Story:Snigdhokothar Premopakan (03)

কলমেঃআফসানা শোভা

 

[ এই গল্পের কোন থিম,প্লট কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ⛔]

সিএনজি ব্রেক কষায় একটা নামীদামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সামনে। কথা সিএনজি থেকে নেমে মাথা তুলে তাকায় ছয়তলা বিশিষ্ট সুউচ্চ দালানটির পানে। দালানটির মিডলের লোগোতে লেখা,

” Sahriar Apparels Group Ltd.”

কথা ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। প্রথম যখন চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে আসল, কস্মিনকালেও ভাবেনি এই শাহরিয়ার তার সেই চির অপ্রিয় ‘স্নিগ্ধ শাহরিয়ার’ হতে পারে। এই চাকরিটা কথার কি যে প্রয়োজন একমাত্র কথাই জানে। সেই গ্রাজুয়েশনের সময় থেকে ও বিভিন্ন চাকরির বই পড়া শুরু করে। ভাগ্যক্রমে ও চাকরি তো পেল, কিন্তু যেই অতীত থেকে কথা সর্বদা পালিয়ে বেরিয়েছে ভাগ্য তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওই অতীতের দ্বারেই এনে ফেলেছে। কিন্তু কথা এবার পিছু হটবেনা। লড়াই করবে নিজের অতীতের, সেই প্রতারকের যে কিনা ওকে একদিন অকূলদরিয়ায় ছুঁড়ে ফেলে চলে এসেছিল। একটা প্রলম্বিত শ্বাস টেনে কথা কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে ভেতরে ঢুকে এলিভেটর যোগে কাঙ্ক্ষিত ফ্লোরে আসে। মূল এন্ট্রান্সের রিসেপশন ডেস্কে ওইদিনের মেয়েটা বসে আছে। কথা এগিয়ে এসে বললো,

– এক্সকিউজ মি। মাইসেল্ফ অনন্যা ইয়াসমিন। নিউ জয়েনার।

– হ্যালো ম্যাম৷ কাইন্ডলি আপনার ফাইলটা দিন।

কথা মেয়েটাকে নিজের ফাইল এগিয়ে দিল। মেয়েটা ফাইলটা জমা নিয়ে মৃদু হেসে বলে,

– কংগ্রাচুলেশনস ম্যাম। আপনি ভেতরে যান অন বোর্ডিং টিম আপনার কাজ বুঝিয়ে দেবেন।

কথা ছোট করে বললো,

– থ্যাংকস।

অন বোর্ডিং টিম কথা সহ নিউ জয়েনারদের মিটিংয়ে নিজেদের কাজের প্রক্রিয়া বুঝিয়ে দিলেন।
কথা স্নিগ্ধর কোম্পানির একজন মার্কেটিং এক্সেকিউটিভ পদে জয়েন করেছে। ওর কাজ আপাতত
ডাটা এন্ট্রি, রিপোর্ট তৈরী করা, টিমকে রিসার্চ বা ডকুমেন্টস দিয়ে হেল্প করা। কথা যারপরনাই অবাক হলো যখন বোর্ডিং মিটিংয়ে স্নিগ্ধ শাহরিয়ারের দেখা পেল না। মনে মনে একটু স্বস্তিও বোধ করল স্নিগ্ধকে না দেখে। পরক্ষণে নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হলো কথা। যে মানুষটাকে একসময় একমুহূর্ত না দেখে কথার দিনরাত বিষাদে কাটতো, আজ তার অনুপস্থিতি কথাকে স্বস্তি দিচ্ছে আশ্চর্য!

রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঝিমুচ্ছিলেন একজন পৌঢ়া। বয়স আনুমানিক ষাট,পয়ষট্টির মতো হবে। শরীরে একটা সাদা জমিনের কাতান শাড়ি। একহাতে তসবিহ নিয়ে বিড়বিড় করছিলেন। বৃদ্ধা হলেন স্নিগ্ধর মা মিসেস সৌমি শাহরিয়ার।

স্নিগ্ধ বিড়াল পায়ে আধো-অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষটিতে প্রবেশ করে। দিনের আলোতেও কক্ষটিতে আলোআঁধারিয়ার প্রতিফলনে স্নিগ্ধ অবাক হলো না। কারণ তার মা দিনের বেলাতেও রুমটা অন্ধকার করে রাখে। সেই দূর্ঘটনার পর তার মা নিজেকে এক প্রকার গৃহবন্দী করে ফেলেছে। দিনের বেশিরভাগ সময় এই অন্ধকার কক্ষটিতে বসে কাটিয়ে দেন।
এসব কিছুর পেছনে একমাত্র দায়ী সে, ভাবতেই স্নিগ্ধর বুকে চিনচিনে ব্যথা জাগলো। একটা শুষ্ক ঢোক গলাধঃকরণ করে স্নিগ্ধ আড়ষ্ট গলায় ডাকল,

– মা আসব?

সৌমি শাহরিয়ার চোখ বন্ধ রেখেই প্রত্যিত্তর করলেন,

– এসো।

স্নিগ্ধ ইতস্ততভাবে সৌমি শাহরিয়ারের সামনে এসে দাঁড়াল। সৌমি শাহরিয়ার চোখ খুলে সরাসরি স্নিগ্ধর ফর্সা আলুথালু মুখপানে তাকালেন। ওনার শান্ত দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই স্নিগ্ধ চোখ নামিয়ে নিল। সৌমি শাহরিয়ার রাশভারি গলায় বললেন,

– কাল রাত কয়টায় বাড়ি ফিরেছ?

স্নিগ্ধ মাথা নিচু রেখেই ক্ষীণ স্বরে বললো,

– দু’টো বোধহয়৷

স্নিগ্ধ মিথ্যে বলার চেষ্টা করলোনা। কারণ সে কখন বাড়ি ফিরেছে তা তার মা খুব ভাল করেই জানে। সৌমি শাহরিয়ার রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। ফলস্বরূপ তার জানার কথা স্নিগ্ধ কখন বাড়ি ফিরেছে।

– আমি যতদূর জানি তুমি সোসাইটিতে একজন ভদ্রসভ্য মানুষ হিসবেই পরিচিত। কোন ভদ্রলোক রাতবিরেতে নেশা করে বাড়ি ফেরেনা। তোমার বাবা একজন শ্রদ্ধাভাজন মানুষ ছিলেন। তার ছেলে হিসেবে তোমার এই রূপ আমি মানতে পারলাম না স্নিগ্ধ।

মায়ের কণ্ঠে ‘তুমি’ ডাক স্নিগ্ধকে মনে মনে খুব ব্যথিত করলো। আজ কতগুলো বছর মা তাকে ‘বাবুন’ বলে ডাকেনা। সবসময় তুমি সম্বোধন করেন এখন তিনি। মা ছেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটাও কেমন পানসে হয়ে গিয়েছে।
অবশ্য এটাই স্বাভাবিক নয় কি? সে যে অপরাধটা করেছে, মা এতগুলো বছর যে তার সাথে কথা বলছে এটাই বেশি। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্নিগ্ধ অপরাধী কন্ঠে বললো,

– স্যরি মা৷

সৌমি শাহরিয়ার কোন কথা বললেন না। নিজের একমাত্র ছেলে যে পুরোপুরি উচ্ছন্নে গিয়েছে এত দিনে তিনি নিশ্চিত। ছেলের ভাঙা হৃদয়ের খবর আর কেউ না জানুক, কিন্তু উনি খুব ভাল করেই জানেন। ভেতরে ভেতরে তার ছেলেটা রোজ তড়পে তড়পে মরে। বুক চিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ওনার। দারাজ গলায় বললেন,

– তুমি সায়ান নও যে আমি তোমাকে বোঝাব। তুমি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছ স্নিগ্ধ। তোমার প্রতি কেবল আমার এতটুকু অনুরোধ থাকবে নিজের জীবনটাকে আর নষ্ট করো না। দুঃখ-কষ্ট, উত্থ্যান-পতন সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মানবজীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তার মানে এই না একটা ঝড়ে আমরা বিধ্বস্ত হয়ে নিজেকে ধ্বংস নামবো।

স্নিগ্ধ মাথা নিচু করে ওনার সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। সৌমি শাহরিয়ার আরেকপলক ছেলেকে দেখে নিয়ে বললেন,

– যাও এখন। নাস্তা খেয়ে অফিসে যাও।

স্নিগ্ধ বিনা উচ্চবাচ্য ব্যয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ও যেতেই সৌমি শাহরিয়ারের বয়সের ভারে কুঁচকে যাওয়া চোখের কোল বেয়ে এক ফোঁটা উত্তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

দরজার বাইরে আসতেই এতক্ষণ উঁকিঝুঁকি মারা সায়ন আর তার মা স্প্রিংয়ের মতো সোজা হয়ে গেল। দু’জনের বেশ অপ্রস্তুত হয়ে ভ্যাবলা মার্কা হাসি দিল। স্নিগ্ধ সরু চোখে ওদের চেয়ে বললো,

– তোরা এতক্ষণ আঁড়ি পেতে ছিলি?

রমনী কিছু বলবে এর আগেই সায়ন নিজেকে বাঁচাতে দু’দিকে মাথা নেড়ে বললো,

– আমি আড়ি পাতি নি। মাম্মি তুমি যাওয়ার পর আমাকে নিয়ে রুমের সামনে আড়ি পেতেছিল।

রমনীটি চোখ কটমট করে নিজের গর্ভের দুশমনের দিকে তাকাল। মায়ের অগ্নিদৃষ্টি দেখে সায়ন সুযোগ বুঝে দিল এক ভো দৌঁড়। স্নিগ্ধ পরনের টাউজারের পকেটে একহাত গুঁজে শান্ত দৃষ্টিতে রমনীটির টকটকে ফর্সা আননে তাকায়। রমনী বোকা বোকা হেসে বলে,

– আমি আসলে দেখতে এসেছিলাম।

– কি দেখতে এসেছিলেন আপনি মহাশয়া? যে মা আমাকে লাঠি তুলে পেটাচ্ছেন কিনা?

রমনী রুমের পাশে কেবিনেটের উপর থেকে চায়ের ট্রেটা হাতে নিয়ে বললো,

– এমা না না, এত বড় ছেলেকে কে পেটায়? আমি তো মা কে চা দিতে এসেছিলাম। থাক মন খারাপ করে না। মা নিজের সন্তানকে বকতেই পারে।

স্নিগ্ধ থমথমে মুখে বললো,

– মজা নেওয়া হচ্ছেনা? ওকে, দিন আমারও আসবে।

বলে স্নিগ্ধ গটগট পায়ে হেঁটে চলে যায়।

স্নিগ্ধ চলে যেতেই রমনীটি নিজে নিজে হেসে কতক্ষণ কুটিকুটি হলো। হাসাহাসি শেষ করে মুখটা স্বাভাবিক করে চায়ের ট্রে টা নিয়ে সৌমি শাহরিয়ারের রুমে ঢুকলো।

– মা তোমার চা।

– এখানে রাখ।

রমনীটি ট্রেটা রেখে সটান দাঁড়িয়ে রইল। সৌমি শাহরিয়ার চোখ তুলে তাকালেন। ছাই রঙা একটা সেমি মসলিন শাড়ি পরনে বছর ছাব্বিশের এই রূপবতী মেয়েটাকে দেখে ওনার কষ্টের চেয়েও মায়া বেশি হলো। মেয়েটি সিমরান শাহরিয়ার । স্নিগ্ধ শাহরিয়ারের একমাত্র ছোট বোন। সৌমি শাহরিয়ার মায়া মায়া চোখে সিমরানের দিকে তাকালেন। এই মেয়েটা খুব আদরের ছিল নীলয় শাহরিয়ারের। কত আদর-আহ্লাদে ভরিয়ে রাখতেন মেয়েকে। অথচ আজ তার সেই আদুরে মেয়টার একি দশা!
এখনো কত ছোট তার মেয়েটা, অথচ এই বয়সেই জীবনের সব রঙ হারিয়ে বিধবা তকমা গায়ে লেপ্টেছে। হঠাৎ অনেক পুরনো একটা লোককথা মনে পড়ল সৌমি শাহরিয়ারের,

‘ মায়ের কপাল নাকি মেয়েরা পায়।’

এই লোককথাটাকে সবসময় সত্যি মনে হয় সৌমি শাহরিয়ারের। তা না হলে মাত্র একদিনের ব্যবধানে তারা দুই মা-মেয়ে একিসাথে কি করে বিধবা হয়ে গেলেন?

– মা।

সৌমি শাহরিয়ার চমকে তাকালেন। মেয়েকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নরম সুরে শুধালেন,

– কিছু বলবি মা?

– মা ভাইয়ার বিয়ের বিষয়ে কি ভাবলে?

সৌমি শাহরিয়ার এক মুহুর্ত চুপ থেকে বললেন,

– সে কি রাজি বিয়েতে।

– মা ভাইয়া কোনদিন রাজি হবেনা, তাই বলে কি হোল লাইফ ও চিরকুমার হয়ে কাটাবে।

– মা ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেলে যে ওদের উপরো বাবা-মায়ের জোর খাটেনা

সিমরান শক্ত কন্ঠে বললো,

– জোর খাটাতে হবে মা৷ ভাইয়ার জীবনটা এভাবে চলতে পারেনা।

সৌমি শাহরিয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

– তোর চেনাজানা তেমন কোন মেয়ে আছে? তাহলে দেখতে পারিস। আমি কাল তোর মামাদেরও বলব। ওইদিন মেজ ভাইয়াও স্নিগ্ধর বিয়ের কথাটা তুলেছিলেন।

সিমরান কিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ বলে,

– মা আশরাফ আঙ্কেলের মেয়ে নোভাকে কেমন লাগে?

সৌমি শাহরিয়ার ধিমি স্বরে বললেন,

– মেয়েটা তো এক কথায় চমৎকার সিমু।

সিমরান গদগদ হয়ে মায়ের পাশে বসে বললো,

– তাহলে মা বাইরে মেয়ে খোঁজার কি দরকার। আমরা
বরং আশরাফ আঙ্কেলের কাছেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠাই।

সৌমি শাহরিয়ারকে চিন্তিত দেখাল। আনমনেই বলে ফেলল,

– কিন্তু ওনারা যদি স্নিগ্ধর অতীত জেনে যায়?

অতীতের কথা মায়ের মুখে শুনতেই সিমরানের মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠে। চিড়বিড় করে বলে,

– কিসের অতীত মা? কোন অতীত নেই। তুমি নিজেই যদি ওই কালো অতীত না ভোল, তাহলে ভাইয়া জীবনে কিভাবে এগিয়ে যাবে? তুমি কি চাওনা তোমার ছেলেটা একটু স্বাভাবিক জীবনযাপন করুক?

সৌমি শাহরিয়ার ধরা গলায় বললেন,

– চাই মা। আমি চাই আমার সন্তানরা নিজেদের জীবনটা হাসিখুশি কাটাক। তোদের ভাঙাচোরা জীবনটা যে মায়ের চোখে সয়না।

সিমরান একহাতে আলতো করে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

– তুমি এদকম চিন্তা করোনা মা। আমার ভাইয়ার জীবন আমি যেকোন মূল্যে সাজিয়ে দেব মা।

সৌমি শাহরিয়ার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

– শুধু ভাইয়ের জীবন সাজালেই হবে, নিজের আর নিজের ছেলের জীবন নিয়ে ভাবতে হবেনা?

সহসা সিমরানের হাসিমুখে আঁধার নেমে আসে। মায়ের থেকে দৃষ্টি লুকিয়ে মিহি গলায় বললো,

– আমার কথা এখানে আসছে কেন মা?

– মা তোর বয়স সবে কত? জীবনটা কি এভাবে চলতে পারে? তোর বয়সী মেয়েরা এখনো হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। মা যদি জীবনটাকে আরেকবার সু…

সিমরান কথা কেড়ে নিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে বললো,

– মা প্লিজ এসব বলোনা। আমি সায়ান আর তোমাদের নিয়ে খুব ভালো আছি৷

সৌমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। জানতেন মেয়ের উত্তর কিছুটা এমনই হবে। এই কয়েক বছরে স্নিগ্ধ তো কম চেষ্টা করেনি। তবুও তিনি আরেকবার চাইছিলেন মেয়ের অভিমত জানতে।

**

কথা নিজের ডেস্কে বসে কম্পিউটারে খুবই মনোযোগের সহিত ডাটা মেলাচ্ছিল। স্টাফরা সবাই একে অপরের সাথে চাপা স্বরে খোশ গল্পে সময় কাটাচ্ছে। হঠাৎ ওর সামনে একটা অবয়বের এসে দাঁড়ায়। কথা ভ্রু কুঁচকে মাথা তুলে তাকায়। দেখে স্যুট-ব্যুট পরিহিত এক ভদ্রলোক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। কথা তাকাতেই লোকটা নিজের ডান হাত এগিয়ে সহাস্যে বললো,

– হ্যালো আমি তৌফিক মাহমুদ।

কথা হালকা হেসে বললো,

– আসসালামু আলাইকুম। আমি অনন্যা ইয়াসমিন।

তৌফিক খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও সামলে নিল। হাত গুটিয়ে মুচকি হেসে বলে,

– আপনার নামটা খুব সুন্দর।

পরপর বিড়বিড়িয়ে বললো,

– ঠিক আপনার মতো।

কথা বিপরীতে সৌজন্য হাসলো। তৌফিক বিরবিরিয়ে কি বললো কথা শুনতে পেলনা।
তৌফিক মুগ্ধ দৃষ্টিতে কথার ফর্সা মুখটায় তাকিয়ে আছে। নিজের উপর অচেনা লোকটার নিগুঢ় দৃষ্টি অনুভব করে কথা আড়ষ্টভাবে আবার কম্পিউটারে মনোযোগ দিল। তৌফিক নিজেই তৎপর হয়ে বললো,

– আমরা কলিগ থেকে বন্ধু হতেই পারি তাইনা মিস অনন্যা?

কথার অদ্ভুত অনুভূতি হলো। এইসব ফ্ল্যার্টিং ওর জন্য নতুন না। ইউনিভার্সিটি লাইফে এমন বহু ছেলের দেখা সে পেয়েছে। কিন্তু কথার কেন জানি ভীষণ হাসি পায় এদের উপর। এরা যদি কখনো কথার অতীত জানে, তাহলে ওর থেকে দশহাত দূরে পালাবে। তৌফিক নামক লোকটা কথার আগ্রহ না পেয়ে মৃদু হেসে বললো,

– ওকে, তোমার কাজে বোধহয় ডিস্টার্ব হচ্ছে। আমি আসি।

তৌফিক চলে যেতেই কথা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
কথার বিপরীত পাশের ডেস্কে বসা একটি মেয়ে এতক্ষণ ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ কথার মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। কথা তাকাতেই মেয়েটা
থমথমে মুখে চোখ সরিয়ে নিল। কথা মেয়েটার অস্বাভাবিক মুখভঙ্গি দেখে অবাক হলো। কিন্তু বেশি ভাবার সময় পেলনা এর আগেই পুরো অফিস সয়লাব হয়ে গেল,

– এই সবাই চুপ, বস আসছে।

কথার শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো। একটা শুকনো ঢোক গলাধঃকরণ করে কম্পিউটারে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। হঠাৎ কর্ণকুহরে আঘাত হানলো মোজাইক মেঝেতে ব্যুট পরা দুটো গটগট পদধ্বনি। সাথে শোনা গেল স্টাফদের মৃদু অভিবাদন,

– গুড মর্নিং বস।

কথা দম আটকে বসে ছিল। হঠাৎ নিজের সন্নিকটে একটা বিশালদেহী ছায়া অনুভব করলো। সেই সাথে জেন্টস পার্ফিউমের কড়া স্মেল ওর নাসারন্ধ্রে এসে বাড়ি খেল। কথা ত্রস্ত চোখ তুলে তাকাল। দৃষ্টিতে মিলল সানগ্লাস পরিহিত স্নিগ্ধর লুকায়িত দৃষ্টি। ব্ল্যাক শার্ট, ব্রাউন ওয়েস্ট কোট আর ব্লাক সানগ্লাসে অত্যন্ত সুদর্শন ধাঁচের পুরুষটকে দেখে কথার বুক ধ্বক করে উঠল। কশেক বছরের ব্যবধানে এই ছেলেটা এত হ্যান্ডসাম কি করে হয়ে গেল? পরক্ষণেই নিজের ভাবনার উপর নিজেই কষে দুটো গালি দিল। স্নিগ্ধ এক পলক সাদামাটা বেশে থাকা কথাকে দেখে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চলে গেল। কথা ওর যাওয়ার পানে চেয়ে মুখ ভেংচাল। বিরবির করে বললো,

– এমন ভান করছে যেন সে কথাকে চেনেই না। জীবনে এই প্রথমই দেখছে।

 

 

চলমান…..

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x