গল্প :আমি তার সন্ধ্যামালতী(০৪)

লেখক:DRM Shohag

পর্ব:০৪

 

 

জেডি তার গাড়ির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে কালো শার্ট, প্যান্ট। তার উপর কালো ওভার কোর্ট। কিচকিচে কালো চোখের মণি দু’টো এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। এতক্ষণ এখানে ঘটে যাওয়া কাহিনী নিয়ে ভাবনায় মশগুল সে। ডান হাতের দু’আঙুলের মাঝে জ্ব’ল’ন্ত সিগারেট। একটু পর পর তাতে একটা করে টান দেয়।
জেডির পুরো নাম ‘Jack Dalton’।

সংক্ষেপে সবাই ‘JD’ বলে ডাকে। নামটি এরকম হওয়ার কারণ আছে অবশ্যই। তার বাবা লন্ডনের স্থানীয় মানুষ। সেই সূত্রে এই নাম। লন্ডন থেকে বাংলাদেশে আসা, আকাশের সাথে পরিচিত হওয়া, আবার হারিয়ে যাওয়া, আবারো ফিরে আসা। সবকিছুর পিছনে একটি গল্প আছে।

জেডির হাইট ৬ ফুট। আকাশের হাইট-ও সেইম। জেডির মাথার কালো চুলগুলো খুব সুন্দরভাবে সেট করা। দু’গাল ভর্তি চাপ দাঁড়ি। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। সেইম আকাশের গায়ের রঙের মতোই। আকাশ আর জেডির মাঝে আহামরি কোনো পার্থক্য নেই। শুধু চোখের মণি ব্যতীত। আকাশের চোখের মণি সোনালি, আর জেডির কালো। এটুকুই। তাছাড়া দু’জন পাশাপাশি দাঁড়ালে অনেকটা আপন ভাইয়ের মতো লাগে দু’জনকে৷ ভার্সিটিতে অবশ্য তাদের দু’জনের খুব নামডাক ছিল। সাধারণত এতো বেশি ফর্সা ছেলেরা খুব দূর্লভ। সেখানে আকাশ ভিরাজ নওয়ান (AV), জ্যাক ডালটন (JD) দু’জনেই বেশ সুদর্শন পুরুষ হিসেবে পরিচিত ছিল ভার্সিটির সকলের কাছে। অনেকে তো তাদের আপন ভাই বলেই চিনতো। কথাগুলো ভেবে জেডি একটু হাসল। কিন্তু হঠাৎ সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেল। যাকে বলে একেবারেই এলোমেলো। জেডির হাসি মিলিয়ে যায়।

 

কোথা থেকে অরুণ এসে দু’হাতে জেডির শার্টের কলার ধরে রে’গে বলে, “জেডি আকাশ এরকম করছে কেন? সত্যি বলবি৷ নয়তো খুব খারাপ হবে বলে দিলাম।”

জেডি’র হাত থেকে সিগারেট পড়ে যায়। বিরক্ত হলো ছেলেটা। দু’হাতে অরুণের হাত তার কোর্টের কলার থেকে ঝাড়া মে’রে সরিয়ে দেয়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“এভিকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। আমার কাছে কি?”

“ও সন্ধ্যাকে চিনছে না কেন?”

জেডি ভ্রু কুঁচকে বলে, “হু ইজ সন্ধ্যা?”

অরুণ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“সন্ধ্যা আকাশের বউ।”

জেডি এতো অদ্ভুূভাবে তাকালো যেন পৃথিবীতে কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘেটেছে, যা সে মাত্র শুনলো। হঠাৎ-ই সে শব্দ করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে ডান হাতে গাড়ি ধরে রাখে। অরুণ বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে। জেডি বহুক’ষ্টে নিজেকে সামলে বলে,
“তোর খোঁজ কি পাবনার লোকেরা এখনো পায়নি? একবার বলছিস এভির চোখ কালো ছিল, একবার বলছিস ও বিবাহিত ছিল। মানে মজা করার লিমিট টা একটু রাখ ডেয়ার।”

অরুণ হতাশ কণ্ঠে বলে,
“চোখের ব্যাপার নিয়ে কিছু বলছি না। কিন্তু ও সত্যিই বিবাহিত। ওর……

জেডি মাঝখান থেকে বলে,
“লাইক সিরিয়াসলি! আমার দুঃস্বপ্ন শুনতে চেয়ে নিজের ভিত্তিহীন স্বপ্ন ফাটাতে এসেছিস? ভালো ভালো। শুনবো অবশ্যই৷ কিন্তু তুই প্লিজ একটা ডক্টর দেখা, নয়তো পাবনায় যা। তোকে আর নেয়া যাচ্ছে না।”

অরুণ রে’গে বলে,
“আমি মিথ্যা বলছি না।”

জেডি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলে,
“এভির মেয়েদের অপছন্দ করার পিছনে অনেকগুলো কারণ আছে। এর মধ্যে তোর প্লেবয়ের রোল যাস্ট একটা নমুনা। আরও বড় বড় কারণ আছে। এগুলো তুই, আমি সবাই জানি। এরপর-ও এসব কোন যুক্তিতে বলিস, বুঝলাম না। মানে, ওকে পুরো বিবাহিত বানিয়ে দিচ্ছিস। একসাথে এতো গার্লফ্রেন্ডদের ছ্যাঁকা খেয়ে গাঁজা খাওয়া শুরু করলে এরকম-ই হয়৷”

অরুণ রে’গে বলে,
“সবাইকে নিজের মতো ভাবা বন্ধ কর জেডি। আমি সিইওর তুই আকাশকে আবার-ও বেপথে নিয়ে গিয়েছিস৷ এরকম হলে আন্টি তোকে ছাড়বে না।”

জেডি হেসে বলে,
“আমার পথ অলয়েজ সুপথ ডেয়ার৷ তোদের মতো বা’লপাকনামি করা পাবলিক এসব বুঝবি না। তাছাড়া ভদ্রমহিলার উপর আমার রুচি ন’ষ্ট হয়ে গেছে। অবশ্য তোর উপর-ও নেই, বুঝলি? বিশ্বাসঘা’তক বলে কথা!”

অরুণ রে’গে কিছু বলতে নেয়, তখনই পাশ থেকে সৌম্য উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ডাকে,
“অরুণ ভাইয়া?”

অরুণ বাদিকে ফিরে তাকায়। সৌম্য’র কোলে সন্ধ্যাকে দেখে ছেলেটা বিচলিত হয়৷ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“সন্ধ্যার কি হয়েছে সৌম্য?”

সৌম্য চোখ বুজে শ্বাস নেয় কয়েকবার। লামিয়া বলেছে, সন্ধ্যা উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছে। তাছাড়া সন্ধ্যা পেট ব্য’থায় ভীষণ কাতরাচ্ছে। সৌম্য’র নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে। বুক কাঁপছে, তার বোনুর বাচ্চার কোনো ক্ষ’তি হলো কি-না এই ভেবে। সন্ধ্যা তার ভাইয়ের বুকে মুখ ঠেকিয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। একে তো আকাশের পরিবর্তিত রূপ, সাথে তীব্র পেট ব্য’থায় মেয়েটার জান যায় যায় অবস্থা। ডান হাতে সৌম্য’র পিঠের দিকে শার্ট খামচে ধরে। ব্য’থা প্রশমনের উপায়। অরুণ সৌম্য’র কাঁধে হাত রেখে অরুণকে ঝাঁকিয়ে ডাকে, “সৌম্য?”

সৌম্য চোখ মেলে তাকায়। দুর্বল কণ্ঠে বলে, “আপনার গাড়িটা কোথায় ভাইয়া? বোনুকে হসপিটাল নিব।”

অরুণ জবাব দেয়, “আমি বাইক নিয়ে বেরিয়েছি। গাড়ি তো আমার সাথে নেই। আচ্ছা দাঁড়াও।”

এরপর অরুণ জেডির দিকে তাকায়। জেডির দৃষ্টি সৌম্য’র দিকে। অরুণ জেডির উদ্দেশ্যে বলে, “লিফট দিবি?”

জেডি কিছু বলছে না৷ সৌম্য’র দৃষ্টি জেডির উপর পড়ে। জেডিকে দেখে সৌম্য ভ্রু কুঁচকে নেয়। চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছে মনে হলো। দু’সেকেন্ডের মাথায় সৌম্য’র মনে পড়ে জেডিকে। ভার্সিটিতে আকাশের সাথে সবসময় জেডিকে দেখত। তাদের ব্যাচের বেশিরভাগ মানুষ জানত এভি, জেডি দুই ভাই। তাদের মধ্যে সৌম্য-ও ছিল। কিন্তু পরে জানতে পারে, তারা ভাই নয়। তারপর হঠাৎ-ই জেডি কোথায় যেন হারালো। সৌম্য এদের ব্যাপারে কিছু জানতো না। মাথা-ও ঘামায়নি৷ আজ এতো বছর পর জেডিকে দেখে সে বেশ অবাক হয়৷ জেডি পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে গম্ভীর গলায় বলে, “ওকে।”
তার দৃষ্টি সৌম্য’র পানে।
জেডির সম্মতি পেয়ে সৌম্য খুশি হলো না। জেডির থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সে অরুণের উদ্দেশ্যে বলে,

“আমি সিএনজি করে চলে যাবো অরুণ ভাইয়া।”

কথাটা বলে সৌম্য উল্টোদিকে এগোয়। অরুণ দ্রুত সৌম্য’র সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “কি হয়েছে সৌম্য? জেডির গাড়িতে যাও। সন্ধ্যাকে অনেক অসুস্থ লাগছে।”

সৌম্য ছোট করে বলে, “উনার সাথে যাবো না ভাইয়া।”

“কেন?”

সৌম্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“উনাকে আমার পছন্দ নয় ভাইয়া। উনি ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল টাইপ। দৃষ্টি-ও ভালো লাগে না। আর….”

জেডি এগিয়ে এসে বলে, “কিছু বলছিলে ডেয়ার?”

সৌম্য চুপ হয়ে গেল। জেডি একবার সৌম্য’র দিকে তাকায় তো একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়। বলে,
“সালাম কালাম সব ভুলে গেছ। সেসব থাক। কোলে এটা কে?”

সৌম্য ভদ্রতাসূচক উত্তর দেয়, “ছোট বোন।”

জেডি হেসে বলে, “ওহ নাইস! তোমার বোন তো পাক্কা লায়লি। বাট মজনু পাত্তা দিচ্ছেনা। আই থিংক, মাথায় গন্ডগোল হয়েছে৷ নকল মজনুকে আসল মজনু ভাবছে।

এটুকু বলে জেডি পকেট থেকে একটি একহাজার টাকার নোট বের করে সৌম্য’র বুকপকেটে রেখে বলে, তোমার বোনকে একটা পা’গ’লের ডক্টর দেখিয়ে নিও। কেমন?”

সৌম্য থমথমে মুখে তাকায়। সে জেডিকে উচ্ছৃঙ্খল বলায় জেডি তাকে সূক্ষ্ম অপমান করল, এটা খুব ভালো করে বুঝল সে। জেডি এক পা পিছিয়ে গিয়ে হেসে বলে,
“আমাকে যতটা খারাপ ভাবো। ট্রাস্ট মি, আমি তার চেয়েও হাজারগুণ খারাপ। প্রুভ চাইলে আমার গাড়ি ছাড়া হসপিটাল গিয়ে দেখ।”

এখানে কি কথা হচ্ছে, সন্ধ্যার মাথায় কিছু ঢুকছেনা। এ পর্যায়ে এসে অসহনীয় পেট ব্য’থায় সন্ধ্যা জ্ঞান হারায়। বা হাত ছেড়ে দেয়। ব্যাপারটি জেডি লক্ষ্য করে হেসে বলে,
“যাহ! তোমার বোন তো ম’রে গেল!”

সৌম্য’র বুক কেঁপে উঠল। দ্রুত সন্ধ্যার দিকে তাকায়। বোনুকে অচেতন অবস্থায় দেখে সৌম্য’র সব এলোমেলো লাগে। অসহায় কণ্ঠে ডাকে, “বোনু?”

জেডি তার গাড়ির চাবি অরুণের পকেটে রেখে অরুণের বাইকের চাবি নিয়ে নেয়। উল্টোদিকে ফিরে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “ওদের নিয়ে যা অরুণ।”

সৌম্য’র নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে। আশেপাশে তাকলো সে। জায়গাটি একদম ফাঁকা। কতদূর গেলে যে গাড়ি পাবে৷ তাছাড়া জেডিকে তার সেই আগের মতোই লাগলো। সে যা বলবে, না শুনলে তুলকালাম কান্ড বাঁধায়। সৌম্য কারো অপমান সয়ে, তার অনুদান নিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী হয়না। কিন্তু এখন তার বোনুর জীবন জড়িয়ে। বোনুর জন্য সে তার অপমান ভুলে গিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। অরুণ গাড়ির দরজা খুলে দিলে সৌম্য সন্ধ্যাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। অরুণ ড্রাইভিং সিটে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
রাস্তার অপর পাশে লামিয়া, সে সন্ধ্যা আর তার ব্যাগ স্কুটির সামনে রেখে স্কুটি স্টার্ট দিয়ে গাড়ির পিছু পিছু যায়।
.
.
কিছুদূরে এসে জেডি অরুণের বাইক পেয়ে বাইকে উঠে বসে। কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে বাইক স্টার্ট দেয়। দৃষ্টি অদৃশ্য হওয়ার পথে তার গাড়ির দিকে। হঠাৎ-ই বাইক টান দেয়। বাইকের স্পিড হাই। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় জেডি তার গাড়ির পাশপাশি এসে বাইকের স্পিড কমায়। আরেকটু চেপে যায় তার গাড়ির দিকে। বাদিকে ঘাড় ফেরায়। অরুণের চোখেমুখে চিন্তা। মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালানোয় ব্যস্ত। জেডি বাঁকা হেসে গলা চড়িয়ে বলে,
“গাড়ির ব্রেক তো ফেইল ডেয়ার।”

কথাটা শুনতেই অরুণ দ্রুত ডানদিকে ঘাড় বাঁকায়। রে’গে বলে,
“তোর প্রবলেম কি জেডি?”

কথাটা বলে অরুণ গাড়ি থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারছে না। তার মনে হলো, সত্যিই হয়তো গাড়ির ব্রেক ফেইল। বেচারা অতিরিক্ত টেনশনে হাইপার হয়ে গিয়েছে। জেডি শব্দ করে হাসে। বলে,
“ক’ব’রস্থানে তিনটা ক’ব’রের টিকিট কাটতে যাচ্ছি। সাবধানে ম’র’বি। ওকেই ডেয়ার?”

কথাটি বলে জেডি তার বাইকের স্পিড বাড়ায়। এদিকে অরুণ গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছে, অথচ প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছে। পিছন থেকে সৌম্য বলে,
“অরুণ ভাইয়া গাড়ির ব্রেক ঠিকই আছে। আপনি গাড়ি চালান।”

তখনই অরুণ গাড়ির ব্রেক ক’ষে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সত্যিই গাড়ির ব্রেক ঠিকই আছে। ওইযে কথায় আছে, অতিরিক্ত হাইপার হলে সহজ জিনিস হাতের বাইরে চলে যায়। অরুণের ক্ষেত্রে তেমনটাই হয়েছিল। কিন্তু সৌম্য কিভাবে বুঝল? অরুণ পিছু ফিরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কিভাবে বুঝলে সৌম্য?”

সৌম্য জবাব দেয়,
“আপনি উনার বন্ধু। তাই মনে হলো।
আপনি প্লিজ দ্রুত চলুন। বোনুর জন্য চিন্তা হচ্ছে।”

অরুণ আর সময় ন’ষ্ট না করে গাড়ি স্টার্ট দিল। সৌম্য তার বুকে পড়ে থাকা অচেতন সন্ধ্যার দিকে তাকায়। মুখটা মলিন। ডান হাত অতি স্নেহের সাথে সন্ধ্যার মাথায় বুলিয়ে দেয়। আজ কি হয়েছে কে জানে! সে শুধু চায়, তার বোনুর বাচ্চাটা সুস্থভাবে এই পৃথিবীতে আসুক। তার বোনুর একটুখানি সুস্থ হওয়ার জন্য এই একটাই সম্বল হিসেবে ধরে রেখেছে সৌম্য। আর তো কোনো উপায় নেই। অরুণের কথায় ধ্যান ভাঙে সৌম্য’র।

“জেডি আমার বন্ধু নয় সৌম্য। ও শুধু আকাশের বন্ধু।”

অরুণের কণ্ঠে রা’গ। সৌম্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এসব ব্যাপারে সে জানেনা। তাই অবুঝ নয়নে চেয়ে রইল।
.
.
জেডি খুব রিল্যাক্স মুডে বাইক চালাচ্ছিল। হঠাৎ-ই চোখমুখ শ’ক্ত হয়ে যায়। বাইকের স্পিড সর্বোচ্চ করে। আঁকাবাঁকা করে বাইক টেনে নিয়ে যায়। তীব্র বাতাসে চোখ বুজে আসার কথা। অথচ জেডির চোখজোড়া তীক্ষ্ণ। একবারের জন্য-ও বন্ধ হয় না। রা’গে মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। বিড়বিড় করে,
“এভির বাচ্চা!”

কিছুসময়ের মাঝে একটি হসপিটালের সামনে বাইক থামায় জেডি। দ্রুত বাইক থেকে নেমে হসপিটালের দিকে দৌড় দেয়। হাঁটুসমান ওভারকোট পিছনে কিছুর সাথে বেঁধে যাওয়ায় ডান হাতে জোরে টান দেয়। এক কোণায় সামান্য ছিঁড়ল বোধয়। জেডি সেদিকে পাত্তা দিল না। দৌড় লাগায় ভেতরে।
তিনতলায় এসে থামে জেডি। হাঁপিয়ে গিয়েছে। সামনে তাকালে দেখল এভি ভীষণ সিরিয়াসভাবে একজন ডক্টরের সাথে কথা বলছে। জেডি বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায়। কোনো কথা ছাড়াই এভিকে টেনে সরিয়ে দিয়ে বা হাতে ডক্টরের কলার শ’ক্ত করে ধরে ডান হাতে সমানে ঘুষি মা’রে। থামাথামির নাম নেই। এভি হতভম্ব চোখে তাকায়। ডক্টরটির বয়স আকাশদের মতোই। সে মা’র খাচ্ছে কেন তাও বুঝল না। জেডিকে আটকাতে চাইলেও পারেনা। জেডি লোকটিকে মা’রতে মা’রতে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। আশেপাশের সকলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। আকাশ এগিয়ে আসার আগেই কোথা থেকে নিয়াজ দৌড়ে এসে জেডিকে আটকায়। চেঁচিয়ে বলে,
“আরে কে আপনি? আমার বন্ধুকে এভাবে মা’রছেন কেন?”

জেডি রে’গে নিয়াজকে ধাক্কা দিয়ে আবার-ও মা’রতে উদ্যত হয়। নিয়াজ এগিয়ে এসে জেডির হাত শ’ক্ত করে ধরে। জেডি মুখ তুলে চায়। চেঁচিয়ে বলে,
“এই ছেলে এতো সাহস কোথায় পেয়েছে যে ও এভির চোখে লেন্স লাগিয়ে দিতে চায়!”

নিয়াজ বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। অবাক স্বরে বলে,
“জেডি তুমি? হঠাৎ কোথা থেকে এলে? আর আমার বন্ধুকে এভাবে মা’র’ছ কেন?”

জেডি রে’গে নিয়াজের মুখে একটা ঘুষি মে’রে দেয়। সাথে বলে, “তোমাকেও মা’রা উচিৎ। দুই বন্ধু যুক্তি করে এভির পিছনে পড় তাইনা?”

নিয়াজ হতভম্ব হয়ে যায়। জেডির কথার আগামাথা কিছুই বুঝল না।
এদিকে আকাশ জেডিকে টেনে তুলে ধাক্কা দিয়ে বলে,
“তোকে আমার সামনে আসতে নিষেধ করেছি না? তুই আবার আমার সামনে এসেছিস? কি প্রবলেম তোর? আমাকে শান্তি দিচ্ছিস না কেন?”

জেডি হতাশ কণ্ঠে বলে,
“প্রবলেম তো আমার-ই এভিজান। তোর চোখ গেলে পরে আমার বউ ভেস্তে যাবে। কারণ আমি বউ রেখে অন্ধ এভিকে প্রক্সি দিতে আসব। একটু বোঝ?”

এভি কটমট দৃষ্টিতে তাকায় জেডির দিকে। জেডি চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। এভি দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“আমি যখন বলেছি আমি লেন্স পরব মানে পরব।”

জেডি হেসে বলে,
“পারবি না জান।”

এভি রে’গে আবার-ও কিছু বলতে নেয় তখনই নিয়াজ এভিকে ঘুরিয়ে তার দিকে ফেরায়। দৃষ্টিতে বিস্ময়। ঢোক গিলছে বারবার। এটা কিভাবে সম্ভব? গত চারমাস যাকে মৃ’ত ভেবে এসেছে, সে এখন জলজ্যান্ত তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ডান হাত তুলে এভির গালে রেখে থেমে থেমে বলে,
“আকাশ? তুমি বেঁচে আছো?”

আকাশ ভ্রু কুঁচকে তকায়। নিয়াজ আকাশকে জড়িয়ে ধরে। তার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না এটা আকাশ। এদিকে নিয়াজের কান্ডে আকাশ অবাক হয়। মনে হচ্ছে নিয়াজ পুরোনো প্রেমিক খুঁজে পেয়েছে। তাকে কোনদিক দিয়ে নিয়াজের প্রেমিকা লাগছে। আকাশ নিয়াজকে ধাক্কা মে’রে সরিয়ে দেয় নিজের থেকে। রে’গে বলে,
“কি প্ল্যান করছ তুমি? তোমার ভালোমানুষীর আড়ালে আসল তুমিকে আমি খুব ভালো করেই চিনি।”

নিয়াজ অবাক হয়ে বলে, “মানে? কি বলছ? তাছাড়া তুমি এতোদিন কোথায় ছিলে?”

আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“তোমার শ্বশুরবাড়ি।”

জেডি নিয়াজের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলে, “ব্যাপার কি? তুমি না আকাশের শ’ত্রু। হঠাৎ প্রমিক প্রেমিক ভাইব দিচ্ছ কেন? তুমি ছেলে এটা মাথায় রাখো। আর আমার এভিজানের থেকে দূরে থাকো।”

নিয়াজ হতভম্ব চোখে তাকায়।
জেডি এসেই যে ডক্টরকে মা’রলো, তার নাক দিয়ে কয়েকফোঁটা র’ক্ত গড়িয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাতের তালু দিয়ে র’ক্তকণা মুছে নেয় সে। এভি তার সামনে এসে গম্ভীর স্বরে বলে,
“আজকে লেন্স পরাতে পারবে না?”

ছেলেটি ঢোক গিলল। এভির পাশ থেকে জেডি কৌতুকস্বরে বলে,
“শুধু আজকে নয়, এক্ষুনি পারবে। আর তারপর জানটা দিয়ে দিতে হবে। লেন্স পরাবে জান দিবে। পারবে না ডেয়ার?”

এভি ওভারকোর্টের ভেতরের পকেট থেকে একটা পি’স্তল বের করে পি’স্তলটি ঘোরায় আর ডক্টরের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“আমাকে লেন্স না পরালে এক্ষুনি জান দিতে হবে। কি চাও বলো?”

নিয়াজের কলিগ ভীতি চোখে একবার জেডির দিকে তাকায় তো একবার এভির দিকে। বেচারা এটা কোথায় ফাঁসলো? সে এদের দু’জনের কাউকেই চেনেনা। তার পরিচয় নিয়াজের সাথে। অল্পদিনেই খুব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাদের মাঝে। কিন্তু সে নিয়াজের থেকে ভীষণ ভীতু টাইপ। তার মাঝে আবার এসব।
নিয়াজ এগিয়ে এসে আকাশের হাতে পি’স্তল দেখে ভীষণ অবাক হয়। বলে,

“আকাশ তোমার কি হয়েছে একটু ক্লিয়ার করবে প্লিজ?”

এভি নিয়াজের কলার ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “তোমার বন্ধুকে রাজি হতে বলো, নয়তো ওকেসহ তোমাকে একদম মে’রে ফেলব।”

নিয়াজ ঢোক গিলল। তার দৃষ্টি আকাশের সোনালি চোখের মণিতে। অবাক হলো না। অবাক হলো আকাশের স্বভাব দেখে। অতঃপর বলে,
“ঠিকআছে, ওর চেয়েও ভালো ডক্টর আছে। আমার বড় স্যারের সাথে কথা বলে তোমাকে জানাবো।”

এভি গম্ভীর স্বরে বলে, “গুড। ডেইট যেন আজকেই হয়।”

এরপর নিয়াজকে ছেড়ে এভি ডান হাতে জেডিকে ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে চলে যায়। জেডির রাগান্বিত দৃষ্টি নিয়াজের উপর। নিয়াজের দিকে তেড়ে এসে বলে, “তুমি এভিকে কি বললে?”

নিয়াজ ঢোক গিলে বলে,
“তোমরা দু’জন এরকম করলে আমি কোনদিকে যাবো বল তো? তাছাড়া আকাশ এতোদিন কোথায় ছিল? আর ও বাঁচলো কিভাবে? তুমি সব জানো তাইনা?”

জেডি তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় নিয়াজের দিকে। পিছন থেকে অরুণ বলে,
“জেডি তুই সব ক্লিয়ার করবি, এক্ষুনি।”

জেডি ঘাড় বাঁকিয়ে অরুণের দিকে তাকায়। বাঁকা হেসে বলে,
“কিচ্ছু ক্লিয়ার করবনা। কি করবি?”

অরুণ রে’গে বলে,
“করবি তুই। আকাশ সন্ধ্যার সাথে এরকম কেন করছে? সন্ধ্যাকে একদম চিনতেই পারছে না। কি হয়েছে আকাশের বল?”

জেডি বিরক্ত হলো। আবার কোন সন্ধ্যা-ফোন্ধাকে টেনে আনছে। অরুণের কথা শুনে নিয়াজ অবাক হয়। আকাশ সন্ধ্যাকে চিনতে পারছে না? এটা কখনো সম্ভব? অতঃপর বলে,
“এসব কি বলছ অরুণ?”

অরুণ উত্তর করে,
“আমি ঠিকই বলছি। তুমি জানো নিয়াজ? সন্ধ্যা আকাশকে টাচ করেছে বলে আকাশ ওকে থা’প্প’ড় পর্যন্ত মে’রে’ছে।”

নিয়াজ এবার ভীষণ অবাক হয়। কিছুক্ষণ আগে বলা আকাশের কান্ড সাথে আকাশের বলা কিছু কথাগুলো নিয়ে ভাবলো খানিক। অতঃপর জেডির দিকে তাকিয়ে বলে,
“শর্ট মেমোরি লস?”

জেডি নিরব। নিয়াজ আবার-ও বলে, “কিছু বলছ না কেন?”

জেডি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“এসব বাদ দাও। তুমি এভিকে লেন্স পরিয়েছিলে কেন?”

“আমি পরাইনি। আমার বড় স্যার পরিয়েছিল।”

“কানেকশন তো তোমার সাথে। ডুই ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া, টানা ক’বছর লেন্স পরার কারণে এভির চোখের অবস্থা কতটা খারাপ হয়েছে?”

নিয়াজ থমথমে মুখে তাকায়। জেডি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“এভির চোখে এগেইন লেন্স পরালে সেই ডক্টরকে আমার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমাকে নিশ্চয়ই নতুন করে চেনাতে হবে না, তাইনা ডেয়ার?”

