লেখিকা:সানজিদা আক্তার মুন্নী
পর্ব : ১০
সুখ তো এক অধরা মরীচিকা। কথায় আছে, সুখের কপালে সুখই জোটে, আর দুঃখ যার চিরসঙ্গী, সুখ তাকে ছুঁয়েও দেখে না। আনভির জীবনেও ঠিক তাই ঘটছে। সুখ নামক পাখিটা তার জানালার কার্নিশে এসে বসছে ঠিকই, কিন্তু ডানা ছুঁয়ে দেখার আগেই যেন উড়ে যাচ্ছে দূর অজানায়।
সেদিনের পর পনেরোটা দিন পেরিয়ে গিয়েছে। ওয়াহেজের সাথে আনভির দাম্পত্য জীবন এক সুন্দর স্বপ্নের মতো কাটছে। আনভি ভীষণ খুশি, ওয়াহেজকে নিয়ে তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু এই সাজানো বাগানের আড়ালে, ওয়াহেজের নিখুঁত মুখোশের পেছনে যে এক ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে আছে, আনভি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তার মুখোমুখি হচ্ছে। এশার নামাজ শেষে ওয়াহেজের জন্য ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়ে বেলকনির দরজায় পা রাখতেই থমকে দাঁড়ায় আনভি। ভেতর থেকে ভেসে আসছে ওয়াহেজের গলা। সে ফোনে তার বন্ধু সাফির সাথে কথা বলছে। আনভির কানে বিষের মতো বিঁধছে প্রতিটি শব্দ,
“ইয়াহিয়ার সম্পর্কে সব তথ্য বের করার একমাত্র ট্রাম্পকার্ড হলো আনভি। আমার ওয়াইফ। ওকে কাজে লাগাতেই হবে। আর ইতিমধ্যেই আমি ওর সাথে একটা স্ট্রং ইমোশনাল বন্ডিং তৈরি করে নিয়েছি। তাই ইয়াহিয়াকে নিয়ে আপাতত টেনশনের কিছু নেই। লোকটাকে এবার হাতেনাতে ধরব, আর টোপ হিসেবে কাজ করবে ওর নিজের মেয়েই। ও ভেবেছিল ছোট মেয়েকে সরিয়ে বড় মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে পার পেয়ে যাবে! কিন্তু আমি ওর চালেই ওকে মাত করব। আনভি এখন আমার স্ত্রী, আমি যা বোঝাব ও তাই বুঝবে। এই খেলায় পলিটিক্স না খাটালে আমারই বড়সড় লস হয়ে যাবে সাফি।”
কথাগুলো শোনার পর আনভির পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। হাতের চায়ের কাপটা কাঁপছে। সে আর সামনে এগোয় না, নিঃশব্দে সেখান থেকে ফিরে আসে। আজ ওয়াহেজও যেন প্রমাণ করে দিচ্ছে, আনভিরা আসলে কারো খাঁটি ভালোবাসার যোগ্য নয়; পৃথিবীর কাছে তারা কেবলই দাবার ঘুঁটি। ওয়াহেজের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া, এই অঢেল আদর-সোহাগ সবই ছিল আনভিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার এক নিপুণ অভিনয়! আর আনভিও কী ভীষণ বোকার মতো এই মিথ্যে ভালোবাসায় গলে যাচ্ছে! নিজের ওপর চরম ধিক্কারে ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। সে এত বড় বোকা? এত অন্ধ? চায়ের কাপটা নিয়ে এসে আর এগোয়া না এই বিশ্বাস ভাঙ্গায় সে ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে আনভি কোনোমতে কিচেনে রেখে আনভি টলটলায়মান পায়ে রুমে ফেরে। দেখে ওয়াহেজ বেলকনি থেকে ঘরের দিকেই আসছে। লোকটার ছায়া দেখলেও এখন আনভির গা গুলিয়ে ঘেন্না আসছে। তাও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় সে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দু’চোখ ছাপিয়ে বাঁধভাঙা জলের ধারা নেমে আসে। চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস টেনে নেয় সে। নিজেকে শান্ত করে আয়নার লাল চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বিড়বিড় করে বলে, “তার ডকুমেন্ট চাই তো? আমি দেব। আমিও চাই আমার বাবার সব কুকর্ম ফাঁস হোক। সব প্রমাণ আমি তার হাতে তুলে দিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাব। আমাকে তো সবাই শুধু ব্যবহারই করছে! বাবা, স্বামী সবাই একরকম, সবাই চরম স্বার্থপর। মিথ্যে সম্পর্কের এই অভিনয় শেষ করে, স্বার্থের এই বিষাক্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে আমি অনেক দূরে চলে যাব। সরাসরি প্রতিশোধ হয়তো আমি নিতে পারব না, তবে যাওয়ার আগে এই নোংরা খেলোয়াড়কে আমি এমন এক শাস্তি দিয়ে যাব, যার ক্ষত সে আজীবন বয়ে বেড়াবে।”
নিজেকে শক্ত আবরণে মুড়িয়ে আনভি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। বেরোতেই ওয়াহেজ তার চিরচেনা অভ্যাসমতো আনভিকে পেছন থেকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আনভির ঘাড়ে মুখ ঘষে আদুরে গলায় জানতে চায়, “কী হয়েছে সামাইরা? এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছো?”
আনভির ভেতরটা এখন রাগে আর ঘৃণায় ফুঁসছে। ‘যেখানেই যাই, তাতে আপনার কী বিশ্বাসঘাতক!’ কথাগুলো ওর ঠোঁটের ডগায় এসেও আটকে যায় । এখন কোনোভাবেই আবেগ দেখানো যাবে না। তাই কঠিন স্বরে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে সে বলে, “না, এই তো একটু নিচে যাব। রান্নার কাজ আছে। আপনি আমাকে একটু ছাড়ুন এখন।”
ওয়াহেজ আনভির ঘাড়ে আলতো চুমু এঁকে দিয়ে বলে, “এত ছটফট করছ কেন আজ? সারাদিন পর ঘরে এলাম, একটু সময় তো আমারও প্রাপ্য, তাই না?”
আনভি এবার প্রায় জোর করেই ওয়াহেজের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নির্লিপ্ত রেখে বলে, “আমার একটু জরুরি কাজ আছে নিচে। আপনি বসুন, আমি আসছি।”
কথাগুলো বলেই আনভি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না, দ্রুতপায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ওয়াহেজ কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। আনভির এই হঠাৎ শীতল আচরণ সে ঠিক মেলাতে পারছে না। এই ক’দিন তো মেয়েটা এমন করেনি! যতক্ষণ ওয়াহেজ ঘরে থাকতো, আনভি তো তার ছায়ার মতোই লেগে থাকতো।
ও কি কিছু শুনে ফেলল নাকি?
পরক্ষণেই ওয়াহেজ নিজের মনকে প্রবোধ দেয় নাহ, শুনবে কী করে? আর মাঝখান থেকে দু-এক কথা শুনলেও এর পুরো অর্থ বুঝতে পারার মতো বুদ্ধি তো আর তার নেই!
রাত দশটা নাগাদ,,,,
রান্না করার অজুহাতে আগে ওয়াহেজের কাছ থেকে সরে গেলেও, এখন তো ঘুমানোর সময়; ঘুমাতে হবে ওয়াহেজের সাথেই। আনভি ওজু করে এসে আলতো পায়ে বিছানায় ওঠে, বালিশে আলগোছে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। ওয়াহেজ তার পাশেই আধশোয়া হয়ে বসে কিছু ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সে প্রচুর চিন্তায় আছে কীভাবে এই ব্যবস্থাকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই তার মূল ভাবনা। গত তিন বছরে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এই খাতে বেশ বড়সড় পরিবর্তনও সে এনেছে। ওয়াহেজের কঠোর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশে ফএক যুগান্তকারী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে প্রথাগত পড়ালেখার খোলস ভেঙে প্রতিটি ক্লাসকে মাত্র ৬ মাসের ডাইনামিক সেশনে নামিয়ে আনা হয়েছে। তার এই সিস্টেমে জিপিএ-৫ বা ৩ ঘণ্টার পরীক্ষার কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা নেই, বরং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় বাস্তবমুখী প্রজেক্ট ও দৈনন্দিন সৃজনশীলতার ভিত্তিতে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ চিরতরে বন্ধ করতে ও সব কোচিং সেন্টার ও গাইড বই নিষিদ্ধ করে শিক্ষকদের আমলাদের সমতুল্য ‘এলিট’ মর্যাদা ও সর্বোচ্চ বেতন নিশ্চিত করেছে, ফলে দেশের সেরা মেধাবীরাই এখন শিক্ষকতায় আসছে। স্কুলগুলো এখন আর মুখস্থবিদ্যার কারখানা নয় বরং কোনো হোমওয়ার্ক ছাড়া আনন্দদায়ক ল্যাবরেটরি, যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার, হাই-টেক প্রযুক্তি এবং সমান সুযোগ পেয়ে খুব অল্প সময়েই এক একজন দক্ষ, চিন্তাশীল ও সুখী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে।
ওয়াহেজের কেন যেনো মনে হচ্ছে, আনভি তার থেকে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। এই যে এখন চুপচাপ শুয়ে পড়ল, অথচ গত রাতেও তো সে নিজ ইচ্ছেয় এগিয়ে এসে ওয়াহেজের বুকে মাথা রেখেই ঘুমিয়েছিল। ওয়াহেজ ফাইলগুলো গুটিয়ে রাখে। ধীরে ধীরে আনভির পাশ ঘেঁষে, পেছন থেকে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। আনভির কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলে, “সামাইরা, কেউ কিছু বলেছে তোমায়?”
আনভি নিঃশব্দে কাঁদছে। গাল বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। ভেতরটা তার ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠছে বারবার। ঢোক গিলে গলা পরিষ্কার করে ও ফিসফিসিয়ে বলে, “না তো, কে কী বলবে?”
ওয়াহেজ আনভিকে আরও শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নেয়। তার কাঁধে আলতো চুমু খেয়ে বলে, “তাহলে এমন এড়িয়ে চলছ কেন?
” না না তো কই এড়িয়ে চলছি আমি তো আপনার পাশেই আছি। “
এ শুনে ওয়াহেজ আনভির কামিজ সরিয়ে তার উন্মুক্ত উদরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, ” আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলাম তোমায় সময় দেব বলে। গত তিন দিন তোমায় একদম সময় দিতে পারিনি। কিন্তু তুমি আমার আশেপাশেই এলে না। একবার এলেও কাজের অজুহাত দিয়ে চলে গেলে। আমার কি কিছু ভুল হয়েছে? আমি কি তোমার সাথে কোনো অন্যায় করেছি?”
ওয়াহেজের কথায় আনভি বুঝতে পারে, তার এমন আচরণে ওয়াহেজের মনে সন্দেহের দানা বাঁধছে। সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ওয়াহেজের দিকে ঘোরে এবং তার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ভেজা চোখ দুটো লুকানোর জন্যই ওয়াহেজের বুকে মুখ গুজে দেয়। আনভি ওয়াহেজকে জড়িয়ে ধরে বলে, “না না, আমি আপনার ওপর নারাজ নই। আমি ভাবছিলাম, হয়তো আপনি ঘরে বসে কাজ করবেন। দুপুরে তো রান্না করিনি, তাই একটু কেমন যেন লাগছিল, এই আরকি! আপনার যখন সময় হবে, তখনই আমাকে সময় দেবেন। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
আনভির কথায় ওয়াহেজ কিছুটা শান্ত হয়। সে আনভির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তবে তার মনে চিন্তার মেঘ কাটে না ওয়াহেজ মনে মনে ভাবে, “একবার মনে হয়, তুমি তোমার বাবার হয়ে আমার কাছে এসেছ; আবার মনে হয়, তুমি সত্যিই কিছু জানো না। তোমার সাথে একটুখানি ভালো সময় কাটানোর ইচ্ছেটা দিন দিন প্রবল লালসায় পরিণত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেখি কী হয়! যদি বুঝি তুমি সত্যিই নিষ্পাপ, তবে এভাবেই আগলে নিজের করে রেখে দেব। আর যদি প্রমাণ হয় তুমি বিশ্বাসঘাতক, তাহলেও নিজের কাছেই রাখব তবে সেটা হবে শাস্তিস্বরূপ। তোমার সাথে আমি সংসার করব এইসবি আমার তোমার সাথে থাকার স্বীকারোক্তি!”
অন্যদিকে আনভি ওয়াহেজের বুকে মাথা রেখেই মনে মনে ভাবে, “আপনি আমাকে বিশ্বাস করলেন না! আমার সরলতাটাকে আপনি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করলেন। আমার বাবার করা পাপের মাশুল বোধহয় এভাবেই আমাকে সারা জীবন দিয়ে যেতে হবে।”
এভাবেই দুজন মনে মনে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো ভাবনা পুষে রেখে, সামনাসামনি ভালো থাকার নিপুণ নাটকে মেতে ওঠে। ওয়াহেজ আনভির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে, “একটু কাছে আসি?”
আনভির মন চায় চিৎকার করে ‘না’ বলতে। সে বলতে চায়, ‘আপনার এই মিথ্যা ভালোবাসার ছোঁয়া আমার গায়ে লাগাবেন না!’ তথাপি সে এখন নিরুপায়। সে চায় না ওয়াহেজ ঘুণাক্ষরেও টের পাক যে, আনভি সব সত্যি জেনে গেছে। আনভি সামান্য সরে গিয়ে নিজের ওড়নাটা বিছানার একপাশে ফেলে দিয়ে শুধু বলে, “আচ্ছা।”
ওয়াহেজ মুচকি হেসে আনভির গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বলে, “শুকরিয়া, ম্যাডাম।”
এ কথা বলেই ওয়াহেজ ধীরে ধীরে প্রতিদিনের মতোই আনভির মাঝে বিলীন হয়ে যায়। হয়তোবা এটাই হতে যাচ্ছে তাদের শেষ মিলন হয়তো এরপর ওয়াহেজ আনভিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে! আনভি তো কেবল একটুখানি ভালো থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু এই পৃথিবীর স্বার্থপর মানুষগুলো তাকে থাকতে দিল না। ক্ষণিকের মোহের মতো সুখ এসে আবার চলেও গেল। আনভির ভেতরটা যে কী পরিমাণ যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তার কোনো কিছুতেই আক্ষেপ নেই, ওয়াহেজ তাকে বিশ্বাস করেনি তাতেও কোনো দুঃখ নেই। তার দুঃখ শুধু এতটুকুতেই যে, ওয়াহেজ নিজের স্বার্থে তার সাথে সংসার করার এই জঘন্য নাটকটা করল!
চলবে……..
আপনারা কি গল্পটি পছন্দ করছেন না? গল্পটা কি বন্ধ করে দিব? আগের তুলনায় রেসপন্স কম৷