ওহে হৃদয়ের রজনীগন্ধা (০১)

লেখক:DRM Shohag

পর্ব:০২

 

“হোয়াট দ্য হেল আর ইয়্যু? চোখ নেই? কোন সাহসে

আমার গায়ের মধ্যে উঠে আসছো? ম্যানারলেস মেয়ে

কোথাকার!”

চলন্ত ট্রেনের পাশের সিটে বসা এক অপরিচিত মেয়ের

উদ্দেশ্যে বাজখাঁই গলায় কথাগুলো বলে উঠল হৃদয়।

পাশে বসা মেয়েটি ভ’য় পেয়ে দাঁড়িয়ে যায়, ভীত চোখে

তাকায় হৃদয়ের আ’গু’নচোখা চোখের দিকে।

রাতের শুনশান পরিবেশে, ঝিকঝিক করে চলতে থাকা

নিস্তব্ধ ট্টেনের ভেতর হঠাৎ এমন বজ্রকণ্ঠে সকল যাত্রীর

টনক নড়ে। কেউ কেউ নিজেদের জায়গা থেকে ঘাড়

বাঁকিয়ে, কেউ বা শরার টানা দিয়ে, কেউবা কোমর

বাঁকিয়ে দেখার চেষ্টা করে ঘটনাটি। চোখে পড়ে একটি

মেয়ের দিকে। একেকজনের মনে একেকরকম প্রভাব

পড়ল, তবে কেউ এগিয়ে এলো না।

বসন্তকালের শেষ তখন। ধরণীতে মৃদু শীতের আমেজ।

মেয়েটি এখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে

অসম্ভব ভীতি। জানালা দিয়ে শো শো করে বাতাস এসে

সরাসরি মেয়েটির গা ছুঁয়ে দিচ্ছিল। ঘুমের ঘোরে মেয়েটি

বেখেয়ালে পাশের সিটে হেলে পড়ে। মৃদু শীতের রাতে,

উষ্ণতা পেয়ে মেয়েটি হৃদয়ের বুকে গুটিশুটি মে’রে শুতে

চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই হৃদয়ের কঠোর স্বরে বলা

কথায় মেয়েটির ঘুম একেবারে ছুটে যায়। ভ’য়ের চোটে

বসে থাকার সাহস হারায়। কিন্তু শীতে কাঁপতে থাকা

মেয়েটি বেশিক্ষণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না।

হঠাৎ ট্রেনের তীব্র ঝাঁকুনিতে ব্যালেন্স হারিয়ে ঠাস করে

পড়ে যায় নিজের সিটে। ব্যাগসহ দু’হাত গিয়ে পড়ে

হৃদয়ের ডান পায়ের উরুর উপর।

কিছুক্ষণ আগে মেয়েটি গায়ের উপর এসে পড়ায়

এমনিতেই হৃদয়ের মাথা পুরোপুরি গরম ছিল, সেটুকু

ঠান্ডা হওয়ার আগেই আবারো একই কাহিনী রিপিট

হওয়ায় রা’গে হৃদয়ের মাথা পুরো দা’উ’দা’উ করে জ্ব’লে

উঠলো যেন। বা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পায়ের উপর উপুড়

হয়ে পড়া মেয়েটির দিকে চেয়ে আছে সে।

দ্বিতীয়বারের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়, মেয়েটির

রীতিমতো কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গেছে। কোনোরকমে

ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসে সামনে তাকালে দেখল,

টকটকে দু’টো লাল চোখ তার দিকেই চেয়ে আছে৷

মেয়েটি ঢোক গিলে মাথা নিচু করে নেয়। তার সিটে

সিটিয়ে গিয়ে দু’হাতে ব্যাগটি শ’ক্ত করে বুকে চেপে

গুটিশুটি মেরে বসে। বার বার শুকনো ঢোক গিলছে। বুক

ধুকধুক করছে এই ভেবে যে, এই বুঝি ছেলেটি তাকে

আগের ন্যায় কড়া ধমক, নয়তো থা’প্প’ড়-ই না লাগিয়ে

দেয়। কিন্তু মেয়েটির ভাবনার কোনোটিই বাস্তবায়ন হলো

না। উল্টে হঠাৎ-ই রাগান্বিত হৃদয় ঝট করে উঠে দাঁড়ায়।

এরপর মেয়েটিকে পাস করে নিজের সিট থেকে বেরিয়ে

এসে হনহন করে হেঁটে ট্রেনের পিছন দিকে চলে যায়।

হৃদয় বেরিয়ে যেতেই মেয়েটি ঘাড় বাঁকিয়ে দেখার চেষ্টা

করল, ছেলেটি আছে কি-না গেছে। হৃদয়কে দেখতে না

পেয়ে মেয়েটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আশেপাশে তাকিয়ে

দেখল অনেকেই তার দিকে চেয়ে আছে। মেয়েটি কিছুটা

বিব্রতবোধ করে নড়েচড়ে বসল। মাথা নিচু করে মলিন

মুখে বসে রইল মেয়েটি।

সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জায়গায় এসে মেয়েটি এমনিতেই

বড্ড ভ’য়ে ভ’য়ে সময় পার করছিল। এর মাঝে হৃদয়ের

সাথে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তার ভীতির পরিমাণ

কয়েকশো গুণ বেড়ে গিয়েছে।

মেয়েটির নাম রজনী। ছোট্ট একটি গ্রামের মেয়ে রজনী।

দরিদ্র ঘরের মেয়ে সে। বাবা ভ্যান চালক। দিন এনে দিন

খাওয়া মানুষ রজনীরা। হয়তো তাদের সংসারে অভাব

ছিল, কিন্তু সুখের কোনো কমতি ছিল না। বাবা, মা-সহ

ছয় বছর বয়সী ছোট একটি বোন রূপা, আর ১৭ বছরের

রজনী,, এই ছিল তাদের ছোট্ট একটি সুখী পরিবার।

‘রজনী আর রূপা’ দুই মেয়ে ছিল বাবার চোখের মণি।

কিন্তু হঠাৎ সব উলটপালট হয়ে গেল। যে বাবা রজনীকে

ছোট থেকে এতো এতো ভালোবেসে বড় করল, সেই বাবা

আজ তার গায়ে হাত তুলল। অকথ্য ভাষায় গা’লা’গা’লি

করল, শুধুমাত্র সে তার বাবার ঠিক করা পাত্রকে বিয়ে

করতে রাজি হয়নি বলে৷ রজনী কি করে রাজি হবে ওমন

ছেলের সাথে বিয়ে বসতে? যে ছেলে সুযোগ পেলেই

তাকে রাস্তাঘাটে উৎপাত করত, তার বান্ধবীদের

জ্বা’লা’তো। তাকে রজনী স্বামী হিসেবে কি করে মানবে?

এলাকার চেয়ারম্যান এর ছেলের সাথে রজনীর বিয়ে ঠিক

হয়েছিল। ছেলের পরিবার থেকে প্রস্তাব আসে রজনীর

বাবার কাছে। এতো বড় ঘর থেকে মেয়ের জন্য প্রস্তাব

পেয়ে রজনীর বাবার তখন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার

মতোন অবস্থা হয়। রজনী তার বাবাকে অনেক করে

বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের গ্রামের চেয়ারম্যান এর

ছেলে ভালো নয়, ভীষণ উগ্র, আর বখাটে। কিন্তু বাবা

মেয়ের কথা কানেই নিল না। উপর থেকে যা দেখেছিল,

তাতেই তার বাব সব ভুলে গিয়েছিল। তার বাবার মতে,

‘ওতো বড় ঘর থেকে আসা দেবদূতের মতো মানুষদের

নিয়ে তার মেয়ে রজনী কি করে এসব ক’টু কথা বলতে

পারে?’

এজন্য রজনীর বাবা মেয়ের উপর খুব চড়াও হয়।

রজনী তবুও খুব করে বাবাকে বোঝাতে চাইল, ছেলেটা

ভালো নয়, সে ওই ছেলেকে বিয়ে করবেনা। কিন্তু বাবা

তার কথা শুনলো তো না-ই, উল্টে তাকে থা’প্প’ড় মে’রে

ঘরে আটকে চলে গেল। জীবনের প্রথম বাবার থেকে

এতো নি’ষ্ঠু’রের মতো আচরণ পেয়ে রজনী খুব কাঁদলো।

আর তারপর, বিয়ের রাতে, বরযাত্রী আসার আগে আগে

বাড়ির কাউকে না জানিয়ে রজনী বাড়ি থেকে পালিয়ে

এলো।

গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে রজনী। জীবনের প্রথম বাড়ি

থেকে বের হয়ে স্কুল ব্যতীত অজানায় পাড়ি জমাচ্ছে সে।

কোথায় যাচ্ছে, কোথায় যাবে, কিচ্ছু জানে না। শুধু জানে

ওরকম ল’ম্প’ট ছেলের বউ হওয়ার চেয়ে ম’রে যাওয়া

ভালো। আজ যদি রজনী ওই গ্রামে থাকত, তবে তার বিয়ে

ওই ল’ম্প’ট ছেলের সাথেই হবে। আর তাই সে কাউকে

কিচ্ছু না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। কথাগুলো

ভাবতে গিয়ে রজনীর চোখজোড়া ভিজে উঠল। সে

জানেনা, সে যেখানে বসে আছে, এটা আসলে কার সিট।

ভ্যানে করে স্টেশনে এসে একটি ট্রেন পেয়ে সেখানেই উঠে

গিয়েছে। কিন্তু ট্রেনের কোনো সিট ফাঁকা পায়নি। ট্রেনের

একটি বগিতে এসে চোখে পড়ে একটি ছেলের পাশের

সিট ফাঁকা। লাজুক রজনী এগিয়ে এসে বসেনি অপরিচিত

ছেলের পাশে। কিছু সময় পেরোনোর পর, একজন মহিলা

এগিয়ে এসে রজনীকে জিজ্ঞেস করে, তার সিট কোথায়।

রজনী ছোট্ট করে জানায়, ‘তার সিট নাই।’

এরপর ভদ্রমহিলাটি ছেলেটিকে বলে রজনীকে তার পাশে

জোর করে বসিয়ে দেয়। ছেলেটির মুখ দেখেই বোঝা

যাচ্ছিল, সে খুব বিরক্ত হচ্ছিল, কিন্তু কিছু বলেনি। আর

তারপর রজনী ক্লান্তির ভাড়ে যখন ঘুমে ঢলতে ঢলতে

ছেলেটির গায়ে পড়ে গিয়েছিল, তখনই ছেলেটি এতো

রিয়েক্ট করে এখান থেকে চলে যায়। রজনী দীর্ঘশ্বাস

ফেলে আশেপাশে তাকিয়ে তখনকার মহিলাটিকে খুঁজল,

কিন্তু পেল না। এর মাঝে একবার ট্রেন থেমেছিল, হয়তো

তখনই ভদ্রমহিলা ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছে। এই

অপরিচিত, অচেনা জায়গায় উনিই একমাত্র তার দিকে

এগিয়ে এসেছিল, আর বাকিরা সবাই চুপ থেকেছে। এই

যে একটু আগে ছেলেটি তার উপর খুব জোরে চেঁচালো,

তখন যদি সেই ভালে মানুষটা থাকতো, তবে নিশ্চয়ই

রজনীর দিকে এগিয়ে আসতো। বাকিদের মতো চুপ করে

শুধু দেখতো না। কথাগুলো ভেবে রজনীর মন খারাপ

হলো। রজনী আগের চেয়েও একটু কুঁকড়ে বসল। শীত

করছে তার। পায়ের চটিজোড়া খুলে রেখে সিটের উপর

দু’পা তুলে বসল। কোমরে গুঁজে রাখা শাড়ির আঁচল খুলে

নিজেকে টেনেটুনে ঢেকে শীত নিবারণ করতে চাইলো।

মুখখান শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। মা, ছোট বোন, বাবা

সবাইকে রেখে এসেছে সে। আসার পথে অনেক কেঁদেছে।

চোখমুখ এখনো লাল। কিন্তু অবুঝ রজনীর মাথায় তখন

পালিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় আসেনি।

_________________

ট্রেন চলছে একই গতিতে। হৃদয় ট্রেনের দরজার সামনে

দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নেভিব্লু কালারের জিন্স প্যান্ট,

সাথে একই কালারের শার্ট। দু’হাতের শার্টের হাতা কব্জি

পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া। হাতার বোতামগুলোও খুলে রাখা। বা

হাতে সেনালি রঙের একটি চেইন ঘড়ি। ডান হাত প্যান্টের

পকেটে গুঁজে রাখা। উজ্জ্বল শ্যামলা গড়নের ছেলে

শাহরিয়ার হৃদয় নওরোজ। গালে চাপ দাঁড়ি ভর্তি। কালো

চোখের মণি দু’টো চলন্ত ট্রেনের বাইরে দূর আঁধারে

নিবদ্ধ। ২৫ বছর বয়সী হৃদয় গত দু’বছর আগে ঢাকা

মেডিকেল থেকে পড়ে বেরিয়েছে। এখন বিসিএস আর

এফসিপিএস এর জন্য চেষ্টা করছে। বাবা বিজনেসম্যান।

বাবার ব্যবসা টুকটাক দেখা হয়। এখনও পুরোপুরি

ফোকাস করেনি কাজে।

বাস, ট্রেন এসবে জার্নি করা হয়না হৃদয়ের। চাপে পড়ে, বা

মাঝেমাঝে বাধ্য হয়ে এই বিরক্তিকর কাজ তাকে করতে

হয়। তবে তার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সে গাড়ি ছাড়া

অন্যকিছুতে জার্নি করলে সবসময় নিজের জন্য দু’টো

সিট কা’টে। এবারেও তার ব্যতীক্রম করেনি। সে দু’টে

টিকিট-ই কে’টেছিল। কিন্তু কোথাকার কোন মেয়ে এসে

তার সিট দখল করল। সে মুখের উপর না করতে পারল

না। কিন্তু তখন থেকেই তার মেজাজ পুরো ৪৪০ ডিগ্রি হাই

হয়েছিল। মেয়ে তো দূর, যেখানে তার পাশের সিটে

ছেলেকেই এলাউ করেনা সে। সেখানে এক মেয়ে উড়ে

এসে জুড়ে বসেছে। হৃদয় বহুক’ষ্টে মেনে গাট্টা মে’রে

বসেছিল, কিন্তু যখন ওই গায়ের পড়া মেয়েটা গায়ের মধ্যে

উঠে এলো, তখন আর নিতে পারলো না। গলার ভয়েজ

দিয়েই বো’মা ফা’টা’লো মনে হলো। সবশেষে অ’সহ্য হয়ে

নিজের সিট থেকেই উঠে চলে এলো। এখন মেজাজ চরম

খারাপ আছে। পকেটে অনেকক্ষণ যাবৎ ফোন ভাইব্রেট

হচ্ছে, হৃদয় ইচ্ছে করেই কল রিসিভ করছে না। সে জানে

এটা তার বে’য়া’দ’ব বন্ধু নিলয় ছাড়া আর কেউ নয়।

নিলয় ওকে টেনে নিলয়ের গ্রামের বাড়ি এনেছিল বলেই

হৃদয়ের আজ এই দিন। নিলয়কে হাতে কাছে পেলে ওকে

কাঁচা চিবিয়ে খেত। আরও অনেকক্ষণ ফোন ভাইব্রেট

হওয়ার পর হৃদয় বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে ফোন বের

করে কল রিসিভ করে। ওপাশ থেকে নিলয় হাঁপাতে

হাঁপাতে বলে,

“কি রে ভাই? কল দিতে দিতে হাঁপিয়ে গেলাম, আর তোর

এখন সময় হলো আমার কল রিসিভ করার? আমি

হাঁপানি রোগী হলে পকেট কিন্তু তোর-ই ফাঁকা হবে, ভেবে

দেখিস।”

হৃদয় বিরক্ত হয়ে বলে,

“কি বলবি বল?”

নিলয় আফসোসের সুরে বলে,

“রাতটা থেকে গেলেই পারতি ইয়ার। যদিও থেকে গেলেও

বিয়েটা খেতে পারতি না। কারণ আমাদের গ্রামে ইয়া বড়

কে’লে’ঙ্কা’রি হয়ে গেছে।”

হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলে, “কি হয়েছে?”

নিলয় অসহায় কণ্ঠে বলে,

“আরে আমার চাচাতো ভাইয়ের আজ বিয়ে ছিল তোকে

বললাম না? কিন্তু বেচারার বউ পালিয়েছে। পুরো বিয়ে

ভেস্তে গেছে। ওর চেহারাটা দেখার মতো ছিল!”

শেষ কথাটা বলে নিলয় শব্দ করে হেসে দেয়। হৃদয় কণ্ঠে

বিরক্তি ঢেলে বলে,

“ভাইয়ের বিয়ে ভা’ঙ’লে কেউ এভাবে হাসে? বে’য়া’দ’ব!”

নিলয় মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে হাসতে হাসতে বলে,

“কাহিনী আছে মামা। পরে বলব একদিন। তুমি তো

গ্রামের পার্টি মিস করে গেলা হৃদয় মামা। আজ বিয়ে

ভা’ঙা’র শোকে আমরা সব্বাই হেব্বি মজা করব, তুমি

এবার ট্রেনে বসে আঙুল খাও।”

হৃদয় এসব পাত্তা দিল না। যদিও তার সব ফ্রেন্ড নিলয়দের

গ্রামে। তারা মূলত নিলয়ের বোনের বিয়ে খেতে গিয়েছিল।

এরপর হুট করে নিলয়ের চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়।

সবাই নিলয়ের চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে খাওয়ার জন্য

থেকে গেলেও হৃদয় থাকেনি। গত দু’দিন গ্রামে থেকে তার

অবস্থা পুরো খারাপ। পুরো শরীর রেশে ভ’রে গেছে, সাথে

গরম, ধুলোবালি সবমিলিয়ে হৃদয়ের মনে হচ্ছে, তার

জীবন এই দু’দিনে ঝালাপালা হয়ে গেছে৷ নিজ বাড়িতে

এসি ঘরে ঢুকতে পারলে একটু শ্বাস নিতে পারবে।

নিলয় আবারো বলে, “আন্টির কল ধরিস না কেন? উনি

চিন্তা করছে। তার হৃদয় ফিডার খেয়েছে কি-না এটা

শুনতে বলল। খেয়েছিস?”

হৃদয় রে’গে বলে,

“নিলয় এমনিতেই রে’গে আছি আমি। মেজাজ খারাপ

করাস না।”

নিলয় ভ্রু কুঁচকে বলে,

“ভাই তুই যখন রে’গে থাকিস না সেইসময়টা বলিস।

তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। মানে তোর রে’গে থাকার

সময়টা বেশি লম্বা। আমি আবার খুব ভালো স্টুডেন্ট,

এতো মনে রাখতে পারিনা। বুঝিস-ই তো ব্যাপারটা।

হৃদয় ডান হাত মুঠো পাকালো। হাতের কাছে থাকলে

বাজে বকার জন্য এ নি’ঘা’ত একটা চড় তার হাতে খেত-ই

খেত। নিলয় আবারো বলে,

জমিদার সাহেবের তো আবার গ্রাম সহ্য হয় না। নিজের

মর্জি মতোই তো ঢেংঢেং করে চলে গেলি। তা বলছি এখন

রে’গে থাকার কারণটা কি রে?

হৃদয় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“কারণ তোর মতো একটা অ’স’ভ্য, বে’য়া’দ’ব, গায়ের

পড়া স্বভাবের মেয়ে আমার সিট দখল করে নিয়েছে।”

নিলয় খুকখুক করে কেশে ওঠে। ওমাগো, কোন মেয়ে এই

বি’দ’ঘু’টে ছেলের সিট দখল করল? কই তার পাশে তো

কোনো মেয়ে বসে না৷ সে কতদিন বাসে, ট্রেনে বসে চেয়ে

চেয়ে থাকলো, কোনোদিন কোনো মেয়ে এসে তার পাশে

বসলো না৷ আর এই তেঁতো ছেলেটার পাশে মেয়ে মানুষ

বসলো? ছ্যাঁহ! কত বড় অ’ন্যায় হলো তার সাথে? এসব

অ’ন্যায় মেনে নেয়া যায়? নিলয়ের মুখটা অসহায় হয়ে

গেল। আপাতত এসব দুঃখ চেপে সে ভাবলো, মেয়েটার

যদি কিছু হয়ে যায়? তাহলে তো তাদের সব বন্ধুদের

জে’ল হয়ে যাবে। এই বন্ধু নামের শ’ত্রুকে তারা সবাই

হাড়ে হাড়ে চিনে। নিলয় এবার হৃদয়ের উদ্দেশ্যে সিরিয়াস

হয়ে বলে,

“দেখ ভাই, ভালোয় ভালোয় বলছি, তুই ট্রেন থেকে নেমে

যা। ওই মেয়েটার জন্য তোকে আমার মোটেও সেভ

লাগছে না।”

হৃদয় রাগান্বিত স্বরে বলে, “হোয়াট?”

নিলয় কান থেকে ফোন সরিয়ে নিয়ে বলে,

“আস্তে চেঁচা। মিস্টেক মিস্টেক! মনে হয়, ওই মেয়ের জন্য

তুই-ই একমাত্র সেভ জোন। থাক ভাই তুই ট্রেনেই থাক।”

হৃদয় রে’গে বলে,

“আজ তুই আমার পাশে থাকলে তোকে এই চলন্ত ট্রেন

থেকে ধাক্কা দিতাম, ড্যাম শিইওর।”

কথাটা বলেই হৃদয় কল কেটে দেয়। এপাশে নিলয়

হতাশার শ্বাস ফেলে। খেয়াল করল, তার দিকে চারটি

উৎসুক চোখ চেয়ে আছে। কিছু বলার আগেই তার

চারবন্ধু নিলয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিলয়সহ চারজন-

ই উল্টে পড়ল। তবে নিলয় চেঁচিয়ে উঠলেও বাকিদের

মাঝে খুশির আমেজ। সকলে নিলয়কে চেপে ধরে চেঁচিয়ে

বলতে লাগলো,

“ওয়াহ্ ওয়াহ্, অবশেষে হৃদয়ের পাশের সিট কেউ দখল

করেছে। এবার আমাদের হৃদয় মামা বিয়ে করল বলে,

আর আমাদের নিলয় মামার সিঙ্গেল হওয়ার পালা হলো

বলে!”

নিলয় চারজনের নিচে চ্যাপ্টা হয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।

‘হৃদয়ের মতো মানুষ জীবনে বিয়ে করবে না, করলে

নিলয় বিয়ে করবে না।’

এই কথাটা নিলয় তার বন্ধুদের বলেছিল। তার কি দোষ,

হৃদয় তো এমনই ছেলে৷ কেমন যেন। শা’লার মাঝে

রসকষ কিছু নেই। এইজন্যই তো সে এতো কনফিডেন্টলি

ওসব কথা বলেছে। এখন তার কথা না মিললে তার

বিয়ের কি হবে? নিলয় কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলতে

লাগলো,

“আল্লাহ প্লিজ, আমি বিয়ে করব! একটা হলেই হবে।

চারটা লাগবেনা। কিছু একটা কর মেরি আল্লাহ!”

____________________

ফজরের আজানের পর ধরনীতে মৃদু আলো ফুটতে শুরু

করেছে। ট্রেন থেমেছে আরও অনেকক্ষণ আগে। এরপর

আর স্টেশন নেই। এটাই শেষ স্টেশন। রজনী চুপচাপ বসে

আছে। ধীরে ধীরে সকল যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছে।

যে দু’একজন ছিল তারাও নেমে গিয়েছে। রজনী কাঁধে

হৃদয়ের মাথা। ছেলেটা ঘুমের ঘোরে তার কাঁধে চলে

এসেছে। রজনী ঘুম থেকে ওঠার পর হৃদয়ের মাথা

অনেকবার সরানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। বেচারি

ভ’য়ে কাঁপছে। রাতে যে ধমকটাই না দিয়েছিল। আর

এখন সে ঘুম থেকে উঠে দেখছে রাতে ছেলেটার গায়ে

একটু টাচ লাগতেই ধমক দেয়া ছেলেটি এখন তার-ই

কাঁধে আরামে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটার কাঁধ ব্য’থা হয়ে

আছে, সে অনুমান করছে, এই ধমকের রাজা ছেলেটা

সারারাত তার কাঁধেই ঘুমিয়েছে। মেয়েটা বোধয় ঠিক করে

রা’গ-ও করতে পারেনা। এজন্যই ছেলেটার প্রতি রা’গ নয়,

উল্টে আরও ভ’য় কাজ করছে মেয়েটির। সে কেন ভ’য়

পাচ্ছে, তাও জানে না। তাছাড়া এখান থেকে বেরিয়ে কি

করবে, কোথায় যাবে কিছুই জানেনা রজনী। সবমিলিয়ে

মেয়েটির কান্না পাচ্ছে। সে ঢোক গিলে মাথা বা দিকে

বাঁকিয়ে ডান হাতে হৃদয়ের মাথায় হাত রাখে। হাতটি

কাঁপছে, তবুও সে হৃদয়ের মাথা ঠেলে সরাতে চাইলো,

তখন-ই হৃদয় চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে মুখের

উপর অপরিচিত মেয়ের মুখ দেখে হৃদয় ঝটকা খেয়ে সরে

যায় রজনীর কাঁধ থেকে। ঝিম ধরা মাথা এদিক-ওদিক

ঝাঁকিয়ে তাকায় রজনীর দিকে। রজনীর উদ্দেশ্যে গম্ভীর

গলায় বলে,

“বাই এনি চান্স, তুমি কি আমাকে নিজের দিকে টেনে

নিয়ে আমার সুযোগ নিতে চাইছিলে?”

রজনী শুকনো ঢোক গিলল। হৃদয়ের কথাটা বুঝতে তার

অনেকটা সময় লাগলো। যতক্ষণে বুঝল, ততক্ষণে হৃদয়

ধমকের স্বরে বলে,

“তোমাকে আমি দেখে নিব। যাস্ট ওয়েট এন্ড সি।”

কথাটা বলে হৃদয় ভেতরের সিট থেকে বেরিয়ে এসে,

উপরের কেবিনেট থেকে তার ব্যাগ নিয়ে বড়বড় পায়ে

বেরিয়ে যায় ট্রেন থেকে। আপাতত এই ট্রেনে রজনী

ব্যতীত আর কেউ নেই বোধয়। রজনী হৃদয়ের ধমকের

চেয়েও ভ’য় পেল এই ট্রেনে সে একা ভেবে। মেয়েটি

কোলের ব্যাগ নিয়ে পায়ে চটি পরে একপ্রকার দৌড়ে

বেরিয়ে আসে ট্রেন থেকে। বাইরে এসে চারপাশে তাকালে

দেখল জায়গায় জায়গায় কিছু মানুষ, তবে ছেলে মানুষ-ই

বেশি৷ রজনী ভ’য়ে গুটিয়ে গেল। সে এখন কোথায় যাবে?

এখানে কাউকেই তো চেনে না। তার পাশে বসা ছেলেটিকে

খুঁজল মেয়েটি। অবশ্য এর কারণ আছে। রজনী সারারাস্তা

এই ছেলেটির পাশে বসে এসেছে৷ কিন্তু ছেলেটা তার সাথে

খারাপ কিছু করার চেষ্টা করেনি। যদিও তাকে মিথ্যে

মিথ্যে কথা বলেছে, কিন্তু ওই ছেলেটা তো অন্তত তাদের ।

গ্রামের চেয়ারম্যান এর ছেলের মতো তার দিকে

খারাপভাবে তাকায়নি। বোকা রজনী এটুকু বুঝেই

হৃদয়কে খুঁজছে। আশেপাশে বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে খুঁজে

পেয়ে যায় হৃদয়কে। হৃদয়ের পিটে একটি ট্যুর ব্যাগ। সে

গটগট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। রজনী তার ব্যাগ ধরে দৌড়

লাগালো হৃদয়ের দিকে। কয়েক হাত দূরত্বে এসে মেয়েটির

দৌড় থেমে যায়। হৃদয়ের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। মিনিট

দুই হাঁটার পর হৃদয়ের মনে হলো, একদম তার পিছু পিছু

কেউ হাঁটছে তো হাঁটছেই, যেন তাকে ফলো করছে। হঠাৎ-

ই সে থেমে যায়। সাথে রজনীও থেমে যায়। হৃদয় উল্টো

ঘুরে তাকালে তার পাশের সিটে বসা মেয়েটিকে দেখে

বিস্ময় চোখে তাকায়। মুহূর্তেই মাথা টগবগিয়ে উঠল। এই

মেয়ে তো আচ্ছা গায়ে পড়া স্বভাবের! যেগুলো সে নিতে

পারেনা। হৃদয় কড়া ধমক দেয়ার আগেই রজনী কম্পিত

কণ্ঠে বলে ওঠে,

“বিশ্বাস করুন, আমি আপনার সুযোগ নিইনি”

হৃদয় থেমে যায়। কপালে ভাঁজ পড়ে ছেলেটার। ট্রেনে

মেয়েটিকে সেভাবে দেখেনি। এবার সে ভালেভাবে

তাকালো। মেয়েটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলালো।

মেয়েটির গেটআপ দেখে হৃদয়ের বিরক্তির মাত্রা বাড়লো।

কেমন উদ্ভট! মেয়েটির পরনে একটি সুতি শাড়ি, যেটি

গ্রাম্য স্টাইলে পরা। মাথায় মাঝ বরাবর মোটা করে সিঁথি

করে পিছনে বড়সড় একটি খোঁপা বাঁধা। নাকের মাঝ

বরাবর ঝুলন্ত ছোট্ট একটি নথ। দু’হাতে একটি ছোট্ট ব্যাগ

বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে,

কোনো অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা এক মেয়ে। এরকম

অদ্ভূত ড্রেসআপ প্লাস অদ্ভূত স্টাইলের মেয়েকে হৃদয় এই

প্রথম দেখল। তবে তার মাঝে বিরক্তি আর রা’গ ছাড়া

তেমন কিছু লক্ষ্য করা গেল না। বারবার তার গায়ে পড়ছে

বলে সে মেয়েটিকে আরও দু’টো কড়া কথা শোনাতে

চাইলো। কিন্তু রা’গের মাত্রা এতো বেড়েছে যে সে বিরক্তি

নিয়ে উল্টো ঘুরতে নিল, তখনই রজনী সাহস করে বলে,

“আমাকে একটা থাকার জায়গা দিবেন ভাইয়া?”

কথাটা শুনতেই হৃদয় বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটির

দিকে। রাগান্বিত স্বরে উচ্চারণ করে, “হোয়াট?”

হৃদয়ের ধমক এতো কড়া ছিল যে, রজনী ভ’য় পেয়ে দু’পা

পিছিয়ে যায়। ধুকধুক বুক নিয়ে শুকনো ঢোক গিলতে

লাগলো অনবরত।

চলবে……

 

Leave a Comment