লেখিকা:অলকানন্দা ঐন্দ্রি
পর্ব:০১-০২
“ মিথি, তুই এবরশন করাবি যত দ্রুত পারিস।আমি এই বাচ্চা চাই না। বিয়ের দুই মাস পার হলো না তুই কনসিভ করলি কোন সাহসে? আন্সার মি, কোন সাহসে তুই কনসিভ করলি? নিষেধ করেছিলাম না আমি? এখন যত দ্রুত পারিস এই বাচ্চার কাহিনী তুই ফিনিশ করবি। নয়তো আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না মিথি, কেউ না! মেরে ফেলব জাস্ট তোকে এবং তোর বাচ্চাকে! ”
মিথির চুলগুলো তখনও আদ্রর হাতের মুঠোয়। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠল মেয়েটা। চোখ ইতোমধ্যেই ভিজে এসেছে কাতরতায়। মিথি যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠল। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে আদ্রর হাত থেকে চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করে কোনভাবে শুধাল কেবল,
“ ব্যাথা পাচ্ছি, ছাড়ুন। চুল ছাড়ুন আদ্র ভাই।”
আদ্র ছাড়ল না। বরং চুলের মুঠি আরো শক্তপোক্ত ভাবে টেনে ধরে মুখটা কাছাকাছি আনল। হিসহিসিয়ে রাগ দেখিয়ে বলল,
“ কনসিভ করার আগে মনে ছিল না? মনে ছিল না আমার নিষেধাজ্ঞা। তোকে বিয়ে করেছি বলে নিজেকে অনেককিছু ভেবে ফেলেছিস তুই? আমার বাচ্চার মা হবি? এত সাহস হয় কি করে তোর? তোকে যেভাবে এনেছি, ওভাবেই এক ধাক্কায় বাড়ি থেকে বের করতে আমার দুই সেকেন্ডও সময় লাগবে না মিথি।মাইন্ড ইট!”
মিথি কেঁদে উঠল।মাস দুয়েক আগেই তার ফুফাত ভাই অর্থ্যাৎ আদ্রর সাথে বিয়ে হয়েছিল। তাও তার বড়ভাই-ভাবীদের ইচ্ছাতেই। কে জানত এরপরের জীবনটা এমন হবে? কে জানত আদ্র এমন পিশাচ? মিথির চোখ দিয়ে নোনা পানিরা নেমে এল গাল বেয়ে। আদ্রর দিকে চেয়ে বলল,
“ আমার ব্যাথা লাগছে। ছাড়ুন না আদ্র ভাই৷”
আদ্র দ্বিগুণ ক্ষ্রিপ্ততা নিয়ে চিৎকার করে বলল,
“ লাগুক।এতোটা কেয়ারল্যাস কিভাবে হোস তুই? কিভাবে? তোকে বলে রেখেছিলাম না আমি বাচ্চা চাই না? বলেছিলাম কিনা? তুই, তুই তারপরও আমার উপর চালাকি করেছিস মিথি। তুই ইচ্ছে করেই এই বাড়িতে নিজের পাকাপোক্ত জায়গা গড়তে কনসিভ করেছিস। আমি জানি মিথি! সবটা জানি। ”
এবারের চুলের টানটা আরো কয়েকগুণ বাড়ল। যেন ছিড়ে চামড়া সহ ছুটে আসবে মাথার খুলি থেকে। মিথি কানের দিকটায় চুল চেপে রেখেই আহাজারি করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই শুধাল,
“ আমি কিচ্ছু করিনি। আমার কনসিভ করার পেছনে আপনার ভূমিকা ও আছে আদ্র ভাই। আপনি, আপনিই তো যখন তখন নেশা করে আমার উপর নিজের পৈশাচিক আক্রমন চালাতেন আদ্র ভাই। ”
কথাগুলো বলা শেষ করতে দেরি হলো বোধহয়, তবে গালে চামড়া জ্বালানো একটা থাপ্পড় পড়তে দেরি হলো না। জুঁই এর গালটা জ্বলে উঠল। হাতটা এবার গিয়ে থামল গালে। শক্তপোক্ত হাতের চড় খেয়ে কি আচরণ করা উচিত তা যেন ভুলে বসল মিথি।কেবল হতবিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। সে দৃষ্টিকে একটুও পরোয়া না করে আদ্র আঙ্গুল উঁচিয়ে তখন শুধাল,
“ জাস্ট শাট আপ, তুই বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি আম্মু আব্বু সবাইকেই জানাব যে বাচ্চাটা আমার না। অন্য কারো। তখন ভালো হবে? তুই খুশি হবি? তোকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে মিথি। এখন তো তাও আশ্রয়টুকু ঝুটছে, তখন তাও জুটবে না।হয় এবরশন করাবি, নয়তো বের হয়ে যাবি বাড়ি থেকে। আমি তোর জন্য মুহুকে লাইফ থেকে হারাতে পারব না। কখনোই না। ”
মিথি মুহু নামটা আগেও শুনেছে। বহুবার আদ্র মুহুর নাম বলেছে। অথচ এই মুহুটা কে মিথি এখনও জানে না।তাই তো এবারও দ্রুতই জানার জন্য শুধাল,
“ মুহু কে? ”
উত্তর এল না। বরং আদ্র নিজেই আলমারি থেকে মিথির জামাকাপড় বের করে দিয়ে মিথির হাত চেপে ধরে শুধাল,
“ তৈরি হয়ে নে, আমরা হসপিটাল যাব। এক্ষুনিই যাব। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। ”
মিথি এতোটা সময় কেঁদেছিল, ব্যাথায় কুঁকড়ে ছিল।কিন্তু এতোটা সময় পর তার হুশ এল যে আদ্র বলেছে মানে এই বাচ্চাটা আদ্র অবশ্য অবশ্যই এবরশন করাবে।আদ্র যা বলে তাই করে।ভীষণ রাগী আর জেদী আদ্র। কি করবে মিথি এবার? প্রথম মা-মা অনুভূতি তার। প্রথম সন্তান তার! এই আঠারো বছর বয়সে তার প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ! মিথি থমকাল। আদ্র আসলেই কি পিশাচ নয়? একটা ভ্রূণর প্রতি তার এত বিতৃষ্ণা? এত রাগ? এত জেদ? যে ঐ ভ্রুণটাকে শেষ করতে সে এক মুহুর্তও অপেক্ষা করতে চাইছে না? অথচ তারই অংশ! আদ্ররই অংশ, আদ্ররই সন্তান, আদ্ররই রক্ত। কোন বাবা তার সন্তানকে এভাবে অবহেলায় রেখে মেরে ফেলতে চায়? কই মিথির তো এমন অনুভূতি হলো না। মাত্র আঠারো বছর বয়স তার। কলেজের গন্ডি পার হতে না হতেই বিয়ে হয়েছে। তবুও তো যখন জানল সে কনসিভ করেছে তখনই খুশিতে উৎফুল্ল হলো।আদ্রর থেকে বয়সে অনেক কম হয়েও প্রথম সন্তানের অনুভূতি কেমন সে তা জানল, বুঝল, আবেগে কাঁদল। অথচ আদ্র বুঝল না? প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি তাকে একটুও ছুঁতে পারল না? মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের ভেতরের ভয় ধামাচাপা দিয়ে, এবার সাহস সঞ্চয় করল। ধীর কন্ঠে জানাল,
“ আমি এবরশন করাব না আদ্র ভাই। ও আমার সন্তান, প্রথম সন্তানুভূতি। কিছুতেই এবরশন করাব না আমি। হাত ছাড়ুন। ”
আদ্রর রাগ বোধহয় মাথায় উঠল। টগবগ করে উঠল যেন। রাগে দিশেহারা ষাঁড়ের মতো সে মিথির মুখ চেপে ধরল দুই হাতে। এতোটা শক্ত ভাবেই চেপে ধরল যে মিথি কুঁকড়ে উঠল। যেন মুখটা ভেঙ্গে ফেলবে।আদ্র ওভাবেই মুখ চেপে ধরে বলে উঠল,
“ টিপিক্যাল বাঙ্গালি মেয়েদের মতো কথা বলবি না মিথি।আমি তোকে বিয়ে করেই ভুল করেছি। কতবার বলেছি আম্মুকে এই ক্ষ্যাত, গেঁয়ো মেয়েকে আমি বিয়ে করব না। তবুও, তবুও আম্মু তোর সাথেই বিয়েটা দিল। আমার লাইফটা হ্যাল করে দিল জাস্ট। তৈরি হয়ে নে মিথি, ভালোই ভালো বলছি তৈরি হয়ে নে। মাথা খারাপ করাবি না।”
মিথি এবারে আকুতি করল। আদ্রর হাতটা জড়িয়ে ধরে অসহায়ের মতো করে কেঁদে উঠল। বলল,
“আমি এবরশন করাব না আদ্র।আমি সত্যিই এবরশন করাতে চাই না। ও থাকুক না, থাকুক না ও আদ্র ভাই। ও তো বৈধ। তবুও ওকে মানতে আপনার এত অসুবিধা কেন আদ্র ভাই? বলুন না। বাচ্চাটা, বাচ্চাটা আমি রাখব আদ্র ভাই। প্লিজ!”
এই পর্যায়ে মিথির গালে আরেকটা শক্তপোক্ত হাতের চড় পড়ল। এতোটাই শক্তোপোক্ত যে মিথির ঠোঁটের কোণটা কেঁটে রক্ত বের হয়ে এল সঙ্গে সঙ্গেই। চড়ের দরুন ছিটকে গিয়ে পড়ল বিছানার কোণটায়।আদ্র আবারও ফের এগিয়ে এসে ওর চুল টেনে ধরল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“ কবার বলব? কবার বলেছি আমি যে বাচ্চাটা আমি চাই না? আমার অনুমতি ছাড়া তুই কনসিভ করলি কেন? কেন? আমার অনুমতি ছাড়া তুই বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান করেছিস না? তোর প্ল্যান আমি দেখে নিব মিথি। ছাড় পাবি না, একটু ও ছাড় পাবি না তুই। ”
এটুকুু বলেই মিথিকে ছেড়ে দিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আজ ছাড় দিচ্ছি, কাল যাবি। অবশ্যই যাবি। এবরশন করাবি ভালো মেয়ের মতো আবার বাসায় চলে আসবি। ব্যাস!এই কাহিনী এখানেই ক্লোজড করবি মিথি।এর অন্যথা হলে তোকে আমি এই বাসায় রাখব না। লা’থি মেরে বের করে দিব। ”
মিথি আবারও বলল,
“ সম্ভব না। আমি এবরশন করতে পারব না আদ্র ভাই।”
আদ্র রাগে বেহাল। হিংস্র চাহনিতে চাইল কেমন ঘাড় ঘুরিয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ পারবি, তোর বাপও পারবে। ”
এটুকু হুংকার দিয়ে বলেই আদ্র বের হয়ে গেল। মিথি শুধু কাঁদল। আহাজারি করে কাঁদল। আর বিড়বিড় করল,
“কক্ষোনো না! কক্ষোনো না, কক্ষনো এবরশন করাব না আমি।”
.
ভার্সিটির হলটা আজকাল বিদ্ঘুটে লাগে মুহিবের। কোথাও যেন ভেতর থেকে তার দমবন্ধ লেগে আসে। মাঝেমাঝেই খুব করে ইচ্ছে করে গ্রামে ছুটে যেতে, তার ফুলের কাছে ছুটে যেতে, একটাবার ফুলকে দেখে আসতে, ফুলের পাগলামো গুলো অনুভব করতে। অথচ কতদিন হলো ফুল আর যোগাযোগ করেনি। মুহিবও আর বাড়ি ফিরেনি। কতগুলো দিন! মুহিব ঠোঁটে সিগারেট গুঁজল। বেশ আয়েশের সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে সে পকেট থেকে তার ফুলের পাঠানো শেষ চিঠিটা মেলে ধরল। মেয়েটার হাতের লেখা চমৎকার। সত্যিই চমৎকার। যখন চিঠি লিখে কি সুন্দর দেখায়। মুহিব চোখ বুলাল। গুঁটিগুঁটি অক্ষরে লেখা,
মুহিব ভাই,
না পেয়েও কি হারানোর যন্ত্রনার অনুভব করা যায় মুহিব ভাই? জানেন? আমি যাকেই এই জীবনে ভালোবেসেছি তাকেই হারিয়েছি কোন না কোন ভাবে। প্রথমে আব্বু, তারপর আম্মু, তারপর সম্ভবত আপনাকে…
আপনাকে তো আমি পাই-ইনি কখনো মুহিব ভাই। এত করে চাইলাম আপনাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে, অথচ পেলাম না। আপনি জেনে খুশি হবেন যে,আপনি আর কখনোই আমার হবেন না। কখনোই না। মুহিব ভাই, আমার কষ্ট হচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে কান্না পাচ্ছে তবুও আমাকে অন্য একজনের হতে হবে। আপনি ব্যাতীত অন্য একজনের সংসার করতে হবে। অথচ আমার কতশত পাগলামো ছিল শুধু আপনার সাথে সংসার করার জন্য। আপনি খুশি,খুব খুশি হবেন এই খবর পেয়ে আমি জানি। কিন্তু আমি, আমি কেন পারছি না খুশি হতে মুহিব ভাই? আপনি কেন কখনো আমায় ভালোবাসলেন না মুহিব ভাই? কেন?
আপনি জানেন?আপনি খুব নিষ্ঠুর। অনেক খানি। আপনার কখনো মনে হয়নি ছোট্ট মিথি এর মন বলতে কিছু আছে। আপনি কখনো মিথিকে এইটুকুও গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ঠিকই কষ্ট দিয়েছেন। বোকা মিথি ও অনুভূতি সামলে উঠতে না পেরে বারবার আপনার কাছে বেহায়া হয়েছে, কষ্ট পেয়েছে,অপেক্ষায় থেকেছে। আপনি ভালো থাকুন, খু্ব ভালো থাকুন মুহিব ভাই। আমি আপনাকে আর ভালোবাসব না, আর তাকাব না আপনার দিকে। আর কখনো আপনাকে আমি আমার করে চাইব না মুহিব ভাই। মিথির থেকে আপনি মুক্ত,সম্পূর্ণ মুক্ত। মিথি আর বেহায়ার মতো ঘুরফির করবে না আপনার আশপাশে, অপেক্ষায় থাকবে না।দোয়া করি, ভালো থাকুন।
ইতি,
মিথি
মুহিবের বোধহয় আবারও দমবন্ধ লাগল। আবারও, আবারও ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। একটা মিথি! সেই ছোট্ট আদুরে মিথি! তার জীবনে একটা আস্ত ফুল ছিল যে কিনা ছোট থেকেই তার ভক্ত ছিল। ছোট থেকেই মুহিবের কথায় উঠত, বসত। অথচ বড় হওয়ার পর সেই ছোট্ট মিথির কি সাংঘাতিক পাগলামো, কি অসম্ভব দুর্বলতা। মুহিব পাত্তা দিল না। এইটুকুও পাত্তা দিল না সে মিথির অনুভূতিকে। বরং বারবার অবহেলা আর জ্ঞান দিয়ে বুঝিয়েছে ও ভুল পথে এগোচ্ছে। ওর অনুভূতি, অনুভূতি নয়। বরং আবেগ। অথচ আজকাল মুহিবের মনে হয় সে সেসময়টায় মিথিকে যদি গুরুত্ব দিত আজ বোধহয় তার মাঝেমাঝেই দমবন্ধ হয়ে আসত না। মিথি কি সত্যিই অন্যের হয়েছে? সত্যিই? তাকে ভুলতে পেরেছে? ভুলে গেছে? মুহিব ভেবে পায় না। তবে এইটুকু জানে, তার ফুল আর হয়তোবা তার ফুল নেই। সে হয়তো অন্যের হয়ে গিয়েছে। নয়তো এতগুলো দিনে একটা চিঠি আসত না? একটা সিঙ্গেল ম্যাসেজ আসত না তাকে জ্বালানোর জন্য? মিথি তো তার জন্য বেহায়া ছিল।পুরোপুরি বেহায়া। সে বেহায়া মিথি একটাবারও তার খোঁজ নিত না? মুহিবের সাহস হয় না কারোর থেকে এই বিষয়ে নিশ্চিত খবর জানতে। থাক না, অনিশ্চায়তা নিয়ে। নিশ্চিত হয়ে গেলে যদি দুঃখরা আরো ঝেঁকে বসে তার হৃদয়ে!
.
আদ্র বাসায় ফিরল প্রায় রাত এগারোটায়। বাসায় মিথি ব্যাতীত কেউ নেই। আদ্রর আম্মু, আব্বু, বোন এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছে আজ দুদিন হলো। আদ্র মাথায় হিসেব কষে। বাবা মা ফেরার আগেই মিথিকে নিয়ে গিয়ে এবরশন করাতে হবে। রিস্ক নিতে চায় না সে বাচ্চা নিয়ে। আদ্র বাসায় ফিরেই ফ্রেশ হলো। চোখে পড়ল মুখচোখ ফুলে যাওয়া মিথির দিকে। ঠোঁটের এককোণে কাঁটা দাগ। গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগগুলোও স্পষ্ট। কান্না করার ফলে বোধহয় চোখ ও ফুলে উঠেছে। আদ্র তীক্ষ্ণ চাহনিতে তাকায়। খাবার খেতে নিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“ তুই কনসিভ করেছিস এই খবরটা যেন ভুলেও আম্মু আব্বুর কানে না পৌঁছায় মিথি। ভুলেও যেন না। মনে থাকবে? ”
কথাটা মিথিকে শাসাতে বললেও মিথি যেন কথাটা শুনে নতুন কিছুই খুঁজে পেল। সন্ধ্যা থেকে, সন্ধ্যা থেকেই সে ভেবে গিয়েছে কিভাবে বাঁচবে সে? কিভাবে তার সদ্য মাতৃত্বের অনুভূতি দেওয়া বাচ্চাটাকে বাঁচাবে? কিন্তু এতক্ষনে মনে হলে আদ্রর আম্মু, অর্থাৎ তার ফুফি এই খরবটা পেয়ে আদ্রর মতো অখুশি হবেন না। তাকে নিশ্চয় সাহায্য করবে এই বিষয়ে ফুফি? সে তো তার কাছ থেকেই সাহায্য নিতে পারে। এমনটা ভেবেই রাতে আদ্র ঘুমিয়ে যাওয়ার পরই ভয়ে ভয়ে সে আদ্রর ফোনটা নিল। কাঁপা হাতে ফুপির নাম্বারটা খুঁজে নিয়েই কল লাগাল। অথচ কেউ তুলল না এতরাতে। মিথি আবারও কল দিলল। ঘুমঘুম স্বরে কেউ ওপাশ থেকে কথা বলতেই মিথি কাঁপা গলায় বলতে লাগল,
“ ফু্ ফুপি…”
বাকিটা বলতে পারল না মিথি। তার আগেই পুরুষালি অবয়ব এসে দাঁড়িয়েছি তারই পেছনে। মিথি হতবিহ্বল দৃষ্টিতে পিছন ঘুরে চাইতে চাইতেই ফোনটা তার হাত থেকে ফ্লোরে পড়ে গেল।
.
“ এবরশন করাবি না তুই মিথি? আমারই বউ হয়ে, আমারই ঘরে থেকে আমার অবাধ্য হয়ে তুই বাচ্চাটা রাখতে চাইছিস? এত সাহস তোর? এই কারণেই আম্মুকে কল দিয়েছিস? আমার সাথে বেঈমানি করছিস জা’নোয়া’র?”
বলতে বলতেই মিথির চোয়াল চেপে ধরল আদ্র। ব্যাথা জায়গায় আবারও ব্যাথা দিয়ে নিজের শক্তপোক্ত হাতের অস্তিস্ব বুঝাল। মিথি কেঁদে উঠে। ব্যাথায়, কষ্টে, ভয়ে সে কেঁদে উঠল অসহায়ের মতো। এই যে ফুফিকে কল করতে নিল, নিজের গর্ভে বাড়তে থাকা ভ্রুণটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে নিল এইটা আদ্র জেনে ফেলার পর তাকে আস্ত রাখবে? নাকি তার গর্ভে বাড়তে থাকা ভ্রুণটাকে? মিথি কেঁদে উঠে। অসহায়ের মতো করে বলতে লাগল,
“ না, আদ্র। ভুল বুঝছেন আপনি আদ্র। আমি এই জন্য কল করিনি ফুফিকে। বিশ্বাস করুন,আমি এইজন্য কল করিনি আদ্র। ”
চোয়াল চেপে রাখায় কথাগুলো স্পষ্ট শোনাল না। একটুও স্পষ্ট শোনাল না। তবুও আদ্র বুঝল। কিন্তু বিশ্বাস করল না। একটা কথাও সে বিশ্বাস না করে দাঁতে দাঁত চেপে রক্তলাল চোখগুলো নিয়ে তাকিয়ে শুধাল,
“ তুই বলেছিলি না এবরশন করাবি না? তুই বলেছিলি না তুই বাচ্চাটা রাখবি? বলেছিলি তো। কি হলে বল,বলেছিলি কিনা? ”
মিথি কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“ বলেছিলাম। ”
আদ্র বিদ্ঘুটে একটা হাসি হাসে। একটা ছোট্ট ভ্রূণ! যার কিনা এখনও কোন সক্রিয়তা নেই তার জন্য মিথি নিজের প্রাণের মায়াও করছে না? মিথি কি জানে না আদ্রর মাথায় কি পরিমাণ রাগ চাপে? রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মিথিকে মেরে ফেলাও খুব অসম্ভব নয়। আদ্র তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মিথির চোয়াল ছাড়ে। অতঃপর শুধাল,
“ বাচ্চাটার বাবা হয়ে আমার যেখানে কোন মায়া হচ্ছে না, সেখানে তোর এত মায়া কেন?জীবনের মায়াও হচ্ছে না তোর? ”
মিথি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। শুধাল,
“ কারণ আমি মা। ”
তাচ্ছিল্যের হাসিটা আদ্রর পছন্দ হলো না। গা জ্বলে উঠে যেন। শরীরে রাগগুলো বয়ে বয়ে চলে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,
“ এবরশন তোকে করাতেই হবে মিথি। ঐ বাচ্চাটা আমি রাখব না।শুধু এই বাচ্চা কেন, তোর গর্ভে আমার কোন সন্তানেরই জম্ম হবে না মিথি। তোকে আমি আমার সন্তানের মা হতে দিবই না। ”
মিথি স্থির চাহনিতে তাকায়। তার সন্তানের মা হতে দিবে না এটাই কারণ? আশ্চর্য! এই যে “আমার সন্তান” বলছে এইটুকুতেও কি একটুও মায়া হচ্ছে না আদ্রর? একটু ও নিজ নিজ লাগছে না? আপন লাগছে না? আদ্র পিশা’চ! আদ্র নি’ষ্ঠুর! মিথি শুধাল,
“ তাহলে আমার সন্তানেরই মা হতে দিন আদ্র। আপনার বলে কখনো ওকে আপনার কাছে আসতে দিব না প্রয়োজন হলে। ছেড়ে দিন না ঐ নিষ্পাপ অস্বিস্তকে। ”
আদ্র অতো সহজ মানুষ হলে তো কথা ছিল না। আদ্র মানল না। বরং বিদ্ঘুটে হেসে উত্তর করল,
“ সে নিষ্পাপ হলেও তুই তো নিষ্পাপ নোস মিথি। তোর শাস্তিটা হলেও তাকে পেতে হবে। এবং পেতে হবে মানে সত্যিই পেতে হবে! ”
এইটুকু বলেই মিথির হাত চেপে ধরল আদ্র।টেনে রুম থেকে বের করে নিতেই মিথি আকুতি মিনতি করে আদ্রর পা জড়িয়ে ধরল। দ্রুত বলল,
