গল্প: বিরহ বৃত্তান্ত(০২)

লেখিকা: জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

পর্ব:০২


কেঁদে-কেটে ভয়ানক অবস্থা। মেহেরুন আজ কোনোভাবেই তার শ্বশুরবাড়িতে যাবে না। অন্যদিকে তাকে এখানে ফেলে তার স্বামীও নড়বে না একচুল। ওয়াহীদকে শিকদার সাহেব অনেক করে বুঝিয়েও কোনো ফায়দা করতে পারলেন না। ছেলেটা জেদি, তবে আজ জেদটা একটু বেশিই দেখাচ্ছে। শেষে পরাস্ত হয়ে নিয়াজকেই অনুরোধ করলেন, মেয়েটাকে যেন রাজি করায়।

‘মা, বাড়িটা তো পাশেই। দু কদম হাঁটলেই চলে আসা যায়। যখন ইচ্ছে এ বাড়িতে চলে আসবি।’

‘তাও বাবা, আমি এখনই ঐ বাড়িতে যেতে চাচ্ছি না।’

‘জামাই চাইছে, মা। আর জেদ করিস না।’

মায়ের কথায় রাগ হলো মেহেরুনের, ‘সবকিছু জামাইয়ের চাওয়া মতো কেন হতে হবে? আমার কি কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই?’

‘না, নেই। বিয়ের পর তোমার স্বামীর চাওয়া-পাওয়াই তোমার চাওয়া-পাওয়া। স্বামীর সুখই তোমার সুখ। উঠো। দশ মিনিটের জায়গায় এক ঘন্টা সময় নষ্ট করেছ আমার।’

দরজার ওপারে দাঁড়ান লোকটাকে দেখে মেজাজ হারাল মেহেরুন। ভীষণ রাগে শরীর রি রি করে ওঠল। তবে বলতে পারল না কিছুই। তার বাড়ির মানুষগুলোও হয়েছে এক! এই ছেলের মধ্যে এত কী দেখেছে কে জানে?

দাদি কপাল কুঁচকে ওয়াহীদের দিকে ফিরলেন। গম্ভীর গলায় শুধালেন, ‘এই যে নাত জামাই, অতো পাগল হইছো ক্যান? মাইয়া তো আমাদের পালাই যাইতেছে না। অনুষ্ঠানের পরও তো বাড়িতে তুলতে পারবা।’

ওয়াহীদ হাত ঘড়িতে সময় দেখল আগে। এরপর তাকাল দাদির কোঁচকান মুখটার দিকে। ফিচেল হাসল সে। বলল, ‘সুন্দরী বউ দাদি, রিস্ক নিতে চাইছি না।’

দাদি হাসলেন দাঁত বের করে। ওয়াহীদের পেশীবহুল হাতে একটা চাপড় মেরে বললেন,

‘হ, বুঝি সব। ঘন্টা কাটল না বিয়ার এখনই এমন বউ পাগল! ও মেহেরুন, জলদি যা। জামাইডারে আর কষ্ট দিস না।’

মেহেরুন বিরক্ত হলো। বজ্জাত লোকটা দাদিকে উল্টা-পাল্টা বোঝাচ্ছে। সে নাক টেনে বলল, ‘কষ্ট তো তোমরা পাচ্ছ, দাদি। খুব জ্বালিয়েছি কিনা এখন তাড়াতাড়ি বিদায় করতে চাইছ কোনরকম। ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। আর আসব না।’

শাড়ির আঁচল টেনে উঠে দাঁড়াল মেহেরুন। তারপর তার একমাত্র ভাই আর ছোট চাচার মেয়ে ফিহার দিকে চেয়ে বলল,

‘তোরাও চল আমার সাথে।’

‘ওরা কোথায় যাবে?’

ছোট চাচি এগিয়ে এলেন। বোঝালেন মেহেরুনকে, ‘ঐ তো সামনের বাড়িটা। ওরা তো সারাক্ষণই যেতে আসতে পারবে। এখন বরং তুমি আগে যাও।’

মেহেরুনের মাও সায় দিলেন তাতে। মেহেরুনের মন তাতে ভার হলো আরো। মেঘলা আকাশের মতো কালো হলো তা। বাইরে থেকে ওয়াহীদ তখন ফের বলে উঠল,

‘সময় গড়াচ্ছে, মেহেরুন। চলো।’

মেহেরুন মা-বাবার বাধ্য মেয়ে। কখনো কারোর কথা অমান্য করেনি। আর সেই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতেই জীবনের এত বড়ো একটা সিদ্ধান্তও সে হুট করেই নিয়ে নিল। সেভাবে ভাবা হলো না কিছু। শখ পূরন করা হলো না কোনো। আদতে সে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে না ঠিক সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না এখন।

খুব কেঁদে-কেটে কাহিল হয়ে বাইরের উঠোনে পা রাখল মেহেরুন। পাশেই ওয়াহীদ। বড্ড বীতঃস্পৃহ। সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া শেষে এবার সে মেহেরুনের হাত ধরল। কান্না দমাল মেয়েটা। স্বামীর দিকে তাকাল ছলছল চোখে। ওয়াহীদের দৃষ্টি সামনে। পা বাড়াতে নিলেই মেহেরুন জিজ্ঞেস করল,

‘ঐদিকে কোথায় যাচ্ছেন?’

‘আমাদের বাড়ির পথ তোমার অচেনা নয় নিশ্চয়ই?’

‘কিন্তু ঐদিকে যেতে তো সময় লাগবে। মনিদের উঠোন দিয়ে গেলেই তো হয়।’

‘বাড়ির পাঁকা রাস্তা থাকতে আমি কেন অযথা অভদ্র, মূর্খের মতো অন্যের বাড়ির উঠোন ডিঙাতে যাব?’

ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যে তাকে অভদ্র আর মূর্খ বলা হলো তা আর মেহেরুনের বুঝতে বাকি নেই। রাগ হলেও বলল না কিছু। বুঝল, ওসব উনার ভদ্রতা বা জ্ঞানীর লক্ষণ নয় বরং দম্ভ আর অহংবোধের বহিঃপ্রকাশ।

মেহেরুনকে নিয়ে এই রাতের অন্ধকারের মাঝেই প্রধান সড়কে গিয়ে উঠল ওয়াহীদ। সেখানে আবার একটা গাড়িও রাখা। মেহেরুন তা দেখে মৃদু হেসে বলল,

‘এখান থেকে এখানে যেতে আবার গাড়ি লাগে না-কি?’

‘আমার লাগে।’

এইটুক বলে গাড়ির দরজা খুলে তাকে চোখের ইশারায় ভেতরে বসতে বলল ওয়াহীদ। মেহেরুন অগোচরে ভেংচি কেটে গাড়িতে উঠল। বাইরে তার পরিবারের সবাই দাঁড়িয়ে। হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল তাদের। ওয়াহীদ পাশে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল এরপর। হয়তো সময় লাগল মিনিট পাঁচেক। পৌঁছে গেল তারা। শিকদার সাহেব আগেই চলে এসেছেন। তাদের বাড়িতে এক খালা কাজ করেন। তিনি ছোট ডালা সাজিয়ে এনে বরণ করলেন মেহেরুনকে।

বাড়ির ভেতরে মেহেরুন প্রথম আসেনি। আগেও তার ভাই-বোনদের সাথে অনেকবারই এসেছে। আনাচে-কানাচে ঘুরে ফিরে ছবি তুলেছে। তাকে বসার ঘরে বসানো হলো। ওয়াহীদ বসেনি। সে উপরে নিজের ঘরে চলে গিয়েছে। শিকদার সাহেব বললেন,

‘তোমার কিছু লাগলে তোমার এই খালাকে বলবে কেমন, মা? আর এখন ফ্রেশ হয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ো। আবার সেহেরিতে উঠতে হবে তো।’

মেহেরুন হেসে মাথা হেলাল। শিকদার সাহেবও নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন তখন। মেহেরুন বসে রইল একা। খালা মিষ্টির বাটি নিয়ে এলেন। তা দেখে মুখ কালো করল মেয়ে। বলল,

‘অনেক মিষ্টি খেয়েছি আজ। আর খাব না।’

‘আইচ্ছা। এগুলা নিয়া উপরে যান। ছোট আব্বা আর আপনি দুজনে মিলে খান গিয়ে।’

ট্রে তে দুটো দুধের গ্লাসও আছে। মেহেরুন ইতস্তত সুরে বলল, ‘উনার ঘর কোনটা?’

‘দু’তালার একবারে পশ্চিম পাশের ঘরটা।’

ট্রে’টা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল মেহেরুন। লোকটা তখন গটগট করে নিজের ঘরে চলে গেলেন। একটাবারের জন্যও মেহেরুনের দিকে চাইলেন না। সে তো এখানে নতুন। এত নির্দয় হয় কেউ!

মেহেরুন ধীর পায়ে খালার বলা ঘরটার সামনে এসে থামল। দরজা ভেজানো। হালকা ফাঁক আছে। আস্তে করে ঠেলে দিয়ে ভেতরে আসতে নিলেই ঘরের ভেতর থেকে কেউ তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,

‘কারোর ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি নিতে হয়, এইটুকু কমনসেন্স আছে নিশ্চয়?’

পা থেমে গেল সেখানেই। মেহেরুন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। মাথা নুইয়ে ক্ষীণ সুরে জিজ্ঞেস করল,

‘আসব?’

‘হু।’

ভেতরে এল সে। দেখল ভদ্রলোক ইজি চেয়ারে চোখ বুজে বসে আছে। চোয়াল শক্ত এখনো। মেহেরুন আমতা আমতা করছে। কী বলবে, কীভাবে বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।

‘অযথা আহাম্মকের মতো চেয়ে থাকা আমার পছন্দ নয়। কিছু বলার হলে বলে ফেলা হোক।’

মেহেরুন কপাল কুঁচকাল। লোকটা এমন কাঠখোট্টা কেন? বাবা যে বললেন, কত নম্র, ভদ্র। এই তার নমুনা! হঠাৎ তার টনক নড়ল। আচ্ছা, লোকটার কি এই বিয়েতে মত ছিল না? হয়তো তাকে পছন্দ হয়নি, বাবার কথা রাখতে বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছে হয়তো।

মেহেরুন এগিয়ে গেল আরো কিছুটা। সরাসরি তাকাল লোকটার কঠিন মুখের দিকে। দেখতে সুদর্শন, সুপুরুষ বটে। কেবল আচার-আচরণটা এমন রুক্ষ না হলেই হতো। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়নি?’

চোখ খুলল ওয়াহীদ। মেহেরুনের সংকুচিত মুখটার দিকে দৃষ্টি ফেলল। চোখ, নাক, ঠোঁট সব মেপে নিয়ে বলল,

‘বিয়ে আমার জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এবং তুমিও এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নও যে তোমাকে আমার পছন্দ করে বিয়ে করতে হবে।’

‘তাহলে বিয়েটা কেন করলেন?’

‘আব্বা চেয়েছেন তাই।’

সোজাসাপ্টা উত্তর ওয়াহীদের। মেহেরুনের মন খারাপের পাল্লা ভারী হলো আরো। সে মাথা নুইয়ে মৃদু সুরে বলল,

‘খালা এগুলো আপনাকে খেতে দিয়েছেন।’

‘রেখে দাও। আমি এই সময় কিছু খাই না।’

মেহেরুন ট্রে টা একটা ছোট কেবিনেটের উপর রাখল। এরপর ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে এসে সে ওয়াহীদকে পেল বিছানায়। লম্বা হয়ে শুয়ে আছে সে। মেহেরুন চুপচাপ গিয়ে পাশে বসল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওয়াহীদ বলে উঠল,

‘বসলে যে? সেহেরির আয়োজন কে করবে?’

মেহেরুন মাথা ঘুরিয়ে চাইল। চমকাল বোধহয়। ওয়াহীদ আগের মতোই।

‘অতো চমকানোর মতো কিছু হয়নি। বিয়ে করে এনেছি ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য নয়। নিচে যাও। সেহেরিতে আজ তুমি রাঁধবে।’

মেহেরুন মাথা নুইয়ে বলল, ‘আমি রান্নায় পটু না।’

‘যা পারো করো। যাও।’

মেহেরুনের যেতে ইচ্ছে করছে না। মাত্র বিয়ে হলো, তাও আচানক। সে কোনোকিছুর জন্যই প্রস্তুত নয়। রান্নাঘরে গিয়ে কী রাঁধবে? টুকটাক পারলেও ঘরের বউয়ের মতো রান্না তো সে কখনো করেনি।

‘তুমি কি কানে খাটো? এক কথা আমাকে বারবার বলতে হচ্ছে কেন?’

মেহেরুনের দিকে বিরক্তির চোখে চেয়ে রইল ওয়াহীদ। উপায়ান্তর না পেয়ে মুখ কালো করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। ওয়াহীদ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল এরপর। চোখ বুজল আবার।

রান্নাঘরে গিয়ে খালাকে পেল মেহেরুন। কী যেন করছেন। সে এগিয়ে গেল। বিষন্ন গলায় বলে উঠল, ‘কী রাঁধব, খালা?’

মেহেরুনকে দেখে খালা হকচকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি এই সময় এখানে কী করেন, খালা? ঘরে যান ছোট আব্বার কাছে।’

ভেংচি কাটল মেহেরুন। পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে তরকারি দেখতে দেখতে বলল, ‘আপনার ছোট আব্বাই পাঠিয়েছেন, রান্না করার জন্য।’

‘সেকি! আজ না আপনাদের বাসর রাত?’ বলেই আঁচলে মুখ চেপে হাসলেন খালা।

মেহেরুন নিরস মুখে চাইল। চোখ মুখ অন্ধকার তার। মেজাজ খারাপ করে বলল, ‘কচুর বাসর রাত। ঐ লোকটা একটা অভদ্র। নতুন বউয়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তাও জানেন না।’

‘এমনে বলতে হয় না, খালা। উনি আপনার স্বামী। আর স্বামীরা অমন কিন্তু মেজাজী’ই হয়। স্ত্রীর আদর সোহাগ পেলেই সব ঠিক হইয়া যাবে।’

‘হয়েছে, ওসব বাদ দিন। এখন আমাকে কী করতে হবে তা বলুন।’

‘কিচ্ছু করতে হইবে না, খালা। আমার সব রান্না-বান্না শেষ। আপনি গিয়া শুয়ে থাকেন। যান।’

মেহেরুন ধীর পায়ে আবার ঘরে ফিরে এল। ভেতরে এখন আর আলো নেই। লোকটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। মেহেরুন পা টিপে টিপে ভেতরে এল। দূরে হালকা আলোয় একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বালান। বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটা একপাশ ফিরে আছে। এই সুযোগ, এখনই চুপচাপ করে গিয়ে মেহেরুনকে শুয়ে পড়তে হবে। লোকটা জেগে গেলেই সর্বনাশ।

চলবে….

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x