গল্প:মাই বিলাভড সানফ্লাওয়ার(০৬)

লেখা – আসফিয়া রহমান

পর্ব:০৬

অনুমতি ছাড়া কপি করা

কঠোরভাবে নিষিদ্ধ❌

বাসায় ফিরে অর্ণব নিজেকে বেশ অদ্ভুতভাবে আবিষ্কার করল। সারাদিনের পরিহিত কাপড় এখনও ওর গায়ে। হাতের এপ্রোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে বিছানার পাশে থাকা সোফায় বসে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল ও।কিন্তু মন পড়ে আছে বিকেলের সেই লেকের পাড়ে।

কীভাবে যেন ওর মন পুরোপুরি বিনীতায় আটকে যাচ্ছে। সাফিন বাসায় ফিরেছে কি ফেরেনি তাও জানতে ইচ্ছে করছে না এই মুহূর্তে। লেকের পাড়ে কাটানো বিকেলের প্রতিটি মুহূর্ত যেন মনে ফিরে আসছে বারবার। বিকেলের স্নিগ্ধ আলো, লেকের শান্ত পানি আর বিনীতার কণ্ঠস্বর!

কবিতা আবৃত্তির সময় যখন ওর রেশমের মত চুল উড়ে আসছিল অর্ণবের চোখে-মুখে, কবিতার মধ্যে ডুবে থাকা বিনীতা খেয়াল করেনি, সেসময় ওর গভীর চোখদুটো— সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করছে ওর মনে।

অর্ণব উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ালো। দেখল রাতের আলো ঝলমলে ব্যস্ত নগরী। মানুষ চলছে তো চলছেই। কারো যেন থামবার ফুসরত নেই। তার মাঝে অর্ণব আটকে আছে শেষ বিকেলের দেখা সেই কাজল কালো চোখদুটোতে। আর ওই মোহাবিষ্ট কন্ঠস্বরে।

বিনীতাকে যেদিন প্রথম দেখেছিল অর্ণব, সেদিনও এমনই এক শেষ বিকেল ছিল। সেদিনও কাজলের আঁচড় ছিল ওই চোখ দুটোতে। পরনে ছিল বেগুনি শাড়ি, অবিন্যস্ত চুলগুলো ছিল বিনুনিতে গাঁথা। অর্ণবের চোখ আটকে গিয়েছিল ওর দিকে। সাদামাটা সাজ, এক অদ্ভুত সারল্য মাখা ছিল ওর চোখে-মুখে।

সেদিন ওদের কোন কথা হয়নি। কিন্তু অর্ণবের মনে হয়েছিল এমন নিরাসক্ত, গভীর চোখ ও আগে কখনো দেখেনি।

কী আছে ওই চোখ দুটোতে?

সেদিনই ওর মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন অন্যরকম। আজ এতদিন পর আবার সেই বিকেল, সেই চোখ…সব যেন নতুন করে ফিরে এলো।

হঠাৎই নিজের ভাবনার মধ্যে খেয়াল হলো ওর,
“আমি কি মেয়েটার কথা বেশিই ভাবছি না?”

নিজের প্রশ্নে নিজেই থমকে গেল ছেলেটা। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়লো পুরো মনজুড়ে।

এটাই কি প্রথম ভালো লাগার অনুভূতি?

নয়তো এতদিন ধরে চেনা শহরের রাত আজ হঠাৎ করে এত অচেনা লাগছে কেন?

অর্ণব ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল। বিনীতার হাসিটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে!

শেষ বিকেলের মায়াময় আলোতে মোড়ানো সেই হাসিটা অর্ণবের ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করল বোধহয়। তবে সেই অনুভূতিটা ও পুরোপুরি ধরতে পারল না; বা হয়তো ধরতে চাইল না।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল, চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতেই এক এক করে অনেক কিছু মনে এল। একের পর এক চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি মিশে যেতে যেতে অর্ণবের মনে এলো হঠাৎ—

“আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই!”

____________________________________

বিনীতা হলে ফিরে চুপচাপ ব্যাগটা টেবিলের একপাশে রেখে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। রিমি আপু গতকাল ফিরেছে, এখন রুমে নেই। টিমটিমে বাতাসে বারান্দার সামনের গাছটার পাতাগুলো নড়ছে। বাইরে রাতের শহর একদম নির্লিপ্ত। গাড়ির হেডলাইট, দূরের বিল্ডিংয়ের আলো, সবকিছুই যেন খুব চেনা। আকাশে ফিকে চাঁদ উঠেছে। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল ও। লেকের পাড়ের মুহূর্তগুলো ভেসে উঠলো ওর মনে। অর্ণবের কথা, আর ওর চোখের গাঢ় বাদামী মণিজোড়া। অর্ণবের কথার বলার ধরনটা খুবই সাধারণ, কিন্তু ঠিক কোথায় যেন একটা মৃদু স্পর্শ করে যায়।

নিজের ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত অনুভূতি টের পাচ্ছে বিনীতা। সেটা কী, ঠিক ধরতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে, আজকের বিকেলটা অন্যরকম ছিল।

“অর্ণব মানুষটা বেশ আন্তরিক! আজকাল কে এত মন দিয়ে কারো কথা শোনে!” নিজ মনে বলল ও।

কবিতা আবৃত্তি করার সময় ও অর্ণবের চোখে যে নিবিড় মনোযোগ দেখেছে, সেটা এখনও চোখের সামনে ভাসছে। বিশেষ করে অর্ণব যখন বলেছিল,
“আজকের ছোট্ট আলাপটা ভালো লেগেছে…”
সেই সহজ, অকপট স্বীকারোক্তি ওর মনে অদ্ভুত একটা ছাপ ফেলেছে।

নিজের ভাবনা বুঝতে পেরে ও যেন একটু থমকে গেল।

এসব কী ভাবছে ও?

একটা গভীর ভাবনার ভাঁজ পড়লো কপালে।
“আমি কি একটু বেশিই ভাবছি না?”
তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকালো, যেন নিজেকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনছে।
“নাহ, এত বেশি ভাবা ঠিক না।”

কিন্তু কিছু ভাবনা কি এত সহজেই দূরে রাখা যায়?

________________________

হেমন্তের পর শীত ঋতু পেরিয়ে বসন্তকাল আসি আসি করছে। বটতলায় বসে গিটারে টুংটাং শব্দ করছে রাহাত। একটা সুর তোলার চেষ্টা করছে কিছুক্ষণ থেকে।

রূপন্তি মুখ বাঁকিয়ে বলল, “রাহাত, কী করছিস? মনে হচ্ছে, গিটার না, পেঁপে কাটছিস!”

রাহাত চোখ ছোট করে তাকাল রূপন্তির দিকে, “চুপ করে থাক। বেশি কথা বলিস না। সুরটা একবার ঠিকমতো তুলতে দে, তারপরে তোর সমালোচনার জবাব দিচ্ছি।”

তুহিন বিরস মুখে বলল, “এই তোরা ঝামেলা পরে কর। আগে সুরটা তোল দেখি।

রাহাত গম্ভীর মুখে আবার গিটারে আঙুল রাখল। কয়েকবার টুংটাং শব্দের পর অবশেষে সুরটা মিলেছে।

রাহাত মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “হুহ, হয়েছে দেখলি? এখন রেডি হ, বটতলায় আজকে কনসার্ট হবে!”

বিনীতা হেসে বলল, “এবার তাহলে গান ধর… দেখি কনসার্ট কেমন জমে।”

রূপন্তি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “সবাই চুপ! আমি শুরু করছি।”

রাহাত সুর তোলার সঙ্গে সঙ্গে রূপন্তি গাইতে শুরু করল—

“এমন যদি হতো
আমি পাখির মত
উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ…”

তুহিন ছন্দে তাল দিতে দিতে বলে উঠলো, “কিন্তু পাখি হয়ে উড়তে গিয়ে যদি গাছের ডালে আটকে যাস, তখন কিন্তু আমাদের ডাকিস না!”

ওর কথায় সবাই একসাথে হেসে উঠলো।

হাসির মাঝেই মিথিলা ফোঁড়ন কাটলো, “তোকে ডাকবে কোন দুঃখে? আমাদের সাফিন ভাই আছে না, সে ঠিক আসবে প্রেয়সিকে বাঁচাতে! তাই না রে, রুপন্তি?”

বিনীতা মজা করে বলল, “সে তো ওয়ার্ডে দৌড়াদৌড়ি করেই সময় পায়না, বটতলায় আসবে কখন?”

“আমাদের রূপুর জন্য ঠিকই সময় হবে।”

রূপন্তি চোখ কুঁচকে সবার দিকে তাকাল, “এই তোরা কি শুরু করলি?”

রাহাত হাসতে হাসতে বলল, “কেন? মিথ্যে বললাম নাকি? দরকার হলে সাফিন ভাই বটগাছ বেয়ে উঠে তোকে ডাল থেকে নামিয়ে আনবে! তুই গাইতে থাক!”

আবারো সবাই হেসে উঠতেই রূপন্তি ভ্রু তুলে গম্ভীর ভঙ্গিতে তাকালো। রাহাতকে খোঁচা দিয়ে বলল, “দেখিস হাসতে হাসতে আবার গিটারের সুর ভুলে যাস না যেন!”

রাহাত গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে বলল, “আমার গিটার বাজানো যেমন নিখুঁত, তেমনি সাফিন ভাইয়ের উদ্ধার মিশনও পারফেক্ট হবে। চিন্তা করিস না!”

মিথিলা হাসতে হাসতে বলল, “রূপন্তি, যদি কখনো সত্যিই বটগাছের ডালে আটকে যাস, তাহলে সাফিন ভাই কে কল দিস! তবে ডালে আটকানোর আগে দেখে নিস উনি ডিউটিতে আছে কিনা!”

বিনীতা হাসতে হাসতে বলল, “ডিউটিতে থাকলে রূপন্তি অপেক্ষা করবে! ডালেই বসে থাকবে যতক্ষণ না সাফিন ভাই আসে!”

তুহিন বলল, “তুই বটগাছের ডালে ঝুলে আছিস আর সাফিন ভাই ডিউটি শেষে এসে তোকে উদ্ধার করছে, হাউ রোমান্টিক!”

বিনীতা হাসতে হাসতে বলল, “থাম ভাই, আমি আর হাসতে পারছি না!”

রূপন্তি চোখ ঘুরিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, “ওদের সাথে তুইও এমন করছিস, বিনীতা?

“আচ্ছা বাবা আর করছি না। রাহাত এবার গানটা শেষ কর!”

রাহাত আবার গিটারে সুর তুলেছে, “দেখিস, এই আড্ডা থেকে একদিন আমরা নিজেরাই গান রেকর্ড করে বিখ্যাত হয়ে যাব!”

“তাহলে আগে নাম ঠিক করতে হবে!” মিথিলা মজা করে বলল, “আমাদের ব্যান্ডের নাম কী হবে?”

“বটতলা ব্যান্ড!” বিনীতা হেসে বলল, “শুরুটা এখান থেকেই তো!”

তুহিন ততক্ষণে মাটিতে পা ঠেকিয়ে তাল দিতে শুরু করেছে। সবাই সুরের সঙ্গে গলা মেলালো।

গিটার বেজে উঠেছে, গাছের নতুন পাতা দুলছে বসন্তের হালকা বাতাসে; বন্ধুত্বের ছোট্ট মুহূর্তগুলো যেন গিটারের সুরের মতো… যার রেশ থেকে যায় দীর্ঘ সময়।

To be continued…

আজকের পর্ব কেমন লাগলো প্রিয়রা?

Loading spinner

Leave a Comment