পর্ব:০৪
লেখনীতেঃ অলকানন্দা ঐন্দ্রি
একটা মেয়ের মা হওয়ার স্বপ্ন, মা মা অনুভূতি, প্রথম সন্তানকে তার নিজের স্বামীই যেখানে শেষ করতে উঠে পড়ে লেগেছে সেখানে মিথি কি করে বিশ্বাস করবে ওর জ্ঞান হারানোর ঐ সময়টুকু আদ্র কাজে লাগায়নি? ঐ সময়টুকুতে যে তার সন্তানকে নিঃশেষ করবে না এতোটা ভদ্র মানুষ তো আদ্র নয়। মোটেই নয়! মিথি কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে হেচকি উঠে যায় মেয়েটার। ডক্টর ফাজরিন একাধারে শুধু বুঝিয়েই চলেছে যে কিচ্ছু হয়নি। তার সন্তান ঠিক আছে। ফাজরিন কিছুই করেনি মেয়েটার, কিছুই না। ওর সন্তান নিরাপদ আছে। এইটুকু মিথি বিশ্বাসই করতে চাইল না যেন। বারবার কান্নার দরুন হেচকি তুলছিল। ঠিক সে সময়ই মিথির সামনে এসে বসল তারই ফুফি। আদ্রর মা। মিথির দিকে অনেকটা রাগ রাগ চাহনি নিয়েই চাইল ও। গম্ভীর দৃঢ় গলায় শুধাল,
“ এবরশন করাতে এসেছিস মিথি? একটা বাচ্চা তুই সামলাতে পারবি না? নিজে মা হয়ে নিজেই এসেছিস এবরশন করাতে? লজ্জা হচ্ছে না তোর? ”
মিথি এতোটা সময় পর কান্না থামাল। তবুও হেচকি থামছে না মেয়েটার। কান্না চেপে সে ফুফির দিকে চাইল বিস্ময় নিয়ে। ফুফি কি করে জানল বিষয়টা? কি করেই বা জেনেছে এখানে এবরশন করাতে এসেছে? কে বলেছে? মিথির মাথায় এতগুলে প্রশ্ন ঘুরফিে করতেই পুনরায় কেঁদে উঠল ও। ঠোঁট কাঁমড়ে সে কান্না আটকানোর চেষ্টা চালাতেই আদ্রর মা আবারও বলল,
“ আদ্র কোথায় ? ওকে না বলে এসেছিস তুই? এতবার কল করছি, কল তুলছে না কেন ও? আর তুই? তুই কি করে পারলি এসব ভাবনাচিন্তা করতে মিথি? কবে থেকে তুই এতোটা চালাক হলি যে নিজে নিজে নিজের সন্তানকে শেষ করতে হসপিটালে চলে এলি? ”
মূলত আদ্রর মা-বাবা এতরাতে হসপিটালে এসেছিল আদ্রর দাদীকে নিয়ে। শ্বাসকষ্ট উঠে অবস্থা গুরুতর ঠেকছিল বলেই আনা হয়েছিল। অথচ আসার পর এখানে কিভাবে যেন দেখে ফেললেন মিথিকে। তখন মিথির জ্ঞান নেই। নার্সকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলেন এবরশন করাতে এসেছে। শুধু মিথিকেই দেখেছিলেন উনি, আদ্রকে নয়। যার ফলস্বরূপ দোষটা একতরফাভাবে মিথিকেই দিয়ে যাচ্ছেন। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। দম আটকে আসে যেন। মিথি কি বলে দিবে যে উনার নিজের ছেলেই চায় না তার গর্ভে বাচ্চাটা বেড়ে উঠুক? মিথি কি বলে দিবে তার ছেলেটা কি পরিমাণ অমানুষ? মিথির তাকিয়ে থাকার মাঝেই আদ্রর মা আবারও বলল,
“ কথা বলছিস না কেন মিথি? তোকে ছেলের বউ করে এনেছি আমিই, মেয়ের মতো ভালোবেসেছি। কিন্তু তাই বলে তুই যাই করবি তাই মেনে নিব না আমি। বল কেন করেছিস এমনটা? ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। উত্তর দেওয়ার জন্য যেই মুখ খুলবে ওমনিই ফোন বাজল। কে কল করল বুঝা গেল না। তবে আদ্রর মা কল তুলেই রাগী স্বরে বলে উঠলেন,
“ কোথায় তুমি? কতবার কল দিয়েছি আদ্র? মিথি কোথায়? কি করেছো ওর সাথে? ও হসপিটালে কেন? ”
আদ্র একদম ভদ্রভোলা, কিছুই জানে না এমন ভঙ্গি করে উত্তর করল ওপাশ থেকে,
“ কোন হসপিটালে? ”
উনি হসপিটালের নাম বললেন। অতঃপর আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
“ এবার বলো, কি করেছো? ”
“ কি করব? কিছু করিনি তো আম্মু। তাছাড়া ও কোথায় কিভাবে জানব আমি আম্মু বলো? ”
“ তুমি ছাড়া কে জানবে? বাড়িতে তুমি ছাড়া তো কেউ থাকার কথা নয়। বলো কি করেছো ওর সাথে? ওর চোখমুখের অবস্থা এমন কেন? ”
আদ্র আবারও কিছু জানে না এমন ভঙ্গিতে বলল,
“ আমি তো জানি না। আমি মুহুর কাছে আম্মু। ”
“ মুহুর কাছে? তুমি আবার মুহুর কাছে গিয়েছো আদ্র? সময় দিচ্ছি তোমায়, জাস্ট দশ মিনিট। দশ মিনিটের মধ্যে তুমি হসপিটালে এসে পৌঁছাবে।”
এইটুকু বলেই কল রাখল আদ্রর মা। মিথির চোখমুখে তাকিয়ে স্পষ্টই দেখল আঘাত গুলো। বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে আঘাতগুলো। ঠোঁটের কোণায়, কপালর এমনকি গালগুলোও কালচে কালচে হয়ে আছে। শুধাল,
“ মুখচোখের এই হাল কেন তোর? কি হয়েছে? বল। ”
মিথি তাকায়। একদিকে যেমন সাহস হয় বলে ফেলতে তেমনই অন্য দিকে ভয় হয় আদ্রর। বলবে? ফুফিকে বলে দিবে সব? এসব ভাবতে ভাবতেই মিথি হুট করেই উত্তর দিল,
“ ফুফি, আমি, আমি পড়ে গিয়েছিলাম ফুফি। ”
মিথি এর আগেও আদ্রর হাতে মার খেয়েছে। এবং জিজ্ঞেস করলে এমনভাবেই অযুহাত দিত। মিথি আজও অযুহাত দিল অজানা ভয়ে। বারকয়েক শ্বাস ফেলে আবারও বলল,
“ আমি এবরশন করাতে চাই না ফুফি। বিশ্বাস করে, এখানে আমি মোটেই এবরশন করাতে আসিনি। ”
আদ্রর মা শুনল। মিথির দিকটা চেয়ে এরপর আর কোন প্রশ্ন করলেন না উনি। তবে নার্সকে বললেন কাঁটা জায়গা গুলো পরিষ্কার করে ঔষুধ লাগিয়ে দিতে। অতঃপর একটা সময় পর আদ্র এল। আদ্র হসপিটালেই ছিল। নিজের আম্মুকে মিথির পাশে তখন দেখেই পালিয়েছিল একপ্রকার যাতে মায়ের চোখে না পড়তে হয়। অতঃপর এতোটা সময় ঘাপটি মেরে ছিল হসপিটালে। মা কল করে বলাতেই সে এসেছে এখানে ভাবখানা এমন করে সে এসেই শুধাল,
“ আম্মু তোমরা এখানে? ”
“ তুমি সত্যিই জানো না কিছু আদ্র? ”
“ নাহ তো, কি হয়েছে আম্মু? ”
“ মিথি মা হতে চলেছে তুমি জানতে নাহ? ও এতরাতে হসপিটালে কেন আদ্র? তাও আবার এবরশনের জন্য? তুমি কিছুই জানো না? যেখানে বাচ্চাটা তোমার আর মিথির।
”
আদ্র মুহুর্তেই মুখেচোখে বিস্ময়ভাব আনল। মায়ের দিকে চেয়ে মিথ্যে ঢং করে দ্রুত শুধাল,
“ হোয়াট? কি বলছো তুমি আম্মু? ”
আদ্রর মা ছেলের দিকে তাকাল। বলল,
“ তুমি সত্যিই জানো না আদ্র? ”
আদ্র সোজাসুজিই উত্তর করল,
” না আম্মু, সত্যিই জানি না। ”
আদ্রর মা এবার মিথির দিকে তাকাল। বলল,
“ মিথি, বাচ্চাটা আদ্ররও। তুই ওকে জানসনি কেন একবারও? ওর জানার অধিকার ছিল তো তাই না? ”
মিথি এতোটা সময় আদ্রর অভিনয় দেখছিল। কি দারুণ মিথ্যে বলে আদ্র। কি সুন্দরভাবে গুঁছিয়ে, সাঁজিয়ে মিথ্যে বলে। কথাগুলে একদমই মিথ্যে বলে মনে হয় না। তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকাতেই আদ্রর মায়ের কথার বিপরীতে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর করল,
“ বাচ্চাটা আমার না আম্মু, মিথির সাথে আমার তেমন কোন সম্পর্ক গড়েই উঠেনি যে ও আমার বাচ্চার মা হবে। এটা অন্য কারোর বাচ্চা। তোমার আদরের পুত্রবধূ নিশ্চয় অন্য কারোর সঙ্গে সম্পর্কে ছিল আম্মু।এইজন্যই তো এই মাঝরাত্রিতে এবরশন করাতে এসেছে ও। ”
দুই দুইজন নার্স একদম সম্মুখেই এবং ডক্টর ফাজরিনও ছিল পাশের রুমে। এতগুলো বাইরের মানুষ এবং নিজের মায়ের সামনে নির্দ্বিধায় আদ্রর নিজের সন্তানকে, নিজের অংশকে অস্বীকার করতে দুবারও ভাবল না। মিথিকে চরিত্রহীন প্রমাণ করতেও দুবার ভাবল না।মিথি নিজের ভাগ্যের প্রতি উপহাস করল। কতটা সৌভাগ্য হলে ও এমন স্বামী পায় জীবনে? কতটা ভাগ্যবান হলে এতোটা কাপুরুষ জুটে কপালে? মিথি চাইল। আদ্রর দিকে সরাসরি নজর ফেলে শুধাল,
“ আদ্র, আমার চরিত্রকে পর্যন্ত ছাড় দিলেন না আপনার এই ষড়যন্ত্র থেকে? নিজের সন্তানকেই নিজে অস্বীকার করছেন? এতোটাই অমানুষ আপনি আদ্র! ”
আদ্র ক্ষিপ্ত চাহনিতেই তাকায়। উত্তর করল,
“ তোর চরিত্র যদি ভালোই হতো, যদি বাচ্চাটা আমারই হয় তাহলে তুই এতরাতে লুকিয়ে লুকিয়ে হসপিটালে এলি কেন এবরশন করাতে? বোকা পেয়েছিস আমায়?”
আদ্রর গলায় কতোটা আত্মবিশ্বাস।আদ্র কতোটা কনফিডেন্স নিয়ে মিথির প্রতি দোষ চাপাচ্ছে।অথচ মেইন কালপ্রিট ও। নিজের সন্তানকে নিজেই শেষ করতে হসপিটালে নিয়ে এসেছিল ও। আদ্র আসলেই মানুষ তো? মনুষত্ব্য আছে এই পুরুষটার? আদ্র কি জানে একজন নারীর জন্য তার চরিত্র কতোটা মূল্যবান? আদ্র জানে নারীর তার চরিত্রের পবিত্রতা কতোটা সাবধানতার সহিত রক্ষা করে চলে? জানে না!
চলবে…
[ পর্ব ছোট। দুঃখিত। আর হ্যাঁ, আদ্রকে নায়ক ভেবে থাকলে ভুল আপনারা। যায় হোক, কেমন হয়েছে জানাবেন। ]