শেষ কথাটা বাঁকা হেসে বলে। এরপর সে আর এখানে দাঁড়ালো না।
নিয়াজ থমথমে মুখে তাকিয়ে থাকে। কানে বাজল দু’টো বাক্য,,

~ আন্টি আকাশকে এভাবে লেন্স পরিয়ে রাখলে অনেক বড় ক্ষ’তি হয়ে যেতে পারে।
~ হলে হবে। সর্বোচ্চ অন্ধ হবে। আমার কোনো সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে আর কখনো কোনো কথা বলবে না। না আমাকে আর না তো আকাশকে।

অরুণের ধাক্কায় নিয়াজের ধ্যান ভাঙে। অরুণ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আরে আকাশ জেডির উপর জেদ করে এমন আগেও করেছে। এখনও করেছে। জেডি এখন সব সামলাবে। কিন্তু তুমি আকাশের ব্যাপারে কি বললে? ও সন্ধ্যাকে চিনছে না কেন?”

নিয়াজ মৃদুস্বরে বলে,
“বুঝতে পারছিনা অরুণ। আমি আকাশকে একবার চেকআপ করলে বুঝতে পারব। আর তাছাড়া…..

নিয়াজের কথা ফুরিয়ে যায়। মাথায় অনেককিছু ঘুরছে।
___________________

সন্ধ্যা বিছানার এক কোণায় শুয়ে আছে। চোখের পাতা বন্ধ হলেও সে জেগে আছে। থেকে থেকে চোখের কোণ ঘেঁষে নোনাপানি গড়িয়ে পড়ে। একপাশে লামিয়া বসে আছে। অপরপাশে ইরা। সৌম্য হসপিটাল থেকে ফিরে বাইরে গিয়েছে। সন্ধ্যার জন্য ফলমূল কিনতে। ডক্টর বলেছে, ভীষণ উইক সন্ধ্যা। পড়ে গিয়ে পেটে ব্য’থা পেয়েছিল বেশ। তবে ডক্টর চেকআপ করে জানিয়েছে, বাচ্চা ঠিক আছে। এতে সবাই আপাতত স্বস্তি পায়।

আসমানী নওয়ান হাতে করে একটি বাটিতে স্যুপ এনেছে সন্ধ্যাকে খওয়ানোর জন্য। ভদ্রমহিলা সন্ধ্যার পাশে এসে বসে। সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদুস্বরে ডাকে,
“জান্নাত?”

সন্ধ্যা সাথে সাথে চোখ মেলে তাকায়৷ কাঁদতে কাঁদতে চোখের বারোটা বাজিয়েছে। মেয়েটা ফুঁপিয়ে বলে,
“আম্মা আমি তোমার ছেলেকে দেখেছি। উনাকে একটা কল কর না! একটু আসতে বল। একবার আসতে বল।”

আসমানী নওয়ান, ইরা দু’জনেই অসহায় চোখে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। তারা দু’জনেই ভাবছে এসব সন্ধ্যার ভুল ধারণা। ইরা বোঝানোর স্বরে বলে,
“আকাশ ভাইয়া আর নেই বোন। তুমি মানার চেষ্টা কর। আকাশ ভাইয়ার অংশের কথা ভাবো।”

সন্ধ্যা রে’গে বলে,
“তোমরা আবার আমাকে পা’গ’ল বলতে চাইছ? আমি বলছি তো, আমি উনাকে দেখেছি৷ উনি অরুণ ভাইয়ার সাথে কথা বলেছে। শুধু আমার সাথে বলেনি।

এরপর সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,
আম্মা তুমি একটু কল কর না উনার কাছে! উনি আমার উপর রে’গে গেলে অপরিচিতদের মতো আচরণ করে। ওই যে আমার গলা অপারেশন করলাম, তখন-ও একদম অপিরিচিতদের মতো করছিল। উনার অনেক বেশি অভিমান। এবারেও হয়ত অভিমান করেছে৷ তুমি একবার আসতে বলো। উনি যা বলবে, আমি সব করব। তুমি শুধু উনাকে একবার আমার কাছে আসতে বলো। বলো না আম্মা! আম্মা?”

বলতে বলতে সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের উরুতে মুখ ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে।
আসমানী নওয়ানের চোখের কোণ ভিজে উঠল মেয়েটির আহাজারিতে৷ কিছু বলতে চায়, মাঝে লামিয়া বলে,
“সন্ধ্যা মিথ্যা বলছে না আন্টি। আকাশ ভাইয়াকে আমিও দেখেছি।”

লামিয়ার কথা শুনে আসমানী নওয়ান, ইরা দু’জনেই বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। লামিয়া ঢোক গিলে বলে,
“উনি আকাশ ভাইয়া কি-না আমি জানি না। কিন্তু একদম আকাশ ভাইয়ার মতো দেখতে। চোখগুলো সোনালি। আর উনাকে একজন এভি বলে ডাকছিল বারবার।”

কথাটা শুনে ইরা ভীষণ অবাক হলো। তার কাছে এভি নামটা বোধয় পরিচিত ঠেকল। কিন্তু সোনালি চোখ, এটা মেলাতে পারলো না।
আসমানী নওয়ান স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখজোড়া ভিজে উঠল। বিড়বিড় করল, ‘সোনালি চোখ? এভি?’
ঢোক গিলে বলে,
“ওর সাথে কে ছিল?”

লামিয়া ভাবুক ভঙ্গিতে বলে, “ঠিক মনে পরছেনা৷ কিন্তু এভির মতোই নামটা।”

আসমানী নওয়ান বলেন, “জেডি?”

লামিয়া সাথে সাথে বলে,
“হ্যাঁ হ্যাঁ। এটাই।”

আসমানী নওয়ান ঢোক গিলল। হাতের বাটি কোনোরকমে ইরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে এলোমেলো পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ধরা গলায় বলে,
“আকাশ ম’রে গিয়েছে।”

আসমানী নওয়ানের রিয়েকশনে ইরা, লামিয়া দু’জনেই অবাক হলো। এভি, জেডি দু’টো নাম ইরার ভীষণ পরিচিত লাগে।
এদিকে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে শোয়া থেকে উঠে বসল। নিঃশব্দে চোখে পানি ফেলে আর আসমানী নওয়ানের দিকে চেয়ে বলে,
“আকাশ বেঁচে আছে আম্মা। সত্যি বলছি।”
.
.
.
আকাশ ভিরাজ নওয়ান। যাকে সবাই তার নামের শর্ট ফর্ম হিসেবে AV নামে চেনে৷ তার গাড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় মাত্র। একজন গার্ড এভি’র গাড়ির দরজা খুলে দিলে এভি ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। দৃষ্টি সামনে দন্ডায়মান সফেদ রঙের তিনতলা বাড়ি। চোখেমুখে গাম্ভীর্যের ছাপ থাকলেও, খুশির ঝিলিক মুখবয়াবে প্রকাশ পায়।
কোনোদিকে তাকায় না সে৷ দৃষ্টি সামনে রেখে বড়বড় পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

আসমানী নওয়ান দোতলা থেকে নেমে
নিজ ঘরে যাওয়ার জন্য কেবল পা বাড়িয়েছেন, তখন-ই মা ডাকটি কানে বর্জ্যের ন্যায় ভেসে আসে৷ ছেলেটির কণ্ঠ স্বাভাবিক হলেও, আসমানী নওয়ানের কাছে তা অস্বাভাবিক লাগলো, কণ্ঠটি যে হুবহু তার ছেলের৷ আকাশ সত্যিই বেঁচে আছে!
আসমানী নওয়ানের পা থেমে গিয়েছে অনেক আগেই। দিক ফিরিয়ে দরজার দিকে দৃষ্টি পড়লে ভদ্রমহিলার দৃষ্টিতে অসীম বিস্ময় ভর করে। আজ প্রায় চার মাস পর নিজ ছেলেকে জীবিত ও সুস্থ দেখে ভদ্রমহিলা রিয়েকশন দিতে ভুলে গিয়েছে৷ যাকে এতোগুলো মাস মৃ’ত জেনে এসেছে, সেই ছেলে হঠাৎ জীবিত রূপে ফিরে এসেছে৷ তাও আবার সাধারণভাবে নয়।
আসমানী নওয়ান ছেলের বেশভূষা খেয়াল করলেন। যা তার কাছে অস্বাভাবিক লাগলো৷ আকাশের সোনালি চোখের মণি, সাথে এরকম বেশভূষা ভদ্রমহিলার মাঝে ভীতি সৃষ্টি করে। যেন এই আকাশ তার কাছে এক ধরনের ফোবিয়া৷ ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি জোড়া ঝাপসা হয়৷ থেমে থেমে আওড়ায়,

“আকাশ?”

এভি আসমানী নওয়ানের দিকে চেয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি, যা খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। এভি আসমানী নওয়ানের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,

“কেমন আছো মা?”

ক্ষণে ক্ষণে আসামনী নওয়ানের দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে। এভি ভদ্রমহিলার পানে দৃষ্টি রেখে এগিয়ে আসছে।

সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের পিছু পিছু ধীরে ধীরে আসছিল। ছোট ছোট পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। ইরা, লামিয়া ডাকলেও শোনেনি। আকাশের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে মেয়েটার পা থেমে যায়। দৃষ্টি নিচতলায় পড়লে সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ এদিকে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তেই সন্ধ্যার চোখজোড়া ভরে ওঠে। বিড়বিড় করে,
“আপনি এসেছেন আকাশ?”

এবার সন্ধ্যা বড় বড় পায়ে একপ্রকার দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। শরীরটা ভীষণ দুর্বল। হাঁপিয়ে যায়, তবে সে নিজের শরীরের প্রতি একটুখানিও দয়া দেখালো না। বরং ছুটল তার মনমানুষের দিকে।

এভি আর আসমানী নওয়ানের দূরত্ব সামান্য। হঠাৎ সন্ধ্যা দৌড়ে এসে এভির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভি’র শক্তপোক্ত শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। তবে জায়গা থেকে একচুল নড়ল না৷
সন্ধ্যা এভিকে শ’ক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“আর ছেড়ে যাবেন না আমাকে। আর অভিমান করবেন না৷ থেকে যান আমার কাছে।”

এদিকে তাকে কোনো মেয়ে সাপ্টে ধরেছে বিষয়টি বুঝতে এভি’র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো৷ যখন বুঝল, ততক্ষণে তার মাথায় র’ক্ত উঠে গিয়েছে। রে’গে বোম হয়ে গিয়েছে৷ কোনো মেয়ের স্পর্শ হজম করার অভ্যেস তার নেই। ডানহাত মুষ্টি mad. নিল। রা’গের ফলে সোনালি চোখের মনি দু’টো স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশি ঝিলিক দিচ্ছে। যা আ’গুনের মতো দপদপ করছে মনে হলো।
এভি বা হাত তুলে সন্ধ্যার কাঁধে রাখে শ’ক্ত করে। এরপর চোখের পলকে সন্ধ্যাকে জোরেসোরে এক ধাক্কা দেয়, সন্ধ্যা পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। নিজের দুর্বল শরীরটাকে বহুক’ষ্টে সামলিয়ে দাঁড়িয়ে যায়৷ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় তার সামনে দন্ডায়মান মানুষটার দিকে। যার দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা সন্ধ্যার ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়।

এভি সন্ধ্যাকে দেখে অবাক হয়। আরে এটা সেই রাস্তার মেয়েটা না? মেয়েটা তার পিছু পিছু তার বাড়িতে চলে এসেছে? আর তো নেয়া যাচ্ছে না একে। আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“হাই ডেয়ার ইউ? আমাকে টাচ করার সাহস কে দিয়েছে তোমাকে?

বলতে বলতে এভি সন্ধ্যার গালে থা’প্প’ড় মা’রার জন্য হাত তুললে, সন্ধ্যা ফুঁপিয়ে উঠে বলে,
“আপনি আবার আমাকে মা’র’বেন?”

আকাশের হাত থেমে যায়। থমথমে দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। মেয়েটা আবার কাঁদছে। আকাশ ঢোক গিলল৷ ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নেয়।

ওদিকে আসমানী নওয়ান আকাশের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আকাশ সন্ধ্যার সাথে এরকম করছে কেন? দোতলায় দাঁড়ানো ইরার অবস্থাও সেইম। মনে হচ্ছে নতুন এক আকাশকে দেখছে।
আসমানী নওয়ান অবাক হয়ে বলেন,
“আকাশ তুমি সন্ধ্যার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন?”

আকাশ একবার তার সামনে দাঁড়ানো মায়ের দিকে তাকায়। দৃষ্টি ফিরিয়ে আবারো সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“মেয়েটি অনেক গায়ে পড়া স্বভাবের মা। সেই রাস্তা থেকে আমার পিছু পড়ে আছে।”

সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ তাকে রাস্তার মেয়ে বলতে পারলো? মেয়েটার ভেতরটা ভেঙে আসে। আকাশ সবাইকেই তো চিনছে। তবে তাকে কেন চিনছেনা? সন্ধ্যার বুক ফেঁটে কান্না আসে। এগিয়ে এসে দু’হাতে আকাশের ওভারকোর্টের কলার ধরে কান্নামাখা গলায় বলে,

“আপনি সবাইকে চিনছেন, শুধু আমায় চিনছেন না কেন আকাশ? এই দেখুন আমি আপনার সন্ধ্যামালতী। আপনার সোনা বউ। আপনার ভালোবাসা। আমায় খুব আদর করে সোনা বউ ডাকতেন। তবে আজ কেন অস্বীকার করছেন বলুন? আমায় এভাবে দূরে সরিয়ে দিবেন না। একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন, গত চারমাসে আমি কত শুকিয়ে গিয়েছি। আমায় বকবেন না আপনি? আচ্ছা আপনি কি কোনো কারণে আমার উপর অভিমান করেছেন? বেশ, আমি আপনার সব অভিমান ভাঙিয়ে দিব। দোহাই, আপনি শুধু আমায় অস্বীকার করবেন না। করবেন না অস্বীকার।”

আকাশ ঢোক গিলল। রাগান্বিত দৃষ্টি নরম হয়ে এসেছে। সন্ধ্যার কথাগুলো তার মাঝে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে কে জানে! সন্ধ্যার দু’হাত তার কলার থেকে সরিয়ে দেয়। কিছু একটা আন্দাজ করে মৃদুস্বরে বলে,

“স্যরি টু সে, আমি মেয়েদের লাইক করিনা। সো, বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না।
I think you’re sick, like kinda mad”

সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। এইদিন দেখার জন্য তার হায়াত ফুরায়নি? নির্বাক দু’চোখ বেয়ে আবারো নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। বিড়বিড় করে,
“আমায় ভালোবাসা দিয়ে হারিয়ে গেলেন। এই আমিকে ভুলে গিয়ে ফিরে এলেন। আমি আপনাকে মনে রেখে পা’গ’লামি করছি বলে কত সহজে আমায় পা’গ’ল উপাধি দিয়ে দিলেন!”

আকাশ সন্ধ্যার বলা কথাগুলো শুনতে পেল না। সন্ধ্যার শরীর ভেঙে আসে। চোখের পাতা বুজে আর খোলে। এভাবে বেশ কয়েকবার করে এক পর্যায়ে পড়ে যেতে নেয়। আকাশ সন্ধ্যাকে পাস করে তার মায়ের দিকে যাচ্ছিলে। সন্ধ্যাকে পড়ে যেতে দেখে দ্রুত মেয়েটিকে আগলে নেয়। সন্ধ্যা বোধয় পুরোপুরি জ্ঞান হারায়নি। বুঝল হয়ত আকাশ তাকে ধরে নিয়েছে৷ নিভু নিভু চোখে চেয়ে বিষাদমাখা হাসি হাসলো৷ এরপর শরীর একেবারে ছেড়ে দেয়।

আকাশ অদ্ভুদচোখে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যার ওই হাসিটুকু আকাশের চোখে পড়েছে। ভীষণ অস্থির লাগছে ছেলেটার। বহুক’ষ্টে তখনকার সেই অসহনীয় দহন প্রশমন করেছিল। এখন আবারও যেন হাজির হচ্ছে। আকাশ ঢোক গিলল। ভাবলো সন্ধ্যাকে ছেড়ে দিবে। মেয়েটা পড়ে যাক, ম’রে যাক। তাহলে যদি সে একটুখানি শান্তি পায়। অতঃপর আকাশ সত্যি সত্যিই সন্ধ্যাকে ছেড়ে দেয়। আসমানী নওয়ান এটা দেখে বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“কি করছ? সন্ধ্যা তো ব্য’থা পাবে। ওকে ধর।”

আকাশের এবারেও কি হলো কে জানে। সাথে সাথে অচেতন পড়ন্ত সন্ধ্যাকে আবার-ও আগলে নেয়। সন্ধ্যার মাথা একদম তার বুকে এসে ঠেকেছে। আকাশের দৃষ্টি সন্ধ্যার মলিন মুখে নিবদ্ধ। ছেলেটার হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক।

 

চলবে ইনশাআল্লাহ………

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments