লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০১
‘কিরে,এমন স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এই এক মিনিট,এক মিনিট,তুই কি ভাবছিস আমি এখন নেমে গিয়ে তোকে পা ধরে সালাম করবো? তাহলে বলবো, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা বন্ধ কর। তেমন কিছুই হবে না। শোন, এই বিয়েটা আমি শুধু আমার বাবা মার জন্য করেছি। তোকে আমি স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আর সারাজীবন বেস্ট ফ্রেন্ডই থাকবি। তাই একদম স্বামীর অধিকার দেখাতে আসবি না,বুঝেছিস?’
কথাটা বলেই তনিমা সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার সদ্য বিবাহিত স্বামী ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজাটা আটকে দিয়ে এসে বিছানার সামনে দাঁড়ালো। ছোট বেলার বান্ধবী তার,তনিমা। এক সঙ্গেই বড় হয়ে উঠা। স্কুল,কলেজ,ভার্সিটি সব কিছুই এক সাথে। ছোট্ট বেলা থেকেই তার পছন্দের তালিকায় তনিমার অগ্রাধিকার সবচেয়ে বেশি ছিল। মেয়েটাকে সে পছন্দ করতো। হয়তো সে পছন্দটাই কোন এক সময় ভালোবাসার রূপ নেই। তবে বন্ধুত্বের খাতিরে কথাটা আর বলা হয়ে উঠেনি। ভালোবাসাটা মনের কোণেই পড়ে থাকে। ভেবেছিল হয়তো এই ভালোবাসা আজীবন এই মনকোণেই রয়ে যাবে, তবে না তা আর হলো না। এক বিশাল সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছে বলেই হয়তো তনিমা আজ তার বউ। এবার পালা শুধু সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর।
বিছানার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ফায়াজ কর্কশ গলায় বলে উঠলো,
‘ঐ,হারামী পুরো বিছানা নিয়ে শুয়ে আছিস কেনো? আমি কোথায় শুবো?’
তনিমা ঘুম ঘুম চোখে একবার ফায়াজের দিকে তাকিয়ে আবারো বালিশে মুখ ডুবালো। তারপর ক্লান্ত কন্ঠে বললো,
‘এত বড় মেঝেটা কি তোর চোখে পড়ে না? বিছানায় জায়গা না হলে নিচে শো।’
ফায়াজ এবার ক্ষেপে গেলো। তনিমাকে শোয়া থেকে টেনে উঠিয়ে বললো,
‘এটা আমার বাড়ি, আর এটা আমার রুম। আর তুই কিনা আমার রুমে থেকে আমাকেই বলছিস নিচে শুতে। এতবড় সাহস?’
তনিমা বড় করে একটা হাই তুললো। তারপর চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তির সুরে বললো,
“আমি বরাবরই সাহসী। তোর মতো ভীতু না। তো কি যেনো বলছিলি,এটা তোর বাড়ি আর এটা তোর রুম তাই তো? ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আমার একমাত্র মাদার ইন লো আমাকে বলেছে আজ থেকে এই বাড়ি এই ঘর সবকিছুতে আমার সমান অধিকার থাকবে। তাই এখন থেকে তোর আর একার কিছু রইল না যা আছে সবকিছু আমাদের দুজনের।সো এই হিসেবে এই রুমটাও এখন থেকে আমার। তাই আমার যেখানে খুশি আমি সেখানে ঘুমাবো। তোর অসুবিধা হলে তুই অন্য কোনো অপশন খুঁজে নে। ওকে গুড নাইট।”
কথাটা বলেই তনিমা আবারও শুয়ে পড়লো। আর ফায়াজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসতে লাগল। এই মেয়েটাকে এখন তার মাথায় তুলে আছাড় মারতে ইচ্ছে করছে। একে তো এই মেয়ে তাদের বাসর রাতটা নষ্ট করেছে তার উপর এখন তাকে ঘুমোতেও দিচ্ছে না। ফায়াজ কিছুক্ষণ ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তনিমার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই সে মুচকি হেসে তনিমার একদম গা ঘেঁষে শুয়ে পড়লো। ফায়াজের শরীরের স্পর্শ পেয়েই তনিমা হকচকিয়ে উঠল। বড় বড় চোখ করে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘কি সমস্যা?দূরে যা।’
তনিমার কথাই পাত্তা না দিয়ে ফায়াজ উল্টো তার আরো কাছে এসে শুলো। তারপর সে দুষ্টু হেসে তনিমাকে বললো,
‘এই তনু, আমার না বাসর বাসর ফিল হচ্ছে।’
তনিমা চটজলদি ফায়াজের কাছ থেকে সরে এসে রাগি গলায় বললো,
‘বাজে কথা বলবি না একদম। ভালোই ভলোই বলছি দূরে গিয়ে শো। নাহলে কিন্তু..’
‘নাহলে কি করবে বেবি? আদর করবে বুঝি?’
কথাটা বলেই চোখ মারলো,ফায়াজ। তনিমার এবার চোখ বেরিয়া আসার উপক্রম। ফায়াজের মুখে এই ধরনের কথাবার্তা গুলো তনিমা ঠিক হজম করতে পারছে না। তনিমা রাগ দেখাতে গিয়েও পারলো না। কেনো যেনো লজ্জা লজ্জা লাগছে। যতই হোক এই মানুষটা তো তার স্বামী আর আজ তাদের বাসর রাত। তনিমার লজ্জাটা তার চোখে মুখে ভেসে উঠলো। ফায়াজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটাকে এর আগে কখনোই এইভাবে লজ্জা পেতে দেখেনি সে। মেয়েটার লজ্জামাখা মুখটা কি মায়াবী!তনিমার লজ্জাটা কে আরো বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফায়াজ ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো,
‘কিরে লজ্জা পাচ্ছিস নাকি? এই তোরও কি আমার মতো বাসর বাসর ফিল হচ্ছে নাকি? বলতে পারিস,আমি আছি তো তোর সব ইচ্ছে পূরণের জন্য।’
তনিমা লজ্জা রাঙা মুখটা লাল হয়ে উঠল। সে বেশ বুঝতে পারছে ফায়াজ যে ইচ্ছে করে তাকে লজ্জায় ফেলছে। তনিমা এবার জোরে একটা শ্বাস টানলো। লজ্জা রাঙা মুখটাকে শক্ত করে বললো,
‘আমার কি মানুষের অভাব পড়ছে যে আমি তোর মতো হনুমানের সাথে বাসর করবো?’
ফায়াজ এবার ভীষণ অবাক হওয়ার ভঙ্গিমা করে বললো,
‘আসতাগফিরুল্লাহ,শেষ পর্যন্ত তুই পরকীয়া করবি? ভাবা যায় এসব? ছি,ছি ভাবতেই তো আমার গা গুলিয়ে উঠছে।’
তনিমা এবার ভীষণ ক্ষেপে গেলো।রাগি গলায় বললো,
‘এই তোর ফালতু কথা বন্ধ করতো। আর সর তুই,আমি এখন ঘুমাবো। ঘুম পাচ্ছে অনেক।’
‘তো ঘুমানা,আমি কি তোর চোখে ধরে আছি নাকি যে তুই ঘুমাতে পারছিস না।’
তনিমা এবার জোর গলায় বললো,
‘আরে বা*,আমার জায়াগা থেকে সর না। তুই তোর বালিশে যা।’
ফায়াজ এবার মুচকি হেসে সরে এলো। তনিমা শুতেই ফায়াজ আবারও তার কিছুটা কাছে গিয়ে বললো,
‘এই শোন,একটা ইম্পোরটেন্ট কথা।’
তনিমা বিরক্তির সুরে বললো,
‘আল্লাহর ওয়াস্তে বলে আমাকে উদ্ধার কর।’
ফায়াজ গম্ভীর গলায় বললো,
‘শোন,বাইরের কারোর সামনে কিন্তু তুই আমার সাথে তুইতোকারি করিস না। আই মিন সবার সামনে আমরা এক জন অন্য জনকে তুমি বলে সম্বোধন করবো আর যখন কেউ থাকবে না তখন চাইলে তুই করে বলতে পারিস।’
তনিমা কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
‘আচ্ছা,ঠিক আছে। যা এবার ঘুমা।’
‘ওকে,গুড নাইট।’
তনিমা হতাশ কন্ঠে বললো,
‘তুই সাথে থাকলে আমার নাইট আর গুড হবে না বরং বেডই থাকবে।’
তনিমার কথার প্রতি উত্তরে ফায়াজ কিছু বললো না। বেশ কিছুটা সময় যাওয়ার পরও ফায়াজের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে তনিমা পেছন ফিরে তাকালো। দেখলো ফায়াজ উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে আছে। তনিমার হঠাৎ করেই মন খারাপ হয়ে গেলো। ফায়াজ কি তার কথায় কষ্ট পেয়েছে? ও তো শুধু মজার ছলে কথাটা বলেছে। তনিমা ফায়াজকে ডাকতে গিয়েও ডাকলো না। মন খারাপ করে সেও উল্টো পাশে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো।
দরজায় একটার পর একটা করাঘাত পড়ছে। কিন্তু তনিমা কিংবা ফায়াজের সেদিকে খেয়ালই নেই। তারা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। দুজনেই ঘুমে গাঁধা। একবার ঘুমালে আর দিন দুনিয়ার খবর থাকে না। এদিকে দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ফায়াজের বোন ফিহা এবার ভীষণ বিরক্ত হয়। তখন থেকে সে ডেকেই চলছে অথচ কারো দরজা খোলার নামই নেই।ফিহা এবার চেচিয়ে উঠে বলে,
‘এই ভাইয়া,ভাবি দরজাটা খোল না আর কত ঘুমাবি? নিচে তোদের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে তো। এই ভাইয়া..’
অপর পাশ থেকে কোনোপ্রকার সাড়া শব্দ না পেয়ে ফিহা এবার রেগে সেখান চলে যায়। আর ডাকবে না সে। যখন ইচ্ছে তখন উঠুক তার কি।
.
ঘড়ির কাটায় যখন দশটা বাজে তখনি তনিমার ফোনটা বেজে উঠে। পর পর দুবার রিং হওয়ার পর তনিমার কানে সেই শব্দটা পৌঁছায়। চোখ না খুলেই সে বালিশের পাশে থেকে হাতড়ে মোবাইলটা নেয়। কোনোরকমে ঠেলে ঠুলে চোখের ভারি পল্লব গুলো খুলে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকায় সে। মোবাইলের স্ক্রিনের উপর আম্মু নামটা দেখে চটজলদি কলটা রিসিভ করে। ঘুমঘুম কন্ঠে বলে,
‘হ্যাঁ,আম্মু বলো..!’
মেয়ের কন্ঠ শুনে মা তানিয়া বেগমের আর বুঝতে বাকি রইল না যে মেয়ে পড়ে পড়ে এখনো ঘুমাচ্ছে।তিনি তখন শক্ত গলায় বললেন,
‘তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস,তনু?’
‘হুম।’
তানিয়া বেগম এবার রেগে যান। মেয়েকে কর্কশ গলায় বললেন,
‘এই ফাজিল,কয়টা বাজে জানিস? ১০টা বাজে আর তুই এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস? তোকে না আমি বলে দিয়েছি শ্বশুর বাড়িতে এত বেলা পর্যন্ত কোনো বউ ঘুমায় না। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়তে। একটা কথাও শুনিস না। এখন জলদি উঠ। ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে যা।’
তনিমা ঠোঁট উল্টে বললো,
‘আম্মু, আমার না এখনো অনেক ঘুম পাচ্ছে। চোখের পাতা খুলতেই পারছি না।’
তানিয়া বেগম এবার বিচলিত কন্ঠে বললেন,
‘মা,এমন করে না। বেলা পর্যন্ত ঘুমের অভ্যাস এখন যে তোকে বাদ দিতে হবে। উঠে পড় মা।’
‘আচ্ছা উঠছি। তুমি রাখো।’
ফোনটা কেটে দিয়ে ভালো ভাবে চোখ মেলে তাকালো,তনিমা। তার পাশে থাকা মানূষটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর কি ভেবে মুচকি হেসে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
চলবে..