“ বিশ্বাস করুন, আমি ফুফিকে এই কারণে কল করিনি আদ্র। বিশ্বাস করুন।”
আদ্র ওভাবে পা জড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই পা ঝাড়া মারে। মিথি ছিটকে যায় আরেকটু দূরে। ফলস্বরূপ কপালে আঘাত লাগে। রক্ত বের হয়ে আসে দ্রুতই। অথচ আদ্র গলল না। নিজের মতোই পাশবিক ভাবে বলল,
“ তোর মতো ছোটলোক মেয়েকে বিয়ে করাই উচিত হয়নি আমার। তোর মতো মেয়ের মাথায় কত কুবুদ্ধি ঘুরে তা আমি প্রুভ পেয়ে গেছি বুঝেছিস? আশ্রয় দিয়েছিলাম। আশ্রিতা হয়ে দিব্যি জীবন কাটাতে পারতি। কিন্তু তোর তো আরো বেশি কিছু প্রয়োজন তাই না? তাই এই প্ল্যান করেছিস! ”
“ আমায় বিয়ে করেছেন আপনি আদ্র। আশ্রিতা নই আমি। এই বাড়ির বউ আমি। ”
মিথিকে কথাটা বলতে শুনেই ধমকে বলে উঠল,
“ শাট আপ,আমি শুধু মুহুকে ভালোবাসি। মাইন্ড ইট! আমার লাইফে শুধু মুহু আছে। তুই না। ”
এইটুকু বলেই আদ্রর এক গ্লাস পানি মুহুর্তেই ডকডক করে পান করল। অতঃপর পৈশাচিক হেসে মিথির দিকে এগিয়ে এসে আবারও হাত চেপে ধরল। বলল,
“ উঠ, উঠ। এক্ষুনিই উঠবি তুই। এক্ষুনিই বের হবি বাসা থেকে। উঠ বলছি মিথি। ”
মিথি ঘাবড়াল দ্বিতীয় দফায়। বলল,
“ এতরাতে? এতরাতে আমি কোথায় যাব আদ্র? ”
“ যেখানে ইচ্ছে হয় ওখানে যাবি। আমার বাড়িতে থাকতে হলে তোকে আমার কথা অনুযায়ী চলতে হবে। আমার কথায় উঠতে হবে, আমার কথায় বসতে হবে। ”
মিথির কান্না এল দ্বিগুণ বেগে। সত্যিই তো কোথায় যাবে ও? কিছুই তো চেনে না, জানে না। কি করবে ও বের করে দিলে? কেউ তো নেই ও বাড়িতে। মিথি ঠোঁট কাঁমড়ে বলার চেষ্টা করল,
“ আদ্র…”
আদ্র টেনে উঠাতে চেষ্টা করে। বলল,
“ স্টপ! এবরশন করাবি নয়তো বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। ”
“ এতরাতে কোথায় যাব আমি আদ্র? আমি, আমি তো কিছু চিনি না..”
আদ্র হেসে উঠল উল্লাস করে। মিথির এই অসহায় রূপটারই অপেক্ষায় ছিল বোধহয় ও। অতঃপর হেসে শুধাল,
” থাকতে দিব তোকে? তোর মতো ছোটলোককে থাকতে দিব আমার বাড়িতে?”
মিথি উত্তর করল না। আদ্রর ততক্ষনে মিথিকে টেনে তুলেছে। শক্তপোক্ত হাত দিয়ে মিথির হাতটা চেপে ধরে বলল,
“ চল, এবরশন করাবি। এখনই। ”
মিথির কন্ঠ কাঁপে। কি বলছে? মিথি আটকাবে কি করে? কোনভাবে বলল,
“ ক্ কি? ”
আদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে বলল,
“ আমার আর তোর যে বেবিটা পৃথিবীতে জম্মাবে বলে তুই উৎফুল্ল হচ্ছিস তাকে শেষ করব, এখনই, আজই! চল… ”
এইটুকু বলেই টেনে হিঁছড়ে মিথিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল আদ্র। মিথি পারে না ওর শক্তির সাথে। তবুও চেষ্টা করল আটকানোর। ভাঙ্গা গলায় বলার চেষ্টা করল,
“ আদ্র, আদ্র…
“ আদ্র, আমি যাব না। যাব না,।আদ্র প্লিজ শুনুন না আদ্র,,
“ আদ্র, প্লিজ আমার কথাটা শুনুন না আদ্র। এটা আমাদের প্রথম বেবি। আপনার আর আমার প্রথম বাচ্চা আদ্র। আমার প্রথম বাচ্চা আদ্র। ”
আদ্র টেনে হিঁচড়ে সোজা মিথিকে নিয়ে বাসার বাইরে এল। দরজা লক করতে করতে হিসহিসিয়ে বলল,
“ জাস্ট শাটআপ!
“ আদ্র, একটাবার শুনুন, একটাবার…
“ কি শুনব? কি শুনব আমি? তোকে না চাইতেও বউ করেছি। বিয়ে করেছি। এটুকু এনাফ। কিন্তু তুই আমার বাচ্চার মা হবি এই কথাটা মুহু পর্যন্ত গেলে মুহু আমায় ছেড়ে দিবে মিথি। আমি মুহুকে পাগলের মতো ভালোবাসি। তুই আন্দাজও করতে পারবি না ওকে আমি কতোটা ভালোবাসি মিথি!”
মিথি নিরবেই তাকায় এবার। মুহুর পরিচয় পেয়ে তার কষ্ট হচ্ছে না। একটুও দুঃখ হচ্ছে না। সে শুরু থেকেই জানে আদ্রর কাছে সে কেবল ভোগ্য বস্তু। ভালোবাসা না। অথচ কষ্ট হলো এই ভেবে যে আদ্রর ভালোবাসা কত স্বস্তা! ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সে শুধাল,
“ এতোটা ভালোবাসার পর ও অন্য একজনকে রাতের পর রাত নিজের শরীরে জড়িয়েছেন। ছুঁয়েছেন! আপনার মুহু এসব জানে আদ্র? ”
আদ্র তীক্ষ্ণ চাহনিতে চায়। ভ্রু বাঁকিয়ে মিথির দিকে এমনভাবে তাকায় যেন এক্ষুনিই মে’রে ফেলবে। বলল,
“ স্টপ! তোকে বিয়ে করেছি, তোর শরীরের উপর আমার অধিকার ছিল। তুই, তুই দেখতে সুন্দর বলেই আমি তোকে রাতের পর রাত কাছে টেনেছি। এইছাড়া আর কিচ্ছু না। আমি এতোটা নির্বোধ বা পৌরুষহীন নই যে মেয়ে পাশে নিয়ে শুঁয়েও স্থির ঘুমিয়ে থাকব! ”
মিথি শুনল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ কাপুরুষ! ”
আদ্র শুনল না স্পষ্ট। তবুও বোধহয় বুঝল।মিথির চুলগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে টেনে ধরল। রাগের সহিত বলল,
“ কি বললি? কি বললি তুই? ”
মিথি এবারে ব্যাথায় প্রতিক্রিয়া দেখাল না। উল্টে বলল,
“ ছাড়ুন, চলুগুলো ছাড়ুন আদ্র। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে এত উঠে পড়ে লেগেছেন কি শুধু মুহুর জন্যই? শুধুই প্রেমিকার জন্য? ”
“তোকে বলতে রাজি নই আমি। ”
ভীতু মিথির আজ বোধহয় সাহস হলো। আবারও বলল,
“ ও অবৈধ নয় আদ্র। ও বৈধ! ওর বাঁচার অধিকার আছে। ওর ও দুনিয়ার আলো দেখার অধিকার আছে আদ্র! ”
আদ্র এবারে স্রেফ মিথির গলা চেপে ধরল। শক্তোপোক্ত হাত দ্বারা গলা চেপে রেখে বলল,
“ আমি চাইলে ওর সঙ্গে সঙ্গে তোকেও মেরে ফেলতে পারি মিথি। তুই ভালোভাবেই জানিস এটা অসম্ভব না। এবার বল,মেরে ফেলব? মেরে ফেলব তোকে? ”
মিথি তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। কোনরকমে উত্তর করল,
“ এই জীবনটাও যে আমার খুব একটা চাওয়ার আপনাকে কে বলল আদ্র? মে’রে ফেলুন। ”
“ তোকে মা’রা যাবে না শুধু আম্মুর জন্য। নয়তো বিয়ের রাতেই তুই শেষ হয়ে যেতি মিথি। ”
এইটুকু বলেই গলাটা ছাড়ল আদ্র। পুণরায় হাত টেনে সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নামাল মিথিকে। জোর করে গাড়িতে তুলল। অতঃপর গাড়ি চালাতে নিয়ে বলল,
“ এই কাহিনীর সমাপ্তি আজই হবে মিথি। আমিও দেখব তুই কিভাবে ঐ সন্তান তোর গর্ভে রাখিস। ”
চলবে……