গল্প: রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা (০৪)

লেখিকা:রিক্তা ইসলাম মায়া

পর্ব:০৪

 

মায়া নিখোঁজ গোটা দু’দিন পার হতে চলল। মায়ার খোঁজ না রিদ করতে পারল, আর না সুফিয়া খান। মায়ার পরিবারে মায়ার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা সুফিয়া খান নিজেই জানান, যখন চারদিকে হুলুস্থুল পাকিয়েও রিদ মায়ার সন্ধান করতে পারছিল না তখন। মায়ার খবর পেয়ে অস্থির উত্তেজিত আরিফ তক্ষুনি ঢাকা ছুটে আসল মায়ার খোঁজে। সঙ্গে মায়ার বাবা, মা ও চাচা জামাল সাহেবও এসেছেন। খবর পেয়ে আরাফ খান, হেনা খান, রাদিফ, নিহাল খানও চট্টগ্রাম থেকে ছুটে এলেন রিদের বাড়িতে। লন্ডনে থাকা আয়ান জুইকেও একই খবরটা দিল ফাহাদ। শালীর নিখোঁজ খবর পেয়ে ফাহাদ মুক্তা আর তার বাবা-মাকে নিয়ে অবস্থান করছে রিদের বাড়িতে। রিদ মায়ার খোঁজে দিশেহারা। পারছে না আকাশ-পাতাল এক করে মায়াকে মাটি খুঁড়ে বের করতে। চারপাশে হুলুস্থুল পাকিয়ে রেখেছে পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় গুন্ডাদের নিয়ে। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় রিদের লোক সেট করে রেখেছে মায়ার খোঁজে। মায়া অপরিচিত এলাকায় কোনো খারাপ লোকের হাতে পড়েছে কিনা, সেই চিন্তায় রিদ ঢাকা শহরের সব নিষিদ্ধ গলিতে পুলিশ নিয়ে সে নিজে রেন্ট করছে। সন্দেহজনক লোকদের থানায় আটকে রাখছে। নির্ঘুম রাতে রিদ পুরো শহর যেন চিরুনি তল্লাশি করছে মায়ার। আরিফ, রাদিফ, নিহাল খান—তাঁরাও রিদের মতোই মায়ার খোঁজে দিশেহারা। শেষ রাতের দিকে সুফিয়া খান নিজের ওকালতির বুদ্ধি খাটালেন। মায়ার ছবি টিভিতে নিউজ করার জন্য বেশ কিছু তথ্য দিলেন চ্যানেলকে। মায়া নিখোঁজ হওয়ার খবরটা সকালের নিউজে বেশ কিছু টিভি চ্যানেলে প্রচার হবে। যে বা যারা মায়ার সঠিক খোঁজ দিতে পারবে, তাদের মোটা অংকের টাকা পুরস্কৃত করা হবে।

রাত ৩ঃ০১। রাত প্রায় শেষ দিকে। রিদ গাড়ির ডিক্কিতে পা ঝুলিয়ে বসে। বাম হাতের কব্জিতে রক্তের দাগ। সেই হাতে একটা রিভলভার চেপে ডানহাতে সিগারেটে অনবরত টানছে। রিদকে সচরাচর সিগারেট টানতে দেখা যায় না। এটা তার পছন্দ না। কিন্তু এই মুহূর্তে রিদের ব্যস্ত সিগারেট টানা দেখে যেকেউ বলে দিতে পারবে রিদ খান কতটা অস্থির ও উত্তেজিত, তোলপাড়। রিদের অবস্থান রাস্তার খালি সড়কে। অন্ধকার খালি সড়কে দাঁড়িয়ে আছে বেশকিছু পুলিশের গাড়ির সঙ্গে রিদের কালো মার্সিডিজটিও। তাতে রিদ পা ঝুলিয়ে বসে। রাস্তায় এলোমেলো ভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিশ-ত্রিশ জন পুলিশের সঙ্গে রিদের ছেলেপেলে ও বডিগার্ডরা। বখাটে গুন্ডাদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে অল্প দূরত্বে। রিদের লোকজন তাদের রাস্তায় আটকে মারছে সন্দেহের বশে। মায়ার সন্ধান তাদের কাছে থাকতে পারে—এমনটা রিদের ধারণা।

নিহাল, রাদিফ, আরিফ, ফাহাদও এই রাতে উপস্থিত। রিদকে সিগারেট টানতে সকলেই দেখছে। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না, কারণ রিদের অস্থির মনোভাব সকলের চোখে পড়ছে দুপুর থেকে। এরমাঝে একজন ছেলে হকিস্টিকের আঘাতে রাস্তায় নেতিয়ে পড়ে চিৎকার করে বলল…

‘ আর মাইরেন না ভাই। আর মাইরেন না। আল্লাহ ওয়াস্তে মাফ কইরা দেন। আমি কইতাছি মাইয়াডারে আমরা কই বিক্রি করছি। জানে মাইরেন না ভাই। প্রাণ ভিক্ষা দেন।

রিদের ছেলেপেলের মাঝে উত্তেজনা দেখা গেল, কিন্তু এর মাঝেই রক্তাক্ত ছেলেটির অপর সঙ্গী মন্টু খেঁকিয়ে উঠে বলল….

‘ শুওরের বাচ্চা কইলি ক্যান? এমনি কতক্ষণ মাইরা আমাগো জানে ছাইড়া দিত। এহন তোর লাইগা আমাগো হোগলেই জানে মরমু। এই কুত্তার বাচ্চারে কেডা দলে লইছিল? হের লাইগা ফাইসা গেছি।

মন্টুর মুখ বরাবর ভারি হকিস্টিক পড়তেই ছিটকে পড়ল রাস্তায়। আঘাতটা করেছে রাদিফ। সে এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। বখাটে ছেলেদের কথাগুলো তার কানে পৌঁছাতেই সে হকিস্টিক তুলে আঘাত করেছে। দুর্বল ছেলেটি—কাশেম—সে রাদিফের আঘাতের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলতে লাগল।

‘ স্যার স্যার আমারে মাইরেন না। আমি সব কমু আপনেগোরে। আমি হেগো দলে নতুন। আমারে মাইরেন না।

রাদিফ চিৎকার করে ডাকল রিদকে। চেঁচিয়ে বলল…

‘ রিদ ভাই। ভাবির খোঁজ পেয়েছি। ছেলেগুলোর একজন ভাবির সম্পর্কে খোঁজ দিচ্ছে, তুমি একটু এদিকে এসো।

রাদিফের চিৎকারে থমথমে পরিবেশ মুহূর্তে উত্তেজিত হয়ে গেল। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষগুলো মুহূর্তে একত্রে হয়ে গেল বখাটে গুন্ডাগুলোকে ঘিরে। অথচ রিদের তখনো জায়গা পরিবর্তন হলো না, আর না নড়ল। অনবরত সিগারেট টেনেই যাচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে বউয়ের খোঁজ থেকেও বেশি জরুরি এই মূহুর্তে তার সিগারেট টানা। রিদকে নড়তে না দেখে রাদিফ কাশেম ছেলেটির কলার চেপে ধরে দাঁড় করাল। কাশেম ছেলেটি ভয়ে দু-হাত জোর করে হাউমাউ করে কেঁদে আহাজারি করতে লাগল।

‘ স্যার আমারে মাইরেন না। আমি সব সত্যি কইতে রাজি। আমারে মাফ কইরা দেন স্যার। আমি কিচ্ছু করি নাই। স্যার! ও স্যার।

আসিফ এগিয়ে এসে কাশেমের অপর কাঁধের শার্ট চেপে দুজন মিলে টেনে কাশেমকে রিদের সামনে ফেলল। পুলিশ কমিশনার মতিউর রহমান কাশেমের পিঠে পুলিশের মোটা কালো লাঠি দ্বারা আঘাত করে বলল…

‘ বল, মেয়েটির কী করেছিস তোরা? মেয়েটি এখন কোথায়?

কাশেম দু’হাতে মতিউর রহমানের পা জড়িয়ে ধরে আহাজারি করে বলল….

‘ স্যার কাল সক্কালের আমরা একটা মাইয়ারে কিডন্যাপ করি রাস্তার থেইক্কা। মাইয়াডা দেখতে মেলা সুন্দর আছিল। তয় আমি মাইয়াডার মুখ তেমন দেখবার পারি নাই, তয় মাইয়াডার হাত-পা দেইখা বুঝবার পারছিলাম মাইয়াডা মেলা সুন্দর। স্যার, আমাগো একটা দল আছে ডেভিড নামে। এই দলের আমরা হইলাম লোকাল গুন্ডা। আমাগোরে দিইয়া রাস্তা থেইক্কা পোলা-মাইয়া উঠানো হয়। হেরপর পোলাগোরে তাগো পরিবার থেইক্কা ফোন কইরা মুক্তিপণ লইয়া ছাইড়া দেই, তয় মাইয়া গুলারে আমরা বেচে দিই এক দালাল পাটির কাছে মোটা অংকের টাকায়। কাল্লা একটা মাইয়ারে আমরা গুলশানের সড়ক থেইক্কা উঠাইয়া হেরপর ঐ মাইয়াডারে পুরান ঢাকা নিষিদ্ধ গলিতে বেচে দিছি বড় এক দালালের কাছে। কাল্লা গলির থেইক্কা বাইরের সময় দেখছিলাম ঐ মাইয়াডারে আরেক পাটির কাছে বেচে দিয়েছে নতুন মাল হওয়ায়। নিষিদ্ধ পল্লিতে নতুন মাইয়াগোর মেলা চাহিদা। রাতে দুই-তিনটা কাস্টমারও থাকে নতুন মাইয়াগোর লাইগা। তয় আমি দেখছিলাম ঐ মাইয়াডারে একজন বয়স্ক লোক কিন্না লইয়া গেছে হের লাইগা। সক্কালে আমাগোরে আবার খবর দিয়েছিল ঐইখানে যাওনের লাইগা, আমাগোরে ডাইকা নিইয়া কইল তাগোরে কাল্লার মাইয়াডার মতন কুচি কুচি আরও কয়ডা মাইয়া জোগাড় কইরা দিতে, তাইলে বেশি বেশি টিহা দিব। এইফাঁকে কাল্লার মাইয়াডারে আমি একবার দেখছিলাম ডাক্তার দেখাইতে। জোড়াজুড়ি করনে লাইগা মাইয়াডার অবস্থা খারাপ আছিল। হেরপর আমি আর কিচ্ছু জানি না স্যার। আমারে মাফ কইরা দেন।

কাশেমের কথায় সকলের মাঝে অজানা ভয়, আশঙ্কা আর উত্তেজনা দেখা গেল। ছেলেগুলোর তুলে নেওয়া মেয়েটি যদি মায়া হয়, তাহলে? দম বন্ধকর পরিস্থিতিতে কেউ আর ভাবতে পারল না। অজানা ভয়ে বুক কাঁপছে সবার। ছেলেটির কথায় সকলেই রিদের দিকে তাকাল রিদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। অথচ রিদ তখনো নিশ্চুপ ও নীরব। সিগারেট ধরা হাতটি মৃদু কম্পনে আরও ঘনঘন ধোঁয়া উড়াতে দেখা গেল। আরিফ অস্থির উত্তেজিত ভঙ্গিতে পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে ছেলেটির মুখের সামনে মায়ার একটি ছবি ধরে বলল…

‘ এই মেয়েটিকে তোরা কিডন্যাপ করেছিলি? এই মেয়েটা ছিল দেখ তো?

ভীত ভঙ্গিতে কাশেম ফোনের মেয়েটিকে দেখে বলল…

‘ স্যার, মাইয়াডার মুখ আমি তেমন ভালা কইরা দেখবার পারি নাই, তয় এই মাইয়াডার লাহান আছিল কাল্লার মাইয়াডা। মনে অয় এই মাইয়াডায় আছিল।

কাশেমের অনিশ্চিত বাণীতে একেক জনের উত্তেজনায় গলায় শুকিয়ে কাট। এরমাঝে রিদ লাফিয়ে নামল গাড়ি থেকে। হাতের সিগারেট পায়ে পিষে বলল…

‘ গাড়ি বের কর আসিফ। কুইক।

‘ জি ভাই। কিন্তু এই ছেলেটাকে কী করব?

রিদ গাড়ী দরজা টেনে ধরতে ধরতে বলল…

‘ ওরে গাড়িতে ওঠা। কমিশনার সাহেব, আপনি পুলিশের ফোর্স বাড়ান। পুরান ঢাকা রেন্ট করব।
~~

পুরান ঢাকার চকবাজার পেরিয়ে গেল আরও দশ মিনিট পূর্বেই। কাশেমের তথ্য অনুযায়ী গাড়িটা থামল সুনসান রাস্তার একটি গলির মোড়ে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় মানুষের দেখা নেই। তবে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে বেশ কিছু বড়লোকি প্রাইভেট কার দেখা গেল। নিষিদ্ধ পল্লির সামনে এসব গাড়ী দিনের আলোয় মুখোশ পড়ে থাকা কিছু ভদ্রলোক হয়ে থাকে। খালি রাস্তায় অদূরে কয়েকটা কুকুরকে দেখা যাচ্ছে রাস্তায় শরীর ফেলে শুয়ে। মোট গাড়ি এসেছে এগারোটা। দুটো পুলিশের জিপ; বাকি দুটোতে রিদের বডিগার্ড। তিনটি ট্রাকে রিদের ছেলেপেলে হকিস্টিক, লাঠিসোঁটা নিয়ে নিঃশব্দে লাফিয়ে নামল রাস্তায়। আরিফ, নিহাল খান অপর গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে তাকাল। ফাহাদ, রাদিফ অন্য গাড়ি থেকে রিদকে অনুসরণ করল। রিদ, আসিফ, কমিশনার একই গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে উপরের হেড বোর্ডের দিকে তাকাল। ‘রঙ্গনা কুঠির’। কাশেম ছেলেটিকে পুলিশ জিপ থেকে নামাল দুজন পুলিশ। রিদ কমিশনারের দিকে তাকাতেই কমিশনার কাশেমের উদ্দেশ্যে বলল…

‘ তুই সামনে যা। আমরা তোকে অনুসরণ করব। খবরদার চালাকি করবি না। তাহলে বেওয়ারিশ লাশে মরবি।

কাশেম ছেলেটিকে টেনে সঙ্গে নিয়ে হাঁটল দুজন পুলিশ। শতাধিক মানুষ হওয়ার পরও কেউ শব্দ করছে না। যতটা নিস্তব্ধ থাকা যায়, ততটাই সতর্কতা অবলম্বন করছে সবাই। কাশেমের পিছনে রিদ, রাদিফ, আসিফ, নিহাল খান, ফাহাদ—আর তাদের পিছনে গোটা শতাধিক মানুষ হাতে হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে পা মিলাচ্ছে। রিদ খানের জীবনে কখনো বউকে এমন নিষিদ্ধ পল্লিতে খুঁজতে আসতে হবে—এই বিষয়টায় নিহাল খানের জন্য লজ্জাজনক। তিনি সংসদ সদস্যের মন্ত্রী। কোনো কারণে যদি বিরোধী দলের কারও কানে আজকের ঘটনাটি যায়, তাহলে খান বংশের সম্মান খোয়াতে সময় নেবে না। সবচেয়ে বড় কথা, উনার ছেলে রিদ এখনো পর্যন্ত শান্ত। আর কতক্ষণ শান্ত থাকবে, বোঝা যায় না। এখনো পর্যন্ত চুপ মানে ধ্বংসের পূর্বাভাস। সঙ্গে এত মানুষ নিয়ে এসেছে, তারমানে মায়াকে সেখানে পাওয়া গেলে আজকে নিষিদ্ধ পল্লির ধ্বংস নিশ্চিত। রিদের ডান হাতের মুঠোয় বন্দুক চেপে ধরা হাতটাও অনবরত কাঁপছে। এবার সেটা রাগে নাকি দুর্বলতায়, সেটাও বোঝা দায়। সকলেই কাশেমের পিছনে পা মিলাল। নিষিদ্ধ পল্লির বাইরে দেখা গেল কালো, সাদা, রঙ-বেরঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে। দিনের শেষ রাতের ক্ষুধা নিবারণের জন্য বিগড়ে যাওয়া একদল বড়লোক আসে নিষিদ্ধ গলিতে।

রিদ পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে মুখে চাপল। জীবনের প্রথম এসব নিষিদ্ধ গলিতে পা পড়েছে তার, তাও শখের নারীর খোঁজে। তাঁর ভিতরকার তোলপাড়, ছটফট বাণীতে প্রকাশ করার মতো নয়। তিনতলার ‘রঙ্গনা কুঠির’-এর নিচতলায় হলঘরের দরজা খোলা ছিল। মেঝেতে নাচ-গানের আয়োজন ছিল, সেটা চারপাশের পরিবেশ দেখে বোঝা গেল। ঢোল, তবলা মেঝের মোটা বিছানার ওপর অবহেলায় পড়ে। বাংলা কিংবা বিদেশি মালের বোতলও মেঝের এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। একজন মধ্যবয়সী মোটা মহিলা রঙিন সাজে অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় সেই বিছানায় শুয়ে। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। মহিলাটির উন্মুক্ত পেটে মাথা রেখে খালি গায়ে একই বয়সী পুরুষ শুয়ে। আশেপাশের ঘরগুলো থেকে উচ্চ স্বরে চিৎকার আর কলকল ধ্বনি কানে আসতেই নিহাল খান থমথম খেয়ে গেলেন। এসব নিষিদ্ধ গলিতে এসবই হয়। কিন্তু বাবা ও ছেলেদের একত্রে এসব নিষিদ্ধ গলিতে প্রবেশ করায় লজ্জায় পড়ে যান তিনি। রাদিফ নিজেও বিব্রত বোধ করে নিহাল খানের উদ্দেশ্যে বললেন…

‘ আব্বা, আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন। আমরা দেখছি বিষয়টা।

নিহাল খান উপস্থিত পরিস্থিতি বুঝে তিনি দৃষ্টি নত করে মুহূর্তে বেরিয়ে গেলেন। একজন পুলিশ এগিয়ে গিয়ে নাক চেপে অর্ধ-উলঙ্গ পুরুষটিকে লাথি মেরে ওঠাতে চেয়ে বলল।

‘ এই উঠ! উঠ! এই হারামির বাচ্চা উঠ।

পরপর লোকটার পেট, কোমর ও বাহুতে লাথি মারায় লোকটা চোখ টেনে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অতিরিক্ত মদ খেয়ে তাল সামলাতে পারছে না। আরও একজন পুলিশ এসে মহিলাটিকেও একই ভাবে হাতে মোটা লাঠি দিয়ে মৃদু আঘাত করে ডাকতে লাগল। একটা সময় পর মহিলা ও পুরুষ দুজনই উঠে বসল, কিন্তু মদের নেশায় দুজনই দুলতে লাগল। দুজন পুলিশ মধ্যবয়সী মহিলা ও পুরুষকে টেনে দাঁড় করাল। মদের ঘোরে দুলতে দুলতে পুরুষ লোকটা মাতাল কন্ঠে বলল…

‘ এত রাইতে মাইয়া দেওন যাইব না। মাইয়া লাগলে সক্কাল পাঁচটার পর পাইবেন। আমাগো এইখানে সব মাইয়াই এহন বুকিং চলতাছে। টাকা এডভান্স করণ লাগব আগে…

ঠাস শব্দে থাপ্পড়টি মাতাল লোকটার ডান গালে পড়ল। মাতাল পুরুষটি তেতে উঠে বলল…

‘ এই কোন কুত্তারবাচ্চারে আমারে মারল? শালা মাদার*দ! তোর মা শ্যাও…

ফের একটা থাপ্পড় মারলেন কমিশনার মতিউর। শক্ত হাতে থাপ্পড় খেয়ে মাথা ঝিমিয়ে উঠল মাতাল লোকটার। নেশার ঘোর খানিকটা কমে আসতে চোখে পড়ল পুলিশের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক মানুষ। মাতাল লোকটার নাম রিপন। সে একত্রে এতগুলো মানুষ দেখে মতিউরকে লম্বা সালাম দিয়ে মাতাল ভঙ্গিতে বলল…

‘ স্যার, আপনেগো কয়ডা মাইয়া লাগব? অল্প বয়সী মাইয়া আমাগো এইখানে সাপ্লাই কম। তয় তিরিশ বছরের মাইয়া গুলাও কম না স্যার। মজা পাইবেন হেগোরে দিইয়া। আপনেগোর দিনের লাইগা মাইয়া লাগব নাকি রাইতের লাইগা স্যার?

মতিউর সাহেব কথা বাড়ালেন না। পাশের মহিলাটি ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারছে না। শাড়ির আঁচল মেঝেতে লুটোচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে থেকে মাতাল অবস্থায় দুলছে। মতিউর সাহেব হাতের ফোনে মায়ার একটা ছবি দেখিয়ে বললেন…

‘ এই মেয়েটাকে কাল তোদের এখানে একদল পাচারকারী বিক্রি করে গেছে। মেয়েটা এখন কোথায়, সেটা বল। আমাদের এই মেয়েটাকে চাই।

রিপন মাতাল চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে মায়ার ছবিটা ঝাপসা চোখে দেখে বলল…

‘ এই মাইয়াডার মেলা চাহিদা স্যার। এই মাইয়ারে নিতে গেলে এক রাইতের লাইগা এক লাখ দিবেন স্যার। কাল রাইতে এক বুইড়া লোক দুই লাখ টাকা দিইয়া নিছিল হের লাইগা মাইয়াডারে। শালা বুইড়া মাদার*দ কচি মাইয়া পাইয়া দফারফা কইরা দিয়েছে। কাল সারাদিন মাইয়াডার স্যালাইন চলছে। আইজ রাইতে ভাবছিলাম মাইয়াডারে কাস্টমারের হাতে দিমু না। আগে সুস্থ হলে আবার কাস্টমসের ঘরে পাঠামু। কিন্তু আবার হেই বুইড়া তার লগে আরও তিন বুইড়ারে লইয়া আইছে, তিন লাখ টাকা দিয়ে এই মাইয়ারে আইজ রাইতের লাইগা লইয়া গেছে ঘরে। মাইয়াডা এহন কাস্টমারের লগে ঘরে আছে। এই মাইয়ারে চাইলে দুই দিন পর নিতে হইব স্যার। আইজ জানি তিন বুইড়া কী দশা করছে মাইয়াডার, হেইডা বুইঝা হেরপর আপনেগো লগে দিতে হইব…

দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকা রিদের হিংস্রতা তক্ষুনি ফেটে পড়ল রিপনের উপর। রিদ হাতের রিভলবার চেপে ধরে এলোমেলো ঘুসি বসাতে লাগল রিপনের মুখে। হিংস্র গর্জনে চিৎকার করে রিদ…

‘ হারামির বাচ্চা, কুত্তাবাচ্চা। আমার বউয়ের দাম ধরাস? রিদ খানের বউ এতো সস্তা? জানোয়ার বাচ্চা, আমার বউরে অন্য কারও ঘরে পাঠানোর সাহস তোরে কে দিসে?

রিদের গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে হাতে বন্দুকও চলল এলোমেলো। চোখের পলকে রিপনের যৌনাঙ্গে গুলি করে রক্তাক্ত করে দিয়ে মহিলাটির মুখে রিভলবার চেপে রিদ হিংস্রতায় বলল….

‘ আমার বউ কই?

মুহূর্তে বয়ে যাওয়া তাণ্ডবে থরথর করে কাঁপতে লাগল মধ্যবয়সী রাজিয়া। এই নিষিদ্ধ পল্লিতে সবাই রাজিয়া আপা বলে ডাকে মহিলাকে। রিপন ছিল রাজিয়ার সহকারী, যাকে রিদ মেরে ফেলেছে। রাজিয়া থরথর করে কেঁপে কম্পিত গলায় বলল…

‘ এই মাইয়া দোতলায় ১০৪ নম্বর ঘরে আছে স্যার।

রিদের গুলি, চিৎকার আর মানুষের কলরবে ততক্ষণে রঙ্গনা কুঠির থেকে ছেলে-মেয়েদের দৌড়াদৌড়ি লেগে গেছে পুলিশের ভয়ে। আসিফ, রাদিফ ও আরিফ রাজিয়ার জবানবন্দি শুনে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে দোতলার ঘরের দিকে গেল, সঙ্গে বেশ কিছু পুলিশ ও রিদের ছেলেপেলেও গেল। কয়েক মিনিট পর ওপরের ঘর থেকে আসিফের আতঙ্কিত ডাক ভেসে এল রিদের জন্য….

‘ ভাই, আপনি দ্রুত উপরে আসুন। জরুরি।

রিদ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে বুক কাঁপছে। সঙ্গে কম্পিত হাত-পা। উপরে ঘরে মায়াকে ঐভাবে তিনজন পুরুষের সঙ্গে দেখাটা রিদের শত মরণের সামিল। রিদ উপরে উঠতে পারল না। বরং রক্তাক্ত লাশের পাশে ধপ করে বসে গেল। হাঁ করে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। ঘোলাটে দৃষ্টি দোতলার ঘরের সিঁড়িতে আটকে রেখে পর মূহুর্তে মেঝেতে তাকাল। রিদকে আসতে না দেখে বয়স্ক তিনজন লোকসহ অসুস্থ মেয়েটিকে অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় কোনো রকম কাপড় পড়িয়ে নিচে নামাল এই কুঠিরের দুজন মেয়েকে দিয়ে। অসুস্থ মেয়েটির গায়ে বিছানার চাদর জড়ানো। চোখ, মুখ, গলা, শরীরের সব জায়গায় কামড়ের দাগ যতটা শরীর দৃশ্যমান। মেয়েটির লম্বা চুলগুলো এলোমেলো পাখির বাসা করে রাখা। মেয়েটির হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে, সেটা মেয়েটির পা ফেলে হাঁটার ধরণই বলে দিচ্ছে। বয়স্ক তিনজন লোকের বয়সই পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে হবে। মোটাসোটা ভারি শরীরে, শুধু একটা করে আন্ডারওয়্যার পরা। পুলিশ সবাইকে নিচে রিদের সামনে নিয়ে এল। রিদ তখনো মেঝেতে দৃষ্টি স্থির করে রাখল। উপরে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। রিদের গায়ের ছাই রঙের শার্টটি ঘামে ভিজে কালো হয়ে আছে। আসিফ ডাকল…

‘ ভাই! ভাবি…
আসিফ থেমে যায়। রাদিফ বলল….
‘ ভাই, এখানে মায়া ভাবিকে আমরা কোথাও পায়নি। ভাবি…

রাদিফের বাকি কথা শেষ করার আগেই রিদ চোখ তুলে তাকাল। চোখের সামনে মায়ার জায়গায় অন্য কাউকে দেখে মূহুর্তে রিদের চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। রিদ খান কাঁদছে? নাকি সবার ভ্রম? শক্ত চোয়াল, হিংস্র রক্তিম লাল চোখের কোণে জলবিন্দু জমে রিদের। আটকে রাখা নিশ্বাসগুলো এবার শব্দ করে ছাড়ছে সে। মেয়েটির গড়ন মায়ার মতোই, তবে মায়া নয়। রাদিফ ফের বলল…

‘ কাশেমের দল যে মেয়েটিকে কিডনাপ করেছিল, সে মেয়েটি অন্য কেউ ভাই। মায়া ভাবি নয়।

অসুস্থ মেয়েটি সকলের কথা শুনতে পাচ্ছিল। উপস্থিত পুলিশসহ সবাই রিদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি তৎক্ষণাৎ রিদের পায়ে পড়ে হাউমাউ চিৎকার করে বলতে লাগল….

‘ আমাকে বাঁচান স্যার। আমাকে এই নষ্ট পল্লী থেকে বের করে নিয়ে যান। আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চাই। ওরা আমাকে কাল কলেজ যাওয়ার পথে তুলে এনেছে। প্লিজ স্যার, দয়া করুন। আমাকে আমার পরিবারের কাছে নিয়ে চলুন। আমি আর পারছি না। এখানে সবাই পশু। আমাকে খুব মারধর করে। আল্লাহর দোহাই লাগে স্যার, আমাকে এখান থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যান। এই খারাপ লোকগুলো আমাকে দিয়ে কাল থেকে খারাপ কাজ করাচ্ছে। আমি এসব থেকে মুক্তি চাই স্যার, আমাকে বাঁচান। আমাকে বাঁচান। প্লিজ স্যার। দয়া করুন। প্লিজ।

রিদ ক্লান্ত, কিন্তু বেশ শান্ত গলায় বলল…

‘ মেয়েটিকে সেইফলি বাসায় পৌঁছে দে আসিফ।
‘ জি ভাই।

 

মেয়েটির নাম নাদিয়া। মায়ার কলেজেই পড়ে। কাল কলেজ যাওয়ার পথে কিডন্যাপ হয়ে এখানে এসেছে। আসিফ ‘রঙ্গনা কুঠিরের’ দুটো মেয়ের সাহায্য নিয়ে মেয়েটিকে গাড়িতে ওঠাল। রিদ তখনো শান্ত ভঙ্গিতে মেঝেতে বসে থেমে থেমে শ্বাস নিচ্ছে। বউ তার ভীষণ দুর্বলতার জায়গা। আর সেই বউয়ের অনাদরের কথা ভেবে রিদের প্রতি মুহূর্তে হাজার মৃত্যু হচ্ছিল। রিদের ভিতরকার তোলপাড় শুধু সেই বুঝতে পারছিল এতক্ষণ। আল্লাহর দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া, তার বউ এই খারাপ চক্রে পড়েনি। কিন্তু রিদের বেয়াদব বউ গেল কই?

চলিত……

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments