গল্প:প্রান সরোবরের তরঙ্গধ্বনি (০৩)

লেখিকা:জান্নাত রাহমান হৃদি

পর্ব:০৩

  (কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

তখন সকাল সাতটা বেঁজে দশমিনিট। সকাল সকাল বাসার কলিংবেল বেঁজে উঠায় ঘুম ছুটে যায় শুভ্রতার। সারারাত আড্ডা দিয়ে ভোরবেলার দিকে ঘুমিয়েছিলো শুভ্রতা! মাথাটা ধরে আছে তাই। দু’বারের মাথায় কম্বল সরিয়ে উঠে বসল শুভ্রতা। বিছানা থেকে নেমে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যায়। কুঞ্চিত কপালে দরজাটা খুলতেই বিস্মিত হলো খুব। বিরক্তিটা উবে গিয়ে চোখে মুখে ফুটে উঠলো নিদারুণ ভালোলাগা। মোহগ্রস্থ কন্ঠে বলেল, বাবা তুমি!”

দরজায় দাঁড়ানো সাদমান রাহমান মেয়েকে জরিয়ে ধরলেন। কোমনীয় কন্ঠে জিগ্যেস করলেন,“সারপ্রাইজ কে::মন লাগলো?”

শুভ্রতা আগ্রহী কন্ঠে শুধায়, “ তুমি আসবে বলো নি কেনো?”

“সাদমান রাহমান ব্যাগটা শুভ্রতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
‘ভিতরে ডুকতে দেও আগে, তারপর বলছি।”

“শুভ্রতা দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। সাদমান রাহমান ভিতরে প্রবেশ করতে করতে প্রশ্ন করলেন, “তোমার মা বাসায় নেই?”

শুভ্রতার মুখটা উদাসীন হয়ে যায়। বলল, মা নানুবাড়ি গেছে, কি কাজ আছে বলল। তুমি ফ্রেস হও। আমি দেখি কি নাস্তা বানানো যায়।”

সাদমান রাহমান থমথমে মুখে বললেন, “তোমার আফসোস হয় না শুভ্রতা?”

শুভ্রতা মুখ তুলে তাকায় বাবার দিকে। ঠোঁটে বিস্তর হাসির রেখা টেনে বলে, “ কি নিয়ে আফসোস করব? পরপর বলল, তুমি এসব বাদ দেও তো বাবা। ফ্রেশ হতে যাও।

শুভ্রতাদের কথার শব্দ শুনে মৌয়ের ও ঘুম ছুটে গিয়েছে পুরোপুরি। ওড়না টা গলায় জুলিয়ে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়ায় সে। সাদমান রাহমানকে দেখে বিনম্র কন্ঠে বলে, “কেমন আছেন আংকেল?”

“ভালো! তুমি? বাসার সবাই ভালো আছে?”

“হ্যাবোধক শব্দ উচ্চারণ করে মৌ। শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি বাসায় যাচ্ছি।”

“নাস্তা করে যাও মৌ।”সাদমান রাহমান বললেন।

“না আংকেল। আমি বাসায় গিয়ে করে নিবো। আপনি আমাদের বাসায় আইসেন।”বলেই মৌ ছুটল নিজের বাসায়।

__

বেশ কিছুদিন ধরে রাফাতকে একটা মেয়ে ফলো করছে। রাফাত বিশেষ পাত্তা দেয়নি। মেয়েটা কালো বর্নের। চোখদুটো ভীষন সুন্দর, এক কথায় মায়াবতী যাকে বলা যায়। মনে হয় সৃষ্টিকর্তা সবটুকু মায়া দিয়ে মেয়েটাকে সৃষ্টি করেছেন। রাফাত টং দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। মেয়টাকে দেখেই তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়ায়। এই মেয়েটার সাথে কথার মারপ্যাচে কখনোই জিততে পারেনা রাফাত। মেয়েটার কাছে কথার ঝুঁলি সাজানো। কখন কোন শব্দ প্রয়োগ করে মানুষকে ঘায়েল করতে হবে বেশ ভালো করেই জানে মেয়েটা। রাফাতকে জোড়ে জোড়ে হাঁটতে দেখে দৌড়ে এসে মেয়েটা রাফাতের সামনে দাঁড়ায়। লম্বা শ্বাস নেয়। এরপর সরাসরি জিগ্যেস করে, “ আমাকে দেখে পালাচ্ছিলেন?”

-রাফাত ভ্রু-দয় সংকুচিত করে জবাব দেয়, “ হ্যা পালাচ্ছিলাম! কারণ তোমার সাথে কথা হলে আমার পুরো দিন খারাপ যাবে।”

-“তপ্ত কন্ঠে জবাব দিলো মেয়েটা। কালো মানুষদেরকে দেখলে মানুষের দিন খারাপ হয়ে যায়? আমরা কালো মানুষরা কি সমাজের আগাছা? আপনার কালো মানুষ পছন্দ না?”

-“রাফাত মেয়েটার দিকে দু’কদম এগিয়ে আসে। হাত দুটো ভাজ করে দাঁড়ায়। থমথমে মুখে বলে, শোনো মেয়ে! আমার কালো মানুষ পছন্দ না, শ্যামবর্ণ ও পছন্দ না, এমনকি ফর্সা ও পছন্দ না। আমার শুধু মানুষ পছন্দ।”

  • “মেয়েটা চমকাল। নিজেকে স্বাভাবিক করে অকপটে জবাব দেয়, আমাকে কি আপনার অমানুষ মনে হচ্ছে?”

-“রাফাত ঠোঁট গোল করে জবাব দেয়, উহু মাথামোটা।”

__

শুভ্রতার আজকের দিনটা ভালোই কেটেছে। দুপুরবেলা শুভ্রতা এবং সাদমান রাহমান এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলো। দাওয়াত খেয়ে বাবার সাথে বাইকে করে বাসায় আসছিলো। হঠাৎ পুরনো এক ক্লাসমেন্টকে দেখে শুভ্রতা বাইক থেকে নামে। সাদমান রাহমানকে বলল, ‘বাবাবলে তুমি বাসায় যাও। আমি আসছি কিছুক্ষন পরে।’
এরপর বান্ধবীর সাথে আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। শুভ্রতা যখন বাসার সামনে এসে দাঁড়ায় তখন মাগরিবের আজান দিচ্ছে চারদিকে। শুভ্রতা গেট খুলে দোতলায় ওঠে। ফ্লাটের দরজায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাঁপে। সারাশব্দ নেই। সে করিডোর পেরিয়ে কিচেন রুমের দরজা দিয়ে বাসায় ডোকে। পুরো বাসা নিস্তব্ধ। শুভ্রতা বাবা বলে ডাক দেয় একবার। কিচেন রুম পেরিয়ে বাসায় ডুকতে নেয়। ফ্লোরে পা পরতেই কি যেনো ক্যাচ করে পায়ে বিধে যায়। দাঁত খিচে ধরে সে। ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে সুইচবোর্ডের কাছে যায়। রুমের আলো জ্বালায়। নজরে পরে সারা রুমে ছড়ানো সিটানো কাচের টুকরো। আলমারি, ড্রেসিং টেবিল থেকে শুরু করে সব কিছু ভাঙা। শুভ্রতার আখি টলমল করে ওঠে। কান্না টা গিলে ফেলে তড়িৎ গতিতে। মেহরিন আলফাকে দেখা যায় ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। শুভ্রতা মায়ের সাথে চেচিয়ে ওঠে,

-“ সমস্যা কি তোমাদের? একটা সুস্হ জীবন দিতে পারো না আমাকে? বছরের প্রথম দিন আজ। কোথায় ভেবেছি পরিবারের সাথে আনন্দে দিন কাটাবো। দিয়েছো আনন্দ করতে? ছোট বেলা থেকে তোমাদের এই গৃহ যুূ্দ্ধ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি। এতই সমস্যা ছিলো যখন আমাকে পৃথিবীতে আনার দরকার টা ছিলো কি?”

-“রক্তলাল চোখে শুভ্রতার দিকে তাকান মেহরিন আলফা। উতপ্ত কন্ঠে শুধায়, সমস্যা তুমি। তোমার বাবা। তোমার নানাভাই, তোমরা তিনজনই আমার সমস্যা। বিশেষ করে তুমি।”

“ আমাকে এত অপছন্দ করার কারন?”

জবাব দেন না মেহরিন আলফা। চুপচাপ উঠে যান। নিজের ফোন টা খুঁজে বাসা থেকে বের হন। রেখে যান এই বিধস্ত ঘরটাকে। চেয়ে চেয়ে সবকিছু দেখে শুভ্রতা। ধপ করে বসে পরে ফ্লোরে। হুহু করে কেঁদে ওঠে। মাথার চুলগুলো খামচে ধরে। কামড় বসায় হাতের উপর।

ঘন্টা দেড় পরে মৌমিতা আসে। সাদমান রাহমানই পাঠিয়েছেন ওকে। শুভ্রতা তখনো ফ্লোরেই বসা। চারদিক চোখ বুলিয়ে মাথায় হাত দেয় মৌ। ফোনে মায়ের নম্বরে ডায়াল করে বলে, “ আম্মু তুমি ফার্স্টএইড বক্স টা নিয়ে দ্রত একটু শুভ্রতাদের বাসায় আসো তো।”

ফোন রেখে শুভ্রতার কাছে এগিয়ে যায় মৌমিতা। শুভ্রতাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। ওঠে না শুভ্রতা। মৌমিতাকে জাপটে ধরে আবার কেঁদে ওঠে। এরমধ্যেই দীপাবলি সাহা এসে উপস্হিত হন। নরম কন্ঠে বলেন, “ কান্নাকাটি করো না শুভ্রতা। ছোটবেলা থেকেই তো এসব দেখে আসছো। তোমার তো অঅভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা এসবের সাথে। কান্নাকাটি বন্ধ করো।”

মৌমিতা ফার্ষ্টএইড বক্স টা খুলে শুভ্রতার পায়ে ব্যান্ডেজ করে দেয়। কাঁচ ফুটে বেশ অনেকটা কেটেছে। দীপাবলি সাহা আর মৌমিতা শুভ্রতাকে ওর রুমে নিয়ে বসিয়ে দেন। মৌমিতাকে বলেন, “ আমার সাথে আসো কাঁচের টুকরা গুলো পরিষ্কার করতে হবে।”

“বেশ সময় নিয়ে মোটামোটি সব বাসাটাকে পরিষ্কার করেন দুজন মিলে। কাজ শেষ হলে দীপাবলি সাহা শুভ্রতাকে বলেন, “ স্টং হও মেয়ে, কান্নাকাটি করে আগেও কিছু ঠিক করতে পারোনি, না এখন পারবে। শুধু বিধাতার কাছে দোয়া করো তিনি যেনো তোমার আব্বু- আম্মুর জেদটা কমিয়ে দেন। পুনরায় বলেন, “ মৌ থাকুক তোমার কাছে। আমি বাসায় যাচ্ছি। সাবধানে থেকো। রাতের খাবার আমি পাঠিয়ে দিবানি তোমাদের জন্য।”


জানালা ভেদ করে দূর আকাশের উজ্জল তারাটার দিকে তাকিয়ে আছে শুভ্রতা। বাতাসে তরতর করে চুল গুলো উড়ছে। শীতের প্রকোটে মৃদু কেঁপে উঠছে আবার। ফোনটা তখন থেকে বেঁজে যাচ্ছে। সাদমান রাহমান ফোন দিচ্ছেন। মৌ এতক্ষন ধরে শুভ্রতাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলল,“ ফোনটা তোল। আংকেল বারবার ফোন দিচ্ছে।”

শুভ্রতা দায়সারাভাবে জবাব দেয়, “ বল শুভ্রতা ঘুমিয়ে পরেছে।”

অগত্যা ফোনটা রিসিভ করে কথা বলে মৌ। সাদমান রাহমান জিগ্যেস করেন, “ শুভ্রতা ঠিক আছে?”

মৌ কঠিন স্বরে জবাব দেয়, শুভ্রতাকে এই পরিস্হিতিতে একা ফেলে আপনি চলে গেলেন কি করে আংকেল?”

হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়েন সাদমান রাহমান। কন্ঠ খাঁদে নামিয়ে জবাব দেয়, “ আমি থাকল শুভ্রতার আরো খারাপ অবস্হা হতো। শুভ্রতার গায়েও হাত তুলত।”

-“আদতে আপনারা এগুলো বন্ধ করবেন কবে? মেয়েটা মারা যাওয়ার পর?”

সাদমান রাহমান কিঞ্চিত চুপ থাকেন। শুষ্ক ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে জবাব দেন,- “ শুভ্রতার দিকে খেয়াল রেখো। কোনো সমস্যা হলে জানিয়ো আমাকে।”

সাদমান রাহমান কল কাটেন। মৌমিতা ফোনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। এই মূহুর্তে ওর মধ্যে বিরক্তিভাব আর রাগ দুটোই বিরাজ করছে।

শুভ্রতা জানালার পাশ ছেড়ে উঠে বিছানায় শুয়ে পরে। বারোটা ছুইছুই প্রায়। দুজনেই ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। মুঠোফোনটা আবারো বেঁজে ওঠে। শুভ্রতা ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকে। নম্বরটা অপরিচিত। শুভ্রতার ফোনে সচরাচর কেউ ফোন দেয় না। দ্বিতীয়বারের ন্যায় আবারো বেঁজে ওঠে মুঠোফোনটা। ফোনটা রিসিভ করে কানে চেপে ধরে ও। ওপাশ থেকে পুরুষালী স্বরে ভেসে আসে। “আসসালামু আলাইকুম।”

সালামের উত্তর দেয় শুভ্রতা। দায়সারা ভাবে জিগ্যেস করে, “কে বলছেন?”

-“আমি কাব্য।”

“ওহ!”

-“কোনো সমস্যা শুভ্রতা? সারাদিনে অনলাইনে আসো নি যে?”

-“বিজি ছিলাম একটু। আর কিছু বলবেন?”

-“না তেমন কিছু না! এমনি খোজ নিতে চেয়েছিলাম।”

-“নেওয়া শেষ?”

-“হ্যা! আচ্ছা রাখছি। থমথমে মুখে জবাব দেয় কাব্য। ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। আজ প্রথমই সরাসরি ফোনে কথা বলেছে শুভ্রতার সাথে। শুভ্রতা এমন করবে ভাবতে পারে নি কাব্য। নিজেকে নিজের কাছে ছোট লাগছে এবার।


শুভ্রতা দূরন্ত মেয়ে। ঠোঁটের কোণে সবসময় মিষ্টি একটা হাসি লেপ্টে থাকে। অথচ সেই হাসির ছিটেফোঁটাও নেই এখন। বেঞ্চের উপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছে সে। স্যার কি পড়াচ্ছেন সে দিকে বিন্দুমাএ খেয়াল নেই। শুভ্রতার পাশে আয়াত বসা ছিল। শুভ্রতার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, “ মন খারাপ তোর?”

-“জবাব দেয় না শুভ্রতা।”

আয়াত একপ্রকার বিরক্ত হয়। কাগজে কিছু একটা লিখে বাকি ছয়জনের গায়ে মারে। ব্যাগপএ গুছিয়ে একে একে সবাই উঠে দাঁড়ায়। আয়াত পাশ থেকে শুভ্রতাকেও টেনে তোলে। এতক্ষণে ধ্যান ভাঙে শুভ্রতার।

-“ তোরা সবাই উঠে পড়েছিস কেন?”

আয়াত কাঠখাট গলায় জবাব দেয়, “ কারন আমরা সবাই বাসায় যাবো।”

“বাসায় যাবি মানে কি? ক্লাস চলছে তো। এভাবে স্যারের সামনে থেকে বেড়িয়ে গেলে গার্ডিয়ান ডাকবে। বেয়াদবির সেরা টফিও দিয়ে দিতে পারে।”

স্যার ব্লাকবোর্ডে ম্যাথ করাচ্ছেন। সেই ফাঁকে একে একে বেড়িয়ে পরে সবাই। সব শেষে বের হয় শুভ্রতা এবং আয়াত। সবাই মিলে স্কুলের বাইরে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে বসে।

ফয়সাল আয়াতকে বলে, “কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে যে ক্লাস থেকে সবাইকে এভাবে নিয়ে চলে আসলি?”

-গম্ভীর শ্বাস নেয় আয়াত। উদাসীন চোখে বলে, “ শুভ্রতাকে একটু দেখ! হাতে কামড়ের দাগ। পায়েও কিছু একটা হয়েছে। পুনরায় বলে, “ সবার সামনে কিছু বলিস না! পরে জিগ্যেস করিস। আমার ধারনা ও তোর সাথে শেয়ার করবে সবকিছু।”

হ্যা বোধক মাথা নাড়ায় ফয়সাল। উঠে শুভ্রতার পাশে এসে বসে। এরপর শুভ্রতাকে প্রশ্ন করে, “ ফুচকা খাবি শুভ্রতা?”

-“উহু।”

আশিক ঠোঁট গোল করে বলে, “ তোমার প্রেমিকা খাবে না মামা! ওরে না সেধে আমারে সাধ। দেখবি এক কথায় রাজি। অত ভংচং নেই।”

-“তোরে আমি সাধতি যাবো কেন? তুই তো আমার প্রেমিকা নাহ।”

-“আমি তোর বন্ধু।”

-“এ্যাহ বন্ধু? তুই হলি চরম শএু।”


সিগারেটের প্রচন্ড ক্রেভিংস চেঁপেছে কাব্যর। বাসায় একটা সিগারেট ও নেই। সকাল সকাল বের হয়েছে বাজারে। সকাল বলা চলে না আসলে, কারণ এখন আনুমানিক বেলা ১১টা বেঁজেছে। কাব্য হেঁটে চেনা পরিচিত এক বন্ধুর দোকানে ডোকে। সেখানে তার আরো গুটিকয়েক বন্ধু উপস্হিত ছিলো। কাব্যকে দেখেই এক বব্ধু বলে ওঠে, “ আমাদের প্রেমিক পুরুষ হাজির।”

আড়চোখে তাকায় কাব্য। একটা গালি দিতে গিয়েও নিজেকে কন্ট্রোল করে নেয়। বন্ধুদের কথা সম্পূর্ন অগ্রাহ্য করে দোকানদারকে বলল,“এক প্যাকেট সিগারেট দে।”

ছেলেটা সিগারেটের একটা প্যাকেট কাব্যর হাতে ধরিয়ে দেয়। পুনরায় বলে, “ ভেতরে আয়। গেম খেলি সবাই মিলে।”

প্রুতুত্তরে কাব্য শুধায়, “ আসতে পারি যদি এই প্রেম সমাচার টা বন্ধ করিস তোরা। আপদত বিরক্ত আমি।”

সাহেদ হো হো করে হেসে ওঠে, “ বিরক্তিটা আসলে কার উপর? আমাদের নাকি ভাবির উপর?”

-“গোটা পৃথীবিটার উপর। বন্ধ করবি নাকি বাসায় চলে যাবো? ”

“জিভ কাটে সাহেদ। রেগে যাচ্ছিস কেনো? আমি মজা করছিলাম। আয় ম্যাচ শুরু করি।”

-ম্যাচ শুরু করার বিশ মিনিটের মাথায় কাব্যর কাছে কল আসে শুভ্রতার। শুভ্রতার কল ছিলো কাব্যর কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। খেলার এমন পর্যায়ে আছে যে, এখন কল ধরতেও ইচ্ছে করছে না। একবার ভাবলো ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কল দিবে। পরমূহুর্তেই বলে ওঠে, “থাক মেয়েটাকে অপেক্ষা করিয়ে লাভ নেই। কাব্য ফোনটা ধরলো কেটে যাওয়ার ঠিক আগ মূহুর্তে। ওপাশ থেকে মিহি কন্ঠে ভেসে আসল সাথে সাথে, “আসসালামু আলাইকুম।”

“জবাব দেয় কাব্য। কিঞ্চিত পরেই মনে পরে গতকাল রাতে শুভ্রতার করা ব্যবহার। সাথে সাথে চোখে মুখের হাসি ভাব টা উবে গিয়ে মুখমন্ডলে ভেসে ওঠে গম্ভীর ছাপ।”

“ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে তখনো মিষ্টি একটা স্বর বাঁজতে থাকে। কাব্য আপনি কি আমার কথা শুনছেন?”

“জ্বী শুনছি বলুন।”

“কালকের রাতে আপনি যখন ফোন দিয়েছিলেন আমি একটু সমস্যায় ছিলাম। আপনি কি রাগ করেছেন?”

-“নাহ।”

“আপনি কি ফ্রি আছেন এখন। আমি একটু কথা বলতে চাই আপনার সাথে।”

“আপনার কথা কি বিশেষ গুরুত্বপূর্ন শুভ্রতা?”

“ঠোঁট ভেজায় শুভ্রতা। না অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনার সাথে আমার অতটা পরিচয় হয়নি তাই ভাবছিলাম…”

“জ্বী বলুন। কি জানতে চান আমার ব্যাপারে।”

“ভিডিও কল দেই?”

“ভিডিও কল? আমি তো এখন বন্ধুদের সাথে আছি। রাতে কল দেই?”

“আচ্ছা।”

“আপনি কি মাইন্ড করেছেন শুভ্রতা।”

“উহু। সমস্যা নেই। রাখছি এখন। সময় করে কল দিবেন।”

“ঠিক আছে ভালো থাকুন শুভ্রতা। নিজের যত্ন নিবেন।”

“আপনিও।”

“ফোনটা রেখে বন্ধুদের দিকে তাকায় শুভ্রতা। মনটা আচমকা অনেকটা ভালো হয়ে গেছে। এপাশ থেকে আয়াত চোখ পিটপিট করে তাকায় শুভ্রতার দিকে।”

শুভ্রতা কন্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলে, “এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিস কেন?”

“তুই এত সুন্দর করে কথা বলা শিখিছিস কবে থেকে? ওয়াও গলা থেকে মধু ঝড়ে পরছে। আর আমাদের বেলায় তিতা বের হয়। গালি ছাড়া কোনো শব্দ বের হয়না।”

ফয়সাল বলে, “ এই ওঠ। চল শুভ্রতা তোর সাথে কথা আছে আমার। তোর বাসা পর্যন্ত পৌছে দিই।”


মৌমিতা, ফয়সাল আর শুভ্রতা পাশাপাশি হাঁটছে। হঠাৎ ফয়সাল জিগ্যেস করে, “তোর বাবা বাড়িতে আসছিলো?”

কথাটা টা কর্নগোচর হতেই শুভ্রতা থমকায়। পা থেমে যায় ওর। কিছুক্ষন পর নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে, “এটা জিগ্যেস করলি কেন?”

“তোর হাতে দাগ কিসের? আন্টি আবার গায়ে হাত তুলিছে তোর?”

“আম্মু মারবে কেন? আর মারলেই কি? মা বাবারা সন্তানের গায়ে হাত দিতে পারে এটা স্বাভাবিক।”

ফয়সাল দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আসলেই তুই বড় হয়ে গেছিস শুভ্রতা। ক্লাস সেভেন থেকে আমরা একসাথে আছি। তোর বাবা আর আমার বাবা এক জায়গায় কাজের সূএে বাবা জানতো তোর ফ্যামিলির ব্যাপারে সব। একদিন স্কুলের প্রোগ্রামে বাবা তোকে দেখে আমাকে জিগ্যেস করেছিলো তুই আমার ক্লাসমেট কিনা। তখন আমি বাবার কাছে তোর ফ্যামিলির ব্যাপারে সবকিছু শুনি। তোর জন্য খারাপ লেগেছিল তখনই ভেবেছি তোর বন্ধু হবো। তোকে আগলে রাখবো। সেই থেকে এই অব্দি আমার দ্বারা যতটুকু সম্ভব আগলে রাখার চেষ্টা করছি তোকে। আগে সবকিছু শেয়ার করতি অথচ এখন অনেক কিছুই লুকানোর চেষ্টা করিস।”

-“আমার এখন আর কারো সিমপ্যাথি নিতে ভালো লাগে না।”

“তোর প্রতি আমি সিমপ্যাথি দেখাই শুভ্রতা?” প্রশ্নটা করে এক মিনিট ও দাঁড়ায় না ফয়সাল। উল্টা দিকে হাটা শুরু করে। শুভ্রতা আর মৌমিতা পেছন থেকে ডাকে। এক পর্যায়ে মৌ বলে, “রাগ কমলে আবার যোগাযোগ করবে। চিন্তা করিস না।”

চলবে…….

Leave a Comment