গল্প :আমি তার সন্ধ্যামালতী (০৫ শেষাংশ)

লেখক:DRM Shohag

পর্ব:০৫ [শেষাংশ]

ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারের এক ঘটনা~

“এভি আমার কথাটা শোন। আরে আমি ম্যাচে ছিলাম ইয়ার। ফোন চেক করতে ভুলে গিয়েছিলাম। একদমই মনে ছিল না তোর কথা।”

জেডি এভির পিছু পিছু যায় আর কথাগুলো বলে। রা’গে এভি’র চোখমুখ লাল হয়ে আছে। গত তিন ঘণ্টা যাবৎ গাড়ি নিয়ে জেডির জন্য অপেক্ষা করেছে ঢাকা ভার্সিটির কার্জনহলের পাশে একসাথে কার রাইডে যাবে বলে। কল দিয়েছে প্রায় ৫০ টা। যদিও এভির জায়গায় জেডি হলে ৫০০০ টা কল দিয়ে দিত। এভির মতো মানুষের জন্য ৫০ টা কল-ই ৫ লাখ এর সমান। কিন্তু বেচারা জেডি বুঝতে পারেনি। একদম মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এভি কোনো কথাই শুনলো না। জেডিকে ধাক্কা মে’রে সরিয়ে দিয়ে তার গাড়িতে উঠে জায়গাটি প্রস্থান করে।

জেডি অসহায় চোখে চেয়ে রইল। এখন কি করবে? নিজের উপর চরম বিরক্ত হয়। কোন দুঃখে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল কে জানে! ডান পায়ে একটি শট দেয়ার মতো করে বিড়বিড় করে,

“চ্যা’টের খেলা।”

.

.

ঘড়ির কাটায় তখন রাত ৮ টা। জেডি অসহায় দৃষ্টিজোড়া চারিদিকে বুলিয়ে নেয়। ডান হাত উঠিয়ে হাতঘড়িতে সময় দেখল। মাথা উঠিয়ে সামনে তাকালে দেখল একটি মেয়ে তার দিকে দৌড়ে আসছে। জেডি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তার থেকে মেয়েটির দূরত্ব আর দু’হাত। তখনই জেডি দ্রুত ডানদিকে সরে দাঁড়ায়। এরপর বা পা মেয়েটির সামনে বাড়িয়ে দিলে মেয়েটি জেডি’র পায়ের সাথে বেঁধে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যায়। মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। জেডি হাসে৷ মেয়েটির সামনে হাঁটুগেড়ে বসে দুঃখ পাওয়ার ভান করে বলে,

“ইশ! বেশি ব্য’থা পেয়েছ ডেয়ার?”

জেডি’র মুখে মিথ্যে দুঃখ মিশে। অথচ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

মেয়েটি মাথা উঁচু করে অসহায় চোখে তাকায়। কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে,

“কিভাবে পড়ে গেলাম বুঝলাম না। আমাকে একটু তুলবে? প্লিজ জ্যাক!”

কথাটা বলার সাথে জেডি মেয়েটির ডান গালে ক’ষিয়ে এক থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। মেয়েটি হতভম্ব হয়ে যায়। জেডি রাগান্বিত স্বরে বলে, “জ্যাক নাম সবার জন্য নয়।”

ছেলেটার কণ্ঠে তীব্র রা’গ ঝরে পড়ছে। মেয়েটি জেডির দৃষ্টি দেখে ভ’য় পেল। জ্যাক নাম নেয়ায় এতো রে’গে গেল কেন বুঝল না। কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে, “তুমি আমাকে মা’র’লে কেন জ্য…..

থেমে যায় জেডির দৃষ্টি দেখে। মিনমিন করে বলে, স্যরি জেডি!”

জেডি এবার ঠোঁট বাঁকালো। রাগান্বিত মুখে মুহূর্তেই হাসির ছাপ দেখে মেয়েটি অবাক হয়। উঠার জন্য জেডিকে ধরতে চাইল কিন্তু বলার সাহস পায়না আর। একটা থা’প্প’ড় খেয়েই চাপার দাঁত নড়ে গিয়েছে মনে হচ্ছে। মেয়েটি নিজেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

জেডিকে চলে যেতে দেখে মেয়েটি দ্রুত জেডির সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

“জেডি তোমার সাথে আমার কথা আছে।”

জেডি মেয়েটির দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে। মেয়েটি সাথে সাথে পিছিয়ে যায়। ঢোক গিলে তাকায়। জেডি ভ্রু নাচিয়ে বলে, “বলে ফ্যালো ডেয়ার।”

মেয়েটি জেডিকে খুব মন দিয়ে দেখে। ফর্সা গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসছে ছেলেটা। মেয়েটি মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে। সে জেডি আর এভির ব্যাচের স্টুডেন্ট। এদের দুই বন্ধুকে ভার্সিটির কে না চেনে! দু’জন দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এদের মাঝে বন্ডিং মাশাআল্লাহ। মেয়েটি জেডিকে পছন্দ করে। কিন্তু সে বলার সাহস পাচ্ছিল না। তার কিছু ফ্রেন্ড বলেছিল, জেডি নাকি গেঁ। কারণ আছে অবশ্য। জেডি এভিকে জান বলে ডাকে সাথে এরকম অনেক উদ্ভট আচরণ করে, মাঝে মাঝে অনেকে কনফিউজড হয়ে যায় এদের সম্পর্কটার নাম আসলে কি এই ভেবে। তাদের মধ্যে জেডির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির ধারণা-ও সেইম ছিল। কিন্তু এই ভুল আজ ভেঙেছে। সে খুব ভালোভাবে শুনেছে জেডি মানুষটাই এরকম। অন্তত এভির প্রতি ভীষণ পজেসিভ। এর পিছনের কারণ তারা জানেনা। তবে এটুকু জানে, এভি-জেডি ভীষণ ভালো বন্ধু। মেয়েটি মিনমিন করে বলে,

“আমি কি তোমাকে জ্যাক বলে ডাকতে পারি?”

জেডি সোজা হয়ে ফোনে এভিকে ট্রাই করছিল। কল রিসিভ হয়না। মেয়েটির প্রশ্নে সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “নো।”

“কেন?”

জেডি রে’গে তাকায়। থা’প্প’ড়টার কথা মনে পড়তেই মেয়েটি ঢোক গিলল। মিনমিন করে বলে,

“আমি শুনেছি তুমি আর এভি অনেক ভালো ফ্রেন্ড। জানি তোমার গার্লফ্রেন্ড নেই। আর তুমি বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুঁজছ এটাও জানি।”

‘বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুঁজছে’ কথাটা শুনতেই জেডির মুখ থমথমে হয়ে যায়। মেয়েটি শান্ত জেডিকে দেখে সাহস করে বলে, “আমি তোমাকে পছন্দ করি। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে জেডি?”

জেডি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। শ’য়তা’নি হাসি হেসে বলে, “রিয়েলি?”

মেয়েটি ঢোক গিলে বলে, “হুম।”

জেডি গলা ঝেড়ে বলে, “গুড। কবে বিয়ে করতে চাও?”

মেয়েটি খুশি হলো। ভাবলো জেডি সত্যিই তাকে বিয়ে করবে। উত্তর দেয়, “তুমি যখন বলবে তখনি। এখন বললে এক্ষুনি।”

জেডি মেয়েটির দিকে দু’পা এগিয়ে আসে। মেয়েটির চোখে চোখ রেখে হাসে। এতো কাছ থেকে জেডির স্নিগ্ধ হাসি দেখে মুগ্ধ হয়ে দেখে মেয়েটি। জেডি আরেকটু ঝুঁকল। মেয়েটি চোখ বুজে নেয়। জেডির হাসি দীর্ঘ হয়। পিছনে ডান হাত নিয়ে মেয়েটির বা হাত মুচড়ে ধরে। চেঁচিয়ে ওঠে মেয়েটি, চোখ মেলে তাকায়। মুখাবয়বে তীব্র ব্য’থার ছাপ। মনে হচ্ছে হাত ভেঙে গেল! কান্নামাখা গলায় বলে,

“জেডি আমার হাত ছাড়ো। প্লিজ!”

জেডি বাঁকা হেসে বলে,

“নো ওয়ে ডেয়ার। যেহেতু তুমি আমাকে এক্ষুনি বিয়ে করতে চাও। সো, তোমার হাত এক্ষুনি ভা’ঙ’তে হবে।”

ব্য’থায় মেয়েটি চোখমুখ কুঁচকে নিয়েছে। জেডি মেয়েটির চোখে দৃষ্টি রেখে এক চোখ টিপ দেয়। বাঁকা হেসে বলে,

“আমার প্রাইমারি ডোজ কেমন লাগছে ডেয়ার?”

ইতোমধ্যে মেয়েটির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়েছে। কান্নামাখা গলায় বলে,

“আমার হাত ভেঙে যাচ্ছে জেডি। প্লিজ ছাড়ো।!”

জেডি আফসোসের সুরে বলে, “হাত ভেঙে ফেলার মুড সেটআপ হয়ে গিয়েছে। কিচ্ছু করার নেই।”

কথাটা বলে জেডি ভীষণ আফসোসের ভঙ্গি করে।

সামনে নিয়াজকে রাস্তায় দেখে জেডি কিছু ভাবলো। মেয়েটির হাত ছেড়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে ডান হাত মুছল, যেন তার হাতে নোংরা লেগেছে।

মেয়েটি ফোঁপাচ্ছে। মুচড়ে রাখা হাতটি বুলায়। হাত লাল হয়ে গিয়েছে। সে বিয়ে করার কথা বলায় জেডি যে এরকম রিয়েকশন সে একটুও বুঝতে পারেনি।

এর মধ্যে জেডিকে রুমাল দিয়ে হাত মুছতে দেখে অবাক হয়। মেয়েটি বোধয় বুঝল, তার হাত ধরার কারণে জেডির এরকম রিয়েকশন। বিস্মিত কণ্ঠে বলে,

“জেডি তুমি আমার হাত ধরেছ বলে নিজের হাত এভাবে রুমাল দিয়ে…..

জেডি সামনের দিকে যেতে যেতে হেসে বলে, “ইউ আর কারেক্ট ডেয়ার।”

মেয়েটি ভীষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল। সামান্য হাত ধরায় এরকম রিয়েকশন? এভি এরকম করলেও মানা যেত কিন্তু জেডিকে দেখে মোটেও এরকম ছেলে মনে হয়নি।

জেডি পিছন থেকে নিয়াজকে টেনে এনে তার গাড়িতে বসিয়ে দেয়। নিয়াজ বেচারা বুঝতেই পারেনি৷ অবাক হয়ে বলে, “আরে আরে কি করছ? আমাকে মেডিকেল যেতে হবে।”

জেডি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলে,

“তোমাকে মেডিকেল নিয়ে যাচ্ছি। তুমি হাঁটছিলে বলে আমার ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছিল মাই ডেয়ার নিয়াজ।”

নিয়াজ কি বলবে বুঝল না। জেডি যে মজা করল তা বুঝেছে সে। চুপ থাকলো। এমনিতেও তার ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছে।

.

.

হসপিটাল এসে জেডি একটি কেবিনে বসে আছে। ডান পায়ের প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে পা উঁচু করে রেখেছে। একজন ডক্টর জেডির পা ব্যান্ডেজ করছে।

জেডির পাশে নিয়াজ দাঁড়ানো। সে অদ্ভুদ চোখে চেয়ে আছে জেডির দিকে। জেডির কান্ডকারখানা বোঝার চেষ্টা করছে। এর যে কি হয়েছে। একদম সুস্থ সবল পা-টা কে ব্যান্ডেজে মুড়িয়ে কি করবে কে জানে!

ব্যান্ডেজ শেষে জেডি নিয়াজের উদ্দেশ্যে বলে, “নিয়াজ এভিকে একটা কল কর।”

নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”

জেডি বিরক্ত চোখে তাকায়। নিয়াজ-ও বিরক্ত হয়ে আছে। বেশিদিন হয়নি তার প্রফ এক্সাম হয়েছে। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে মাত্র কয়েকদিন ক্লাস করেছে। ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে। অথচ জেডি তাকে যেতে দিচ্ছে না। আবার উদ্ভট সব কাজকর্ম করছে। নিয়াজকে স্ট্যাচু দেখে জেডিকে বিরক্তি মাখা কণ্ঠে বলে, “এভিকে কল দিয়ে বল, আমি এক্সিডেন্ট করেছি।”

নিয়াজ অবাক হয়ে বলে, “তুমি তো একদম সুস্থ। আমি মিথ্যা বলব কেন? আমি এসব পারব না।”

জেডি রে’গে বলে,

“নিজের ভালো চাইলে চুপচাপ তাই কর যা আমি বলেছি।”

নিয়াজ থমথমে মুখে তাকায়। তার ক্লাসের টাইম চলে যাচ্ছে। কিছু না বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।

জেডি পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল করে বলে,

“নিয়াজের টুনি-বাবু ছোট। এই খবর নিয়াজের মেডিকেলের মাঝে ছড়িয়ে দে।”

সাথে সাথে নিয়াজের পা থেমে যায়। দ্রুত জেডির দিকে চেয়ে বলে,

“কি বলছ তুমি এসব?”

জেডি হেসে বলে, “কমন পড়েছে ডেয়ার?”

নিয়াজ ভীষণ বিব্রতবোধ করল। জেডি বাঁকা হেসে বলে, “যা বললাম তা কর। তাহলে এই সত্য আর ছড়াবে না।”

নিয়াজ কটমট করে বলে, “আমার কিছু ছোট নয়।”

জেডি ডানেবামে মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বলে, “ওহ আচ্ছা আচ্ছা। এর মানে তোমার টুমি-বাবু বড়। ওয়াও!”

নিয়াজের কান বন্ধ হয়ে আসে। ইচ্ছে করছে এই জেডিকে যাস্ট খু’ন করতে। কি পরিমাণ জ’ঘ’ণ্য কথা বলে। কিন্তু কিছু বলল না৷ এমনিতেও জেডিকে তার সুবিধার মানুষ লাগেনা। কথা না শুনলে তার মানসম্মান নিয়ে টানাটানি করবে এই ছেলে। হতাশ কণ্ঠে বলে,

“আকাশকে কল করছি।”

জেডি ছোট করে বলে, “গুড।”

.

প্রায় ১৫ মিনিটের মাথায় আকাশ হতদন্ত হয়ে হসপিটালে আসে। নিয়াজের থেকে শুনেছে, জেডি এক্সিডেন্ট করেছে। দিকবিদিক হারিয়ে হাঁটতে গিয়ে নিয়াজের সাথে ধাক্কা খায়। নিজেকে সামলে হাঁপানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “জ্যাক কোথায় নিয়াজ?”

নিয়াজ তাকায়। আকাশের চিন্তিত মুখ দেখে তার খারাপ লাগলো। আকাশ কত চিন্তা করছে আর এই জেডি আকাশের সাথে ফাজলামো করছে। নিয়াজকে চুপ দেখে আকাশ রে’গে বলে,

“কি প্রবলেম, কথা বলছ না কেন? জ্যাক এর কিছু হলে তোমাকে ছাড়বো না আমি।”

নিয়াজ অসহায় চোখে তাকায়। এরা দুই বন্ধু দুইদিক থেকে তাকে চাপা দেয়, কি আজব! অতঃপর আকাশকে জেডির কেবিন দেখিয়ে দিলে আকাশ দ্রুত সেদিকে যায়।

জেডি কেবিনে শুয়ে ব্যান্ডেজ করা পা নাড়ায় আর গুন-গুন করে গান গায়। অপেক্ষা করছে এভির জন্য। হঠাৎ-ই এভির কণ্ঠ ভেসে আসে, “জ্যাক?”

সাথে সাথে জেডির পা থেমে যায়। গুনগুনানোর ইতি টানে। বাদিকে ঘাড় ফিরিয়ে এভির দিকে তাকায়। বেচারা ভীত হয়ে ঢোক গিলল এভি তার পা নাড়ালো দেখে নিল কি-না এই ভেবে। এভি দ্রুত এগিয়ে এসে জেডির সামনে দাঁড়িয়ে, বন্ধুর ব্যান্ডেজ করা পায়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,

“এটা কিভাবে হলো জ্যাক?”

কথাটা বলতে বলতে একটু ঝুঁকে জেডির পা ধরলে জেডি চেঁচিয়ে উঠে,

“আহ! মারাত্মক ব্য’থা এভিজান। মনে হয়, আমার এই পা কে’টে ফেলতে হবে। তুই কেন রা’গ করলি বল তো? আমার সব শেষ। ইশ! এখন সবাই বলবে জেডি এভিজানের পা কাটা ফ্রেন্ড। এসব তুই কিভাবে সইবি বল? ভেবেই তো আমার-ই ক’ষ্টে বুকটা ফাঁটতে ফাঁটতে ফেটেই গেল মনে হয়! তুই…

এভির শ’ক্ত দৃষ্টি দেখে জেডি মুখের লাগাম টানলো। মলিন গলায় বলে,

“না মানে, ওই আর কি একটু ক’ষ্ট হচ্ছে সেটাই প্রকাশ করছিলাম!”

এভি দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “কিছুই হবে না তোর।”

জেডি অসহায় কণ্ঠে বলে, “নাহ তুই বুঝতে পারছিস না এভিজান। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। পায়ের ব্য’থা বুকে আসলো বলে! আহ!”

এভি জেডির কলার ধরে রে’গে বলে,

“আর একটা বাজে কথা বললে, তোর আরেকপা সহ বাকি দু’টো হাত কে’টে ম’রার শাধ মেটাবো। বে’য়া’দ’ব!”

নিয়াজ বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে। কি পরিমাণ এক্টিং করে এই জেডি ভাবা যায়!

এদিকে জেডি মনে মনে হাসে। এভিকে বলে তাকে বাসায় নিয়ে যেতে। তার এখানে ভালো লাগছেনা। এভি রাজি হয়। হসপিটাল তাদের দুই বন্ধুর সবচেয়ে বিরক্তির জায়গা। তাই এখানে আর থাকলো না। এভি জেডিকে ধরে ধরে দাঁড় করালো। জেডি এভির কাঁধের উপর ভর দিয়ে ডান পা উঁচু করে রেখে একটু একটু করে এগোয়। কিছুদূরে এগিয়ে জেডি নিয়াজের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপ দেয়। ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি।

নিয়াজ চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। ডেকে ওঠে, “আকাশ?”

আকাশের পা থেমে যায়। তাকায় নিয়াজের দিকে। জেডি ভস্ম করা দৃষ্টি দেয় নিয়াজের পানে। আজ যদি এভি কিছু জানে, তবে তার সব যাবে। এর মান ভাঙে না। শা’লার গার্লফ্রেন্ডের পিছু কখনো যায়নি দু’মিনিট টাইম ন’ষ্ট করতে। আর সেখানে এভির মান ভাঙাতে হালুয়া টাইট হয়৷ এবার কত ক’ষ্ট করে একটা বুদ্ধি বের করেছে এটা ভেস্তে গেলে এই নিয়াজকে সে কুটিকুটি করে কাটবে৷ ভাবনা অনুযায়ী বলে,

“আমি সুস্থ হয়ে গেলে একজনকে খুব সুন্দর করে খু’ন করব এভি। এখন বেড রেস্ট নিব আর প্ল্যান করব।”

এভি বিরক্ত হলো। কিছু বলল না। নিয়াজকে চুপ দেখে সে জেডিকে ধরে আবারও এগিয়ে গেল। এদিকে জেডির কথা শুনে নিয়াজ ঢোক গিলল। জেডি ভ’য় পাওয়ার মতোই মানুষ। এই ছেলে হাসতে হাসতে মানুষকে মে’রে ফেলার কোনো ওয়ে বাদ রাখেনা। মাস্তান-ও ভালো আছে এর থেকে।

____________________

পুরোনো কিছু স্মৃতিচারণ করে জেডি হাসল। স্কুল, ভার্সিটি লাইফে এভির সাথে এরকম হাজারো দৃশ্য স্মৃতির পাতায় জমা হয়ে আছে। নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলে,

“কিছু বলছ না কেন? আকাশের ব্যাপারটি ক্লিয়ার কর।”

জেডি হেসে বলে, “তোমার টুনি-বাবু যে বড়। এটা মেডিকেলে তোমার ক্লাসমেটদের জানাতে পারিনি বলে ভীষণ আপসেট আমি।”

নিয়াজ থতমত খেয়ে তাকায়। তার নিজেরও বোধয় কিছু মনে পড়ল। অরুণ চোখ ছোট ছোট করে বলে, “টুনি-বাবু কি?”

নিয়াজ কটমট দৃষ্টিতে জেডির দিকে তাকায়। জেডি হাসে। অরুণের দিকে ঝুঁকে বলে, “এটা সব ছেলেদের থাকে ডেয়ার। তোর-ও আছে। আয় দেখাচ্ছি। সাথে মাপটাও বলছি।”

কথাটা বলে জেডি বা হাত অরুণের দিকে এগিয়ে নিলে অরুণ চেঁচিয়ে ওঠে। দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। রে’গে বলে,

“জেডির বাচ্চা তোকে ছাড়বো না আমি।”

জেডি চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা পিছনদিকে ঠেকিয়ে রেখে হাসছে। নিয়াজ হতাশ চোখে চেয়ে। এসব রেখে সে বলে,

“জেডি? আকাশ এক্সিডেন্ট করেছিল। তুমি ওকে কোথায় পেলে, আর ও এতোদিন কোথায় ছিল? কেন আসেনি এখানে। রিকুয়েস্ট করছি ক্লিয়ার কর।”

জেডি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“এভি আমার কাছে কেন থাকবে? এভি নিজের মতো ছিল। ও ওর লাইফ নিয়ে বিজি ছিল।

এটুকু বলে থামে। অরুণ রে’গে বলে,

“ফা’জ’লা’মো করছিস? আকাশ সন্ধ্যাকে চিনতে পারছে না কেন? আর….

জেডি রে’গে বলে,

“চুপ থাক। নয়তো গু’লি সোজা তোর মাথায় ঢুকবে।”

নিয়াজ অরুণকে শান্ত করল। জেডিকে বলতে বলে। জেডি সময় নেয়। কিছু ভাবছে হয়ত। এরপর বলে,

“এক্সিডেন্টের ব্যাপারে আমি জানিনা। তবে ওকে আমি আধাম’রা অবস্থায় পেয়েছি। ডিটেইলস বলার মুড নেই।”

অরুণ রে’গে বলে,

“তুই আকাশকে জীবিত পেয়ে আমাদের একটা খবর দিলি না কেন?”

অরুণের কথা শুনে জেডি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হঠাৎই শব্দ করে হেসে ফেলে। ডান পা বা পায়ের উপর তুলে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কপালে ঠেকিয়ে হাসে। প্রায় তিন মিনিটের মাথায় তার হাসি সংকুচিত হয়ে আসে। ইতোমধ্যে চোখেমুখে ক্রোধ জমাট বেঁধেছে। অরুণের দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“রিয়েলি? যারা আমাকে আর এভিকে আলাদা করার জন্য এতোকিছু করেছে, তাদের কাছে আমি এভির খোঁজ দিব? হাউ ফানি! আমার সাধ্য থাকলে এভিকে কখনোই তোদের কাছে ফিরতে দিতাম না। কখনোই না।

এটুকু বলে জেডি চোখ বুজে দু’বার শ্বাস নেয়। নিজেকে শান্ত করে চোখ মেলে শীতল কণ্ঠে বলে,

“তোর ম’রা’র ভ’য় করেনা অরুণ?”

জেডির বলার ধরন অদ্ভুদ। অরুণ ঢোক গিলল। নিয়াজ-ও কিছুটা ভ’য় পেল। জেডি অরুণের ভীত মুখ দেখে আবারও উচ্চস্বরে হেসে দেয়। অরুণ নিজেকে সামলে বলে,

“আমি ম’রার ভ’য় করিনা জেডি। অন্তত তোর হাতে তো নয়-ই। কারণ আমি জানি তুই আমাকে আর আন্টিকে কখনোই মা’র’বি না।”

জেডি থমথমে মুখে তাকায়। শ’ক্ত গলায় উত্তর করে,

“যদি তুই আর তোর আন্টি এভি’র রিলেট না হতি,, তোরা ম’রলে যদি এভি ক’ষ্ট না পেত,, আই সোয়্যার তোদের দু’জনকে ঠিক কত টুকরো করতাম, কল্পনাও করতে পারতি না।”

অরুণ অবাক হলো না। কারণ উত্তরটি তার মনের মতোই হয়েছে। নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ জেডির বলা কথার পিছনে কারণগুলো সে জানে। সামান্য অবাক হলো আকাশের প্রতি এখনো জেডির সেই একই চিন্তাধারা দেখে।৷ জেডির উদ্দেশ্যে সে বলে,

“তুমি একটুও বদলাওনি।”

জেডি তাকালো নিয়াজের দিকে। মুখটা মলিন হয়। কনুই পর্যন্ত গোটানো শার্টের হাতা আরেকটু উপরে উঠায়। বুকের কাছে দু’টো শার্টের বোতাম খুলে পিছনদিকে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নেয়। হাসল খুব সামান্য। ক্লান্তির সুরে আওড়ায়,

“বাট এভি বদলে গিয়েছে। গত সাতবছর আগে হঠাৎ বদলে গেল। কি আজব!”

অরুণ বলতে নেয়, “তোর মতো…..

নিয়াজ অরুণকে থামিয়ে দেয়। জেডি তাকায় অরুণের দিকে। কিছু বলল না। নিয়াজ বলে আকাশের ব্যাপারটি ক্লিয়ার করতে। জেডি নিয়াজের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে,

“ফার্স্ট-এ এভি আমাকে-ও চিনত না। মাঝেমাঝে চিনত। ভালোভাবে কথা বলত। আবার মাঝেমাঝে চিনত না। যেন আমাকে চেনে না, আমি ওর অপরিচিত। রা’গ করে নয়। একদম সত্যি-ই অপরিচিতদের মতো বিহেব করত। এভাবে কয়েক মাস গিয়েছে।

রিসেন্ট ও একদম আগের মতো বিহেব করা শুরু করল। ফার্স্ট-এ আমার সাথে ঝামেলার কথা মেবি মনে ছিল না। রিসেন্ট মনে পড়েছে।

অরুণ ভ্রু কুঁচকে বলে,

“মনে পড়লে ও সন্ধ্যাকে চেনে না কেন?”

জেডি বিরক্ত হয়ে বলে,

“কারণ এভির কোনো মেয়েকে চেনার কথা নয়। ফা’ল’তু কথা বলে আমার রা’গ বাড়াবি না বলে দিলাম।”

অরুণও বিরক্ত হলো। মাঝখান থেকে নিয়াজ বলে,

“বুঝেছি। আকাশের ‘অ্যামনেশিয়া’ উপসর্গ দেখা দিয়েছে। রিসেন্ট কিছু স্মৃতি ন’ষ্ট হয়ে গিয়েছে। মানসিক আ’ঘা’ত বা মাথায় আ’ঘা’ত পেলে এই উপসর্গ দেখা যায়।”

এবার অরুণ অনেক কিছু বুঝল। আসমানী নওয়ান কিছুক্ষণ আগে তাকে কল করে বলেছিলন, আকাশ গত প্রায় সাড়ে তিন বছর আগের কথা বলছে। এর মানে গত সাড়ে তিন বছর আগে আকাশ আসমানী নওয়ানের সাথে রা’গ করে ইংল্যান্ড গিয়েছিল,, এটাই তার মাথায় আছে। এরপরের সব স্মৃতি ন’ষ্ট হয়ে গিয়েছে? এইজন্যই কিছু মনে নেই আকাশের। এমনকি তার বাবার মৃ’ত্যু পর্যন্ত মনে নেই। একে একে হিসাব মিললে অরুণ শুকনো ঢোক গিলল। এখন সন্ধ্যার কি হবে? আকাশ আবারো আগের মতো হয়ে গিয়েছে। ও কার কথা শুনবে? কার কথা মানবে? অরুণ জেডির উদ্দেশ্যে বলে,

“তোর অনুপস্থিতিতে আকাশ যথেষ্ট ভালো হয়ে গিয়েছিল। তুই সাথে থেকে আবারো ওকে কি বানিয়েছিস?”

জেডি রে’গে বলে,

“এভিকে আমি তিন বছর আগে যেমন দেখেছি, আজ-ও সেইম দেখছি৷ তাছাড়া এভি এভির মতো। ও কারো কথা শুনলে সবার আগে আমার কথা-ই শুনতো।”

অরুণ মানে না। “তুই আসলেই খুব খারাপ…..

বাকিটুকু শেষ করার আগেই জেডি পি’স্ত’ল বের করে অরুণের পায়ের পাশে একটি গু’লি করে দেয়। অরুণ লাফিয়ে ওঠে। নিয়াজ-ও ভ’য় পেয়েছে। অরুণকে গু’লি লাগেনি বিধায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। জেডি ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যেতে বলে,

“পরেরবার ছাড় পাবি না। এভি’র অজুহাতেও না। মাইন্ড ইট।

আর নিয়াজ কান খুলে শুনে রাখো, এভির চোখে লেন্স পরাবে না। কথার হেরফের হলে…..

এটুকু বলে জেডি পিছু ফিরে উদ্ভট এক হাসি দেয়। এক চোখ টিপ দিয়ে বলে,

“বুঝেছ ডেয়ার?”

এরপর জেডি ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যায়। নিয়াজ শান্ত হয়ে ভাবনায় ব্যস্ত। আকাশের সোনালি চোখ জেডির পছন্দ বলে আকাশ চোখে লেন্স পড়ে। আসমানী নওয়ান জেডির অস্তিত্ব মুছতে ছেলেকে অন্ধ বানাতেও রাজি। আর জেডি…ভ’য়ংক’র মানব বলা যায়। তবে এই জেডি এভির জন্য অনেককিছুই সয়ে নেয়।

কথাগুলো ভেবে নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

_____________________

সৌম্য ফলমূল হাতে নিয়ে বাসার ভেতর প্রবেশ করে। ডায়নিং-এ সবাইকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে। দাঁড়ায় সন্ধ্যার সামনে। সন্ধ্যাকে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে দেখে সৌম্য বিচলিত হয়। কেঁদেকেটেই তার বোনুর শরীর এতো খারাপ হয়েছে। হাতের ব্যাগগুলো ইরার হাতে দিয়ে দ্রুত বোনের পাশে বসে। সন্ধ্যার গালে হাত রেখে সন্ধ্যাকে তার দিকে ফিরিয়ে বলে,

“আবার কাঁদছিস কেন বোনু? অসুস্থ হয়ে যাবি তো!”

সন্ধ্যা বিড়বিড় করে,

“আকাশ আবার চলে গিয়েছে ভাইয়া। আকাশ….

সৌম্য তার বোনুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “এসব আর ভাবিস না বোনু। আকাশ ভাইয়া তো নেই। কেন এমন করছিস?

সৌম্য’র কথায় আসমানী নওয়ানসহ ইরা, লামিয়া তাকায়। তিনজনের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব। আকাশ ফেরায় তারা যতটা খুশি হয়েছিল, তার চেয়ে বহুগুণ ক’ষ্ট পাচ্ছে আকাশের অদ্ভুদ আচরণে। তারা সৌম্যকে কিভাবে বলবে, আকাশ তার বোনুকে দেখলে শুধু দূর দূর করে। বোনকে কতশত কথা বলে সান্ত্বনা দিত। সে যখন দেখবে, তার বোন যার জন্য এতো পা’গ’লা’মি করে, সেই মানুষটাই সন্ধ্যার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়,, তখন সৌম্য’র রিয়েকশন কেমন হবে?

সৌম্য এতো থমথমে পরিবেশ আঁচ করতে পেরে চারপাশে তাকালে দেখল আসমানী নওয়ান একটি চেয়ারে ভীষণ চিন্তিত মুখে বসে আছে। ইরার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চায়, তখন-ই দোতলা থেকে পরিচিত কণ্ঠে সৌম্য ডাক ভেসে আসে। সৌম্য থমকায়। দৃষ্টি ইরার পানে এখনো। সে কি ভুল শুনলো? ইরার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলতে ভ’য় করছে। তার বোনুর মতো কি তার-ও ভ্রম হচ্ছে? সে কেন আকাশ ভাইয়ার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে? সৌম্য ঢোক গিলে দৃষ্টি ঘোরালে দেখল আকাশ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আওড়ায়, “আকাশ ভাইয়া?”

আকাশ ধীরে ধীরে নামতে থাকে। দৃষ্টি সৌম্য’র পানে। আসমানী নওয়ান, সন্ধ্যা, ইরা, লামিয়া ভীষণ অবাক হয়। আকাশ সন্ধ্যাকে চিনল না। অথচ সৌম্যকে এক দেখায় চিনে ফেলল? সৌম্য আকাশকে দেখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এর মানে বোনু সত্যি বলছিল? আকাশ ভাইয়া সত্যিই এসেছে? এইতো এসেছে৷ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সৌম্য’র হাত পা কাঁপছে মনে হলো। কিভাবে সম্ভব এটা? কাঁপা হাতে দু’চোখ ডলে ছেলেটা। এরপর আবারও তাকালে অবিকল আকাশকে দেখে সৌম্য রিয়েকশন দিতে ভুলে যায়। হাজারটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আকাশ কিভাবে বেঁচে গেল? এতোদিন কোথায় ছিল? আজ হঠাৎ কোথা থেকে এলো?

আকাশের পরনে সাদা রঙের গ্যাবার্টিন প্যান্ট, সাদা শার্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো৷ শার্টের বোতাম প্রায় অর্ধেক খোলা। খোলা শার্টের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সিলভার কালারের একটি চেইন। ডান হাতে সেইম ডিজাইনের একটি চেইন। সৌম্য আকাশের বেশভূষায় যেমন অবাক হলো, তেমনি বিরক্ত হলো। আকাশ যখন ভার্সিটি ছিল, তখন এই চেইনগুলো গলায় আর হাতে পরতে দেখেছিল আকাশকে। এসব জড়ালে একদম বখাটে বখাটে লাগে সৌম্য’র দৃষ্টিতে। কিন্তু তার বোনুর সাথে বিয়ের পর সে অন্য এক আকাশকে দেখেছিল। সেই আকাশের সাথে এই আকাশকে মেলাতো পারলো না শুধু চেহারা ছাড়া। আকাশ তার সম্মুখ বরাবর এসে দাঁড়ালে সৌম্য এবার সবচেয়ে বেশি অবাক হয় আকাশের চোখে চোখ রাখলে। আকাশের সোনালি চোখ সে এর আগে দেখেনি৷ আজকেই প্রথম দেখছে। আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

“তুই সৌম্য, রাইট?”

আকাশের কথায় সৌম্য আসমান থেকে পরার মতোন অবাক হয়। আকাশ এটা কিভাবে কথা বলছে তার সাথে? তার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না।

সন্ধ্যা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় ভাইয়ের পাশে। কান্নাভেজা মলিন মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তখনকার বলা আকাশের কথাগুলো মনে পড়ল। আকাশের বলা পা’গ’ল শব্দটি তার কানে এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাকে দূরে ঠেলে দেয়ার দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। এই মানুষটাই একদিন তাকে একবার জড়িয়ে ধরার জন্য কত পা’গ’লামি টা-ই না করত! তাকে দেখার জন্য কত ছটফট করত! সোনা বউ ছাড়া ডাকতো না। সেই মানুষটাই আজ তাকে দূরছাই করে। মেয়েটি এসব কি করে মানবে? সন্ধ্যার চোখজোড়া ভরে ওঠে।

আকাশ একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়। এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে সৌম্য’র উদ্দেশ্যে বলে,

“বোনকে ভালোবেসে বোনু ডাকিস? গুড। ওকে ইমারজেন্সি পা’গ’লের ডক্টর দেখিয়ে নে। হাতে বেশি সময় পাবিনা।”

সকলে বিস্মিত হয়। নাতো আকাশের কথার আগামাথা বুঝল, আর না আকাশের এরূপ ব্যবহারের কারণ বুঝল। সন্ধ্যা মাথা নিচু করে নিল। চিনচিন ব্য’থা করে ওঠে বুকটায়। আকাশ আবারো তাকে পা’গ’ল বলছে। আকাশ কি একটুও বুঝতে পারছে না, আকাশ এভাবে বললে তার সন্ধ্যামালতী কত ক’ষ্ট পায়? একটুখানিও আঁচ করতে পারছে না তাইনা? এজন্য বোধয় নির্দ্বিধায় বলে দিচ্ছে একেকটি ভারী কথা। যার ভার সন্ধ্যা আর বইতে পারছেনা।

সৌম্য বিস্মিত কণ্ঠে বলে, “আকাশ…….

রা’গে আকাশ সৌম্য’র নাক বরাবর শক্ত পাঞ্চ মা’রে। সৌম্য এক পা পেছায়। হতভম্ব হয়ে যায় সকলে। আসমানী নওয়ান এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,

“আকাশ কি করছ?”

আকাশ গ্রাহ্য করল না। সৌম্য’র শার্টের কলার ধরে টেনে বাদিকে আনে। সমানে মা’র’তে থাকে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে না যেন। বেচারা সৌম্য জানেও না সে কেন মা’র খাচ্ছে। তাও আবার আকাশের হাতে। যার জন্য এই কয়টা মাস হাসতে ভুলে গিয়েছিল, তাকে দেখে আজ আনন্দ করার কথা। অথচ সেই বড় ভাইয়ের হাতেই চোরের মতো মা’র খেতে হচ্ছে। ছেলেটা ব্য’থা পেয়েও টুঁ-শব্দটিও করেনা। কেবল অবাক চোখে আকাশকে দেখে। এটা আকাশ? তার বড় ভাই আকাশ?

সন্ধ্যা দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে বলে,

“আমার ভাইয়াকে মা’রছেন কেন? উনাকে ছাড়ুন বলছি।”

আসমানী নওয়ান আকাশকে টেনে সরাতে চায় আর বলে,

“আকাশ ওকে ছাড়ো। আকাশ?”

আকাশকে চুল পরিমাণ নাড়াতে পারেনা। আকাশ ভস্ম করা দৃষ্টিতে চেয়ে সমানে মে’রেই যাচ্ছে সৌম্যকে। ইরা সৌম্যকে টেনে সরাতে চায়, অপর পাশে সন্ধ্যা-ও ধরেছে। কিন্তু তারা ব্যর্থ। লামিয়া ভীত চোখে চেয়ে আছে। এখানে এসব কি হচ্ছে!

এক সময় আকাশ নিজেই সৌম্যকে ধাক্কা মে’রে চিৎকার করে বলে,

“তোর সাহস কি করে হয় আমার বাড়ি পা রাখার? আমাদের দিকে নজর দেয়ার? এখানে বসে বসে খাওয়ার পারমিশন কে দিয়েছে তোকে? এক্ষুনি বেরোবি, নয়তো তোর লা’শের অস্তিত্বটুকু-ও মুছে ফেলব এই দুনিয়ার বুক থেকে।”

সকলে বাকহারা চোখে তাকায়। সৌম্য’র নাক-মুখ দিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে। ছেলেটা নিভু নিভু চোখে আকাশকে দেখে। শরীরের চেয়ে মনটা-ই বেশি দুর্বল লাগছে। শরীরের ভার ছেড়ে মেঝেতে বসে পড়ে। আকাশ আবার-ও তেড়ে আসতে নিলে আসমানী নওয়ান আকাশের সামনে এসে দাঁড়ায়। আকাশকে থা’প্প’ড় মা’রা’র জন্য হাত উঠালে আকাশ তার মায়ের হাত আটকে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“এসব আমি পছন্দ করিনা মা। তোমার সাথে অভদ্রতা করতে আমাকে বাধ্য কর না।”

আসমানী নওয়ান ভীষণ অবাক হয়। এই আকাশকে সে মানতে পারেনা বলে কতকিছু করেছিল। অথচ আজ আবারও সেই আকাশ তার সামনে, যাকে সে এক সেকেন্ডের জন্য সহ্য করতে পারেনা। ভদ্রমহিলার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এসব কি হচ্ছে!

আকাশ মায়ের হাত ছেড়ে আবারো সৌম্য’র দিকে এগোলে ইরা সৌম্য’র সামনে দাঁড়িয়ে যায়। মাথা নিচু করে দু’হাত জমা করে কান্নামাখা গলায় বলে,

“আমার স্বামীকে আর মা’রবেন না ভাইয়া। আমরা এক্ষুনি চলে যাবো এখান থেকে।”

আকাশের দৃষ্টি সৌম্য’র দিকে। সৌম্য ক্রোধান্বিত আকাশের দিকে চেয়ে। ছেলেটার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। সে এই বাড়ি তার বোনুর জন্য থাকতো। নয়তো সে অন্যের বাড়ি বসে বসে খাওয়ার মানুষ নয়। কিন্তু আকাশের বলার ধরন টা একদম বুকে এসে লেগেছে। তার বোনুর স্বামী সেই আকাশ আর নেই। সে তাকে ছোট ভাই হিসেবে কত আদর করত! আর ইনি….

নিজের ভাগ্যের উপর আজ আবারো উপহাস করল সৌম্য নিজেই। রাগান্বিত আকাশের দিকে চেয়ে মলিন হেসে বিড়বিড় করে,

“জানতাম, সৌম্য’র সৌভাগ্যের পাতা উল্টাবে। তবে সেই সময়টা যে এতো দ্রুত আসবে, ভাবিনি। ক্ষণিকের সৌভাগ্যের জোরে একটা বড় ভাই পেয়েছিলাম। সবশেষে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ সেটাও হারালাম।”

সৌম্য ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। আসমানী নওয়ান দ্রুত সৌম্য’র কাছে এসে বলে,

“সৌম্য আব্বা তুমি থাকো এখানে। আকাশের কথা ধর না। ওর কি যেন হয়েছে।”

সৌম্য ডান হাতের শার্ট দ্বারা নাকেমুখে লেপ্টানো র’ক্তকণা মুছে নেয়। আসমানী নওয়ানের উদ্দেশ্যে ছোট করে বলে, “প্রবলেম নেই।”

এরপর দু’পা এগিয়ে এসে ইরার হাত ধরে। তাকায় আকাশের দিকে। আকাশের বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি দেখে সৌম্য ঢোক গিলল। বুকে পাথর চেপে বহুক’ষ্ট নিয়ে দু’টো দৃঢ় বাক্য বড় ভাইয়ের দিকে ছুড়ে দেয়,

“আজ আমার আল্লাহ্কে সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞা করে গেলাম। আমি সৌম্য’র দেহে প্রাণ থাকতে আমি, আমার স্ত্রী এই বাড়ির চৌকাট কখনো পেরোবো না ইনশাআল্লাহ।”

কথাটা বলে সৌম্য শ্বাস নেয়। আকাশের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর নেই। গম্ভীর গলায় বলে,

“বোনকে সাথে নিয়ে যা। ওর জায়গা এই বাড়ি হবেনা৷ নেভার। বোনের দায়িত্ব নিতে পারবিনা বলে আরেকজনের বাড়ি রেখে যাওয়ার নীতি কোথায় পেয়েছিস?”

আকাশের কথায় সৌম্য’র পা থেমে যায়। ভীষণ অবাক চোখে তাকায় আকাশের দিকে। বোনুকে নিয়ে আকাশ ভাইয়া এমন কথা কেন বলছে? সৌম্য উত্তর করে,

“বোনু আপনার বউ। আমি আপনার উপর আমার বোনুকে গছায়নি, বরং আপনি আমার কাছে এসেছিলেন আমার বোনুকে চাইতে।”

কথাটা শুনে আকাশ শব্দ করে হেসে ফেলল। একটু পর থেমে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“তোর বোন আমার বউ। আমি তোর বোনের জন্য পা’গ’ল। মানে আমি তোর বোনের জন্য চিৎকার করে কেঁদেছি। সন্ধ্যামালতী নামের জ’ঘ’ণ্য ফুলের প্রশংসা করেছি তোর বোনের জন্য।

ওহ হ্যাঁ তোর বোনের পেটে আবার আমার বাচ্চা-ও আছে। এরপর আবার তুই আর তোর বোন আমার খালাতো বোন।

এটুকু এক নিঃশ্বাসে বলে আকাশ থেমে যায়। সকলে বাকরুদ্ধ। আকাশ তো সবই জানে। তবে এরকম আচরণ কেন করছে? কারো মাথা কাজ করছেনা।

এদিকে সন্ধ্যার একমুহূর্তের জন্য মনে হলো সে তার আকাশকে ফিরে পেয়েছে। এইতো আকাশ সব মনে রেখেছে। মেয়েটির কি যে খুশি লাগলো। তার মনে হলো, আকাশ এক্ষুনি তাকে জড়িয়ে ধরতে আসবে। সোনা বউ বলে ডাকবে। খুব ভালোবাসবে। এসব ভেবে সন্ধ্যার কান্নামাখা মুখে একটুখানি হাসি ফুটল। আকাশের দিকে এগোনের জন্য এক পা বাড়ায়। তখন-ই এক তি’ক্ত বাক্য তার পা থামিয়ে দেয়। মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। খুশিগুলো হাওয়ায় ভেসে যায়।

“অথচ এগুলোর কোনো প্রুফ নেই। এটা যাস্ট একটা মিথ্যা গল্প মাত্র।”

বিনা মেঘে বর্জ্যপাত হলে যেমন হয়, সকলের রিয়েকশন এখন তেমনি মনে হচ্ছে। সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ালো। আকাশ এসব কি বলছে? কেন বলছে?

আসমানী নওয়ান বিস্ময় কণ্ঠে বলে,

“তুমি এসব কি বলছ আকাশ? যা বললে সব সত্যি। কিন্তু শেষে এসে অস্বীকার কেন করছ?”

আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। গম্ভীর গলায় বলে,

“এর মধ্যে একটা কথার প্রুফ দেখাতে পারবে? ওয়ানলি ওয়ান প্রুফ!”

আসমানী নওয়ানের সবকিছু এলোমেলো লাগে। এসবের প্রুফ দিবে কিভাবে? আকাশ আর সন্ধ্যার রেজিস্ট্রি পেপার তার কাছে ছিল। আসমানী নওয়ান ভাবলেন সেটাই আকাশকে দেখাবে। কিন্তু মুহূর্তেই তার মুখ মলিন হয়ে যায়। কাগজটি ক’দিন আগে কাজের মেয়ের ছোট বাচ্চা কুচিকুচি করে কে’টে’ছে। সন্ধ্যার এসবে খেয়াল ছিল না। সে ভীষণ আফসোস করছিল। কিন্তু আজ……

ভদ্রমহিলা হতাশ কণ্ঠে বলে,

“আমরা কেউ মিথ্যা……

শেষ করতে দেয়না আকাশ। রে’গে বলে,

“আমি খারাপ হতে পারি। বাট লায়ার নই। আর তুমি নিজের সম্মান নিজে রাখো মা। আমি কিন্তু বারবার মনে করাবো না।

এরপর সৌম্য’র উদ্দেশ্যে বলে,

“তুই কি যাবি না-কি দারোয়ানকে ডাকব?”

তীব্র অপমানে সৌম্য’র মুখ নীল বর্ণের ন্যায় হয়ে যায়। অবাক আর হয় না। আর কত অবাক হওয়া যায়? আকাশের ব্যবহারের কারণ সে না বুঝলেও এটুকু বুঝেছে, এই আকাশ অন্তত মানুষ নয়। আরেকটু শ’ক্ত করে ধরে ইরার হাত। এগিয়ে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “বোনু আয়।”

সন্ধ্যা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। আকাশ নিজ মুখে বলছে, তার জায়গা না-কি এই বাড়ি হবেনা। তার কান কি ন’ষ্ট হয়ে গেল? সে কেন তার আকাশের মুখ থেকে এসব ভুলভাল শুনছে? একটার পর একটা ক’ষ্টে ভরা কথা শুনতে হচ্ছে তাকে।

সন্ধ্যাকে চুপ দেখে সৌম্য চেঁচিয়ে ওঠে,

“কি প্রবলেম তোর? আসছিস না কেন? দেখছিস না তোকে কিভাবে বের করে দিচ্ছে? তবুও এই বাড়ি পড়ে থাকবি? তোর কি নিজের আত্মসম্মান বলতে কিচ্ছু নেই বোনু? পা’গ’ল হয়ে গেছিস তুই?

ভাইয়ের কথায় সন্ধ্যার বুকটা আরও ভার হয়। দম আটকে আসে। তার ক’ষ্ট সে কাকে বোঝাবে? এতোদিন পর আকাশকে পেয়ে আকাশের থেকে দূরে কি করে যাবে সে? আবার এরকম আকাশের কাছেই বা থাকবে কি করে?

সন্ধ্যা ভাইয়ের দিকে তাকায়৷ চোখদু’টো ভীষণ লাল। মেয়েটা ভাঙা স্বরে আওয়ড়ায়,

“পা’গ’লদের তো মান থাকে না, জানোনা ভাইয়া? তুমি যাও।”

এটুকু বলতে গিয়ে সন্ধ্যার চোখ থেকে আরও ক’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। সৌম্য ঢোক গিলল। আজ পর্যন্ত যেই চাওয়া তার বোনুর জন্য চায়নি, আজ সেটাই চাইল। খুব করে চাইল, তার বোনুর কপালে সুখ না থাকলে তার বোনু ম’রে যাক। এই স্বা’র্থপ’র দুনিয়ার বুক থেকে বিদায় নিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে তার বোনু একটু শান্তিতে থাকুক। সে ভাই হিসেবে ব্যর্থ। পারলো না তার বোনুর জীবনে এক ঝাপ্টা সুখ এনে দিতে। এর চেয়ে তার প্রাণের বোনুর মরণ-ই সই।

আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

“আমার বাড়িতে আমার মেয়ে থাকবে। এখানে কারো কথা শুনে আমার মেয়েকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবো না আমি।”

মায়ের কথায় আকাশ বিরক্ত হলেও চুপ থাকলো। আসমানী নওয়ান সৌম্যকে থাকতে বলতে গেলে সৌম্য ভাঙা গলায় বলে,

“আমার বোনুকে দেখে রাখবেন।”

কথাটা বলে সৌম্য আর এখানে দাঁড়ালো না। আর না তো কারো দিকে তাকালো! ইরার হাত ধরে খালি হাতে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। ডান হাতে ঝাপসা চোখজোড়া ডলে নেয় ছেলেটা। আবারো দৃষ্টি ঝাপসা হয়। পাশে ইরা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে।

এতোদিন মনে পুষে রেখেছিল, তার এক বড় ভাই ছিল, যে তাকে ভীষণ ভালোবাসতো। আর আজ থেকে জানতে হবে, তার সেই বড় ভাই তাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসে না। বুকের বা পাশটা ব্য’থায় জর্জরিত হয়। বা হাতে ইরাকে জড়িয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাঙা গলায় বলে,

“আমার আর বোনুর জীবনে সুখ নেই রে ইরাবতী। আজ প্রথমবারের মতো তোমাকে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে ভীষণ আফসোস করছি। তোমার সুখ প্রাপ্য ছিল। যা আমার কাছে একদম ক্ষণস্থায়ী!”

ইরা হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। সৌম্য দাঁড়ালো না। ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে এগোলো। এই ত্রসীমানায় দাঁড়ালেও তার নিজেকে কীটের চেয়েও মূল্যহীন লাগছে।

.

.

সন্ধ্যা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সৌম্য আর ইরার পানে। যাদের এই স্থান ত্যাগ করতে বড্ড তাড়া। সন্ধ্যা দরজায় মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। দু’চোখ বেয়ে অনর্গল নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। সৌম্য যখন বলেছে, সে এই বাড়ি আর আসবে না। এর মানে সে সত্যিই আসবেনা সন্ধ্যা জানে। ছোট থেকে কত যত্নে তার ভাইয়া তাকে মানুষ করেছে৷ কত আদর দিয়ে বড় করেছে! নিজে না খেয়ে তাকে খাইয়েছে সেই বাবা-মা রূপি ভাইকে তার স্বামী কত অপমান করল! সন্ধ্যার বড্ড ক’ষ্ট হলো! দেখতে দেখতে সৌম্যরা দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায়। সন্ধ্যার কান্নার বেগ বাড়ে। সে কিছুই ভাবতে পারছে না। সে শুধু অনুভব করছে তার ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছে। এই জীবনের উপর মেয়েটার বড্ড বিতৃষ্ণা জন্মেছে। দুর্বল, ক্ষ’ত মনটা আজ নিজের মরণ বড্ড প্রয়োজনবোধ করল।

ভেতরে আসমানী নওয়ান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা তার মাথা জ্যাম করে রেখেছে। কি করবেন, কি করা উচিৎ কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা। পাশে লামিয়া। মেয়েটা বান্ধবীর জন্য একটু পর পর চোখের জল ফেলছে। সত্যিই তার বান্ধবীর কপাল পোড়া।

সন্ধ্যা এখনো দরজা কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার সাথে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। চোখের বাঁধ এখনো থামেনি। দৃষ্টি তার থেকে কিছুদূরে দাঁড়ানো আকাশের দিকে। যে মনের সুখে সিগারেট ফুঁকছে, যেন ভীষণ ভালো একটি কাজ করেছে৷ বা হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। ডান হাতে জ্ব’লন্ত সিগারেট। ইতোমধ্যে পুরো এক প্যাকেট সিগারেট শেষ করেছে। এখন লাস্ট সিগারেট ফুঁকছে।

সন্ধ্যা খুব মনোযোগ দিয়ে আকাশকে দেখছে। আকাশকে সে জীবনে একবার সিগারেট খেতে দেখেছিল। তবুও একটা মাত্র, তার-ও আবার অর্ধেক। অথচ আজ আকাশ একটার পর একটা সিগারেট পোড়াচ্ছে। সন্ধ্যা বিড়বিড় করে,

“আপনি কে বলুন তো? আমার আকাশ এতো অ’মানুষ নয়।”

কথাটা সন্ধ্যার নিজের কাছেই ঠিক লাগলো না। এটা আকাশ না হলে আসমানী নওয়ানকে কিভাবে চিনতো? আকাশ শুধু তাকেই চেনে না৷ বাকি সবাইকে চেনে। মেয়েটির চোখ বেয়ে আবারও অশ্রু গড়ায়। ঠোঁট নাড়িয়ে আওড়ায়,

“মানুষ পরিবর্তনশীল! কথাটা তবে মিথ্যা নয়?”

আকাশ মাত্রই এদিকে ফিরেছিল তখন-ই সন্ধ্যার ঠোঁট নাড়ানো তার চোখে পড়ে। অবাক করা কান্ড, আকাশ সন্ধ্যার কথা একটু-ও শুনতে পায়নি, কিন্তু ঠোঁট নাড়ানো দেখেই লাইনটি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। আকাশ নিজের কান্ডে নিজেই অবাক। এটা কিভাবে সম্ভব? ঠোঁটের ফাঁকে এখনো সিগারেট। দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে। মুখাবয়বে অবাকের রেশ।

চলবে ইনশাআল্লাহ……..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments