হলাম ইকোপার্কের উদ্দেশ্যে। বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে লাগাতে লাগাতে পৌঁছে গেলাম টিলাগড় এমসি কলেজ ছাত্র হোস্টেলের সামনে। মূল সড়ক থেকে একটি পার্শ্বসড়ক চলে গেছে পূর্ব দিকে। এই রাস্তা দিয়ে গেলে পাওয়া যাবে তিনটি জিনিস। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, আর ইকোপার্ক।
আমি আর আমার বন্ধু একটি রিকশায় চড়ে বসলাম। ছয়/সাত মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম ইকোপার্কে।
নিরিবিলি পরিবেশ পাখিদের কুহুতান বেশ ভালোই লাগছিলো। তবে মাঝে মধ্যে ঝোপঝাড়ে টুনাটুনিদের দেখা মিলছিলো। টুনাটুনি মানে প্রেমিক যুগল। নিজেদের যৌবনের পানি ঢালতে ওনারা সব বাঁধা অতিক্রম করে ঝোপঝাড়ের ভেতরে ঢুকে গেছেন। এইসব দেখে আমার ভীষণ হাসি পেলো আবার আফসোস ও হলো বটে।
কেনো না, একটি মেয়ের কাছে যদি কোটি টাকা দামের হীরের নেকলেস থাকে আর তার বয়ফ্রেন্ড বা বন্ধু যদি বলে যে ওই নেকলেস তাকে দিয়ে দিতে, খুব কম পরিমাণে মেয়ে আছে, যে ভালোবাসার জন্য কোটি টাকা দামের নেকলেস বয়ফ্রেন্ডকে দিয়ে দিবে। অথচ কোটি টাকার নেকলেসের চেয়েও দামী হচ্ছে নারীর সতীত্ব। সেই সতীত্ব কত সহজেই সস্তা ভালোবাসার কাছে বিক্রি করে দেয়। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে৷
আমি আর বাশার মিলে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কিছুদূর পাড় হওয়ার পর চোখে পড়লো বড় বড় দুইটা অজগর সাপ খাঁচাতে বন্ধি। আমি ফোন বের করে অজগর সাপের ছবি তুললাম। এরপর এগিয়ে গেলাম আরো গহীনের দিকে। প্রায় ১৫০/২০০ ফুট লম্বা গাছগুলো দেখতে দেখতে সামনে এগুচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে দিনের আলো ম্লান হয়ে এলো। মাগিরবের আজানের ধ্বনি ভেসে এলো চারদিক থেকে। আমি আর বাশার পার্কের ভেতরে একটা সিঁড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। অনেক উঁচু সিঁড়িটি একদম পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছেছে। আমি বন্ধুকে বলল____দোস্ত চল, উপরে উঠি।
সে ও বলল____চল।
আমরা সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাবো তখনি এক বৃদ্ধলোক বলল____সন্ধ্যার সময় উপরে যেও না। বিপদ হতে পারে।
আমি বললাম____আ..রে চাচা, কী যে বলেন। আমাদের কিছু হবে না বুঝলেন।
কথাটি বলে আমরা উপরে উঠতে লাগলাম। বৃদ্ধলোক পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলো আমরা সাড়া দেই নি। নিজেদের লক্ষ্যে আমরা অটল।
সিঁড়ি বেয়ে আমরা একদম উপরে পৌঁছে দেখলাম বসে বিশ্রাম করার জন্য বড় একটা টিনের ছাউনি। আমরা ছাউনির কাছাকাছি যেতেই মেয়েলি কণ্ঠে ঘুঙিয়ে ঘুঙিয়ে কান্নার শব্দ পেলাম। আমি বন্ধুকে বললাম ____দোস্ত, এখানে হয়তো বাসর রচনা হচ্ছে।
বন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল_____ তুই যেটা ভাবছিস সেটা নাও হতে পারে। দেখলি না বৃদ্ধলোক বলেছে উপরে এলে বিপদ হতে পারে। আমার মনে হয় এই মেয়েটি উপরে এসে সেই অজানা বিপদে পড়েছে।
____হুম, হতে পারে, চল কাছে গিয়ে দেখি।
সন্ধ্যার আবছায়া আলোয় আমরা এগিয়ে চললাম সেই ছাউনির দিকে। শান্ত পরিবেশে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দটাকে বজ্রপাতের আওয়াজের মতো লাগছিলো। পাতার সেই শব্দ শুনে ছাউনির ভেতরের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। আমি আর আমার বন্ধু ছাউনির সামনে গিয়ে তাকিয়ে বেশ অবাক হলাম৷।
ছাউনিতে মানুষতো দূরে থাক, একটা ব্যাঙ পর্যন্ত নেই। তাহলে কীসের শব্দ শুনছিলাম আমরা দুজন। আমি বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গেলাম। আমার বন্ধুটি তখন আমায় বলল____দোস্ত এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। আয়, চলে যাই।
____হুম চল।
আমরা যখন ফিরে আসতে যাবো তখনি ভয়ংকর এক হাসির শব্দ শুনতে পাই। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলাম ছাউনিতে একটি মেয়ের মৃতদেহ ঝুলছে। পরক্ষণেই আবার সেটি অদৃশ্য হয়ে গেলো। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো আমার দেখার ভুল বাশারকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল____সেও একটি মেয়ের লাশ ঝুলতে দেখেছে। বাশারের কথা শেষ হতে না হতেই ভয়ংকর ভাবে হাসতে লাগলো কেউ। হাসির শব্দে যেনো পুরো বন কাঁপছে। পাখিরা যেনো ভয়ে নিরব হয়ে গেছে৷
ডানা গুটিয়ে চুপটি করে বসে আছে নিজেদের বাসস্থলে। আমি আর বাশার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলাম প্রায়। সেই মূহুর্তে আমাদের মনে হচ্ছিলো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি ওই বৃদ্ধের নিষেধ অমান্য করে এই চূড়ায় এসে। আমি বাশারকে বললাম____দোস্ত, এখানে আর এক মূহুর্ত নয়।
বাশার বলল___ হ্যাঁ চল,চল।
আমরা পাহাড়ের চূড়া থেকে নামতে যাবো ঠিক সেই মূহুর্তে পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো_____দাঁড়াও।
কণ্ঠটি শুনতেই আমরা পেছন ফিরে তাকালাম৷ ছাউনির ঠিক মাঝখানে ঝুলছে একটি মেয়ের লাশ৷ রক্তিম লাল পশ্চিম আকাশে চলছে রঙের খেলা। দিনের আলো অন্ধকারে পরিণত হয়েছে। হালকা আলোয় ঝুলন্ত দেহটির অবয়ব বুঝা গেলো মুখটা পুরো দেখা যাচ্ছিলো না। আমি পকেট থেকে ফোন বের করে লাশটির দিকে ধরতেই আমরা যে দৃশ্য দেখলাম সেটা ছিলো খুবই ভয়ানক।
আমরা দেখতে পেলাম একটা মেয়ে ছাউনির লোহার সাথে ফাঁসিতে ঝুলে আছে। মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে তার। বড় বড় দুইটি চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে। হাসতে হাসতে মেয়েটি বলল____তোঁদের মৃত্যু তোদেরকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে, হা হা হা।
আমি আর বাশার একদম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। কী করবো না করবো কিছুই মাথায় আসছে না। হঠাৎ করে আমরা অনেকগুলো হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। চারদিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম গাছের ডালে বসে অনেকগুলো কালো অবয়বের নীল চক্ষু আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমরা বুঝতে পারলাম অতিশীঘ্রই খুব ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীম হতে যাচ্ছি আমরা। হঠাৎ করে বাশার বলল____দোস্ত, দুরুদ শরীফ পাঠ কর। দেখবি আমরা বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। কথাটি বলেই বাশার জোরে জোরে দুরুদ পড়তে শুরু করলো।
আমিও দুরুদ পাঠ করে নিজের মুখস্ত যত সূরা আছে তা তিলাওয়াত করতে লাগলাম। আমরা খেয়াল করলাম আমাদের আশপাশে থাকা কালো অবয়বগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমি আর বাশার দূরুদ পড়তে পড়তে আর তিলাওয়াত করতে করতে পেছন হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম। পেছন দিকে নামতে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। প্রায় পঞ্চাশটা সিঁড়ি আমরা পেছন দিকে হেঁটে নামার পর সামনে তাকিয়ে খুবই দ্রুত দৌঁড়ে বাকী সিঁড়িগুলো নেমে পড়লাম। নিচে এসে দেখলাম সেই বৃদ্ধলোকটি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখে তিনি বললেন____ তোমাদের কপাল ভালো তাই জীবিত ফিরে এসেছো। গত পাঁচ বছর ধরে সন্ধ্যার পর যারাই ওই চূড়ায় গিয়েছে কেউ জীবত ফিরে নি।
বাশার বলল____কে মেরেছে সবাইকে।
বৃদ্ধ লোকটি বললেন_____ পাঁচ বছর আগে ওই চূড়ায় একটা মেয়ের ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়, এরপর থেকে ওই চূড়ায় গিয়ে প্রায় বিশজন মারা গেছে৷ তোমরাই প্রথম যারা জীবত ফিরে এসেছো। মায়ের ছেলে মায়ের কোলে ফিরে যাও।
বাশার আমাকে বলল___দোস্ত চল, আর এখানে থেকে লাভ নেই।
এরপর আমরা দুজনেই পার্ক থেকে বের হয়ে যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মাঝে মধ্যেই স্বপ্নে সেই ভয়ানক স্মৃতি ভেসে ওঠে।
সেই সন্ধ্যা, সেই ভয়ানক পরিবেশ, তা ভুলে যাওয়ার নয়।