Writer: Ruhanika Noor
রাতটা ছিল অদ্ভুত নীরব। বাতাস নেই, তবুও জানালার পর্দা হালকা দুলছিল—যেন কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
নাফিসা প্রথমে ব্যাপারটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে সে লক্ষ্য করছিল—তার জীবনে অদ্ভুত কিছু ঘটছে। জিনিসপত্র ভুলে যাচ্ছে, নামাজে দাঁড়ালেই ঘুম পেয়ে যায়, আর আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চোখকেই অপরিচিত লাগে।
একদিন তার খালা এসে বললেন, —“তোকে কেউ নজর দিছে… শুধু মানুষ না।”
সেদিন রাতেই শুরু হলো সব।
নাফিসা ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ মনে হলো কেউ তার নাম ধরে ফিসফিস করছে।
—“নাফিসা…”
সে চোখ খুলতেই দেখল, ঘরের কোণায় একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। মানুষের মতো, কিন্তু চোখ নেই। শুধু ফাঁকা অন্ধকার… তবুও সে অনুভব করছিল—ওটা তাকিয়ে আছে।
তার বুক ভারী হয়ে গেল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। যেন অদৃশ্য কিছু তার বুকে বসে আছে।
পরদিন থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে লাগল।
সে যখন কোরআন তিলাওয়াত করতে বসে, হঠাৎ মাথা ঘুরে যায়। আয়াত পড়তে গেলে শব্দগুলো জড়িয়ে যায়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার—তার মাথার ভেতর একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়:
—“পড়িস না… থাম…”
এক রাতে, সাহস করে সে রুকইয়াহ শুরু করল। দোয়া পড়তে পড়তে হঠাৎ তার গলা আটকে গেল। হাই তুলতে চাইল—কিন্তু হাইটা যেন গলায় আটকে আছে।
ঠিক তখনই আয়নায় সে যা দেখল, তা তার জীবন পাল্টে দিল।
তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ছায়া।
একটা নয়… দুইটা নয়… অনেকগুলো।
তাদের চোখ নেই, কিন্তু তারা তাকিয়ে আছে। একসাথে। এক দৃষ্টি। ভয়ংকর, ভারী, চাপ সৃষ্টি করা দৃষ্টি।
তার মাথার ভেতর আবার সেই কণ্ঠস্বর— —“এই চোখগুলোই তোকে ধরে রেখেছে…”
নাফিসা বুঝতে পারল—এটা শুধু যাদু না। এটা একটা জাল।
হিংসা, বদ নজর, আর অদৃশ্য দৃষ্টির জাল।
পরদিন সে আরও শক্ত হয়ে দোয়া শুরু করল। কাঁপতে কাঁপতে পড়তে লাগল—
“اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ عَيْنٍ تَرَانَا وَلَا نَرَاهَا…”
হঠাৎ তার শরীর কেঁপে উঠল।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল। চারপাশ থেকে যেন ফিসফিস শব্দ আসতে লাগল—রাগে, বিদ্বেষে ভরা।
তার চোখের সামনে ছায়াগুলো একে একে প্রকাশ পেতে লাগল।
কেউ দেয়ালের সাথে লেগে আছে। কেউ ছাদের কোণায়। কেউ তার ঠিক পাশে বসে।
তারা সবাই তাকিয়ে আছে। শুধু তাকিয়ে।
হিংসায় জ্বলতে থাকা অদৃশ্য চোখ…
নাফিসা চোখ বন্ধ করে আরও জোরে পড়তে লাগল—
“بِسْمِ اللَّهِ تَخْرُجُ كُلُّ عَيْنٍ وَنَفْسٍ مَارِدَةٍ…”
হঠাৎ একটা তীব্র চিৎকার!
মনে হলো পুরো ঘর কেঁপে উঠল। বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
এক এক করে ছায়াগুলো ভেঙে যেতে লাগল—যেন কাঁচের মতো চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
শেষে শুধু একটা ছায়া বাকি রইল।
সবচেয়ে বড়টা।
ওটা ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলো…
তার কানে ফিসফিস করে বলল—
—“তোর ভিত এখনও পুরো ভাঙে নাই…”
নাফিসার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে বুঝতে পারল—
যাদু ভাঙা যায়… ছায়া দূর করা যায়…
কিন্তু যতক্ষণ না মানুষের ভিতরের হিংসা, ভয় আর দুর্বলতা শেষ হয়—
ততক্ষণ সেই “ভিত্তি” থেকেই যায়…
আর সেই ভিত্তি থেকেই আবার জন্ম নেয় অন্ধকার।
ঘরের বাতি হঠাৎ নিভে গেল।
আর অন্ধকারের ভেতর… আবারও কেউ ফিসফিস করল—
—“আমি এখনও আছি…”
সমাপ্ত